আবার বসন্ত পর্ব ১১
ঝিলিক মল্লিক
রুবায়েত নিজের রুমে ফিরলো রাত সাড়ে দশটার দিকে। আলাপ-আলোচনা করতে করতে লাড্ডু এবং মা প্রায় একইসাথে ঘুমিয়ে পরেছেন। লাড্ডুকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না রুবায়েত তিন বছরের অভ্যাস তার৷ এই অভ্যস্ততা ছাড়ার উপায় নেই। তাই, ঘুমন্ত লাড্ডুকে কোলে তুলে নিয়ে এসেছে।
তাজরীন উল্টোদিকে ঘুরে বালিশে মুখ ঠেকিয়ে বসেছিল। রুবায়েত লাড্ডুকে শুইয়ে দিয়ে ড্রয়ার খুলে কিছু একটা খোঁজাখুজি করতে করতে তাজরীনের উদ্দেশ্যে হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করলো,
“এখনো ঘুমাওনি যে?”
“এমনি।”
তাজরীনের কণ্ঠস্বর কেমন যেন শোনালো। খুব একটা গায়ে মাখলো না রুবায়েত; বরং, স্বাভাবিকভাবেই নিলো। আবারও জিজ্ঞাসা করলো,
“চা বানাবো নাকি কফি? কোনটা খাবে? আমি কিন্তু অলওয়েজ হয় ব্ল্যাক কফি না-হয় গ্রিন টি প্রেফার করি। আমার মনে হচ্ছে, এখন কফিটা-ই বেটার হবে।”
রুবায়েত তাজরীনের নিরবতাকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়ে নিলো। রুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল ব্ল্যাক কফি বানানোর উদ্দেশ্যে।
রুবায়েত দুই মগ কফি নিয়ে রুমে ফিরলো মিনিট পনেরো বাদে। তাজরীন তখনও উল্টোদিকে ঘুরে বসে আছে৷ রুবায়েত ওকে ডাকলো। তবু ও কোনোপ্রকার সাড়াশব্দ করলো না। এবার ঘুরে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়ালো রুবায়েত। দেখলো, তাজরীন নতমুখে বসে আছে। ওর সামনে কফির মগটা রেখে খেতে বলে দাঁড়িয়েই নিজের কফির মগে চুমুক দিতে লাগলো রুবায়েত।
তার কফি প্রায় শেষের দিকে। তবুও তাজরীন মুখ তুলে কফির মগটা দেখছে না। রুবায়েত এবার বললো,
“কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তো তাজ।”
তাজরীন এবার ধীরে ধীরে মাথা ওঠালো। চোখ টকটকে লাল ওর। তাতে মারাত্মক ক্ষিপ্রতা। পারলে চোখ দিয়ে ভস্ম করে দেয়। রুবায়েত এবার সামান্য ভ্রু কুঁচকে নিলো। তাজরীন উঠে দাঁড়িয়ে রুবায়েতের দিকে কয়েক পা এগোতে এগোতে নাকের পাটা ফুলিয়ে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে প্রশ্ন করলো, “দয়া দেখাচ্ছেন আমাকে?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রুবায়েত থমকালো। এই-তো সন্ধ্যা অবধিও মেজাজ ঠান্ডা ছিল, শান্ত ছিল, সবকিছু মেনে নিয়েছিল। তাহলে এখন আবার কি হলো তাজরীনের? কিঞ্চিৎ অবাক-ই হলো বটে। কপালে ভাঁজ পরলো। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো,
“আশ্চর্য! দয়া কেন করবো তোমাকে? কফি শেষ করতে বলেছি। এখানে দয়া করার প্রশ্ন আসছে কেন?”
“একদম চুপ! আবার বড় মুখ করে কথা বলছেন কোন সাহসে? লজ্জা নেই আপনার?”
“কি হয়েছে তোমার? স্পষ্ট করে বলো তো।”
রুবায়েত কেবিনেটের ওপর মগটা রেখে এসে দাঁড়ালো তাজরীনের সামনে জবাব নেওয়ার জন্য। তাজরীন কোনো কথা বললো না। রুবায়েতকে ডিঙিয়ে গিয়ে কেবিনেটের ওপর থেকে ওর ফোনটা নিয়ে আসলো। নিমিষে ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশ করে কনভারসেশন থেকে সেই মেসেজটা বের করে রুবায়েতের চোখের সামনে ধরলো। রুবায়েত কয়েক মুহূর্ত ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে কেঁড়ে নিলো ফোনটা। থতমত খেয়ে বললো,
“পারমিশন ছাড়া ফোন ধরেছো কেন?”
তাজরীন একথার জবাব না দিয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার বেগে রুবায়েতের শার্টের কলার চেপে ধরলো সোজা। দাঁতে দাঁত পিষে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,
“আমার সাথে প্রতারণা? কীভাবে পারলেন আপনি? আরে মানুষ তো একটা পোষ্য প্রাণীর সাথেও এভাবে বেইমানি করে না। সেখানে আমি রক্ত-মাংসে গড়া একজন মানুষ। আমি বলেছিলাম, আমাকে দয়া দেখান? বলুন, বলেছিলাম? কীসের এতো ঠেকা আপনার? কেন এতো দায়? সমাজসেবা করছেন? নাকি করার চেষ্টায় আছেন? আপনি আমার চোখের পানির কোনো মূল্য দেননি। আপনার অভিনয়ের মতো মিথ্যা নয় সবকিছু। আপনি জানতেন, আমি দয়াদাক্ষিণ্য নিতে পারি না। তবুও ইচ্ছা করে এমনটা করলেন আমার সাথে। এরমধ্যে আমার বড়ভাইকেও টেনে এনেছেন। বশীভূত করেছেন। ভালোবাসতে পারবেন না, আবার আমাকে নিয়ে সংসারও করবেন! ছ্যাহ! ঘেন্না ধরছে আমার। থুতু মারি আপনার মুখের ওপর।”
থুতু মারার কথা বললেও তাজরীন ঠিক কাজটা করলো না, তবে বিছানার ওপর ঠান্ডা হয়ে অপাংক্তেয় বেশে পড়ে থাকা কফির মগটা নিমিষে তুলে এনে ছুঁড়ে মারলো রুবায়েতের দিকে। ঠান্ডা কফি মুখ হতে গড়িয়ে সম্পূর্ণটা গলায় এবং সন্ধ্যায় বের করে পরা নতুন সাদা শার্টে লেপ্টে-মেখে একাকার হলো। রুবায়েত শক্তভাবে চোখ বুঁজে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। সহ্যশক্তি আরো কিছু্টা বাড়িয়ে নিলো। এই মুহূর্তে সামনের মানুষটা ক্ষেপেছে। সুতরাং, সে-ও ক্ষেপে গেলে পরিস্থিতি হাতের নাগাল হতে ছিটকে যাবে — এ-কথা তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন রুবায়েতের নিকট হলফনামার মতো নিশ্চিত।
রুবায়েত তাজরীনের দিকে তাকিয়ে বললো, “ভুল বুঝছো তাজ। তোমাকে দয়া দেখিয়ে বিয়ে করিনি। জানি তো, তুমি এসব পছন্দ করো না।”
“কিন্তু আমার কাছে তো এটা এখন দয়ার সম্পর্ক-ই। আমি কীভাবে মেনে নেবো সবকিছু? জুতা মে’রে গোরু দান করতে চাইছেন আপনি। এরচেয়ে তো এশরাক ভালো ছিল। আর যা-ইহোক, অন্তত অভিনয় তো করতো না৷ যা বলার, স্পষ্ট বলে দিতো। আর আপনার পুরোটাই অভিনয়!”
“এশরাক ভালো ছেলে নয় তাজরীন। তোমাকে অপমান করতো কীভাবে সেসব ভুলে গেছো? ওর সাথে তোমার জীবনটা সহজ হতো না।”
তাজরীন মানলো না। পুনরায় এগিয়ে গিয়ে রুবায়েতের কলার চেপে ধরলো। অন্য সময় হলে হুঙ্কার দিয়ে বসতো রুবায়েত। তার শার্টের কলার ধরার সাহস কেউ দেখাবে, এটা সহ্য করা সম্ভব না। তবে এখন তাজরীনের ক্ষেত্রে কিছুই বলছে না। একটা টুঁশব্দও করছে না। তাজরীন কলার ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ওর মুখের দিকে চেয়ে বললো,
“আপনার সাথে বুঝি খুব সহজ হবে আমার জীবন? এমন অনাচার করার কী খুব দরকার ছিল রুবায়েত? বিবেক নেই আপনার? নাকি মনুষ্যত্ব হারিয়েছেন? চলে যাচ্ছিলাম তো আমি সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে। আবারও সবার থেকে দূরে। জীবনে কম ধাক্কা খাইনি আমি৷ তবে বারবার উঠে দাঁড়িয়েছি নিজের আত্মবিশ্বাসের জোরে। কিন্তু এতোবড় ধাক্কা তো আমি সামলে উঠতে পারবো না রুবায়েত। বিশ্বাস করুন, পারবো না। আপনার ওপর থেকে মন উঠে গেছে আমার। অবশিষ্ট আছে শুধুমাত্র ঘৃণা। একরাশ ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকা যায়? অন্ততপক্ষে শেষ জীবন পর্যন্ত সংসার করা যায়? বলুন না? ভালোবাসা ছাড়া একটা জীবন কেউ কাটিয়ে দিতে পারে না। অথচ, সেখানে আপনার এবং আমার বর্তমান সম্পর্কটা হওয়া উচিত ছিল ভালোবাসার। কিন্তু আপনি অত্যন্ত জটিল এবং চতুর মনের। ভালোবাসার অযোগ্য আপনি। ভাববেন না, আঙুর ফল টক। সত্যি বলছি, আপনি ভালোবাসার যোগ্য-ই না। দুঃখ হচ্ছে আমার সেইসব মানুষগুলোর প্রতি, যারা আপনাকে ভালোবেসেছে এবং এখনো বাসছে। হৃদয় ভেঙেছেন আমার। একবার না বারবার। ক্ষমা করবো না কখনো। এই জীবনে কখনো না।”
কলার ছেড়ে রুবায়েতের পায়ের কাছেই ধপ করে বসে পরলো তাজরীন। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত ও। শরীরে একরত্তি শক্তি-সামর্থ্য অবশিষ্ট নেই৷ তাজরীন ফ্লোরে বসে থেকেই রুবায়েতের হাত শক্ত করে চেপে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে কেঁদেকেটে বললো,
“এর একটা বিহিত করুন রুবায়েত। আমাকে আমার আগের সুন্দর সময় এবং খোয়ানো আত্মসম্মান ফিরিয়ে দিন। আমার ভেঙে যাওয়া হৃদয় জোড়া লাগিয়ে দিন। আমাকে আমার পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। বিনিময়ে আমি হয়তো কিছু দেওয়ার সামর্থ্য রাখি না। তবে যৌক্তিক যা চাইবেন, দেওয়ার চেষ্টা করবো; কথা দিচ্ছি। কি হলো? চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আমার বেলায় আপনি নিশ্চুপ হয়ে যান কেন? এমনটা তো না হলেও পারতো। দূরত্ব, বিচ্ছেদ নিয়েও দিব্যি বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু, ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকা যায় না। তিলে তিলে শেষ করে দেয় মানুষের ভেতরকার সত্ত্বাকে। ”
রুবায়েতের নির্লিপ্ততা দেখে ভেতরের রাগ আরো বেড়ে গেল তাজরীনের। উঠে দাঁড়িয়ে চোখের পানি মুছে কটমট চোখে রুবায়েতের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
“ওকে। আপনাকে তোয়াক্কা করার মানে দেখছি না। আমাকেই যা ব্যবস্থা নেওয়ার, নিতে হবে৷ চলে যাচ্ছি আমি। করবো না আপনার নামকাওয়াস্তে সংসার। মাফ করুন আমাকে।”
তাজরীন হাত জোড় করে কথাগুলো বলে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। রুবায়েত অস্থির হয়ে ওকে আটকালো। হাত টেনে ধরে অশান্ত গলায় বললো,
“এই কোথায় যাচ্ছো এখন? সবাই ভালোভাবে নেবে না ব্যাপারটা। প্লিজ থামো, শান্ত হও৷”
রুবায়েত তাজরীনের হাত ধরে রেখেছে এখনো। হাতটা ছিটকে সরিয়ে দিয়ে তাজরীন বললো, “আপনার অভিনয়ের ধরন চিনে গিয়েছি আমি। বোকা বানাতে পারবেন না আর। অন্তত আপনার মতো মানুষের সাথে এরকম গুরুত্বহীন সংসার করা আমার পক্ষে সম্ভব না। ওই ছোট বাচ্চাটার আবেগের কোনো মূল্য নেই আপনার কাছে? আপনি কারো মূল্যায়ন করতে জানেন না। সেই যোগ্যতা-ই আপনার হয়নি!”
তাজরীন বিছানায় গিয়ে বসে ফুঁসতে লাগলে নিরীহ বেশে দাঁড়িয়ে থাকা রুবায়েতের দিকে। রুবায়েত এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিতেই পানির গ্লাস টেনে নিয়ে রুবায়েতের মুখে মে’রে দিলো তাজরীন। রুবায়েত এবারও কিছু বললো না। তোয়ালে এনে মুখ মুছে তাজরীনকে বললো, “ঘুমাও তুমি। ঘুমিয়ে মাথা ঠান্ডা করো। স্ট্রেস গিয়েছে তো, এজন্য মাথা গরম। একটা ঘুম দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“আমি কি করবো না করবো, সেটা আপনাকে বলে দিতে হবে না। —— আপনি চুপ থাকুন!”
“আস্তে কথা বলো। আম্মা শুনবে।”
“শুনুক আপনার আম্মা। জানুক, তার ছেলের কীর্তি।”
রুবায়েত জবাব না দিয়ে আলমারি থেকে স্যান্ডো গেঞ্জি বের করে এনে বাথরুমে গিয়ে পাল্টে আসলো। তাজরীন গজরাচ্ছিল এতোক্ষণ। রুবায়েত ফিরতেই এবার বললো, “আপনার সাথে একঘরে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। হয় আপনি বের হবেন এ-ঘর থেকে, নাহলে আমি।”
“আমি-ই বের হচ্ছি।”
রুবায়েত একবার তিতানকে দেখে বেরিয়ে গেল ঘরের বাইরে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কি মনে করে যেন আবার এগিয়ে উঁকি দিয়ে বললো, “তাজরীন, বালিশটা?”
কথাটা বলার কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওর মুখের ওপর একটা বালিশ ছুঁড়ে মারা হলো৷ রুবায়েত জোরপূর্বক হাসিমুখে সেটা তুলে নিয়ে এসে সোফায় পেতে শুয়ে পরলো। সোফায় শোয়ার অভ্যাস নেই। একারণে, মাঝরাতে দুইবার সোফা থেকে পড়েও গেল ঘুমের মাঝে। এরমধ্যে উঠে গিয়ে কফি বানিয়ে এনে এক মগ কফি খেলো। ড্রয়িংরুম অস্থিরতভাবে জুড়ে পায়চারি করলো কতক্ষণ। তন্মধ্যে, পায়চারি থামিয়ে নিজ ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
আবার বসন্ত পর্ব ১০
ভেতর থেকে দরজা ভেজিয়ে দেওয়া পুরোটা। রুবায়েত নব ঘুরিয়ে আলতোভাবে সাবধানে দরজা কয়েক ইঞ্চির মতো খুলে বাইরে থেকে দেখলো, তাজরীন একহাতে লাড্ডুকে জড়িয়ে ধরে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। মাথার নিচে কোনো বালিশ নেই। এসি এবং ফ্যান— দু’টোই চলছে৷ লাড্ডুর শরীরে কম্বল থাকলেও তাজরীন ঠান্ডায় কুঁকড়ে আছে। আস্তে-ধীরে দরজা মেলে সতর্কভাবে ভেতরে প্রবেশ করে ওয়ারড্রব খুলে একটা কম্বল বের করে এনে তাজরীনের গায়ের ওপর দিয়ে দিলো রুবায়েত। বিছানার অপর পাশ থেকে বালিশ এনে হেলে পরা মাথাটা তুলে বালিশে ঠেকিয়ে দিলো। তারপর সতর্কতার সহিত বের হয়ে দরজা টেনে দিয়ে এসে সোফায় শুয়ে পরলো।
