আমার বোবাফুল পর্ব ৪২
তৃপ্তি এহসান নাওরা
বর্ণ বলল গম্ভীর গলায়, ‘ আপনার জন্য দুটো নিউজ।একটা গুড, অন্যটা ব্যাড।’
মৃদু হাসি ছিটকে আসে স্বর থেকে, ‘হুইছ ওয়ান উ্যুড ইউ্যু লাইক টু হেয়ার ফার্ট মিসেস হায়দার?’
বুকেটা এগিয়ে দিল নিজ উদ্যোগে।সামিয়া বাকশূণ্য চোখে তাকালো ফুলের তোড়ায়।পরে অনুকে ইশারা দেয় আসফিয়ান বর্ণ’র হাত থেকে সেটা নিতে।
গনমাধ্যমে ছড়িয়ে আছে মিশ্মির উধাও হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা। মুশফিক হায়দার চারপাশের পজেটিভ, নেগেটিভ মন্তব্য এড়াতে এবং মেয়েকে খুঁজে পেতে মাশ্মির রেখে যাওয়া চিরকুট সহ, আরো অনেক তথ্য শেয়ার করেছেন।আরো একটি বিষয় জানা গেছে –নিখোঁজ হওয়ার দু’তিন দিনেও এদেশ থেকে বহিরাদেশে পাড়ি দেওয়া যাত্রীদের মাঝে মিশ্মির নাম কিংবা ছবির সাথে কারো ম্যাচ পড়েনি। অতএব, ধারনা করা হয় সে এখনো দেশেই আছে।এমনও হতে পারে –মিশ্মি নিজের আদল বদলে এতোক্ষণে অন্যদেশে চলেও গেছে।এতো ছলচাতুরি?এতো অভিনয়?এতে তার লাভটা কোথায়?কী চায় সে?
বর্ণ সহানুভূতি দেখাতে ইতোপূর্বে আরো দু’বার এসেছে এবাড়ি। মুশফিক হায়দারকে বলেছে খুব অমায়িক স্বরে,
‘ আমরা আমরাই তো।তার করা সেদিনের অন্যায় ক্ষমা করে দিয়েছি।চাইলে ওকে খুঁজে পেতে আপনাদের সাহায্য করতে পারি। নিজের ছেলে মনে করে ভরসা রাখতে পারেন।’
কথার সুরে তাচ্ছিল্য মিশ্রণ ছিল।যা বুঝার ক্ষমতা মুশফিক হায়দারের ছিল না তখন।বাবা হায়দার একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন যে!সাধ্যমত সর্ব ক্ষমতা প্রয়োগ করেও মেয়েকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়ে তিনি বর্ণকে একবার বিশ্বাস করতে চাইলেন।__
সামিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বর্ণ’র মুখে গুড নিউজ মানে নিশ্চয়ই মিশ্মির কোন খোঁজ নিয়ে এসেছে। তিনি নড়েচড়ে বসে কৌতুহলী হয়ে বললেন,
‘ গুড নিউজটা আগে শুনি!মিশ্মিকে পেয়েছো ?’
বর্ণ ভ্রু তুলে সেকেন্ড কয়েক একনাগাড়ে চেয়ে রইলো স্থির।যে চাহনিতে যেকেউ বিব্রতবোধ করবে।সামিয়াও করল অল্পবিস্তর। ঠোঁটে ঠোঁট গুঁজে বর্ণ মাথা নেড়ে শুধু বলে,
‘ হুম!’
দরদী মায়ের মন যেনো প্রফুল্লে নেচে দুলে উঠলো আচমকা।
‘ কোথায় ও?’
তৎক্ষণাৎ উঠে গিয়ে ছুটলো দোরের দিকে।হুট করে বর্ণ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মহিলা ব্যাড নিউজ না শুনেই ছুটছে?ব্যাড ম্যানার।সে বলল পিছু থেকেই,
‘ ফরচুন হেল্থকেয়ার’স ট্রমা এন্ড বার্ন সেন্টার!’
পথিমধ্যেই থমকে যায় ভদ্রমহিলার পদচারণা। ‘বার্ণ সেন্টার?’! ওখানে তো পোড়া রুগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।তবে কী মিশ্মি..
‘ ও_ওখানে কী?’
বর্ণ গা ঝেড়ে পা চালিয়ে এগিয়ে আসে। নিকটে এসে বলল ধীর গলায়,
‘ মিমিহ!মেইবি আপনাদেরই মেয়ে। ফর ইউ্যুর কাইন্ড ইনফর্মেশন -চেহারা দেখে চিনবেন না। ডিএনএ টেস্ট প্রয়োজন হতে পারে।যদিও আধপোড়া আই. কার্ডে আপনাদের মেয়ের ডিটেইলস-ই দেওয়া।’
‘ ফুপ্পিই..’
পা দুলে পড়ে যেতে নিলে অনু দুহাতে জাপটে ধরে সামিয়াকে। শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে দু’জনেই মেঝেতে বসে পড়ে। গড়গড়িয়ে চোখ অশ্রু ঝরে। হুঁ হুঁ ডুকরে উঠে অস্ফুট স্বরে কী যেন বলছে সামিয়া।
সুখের র-ক্তাক্ত নিথর দেহের সংবাদে বোধহয় এমনি নেতিয়ে পড়ে আর্তনাদ করেছিল রুবাইয়্যাত। বর্ণ’র সঠিক মনে পড়ে না। সেদিকে খেয়ালই দিতে পারেনি তখন।তার সম্পূর্ণ ধ্যান জ্ঞান ফুলেতেই নিবদ্ধ ছিল কিছু মূহূর্তের জন্য।
বর্ণ’র দেয়া হসপিটালে মুশফিক সাহেব এবং তার স্ত্রী ছুটে গেলেন হন্তদন্ত।গলা থেকে পায়ের নখ অবধি প্লাস্টেড; মাথা ও মুখের চারপাশও।বন্ধ চোখ। মুখশ্রীতে থকথকে ঘা। কাছে ঘেঁষতেই বাজে একটা বিদঘুটে গন্ধ নাকে এসে ঠেকে। দেহটিতে কেবল নড়বড়ে প্রাণটাই জড়িয়ে আছে কোনরকম। ডক্টরের ভাষ্যমতে— বিগত এক মাস আগে বেওয়ারিশ পুড়া দেহটা হসপিটালে কেউ একজন এনে দিয়ে গেছে। উক্ত ব্যক্তির হদিস পাওয়া যায়নি দ্বিতীয় বার।তবে দেহটি তিনি কোথায় পেয়েছে তার ঠিকানা দিয়েছেন।একটা আধপুড়া পার্স গছিয়ে দিয়ে আরও বলেছে— দেহটির যে গাড়িতে ছিল তার পাশেই পার্সটি পাওয়া গিয়েছে। এরচেয়ে বেশি তথ্য জানা যায়নি। ব্যাক্তিটি দ্বিতীয় বার আসবেন বলে আশ্বস্ত করে পুণরায় আর দেখা দেয়নি।
ডক্টর এও জানিয়ে দিলেন— ‘আসফিয়ান বর্ণ গত সপ্তাহে হঠাৎ এসে দেহটি পরিচিত বলে শনাক্ত করেছেন। এবং উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন।’
অধিকাংশ পুড়ে গলে যাওয়া পার্সে থাকা আই. কার্ডে মিশ্মির ছবি দেখেই অবিশ্বাস্য আতঙ্কে থরথর কাঁপতে লাগে সামিয়া।নামগুলোর অর্ধেক দেখা যাচ্ছে না।তবে শুরুর দুয়েক অক্ষর অভিভাবকের নামের সাথেও মিলে যাচ্ছে। দরদর ঘাম বেয়ে ঝরে কপাল ঘেঁষে।একসময় চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ে সামিয়া।অনু উনাকে সামলানোর চেষ্টা করে। মুশফিক হায়দার তখন বাকশূণ্য। চোখের সামনে বোধহয় ভেসে উঠে হাস্যোজ্জ্বল মিশ্মির মুখশ্রী।
ইংলিশ, বাংলা বাদে বর্ণ’র আরো বৈদেশিক পাঁচটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন ছিল। এখন তা ছয়’য়ে রূপান্তর হয়েছে।আর লিস্টের ছয় নম্বর ভাষার নাম হলো –সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ উইথ লিপ রিডিং।গত সাতটি মাস ধরে এই ভাষার কোর্স করে এসেছে।বোবাফুলের চোখে চোখ রাখতেই যেনো তার অনুভূতি শূন্য হৃদয়ে অনুভূতির সঞ্চার ঘটে।ওই আঁখিদ্বয়ের নিশ্চুপ ভাষা মূহুর্তেই যেনো আয়ত্ত করে নিতে পারে। মূলত, তাই এতো আয়োজন।
সুখ এখন সুস্থ। হাঁটতে পারে, চলতে পারে।তবে আগের মতো চঞ্চল নয়।মনবিভাগে আবেগ নিষ্ক্রিয়; শক্তপোক্ত খোলসে আবদ্ধ।হাসে যেনো মেপে মেপে।সবসময় গম্ভীর হয়ে বসে থাকে।
অতিবাহিত হওয়া মাঝের দিনগুলোতে একটি যুদ্ধ সম্পন্ন করেছে সুখ। এইসএসসি এক্সামে অংশগ্রহণ করেছে।তামিজ সাহেব যদিও মেয়ের অসুস্থতার কথা মাথায় রেখে পরিক্ষায় না বসার পরামর্শ দিয়েছিলেন।তবে, সুখ মানলো না। হুইলচেয়ারে করেই কেন্দ্রে পৌঁছেছে। এখনো পরিক্ষার ফলাফল প্রকাশ পায়নি।
সকাল আটটা বেজে পঁয়ত্রিশ। সবুজ গাছপালার বহুগুণ উর্ধ্বে নীল আঁচল ঢালানো বিস্তৃত আকাশ।প্রকৃতিতে হালকা-পাতলা শীত শীত আবহ। শ্যামল গার্ডেনে মিঠা মিঠা রুদ্র তাপ এসে হামলে পড়ে এইসময়। ঘরকুনো স্বভাবের সুখকে টেনেটুনে বেরিয়ে এলো তুহফা।মিঠা মিঠা রোদ্দুর গায়ে মাখালে আরাম লাগবে।তুহফার হাতে মুড়ি মাখা বাটি।বড় বাটিতে মোট ছয়টা চামচ। অর্থাৎ,সকলে একবাটি থেকেই মিলেমিশে পেটে পুরবে। আরো দুজন সদস্য উপস্থিত আছে এখানে। তাদের একজন ফাহা,সুখের বেস্ট ফ্রেন্ড বলা যায়। অন্যজন নূরার ছোট খালা মণির মেয়ে রুস্মিতা।চার দিন হলো এসেছে।
হাত দিয়ে মুখে বাতাস করতে করতে ফাহা বলল হু হা করে ,
‘ হায়-ই মালিক!কতো ঝাল! বানিয়েছে কোন বান্দা?সুখ নাকি?’
তুহফা আড়চোখে আনমনে চুপসে থাকা সুখকে পরখ করে অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
‘ তুমি কীভাবে জানলে ফাহা?আ’ম ইমপ্রেসড টু ইউ্যু!’
‘ জাস্ট গেস করলাম আপু।বাট ট্রাস্ট মি, সুখ নাড়ি ভুঁড়িতে গিয়ে এ্যাটাক করা ঝাল দিয়ে এতো বাজে মুড়ি মাখা বানায় আন্দাজ করতেও পারিনি।হেই সুখী, বেগুন বেঁচে লোকসান খেয়েছিস মতো মুখ করে আছিস কেনো।মন খারাপ করিস না।আমরা কিছু মনে করিনি।’
সুখ হতভম্ব। স্তব্ধ প্রায়।বোকার মতো কথোপকথনে লিপ্ত দুজন মানবীকে পিটপিট চোখে দেখে বলল ইশারায় হাত নেড়ে,
‘ আমি কখন বানালাম?ওসব ছুঁইও নি এখনো!’
রুস্মিতা ডান হাতের সহায়তায় একধ্যানে পায়ে নেইলপলিশ লাগিয়ে, সময় সময় বাঁ হাতে চামচের আঘাতে মুড়ি মাখা মুখে দিচ্ছিল।সুখ ভেতরে ভেতরে নাক কুঁচকায়। বাঁ হাতে খাওয়া দাওয়া তার মোটেও পছন্দ নয়।
দু’জনের উদ্দেশ্যকে সফল করে দিতে খাবে না বলে চুপটি করে বসা সুখ মুড়ি মাখা গালে নিলো। দাঁতের নিচে পিষ্ট করে ঢোক গিলে দু’জনের দিকে চাইলো সন্দিহান চোখে।ঝাল তো স্বাভাবিকই আছে। স্বাধও ভালো।আরো এক চামচ নিলো।
তুহফা বলল হেসে,
‘ দেখেছিস কেমন টেস্টি?খাবি না বলে গো ধরে থাকলে মিস করে যেতিস আজ। ’
সুখ প্রলম্বিত শ্বাস ছাড়ে।মনে মনে আনন্দিত হলো কী না কে জানে। সকলে তাকে সন্তুষ্ট করতে যেনো উঠে পড়ে লেগেছে।নূরা বাচ্চাটা তো কোলে বসে মুখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক নাগাড়ে বলতে থাকে,
‘ হাসোতো সুখ।আমি গুনে রেখেছি তুমি অনেকদিন হাসো না। ইউ্যু নো হোয়াট ডিম্পল কুইন হাসলে তোমায় কতো প্রিটি দেখায়?’
না হেসে তখন গম্ভীর থাকা যায় না সুখের। বাড়ির প্রতিটি সদস্যই তাকে সবসময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টায় নিয়োজিত। এমনকি হানিফা বেগমও বাদ পড়েননা। সুখকে কাছে ডেকে খুব আদর করে বলেন,
‘ নাতনি এদিকে আয়। চুলগুলো তো শুকায়া বাঁশ পাতার মতো হয়ে গেছে।আমি তেল দিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে আঁচড়ে দেই!’
সুখের ঝরঝরে চুল এখন পিঠ চড়ে বেড়ায়। কিন্তু আগের মতো এখানে দৈর্ঘ্য হয়নি।
জিম করে ফিরছে বর্ণ।গায়ে হাতাকাটা শুভ্র গেঞ্জি। ঘামে ভিজে জবজবে। তোয়ালে ঘাড় মুছতে মুছতে পুলের সামনে এসে গার্ডেনে চোখ পড়তেই নজর স্থির।ফুলকে দেখা যাচ্ছে।বর্ণ আজকাল ভাবে— ফুল নামটা খুব শীঘ্রই চেঞ্জ করতে হবে। মেয়েটা এখন ফুলের মতো কোমল নেই,তবে স্নিগ্ধ।সদ্য ফোঁটা পুষ্পের মতো আদলখানি কোমল। কিন্তু চরিত্রটা ফুলের সাথে যাচ্ছে না। বর্ণ’র চেয়ে এককাঠি উপরে গিয়ে তার চেয়েও নিষ্ঠুরনী হচ্ছে দিনকে দিন।বাড়ির প্রত্যেকের সাথে তার ভীষণ ভাব অথচ বর্ণ’কে দেখা মাত্রই ভয়ার্ত মুখে কার আঁচলে আশ্রয় নেবে কুল কিনারা পায়না। ছলনাময়ী, অসভ্য।
‘ কী হচ্ছে এখানে?’
রুস্মিতার আবার বর্ণ’র ডাই হার্ড ফ্যান। মেয়েটা চকচকে চোখে জবাব করে,
‘ সুখ মুড়ি মাখা বানিয়েছে আর আমরা এনজয় করছি।তুমিও এসো ভাইয়া টেস্ট করে দেখো!’
মেয়েটা আসলে জানেই না কে বানিয়েছে। বেখেয়ালে তুহফার কথাটাই মনে গেঁথে গেছে।বর্ণ সজোরে উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে এগিয়ে এলো।সুখ বানিয়েছে যখন টেস্ট তো করতেই হয়।
সুখের পাশের খালি চেয়ারে বেহায়ার মতো ধফ করে বসলো বর্ণ। পারফিউমের কড়া ঘ্রাণ মৌ মৌ করছে।রুস্মিতা গালে হাত দিয়ে চেয়ে রয়।ভাইয়াটা কতো হ্যান্ডসাম।এমন একটা জীবন সঙ্গী পেলে লাইফ পরিপূর্ণ।তবে ভাইয়ার কাছে গিয়ে এসব বলার কলিজা নেই। বছর খানেক আগে যেই দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া থাপ্পড়টা খেয়েছিল এখনো রোজ মনে পড়ে দুবার করে।
বর্ণ মনে করে –মুড়িমাখা, ফুচকা, আইসক্রিম, চকলেট এসব মেয়েদের সম্পদ।এসব কখনো সে মুখে তুলেছে কী না সন্দেহ।আজ মুখে দিলো।বাটিতে এক্সট্রা চামচ থাকার পরেও সুখের হাতের চামচ খানা নির্বিকার ভঙ্গিতে কেড়ে নিয়ে একবার মুখে দিয়েই চোখ কুঁচকে নিলো,
‘ এটা কোন খাবার হলো?না লবণের ঠিক আছে,না মরিচ।না আছে সরষের ঘ্রাণ, না আছে..
সুখকে ক্ষ্যাপানোর উদ্দেশ্য বিরক্তি ঝেড়ে যাচ্ছে তাই বলে গেল বর্ণ। এদিকে তুহফা বেচারির মনক্ষুণ্ণে চোখ চিনচিন করে উঠে। ইউটিউব দেখে ঘন্টা খানেক সময় ব্যয় করে মুড়ি মাখা বানানোর এমন জঘন্য রিভিউ?
‘ ভ্ _ভাইয়া?’
‘ কী’। বড্ড বিরক্ত দেখালো বর্ণ’কে।তুহফা নিচু গলায় বলল চোখ নামিয়ে,
‘ এটা আমি বানিয়েছি।এই প্রথম!’
ভ্রু গুটিয়ে বর্ণ ফট করে চোখ তুললো। আড়চোখে সুখকে দেখে বুঝলো মেয়েটা দাঁত চেপে শক্ত চোখে তার দিকেই চেয়ে। অথচ মিরাকল ঘটবে তখন –যখন বর্ণ সরাসরি তার চোখে চোখ রাখবে, আর ওমনিই মেয়েটার মনে দুনিয়ার শঙ্কা জেঁকে বসবে। এবং আঁতকে উঠে নিজেকে গুটিয়ে নেবে।ধরতে হবে আজ শক্তপোক্ত হাতে।
‘ ওওহ..’
ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলে পুণরায় সুখের হাতে জোরপূর্বক চামচ ঠেসে দিলো।সুখ হাত স্থির করে রেখেছে।নিতে চাইছিল না।
বর্ণ’র ছোট্ট দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনে নূরার মতো তুহফারও বলতে ইচ্ছে হলো,
‘ শুধু ওওহ কেনো?এতো মজাদার হওয়ার পরো এমন বাজে রিভিউ? আমার জিনিস এখনি আমায় ফেরত দাও!’
বর্ণ চলে গেলো ঠিকই তবে বোনেদের মনে উল্লাস গেঁথে দিলো একরাশ।আজ সকলকে একজায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাবে বলেছে সে।
সুখ যাবে না যাবে না বললেও রুস্মিতা কিংবা তুহফা মানল না,মানবে না।কারণ বর্ণ বলে দিয়েছে,
‘ ভাই বোনের মধ্যে কেউ যদি বাদ পড়ে যায়, তবে ঘুরতে যাওয়া ক্যান্সেল!’
এমন অফার ক্যান্সেল করতে দেয়া যায়? বাড়ি থেকে চেঁচামেচি ভেসে আসছে। বেশিরভাগ আওয়াজ রাজবীরের।রাজভীর হলো রুশ্মিতার ছোট ভাই। অভ্র’র পিঠাপিঠি।মেয়েরা সব ছুটে গেলো দ্রুত কদমে।
নূরা দুহাতে বীরের মাথার চুল খামচে ধরে কাপড় কাচার মতো ঝাঁকিয়ে চলছে। দাঁতে দাঁত চেপে কী যেনো বলছে।বীরটা মেকি ব্যাথাতুর মুখশ্রীতে ‘খালামণিকে’ ডাকছে!
আইজা রান্নাঘর থেকে ছুঁটে এলেন,
‘ নূরা ছাড়ো ওকে!কী করছো ব্যথা পাচ্ছে ভাইয়া!’
‘ আদর করছি না আমি!’
ফোনে চোখ রেখে অভ্র বললো,
‘ কারো কথা কানে তুলিস না পাকনি। এভাবে ওর চুলে ঝুলে থাক।’
মায়ের ধমকে অভ্র চুপ হয়ে গেলেও নূরা বীরের চুল ঝাঁকাতেই আছে। কিন্তু বীর ছাড়া পাওয়ার কোন চেষ্টাই করছে না।আইজা দ্রুত এগিয়ে গেলেন,
‘ নূরা ছাড়তে বলেছি আমি।মার খাওনি এখনো..
‘ আজ ওর চুল সব ছিঁড়ে কাকের বাসা বানাবো।’
‘ কী অপরাধ ওর?’
রুস্মিতা জানতে চাইলো।নূরা উত্তর দেয় ক্ষিপ্র মেজাজে,
‘ ও আমার চোখে চোখ রেখে বলেছে আমি নাকি দেখতে বনো বিড়ালীনির মতো। যখন তখন মানুষ খামচে দিই।খোলা পৃথিবীতে ছেড়ে দেওয়া মানুষের জন্য বিপদজনক তাই চিড়িয়াখানায় রেখে আসা উচিত!’
একযোগে হুঁ হুঁ হাসির কয়েকটি সমন্বিত স্বর কর্ণকৌঠরে পৌঁছাতেই হাত স্থির হলো তার।চোখ ঘুরিয়ে দেখলো সকলেই হাসছে।কেউ শব্দ করে, কেউ ঠোঁট টিপে। মনে হলো সবাই তাকে হেয় করে অপমানিত করছে।দুঃখে, অপমানে জর্জরিত হয়ে সইতে না পেরে আচমকা ভ্যাঁ ভ্যাঁ কেঁদে উঠে সোফা থেকে ঝটপট ফ্লোরে নেমে হাত-পা ছুঁড়ে কান্না লাগিয়ে দিলো মেয়েটা।
আমার বোবাফুল পর্ব ৪১
‘ কেউ ভালোবেসে না আমায়!’
পরবর্তীতে কারো সান্ত্বনা গ্রহণযোগ্যতা পেলো না নূরার কাছে।
‘ হচ্ছে কী এখানে?নূর ফ্লোরে বসে কাঁদছে কেনো?’
আইজাকে বলল কেউ।হাতের উল্টো পিঠে নূরা চোখ মুছে সেদিকে চেয়ে ঠোঁট উল্টে পুণরায় কেঁদে উঠলো, ‘ বর্ণ।ও আমার চুল টেনে মেরেছে আর বাকি সবাই মজা লুপেছে ’
