আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭৭
ইশিকা ইসলাম ইশা
একটা স্বাক্ষর আর তিনবার কবুল করেই একটা পবিত্র বন্ধন তৈরি হয়েছে রিদ আর নীরের। দুইজনেই দুইজনকে কবুল করেছে। সারাজীবন একে অন্যের হয়ে থাকার প্রতিঙ্গা করেছে।রিদি দূর থেকে রিদের হাসি মুখটা দেখে নিজেও মুচকি হাসল।রিদের হাসিতে মিশে আছে প্রিয় মানুষকে আপন করে পাওয়ার তৃপ্ততা।আছে হাজারো সাজানো স্বপ্ন পূরন করার নিশ্চয়তা।রিদি দূর থেকে দোয়া করল সারাজীবন যেন তারা সুখে থাকে।
মানুষজনে ভর্তি বাড়ি।একহাতে শাড়ি সামলিয়ে অন্য হাতে রোজ কে কোলে নিয়ে এদিক ওদিক তীব্র কে খুঁজে চলছে রিদি।মেয়ের কান্না থামলেও ফুঁপিয়ে উঠছে বারবার।ছোট শরীরটা থেমে থেমে কেঁপে কেঁপে উঠছে।এখানেও সবার টানাটানিতে রোজ ভয় পেয়ে কেঁদে উঠেছে।রোজ কে কোলে নেওয়ার জন্য একপ্রকার হুড়াহুড়ি চলছিল।রিদি কোনমতে সবাইকে বলে মেয়েকে নিয়ে বাইরে এসেছে।
এদিকে সবার খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলেও খাবারের জায়গায় তীব্রর খোঁজ পাইনি রিদি।তীব্র এখনো খাওয়া দাওয়া করে নি।এতো মানুষ জনের মধ্যে খাওয়া অদ্ভুত লাগে। সবচেয়ে বেশি বিরক্ত লাগে সবার তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা দেখে।আরো একটা কারন হলো তীব্র সব সময় হেলদি খাবার পছন্দ করে।ছুড়ি কাটা দিয়ে বয়েল সবজি খায়।অধিক তেলমশলা খাবার তার পছন্দ না।বৌয়ের হাতের খাবার ব্যাতিত সে এসব তেলমশলা যুক্ত খাবার খায় না।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রিদি শাড়ি সামলিয়ে রোজ কে নিয়ে আশেপাশে তাকালো ।মার্ভেল কে দেখে হাত উঁচিয়ে ডেকে বলল,
রৌদ্র, তূর্য আর আপনাদের বস কোথায় ভাইয়া??
ম্যাম বস তো তূর্য আর রৌদ্র বাবাকে নিয়ে বাইরে মাঠের কাছে আছে ।
রিদি মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,
এইতো পাপার কাছে যাচ্ছি জান! কাঁদে না মা।
রিদি গেট পেরিয়ে মাঠের দিকে তাকালো।সবুজ ঘাসের উপর দুই ছেলে দৌড়াচ্ছে আর তীব্র প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে।মাঝে মাঝে ছেলেদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে।মোট কথা তীব্র রৌদ্র, তূর্য কে খাওয়াচ্ছে।রিদি দূর থেকে এটা দেখে মুচকি হাসল।নিজে এখনো খাইনি অথচ ছেলেদের কি সুন্দর যত্ন করে খাইয়ে দিচ্ছে।রিদি মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে বলল,
ঐ যে পাপা আর ভাইয়ারা যাও!!
রোজ পাপা কে দেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। তীব্র কিছুটা দূরে থাকাই মেয়ের কান্না শুনতে না পেলেও তূর্য রৌদ্র বোনকে দেখে ছুটে এলো। তীব্র পিছে ঘুরে মেয়েকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখে বড় বড় কদম ফেলে এগিয়ে এসে মাটিতে মেয়ের সামনে বসে এক হাতে বুকে জড়িয়ে ধরল।
কি হয়েছে জান?কে বকেছে??
রোজ ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
পুচা পুচা তবাই পুচা!
তীব্র মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বুকে চেপে ধরল।এটো হাত ধুয়ে মেয়েকে কোলে তুলে আদর করে বলল,
থাক মা আর কাঁদে না।পাপাকে বলো কি হয়েছে??
রিদি টিস্যু দিয়ে ছেলেদের মুখ মুছিয়ে দেয় খাওয়া শেষ ওদের। গ্লাসে পানি ঢেলে ছেলেদের মুখের সামনে পানি এগিয়ে দিতে দিতে বলল,
সবাই ওকে নিয়ে টানাটানি শুরু করেছিল তাই!
তীব্র রাগ কট্রোল করে।মেয়েকে শান্ত করতে করতে বলে,
রিডিউকিলাস!!
রিদি তীব্র কে রেগে যেতে দেখে মৃদু স্বরে বলল,
খাবেন না!
না!!
রিদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ির কাছে গিয়ে একটা বক্স বের করে।সে জানত তীব্র খাবে না তাই খাবার নিজেই করে নিয়ে এসেছে।মেয়েকে রুপ খাইয়ে দিয়েছে তাই মেয়ের খাওয়া নিয়ে ঝামেলা নাই।এখন বাপের খাওয়া নিয়ে ঝামেলা।রিদি গাডদের কিছু ইশারা করতেই তারা একটা পাটি বা মাদুর এনে ছায়াযুক্ত সবুজ ঘাসের উপর বিছিয়ে দেয়।রিদি তীব্র কে সেখানে বসতে বললে তীব্র বিরক্ত হয়ে বলল,
এখানে কেন বসব??
খাবেন তাই!!
খাব না!!
রাগ করলে পুরোপুরি রাগ করবেন।যাতে আমিও মায়ের বাড়িতে থাকতে পারি।
প্ল্যান আছে নাকি!!
থাকলে সমস্যা!! ছেলেমেয়েকে তো সামলিয়ে নিচ্ছেন!
তীব্র মেয়েকে নিয়ে পাটিতে বসতে বসতে বলল,
থাকলে চেঞ্জ করেন।
এহহ!!মগের মুল্লুক নাকি!!
তীব্র ভূ কুঁচকে বলল,
না! তীব্র চৌধুরী মুল্লুক!!আপনার কোন অধিকার নেই আমাকে অশান্ত করার।যার পরিনাম ভালো হয় না!
রিদি মৃদু হাসল।খাবার তীব্রর মুখের সামনে ধরে বলল,
ভেতরে গেলেন না কেন?
তীব্র খাবার খেতে খেতে বলল,
নিজেকে এলিয়েন লাগে তাই!!
রিদি ফিক করে হেসে উঠলো। তীব্রর গাল টেনে বললো,
আপ ইতনি সুন্দর কিউ হো!!
তীব্র উওর করল না।মেয়ের ঘুম ঘুম মায়াবি মুখানার দিকে তাকিয়ে শুধু মুচকি হাসল।
ততক্ষণে রৌদ্র তূর্য ও এসে হাজির মায়ের কাছে। দৌড়াদৌড়ি করে ঘেমে গেছে প্রায়।রিদি ওদের কেউ খাবার মুখে তুলে দিতে দিতে বলল,
আপনি জানেন এরা আমার নিজের পেটের সন্তান কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।একটাও আমার রং পায়নি।সবগুলা ইংরেজদের নাতি হু!!
তীব্র সব জানে।তবে এসবে তার মাথাব্যাথা নেই।রিদের বিয়ে আর নিজের বৌয়ের জেদের কাছে হার মেনে বাধ্য হয়েই বিয়েতে এসেছে সে।বৌ বাচ্চা ছাড়া থাকা সম্ভব না। একদিন কি একমহূতও না। তীব্র খাবার মুখে নিয়ে টপিক এড়াতে বলল,
কখন রান্না করলেন??
আসার আগে!!
রাতে ফিরছি আমরা!
মানে??
মানে সিমপল আমরা রাতে ফিরছি!
কিন্তু আমি তো থাকব! ভাইয়ার বাসর ঘর সাজিয়েছি টাকা নিব না??
কত টাকা নিবেন!!
২০০০০!!হিসাব করেছি আমরা ১০জন।
ঠিক আছে নেওয়ার পর যাবো!
রিদি খাবার মেখে তীব্রর মুখে দিয়ে বলল,
পরে গেলে কি হবে!!
খুন!!!
কিহহ????রিদির হাত থেমে যায়
তীব্র রিদির হাত থেকে নিজেই খাবার টুকু মুখে নিয়ে বলল,
আপনি আমার!ইউ আর অনলি মাইন!আপনার দিকে কারো নজর আমি বরদাস্ত করব না।
রিদি আহাম্ক এর মতো তাকালো তীব্রর দিকে।এই কথার মানে কি? তাও হঠাৎ!আর কেই বা তার দিকে নজর দিবে। আচ্ছা নজর বলতে কি বোঝাল!রিদি এই নিয়ে কিছু বলার আগেই রুপ শাড়ি সামলিয়ে এগিয়ে এসে বলল,
এই রিদু তোকে রিদ খুঁজছে!ফোন কোথায় তোর!!সবাই তোর খোঁজ করছে।বিদায়ের সময় হয়ে এসেছে।
রিদি তীব্রর দিকে শেষ লোকমা এগিয়ে দিতে দিতে বলল,
রোজ কান্না করছিল আর ওনার খাওয়া হয়নি তাই!
রুপ রিদির হাতের লোকমার দিকে তাকিয়ে বলল,
আইছে ধেরে খোকা!হু!! আয়!একটু পরেই বিদায়!
রিদি ফিক করে হেসে উঠল। তীব্র ভয়ংকর দৃষ্টিতে রুপের দিকে তাকাতেই রুপ গায়েব।রিদি তখনো মিটমিট করে হাসছে দেখে তীব্র ভু কুঁচকে বলল,
আমি বাচ্চা!!
নাতো!!
আপনি বুড়ো বাচ্চা!তিন ছোট বাচ্চার বাপ বড় বাচ্চা!
তীব্র রিদির আঁচল টেনে মুখটামুছে। বোতল খুলে পানি খেয়ে আবার মুখ মুছে তা দেখে রিদি চেঁচিয়ে উঠে,
এই!এই আমার নতুন শাড়ি!!!
তো!!
তো মানে!!
তো মানে তুমি জানো!!
রিদি বিরক্ত হয়ে উঠে যেতে যেতে বিরবির করল,
অসভ্য বদ লোক ! পরক্ষনেই মুচকি হেসে বলল,
তবে আমার!!!
বিদায় পর্ব শেষ হতেই সবাই একে একে গাড়িতে উঠে পড়ে।রিদের গাড়ি বেশ কিছুক্ষণ আগেই চলতে শুরু করেছে।একে একে বরযাত্রীর গাড়ি বের হওয়ার পর তীব্রর পরপর তিনটা গাড়ি বের হয়।
এদিকে তূর্যের হুট করেই শরীর খারাপ করেছে।দুবার বমি করে ক্লান্ত হয়ে মায়ের বুকে মিশে আছে। ওষুধ আর স্যালাইন খাওয়ানো হয়েছে ইতিমধ্যে এখন কিছুটা সুস্থ হলেও ছেলেকে বুকে সাথে নিঝুম ভাবে সিটিয়ে থাকতে দেখে রিদির চোখ ছলছল করছে। সারাদিন ছেলের দৌড়াদৌড়ি আর হাসিহাসি মুখখানা দেখেছে আর মূহুর্তেই কি হয়ে গেল।রিদি তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলল,
আব্বু!!এখন ঠিক আছেন?খারাপ লাগছে?
তূর্য দু’পাশে মাথা নাড়ায়।যার অর্থ না।
রিদি ছেলের কপালে পরপর কয়েকটা চুমু দিয়ে বলল,
আমরা বাসায় ফিরে যাচ্ছি সোনা।
তূর্য মাথা তুলে তাকালো মায়ের দিকে,
বিয়ে শেষ আম্মু? নতুন মামিকে দেখব না!!তুমি টাকা নিবে না মামুর থেকে!
রিদি গায়ের চাদর ভালোভাবে মিশিয়ে দিল তূর্যের গাঁয়ে,
দেখেন নি আপনি মামিকে আব্বু!!আর টাকা নেওয়া একটা রীতি বলতে পারো।তবে সেসব আপনার কাছে কিছু না আমার জান!আপনি আগে সুস্থ হোন।
দেখেছি!মামি সুন্দর!!আম্মু আমরা কিন্তু মামুর থেকে টাকা নিব।
রিদি মৃদু স্বরে বলল,
তাই!! আচ্ছা নিও।
জানো মামি রৌদ্র আর তূর্য কে আদর করেছে!
তাই!কাল আমরা আবারো মামির সাথে দেখা করব। কিন্তু এখন আমরা বাসায় ফিরব!আপনার শরীর ভালো না জান!
মায়ের আদুরে কথায় তূর্য আবারো মায়ের বুকে গুটিয়ে গেল। এতক্ষণ শান্ত থাকা পরিবেশ এবার কিছুটা অশান্ত হলো। রৌদ্র তূর্য কে মায়ের বুকে আরামে থাকতে দেখে বলল,
আমিও অসুস্থ হব!!
রিদি পাশে বসা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
কি???
আমিও তোমার কোলে উঠবো!!আমি ভাইয়ের মতো অসুস্থ হলে তুমিও আমাকে কোলে নিবে।
রিদি খানিকটা থতমত খেয়ে তাকালো তীব্রর দিকে। তীব্র ভূ কুঁচকে তাকিয়ে আছে মা ছেলেদের দিকে।তার কোলে ছোট্ট রোজ ঘুমিয়ে আছে।রিদি ফিক করে হেসে বলল,
আপনাকে কোলে নিই না বুঝি!!!
আপনি পাপার কোলে আসেন আব্বু!!
নো!!আমি মাম্মার কোলে যাব!মাম্মার শরীরের পারফিউম আছে।সেটা আমার ভালো লাগে।
তীব্র বিরবির করে বলল,
একদম বাপের মতো হয়েছে।হু!! কিন্তু আগে তো বৌ আমার!
কিছু বললে পাপা!!
না বেটা!কি আর বলব!ভাই অসুস্থ এখন ও থাক বাসায় ফিরে আপনি দখলদারি করেন।
ওকে পাপা!!
তীব্র জানালার দিকে মুখ করে আবারো ফিসফিস করে বলল,
হু!আমার তো চান্স ই নেই!!!
রাত প্রায় ১০ টার কাছাকাছি। তীব্র মেয়ের পোশাক পাল্টে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে। চৌধুরী বাড়ি ফিরেছে খানিকক্ষণ আগে। রৌদ্র তূর্য ফ্রেশ হয়ে কার্টুন দেখছে।রাতের খাবার আসার সময় রেস্টুরেন্টে করে এসেছে। তীব্র মেয়েকে শুইয়ে তূর্যের চেকআপ করে ছেলেদের বিছনায় গিয়ে ঘুমাতে বলল। দুইজন বিছনায় শুয়ে মায়ের অপেক্ষা করছে তা জেনেও তীব্র বলল,
ঘুমিয়ে পড়!!
আম্মু আসবে!!
তীব্র একপাশে সুয়ে মেয়েকে বুকে তুলে নিল।মা ছাড়া এই দুটা ঘুমাবে না। কিছু ক্ষণ পর রিদি ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় বসতেই দুপাশে থেকে দুইজন মায়ের কাছে সুয়ে পড়ল। রিদি দুইজনের কান্ডে শুধু হাসল।লাইট অফ করে দুইজন কে বুকে জড়িয়ে ধরল।
ঢাকার সুনাম ধন্য কমিউনিটি সেন্টারে রিদের রিসেপশনের আয়োজন করা হয়েছে।রাতে রিসেপশন হওয়াই রিদ নীর কে নিয়ে সকালে চলে এসেছে তার ফ্ল্যাটে। এখানে পার্লারের লোকরা এসে নীর কে রেডি করবে। রিয়া অবশ্য সাথে এসেছে।বাকিরা মোটামুটি সবাই রিশেপশনের জন্য রাতেই আসবে।
ছেলেদের পোশাক পড়িয়ে চুল গুলো সেট করে দিল তীব্র।আজকে তিন বাপ ছেলে একই রকম সুট পড়েছে।রিদি রেডি হয়ে রুমে ঢুকতে ঢুকতে তিনজনকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল। তাকিয়ে শুধু দেখল বড় তীব্র চৌধুরী আর সেম সেম দুটা ছোট তীব্র চৌধুরী।এক দেখায় যে কেউ বলতে বাধ্য তীব্র চৌধুরীর অংশ ওরা।
মাশাআল্লাহ!!আমার জানবাচ্চাদের তো সুপার ডুপার লাগছে। একদম প্রিন্স!!
রৌদ্র মায়ের কথায় মুচকি হেসে চেচোখে চশমা পড়তে পড়তে বলে,
এখন!!
রিদি ফিক করে হেসে উঠলো,
একদম হিরো!!
তূর্য ও ভাইয়ের মতো চশমা পড়তেই রিদি বলে,
হুম!বুঝেছি!!দুই ভাইকেই হিরো লাগছে।
তূর্য কিছুটা এটিটিউড নিয়ে বলল,
দেখতে হবে না কে রেডি করিয়েছে!!লেটস গো ব্রাদার!! তূর্যের কথায় রৌদ্র ও একই ভঙ্গিতে বলল,
ওকে ব্রো!!!
রিদি বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে দুইজনকে দেখল।মা মা করে সারাক্ষণ তার সাথে চিপকে থাকা ছেলেদের এমন স্টাইল দেখে রিদি সত্যিই অবাক হয়ে দুইজনের যাওয়ার দিকে চেয়েই রইল।মনে মনে অংক কষে বের করল ছেলেদের বয়স গুনে গুনে ৪ বছর ৮ মাস প্লাস!আর এই সামান্য বয়সে এখন থেকেই বাবাকে কপি করছে!!এমনিতেই তো বাবার কার্বন কপি!তার উপর স্টাইল বাবার পেলে তার কি পাবে!!সবাই সত্যি বলে এইদুটো রিদির পেট থেকে বের হয়েছে কেউ বিশ্বাস করবে না!!হাহ কি কপাল!!
মেয়ে কোথায়??
তীব্রর ডাকে তীব্রর দিকে ঘুরে তাকালো রিদি।ভূ কুঁচকে বলল,
আগে বলেন এসব কি??
কোনসব??
এই ফালতু নাটক করবেন না। ছেলেদের মাথায় এসব স্টাইলের ভুত আপনি ঢুকিয়েছেন!!
স্টাইল তো ফালতু না বৌপাখি!!
অবশ্যই ফালতু!!
বাপের সুদর্শন হওয়ার ঠেলায় বাঁচি না এখন ছেলেরাও।এমনিতে মানুষ বলে এদের সাথে আমার মিল নাই! ঠিকই বলে!!!নিজের পেটের তিনটাই রাজাকার !জন্ম আমার পেট থেকে নিল অথচ হয়েছে বাপের মতো ইংরেজ!! ধূর ভালো লাগে না…
জেলাস!!!
রিদি সরাসরি বলল,
হ্যাঁ অবশ্যই জেলাস!এখন বের হন তো আপনি!আমি রেডি হব।জরিনা সেজে সেই ঘুরছি সকাল থেকে আপনাদের পিছু পিছু।৩টা বাচ্চা সামলিয়ে উপস সরি ৪ টা বাচ্চা। আপনিও তো বাচ্চার চেয়েও ছোট বাচ্চা….ধূর ভাল্লাগে না! তীব্র রিদির কথায় হাতের ঘড়ি পড়তে পড়তে মুচকি হেসে বিরবির করল,
আমার তোতাপাখি!!
এই আপনি একদম আমাকে তেল দিবেন না।দুদিন ছেলেমেয়েকে কি সামলিয়েছেন তাতে সুদে আসলে বেশি আপনাকে সামলাতে হয়েছে আমার।সকাল থেকে আপনার পিছু পিছু দৌড়াতে হয়েছে আমাকে।এতো বড় ধামড়া ছেলেকেও আমাকে গোসল করিয়ে দিতে হয়েছে।এখন নিজে ফিটফাট আর আমি জরিনা সদরঘাট!!রিদি বকবক করতে করতে গোসলে ঢুকে যায়।এখন সাওয়ার না নিলেই না।
চারপাশের চকচকে আলোয় পরিবেশ বেশ রমরমা।নীর কে নিয়ে রিয়া স্টেজ এ বসিয়ে দেয়।নীর চারপাশে তাকিয়ে বলল,
আপু!!রিদিতা আসেনি এখনো!
না।চলে আসবে!!তুমি বসো আমি রিদ কে পাঠাচ্ছি।ওর বন্ধুদের সাথে ওদিকে আছে।
নীর মাথা নাড়ে।
এদিকে এরিকা শাড়ি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।রিক মাকে শাড়িতে দেখে প্রতিবারই অবাক হয়ে বলেছে,
মম তোমাকে অন্যরকম লাগছে!!
এরিকা ছেলের কথায় মুচকি হেসে বলল,
তাই!!কেমন?? সুন্দর!!
হুম!!বাট অলিভা মনি ইজ লুকিং সেম লাইক বিফোর!
অলিভার কথায় এরিকা আশেপাশে তাকালো।অলিভাকে দেখা গেল কিছুটা দূরে একটা সিলভলেস হাটু সমান ফ্রক পড়ে আশেপাশে বারবার তাকাচ্ছে।কি জেন খুঁজছে।এরিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেল বোনের কাছে।
এভাবে বারবার আশেপাশে তাকিয়ে কি দেখছ??আর এগুলো কি পড়েছো! সবাই ড্যাবড্যাব করে দেখছে তোমাকে!!অলিভা এমনিতেই সুন্দর তারউপর ভারী সাজ আর ওয়েস্টান গাউনে নায়কা নায়কা লাগছে।অলিভা এরিকার কথা তোয়াক্কা না করে বলল,
ওহহ প্লিজ এরি!!শাশুড়ির মতো ভাষন দিও না।আমি আজ ভীষণ ভালো মুডে আছি।এরি তুমি জানো তোমার শশুর বাড়ী সাথে আমার ক্রাশ আর বিজনেস পার্টনার তীব্র চৌধুরীর কানেকশন আছে।ওনাকে আমি দেখেছিলাম তোমার দেবরের হলুদে।কথা বলতে চেয়েও বলা হয়নি। বিয়ের দিন দেখিনি আর আজ ও দেখছি না। তুমি জানো কিছু এই ব্যাপারে! তীব্র চৌধুরী কি হয় সম্পর্কে তোমার শশুর বাড়ির।
মাত্র দু’দিন এসে আমি এসব জানবো কিভাবে!!দেখ যাই হোক তুমি প্লিজ এখানে কোন সিনক্রিয়েট করবে না। বিশেষ করে রিদির সাথে।
থমথমে মুখে ঝটকা খেয়ে স্থির হয়ে বসে আছে অলিভা। তীব্র চৌধুরী রিদির হাজবেন্ড এটা দেখেই সে শকড্ হয়ে আছে। শুধু যে অলিভা তা নয় রাদিফ ও বেশ অবাক হয়েছে। তীব্র চৌধুরী নামটা তার পরিচিত। যদিও কখনো সাক্ষাৎকার হয় নি রাদিফের সাথে তবে নামটা পরিচিত।সেবার যখন তীব্র চৌধুরী এসেছিল তাঁদের সাথে ডিল ফাইনাল করতে রাদিফ কাজসূত্রে তখন বাইরে ছিল। তাছাড়া কখনো ছবি ও দেখে নি।
রিদির হাজবেন্ড তীব্র চৌধুরী??এটা সত্য??
রাদিফ মায়ের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়তেই তিনি মুচকি হেসে বলল,
চিরন্তন সত্য!!অবাক হয়েছো তাই না! তীব্র চৌধুরী!যাকে এক নামে সবাই চেনে তার বৌ এক গ্রামের অসহায় মেয়ে কিভাবে হলো!!
রাদিফ নিশ্চুপ……রাদিফকে নিশ্চুপ দেখে তিনি আবারও বললেন,
তুমি যে হিরাকে কালো বলে,নিজের সাথে মানাবে না বলে!দূর ছাই করে অবহেলা করেছো সেই হিরাকে তীব্র চৌধুরী যত্নে আগলে রেখেছে।সে তীব্র চৌধুরীর বৌ!তার তিন সন্তানের জননী। চৌধুরী বাড়ির পুত্রবধূ!
রিদির ছেলেমেয়েকে দেখেছো!!আল্লাহর তরফ থেকে পাওয়া রাজপুত্র আর রাজকন্যা তাঁদের। তুমিও যাকে দেখে অবাক হয়েছো,যার রুপে এখন মুগ্ধ হয়েছো এটা সেই রিদিই তফাৎ শুধু অবহেলা আর যত্নের। তাছাড়া তীব্র চৌধুরীর বৌ ব্যাতিত তার নিজস্ব ও একটা পরিচয় আছে।রিদিতা একজন ডক্টর।মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।ডঃরিদিতা তীব্র চৌধুরী। তীব্র চৌধুরী সম্পর্কে তো জানোই তীব্র নিজেও একজন ডক্টর।আর হয়তো কিছু বলার প্রয়োজন নেই।
তবে বলতেই হয় সেদিন ভ্যাগিস তুমি অবহেলা করেছিলে নয়তো মেয়েটা এতো সুখী হতো না।আমি তোমাকেও দোষ দেব না।তবে এটা অবশ্যই বলব,
তোমার তুলনায় তীব্র চৌধুরী বেস্ট ।ছেলে হিসেবেও বেস্ট। যেখানে তুমি নিজের বাপের কেনা কমদামি পাঞ্জাবি পড়তে অনিহা দেখিয়েছো যেখানে সে তার সন্মান রক্ষার্থে তার দেওয়া পাঞ্জাবিই পড়েছে।আসলে কি বলোতো রাদিফ এটা আমাদের ব্যার্থতা যে আমরা তোমাকে ভালো শিক্ষা দিতে পারি নি।তবে চেষ্টা করেছি।আশা করছি তোমার ছেলেটাকে তোমার মতো তৈরি করবে না।
কথাটা শেষ করেই তিনি ধীর পায়ে হেটে স্টেজ এর দিকে গেলেন। সেখানে সবাই এটা ওটা নিয়ে কথায় মশগুল।
অলিভা কিছুটা দূর থেকে মা ছেলের কথা শুনে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।রাগে ফর্সা মুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে।
গম্ভীর মুখে সোফায় বসে আছে তীব্র।ঠিক তার দু’পাশে একই ভঙ্গিতে বসে আছে রৌদ্র আর তূর্য। তাঁদের নজর স্টেজ এ বসা নীরের দিকে।কারন নীরের কোলে বসে আছে ছোট্ট বোনটা।যাকে সবাই গাল টেনে আদর করছে।ভীর জমেছে স্টেজ এ। রৌদ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বোনের গালের দিকে চেয়ে আছে।খুব শান্ত ভঙ্গিতে বাবার উদ্দেশ্য বলল
পাপা রোজ কে নিয়ে আসি!!সবাই ওর গাল টানছে।
তীব্র ছেলেদের দিকে চেয়ে দেখল।দুইজনের মুখটা গম্ভীর। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বোনের উপরে আরোপিত। তীব্র ছেলেদের দেখে যা বুঝার বুঝে গেল।বোনকে কারো কোলে রাখলে দুইভাই সিসিটিভি ক্যামেরার মতো নজর রাখে। তীব্রর অধর কোনে হাসি ফুটল।তবে তা আড়াল করে বলল,
বোন তো কাঁদছে না বাবারা কাঁদলে আমি নিয়ে আসব তোমরা যাও গিয়ে খেলা করো।
তীব্র কথাটা বললেও দুইজনের একজনও নড়ল না। তীব্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেয়ের দিকে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রিদির দিকে তাকালো।রিদিও স্টেজ এ সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। তীব্র সেদিকে এক নজর দেখে আবার মেয়ের দিকে তাকাতেই ঝরের গতিতে স্টেজ এ উঠে নীরের কোলে থেকে নিজের কোলে তুলে নিল।
নীর আহাম্মক এর মতো হা হয়ে দেখল।রোজ উসখুস করে কাঁদো কাঁদো মুখ করলে নীর রোজকে রিদির কাছে দেওয়ার জন্য উঠতেই ঝরের গতিতে আসা তীব্র মেয়েকে কোলে আদুরে গলায় বলল,
এই পাপা জান!!কি হয়েছে??
রোজ পাপাকে দেখে মিষ্টি করে হাসল। তীব্র স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে এদিক ওদিক না তাকিয়ে সোজা মেয়েকে নিয়ে হাটা ধরল গাডেন এরিয়ায়।
অলিভা,এরিকা রিয়ার মুখে রিদি আর তীব্রর বিয়ের কাহিনী শুনে চরম অবাক হয়ে আছে। অলিভার মতে তীব্র চৌধুরী সাধারন মানুষের বেশে এক ভয়ংকর মানব। যার কথা অমান্য করা মানে মৃত্যু নিশ্চিত।যার উপস্থিতিই হাজারো নারীর বুকে কম্পন ধরাই।হাজারো সুন্দরী মেয়ে এক ঝলক দেখেই যার উপর ফিদাহ!!সে কি না রিদির মতো কাউকে বিয়ে করেছে।তার বৌ হওয়া উচিত ভয়ংকর সুন্দর।রিদিই কেন??
এরিকা সবটা শুনে মুগ্ধ হয়ে বলল,
সত্যি বলতে আমি অবাক হয়েছি বেশ। তবে রিদিতার মাঝে আলাদা সৌন্দর্য আছে যা সবার থেকে আলাদা।
রিয়া মাথা নেড়ে দূর হতে রিদিতার দিকে তাকালো,
রিদি লতিফা বেগম আর নাফিসার সাথে বসে কথা বলছে আর দুই ছেলে দুই পাশ থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে।রিদিও ছেলেদের আগলে নিয়ে আছে।দুটোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এদের মতো ভদ্র বাচ্চা একটাও নাই এই জায়গায়।মা পাগল ছেলে দুটো একদম বাবার কপি।নাফিসা টেনে তাদের কাছে ডাকলেও আসল না।একদম মাকে চিপকে বসে আছে।
আম্মু তুমি কি আমাদের আম্মু নও!!!
রিদি রৌদ্রের কথায় অবাক হয়ে তাকালো রৌদ্রের দিকে। রৌদ্রের ছলছল চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে রইল কিছু সময়!
রৌদ্র মাকে চুপ দেখে আবারো বলল,
তুমি কি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?
রিদি চট করে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
কি হয়েছে আব্বু!!কে কি বলেছে?? তূর্য কি হয়েছে??
তূর্য ভু কুঁচকে তাকিয়ে আছে চুপচাপ!মায়ের কথায় মুখটা তুলে একবার মাকে দেখে চট করে মায়ের বুকে গুটিয়ে গেল।রিদি দুইছেলের এমন কান্ডে অবাক হয়ে বলল,
আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭৬
কি হয়েছে আমার আব্বুদের!
পঁচা আন্টি বলেছে আমাদের গায়ের রং তোমার সাথে মিলে না।তুমি আমাদের মা না।তুমি নাকি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে।
রিদির বুকটা ধক করে উঠল।সে মা না!!
