আমায় রেখো প্রিয় শহরে পর্ব ১৭

আমায় রেখো প্রিয় শহরে পর্ব ১৭
নূরজাহান আক্তার আলো

-‘খারাপ যখন হতেই হবে কিছু না করে খারাপ হবো কেন? বরং খারাপ কিছু ঘটিয়ে খারাপ হই। এতে নিজের কাছে লয়্যাল থাকতে পারব।’
একথা বলে রিদওয়ান কুহুর দুই হাতের আঙ্গুলের ভাঁজে আঙুল গুঁজে দেওয়ালে আঁটকে ফেলল। ঠোঁটে রাখল ঠোঁট। পুরুষালি শক্তির সঙ্গে না পেরে কুহু ছটফট করতে থাকল। হাতে ছাড়ানোর শতচেষ্টায় ব্যর্থ হলো
তার ক্ষীণ শক্তি। তখনই লোডশেডিং হলো। বজ্রপাত হলো।

তাও ছাড়ল না রিদওয়ান। আঁধারে ডোবা পুরো রুমে যেন আরো সুবিধা হলো। তার ছোঁয়া গাঢ় হলো। এক বুনো উন্মাদনা ভর করেছে তার মাঝে। সে উন্মাদ হয়ে সারাদিনের রাগ ক্ষোভ ঢেলে দিতে লাগল কুহুর ঠোঁটের উপর। সব দোষ যেন কহুর ঠোঁটের। তাই নিষ্ঠুরের মতো শাস্তি দিচ্ছে তার গোলাপি ঠোঁটজোড়াকে। হঠাৎ হাত শিথিল হলো রিদওয়ানের। থামল। আর এই সুযোগে পিঠে খামছি বসিয়ে দিলো কুহু। রিদওয়ান কুহুর ধাক্কা, খামছি উপেক্ষা করে নিজের কাজে মগ্ন। না বারণ শুনছে আর না বারণ শোনার অবস্থায় আছে। সঙ্গে ভুলে যাচ্ছে বন্ধুর অগাধ বিশ্বাসের কথা। রুপক যে তার বোনকে ফাঁকা বাসায় শুধু তার ভরসায় নিশ্চিন্ত আছে, একথা সেও জানে। মানে। তবুও সে এই মুহূর্তে অবুজ, দিশেহারা……!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সে এই মুহূর্তে মাথায় আনতে পারছে না এই ভুলই হতে পারে তার বন্ধুত্ব নষ্টের মুখ্য কারণ। হতে পারে বন্ধুত্বের চরম অপমান। বিশ্রীভাবে কহুর গায়ে লেপ্টে যেতে পারে তার দেওয়া কলঙ্ক। রটে যেতে পারে ছাত্রী আর শিক্ষককে নিয়ে করুচিপূর্ণ নোংরা কথাবার্তা। হেরে যেতে পারে একজন মায়ের বিশ্বস্ত ভালোবাসা। ইসমত আরা বেগম খুব ভালোবাসে। এমনকি ভালোবেসে জোর করেই এই বাসায় এনেছিল।

তার ভরসাতেই মেয়েকে রেখে গেছেন উনি। বার বার বলে গেছে কুহুকে দেখে রাখার জন্য। যেন মেয়েটা সাবধানে থাকে। কোনো বিপদ না হয়। রিদওয়ানও উনাকে কথা দিয়েছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে তার কিচ্ছু মনে নেই। কিচ্ছু না। মনে করতেও চাচ্ছে না সে। কারন সে পাগলামিতে মত্ত। চরম তৃষ্ণার্তের মতো শুষে নিতে ব্যস্ত কুহুর ঠোঁট। তার এমন অবাধ্যতায় চোখ ফেটে জল। আর জল গড়িয়ে ভিজে গেছে কুহুর দুই গাল। রিদওয়ান অনুভব করে থামল। তারপর ঠোঁট সরিয়ে মুখ গুঁজল কুহুর কানের নিচে। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এরপর কয়েকটা চুমু খেয়ে আদুরে সুরে বলল,

-‘এবার রাজি হও!
-‘না। আজকে পর থেকে আপনাকে ভালোবাসা তো দূর ঘৃণা করতেও ঘৃণা লাগবে আমার। আপনি দুশ্চরিত। লম্পট। ঘৃণা লাগছে আপনাকে। ভাইয়া এলে আমি সব বলে দেবো, সব।’
-‘কি বলবে?’
-‘যা করেছেন সব বলব?’
-‘সব?’
-‘হ্যাঁ সব।’
-‘তা কি কি বলবে? আমি শিখিয়ে দেই?’
-‘না তার প্রয়োজন নেই।’

-‘ জানি তো। তারপরেও শিখিয়ে দেই একটু। শোনো তোমার ভাইয়াকে বলবে যে, ‘ভাইয়া তোমার বন্ধুকে আমি তার শরীর মুছে দিতে চেয়েছি৷ অবিবাহিত মেয়ে হয়ে অবিবাহিত ছেলের শরীর স্পর্শ করতে চেয়েছি। বৃষ্টিতে ভিজে পুরে একাকার হতে ছাদে গিয়েছিলাম। আমাকে খুঁজতে সেও ছাদে গিয়েছিল, তারপর তাকে আমার ভেজা শরীর দেখিয়েছি। সেও দু’চোখ ভরে দেখেছে আমার ভেজা শরীরে ভিজে থাকা শরীরের ভাঁজ। সুস্পষ্টভাবে ভেসে ওঠা অন্তবার্সের উপস্থিতি। ভেজা চুল। ভেজা চোখ। তিরতির করে কাঁপতে থাকা ভেজা ঠোঁটের প্রলোভন দেখিয়েছি। তার শরীর নিষিদ্ধ অনুভূতি জাগাতে সক্ষম হয়েছি। এইটুকু করেও থামি নাই। এসব করে পুনরায় তাকে রিজেক্ট করার কথা বলে খুঁচিয়েছি। এই টুকু বলে তারপর আমার লিপকিস করার কথাটা বলবে, তাহলেই হবে।’

-‘আমি আপনাকে শরীর দেখিয়ে প্রলোভন দেখিয়েছি?’
-‘অবশ্যই।’
-‘মোটেও না নয়।’
-‘তাহলে আমি তোমাকে রেপ করতে এই রুমে এসেছি মোটেও তা নয়।’
-‘তবে কি করতে এসেছেন?’
-‘তোমার অবাধ্যতার শাস্তি দিতে।’
-‘এটা শাস্তি? এটা কেমন শাস্তি? লজ্জা লাগে না আপনার? ছিঃ!’
-‘লজ্জা সেটা সেটা আবার কি?’

-‘ঘৃণা লাগছে আপনি আমার টিচার। ঘৃণা লাগছে আপনার মতো ছেলে
আমার ভাইয়ার বন্ধু। খুব আফসোস হচ্ছে আমার আম্মুর বিশ্বাসের উপর। ‘
-‘এগুলো তোমার সমস্যা আমার না।’
-‘তাই তো। সরুন। আমার ঘৃণা লাগছে। ঘৃনায় গা গুলিয়ে আসছে। এবার না সরলে চেঁচাব আমি।’
-‘চেঁচাও নিষেধ করেছে সে?’
-‘আপনি বর্বর! বেয়াদব! অসভ্য একটা লোক।’
-‘আই নো, ড্রালিং।’

আবারও শুরু হলো কুহুর জোরজবরদস্তি। এবার গলায় স্বর বাড়ল। সে
চেঁচাতে লাগল। রিদওয়ান তাকে ছেড়ে ছুঁড়ে মারল বিছানার দিকে। সে ছিঁটকে গিয়ে পড়ল বিছানার মাঝবরাবর। রিদওয়ান আশেপাশে দেখে কুহুর ওড়না খুঁজল। পেয়েও গেল। সেটা নিয়ে ঘুরে দেখে কুহু পালানোর
জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে। তাকে চট করে ধরে পুনরায় বিছানায় ফেলে তার উপরে নিজের শরীরের অর্ধেক ভর ছেড়ে দিলো। অসহায় কুহু হাত পা ছুঁড়লেও উঠতে পারল না। রিদওয়ানের বুকের নিচে চাপা পড়ে থাকল। রিদওয়ান ওড়নার একটা কোণা দিয়ে তার হাত বেঁধে দিলো। তারপর কুহুকে বলল,

-‘হাত বাঁধলাম। এবার মুখ বাঁধব। একটা টু শব্দ করলে খবর আছে। যা হচ্ছে হতে দাও। বরং চেঁচালেই আশপাশের মানুষ জেনে আমার সঙ্গে তোমার বিয়ে দিয়ে দেবে। তখন সারাজীবন আমার সঙ্গে থাকতে হবে।’
-‘আপনি! আপনি একটা চরম লেভেলের অসভ্য।’
-‘পুরুষ মানুষ অসভ্য, অভদ্র, না হলে ভেড়া আর পুরুষের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকে না। বুঝলে?’
-‘আপনি রেপ না করলে এমন ব্যবহার কেন করছেন? কি উদ্দেশ্যে আপনার?’
-‘ইশ! অনেক কথা বললে এবার আমার কথা শুনো।’

-‘আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না। আল্লাহর দোহায় লাগে আপনি সরুন। নিজের রুমে যান।’
-‘তুমিই তো আমাকে খারাপ তো বাধ্য করলে। এখন আমার দোষ দিচ্ছো কেন?’
-‘আমি! আমি কখন খারাপ হতে বাধ্য করলাম। আপনি কিন্তু.…!’
রিদওয়ান হাসল। তখনই কারেন্ট এলো। রিদওয়ান হাতের কাছে থাকা ল্যাম্প অন করল। শুভ্র আলোয় ভরে গেল রুম। স্পষ্ট হলো কুহুর কেঁদে কেটে লাল হওয়া মুখ। রিদওয়ানের মাথায় আবারও দুষ্টুমি ভর করল। সে কুহুর পায়ের সঙ্গে পা পেঁচিয়ে নখ বসাল কুহুর পায়ে। ব্যথা পেয়ে কুহু উহ! জাতীয় শব্দ করে উঠল। তা দেখে রিদওয়ানের হাসি চওড়া হলো। সে এবার কুহুর টিশার্টের গলার কলার সরাতেই কুহু ছটফটিয়ে বলল,

-‘প্লিজ না।’
-‘প্লিজ হ্যাঁ।’
-‘প্লিজ, দয়া করুন, এমন করবেন না।’
-‘জাস্ট দেখব।’
-‘কি আশ্চর্য! কি দেখবেন?’
-‘মাইন্ড ফ্রেশ করো। যা ভাবছো তা নয়।’

একথা বলে রিদওয়ান কুহুর টিশার্টের কলার সরিয়ে দিলো। কুহুর ঠিক কন্ঠনালির উপরে জ্বলজ্বল করছে কালো কুচকুচে একটা তিল। অদ্ভুত সুন্দর সেটা দেখতে। সে হাত বাড়ালো তিলটার দিকে। আলতো স্পর্শে
আঙুল বুলাল। নখ দিয়ে খুটল। এই তিলটাই তার জীবনে সর্বনাশ ডেকে এনেছে। নজর কেড়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। ভাবতে ভাবতে ভাবনা জুড়ে তার মনে দখলদারি শুরু করেছে। আর এটা তার নজরে পড়েছিল এই বাসায় আসার চারদিনের দিন।

অদ্ভুতভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল সে। এরপর কুহুর অসাবধানতার বশে আরো একদিন এটার দেখা পেয়েছে। ছোঁয়ার স্পৃহা জেগেছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভীষণ এ্যাট্রাকটিভ তিলটি। তিল
কাউকে এতটা আকৃষ্ট করতে পারে সেটা নিজের সঙ্গে না ঘটলে অজানা থেকে যেতো তার। এমনিতেই নারী শরীরের প্রতি পুরুষদের আকৃষ্টের শেষ নেই। আর যদি থাকে এমন কিছু লোভনীয় ব্যাপার তাহলে কথায় নেই। কুহু নিঃশব্দে কাঁদছে। তাকে কাঁদতে দেখে রিদওয়ান তার শরীরের ভর কমাল। তারপর কুহুর কপালে চুমু এঁকে আদুরে সুরে বলল,

-‘শুধু ঠোঁট ছুঁইয়েছি আর এই তিলটা। এখনো তো বাজে স্পর্শ করি নি।
তুমি খেয়াল করো আমি পুরোপুরি তোমার শরীর জাপটে ধরি নি। রেপ করার মতো কামুকতার স্পর্শ করি নি।আর না তোমার ড্রেস এলোমেলো করেছি। আগে তো নিজেকে দেখো! উপলব্ধি করো। আর কাছে আসা মানেই নোংরা স্পর্শ নয় কুহু। কাছে আসা মানে শরীরের ক্ষুধা মেটানোর
তাড়া নয়। তবে কাঁদছো কেন? কেঁদো না।

ভালোবাসো না বলেই আমার স্পর্শ উপলব্ধি করতে পারো নি, পারছো না। যদি ভালোবাসতে তাহলে অনুভব করতে পারতে আমার স্পর্শে কামুকতা নেই। কামুকতার স্পর্শ এমন হয় না। কামুকতার স্পর্শ কপালে নয় হয় বক্ষবিভাজনে। ঠোঁটে চুমু খাওয়া মানেই কামুকতা নয়, ভালোবাসার প্রকাশও হয়। সেটা স্পর্শের মাঝে অনুভূত হয়। আর এই যে,তোমার এই তিলটা আমাকে পাগল করে দেয়। যখনই দেখি আমার মাথা কাজ করে না। পাগল পাগল লাগে আমার। আমি ভুলে যায় সম্পর্কের কথা। কে কার বোন, কে কার ছাত্রী আমার স্মরণে আসে না।

মন বলে তিলটাকে আঁচড়ে, কামড়ে, আমাকে জ্বালানোর সাধ মিটিয়ে দেই। কিন্তু পারি না। সম্ভব হয় না। বহুকষ্টে তখন
নিজেকে সামলায়। তাছাড়া তোমাকে বন্ধুর বোন কিংবা ছাত্রী হিসেবে ভালোবাসিনি আমি। ভালো লেগেছে তোমায়, প্রতিনিয়ত মনের টান কাজ করে তাই ভালোবেসেছি। তাহলে বার বার এক কথা বলো কেন? আমাকে খোঁচাতে ভালো লাগে? আর স্যার হয়েছি তো কি? স্যাররা কি ভালোবাসতে পারে না? তাদের কি মন নেই? নাকি মন থাকা অপরাধ?

নাকি বন্ধুর বোনকে ভালোবাসা যাবে না এমন আইন জারি করা আছে? কোনটা? যদি দুটোর একটা আইনও থাকে তবে আমি রিদওয়ান সেই আইন সবার আগে ভঙ্গ করব।’
-‘(নিশ্চুপ)
-‘আর শুনুন, এবার থেকে আমি বাসায় থাকালীন কারো শিক্ষকও নয়। কারো বন্ধুও নয়। আমি শুধু আপনার উন্মাদ প্রেমিক। সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমার আপনাকেই চাই, ব্যস।’
-‘পতিতালয়ে যান। আমার থেকেও সুন্দরী কাউকে পেয়ে যাবেন। শুধু শুধু কথা দিয়ে আমাকে ভুলানোর চেষ্টা করতে হবে না। এনার্জি লসও হবে না।’

-‘ এখন যদি একটা থাপ্পড় দেই দোষ তো হবে আমার। কথাবার্তা এমন কেন?’
-‘আপনি করতে পারলে আমি বলতে পারব না?’
-‘ কুহু! আমি লিমিটের মধ্যে আছি থাকতে দাও। আর পতিতালয়ে গেলে
শরীরের ক্ষুধা মিটবে, মনের না। আমার মনের ক্ষুধা মেটানো প্রয়োজন, শরীরেরটা এখন অবধি কনট্রোলে আছে। যখন মনে হবে কনট্রোললেস তখনই তোমার এই বাসায় থাকার মেয়াদ ফুরাবে।’

-‘যতটুকু সম্ভবনা ছিল সেইটুকু শেষ। যতটুকু সন্মান পেতেন তাও পাবেন না। ভালোবাসা তো দূর।’
-‘দেখা যাবে।’
-‘অবশ্যই দেখা যাবে। তবে একটা কথা ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও
তুমি যত বেপরোয়া হবে আমিও তত উন্মাদ হবো। সকালে সুন্দরভাবে
মার্জিত ভঙ্গিতে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করেছি। শুনলে না। পাত্তায় দিলে না। বরং বোকামি করে তিল দেখিয়ে আমাকে পাগল করে তুললে।

আমায় রেখো প্রিয় শহরে পর্ব ১৬

রুড হতে বাধ্য করলে। এই রুপে যখন আসতেই হলো এভাবেই মানতে হবে আমাকে।’
-‘মরে যাব তবুও আপনাকে ভালোবাসব না। কখনো না।’
একথা শুনে রিদওয়ান হাসল। উঠে দাঁড়িয়ে টি শার্ট ঠিক করে আয়নার সামনে দাঁড়াল। চুলগুলো ঠিকঠাক করে আয়নার ভেতর দিয়ে কুহুর দিকে তাকাল। তারপর ফিচেল হেসে তার রুমে যেতে যেতেই বলল,
-‘আমিও ছাড়ানোর জন্য ধরি নি; সরানোর জন্য কাছে টানি নি।’

আমায় রেখো প্রিয় শহরে পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here