Home অনুরাগে তুই অনুরাগে তুই পর্ব ৫৪

অনুরাগে তুই পর্ব ৫৪

অনুরাগে তুই পর্ব ৫৪
সাদিয়া শওকত বাবলি

নিশিথের আঁধার কেটে চারিদিকটা উজ্জ্বল আলোয় ভরে উঠেছে। রাতের আঁধারে নিস্তব্ধতায় ঢাকা শহরটা ব্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে একটু একটু করে। সরোয়ার চৌধুরী এবং মেহেরের মা মেহরিমা বেগম কেবলই সকালের নাস্তা সেড়ে এসে বসলেন বসার কক্ষের সোফায়। মেহেরও এসে বসলো তাদের মুখোমুখি। সরোয়ার চৌধুরী হাত উঁচিয়ে সময় দেখলেন। অতঃপর থমথমে কণ্ঠে শুধালেন,
“আলভীকে আসতে বলোনি? আমার অফিসের সময় তো প্রায় হয়ে এলো। অফিসে যেতে হবে।”
মেহের একটু দ্বিধাগ্রস্ত হলো। সরোয়ার চৌধুরীর কথা অনুযায়ী সে তো আলভীকে তখনই কল করেছিল। আর বলেছিল সকাল সকাল চলে আসতে।‌ কিন্তু এখনো ছেলেটা আসছে না কেন কে জানে! মেহের জোরপূর্বক হাসলো একটু। আমতা আমতা করে বলল,

“বলেছিলাম তো আসতে।”
“তাহলে এখনো এলো না কেন? আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম এই ছেলেটা ভালো নয়। কোনো ভদ্রতা নেই, সময়জ্ঞান নেই।”
মেহের কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হলো। সাথে বিরক্তও হলো আলভীর উপরে। ছেলেটাকে গতকাল বারবার করে বলে দিয়েছে তাড়াতাড়ি আসার জন্য। এও বলেছে যে সরোয়ার চৌধুরী তার সাথে কথা বলেই অফিসে যাবে। অথচ তার আসার এখনো কোনো নাম গন্ধ নেই। মেহের নিজের মোবাইলটা হাতে তুলে নিল। কল করল আলভীর নাম্বারে। আলভী কলটা ধরল না, উলটো কেটে দিলো। মেহেরের রাগ বাড়লো। দাঁতে দাঁত পিষে সে বিরবিরিয়ে বলল,
“পটানোর সময় তো কাক ডাকা ভোরেও আমার বাড়ির সামনে এসে দাড়িয়ে থাকতো। আর এখন এত বেলা হয়ে গেল তারপরেও আসতে পারছে না?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মেহেরের বিরবির করার মধ্যেই আলভী প্রবেশ করল বসার কক্ষে। বেশ নম্র কণ্ঠে বলল,
“আসসালামুয়ালাইকুম।”
সরোয়ার চৌধুরী তাকালেন আলভীর দিকে। থমথমে কণ্ঠে বললেন,
“ওয়ালাইকুমুস সালাম। বসো।”
আলভী নিজের সৌজন্যতা বজায় রেখে বসলো তার মুখোমুখিই একটি সিঙ্গেল সোফায়। সরোয়ার চৌধুরী সেদিকে তাকালো একবার। অতঃপর মেহরিমা বেগমের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললেন,
“ওর জন্য চা নাস্তার ব্যবস্থা করো।”
মেহরিমা বেগম পুরোনো দিনের মানুষ।

সহজ সরল ধাঁচের মহিলা। স্বামীর আদেশ আসতেই তিনি উঠে গেলেন। তবে উঠল না মেহের। সে ঠাঁয় বসে রইল পূর্বের স্থানেই। সরোয়ার চৌধুরী তাকালেন মেয়ের দিকে। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“তুমি এখানে এখনো বসে আছো কেন? তোমার মাকে সাহায্য করো যাও।”
মেহের আশাহত হলো। মেয়ের পছন্দের ছেলের সাথে বাবা-মা কথা বলছে কিংবা বাবা-মা বিবাহযোগ্য মেয়ের বিয়ের কথা বলছে সেখানে মেয়ের থাকা শোভা পায় না। তবুও মেহের নির্লজ্জের মতো এতক্ষণ বসেছিল। ভেবেছিল তার বাবা তাকে যেতে বলবে না। সে নিরিবিলিতে বসে বসে বাবা এবং আলভীর কথা শুনবে। কিন্তু তার সরোয়ার চৌধুরী শেষ পর্যন্ত তাকে যেতে বললই বলল। এখন আর এখান থেকে না গিয়েও উপায় নেই। মুখ ভার করে মেহের উঠে দাঁড়াল। একবার বাবার দিকে আর একবার আলভীর দিকে তাকিয়ে সে পা বাড়ালো রান্নাঘরের দিকে। মেহের চলে যেতেই সরোয়ার চৌধুরী দৃষ্টি দিলেন আলভীর দিকে। পূর্বের ন্যায় গুরুগম্ভীর কণ্ঠেই শুধালেন,
“আমার মেয়েকে কেন ফাঁ’সা’লে?”

আলভীর সাথে এর আগে কখনো মুখোমুখি কথা হয়নি সরোয়ার চৌধুরীর। তবে লোকটা কতটা ধূর্ত, দূর্নীতিবাজ এবং ছলপ্রিয় সে সম্পর্কে শুনেছে। তাই এখানে এলে এই লোক ঠিক কিভাবে প্রশ্ন করতে পারে সে সম্পর্কে আগে থেকেই একটি ধারণা ছিল তার। আলভী স্বাভাবিকভাবেই বলল,
“আমি আপনার মেয়েকে ফাঁ’সাই’নি। বরং দুজন দুজনকে ভালোবেসেছি।”
“আমার মেয়ে তোমাকে ভালোবাসে আমি বিশ্বাস করি। তবে তুমি তাকে ভালোবাসো না। এখন বলো আমার সহজ সরল মেয়েটাকে কেন তোমার ভালোবাসা নামক অভিনয়ের গুটি বানিয়েছো? আমার টাকা দেখে নাকি আমার উপর প্রতি’শোধ নিতে?
আলভী গা এলিয়ে দিলো সোফায়। বাঁকা হেসে বলল,

“আপনার টাকা দেখে! হাসালেন চৌধুরী সাহেব। আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন আপনি চৌধুরী হলে আমরা সিকদার। অর্থ, প্রতিপত্তি, নাম, জশ আপনাদের তুলনায় কোনো অংশে আমাদের কম নেই। আর প্রতিশোধের কথা যদি বলেন তাহলে বলবো আপনার সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই। তবে আপনি যে লোকটা ভালো নয় তাও আমার অজানা নয়।”
“তুমি কিন্তু আমাকে অপমান করছো।”
“অপমান করতে তো চাইছি না বরং শ্বশুর বানাতে চাইছি। কিন্তু আপনার ঐ গ্যাস্ট্রিক যুক্ত পেটে বোধ হয় তা হজম হচ্ছে না। তাই আমাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অপমানিত হচ্ছেন।”
সরোয়ার চৌধুরী মুখ বাঁকালেন। তাচ্ছিল্য করে বললেন,
“শ্বশুর, হাহ! তোমাকে আমার জামাই বানানোর কোনো ইচ্ছা নেই।”
“আমারও অবশ্য আপনার মতো ধুরন্ধর লোককে শ্বশুর বানানোর কোনো ইচ্ছা নেই। নিহাত আপনার মেয়েকে ভালোবাসে ফেঁ’সে গেছি।”

সরোয়ার চৌধুরী এবারে একটু বেশিই অপমানিত বোধ করল। কটমট করে বলল,
“তুমি কি এখন একটু বেশি বেশিই বলছো না?”
“বেশি বেশি বলছি? আমার তো আরও মনে হচ্ছে কম কম বলছি।”
সরোয়ার চৌধুরী খ্যাপে গেলেন। তৎক্ষণাৎ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হুংকার ছেড়ে বললেন,
“বেয়াদব ছেলে। এক্ষুনি বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে।”
বাবার হাঁক ডাক শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো মেহের। আলভীও উঠে দাঁড়াল। পরিস্তিতি স্বাভাবিক করতে বলল,
“আপনি উত্তেজিত হবেন না দয়া করে। এই বয়সে এত উত্তেজনা শরীরের জন্য ক্ষতিকারক আঙ্কেল।”
“উত্তেজিত হওয়ার মতো কথা বলে এখন বলছো উত্তেজিত হবেন না?”
আলভী চোখ বড়ো বড়ো করল। অবাক হওয়ার ভান ধরে বলল,
“আমি আবার কি করলাম?”
“তুমি কি করোনি? আমার বাড়িতে এসে আমাকে চড়ম পর্যায়ে অপমান করেছো। আমাকে ধুর’ন্ধর, দু’র্নী’তিবাজ যা নয় তাই বলেছো।”

“একটাও মিথ্যা তো বলিনি।”
সরোয়ার চৌধুরী মেহেরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“দেখলে, দেখলে তুমি কেমন ছেলেকে পছন্দ করেছো। যে তোমার বাবাকে সম্মান করে না।”
এই টুকু বলে থামলেন তিনি। দম নিয়ে ফের বললেন,
“এই দিন দেখার জন্য আমি তোমাকে জন্ম দিয়েছি, এত বড়ো করেছি? ছোট বেলা থেকে তোমাকে আমি কখনো অভাব বুঝতে দেইনি, গায়ের রক্ত পানি করে তোমার শখ পূরণ করেছি, নামিদামি স্কুল-কলেজে পড়িয়েছি এই দিন দেখার জন্য? আজ এই বয়সে তোমার জন্য একটা ছেলে বাড়ি বয়ে এসে আমাকে এভাবে অপমান করে যাচ্ছে।”
মেহের শুনলো বাবার সব কথা। সে আলভীর কথাও শুনেছে। তবে নিজের বাবার সম্পর্কে এমন কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো মেয়েটার। মেহের একটু সময় নিয়ে আলভীকে শুধাল,

“আপনার কাছে কি প্রমাণ আছে যে আমার বাবা ধুরন্ধর, দুর্নী’তি’বাজ?”
“প্রমাণ! প্রমাণ তো আপনার বাবা নিজেই। আপনার বাবাকে জিজ্ঞেস করুন সে জীবনে কি কি অন্যায় এবং পাপ করেছে। ব্যবসা করছে ঠিক তবে সঠিক পথে নয়। অন্যের হক মে’রে, দু’র্নী’তি করে। এমনকি উনি লোক লাগিয়ে আমার বন্ধু শীর্ষদের কোম্পানি থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাগজ পর্যন্ত সরিয়েছিলেন।”
“মিথ্যা, সব মিথ্যা। উলটো ওরা আরও আমাকে ভয় দেখিয়ে, জিম্মি করে আমার কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাগজ হাতিয়ে নিয়েছে। যার দরুন আমার ব্যবসায় অনেক ক্ষতিও হয়েছে। সেদিন তোমাকে আমি বলেছিলাম সবটা।”

‘পুরুষ মানুষ খারাপ হয় কিন্তু বাবারা খারাপ হয় না।’ সরোয়ার চৌধুরীর ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছে। এমনি বাহিরে তিনি যতই খারাপ হোক না কেন নিজের স্ত্রী সন্তানদের নিকট সর্বদাই একজন সৎ এবং আদর্শবান মানুষ হিসেবেই ধরা দিয়েছে। মেহের ছোটো বেলা থেকে তার বাবাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে দেখেছে। তার আদর্শেই বড়ো হয়েছে। সেক্ষেত্রে আজ যদি কেউ এসে হঠাৎ বলে তার বাবা খারাপ। এ নিশ্চয়ই বিশ্বাসযোগ্য নয়। মেহেরও বিশ্বাস করতে পারল না। তাছাড়া আলভীর সাথে মেহেরের পরিচয় কতদিনের? এই মাত্র কয়েক মাসের। আর সরোয়ার চৌধুরীকে সে দেখে আসছে সেই ছোট বেলা থেকে। তার সুখ দুঃখ, হাসি কান্না সব ক্ষেত্রেই সরোয়ার চৌধুরী তার পাশে থেকেছে। সমাজের সকল প্রতিকূলতা থেকে ঢাল হয়ে তাকে রক্ষা করেছেন।

কষ্ট করে তাকে লালনপালন করেছেন। আজ যে সে সুন্দরভাবে বেঁচে আছে, এত বড়ো হয়েছে, সমাজে সুন্দর একটা জীবন পেয়েছে এ সবটাই সরোয়ার চৌধুরীর জন্য। আর সেই লোকটাকে কিনা মাত্র কয়েকদিনের পরিচয় হওয়া একটা মানুষের জন্য অবিশ্বাস করবে? কখনো না। হ্যা, আলভীকে মেহের ভালোবাসে, তবে নিজের বাবার থেকে অধিক নয়। মেহেরের মুখাবয়বের পরিবর্তন ঘটলো। শক্ত কণ্ঠে বলল,

“যা বলবেন ভেবে চিন্তে বলবেন। ভুলে যাবেন না আপনি যার সম্পর্কে কথা বলছেন তিনি আমার বাবা হন।”
আলভী নিজের কথা থেকে পিছু হটলো না। সে মেহেরকে ভালোবাসে ঠিক কিন্তু তাই বলে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিবে না। যেখানে সে নিজের বাবা, নিজের পরিবারকে কখনো অন্যায়ের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়নি সেখানে সরোয়ার চৌধুরী তো তার এখনো না হওয়া শ্বশুর। আর সে এমন ধাঁচের পুরুষও নয় যে অন্যায় জেনেও শুধু তার মেয়েকে ভালোবেসেছে বলে চুপ থাকবে, তার হ্যা তে হ্যা মিলাবে, না তে না। আলভী আলতো হাসলো। শান্ত কণ্ঠে বলল,
“অন্যায় তো অন্যায়ই। তাতে সে হোক আপনার বাবা কিংবা আমার বাবা।”
“আমার বাবা কোনো অন্যায় করতে পারে না। আমি আমার বাবাকে বিশ্বাস করি।”
“বিশ্বাস করার পূর্বে তার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে দেখবেন।”
“যার কাছ থেকে আমি বিশ্বাস শব্দটার মানে বুঝেছি তার সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন নেই।”
এই টুকু বলে থামলো মেহের। দম নিয়ে ফের বলল,
“আর হ্যা, আজ থেকে আমাদের সব সম্পর্ক শেষ। যে পুরুষ আমার বাবাকে সম্মান করে না আমি তার সম্পর্কে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না।”

কথাগুলো বলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল মেহেরের। বারবার গলা ধরে আসছিল। এতদিন ধরে একটু একটু করে ভালোবাসে গড়ে তোলা সম্পর্কটাকে আজ সে নিজের হাতেই ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিলো। কিন্তু সেও বা কি করবে? কোনো সন্তানের পক্ষে কি নিজের বাবার অপমান, অসম্মান মেনে নেওয়া সম্ভব? তাছাড়া মেহের তো তার বাবার খারাপ রূপটা কখনো দেখেইনি। সেক্ষেত্রে আলভীকেই তার মিথ্যাবাদী মনে হচ্ছে। সরোয়ার চৌধুরী তাকে জন্ম দিয়েছে, বড়ো করেছে। এই দুই দিনের ভালোবাসার জন্য মেহের তাকে ভুলে যেতে পারে না। একজন সন্তান হিসেবে বাবার সম্মান রক্ষার্থে যা তার সঠিক মনে হয়েছে সে তাই করেছে।

আলভী মেহেরের কথাগুলো শুনে কিঞ্চিৎ সময়ের জন্য থমকে গেল। মনে হলো যেন কেউ বিষাক্ত কিছু ছুঁড়ে দিয়েছে তার বক্ষ অভ্যন্তরে। ভিতরটা জ্বলছে ভীষণ। এমন একটি বিষয়ের জন্য সে নিজের ভালোবাসা হারাবে বলে ভাবেনি কখনো। সে ভেবেছিল মেহের বুদ্ধিমতী নারী। সে সবটা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিবে। কিন্তু না, সে কোনোরূপ যাচাই-বাছাই ব্যতীতই নিজের বাবাকে বিশ্বাস করল। তাই বলে আলভী ভালোবাসা রক্ষার্থে নিজের সততা, আদর্শের সাথে বেইমানি করতে পারবে না। আলভী নিজেকে একটু সামলে নিল। বেশ শান্ত কণ্ঠে শুধাল,
“এটাই আপনার শেষ সিদ্ধান্ত মেহের?”
“হ্যা।”
“আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলুন তো।”
মেহের এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো। আঁখি দ্বয় তার নোনাজলে পরিপূর্ণ। সে কিভাবে ঐ চোখের দিকে তাকিয়ে বিচ্ছেদের ঘোষণা দিবে? না সে পারবে না, কিছুতেই না। সরোয়ার চৌধুরী হয়তো বুঝলেন মেয়ের মনের কথা। খ্যাপে উঠলেন তিনি। রুক্ষ স্বরে বললেন,

“তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে হবে কেন? এমনি বলেছে তা শোনোনি তুমি? আমার মেয়ের সাথে আজ থেকে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। যাও, এক্ষুনি বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে।”
আলভী তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো। ধীর কণ্ঠে বলল,
“কাউকেই অন্ধের মতো বিশ্বাস করা উচিত নয়। হোক সে আপনার বাবা, মা, ভাই কিংবা প্রেমিক। সময় হলে আমার কথাগুলোকে যাচাই-বাছাই করে দেখবেন। আমার দুয়ার আপনার জন্য সব সময় খোলা।”
থামলো আলভী। একটু সময় নিয়ে ফের বলল,
“আমি অপেক্ষায় থাকবো আপনার ফিরে আসার।”
নিজের কথা শেষ করে আর দাঁড়াল না আলভী। লম্বা লম্বা কদমে বেড়িয়ে গেল চৌধুরী বাড়ি থেকে। মেহেরের কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। কণ্ঠনালী ভেঙে আসছে। ভিতর থেকে কান্নারা বেরিয়ে আসতে চাইছে দাপটের সাথে। মেহের আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না ঐ স্থানে। এক ছুটে চলে এলো নিজের কক্ষে।

খান বাড়ির খাবার কক্ষে রমরমা পরিবেশ। শীর্ষ ব্যতীত সবাই সকালের নাস্তার উদ্দেশ্যে বসেছে টেবিলে। ফাহমিদা বেগম শীর্ষের খাবারটা একটি থালায় বাড়ছেন। খাবার বাড়া শেষ হতেই ত্রয়ী উঠে দাঁড়াল। আমতা আমতা করে বলল,
“খাবারটা আমি দিয়ে আসি শীর্ষ ভাইকে?”
ফাহমিদা বেগমের দৃষ্টি তীক্ষ্ম হলো। ভারী কণ্ঠে বলল,
“না, তোমাকে যেতে হবে না।”
পরপর তিনি তাকালেন পন্নার দিকে। আদেশের সুরে বললেন,
“খাবারটা শীর্ষকে দিয়ে আয় তো।”
মায়ের আদেশ পেয়ে পন্না আর দেরি করল না। খাবারের থালাটা হাতে নিয়ে ছুটলো শীর্ষের কক্ষের দিকে। ত্রয়ীর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আহত দৃষ্টিতে সে চেয়ে রইল পন্নার গমন পথের দিকে।
পন্না খাবার নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করতেই শীর্ষ ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে এলো। পন্নার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল সে। থমথমে কণ্ঠে শুধাল,

“ত্রয়ী কোথায়?”
“নিচে, খাচ্ছে।”
“আচ্ছা, খাবার রেখে চলে যা তুই।”
পন্না ভাইয়ের কথা মতো খাবারের থালাটা রাখলো বিছানার পাশের টেবিলে। এরপর পিছন ঘুরলো চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। ঠিক তখনই শীর্ষ ফের প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
“বাবা কোথায়?”
“সেও নিচে খাচ্ছে।”

অনুরাগে তুই পর্ব ৫৩

শীর্ষ আর কোনো প্রশ্ন করল না। কপালে ভাঁজ ফেলে এগিয়ে গেল খাবারের দিকে। আব্দুর রহমান খান অফিসে যাওয়ার আগেই তার সাথে কথা বলতে হবে। ত্রয়ী আর তার বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করতে হবে। বিষয়টা আর ফেলে রাখা যাবে না। ফেলে রাখতে রাখতে সব কেমন জটিল হয়ে উঠছে। কাল যে ঘটনাটা ঘটলো। তাদের বিয়ের বিষয়টা জানাজানি হলে কিংবা ঢাকা ঢোল পিটিয়ে বিয়ে করলে নিশ্চয়ই এমন একটা ঘটনা ঘটতো না। শীর্ষ গতকালই চেয়েছিল তার এবং ত্রয়ীর বিয়ের ব্যাপারে আব্দুর রহমান খানের সাথে কথা বলবে। কিন্তু অসুস্থতার কারণে আর বলা হয়ে ওঠেনি।

অনুরাগে তুই পর্ব ৫৫