Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৯

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৯

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৯
কায়নাত খান কবিতা

একটি ৪ মিনিট দীর্ঘ আপত্তিকর ভিডিও চলে হল রুমের বিশাল স্ক্রিনে। যেখানে দেখা যায় দুই যুগল একে অপরকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে বৃষ্টির মাঝে চু’মু খাচ্ছে।
ভিডিওটি আজ থেকে প্রায় তিন বছর পূর্বের। সেখানে স্পষ্ট দেখা যায়, বিশ্বের দ্বিতীয় রিচ পার্সন এবং মিয়াং ঝাউ এর মেয়ে রোজ ঝাউ একে অপরকে ধরে এমন আপত্তি কর কাজ করছে।
থরথর করে শরীর কাঁপতে থাকে অরিনের। তিন বছর আগের করা একটি ভুল আজকে এভাবে ঝড়ের বেশে সবার সামনে আসবে সে কল্পনা ও করতে পারেনি ।

—–মায়ের সাথে কথা বলে নিজের মন শক্ত করে যখনই জীবনের নতুন আরম্ভের দিকে পা বাড়ায় অরিন, ঠিক তখনই তার ভয়ংকর অতীত এসে হাজির হয় সকলের সামনে।
আংটিবদলের একদম মাহেন্দ্র ক্ষণে কনভেনশন হলের সব থেকে বড় স্ক্রিনে অরিন এবং কিংশুকের এই আপত্তিকর ভিডিওটি অন হয়ে যায়। এবং তারপর সকলের আর্কষণের কেন্দ্র বিন্দু হয় এই ভিডিও টি।
হাত থেকে আংটি পরে যায় অরিনের। ভয়ে ভয়ে তাকায় মায়ের দিকে।
আইরিন ঝাউ তাড়াতাড়ি করে স্ক্রিন অফ করে দেয়।
—জিয়েহুন ছিয়ান ঝেগে ন্যু-হাই জুও-গুও ঝে-শিয়ে শি, ঝেন এ-শিন।’’
চারপাশে কোলাহল শুরু হয়ে যায়, সকলে অরিনকে নিয়ে কানাঘুষা শুরু করে দেয়। তাকে বিভিন্ন কথা শোনানো শুরু করে। তার চরিত্র নিয়ে ও বাজে কথা বলা শুরু করে দেয়।

—ঝে শি ই গে জিয়া ঝাংহাও। ঝে বুও শি ঝেন দে, ছিং দাজিয়া লেংজিং ইশিয়া।’’
অরিনের মা সকলকে বোঝাতে চেষ্টা করে এটা একটা ফেক ভিডিও। অরিনের নয়।কিন্তু অরিনের ভয় পাওয়া দেখে সকলে বুঝে যায় এটাই আসল।কেউ তাদের কথা শুনতে চাই না। বরং আরো বেশি কথা ছড়াছড়ি হয়। মিডিয়া পুরো বিষয়টি কাভার করে উই-চ্যাটে দিয়ে দেয়। দেখতে দেখতে মোটামুটি সকলেই ভিডিওটি দেখে ফেলে। চ্যাং ঝাং এর পরিবার চায়নাতে আদি প্রিন্স হওয়ায় বিষয়টি বাতাসের গতিতে সকলের নিকট পৌঁছে যায়। তার থেকে ও বেশি ভাইরাল হওয়ার হওয়ার কারণ ছিলো, ওয়ার্ল্ডের দ্বিতীয় রিচ পার্সন থার্ড কিং সেই ভিডিওতে থাকায়।
চ্যাং ঝাং এর পরিবার ক্ষুব্ধ হয় মিয়াং ঝাউের উপরে।তাদের এলায়েন্স ভেঙে দিয়ে পুরো চায়নাতে ব্লাক লিস্টেড করে দিবে বলে তাদের প্রতিক্রিয়া জানায়।
মিয়াং ঝাউ শত চেষ্টা করে ও উনাদের আটকাতে পারে না, বরং চারপাশে থু থু পরে যায়। বিদেশি কালচারে এসব ভিষণ কমন হলে ও যার সাথে কমিটেড তাকে থুয়ে অন্য আরেক জনের সাথে এমন ঘনিষ্ঠ হওয়াকে নিচু নজরে দেখে চায়নিজরা।
সকলে প্রচন্ড নিন্দা করে এবং হল রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আইরিন ঝাউ অরিনকে নিয়ে সোজা গাড়িতে উঠে বসেন৷কিন্তু সেখানে ও শান্তি নেই। মিডিয়া তাদের ঘিরে ধরে। প্রচন্ড ধিক্কারের শিকার হয় অরিন। গার্ডরা কোনো রকম তাদের প্রটেকশন দিয়ে গাড়িতে বসায়।

–সরি মা। আই ডোন্ট মিন টু ডু দ্যাট!’’
প্রচন্ড কান্নায় ভেঙে পরে অরিন।আইরিন ঝাউয়ের জানা নেই সে কীভাবে অরিনকে শান্তনা দিবে। কারণ দোষ অরিনের ও ছিল। কিন্তু চিন্তার বিষয় এটাই ছিল যে তিন বছর আগের ভিডিও এখন কীভাবে সামনে এলো। তাহলে কি সে ফিরে এসেছে?
আইরিন ঝাউ প্রচন্ড চিন্তায় পরে যান। এই তিন বছর সে কীভাবে অরিনকে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছিলেন সেটা তিনিই একমাত্র জানেন। কিংশুকের বাজপাখির নজর থেকে অরিনকে লুকিয়ে রাখা এতোটাও সহজ ছিল না।
–তিন বছর পূর্বে আইরিন ঝাউকে কল দিয়ে আতিয়া বেগম পুরো বিষয়টি জানান। কিংশুকের অত্যা চার এতোটাই বেশি হয়ে গেছিল যে আতিয়া বেগম না পারতে ও আইরিন ঝাউকে পুরো বিষয়টি জানান। তখন তিনি অরিনের সাথে সোশ্যাল মিডিয়াতে কনটাক্ট করেন। তারা ঠিক করে বিয়ের দিন অরিন পালাবে। কিন্তু আতিয়া বেগমকে কিছু জানাবেন না। কারণ কিংশুকের চাপে তিনি কতদিন নিজের মুখ বন্ধ রাখতে পারবেন তার ঠিক নেই। তাই অরিন বাইকের সাথে মিলে প্ল্যান বানায়। সে পালাবে। পুরো বিষয়টি খুব সুক্ষ ভাবে করা হয়। যার ফলে কিংশুক বিন্দু মাত্র কিছু আচ করতে পারে নি। সেদিন থেকে এই অব্দি লোকচক্ষুর আড়ালে অরিনকে বড় করেন আইরিন ঝাউ। কিন্তু মেয়ে বড় হলে তাকে তো নিজের কাছে বেশিদিন রাখা ঠিক হবে না। তাই তিনি ঠিক করেন অরিনের বিয়ে দিবেন।
নিজের বিজনেস পার্টনারের ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক করেন অরিনের। ভেবেছিলেন হয়তো তিন বছরে কিংশুক পুরোপুরি ভুলে গেছে অরিনকে।কিন্তু না। কিংশুক ভুলে নি। কিংশুক যে অরিনকে ভুলেনি তার প্রমাণ আজ মা-মেয়ে সহ পুরো চায়না শহর পেলো।
আইরিন ঝাউ যখন চরম হতাশার মাঝে তখন তিনি লক্ষ্য করেন গাড়ি তাদের ভিলার দিকে নয়, বরং উল্টো রাস্তার দিকে যাচ্ছে। জনমানবশূন্য একটি রাস্তার দিকে।

— নি ইয়াও বা ওয়া দাই দাও নালি, সিজি?’’
ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেন আইরিন ঝাউ এটা কোন রাস্তা। তাদের ভিলা তো এদিকে নয়। এটা তো পরিত্যক্ত শূন্য রাস্তা। দূর দূরান্ত থেকে ও কোনো লোকের দেখা মিলবে না।
আশ্চর্যের বিষয় এটা ছিল যে ড্রাইভার কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ টুকু করেন নি। বরং সে তার মতো ড্রাইভ করতে ব্যস্ত।
এক পর্যায়ে আইরিন ঝাউ রাগারাগি শুরু করেন। অরিন ও ভয় পেয়ে যায়। এতো কিছু হচ্ছে আজ তাদের সাথে, এখন আবার কোন বিপদ ওতপেতে বসে রয়েছে তাদের জন্য আল্লাহ মাবুদ জানেন।

–মম, কিছু ঠিক লাগছে না!’’
–ইট’স ওকে বাচ্চা। মা আছে তো সাথে।”
আইরিন ঝাউ কোনো উপায় না পেয়ে হাতে থাকা পার্সব্যাগটি দিয়ে ড্রাইভারকে মা’রতে শুরু করেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় এটা ছিল যে ড্রাইভারের তাতে ও কোনো হেলদোল নেই। যেন আস্ত একটা পালোয়ান।
মা-মেয়ে যখন ভয়ের অন্তিম সীমানায় দাড়িয়ে ঠিক তখনই তাদের গাড়িটি থাকে। গাড়ি থামার সাথে সাথে ড্রাইভার পিছনে ফিরে তাকায়। তাকে দেখার সাথে সাথে অরিনের চোখ মুখ শুকিয়ে আসে ভয়ে।
–টা..টাইগার…”
–স্যার ইজ ওয়েটিং ফর ইউ ম্যাডাম”
টাইগারের মুখে স্যারের নাম শুনতেই পিলে চমকে উঠে অরিনের। মানে কিং এসেছে এখানে। সে কি তার খুব কাছে?

টাইগার গাড়ি থেকে নেমে সামনে যেতে থাকে। আইরিন ঝাউ অরিনের হাত শক্ত করে চেপে ধরে। ভয়ে ঘামতে থাকে অরিন। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে বেশ কিছু একই ডিজাইনের কালো গাড়ি এসে তাদের গাড়ির সামনে পিছনে দাড়ায়। তারপর আরো একটি গাড়ি তাদের গাড়ি থেকে কিছুটা দূরুত্ব বজায় রেখে একদম সামনে এসে দাড়ায়।
গাড়িতে কোব রার ডিজাইন দেখেই অরিন বুঝতে পারে এটা কিং এর গাড়ি। একমাত্র সেই এই কোবরা ডিজাইন ওয়ালা রেয়ার গাড়ি ব্যবহার করে। যার দ্বিতীয় কোনো কালেকশন নেয়। পুরো বিশ্বে একটাই বানানো হয়। তাও কিং এর মন মতো কাস্টমাউজ করে।
গাড়িটি থামার সাথে সাথে অরিনের চোখ যেনো ঘোলা হয়ে আসে। এখন সে কি করবে।

–রৌদজ্জল দূপুরে সমস্ত রোদের দুত্যি নিজের আয়ত্তে এনে, উজ্জল শ্যাম বর্নের পুরুষটি সিগা’রের ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে গাড়ি থেকে নামে। চোখে সান গ্লাস থাকার পর ও অরিন যেনো তার চোখের ভাষা স্পষ্ট বুঝতে পারছে। কিং আজ ও ব্লক ড্রেসে। অরিন যে-দিন থেকে বলেছিল তাকে ব্লক কালার ভিষণ স্যুট করে সেদিন থেকে কিং ব্লক কালার বেশি পরে। তার পুরো ম্যানশন যেখানে ব্লক থিমে ছিলো। সেখানে সে নিজে ক্যারি করতো অন্য থিমের ড্রেস কোড।কিন্তু অরিনের বলার পর থেকে কিং ব্লকই পরিধান করে।আজ ও তার ব্যতীক্রম নয়।
সিগা’র টানতে টানতে অরিনের ডোরের সামনে এসে দাড়ায় কিংশুক।
ভয়ে অরিন নিজের মায়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরে। কিন্তু তাতেই বা কী? এতো সহজ কিংএর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া? কিং ডোর না খুলে আবার ও তার গাড়ির সামনে এসে দাড়ায়। তারপর একটা টেক্সট পাঠায় অরিনের ফোনে।

কাঁপা কাঁপা হাতে টেক্সট অপেন করে অরিন। তারপর নিজের মায়ের পানে তাকায়।
আইরিন ঝাউ অরিনের হাত থেকে ফোন নিয়ে নেয়। যেখানে একটা লিস্ট রয়েছে। পুরো চায়নাতে ব্লাক লিস্টডেট হওয়া মানুষদের লিস্ট। যেখানে এক নাম্বারে আইরিন ঝাউয়ের নাম দেওয়া। এখন ও তাকে ব্লক লিস্ট করা হয়নি। কিন্তু খুব শীঘ্রই করা হবে। এটা ছিল তার একটা ডেমো লিস্ট। আর নিয়ম অনুযায়ী ব্লাক লিস্ট হলে তাকে এক ঘরে করে দেওয়া হবে।কেউ তাদের সাথে মিশবে না। কোনো বিজনেস কল্যাপ ও করা হবে না। দিনশেষে পরিনতি ভয়া বহ।
পরক্ষণেই কিংশুকের কন্ঠস্বর তাদের কানে ভেসে আসে। একটি মাইক নিয়ে কিংশুক অরিনের উদ্দেশ্যে বলে।

– মাই ডিয়ার চিটার রোজ। তুমি তোমার ইচ্ছে তে নামবে না-কি আমি আমার স্টাইলে নামাবো?’’
দীর্ঘ তিন বছর পর কিংশুকের কন্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই গায়ের পশম দাঁড়িয়ে পরে অরিনের।
–মম।
–কিচ্ছু হবে না রোজ। তুমি পালাও। আমি এদিকটা দেখছি।
–কিন্তু, ও তোমাকে যদি..”
– কিচ্ছু করতে পারবে না। যতক্ষণ না তোমাকে পাচ্ছে।
আইরিন ঝাউ অরিনকে বোঝায়, তাকে পালাতে হবে। কিং তাকে হাতের কাছে না পেলে তেমন কিছুই করতে পারবে না। পূর্বের তিন বছরের মতোই আবার ও সে নিরাপদ।
মায়ের কথা মতো অরিন গাড়ি থেকে নেমে পরে। গাড়ি থেকে নামতেই সামনে বসে থাকা কিং এর দিকে চোখ চলে যায় অরিনের। বেশ অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে তার। এখন সে ২৯ বছর বয়সী পুরুষ মানুষ । তার মুখের আদলে এখন মোটামুটি একটা ম্যানলি ভাব চলে এসেছে। প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের যেমন ঠিক তেমনই।কিন্তু তার থেকে বড় কথা, আর থুতনিতে থাকা সেই বাদামি তিলটি। যেটা এখন ও আর্কষণের কেন্দ্র বিন্দু। প্রায় তিন বছর পর কিংশুককে দেখে কলিজা শুকিয়ে আসে অরিনের।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো কিং এর মুখে থাকা এতো ঠান্ডা চিত্র। তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তার মনে কি চলছে। এতোটা ঠান্ডা?
অরিন কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে সোজা ছুটে পালাতে থাকে জঙ্গলের ভিতরে।
অরিনের এমন বোকামি দেখে হাসতে থাকে কিং। এতো কষ্ট করে ফিরে পাওয়া অমূল্য সম্পদ কি কিং এতো সহজে হারাতে দিবে আর?

–জঙ্গলের পথ বেয়ে নিজের আপ্রাণ দিয়ে দৌড়াতে থাকে অরিন। কিন্তু গাউনটি বেশ লম্বা এমন ভারি হওয়ায় দৌড়াতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে তার। তারপর ও থামার কোনো নাম নেই। এখন থামলে চলবে না। পালাতে হবে। নিজেকে বাঁচাতে হবে।
প্রায় এক-দেড় ঘণ্টার মতো দৌড়াতে থাকে অরিন। ধরতে গেলে একদম জঙ্গলের মাঝ বরাবর চলে যায়। যেখানে তাকে খুঁজে পাওয়া কিং এর পক্ষে সম্ভব হবে না।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৮

শরীরে যখন আর এক বিন্দু পরিমাণের ও শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। কিছু ক্ষণের জন্য থমকে যায় অরিন। গাছের ধারে দাড়িয়ে জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিতে থাকে সে। চারপাশে তাকিয়ে পথ দেখতে থাকে। তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তার।
এদিক-ওদিক দেখতে থাকে। যাওয়ার জন্য। ঠিক তখনই কাঁধে কোনো একজনের গরম নিঃশ্বাস অনুভব করে।
–’’ Are You Lost Baby Girl? ‘’

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২০