অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৩+৪৪
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘরে ছুঁই ছুঁই। আনিকার রুমে বিষণ্ন মনে শুয়ে আছে হীরা। খেলা শেষে আনিকারা সবাই ছাদে গেছে তাকেও যেতে বলেছিল তবে সে যায়নি। সবাই তেমন একটা জোরও করেনি- এসব নিয়ে হীরার মাথা ব্যাথা নেই। তার পুরো মস্তিষ্ক জুড়ে ঘুরছে অনিল নামক পুরুষটি। যে আজকে একবারও তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেনি আর নাতো তার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করেছে। সে কী এতটাই তুচ্ছ অনিলের কাছে?
ভাবনার মাঝেই রুমের দরজা ভিড়িয়ে রুমে প্রবেশ করলো কেউ। সাথে সাথেই নিজের অবাধ্য অশ্রুকণা দের আড়াল করে ফেললো সে।
“ হীরা চলো। ”
আনিকার কথায় ঘুরে তাকালো হীরা। বললো,
“ কোথায়? ”
“ ছাদে। ”
“ আমি যাবো না আপু, আমার ভালো লাগছে না। ”
“ তুমি উঠো তো, ভালো না লেগে কোথায় যাবে আমি দেখছি। ”
হীরাকে টেনে শুয়া থেকে তুলতে তুলতে বললো আনিকা। হীরা অসহায় কণ্ঠে বললো,
“ আপু প্লিজ আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। ”
“ প্লিজ হীরা একটুর জন্য এসো, আমার কথা রাখবে না তুমি? ”
হাল ছাড়লো হীরা। পড়নের শাড়িটা ঠিকঠাক করে বিছানা ছাড়লো। আজকে অনেকদিন পর শাড়ি পড়েছে সে। পড়েছে বললে ভূল হবে বাড়িতে মেহমান আসছে বিদায় তার শাশুড়ি মা তাকে এক প্রকার জোর করেই পড়িয়েছে। প্রথমে হীরা রাজি না থাকলেও পরে অনিলের শাড়ি পড়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা স্মরণে আসতেই তা অমান্য করতে ফটাফট পড়ে ফেলেছে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
অলস ভঙ্গিতে হেঁটে এক সময় ছাদের সিড়ির কাছে এসে থামলো আনিকা ও হীরা। বেখায়ালি ভাবে সিঁড়িতে পা রাখতেই হচোট খেলো হীরা। হালকা হলুদ আলোয় আলোকিত সিঁড়ি গুলোতে নজর পরতেই চমকে গেলো মেয়েটা। গুনে গুনে ষোলো টা সিঁড়িতে মাঝারি সাইজের ষোলো টা গিফট্ বক্স রাখা। রঙিন কাগজে মোড়ানো বক্স গুলো থেকে নজর সরিয়ে পাশে থাকা আনিকার দিক তাকাল হীরা। সে তাকাতেই আনিকা চোখের ইশারায় গিফট্ বক্স গুলো তুলতে বললো। প্রথম বক্স টা তুললো হীরা। বক্স এর উপরে একটা কাগজে গুটিগুটি অক্ষরে লিখা,
“ স্যরি হীরা ”
থমকালো মেয়েটা। আনিকা তার হাত থেকে বক্স টা নিয়ে বললো,
“ বাকিগুলো তাড়াতাড়ি তোলো, সময় শর্ট। ”
তার কথায় দ্বিতীয় সিঁড়ির বক্স টা তুললো হীরা। সেখানেও একই ভাবে লিখা,
“ স্যরি, মিসেস অনিল এহসান।”
“ স্যরি, পাঁজরিনী ”
“ স্যরি, অবুঝপাখি। ”
“ স্যরি, পিচ্ছিপরী। ”
“ স্যরি, কিশোরী। ”
“ স্যরি একান্ত রোগী সাহেবা। ”
“স্যরি, আমার ভবিষ্যৎ বাচ্চার আম্মু। ”
এভাবেই পুরো ষোলোটা সিঁড়ি ষোলো রকমের সম্বোধনে “স্যরি ” অতিক্রম করে শেষ হলো হীরার বক্স তোলার পর্ব। আর সেগুলো হাতে নিয়ে নাজেহাল অবস্থা আনিকার। সিঁড়িতে রেখেছে দশ টা আর বাকিগুলো তার হাতেই। সতেরোতম সিঁড়িতে এসে আর কোনো গিফট্ বক্স চোখে পরলো না হীরার। তবে সাদা কাগজে, কালো কালিতে লিখা একটি ভাঁজ করা চিরকুট পেলো সে। চিরকুট টা খুলে চোখের সামনে ধরতেই ভেসে উঠলো কিছু লাইন,
“ সতেরোতম জন্মদিনের গিফট্ টরা জন্য আপনার মসৃণ পা জোড়া একটু কষ্ট করে ছাদে রাখতে হবে রুগী সাহেবা। ”
কিঞ্চিৎ হাসির রেখা ফোটে উঠলো হীরার মুখ জুড়ে। দরজা ঠেলে ছাদে প্রবেশ করলো সে। সাথে সাথেই পুরো ছাদ আলোকিত হয়ে উঠলো। চারপাশ থেকে সমস্বরে ভেসে আসলো অনাকাঙ্খিত একটি লাইন,
“ Haapy Birthday Mrs. Onil Ehsan. Happy Birthday to you. ”
বিস্ময়ে বাক হারা হয়ে গেল হীরা। আজকে যে, তার জন্মদিন তা একেবারেই ভূলে গেছিলো সে। তার মানে তখন ছাদে আসতে তাকে জোর করা হয়নি এ কারণে! ছাদের মাঝখানে একটা চকলেট কালালের বার্থডে কেক। তার চারপাশে জ্বালানো সতেরো টি ক্যান্ডেল। গিফট্ বক্স গুলো মেঝেতে রেখে হীরার কাছে এলো আনিকা। হীরার গাল টেনে বললো,
“ Haapy Birthday my sweet vabi. ”
“ Thank you my sweet apuiii. ”
কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে বললো হীরা। তারপর তাকে মাঝখান টায় নিয়ে গিয়ে কেক কাটাতে লাগিয়ে দিলো আনিকা। ক্যান্ডেল গুলো নিভিয়ে কেক কাটলো হীরা। যেহেতু এখানে বড়োরা কেউ নেই তাই সবার আগে কাটা অংশ টা আনিকার হাতে দিয়ে ইশারা করলো অনিল কে দিতে। তৎক্ষনাৎ পিছিয়ে গেলো আনিকা। হেসে উঠলো সকলে। সবাই জানে অনিল আর হীরার মান অভিমানের কথা। আনিকা বলেছে তাদের, তবে মান অভিমানের কারণ কাউকেই জানায়নি। উপায় না পেয়ে হীরা সেই কাটা অংশ টা আলাদা করে সাইডে রেখে দিলো। তারপর কেক কেটে সবাইকে খাওয়ালো তবে নিজে এখনো মুখে নেয়নি। সকলেই বিষয়টা বুঝতে পেরে আর তেমন কিছু বলে নি। কেক খাওয়ার পর্ব শেষ হতেই পরিকল্পনা অনুযায়ী সকলে সব গুছিয়ে ছাদ ত্যাগ করা শুরু করলো।
ক্ষনিকের মধ্যেই ফাঁকা হয়ে গেলো পুরো ছাদ। শুধু সামনা সামনি দাঁড়িয়ে রইলো দুজন ক্লান্ত মানব- মানবী। অনিল পলকহীন দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে হীরাকে। হাঁসফাঁস করছে হীরা, অনিল কে কিছু বলতে না দেখে পা ঘুরিয়ে যেতে নিচ্ছিলো ওমনিই পিছন থেকে এক জোড়া বলিষ্ঠ হাতের বাঁধনে আটকা পরলো তার ছোট্ট শরীরটা। উদরে অনিলের ঠান্ডা হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠলো মেয়েটার পুরো সত্ত্বা।
“ আমি না চাওয়া অবধি এখান থেকে এক পা ও নড়া না হোক। ”
হীরার ঘাড়ে থুতনি ঠেকিয়ে নিরেট স্বরে বললো অনিল। চোখ মুখ খিচে দাঁড়িয়ে রইলো হীরা। এর মাঝেই তাকে ছেড়ে দিলো অনিল। ছাড়া পেয়ে ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে অনিলের দিক ফিরলো হীরা। তবে সামনে ফিরে অনিলকে হাঁটু মুড়ে বসতে দেখে চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো তার। হীরার সামনে একটা লম্বা বক্স মেলে ধরলো অনিল, সেখানে সাদা পাথরের একটা ব্রেসলেট ঝকঝক করছে, যার ভিতরে নিখুঁত ভাবে খুদাই করে গুটিগুটি অক্ষরে লিখা “অবুঝপাখি”। লিখা টার দু’পাশে নকশা করা আছে দুটো ছোট পাখি। এক দেখাতেই যে কেউ বলে দিতে পারবে এটা একটা স্বর্ণকারের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল। ব্রেসলেট টা হাতে নিয়ে অনিল বলা শুরু করলো,
“ তুমি আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে জন্ম নেয়া এক বেনামী রোগ যা নিরাময়ের একমাত্র প্রতিষেধক তোমার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। আমার বক্ষদেশে জন্ম নেয়া এক জীবন্ত অবুঝপাখি তুমি,যার ক্ষনিকের দূরত্ব বিষিয়ে তোলে এই আমার পুরো আমিটাকে। আমার অনুভূতির রাজ্যে রাজত্ব করা একান্ত পিচ্ছিপরী তুমি, যার অনুপস্থিতিতে এই আমি টার সকল অনুভূতিরা অকাল মৃত্যুতে ধাপিত হয়ে পড়ে। ভালোবাসি, আমার পাঁজরে রাজত্ব করা পাঁজরিনী। যতটা ভালোবাসলে এক তুমিহীন, পুরো পৃথিবীটা শূন্যতায় জর্জরিত হয়ে পড়ে ততটা ভালোবাসি।
এবারের জন্য এই অধমকে মার্জনা করুন মিসেস. অনিল এহসান। আপনারা বুঝদার পুরুষ নাহয় একটু অবুঝ পনামী করে ফেলেছে তার জন্য আপনি যা শাস্তি দিতে চান দিন। তাও তার থেকে দুরত্ব বাড়াবেন না। নয়তো আপনিহীন ভয়ানক ব্যাথায় ব্যাথিত হয়ে সে যে নিঃশেষ হয়ে যাবে। আপনার ডাক্তার সাহেব যে তার একান্ত রোগী সাহেবা ব্যতিত একেবারেই নিঃস্ব। সবকিছু ভূলে আজ হয়ে যান না তার নিসঙ্গতার সঙ্গী, লিখে দেন আমাদের অকস্মাৎ প্রণয়ের এক সুখময় পরিণতি। এই যে, কিশোরী পারবেন কী? ”
চোখ দিয়ে টপটপ করে বারি বর্ষণ হচ্ছে হীরার। আবেগ, ভালো লাগা, ভালোবাসা, বিস্ময় সব কিছু মিলিয়ে হেঁচকি শুরু হয়ে গেছে মেয়েটার। তবুও অবস হয়ে আসা বাঁ হাতটা বাড়িয়ে দিলো অনিলের উদ্দেশ্যে। পলকের মধ্যেই সেখানে স্থান পেলো গোল্ড ও ডায়মন্ড মিশ্রিত ব্রেসলেট টি। সোজা হয়ে হীরার মুখোমুখি দাঁড়ালো অনিল। চোখের পানি মুছে দিয়ে অনুতপ্ত স্বরে আবারও বললো,
” স্যরি অবুঝপাখি। ”
“ আপনি খুব বাজে ডাক্তার। না জেনে, না বুঝে রোগী কে শুধু কষ্ট দেন। ”
অনিলের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো হীরা। মুহূর্তেই তাকে পাঁজাকোলো করে নিলো অনিল। ছাদ থেকে নামতে নামতে হীরার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
“ আর দিবো না। ”
তুলতুলে নরম বিছানায় এসে পিঠ ঠেকলো হীরার। অনিলের এতটা সান্নিধ্যে কাঁপছে তার শিরা,উপশিরা। শ্বাস প্রশ্বাস যেনো আজ কালবৈশাখী ঝড় বইয়ে ছাড়বে বলে পণ করেছে। তার কাঁপতে থাকা হাত গুলো নিজের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় পুরে নিল অনিল। মুহূর্তেই তার সুঠাম দেহের নিচে চাপা পড়লো হীরার ছোট্ট নারী দেহটা। সহসাই হীরার কানের কাছে মুখ নিয়ে অনিল নেশালো স্বরে বলে উঠলো,
“ ভালোবাসি ”
এই টুকু বলেই হীরার পুরো মুখমন্ডলে চুমু খেলো অনিল। তারপর আকড়ে ধরলো হীরার গোলাপি রঙা অধরযুগল। অধরের সকল মিষ্টতা শুষে নিয়ে গ্রীবা দেশে মুখ ডুবিয়ে দিলো অনিল। তার পুরুষালী ঠোঁটের এক একটা স্পর্শে বাড়তে লাগলো হীরার কাঁপুনি। শরীর ছেড়ে দিলো সে, ভারী নিশ্বাসের সাথে শরীর কেঁপে উঠছে তার ক্ষণে ক্ষণে। অনিলের সেসবে খেয়াল নেই সে নেশায় বুদ হয়ে আছে। গভীর থেকে গভীর হতে লাগলো তার ছুঁয়া। হীরার শরীরের প্রতিটা অঙ্গ প্রতঙ্গে বিচরণ করছে তার পুরুষালী ছুঁয়া। সময়ের সাথে সাথে অনিল যেনো আরও বেসামাল হয়ে উঠছে, আর হীরার তার বুঝদার পুরুষকে সামলাতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। বহু প্রতীক্ষার পর স্বামীর থেকে পাওয়া এক একটা স্পর্শ সাদরে গ্রহন করতে ব্যাস্ত সে।
এভাবেই এক মিষ্টিময় রাতকে সাক্ষী রেখে লিখা হলো তাদের অকস্মাৎ প্রণয়ের সুখময় পরিণতি। যার ভাঁজে লুকিয়ে আছে দুজন নর- নারীর সকল অনুভূতি।
মাঝরাতে ফোনের বাজখাঁই শব্দ ঘুম ভেঙে গেলো আনিকার। ঘন্টা খানেক হয়নি ঘুমিয়েছে মেয়েটা। এর মাঝেই কোন ইবলিশের এখন আবার কল দেওয়ার সময় হলো। চোখ বুঝেই ফোন হাতে নিয়ে কল রিসিভ করলো সে। ঘুমের জন্য ঠিক মতো চোখ গুলোও খুলতে পারছে না সে।
“ তোমার নাকি ফ্রাইডে তে বিয়ে? ”
“ রং নাম্বার, শাশুড়ির পোলার কপালে লাল বাতি জ্বালানোর দিন আমার পোড়া কপালে সিলেক্ট হয়নি। ”
“ ইরাবতী, আই অ্যাম সিরিয়াস। ”
ধমক খেয়ে ঘুম পুরো চটে গেলো আনিকার। ধরফর করে উঠে বসলো সে। বললো,
“ আপনি মি. উগান্ডা! ”
“ তোমাকে আমি কী জিজ্ঞেস করেছি ঐটার উত্তর দাও। ”
“ আসলে ঘুমের মধ্যে শুনছিলাম তাই মনে নাই, একটু আবার বলুন প্লিজ। ”
“ তোমার নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে? ”
“ আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ না মিস্টেক আলহামদুলিল্লাহ ,আলহামদুলিল্লাহ। এতদিনে তবে জামাইয়ের কপালে লাল বাতি জ্বালানোর সুযোগ পাইলাম। কিন্তু লোকটা কে? ”
“ তুমি কী আমার সাথে মজা করছো? ”
“ ইয়া আল্লাহ! বলে কী, আমি মোটেও মজা করছি না তবে মজা এসে যাচ্ছে। ”
“ তুমি কী নিরব কে পছন্দ করো? ”
কপালে ভাঁজ পরল আনিকার। এই লোক বলে কী! নিরব ভাইয়ার নাম কেন নিচ্ছে? তার ভাবনার মাঝেই আবারও ধমকে উঠলো সাদিক,
“ তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি আমি। ”
“ আরে ধুর, আপনার মতো বেয়াই থাকতে আমি নিরব ভাইয়াকে কেন পছন্দ করতে যাবো! ”
কথাটা বলে নিজেই থতমত খেয়ে গেলো আনিকা। সাথে সাথেই কথা কাটিয়ে বললো,
“ আই মিন… ”
সম্পূর্ণ করতে পারলো না কথাটা এর আগেই সাদিক বললো,
“ ইউ মিন, ইউ লাইক মি? ”
“ আরে না, আমি ঐটা বুঝাতে চাইনি। ”
“ তুমি অন্য কিছু বুঝাতে চাইলেও আমি এটাই বুঝবো। যাই হোক বিয়াইন হিসেবে কিন্তু তুমিও মন্দ নও। ”
চুপ মেরে গেলো আনিকা। কথা খুঁজে পেলো না আর।
“ আচ্ছা এখন ঘুমাও আগামীকাল তোমার সাথে খুব ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলবো। ”
“ দিলেন তো ঘুম চাঙ্গে উঠাইয়া, কালকেই একেবারে কথা টা বলতেন এখন মনের মধ্যে উত্তেজনা ঢুকিয়ে দেওয়ার মানে হলো। ”
হাসলো সাদিক। বললো,
“ একদিন না ঘুমালে কী আর তুমি পাবনার মহিলা থেকে ভালো মহিলা হবে? জানি হবে না, তাই না ঘুমালেও কিছু হবে না। ”
“ আপনি আসলেই একটা উগান্ডার লোক। ”
বলেই কল কেটে শুয়ে পরলো আনিকা। কিন্তু ঘুম ধরা দিলো না চোখে। ভাবতে লাগলো সাদিকের প্রথমে করা প্রশ্নগুলো নিয়ে। তার বিয়ে, নিরব- এসব কী বললো উনি? সকাল হতেই আম্মুকে জিজ্ঞেস করতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতেই এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পরলো।
ধরণীতে সূচিত হলো এক নতুন সকালের। দিবাকরের তীক্ষ্ণ রশ্মি জানালার কাঁচ ভেদ করে চোখে পড়তেই ঘুম হালকা হয়ে গেলো হীরার। পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালো সে। অনিলের ঘন কালো লোমে বিস্তৃত নগ্ন বুকে আবিস্কার করলো নিজেকে। সন্তর্পনে মাথা তুলে অনিলের মুখপানে চাইতে নিবে ওমনিই তার মাথাটা বাড়ি খেলো অনিলের থুতনিতে। তৎক্ষনাৎ জিভ কেটে অতি সাবধানতার সাথে মাথাটা তুললো সে, অনিলের কুঞ্চিত কপালটা নজরে আসতেই ভেংচি কাটলো। মিনমিন করে বললো,
“ নিজে সারারাত আমাকে ঘুমাতে দেয়নি অথচ এখন একটু ঘুমে ডিস্টার্ব হয়েছে কী হয়নি এতেই নবাব সাহেব কপালে আস্ত একটা বাঁকা ব্রিজ নির্মাণ করে ফেলেছেন। ”
“ ইনজেকশন খেতে না চাইলে ডিস্টার্ব শান্ত হয়ে থাকো। ”
অকস্মাৎ অনিলের এমন ঘুম জড়ানো কন্ঠে সতর্ক বাণী শুনে ভরকে গেলো হীরা। উনি কী জেগে আছেন- ভাবতেই শুঁকনো ঢোক গিললো মেয়েটা। ভাগ্যিস চোখ খোলে নি! যে করেই হোক অনিলের চোখ খোলার আগে তাকে এই রুম ত্যাগ করতে হবে। নয়তো অনিলের সামনা সামনি পরলে তার অবস্থা বেগতিক হয়ে পড়বে। যা ভাবা তাই কাজ, আস্তে আস্তে অনিলের বাহু বন্ধনী থেকে নিজেকে ছাড়ালো সে। ছাড়া পেতেই এক দৌঁড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো।
আনিকার পুরো বিছানা জুড়ে গতরাতের সব গিফট নিয়ে বসে আছে হীরা। দুজন মিলে একটা একটা করে সবগুলো গিফট আনবক্স করছে। গিফট বলতে শুধু অনিল আর আনিকার দেওয়া গিফট গুলোই নিয়ে বসেছে সে, আর বাকিরা তার জন্মদিন সম্মন্ধে অবগত না থাকায় গিফট করতে পারে নি। এতে হীরার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই সে আনিকার গিফট আনবক্স করে এখন অনিলের গুলো খুলতে ব্যাস্ত। প্রথম গিফট বক্স টার প্যাকিং ছেড়ার পর সেখানে উদয় হলো “ বারো জোড়া অর্থাৎ চব্বিশটি ছোটো ছোটো গার্লস ডল” অবাক হলো হীরা। পরক্ষণেই নিচে একটা চিরকুট পেলো সেখানে গুটিগুটি অক্ষরে লেখা কিছু লাইন,
“ যখন তুমি এক বছরের একটা পিচ্ছিপুতুল ছিলে তখন নিশ্চয়ই তোমার এই পুতুলগুলো খুব পছন্দ ছিলো? তখন আমার অনুপস্থিতির জন্য আজ দিলাম। ”
লেখাটা পড়ে বিস্ময় ভাব টা কেটে গেলো হীরার, মুখে হাসি ফুটলো। দ্বিতীয় গিফট টা আনবক্স করলো হীরা। সেখানে দেখতে পেলো বিভিন্ন রকমের চকলেট সাথে একই ভাবে একটা কাগজে লিখা,
“ দুবছর বয়সে তো তুমি স্পষ্ট কথা বলতে পারতে তখন নিশ্চই প্রতিদিন বাবার কাছে তোমার ঐ গোলাপের পাপড়ির ন্যায় রাঙা ঠোঁট গুলো নেড়ে চকলেটের আবদার করতে? আমার থেকে প্রাপ্য চকলেট গুলো তোমায় আজ দিলাম। ”
এভাবেই এক একটা বক্স এ এক এক ধরনের জিনিস আর তার সাথে চিরকুট পেলো সে আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যে বছরের জন্য অনিল যেটা দিয়েছে সেই বছরে তার ঐটাই সবচেয়ে পছন্দ ছিলো। দেখতে দেখতে পনেরোতম গিফট খুলে সেখানকার চিরকুট আর জিনিসগুলো দেখে অত্যধিক সুখে মেয়েটার চোখে পানি এসে পরলো। সেখানে স্টেথোস্কোপ, ডাক্তারি অ্যাপ্রন আর চশমা, সাথে চিরকুট টা এমন,
“ পনেরো বছর বয়সে নবম শ্রেণীতে উঠে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়েছিলে নিশ্চই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে? নাও তোমার স্বপ্নের জিনিসগুলো তোমার হাতে তোলে দিলাম। আমার একান্ত রুগী সাহেবা থেকে একান্ত ডাক্তারিনী হওয়ার প্রতিটা কদমে তোমার ডাক্তার সাহেব তোমার পাশে আছে। আর হ্যাঁ আমার একটা ড্রিম আছে, তুমি ডাক্তারি পড়া শেষ করলে আমাদের নিজস্ব একটা হসপিটাল বানাবো সেখানে তুমি আমি মিলে সবাইকে রোগ সারানোর জন্য চিকিৎসা দেবো আবার নিয়ম করে প্রেম নামক রোগে আমরা দুজনেই আক্রান্ত হবো, আমি হবো তোমার একান্ত ডাক্তার আর তুমি হবে আমার ডাক্তারিনী। এভাবেই দুজনে দুজনার মধ্যেই বেঁচে থাকবো। কী বলো? ”
এতো সুখ কোথায় রাখবে হীরা? নিজের ছোটোবেলা থেকে দেখে আসা স্বপ্নটা তার ডাক্তার সাহেবের ও স্বপ্ন! এ কেমন অলৌকিক ঘটনা? সৃষ্টিকর্তা কী তার প্রার্থনায় থাকা প্রতিটা শব্দের অস্তিত্ব তার স্বামীর অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলো? এমনটাই হয়েছে হয়তো, সৃষ্টিকর্তা চাইলে কোনোকিছুই অসম্ভব নয়। চোখ মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করে ভাবনার মত্ত হয়ে থাকা আনিকার দিক নজর পরলো হীরার। বললো,
“ আপু তুমি কী কিছু ভাবছো? ”
সহসা হীরার কন্ঠে সম্বিৎ ফিরল আনিকার। বললো,
“ কই নাতো! ”
হীরার দিক চেয়ে জোরপূর্বক হেসে জবাব দিলো আনিকা। হীরার কপালে ভাঁজ পরল, সকাল থেকেই আনিকাকে কেমন যেন চিন্তিত দেখা যাচ্ছে আবার নাজিয়া বেগমের থেকে বিয়ের কথা জেনেও তেমন রিয়েকশন দেখায়নি। চুপচাপ থাকছে সারাক্ষণ। এই অব্দি হীরা বার কয়েক জিজ্ঞেশ করেছে “ কিছু হয়েছে আপু?” প্রতিবারই তাকে হতাশ করে দিয়ে আনিকা দু পাশে মাথা নেড়ে না বোধক উত্তর দিয়েছে। তার ভাবনার মাঝেই আনিকা বললো,
“ তা সব গিফট দেখা শেষ? কেমন লাগলো আমার ভাইয়ার গিফট গুলো?”
“ তোমার ভাইয়ার মতোই মনোমুগ্ধকর! ”
“ ওরে বাবু লে…! আমার পিচ্ছি ভাবী দেখি আমার ভাইয়ার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে! ”
মাথা নুইয়ে হাসলো হীরা। একটু তেই মেয়েটার গাল লজ্জায় রক্তিম হয়ে যায়- ভেবেই হাসলো আনিকা।
“ ঐ বক্স টা খুলবে না? ”
ষোলোতম গিফট বক্স টাতে আঙুল তাক করে জিজ্ঞেস করল আনিকা। হীরা সেদিকে তাকিয়ে সম্মতি জানিয়ে সেটা হাতে নিয়ে আনবক্সকিং করতে শুরু করলো। প্যাকিং ছিঁড়তেই সেখানে ভেসে উঠলো চোখ ধাঁধানো একটা মুকুট। সিলভার রঙের মুকুট টাতে স্থান পেয়েছে মুক্তোর ন্যায় ঝলমল করা অসংখ্য পাথর। চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো হীরার। আজকে যেনো শুধু তার বিস্মিত হওয়ার দিন। একের পর এক বিস্ময় মিশ্রিত জিনিস শুধু চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার। এই দিকে আনিকা মুকুট টা দেখতে পেয়েই দেরি না করে সেটা হীরার মাথায় পড়িয়ে দিলো। কালো কেশরাশির মাঝে চকচক করা বস্তুটি সামনে থাকা রমনী টিকে করে তুললো অত্যধিক আকর্ষণীয়। আনিকা দু’ গালে হাত রেখে পুলকিত স্বরে বলল,
“ ইয়া আল্লাহ, তোমাকে তো পুরো রাজকুমারীর মতো লাগছে হীরা! ”
“ ধুর আপু, কী যে বলোনা তুমি! ”
বলতে বলতেই মুকুট টা খুলতে ব্যাস্ত হলো হীরা তবে পারলো না আনিকার জন্য। তাকে পথিমধ্যেই থামিয়ে দিয়ে আনিকা বলল,
“ একদম না, আগে ভাইয়াকে দেখিয়ে আসো তারপর খুলবে। ”
আকাশ থেকে যেনো পড়লো হীরা। বললো,
“ আরে না আপু প্লিজ প্লিজ, এখন না পরে দেখাবো। এখন আমি রুমে যাবো না। ”
কপাল কুঞ্চিত করলো আনিকা। বললো,
“ কেন? ”
“ এমনেই। ”
মেকি রাগের ভান ধরলো আনিকা। তা দেখে হীরা কিছু বলতে নিবে তার আগেই তার ফোনে নোটিফিকেশন এর শব্দে মোবাইলে নজর দিলো।
“ এই যে মিসেস পিচ্ছিপরী, আপনার পদার্পণ ফেলে আমার রুমটটাকে জীবিত করুন, সে যে মৃত্যু পথে তলিয়ে যাচ্ছে। আপনাকে ছুঁয়েছি বলে কী আপনার ঐ চন্দ্রমুখ খানি দেখার সুযোগ কেড়ে নিবেন? পাঁচ মিনিটের মধ্যে রুমে আসুন নয়তো রুমের মালিক কিন্তু এতটাও সভ্য পুরুষ নয়। ”
অনিলের আইডি থেকে আসা মেসেজটা পড়তেই শিউরে উঠলো হীরার পুরো শরীর। অনিলকে আজকেই কেন বাড়িতে থাকতে হলো! আজকে না থেকে সারাবছর বাড়িতে থাকলেও তার কোনো সমস্যা ছিলো না। অথচ উনাকে আজকেই বাসায় থাকতে হলো। সেজন্যই তো সকাল থেকে এই অব্দি এক বারও রুমে যেতে পারে নি হীরা। শুধু এরুম ওরুম করেই পুরো সকাল কাটিয়ে দিয়েছে সে। এবার বুঝি তার সময় ফুরিয়ে এলো, দুই ভাই- বোন মিলে পিছে লেগেছে তার, না গিয়ে আর উপায় নেই। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। আনিকা কে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ আচ্ছা যাচ্ছি, আর রাগ করতে হবে না তোমাকে। ”
তার কথায় মুহূর্তেই হাসি ফুটলো আনিকার মুখে। সে তো এতোক্ষণ শুধু এক্টিং করছিলো। হীরা যেতেই নিজের ভাবনার জগতে আবার হারিয়ে গেলো সে।
ছোটো ছোটো পায়ে রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো হীরা। মাথার মুকুট টা খোলে হাতে নিলো। তারপর হাতটা পিছনে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। বুক কাঁপছে তার, এলোমেলো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রেখেছে মেঝেতে। সোফায় বসে মোবাইল স্ক্রোল করছিলো অনিল, হীরার উপস্থিতি টের পেয়ে মোবাইল থেকে নজর ফিরিয়ে তার উপর পূর্ণদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। হীরার কান্ড কারখানা দেখে সূক্ষ্ম হাসলো। হীরার এই লজ্জায় নুইয়ে রাখা বদন খানায় যেনো এক অন্যরকম আসক্তি জন্মে গেছে তার। বেশ মনোযোগ দিয়ে পুরোটা সময় হীরাকে দেখলো সে। তার থেকে কিছুটা দূরত্বে এসে থামলো হীরা। মৃদু স্বরে আওড়ালো,
“ কেন ডেকেছেন? ”
“ এদিকে এসো। ”
আরেকটু এগিয়ে গেলো হীরা। সহসাই তাকে হেচকা টান দিয়ে নিজের কোলে বসিয়ে দিলো অনিল। ভরকে গেলো মেয়েটা, নিজেকে বাঁচাতে অনিলের গলা জড়িয়ে ধরলো তৎক্ষনাৎ। হাতে থাকা মুকুট টা পরলো তার কোলে। সেটা হাতে নিয়ে অনিল ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ এটা কী হাতে নিয়ে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে? ”
জোড়ে জোড়ে দুদিকে মাথা নাড়ালো হীরা। বললো,
“ ঐ আমি… ”
কথা সম্পূর্ণ করতে পারলো না সে তার আগেই তাকে সোজা করে তার মাথায় মুকুট টা পড়িয়ে দিলো অনিল। চুলে আটকে রাখা কাঠগোলাপের ক্লিপ টা খোলে দিলো। খোলা কেশরাশিতে মুকুট পরিহিত হীরার পানে চেয়ে মোহনীয় স্বরে বললো,
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪১+৪২
“ একদম রানী লাগছে আমার অবুঝপাখি টাকে, অনিল এহসানের হৃদয় রাজ্যের রানী। ”
বলেই হীরার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ালো অনিল। আবেশে চোখ বুঁজে ফেললো হীরা। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো,
“ ভালোবাসি ডাক্তার সাহেব, আমার হৃদয় রাজ্যের রাজা সাহেবকে অসম্ভব ভালোবাসি। ”
হাসি ফুটলো অনিলের মুখে। হীরাকে নিজের সাথে আরও জড়িয়ে নিলো সে। হীরাও একদম বিড়াল ছানার মতো গুটিয়ে রইল তার ডাক্তার সাহেবের কোলে।
