আমার তুমি সিজন ২ পর্ব ২৯
জান্নাত সুলতানা
-“শুনলাম তোমার ঠিক করা পাত্র বিদেশিনী বিয়ে করে দেশে ফিরেছে!ওয়াও।”
সাদনানের চোখে মুখে হাসির ঝলক নিয়ে কথা টা জানালো। আজ্জম মির্জা চোরা চোখে ছেলের দিকে একবার আঁড়চোখে তাকালো।বিচ্ছু একটা। এটা এভাবে ঘটা করে সবার সামনে বলার কি আছে? আর সবচেয়ে বড়ো কথা এই বিচ্ছু এই খবর টা পেলো কোথা থেকে? আজ্জম মির্জা খাবার নড়াচড়া করতে করতে কথা গুলো ভাবছিল। তক্ষুনি সাদনান আবার বলে উঠলো,
-“কি ভাবছো?নিশ্চয়ই ভাবছো ইনফরমেশন পেলাম কি করে?ওহ্ কামন বাবা।আমি একজন মন্ত্রী এই ইনফরমেশন টা কালেক্ট করতে জাস্ট আমার সাত মিনিট টাইম লেগেছে।”
আজ্জম মির্জা কথা ঘুরিয়ে জিগ্যেস করলো,
-“তা তোমার পাত্র কোথায়?
আমার সাথে দেখা করাবে না?”
-“অবশ্যই।
কাল বিকেলে আমি তোমার সাথে মিট করাবো।
বি রেডি।”
সাদনান খাবার শেষ চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাঁড়ালো। বউয়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে উপরে নিজের রুমে চলে গেলো।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সারা কেঁদেকুটে নাজেহাল অবস্থা করে ফেলেছে নিজের চোখ মুখের।বাবা আর ভাই মিলে কি শুরু করে দিয়েছে ভাবলেই বুক ফেটে কান্না আসছে সারা’র। সবাই পাত্র নিয়ে যুদ্ধ করছে। অথচ সারা কে একবারও কেউ কিছু জিগ্যেস করার প্রয়োজন মনে করলো না!এটা কেমন বিচার? যার জন্য পাত্র দেখছে তাকে একবার জিগ্যেস করলে না ওর পছন্দ আছে কি না?ও কি চায়?প্রিয়তা সারা’র কান্নার কারণ জানে।অনেকক্ষণ হয় সারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে।
প্রিয়তা বুঝাচ্ছে।কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না।এদিকে রাত বাড়ছে।সাদনান নিশ্চয়ই বসে আছে। প্রিয়তার রাগ হলো সাদনানের উপর। কি অদ্ভুত লোক সব সময় তো ভাব এমন যেনো বোনদের সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তবে এখন কেনো এরূপ আচরণ করছে?কোথায় আয়ান তো এমন করে নি।বরং প্রিয়তার বাবা একটু জোর করেছিল বিয়ের জন্য। কিন্তু আয়ান বোন কে কি সুন্দর করে বুঝিয়েছে তাই তো মনে সাহস পেয়েছিল।কিন্তু এখানে সাদনান তো উলটো করছে।প্রিয়তা সারা কে কোনো রকম বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রুমের উদ্দেশ্য হাঁটা শুরু করলো।মনে মনে আসার সময় ঠিক করে নিলো রুমে এসে বজ্জাত লোক টার সাথে কোনো কথা বলবে না আজ।
সাদনান আয়েশ করে সোফায় বসে কুশন কোলে ফোনে স্ক্রল করছিল।রুমে কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে ছোট ছোট চোখ করে সেদিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।প্রিয়তা ধুপধাপ পা ফেলে কাবাড থেকে রাতের পোষাক নিলো।
ওয়াশ রুমে গিয়ে ঠাশ করে দরজা লক করলো।সাদনান একটু নড়েচড়ে বসে। বউয়ের হঠাৎ হলো কি?পরক্ষণেই বুঝতে পারে।ভ্রু কুঁচকে ওয়াশ রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে।বউয়ের বেরুনোর অপেক্ষা করে।
প্রিয়তা মিনিট পাঁচ এর মধ্যে বেরিয়ে এলো।নাইটির ফিতা বেঁধে এসে কোনো দিকে না তাকিয়ে লাইট অফ করে ড্রিম লাইট অন করে শুয়ে পড়লো। সাদনান কিছু টা ভ্যাবাচ্যাকা খেলো।বউ তাকে পাত্তা দিচ্ছে না। ভাবা যায়?মন্ত্রী সাদনান শাহরিয়ার কে ইগনোর করছে তার বউ।এটা যদি জণগণ জানতে পারে নিশ্চিত তাকে নিয়ে সবাই হাসি-তামাশা করতে পিছ বা হবে না।নিউজ হবে আর সেখানে হেডলাইন হবে বড় বড় অক্ষর করে লেখা থাকবে, মন্ত্রী বউ মন্ত্রী কে পাত্তা দেয় না।” কি ভয়ানক!সাদনান আবছা আলোয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে বিছানার দিকে তাকিয়ে সেন্ডেল পায়ে দিয়ে এগিয়ে গেলো।ফোন রেখে চপ্পল খুলে বিছানায় বসতেই প্রিয়তা আরো কিছু টা গুটিশুটি মেরে গেলো।সাদনান এবার আশাহত। সত্যি সে আশাহত বউ তাকে ইগনোর করছে তাও আবার যেমন-তেমন ইগনোর নয়।যেনো তার ছায়া মারালেও ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে।
তবে সাদনান কি দমে যাওয়ার পাত্র? উঁহু। একদমই নয়।দানবীয় হাত এগিয়ে বউ কে খাবলে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলো। প্রিয়তা বিরক্ত ভ্রু নাক কুঁচকে দৃষ্টিপাত করে সাদনানের দিকে। সাদনান গভীর দৃষ্টিতে বউ কে পর্যবেক্ষণ করলো।আস্তে করে বউয়ের কানের লতিতে ওষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে দিতেই প্রিয়তা সাদনান কে কিছু টা জোর খাঁটিয়ে নিজের উপর থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলে উঠলো,
-“রাহান ভাইয়া সারা কে ভালোবাসে।
আপনি জানেন।তাহলে পাত্র কেনো দেখছেন?”
-“হোয়াট ইজ দিস!
এমন একটা রোমান্টিক মূহুর্তে তুমি আমার অনুভূতির দফারফা করে দিলে।
ভেরি বেড জান।”
প্রিয়তা অবাকই হলো।কি অদ্ভুত লোক।বোন কেঁদেকুটে নাজেহাল অবস্থা করে ফেলেছে নিজের। আর এই লোক?এতো সিরিয়াস একটা বিষয় কে কত টা হেলাফেলা করে নিচ্ছে। রাগ হলো প্রিয়তার কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে তার আগেই সাদনান বলে উঠলো,
-“বিশ্বাস রাখো।ধৈর্য্য ধরো।কখনো হতাশ করবো না জান।
সময় দাও সব ঠিক করে দেব।”
প্রিয়তা জানে সাদনানের কখনো এমন কিছু করবে না যাতে করে সারা কষ্ট পাবে।কিন্তু তাও কেনো জানি রাগ হচ্ছিল। তবে এখন সাদনানের কথা শুনে রাগ সব গলে আগুন থেকে পানি হয়ে গেলো।গলা জড়িয়ে ধরলো সাদনানের।গদগদ কণ্ঠে আহ্লাদী স্বরে আবদার জুড়ে দিলো,
-“প্লিজ এমন কিছু করবেন না যাতে করে ওরা দু’জন কষ্ট পায়।”
-“বাহ্,বাহ্।অন্যের জন্য কত দরদ।কষ্ট পাবে। আর আমি? আমি যে বউয়ের ভালোবাসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছি? বুক চৌচির হয়ে যাচ্ছে।বউ কে এই মূহুর্তে আদর না করতে পারলে সেই কষ্ট সব বেরিয়ে এসে তোমার নামে আন্দোলন করবে।”
প্রিয়তা প্রথমে লজ্জা পেলেও পরক্ষণেই সাদনানের এমন আজগুবি সব কথাবার্তায় পেট মুচড়ে হাসি পেলো। শব্দ করে হাসতে লাগলো। সাদনান বউয়ের নাইটির ফিতা খুলে পেটে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরতেই প্রিয়তার হাসি গায়েব হয়ে গেলো।শক্ত করে সাদনানের চুল খামচে ধরলো। সাদনান বউয়ের পেট থেকে মুখ তুলে বাঁকা হেঁসে বলে উঠলো,
-“বউ কি করে কন্ট্রোল করতে হয়।মির্জা সাদনান শাহরিয়ার ভালো করেই জানে।”
রাতের খাবার সব গুছিয়ে তিন্নি রুমে এলো।কবির ফ্রেশ হয়ে ওয়াশ রুম হতে বেরিয়ে এসেছে মাত্র।
তিন্নি কবির কে বলল,
-“চলুন খাবেন।
বাবা বসে আছে।”
কবির মুচকি হাসলো। টাওয়াল তিন্নির হাতে দিয়ে বলল,
-“তুমিও এসো।”
কবির ভাবলো তিন্নি হয়তো টাওয়াল ব্যালকনিতে মেলে দিয়ে তার পেছন পেছন আসবে।কিন্তু না।কবির খাবার টেবিলে গিয়েও কতক্ষণ বসে রইলো।কালাম খান কবির কে বকাঝকা করতে লাগলো।সে কেনো সাথে করে তিন্নি কে নিয়ে এলো না?
কবির বাবা-র দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফের রুমের উদ্দেশ্য হাঁটা ধরলো।রুমে এসে কবির অবাক হলো।তিন্নি বিছানায় মাথা চেপে ধরে বসে আছে।এই প্রথম তিন্নি রাতে খাবার দিয়ে রুমে চলে এসছে। আজ পাঁচ মাসে এর আগে কখনো এমন হয় নি।হঠাৎ হলো কি মেয়ে টার?
কবির এগিয়ে গেলো। তিন্নির কাঁধে আলগোছে হাত রেখে ভ্রু উঁচিয়ে জিগ্যেস করলো,
-“কি ব্যাপার খাবার কেনো খেতে আসো নি?
চলো খাবে?”
-“খেতে ইচ্ছে করে না।
আপনি আর বাবা খেয়ে আসুন।আমি শুয়ে পড়ছি।ভালো লাগছে না।”
কণ্ঠ কেমন ক্লান্ত। কবির বেশ কিছু দিন হয় তিন্নির কে ডক্টর এর কাছে যাওয়ার জন্য ঘ্যানঘ্যান করছে।কারণ অনেক গুলো তিন্নি খাবার খেতে পারে না।চোখের নিচে কালশিটে দাগ বসেছে। মাঝে মধ্যে তো হঠাৎই রেগে যায়।
কবির ফিরে গেলো।কালাম খান কে খাবার খেতে বলে নিজেও খেলো।কালাম খান আর কোনো কিছু জিগ্যেস করলো না।কবির আসার সময় খাবার নিয়ে রুমে এলো।কাজের লোক কে সব গুছিয়ে রেখে আসার কথা বলে এলো।
বেশ জোর করেই কিছু টা খাবার খাইয়ে দিলো তিন্নিকে কবির।তিন্নি খাবার খেয়ে পানি খেয়ে শুয়ে পড়লো।কিছু সময় ব্যবধানে ঘুমিয়েও পড়লো।কবির ঘুমন্ত তিন্নির মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
আমার তুমি সিজন ২ পর্ব ২৮
-“আমার সুখ তুমি।
তুমি অসুস্থ মানে আমার সুখ নামক অস্তিত্ব দুঃখে পরিণত হয়।কালই ডক্টর এর কাছে যাব তোমায় নিয়ে সোনা।”
