অপরাজিতা পর্ব ২

1052

অপরাজিতা পর্ব ২
স্নিগ্ধতা প্রিয়তা

রাজিতাকে বিছানার উপরে ফেলতেই রাজিতা আবার চেঁচিয়ে উঠল,
–“ও মাগো! আমার কোমরটা মনে হয় ভেঙে গুড়ো-গুড়ো হয়ে গেছে। এতজোরে কেউ আছাড় মারে।”
আনান ওকে নকল করে বলল,
–“ও মাগো! আমার কোমরটা মনে হয় ভেঙে গুড়ো-গুড়ো হয়ে গেছে! এমনভাবে বলছে যেন আমি উনাকে আকাশ থেকে ফেলেছি। ”

–“আকাশ থেকে না ফেলুন। আপনার…”
এটুকু বলেই থেমে গেলো রাজিতা। আনান ওর কাছে এগুতে এগুতে বলল,
–“এতকষ্ট করে কোলে করে নিয়ে আসলাম, ধন্যবাদ দিবে কি উল্টো আমাকেই কথা শুনাচ্ছে। ওইজন্যইতো বলে যে মানুষের ভালো করতে নেই।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

–“আপনার ভালো আমার লাগবে না। একেতো ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করেছে। তার উপর জোর খাটাচ্ছে। আমাকে তেমন মেয়ে পাননি যে, জোর খাটিয়ে সব করবেন।”
আনান হাসতে হাসতে রাজিতার আরো কাছে এগিয়ে যায়। একদম রাজিতার মুখের সামনে গিয়ে বলে,
–“জোর করে কি করলাম মিসেস…”
রাজিতা এক ধাক্কায় আনানকে সরিয়ে দিয়ে বলল,

–“কি-কিছুই করতে পারবেন না। একদম আমার কাছে আসবেন না। কাছে আসলে কিন্তু আমি…”
–“আবার কি কলম এটাক করবে নাকি!”
বলেই হো-হো করে হেসে ওঠে আনান।
–“তুমি কি ভেবেছো হ্যাঁ! আমি তোমাকে বিয়ে করেছি বলে তোমার রূপের আগুনে জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে গেছি! মোটেও না। আমার জন্য কত মেয়ে পাগল, আর আমি কি না তোমার মতো একটা ক্যাবলা মেয়ের জন্য পাগল হবো! নেহাৎ দাদু ওয়াদা করেছিল তোমার দাদুকে। নইলে তোমার দিকে আমি ফিরেও তাকাতাম না।”

–“তো কে বলেছে আমার দিকে ফিরে তাকাতে। যেসব মেয়েরা আপনার জন্য পাগল, তাদের কাছে যান।”
–“তখনতো আবার এটা বলবে না যে, ক্যারেক্টারলেস ছেলে!”
–“আপনার ক্যারেক্টার কেমন তাতো বুঝেই গেছি। চেনা নেই জানা নেই, একটা মেয়ের গাঁয়ে পড়ে ঝগড়া করতে এসেছেন।”

–“হেই, লিসেন! তুমি অপরিচিত হলেও আজ থেকে আমার বিয়ে করা একমাত্র বউ। আর তোমার জন্য আমি যা করছি শুধুমাত্র একজন স্বামীর দায়িত্ব হিসেবেই করছি। তুমি চাইলে আরোকিছু স্বামীর দায়িত্ব পালন করতে পারি।”
বলেই আবার রাজিতার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে আনান। রাজিতার ফোলা-ফোলা মুখটা এবার লজ্জায় রাঙা হয়ে যায়৷ দুইহাতে মুখ ঢেকে বলতে থাকে,

–“একদম কাছে আসবেন না। আমি মাত্র অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়া বাচ্চা একটা মেয়ে।”
আনান হাসতে হাসতে রাজিতার পেছন থেকে বালিশটা নিতে নিতে বলল,
–“অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়া একটা মেয়ে যে বাচ্চা হয় তাতো আগে জানতাম না। তোমার থেকে আজ বাচ্চার একটা নতুন সংজ্ঞা শিখলাম৷ তোমার থেকে দেখছি অনেক কিছু শিখতে হবে আমার। হা-হা-হা!। তুমি কি ভেবেছিলে! আমিতো বালিশটা নিচ্ছিলাম।

ঘুমাবো বলে। তুমিও ফ্রেস হয়ে ওসব রংচং ধুয়ে আসো। কান্না করতে করতে মুখের একেবারে তোরো-চৌদ্দটা বাঁজিয়ে ফেলেছো। আর এসব ঢং মার্কা কাপড় চেঞ্জ করো। কিছু না পেলে দেখো মা মনে হয় আলমারিতে তোমার জন্য কিছু কাপড়চোপড় রেখেছে । ভয় পেও না তুমি না চাইলে আমি তোমাকে কোনকিছুতে জোর করব না। আমি ওমন ধরনের স্বামী নই।”

রাজিতা লজ্জা পেয়ে বাথরুমে চলে গেলো। সেখানে আগে থেকেই দুটো তোয়ালে, দুটো ব্রাশ, আনানের জিনিসের পাশাপাশি মেয়েদের প্রয়োজনীয় সব জিনিসও সাজানো। তারমানে আগে থেকেই কেউ সব সাজিয়ে রেখেছে। রাজিতাদের বাড়িতে বিয়ের জন্য বিশাল আয়োজন করা হলেও, এখানে তার ছিটেফোঁটাও নেই। নিশ্চয়ই আনান কোনো অনুষ্ঠান করতে দেয়নি। আচ্ছা ওর আবার নতুন করে কাউকে বিয়ে করার ফন্দি নেইতো! অনুষ্ঠান কেন করেনি!

বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে তবুও কোনো অনুষ্ঠান ছাড়াই বিয়ে করল! আনান পেশায় কি করে তাওতো রাজিতা জানে না। শুধু শুনেছিল যে ঢাকায় দুইটা বাড়ি আছে। একটা ভাড়া দেওয়া, আরেকটার একটা ফ্লাটে ওরা থাকে,বাকিগুলা ফ্লাট ভাড়া দেওয়া। নিজের সম্পর্কে কেন যে সব লুকিয়ে রেখেছে কে জানে! কোনো মাফিয়া-টাফিয়াদের সাথেতো আবার জড়িত নেই! এসব ভাবতে ভাবতে শুনতে পায় যে বাথরুমের বাইরে থেকে আনান ওকে ডাকছে।

–“এই যে আমার বাচ্চা মিসেস। বাথরুমেতো ঢুকে গেলেন, কাপড় কে নিবে! দরজাটা খুলুন, এই কাপড়টা নিয়ে চেঞ্জ করে নিন। আমারতো মনে হচ্ছে যে, বাথরুমটা তোমার অনেক পছন্দ হয়েছে। তুমি চাইলে ওখানেও ঘুমাতে পারো।”
রাজিতা দরজা খুলে কাপড়টা নিয়ে আবার বন্ধ করে দিতে দিতে বলল,
–“আপনি আসলেই বেহায়া! যতই আমার থেকে দূরে থাকতে বলছি, ততই কাছে আসছেন৷ আবার বলছেন যে, আপনি ওমন স্বামী না।”

বলেই খট করে আনানের সামনেই দরজাটা বন্ধ করে দিলো।
সকালে আনান ঘুম থেকে উঠে দেখে যে, রাজিতা ওর পায়ের দিকে মাথা দিয়ে চার হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। রাজিতার পা আনানের গায়ের উপর তুলে দিয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে। আরেকটু হলেইতো আনানের লাথি খেয়ে নিচে পড়তে হতো! এতবাজে ভাবেও কেউ শুয়ে থাকে নাকি! এই মেয়েটাকে নিয়ে যে কি করবে৷ কেন যে ওর দাদু এমম একটা ওয়াদা করেছিল! ও জীবনেও ওর দাদুকে ক্ষমা করতে পারবে না। ভাবতে থাকে আনান।

তারপর রাজিতার মাথার নিচে একটা বালিশ দিয়ে দিলো, আর কাথা দিয়ে শরীরটা ঢেকে দিলো।
আনানের মা এরমধ্যে দুইবার কাজের মেয়েটাকে পাঠিয়েছে আনান আর রাজিতাকে ডেকে আনার জন্য৷ আনান রাজিতাকে ঘুম থেকে না তুলে যেতেও পারছে না। অবশেষে হাতে পানি নিয়ে রাজিতার চোখেমুখে ছিটিয়ে দিলো আনান।
পানির ছিটায় ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠল রাজিতা। তারপর সামনে পানির গ্লাস হাতে আনানকে দেখতে পেয়ে বলল,

–“কি করছেন এসব?”
–“আমার বাচ্চা মহারানীর ঘুম ভাঙাচ্ছি।”
–“এভাবে কি কেউ কারো ঘুম ভাঙায়?”
–“তো কিভাবে ভাঙাবো? আমারতো মনে হয় তোমার ঘুম ভাঙানোর জন্য মাইক আনাতে হবে। যাও তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে এসো। কাল থেকে যেন দেরি না হয়। তাহলে নেক্সট টাইম বালতি ভর্তি পানি রেডি থাকবে বলে দিলাম।”
বলেই হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো আনান।

খাবার টেবিলে সবাই রাজিতার জন্য অপেক্ষা করছে দেখে লজ্জায় রাজিতার মুখটা এইটুকুন হয়ে গেছে।
খাওয়া শেষে রাজিতা ওর শাশুড়ীকে গিয়ে আস্তে আস্তে বলতে লাগল,
–“আমি ওইবাড়িতে কখন যাবো আন্টি?”
–“তোমার চাচ্চু বলেছিল যে, উনারা তোমাকে নিতে আসবে। কিন্তু আনান…”
এটুকু বলতেই রাজিতা জোরে বলে উঠল,

–“আমাকে ওই বাড়িতেও যেতে দিবে না নাকি?”
এইবার আনানের মা হেসে ফেললেন।
–“ধুর পাগলী! আমাদের তোর কি মনে হয়? আমরা কি তোকে খাঁচায় বন্দী করেছি নাকি যে যেতে দিবো না। ”
–“তাহলে?”

–“আনান বললো যে, শুধু-শুধু উনাদের কষ্ট করে আসতে হবেনা। আনান নিজেই তোকে নিয়ে যাবে।”
–“আমি উনার সাথে কেন যাবো! আমি চাচ্চুর সাথেই যাবো।”
এতক্ষণ আনান রাজিতার কথাগুলো শুনছিল। এইবার বলে উঠল,
–“বেশি কথা বলো না। যদি যেতে চাওতো তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আসো। নইলে কিন্তু আমি আর নিয়ে যেতে পারব না।”
রাজিতা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

–“কে বলেছে আপনাকে কষ্ট করে নিয়ে যেতে। আমি চাচ্চুর সাথেই যাবো।”
–“মা, ওকে বলো রেডি হতে। আমার হাতে বেশি সময় নেই।”
আনানের মা রাজিতাকে ঠেলে রুমের দিকে পাঠাতে পাঠাতে বললেন,
–“যা মা৷ ওর সাথে বেশি বাজে বকিস না। ও ভালোর ভালো আবার রেগে গেলে..”

–“আচ্ছা আন্টি, আমি যাচ্ছি। তবে আজ কিন্তু আসব না। ও বাসায় সবাই এসেছে, কত মজা করছে আর আমি এখানে!”
আনান এইবার রাজিতার হাত ধরে টানতে টানতে রুমে নিয়ে গেলো।
–“তোমাকে না বারণ করেছি, আমার মাকে আন্টি না ডাকতে। মা ডাকলে কি তোমার মুখ খুলে পড়ে যাবে! নাকি কথা বলা বন্ধ হয়ে যাবে!”
–“আচ্ছা। বলব। ”

বাইরে ‘বলব’ বললেও রাজিতা মনে মনে ভাবতে থাকে যে, কালরাতে কি সুন্দর হেসে হেসে কথা বলছিল। আর সকালে উঠেই মুখটা একেবারে রামগরুরের ছানার মতো গোমড়া করে রেখেছে। কি লোক রে বাবা! ওই আন্টি থুক্কু মা ঠিকই বলেছে। এর মুড সুইং হয় খুব দ্রুত।
রাজিতা গাড়ি থেকে নামতেই ওর চাচাতো বোন নিলা আর রিমি ছুটে আসে৷ নিলা রাজিতাকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে,

অপরাজিতা পর্ব ১

–“সরি রে! আমার জন্য তোর জীবনটা নষ্ট হয়ে গেলো। আমাকে ক্ষমা করে দিস বোন।”
এটুকু বলতে না বলতেই যখন আনান গাড়ি থেকে নামল তখন নিলাসহ বাকি সবাই হা করে তাকিয়ে আছে আনানের দিকে। কে এই সুন্দর ছেলেটা!

অপরাজিতা পর্ব ৩