আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৪
DRM Shohag
অরুণের কথা শুনে জেডি ডানদিকে ফিরে অরুণের দিকে তাকায়। জেলি শব্দটা মারাত্মক অদ্ভুদ লাগলো তার কাছে। তাই বলে তার নামটাকে একেবারে জেলি বানিয়ে দিবে? চোখমুখ কুঁচকে আওড়ায়, “জেলি?”
অরুণ হাসল। জেডির পাশ থেকে আকাশ আর জেডির সামনে এসে দাঁড়ালো। জেডি চোখ ছোট ছোট করে বলে, “বাচ্চাটা তোর সাথে থাকে তাইনা?”
অরুণ হেসে বলে,
“অবশ্যই। আমি ওর বাবা…..
কথাটা বলে পাশে উঁকি দিলে দেখল আকাশ তার দিকে তাকিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে চোখদুটোয় রা’গের আভা। অরুণের চোখ ছোট ছোট হয়ে আসে। মাথা চুলকালো ছেলেটা। কিছুই তো মানে না আকাশ। সেই রেশ ধরে পুরো দু’টো বছর বাংলাদেশে পা রাখল না। কিন্তু রা’গের সময় ১৬ আনা রা’গে। আজব পাবলিক। অরুণ দৃষ্টি ফিরিয়ে জেডির দিকে চেয়ে বলে,
মানে আমি সৃজনের দুই নাম্বার মামা বুঝলি? বাচ্চাটা আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। কি ভালো আমার বাচ্চা…মানে ভাগ্নে টা!”
কথাটা বলে আকাশের দিকে তাকালে মনে হল, আকাশ স্বাভাবিক-ই আছে। অরুণ স্বস্তি পেল। জেডি অরুণের দিকে এগিয়ে এসে কটমট চোখে চেয়ে বলে,
“তুই ইচ্ছে করে ওকে আমার নাম জেলি শিখিয়েছিস তাইনা?”
অরুণ বা হাত এগিয়ে দিয়ে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“বুঝলাম তুই জ্যোতিষি। হাতটা দেখে বলে দে, আমার…..
জেডি বাঁকা হেসে বলে,
“হাত দেখতে হয় না আমার। নেক্সট উইকে তুই অনামিকাকে বিয়ে করার জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবি। লাইক পা’গলা কু’ত্তা।”
জেডির মুখে হঠাৎ অনামিকা নাম শুনে অরুণের মুখ থমথমে হয়ে যায়। অবাক হলো না। কারণ তাদের ফ্রেন্ড আনিকার সাথে তার যেগাযোগ না থাকলেও আকাশ আর জেডির সাথে যে যোগাযোগ আছে এটা অরুণ জানে। কিন্তু অবাক হয় জেডির বলা কথা শুনে। সে কেন অনামিকার পিছনে ঘুরতে যাবে? গত দুই বছরের বেশি যাকে চোখেই দেখল না, তার পিছনে নতুন করে ঘুরবে কেন? অরুণ উত্তর করে,
“আমার রুচি আগের চেয়ে ভালো। বিবাহিত নারীদের দিকে তাকাই না।”
জেডি শব্দ করে হাসে। অরুণ বিরক্ত হয়। নিজেকে সামলে নেয় দ্রুত। হেসে বলে,
“শোন, সৃজনের জেলি খুব পছন্দের খাবার বুঝলি? মাঝে মাঝে ওকে তোর কাছে পাঠিয়ে দিলে তুই জামা-কাপড় খুলে নিজেকে সার্ভ করিস ওর সামনে। বেস্ট অফ লাক!”
জেডি অদ্ভুদভাবে আওড়ায়, “হোয়াট?”
অরুণ হাসল। জেডির দিকে মুখ এগিয়ে আনতে আনতে বলে,
“আয়, ভাগ্নের আগে আমি টেস্ট করে দেখি তো জেলির গোডাউন টার স্বাদ কেমন!”
জেডি হেসে নিজেও অরুণের দিকে এগোয়। অরুণ এটা দেখে দ্রুত দু’পা পেছায়। কোমরে হাত রেখে বলে,
“ছিহ! আগে তোর শুধু আকাশের দিকে নজর ছিল! এখন আমার দিকেও? ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ! মানুষের উন্নতি হয়, আর তোর অবনতি? ছিহ!”
জেডি রে’গে তাকায় অরুণের দিকে। আকাশ ফোনে কোনো ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করছিল, অরুণের এতো জোরে কথা বলায় অ’সহ্যরকম বিরক্তি নিয়ে মাথা উঁচু করে তাকায়। কিছু বলার আগেই
অরুণ এগিয়ে এসে আকাশের মুখ থেকে মাস্ক খুলে নেয়ার জন্য ডান হাত বাড়ালে আকাশ বিরক্ত হয়ে অরুণের হাত ঝাড়া মে’রে সরিয়ে দেয়। রে’গে বলে, “কি প্রবলেম?”
অরুণ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“নতুন বউয়ের মতো মুখ ঢেকে আছিস কেন? অনেকদিন দেখিনা। বন্ধুকে মুখটা দেখিয়ে ধন্য হ।”
আকাশ আবারো ফোনে মগ্ন হয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“তোকে মুখ দেখানোর জন্য দেশে ফিরিনি আমি।”
অরুণ অবাক হয়ে বলে,
“তো, কাকে মুখ দেখানোর জন্য ফিরলি? বউকে তো মা….
এটুকু বলে থেমে যায় অরুণ। আকাশ রে’গে তাকিয়েছে বেচারার দিকে। অরুণ ঢোক গিলল। এই শা’লা স্মৃতি হারিয়ে বউ মানেনা। তাদের সত্যি শুনলে তো এ শুধু রে’গেই যায়। তাই আর এই বাক্য শেষ করল না। অতঃপর সে মেকি হেসে বলে,
না মানে, ভেরি স্যরি! আমি বলতে চাইছিলাম, তুই চরম সিঙ্গেল। তোর বউ থাকতেই পারেনা আর বাচ্চা তো বিলাসিতা!”
কথাগুলো বলে অরুণ মনে মনে বিড়বিড় করে, তোর কপালে বহুত দুঃখ আছে রে আকাশ!”
এখনো আকাশকে নিজের দিকে রে’গে তাকিয়ে থাকতে দেখে অরুণ অসহায় চোখে তাকায়। রা’গলে এর সোনালি চোখগুলো কেমন ঝিলিক দেয় দেখ। অরুণ আকাশের উদ্দেশ্যে হতাশ কণ্ঠে বলে,
“ভাইরে একটু কম করে রা’গিস। আগের মতো তো লেন্স পরিস না। রে’গে তাকালে মনে হয়, আমার সামনে সত্যিকারের নাগিন দাঁড়িয়ে আছে।”
আকাশ কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়, দূরে মাঠের মাঝে গোল হয়ে বসা সন্ধ্যাদের দিকে চেয়ে। অরুণের উপর যা রে’গেছিল তার কয়েকশগুণ বেড়ে গেল বোধয়। কারণটা অবশ্য সন্ধ্যার সব ফ্রেন্ডসার্কেলের মাঝে দু’টো ছেলে অর্থাৎ সাইফ আর জাবিরকে নিয়ে। আকাশ আর এখানে দাঁড়ালো না। অরুণকে পাশ কাটিয়ে ভিসির অফিসের দিকে এগিয়ে যায়। ডানদিকে ঘাড় বাঁকিয়ে আরেকবার দেখল সন্ধ্যাদের। পায়ের গতি বাড়ালো।
অরুণ আকাশকে যেতে দেখে স্বস্তি পেল। জেডির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তোদের মাঝে কি সব ঠিক হয়ে গেছে?”
জেডি থমথমে কণ্ঠে বলে,
“আমার সাথে এভির সব ঠিক হলে তো তোর আর তোর সো কল্ড আন্টির সাথে এভির মাঝে ঝামেলা চলত ডেয়ার।”
অরুণ হেসে জেডির কাঁধে হাত রেখে বলে, “সত্যি বলতে তুই মানুষটা খারাপ না। কিন্তু আমার তোকে যাস্ট অ’সহ্য লাগে।”
জেডি অরুণের দিকে বেশ কয়েক সেকেন্ড দৃষ্টি রেখে বলে,
“বিশ্বাসঘাতকের লিস্টে তোর আগে কেউ যেতে পারবে না।”
অরুণ জেডির কথা শুনে শব্দ করে হাসে। হাসতে হাসতে বলে,
“তোর সাথে আমি একমত।”
জেডি কেমন করে যেন তাকায় অরুণের দিকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে টপিক পাল্টে হেসে বলে,
“এভির ক্যারেক্টার একেবারে লুজ হয়ে গিয়েছে বুঝলি অরুণ? বিয়াত্তা মেয়েদের দিকে নজর দেয়। ওকে দ্রুত বিয়ে দিতে হবে। মেয়ে খোঁজ।”
কথাটা বলে সে অরুণের পাশ কটিয়ে ভিসির রুমের দিকে যায়। যেতে যেতে বলে, “তোদের বলা বানোয়াট গল্পের নায়িকা এক বাচ্চার মাকে যেন আনিস না আবার। এভি ওর চেয়ে বেটার কাউকে ডিজার্ভ করে।”
অরুণ অবাক হলো। নায়িকা বলতে জেডি সন্ধ্যাকে বুঝিয়েছে এটা বুঝেছে। কিন্তু আকাশ বিয়াত্তা মেয়েদের দিকে নজর দেয় মানে? ইংল্যান্ডে কোনো বিবাহিত মেয়েকে পছন্দ করে ফেলেছে নাকি আকাশ? কিন্তু এটা তো অসম্ভব। যেই পোলা সিঙ্গেল মেয়েদের দিকেই তাকায় না। সে বিবাহিত মেয়েদের দিকে তাকাবে? অরুণ মাথা চুলকালো। এই জেলিটা তাকে টেনশনে ফেলার জন্য নিশ্চয়ই ভুলভাল বলে গেল। কিন্তু সন্ধ্যাকে নিয়ে এভাবে বলায় অরুণের রা’গ হলো। সাথে আফসোসও হলো। ইশ! আকাশের সব মনে থাকলে, ওর সন্ধ্যামালতীকে নিয়ে কেউ এভাবে বলছে শুনলে আকাশ কত না রিয়েক্ট করত! অরুণ এসব চিন্তা বাদ রেখে সন্ধ্যাদের দিকে যেতে গিয়েও গেল না। আবার যখন ক্লাস থাকবে তখন আসবে, তাহলে সন্ধ্যা আর রা’গ’বে না। এখন গেলে চারটে কথা শোনাবে তাকে। তাই অরুণ সন্ধ্যাদের উল্টোদিকে পথ ধরল।
সন্ধ্যাকে শান্ত দেখে বুঝল ও এখনো আকাশকে দেখেনি। নয়তো সন্ধ্যা এতো রিল্যাক্স থাকতো না। দেখা যাক এদের কি হয়!
সে আর আসমানী নওয়ান কিছুক্ষণ আগে আকাশের বাংলাদেশে আসার খবর জানতে পেরে আসমানী নওয়ান আকাশকে কল করলে আকাশ জানিয়েছে, ‘তার কিছু কাজ আছে। আজ সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরবে।’
ভার্সিটির মাঠে বসে সন্ধ্যারা পাঁচ বন্ধু মিলে খিচুড়ি খেয়েছে। যদিও সন্ধ্যা লামিয়ার হাত থেকে শুধু দু’বার মুখে নিয়েছিল সকলে অনেক জোর করায়। তার নাকি খেতে ইচ্ছে করছিল না। কোনো কারণে সন্ধ্যা আপসেট এটা সবাই বুঝলেও জিজ্ঞেস করেনি। বলবেনা এই মেয়ে। মারাত্মক চাপা স্বভাবের।
খাবার শেষে সন্ধ্যাসহ তার ফ্রেন্ডরা একটা শপের উদ্দেশ্যে বের হয়। কারণ সন্ধ্যার পায়ে জুতো নেই। এখন জুতো না কিনলে ভার্সিটির পরবর্তী ক্লাসগুলো খালি পায়ে করতে হবে। তাছাড়া ক্লাসের মাঝে গ্যাপ আছে। এজন্য সবাই বেরিয়েছে ভার্সিটি থেকে। লামিয়ার স্কুটিতে লামিয়া আসছে। জাবির আর সাইফ জাবিরের বাইকে, সাথে সৃজন। মায়ের সাথে স্কুটি করে ঘোরাফেরায় পছন্দ হলেও বাইক সৃজনের বেশি পছন্দের। সৃজনের এই অভ্যাসটা অবশ্য জাবির-ই করিয়েছে। সে সুযোগ পেলেই সৃজনকে নিয়ে এদিক-ওদিক চক্কর দিয়ে নিয়ে আসে।
সন্ধ্যা আর সাফা সন্ধ্যার স্কুটিতে। সাফা লামিয়ার স্কুটিতে কখনো ওঠেনা। উঠলে সবসময় সন্ধ্যার স্কুটিতেই ওঠে। ওর মতে, লামিয়া স্কুটি চালাতে পারেনা। ভ’য় পায় সে লামিয়ার স্কুটিতে উঠতে৷ মূলত লামিয়া জোরে চালায় সাথে হঠাৎ এদিক থেকে ওদিক নেয়। কিন্তু সন্ধ্যা সৃজনকে নিয়ে সবসময় সাবধানে চালায়। গতিও কম থাকে। আর সাফা-ও স্বস্তি পায় সন্ধ্যার স্কুটিতে উঠে।
শপের সামনে এসে সন্ধ্যা স্কুটি সাইড করে। এরপর দু’ই বান্ধবী নেমে পড়ে স্কুটি থেকে। লামিয়া, জাবিরদের বাইক আর স্কুটি সাইড করা দেখে বুঝল ওরা তাদের আগেই এসে পৌঁছেছে।
সন্ধ্যা সাফার হাত ধরে ভেতরে যেতে নিলে সাফা সন্ধ্যার হাত টেনে ধরে। সন্ধ্যা ভ্রু কুঁচকে বলে, “কিছু বলবি?”
সাফা জিজ্ঞেস করে,
“ওভাবে ব্যাটিং করলি কিভাবে? তোকে চিনতে পারছিলাম না।”
সন্ধ্যা মৃদু হেসে বলে,
“এটা এমন কিছু নয়। ছোটবেলায় আমার দুইটা ভাইয়া আমাকে নিয়ে ক্রিকেট খেলত। ভালোই লাগতো আমার। এরপর অনেক কারণে ঘরকুনো হয়ে গেলাম। ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু ভার্সিটি এসে সাইফ, জাবিরের সাথে খেলেছিলাম বেশ কয়েকবার। ওরা প্রশংসা করেছিল। ছোটবেলায় ভালো লাগতো, সেখান থেকে শুধু ব্যাটিং টা পারি। আর কিছু পারিনা।”
সাফা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“তোর তো একটা ভাইয়া, মানে সৌম্য ভাইয়া। আজ দু’টো বললি কেন?”
সাফার কথায় সন্ধ্যার মুখ থমথমে হয়ে যায়। ভাবুক হয়। কিছুক্ষণ পর বলে,
“ভাইয়া তো একটাই। তবে কিছু কিছু ঘটনায় দুটো ভাইয়া ছিল।”
সাফা অবাক হয়ে বলে,
“সৌম্য ভাইয়া দু’টো হয়ে যেত না-কি!”
সাফার বোকা কথায় সন্ধ্যা হেসে ফেলে। কথাটা বলে সাফা নিজেই বোকা বনে যায়। সন্ধ্যা নিজেকে সামলে বলে,
“এমন নয়। আরেকদিন বলব।”
“লামিয়া যে বলে, আগে তুই ভীতু ছিলি। ও মেবি মিথ্যা বলে তাই না? আজকের পর তো আমি জীবনেও এটা বিশ্বাস করব না। তোর অনেক সাহস। ওই ছেলেরা কত বাজে! তবুও তুই ওদের সাথে কিভাবে কথা বলছিলি। ভ’য়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।”
কথাটা বলে সাফা সন্ধ্যার দু’হাত ধরে বলে, “এই দেখ, এখনো আমার হাত ঠান্ডা হয়ে আছে।”
সন্ধ্যা খেয়াল করল, সত্যিই সাফার হাত দু’টো স্বাভাবিক এর চেয়ে একটু ঠান্ডা। সাফার দিকে তাকায় সে। তার মাঝে মাঝে মনে হয়, আগের নিজের কার্বন কপি এই সাফা। সন্ধ্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তোর জায়গায় আগের আমি থাকলে, আমার জ্বর উঠত সিইওর।”
সাফা মাথা নেড়ে বলে,
“তোদের কথা আর জীবনেও বিশ্বাস করব না। আমি তোদের মাঝে পরে এসেছি বলে তোরা আমাকে বোকা বানাস, তাইনা?”
সন্ধ্যার মুখ মলিন হয়। তার নিজেরও তো বিশ্বাস হয়না। মাঝে মাঝে নিজেকে কেমন অচেনা লাগে। মনে হয়, সে অন্যাউকে নিজের মাঝে প্রতিনিয়ত লালন করে। কিন্তু এসবের কারণ মনে পড়লে সন্ধ্যার ক’ষ্ট হয়। এইতো এখনো হচ্ছে। বড় করে শ্বাস ফেলে একটা। ডান হাত সাফার গালে রেখে মলিন স্বরে বলে,
“একটা কথা মনে রাখবি, যাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তারা সবাই বাঁচেনা। অনেকেই রাস্তা খুঁজে না পেয়ে সেই দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে নিজের প্রাণ হারায়। আর যারা বেঁচে ফেরে, তারা সেই শ’ক্ত দেয়াল ভেঙে দেয়ার জন্যই বাঁচে।”
সাফা মুখ কুঁচকে বলে,
“এতো কঠিন কথা! এর চেয়ে পড়াশোনা সহজ। তোর কথা কিছুই বুঝলাম না।”
সন্ধ্যা সাফার হাত ধরে শপের ভেতরে যেতে যেতে বলে,
“বুঝতে হবেনা। যেদিন ধৈর্যের বাঁধ ভাঙবে, সেদিন নিজেই বুঝে যাবি। ভেতরে আয়।”
সামনে অনেক জুতো সাজানো৷ যেখানে সন্ধ্যাসহ তার ফ্রেন্ডরা দাঁড়িয়ে আছে। জাবিবের কোলে সৃজন। সন্ধ্যা একটি টুলে বসে আছে। বেশ কয়েকটি চটি সামনে রাখা। সন্ধ্যা ডান পা উঁচু করে চটি পায়ে দিতে নিলে দোকানদার তার পা ধরে পরিয়ে দিতে নেয়, ব্যাপারটি সন্ধ্যা খেয়াল করতেই দ্রুত পা নামিয়ে নেয়। যেন কিছু দেখে ভ’য় পেয়েছে। দোকানে বসা লোকটিও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কি হইছে আপা? পইরা দেহেন এইডা। আপনার পায়ে ঠিক হইব।”
সন্ধ্যা ঢোক গিলল। কিছু মনে পড়ে গেল বোধয়। তার আর আকাশের বিয়ের পর পর একবার আকাশের সাথে জুতো কিনতে এসেছিল এরকম একটা শপে। দোকানদার তার পায়ে হাত দিলে নিলে আকাশ সেই লোককে ধমকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বউ কার?’
লোকটির উত্তর ছিল, ‘স্যার আপনার।’
এরপর আকাশ সেই লোকটির গালে একটি থা’প্প’ড় দিয়ে বলেছিল,
‘বউ আমার। পায়ে হাত দিচ্ছিস তুই। হিসাব তো মিলল না। তাই একটা ডোজ দিলাম।’
কথাগুলো সন্ধ্যার স্পষ্ট মনে আছে। সেইদিনগুলোর একেকটি দৃশ্য আজও কি ভীষণ স্বচ্ছ! সন্ধ্যা ডানেবায়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। আকাশ এখানে নেই। শুধু এখানে নয়, এই বাংলাদেশেই নেই। শুধুমাত্র তার-ই জন্য। তাকে সহ্য করতে পারে না বলে। তবুও সন্ধ্যার দৃষ্টি মাঝেমাঝে এলোমেলো হয়। মেয়েটার অস্থির লাগলো ভীষণ। হঠাৎ করেই সন্ধ্যা উঠে দাঁড়াল। দোকানদের উদ্দেশ্যে বলে,
“এগুলো রেখে দিন।”
কথাটা বলে সন্ধ্যা জাবিরের সামনে এসে জাবিরের কোল থেকে সৃজনকে নিয়ে বাইরে যেতে যেতে বলে,
“বাসায় যাচ্ছি আমি। তোরা ভার্সিটি যা। বাসায় জুতো, চটি আছে। কিনতে হবে না।”
সন্ধ্যার কথায় সবাই অবাক হলো। দ্রুত সন্ধ্যার পিছু পিছু আসে আর জাবির বলে, “কি হলো? এই তো জুতো পায়ে দিচ্ছিলি। মেয়ে মানুষের এতো মুড সুয়িং ভাই!”
সৃজন দু’হাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে পিছনে জাবিরের দিকে তাকিয়ে বলে,
“মু’ত চুয়িং জাবিল বাই!”
জাবির চোখমুখ কুঁচকে বলে,
“হ্যাঁ হ্যাঁ সবারই ভাই আমি। তোর মায়েরও ভাই, তোরও ভাই। জাতির ভাই আমি।”
সৃজন মুখে হাত দিয়ে হেসে বলে,
“জাবিল বাই জাতিল বাই।”
জাবির আর সৃজনের কথা কেউ আপাতত পাত্তা দিল না। সন্ধ্যা তার স্কুটির কাছে এসে দাঁড়ায়। লামিয়া দৌড়ে এসে সন্ধ্যাকে টেনে তার দিকে ফিরিয়ে বলে,
“সন্ধ্যা কি হয়েছে তোর বলবি? খিচুড়ি-ও খাইলি না। আর এখন জুতো পরতে গিয়ে বাসায় চলে যাচ্ছিস। এমন আজব বিহেভ করছিস কেন?”
সন্ধ্যা মৃদুস্বরে বলে,
“কিছু হয়নি। ঘুম পাচ্চে আমার। বাসায় গিয়ে ঘুমাবো। তোরা ক্লাসে যা। কাল দেখা হবে।”
সাইফ একজোড়া চটি কিনে মাত্র দোকান থেকে বের হয়। সন্ধ্যাদের দেখে এগিয়ে এসে সন্ধ্যার পায়ের কাছে চটিজোড়া শব্দ করে রেখে বলে,
“জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না, এটা সন্ধ্যার কমন ডায়লগ। ওর কমন ডায়লগ এটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ তার জলজ্যান্ত প্রমাণ সন্ধ্যা নিজেই, তাই না?”
সাইফের কথা শুনে সবাই সাইফের দিকে তাকায়। সন্ধ্যা ঢোক গিলল। মাথা তুলল না সে। চটিজোড়ার দিকে চেয়ে বলে, “এসব কেন বলছিস?”
সাইফ সৃজনকে কোলে নিয়ে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বলে,
“কারণ তুই আকাশ ভাইয়াকে ছাড়া জীবন চালিয়ে নিয়ে গেলেও সামান্য জুতো কেনা থামিয়ে দিচ্ছিস।”
সন্ধ্যা সাথে সাথে মাথা উঁচু করে ঘোর প্রতিবাদ করে বলে,
“মোটেও না। আমি…..
সাইফ মাঝখান থেকে বলে,
“সৃজন তোকে দেখছে।”
সন্ধ্যা সৃজনের দিকে তাকালে দেখল বাচ্চা ছেলেটি মায়ের দিকে এমনভাবে চেয়ে আছে যেন এক্ষুনি কেঁদে দিবে। সন্ধ্যা দ্রুত তার ঝাপসা চোখজোড়া নামিয়ে নেয়। চোখ বুজে নিজেকে সামলাতে চায়। সকলের মুখ থমথমে হয়ে যায়। এতক্ষণ সাইফ একা বুঝেছিল, এখন সকলেই বুঝেছে সন্ধ্যার ব্যাপারটি।
কয়েক সেকেন্ডের মাঝে সন্ধ্যা নিজেকে সামলে নেয়। দু’হাতে চোখ ডলে চোখ মেলে সৃজনের দিকে চেয়ে হেসে ডাকে,
“আব্বা?”
মায়ের হাসি মুখ দেখে সৃজনের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। দু’হাত বাড়িয়ে দেয় সন্ধ্যার কাছে আসার জন্য। সন্ধ্যা কোলে নিতে চায় সৃজনকে। তখন-ই জাবিরের নজরে আসে একটি ছেলে সন্ধ্যার দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়বে পড়বে ভাব। জাবির দ্রুত সন্ধ্যার বা হাতের বাহু বরাবর ধাক্কা দেয় ডানদিকে। ফলস্বরূপ সন্ধ্যা ডানদিকে দাঁড়ানো সাফার সাথে জোরেসোরে ধাক্কা খায়। সন্ধ্যা নিজেকে সামলে নিলেও সাফা উল্টে পড়ে রাস্তায়। সন্ধ্যা হতভম্ব হয়ে যায়। দ্রুত সাইফ আর সৃজনের দিকে তাকিয়ে সৃজনকে সাইফের কোলে ঠিকঠাক দেখে স্বস্তি পায়।
কে ধাক্কা দিল এটা দেখতে সন্ধ্যা বাদিকে ফিরলে চোখে পড়ে, সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে মাত্র একটি ছেলে হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ছে, তখনই পিছন থেকে একটা বড়সড় হাতুড়ি টাইপ কিছু ছেলেটির মাথার পিছনে এসে শ’ক্ত আ’ঘা’ত করে। ফলে ছেলেটি আরও দু’কদম সামনে এগিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মাথার পাশে শব্দ করে পড়ে যায় সেই হাতুড়ি। সাথে ছেলেটির মুখ থেকে কয়েক দলা র’ক্ত ছিটকে সন্ধ্যার পায়ের কাছে এসে পড়ে।
হঠাৎ এহেন ঘটনায় সন্ধ্যাসহ সকলে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। সাফা ভ’য়ে মৃদু চেঁচিয়ে ওঠে। সন্ধ্যা আর লামিয়া দ্রুত সাফার দিকে এগিয়ে গিয়ে সাফাকে টেনে তোলে। সন্ধ্যা বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“ঠিক আছিস? আমাকে কেউ ধাক্কা দিয়েছে। বুঝতে পারিনি আমি।”
সাফা রাস্তায় পড়ে থাকা র’ক্তা’ক্ত দেহে একবার তাকিয়ে দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। সন্ধ্যার দিকে সিটিয়ে গিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে, “আমি বাড়ি যেতে চাই।”
জাবিরের কণ্ঠ পেয়ে সন্ধ্যা বাদিকে ফিরে তাকায়।
জাবির হাঁটু মুড়ে বসে রাস্তায় পড়ে থাকা ছেলেটিকে উল্টো করে শোয়ালে দেখল ছেলেটির মুখের অবস্থা যাকে বলে একেবারে বীভৎস। মুখসহ পুরো বডি র’ক্তা’ক্ত। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পুরো মুখ বিকৃত করে দিয়েছে কেউ। একটুও চেনা যাচ্ছে। ছেলেটির অবস্থা দেখে জাবির, সাইফ সহ সকলের শরীর শিরশির করে ওঠে। সন্ধ্যা দ্রুতপায়ে কয়েক কদম এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
“কে এটা? আর এর এই অবস্থা কে করল?”
জাবির লোকটির মুখ ধরে এপাশ-ওপাশ করছিল। বেঁচে আছে কি-না বোঝার চেষ্টা করছে। চোখেমুখে অজস্র বিস্ময়। সন্ধ্যার কথা শুনে আশেপাশে তাকালে তেমন কাউকেই দেখতে না পেয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
“বুঝতে পারছি না। লোকটাকে তো চেনাই যাচ্ছে না। কি বিচ্ছিরি অবস্থা করেছে! কিন্তু বেঁচে আছে।”
সাইফের কোলে সৃজন এদিক ফিরতে নিলে সাইফ সৃজনের মাথায় হাত রেখে বলে, “মামা চোখ বন্ধ রাখো। তাহলে অনেক চকলেট দিব।”
ছোট্ট সৃজন সাইফের কথায় খুশি হয়। দু’হাতে সাইফের গলা শ’ক্ত করে ধরে চোখ বুজে হেসে বলে, “আত্তা আত্তা। ছাইপ মামা বালো।”
সৃজনের কথায় সাইফ মৃদু হাসল। এরপর সে রাস্তায় পড়ে থাকা ক্ষ’ত লোকটির দিকে চেয়ে বলে,
“একে আমার চেনা চেনা লাগছে।”
সাথে সন্ধ্যাও বলে,
“আমারও। মনে হচ্ছে ভার্সিটির কেউ।”
তখনই কয়েকজন ছেলে দৌড়ে এসে দাঁড়ায় জাবিরদের এখানে। তার মধ্যে একজন ক্ষ’ত লোকটির পাশে ধপ করে বসে হাসফাস কণ্ঠে বলতে থাকে,
“রনি? এ্যাই রনি ঠিক আছিস? রনি?”
পরিচিত ছেলে, সাথে পরিচিত নাম শুনে সন্ধ্যা, সাইফ, জাবির, লামিয়া, সাফা সকলে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়।
জাবির একবার আহত ছেলেটির দিকে তাকায় তো একবার একবার রনির ফ্রেন্ডের দিকে তাকায়। তার মানে এই আহত ছেলেটি আর কেউ নয়, সন্ধ্যার পিছনে লাগা সেই ছেলে রনি? কিন্তু এর এই অবস্থা কে করল? জাবির অস্ফুটস্বরে আওড়ায়, “রনি?”
জাবিরের কথাটি রনির ফ্রেন্ডের কানে আসতেই সে রনিকে ছেড়ে জাবিরের দিকে তেড়ে গিয়ে জাবিরের কলার ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“ওর এই অবস্থা তোরা করেছিস, তাইনা? ছাড়বো না তোদের।”
ছেলেটির কথায় সন্ধ্যারা সবাই অবাক হয়। সাইফ সৃজনকে সন্ধ্যার কোলে দিয়ে বলে, “সাইডে যা।”
সন্ধ্যা সৃজনকে নিয়ে এক সাইডে গিয়ে দাঁড়ায়। সৃজন এখনো চোখ বুজে রেখেছে। ওই যে সাইফ বলল, চোখ বন্ধ রাখলে তাকে চকলেট দিবে, ওটাই মানছে সে। কোল পরিবর্তন হয়ে মায়ের কোলে এসেছে, এটা সে বুঝেছে, মায়ের গায়ের গন্ধ পেয়ে। সৃজন ডাকে, “মা?”
সন্ধ্যা উত্তর করে,
“জ্বি আব্বা?”
“একানে কি হয়িচে?”
সন্ধ্যা সৃজনের পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,
“কিছু হয়নি আব্বা। তুমি চোখ বন্ধ করে রাখো।”
সৃজন মেনে নিয়ে চোখ খুলল না।
এদিকে সাইফ জাবিবের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। রনির ব্যাচ তাদের এক ব্যাচ সিনিয়র। সে অহেতুক ঝামেলা চাইল না। অতঃপর রনির ফ্রেন্ড এর উদ্দেশ্যে বলে, “ভাইয়া আমরা এসব ব্যাপারে কিছু জানিনা। জাবিরকে ছাড়ুন।”
সাইফের কথা কানের নিল না ছেলেটি। উল্টে সে রে’গে জাবিরের গলা চেপে ধরে। এবার জাবির রে’গে ছেলেটিকে ধাক্কা দিয়ে বলে, “একদম গায়ে হাত দিবিনা। যতসব সিনিয়র নামের কু’ত্তার দল।”
ছেলেটি আবারো তেড়ে আসতে নিলে
রনির অন্যান্য ফ্রেন্ডরা তাকে আটকে দেয়। আহত রনিকে হসপিটাল নিতে হবে। তাই তারা এখানে থেকে সময় ন’ষ্ট করল না। রনিকে নিয়ে গাড়িতে উঠায় দ্রুত।
জাবির রাস্তা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সাইফের ঘাড়ে হাত দিয়ে আশেপাশে সূক্ষ্ম দৃষ্টি ঘোরায়। এই রনিই তো সবার অবস্থা খারাপ করে। আর আজ সেই রনির অবস্থা খারাপ অন্যকেউ করেছে? ব্যাপারটি অবিশ্বাস্য লাগছে।
সন্ধ্যা সৃজনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে কিছু। সে ভার্সিটিতে ওমন কান্ড বাঁধিয়ে এসে একটু-আধটু ভ’য় পাচ্ছিল। ভ’য়টা সৃজনকে নিয়ে। ভার্সিটির এসব ছেলেপেলেদের থেকে যতই সাময়িক নিজেদের রক্ষা করুক,, কখনো না কখনো ঝামেলায় পড়তে হয়ই। এসব সন্ধ্যা জানে। তাছাড়া ভার্সিটি আসার পর থেকে দেখেছে এই রনি ছেলেটা ভীষণ বে’য়া’দ’ব টাইপ। কমবেশি সবার পিছনেই লাগত। কিন্তু আজ তার এই অবস্থা কে করল এর হিসাব মিলছে না। ওমন বীভৎস মুখচোখে চোখ পড়লেই সন্ধ্যার শরীর শিউরে ওঠে। তখনই সন্ধ্যার ডান কানের কাছে অপরিচিত ছেলে কণ্ঠে কয়েকটি শব্দ ভেসে আসে,
“আজকের ব্যাটিং যাস্ট ওয়াও ছিল!”
সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। দ্রুত ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকালে কাউকে দেখতে পায়না। আশেপাশে তাকিয়েও তেমন কাউকে দেখতে পায় না। পিছনে দাঁড়ানো লামিয়া আর সাফা এগিয়ে এসে বলে,
“কি হয়েছে সন্ধ্যা?”
সন্ধ্যা চারিদিকে তাকায় আর চিন্তিত কণ্ঠে বলে, “কে যেন আমার পিছনে এসেছিল। কিসব বলে গেল। তোরা দেখেছিস?”
লামিয়া, সাফা মাথা নেড়ে না বোঝায়। লামিয়া বলে,
“অনেক মানুষই তো রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসা করছে। কাকে ধরব? কি বলেছে তোকে?”
সন্ধ্যা ছোট করে বলে, “কিছুনা।”
সৃজন ডানদিকে কোনো একজনের দিকে চেয়ে আছে। হঠাৎ ডান হাত সেদিকে তাক করে বলে,
“মা মা দেকো, ইয়া বলো কালো বিলাই। অুই যে!”
সৃজনের কথায় সন্ধ্যা সৃজনের তাক করা হাত অনুসরণ করে সেদিকে তাকায়। চোখে পড়ে একজন লোককে যে সম্পূর্ণ কালো পোষাকে মোড়ানো। পিছন থেকে একটু-আধটু চুল যে দেখা যাবে তাও দেখা গেল না। সন্ধ্যার কাছে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত লাগলো, ছেলেটির গা আর মাথা ডানেবায়ে অনবরত দুলানো। মনে হচ্ছে রাস্তায় নাচতে বেরিয়েছে। সন্ধ্যা বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“ওটা বিড়াল নয় আব্বা। ওটা জোকার।”
মায়ের কথা সৃজনের বোধয় পছন্দ হলো। সে ঘোর বিরোধিতা করে বলে,
“ওটা তু ছাদা চোখেল বিলাই।”
সন্ধ্যার ফোন বেজে উঠলে সে সৃজনের কথার উত্তর করল না। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখল ইরার কল। সন্ধ্যা কল রিসিভ করে ফোন কানে নেয়। কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ইরার কান্নার কণ্ঠ শুনতে পেয়ে সন্ধ্যা বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“ভাবি কি হয়েছে? ভাবি? ভাইয়া কোথায়? তুমি কাঁদছ কেন?”
ইরা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে,
“সৌম্যকে পু’লি’শ ধরে নিয়ে গেছে সন্ধ্যা। কিছু কর তুমি।”
কথাটা শুনে মনে হলো, সন্ধ্যার মাথায় আসমান ভেঙে পড়ল। তার ভাইয়াকে পু’লিশ কেন ধরে নিয়ে গেছে? কেন? সন্ধ্যা ঢোক গিলে বলে,
“কেন ভাবি?”
ইরা কান্না গিলে নিয়ে বলে,
“আমি কিছুই জানিনা। তোমার ভাইয়া ভার্সিটি যাবে বলে বেরিয়েছিল, তখন-ই পু’লি’শ এসে কিছু না বলেই নিয়ে গেল।”
সন্ধ্যার চোখের কোণে পানি জমে। তার ভাইয়াকে জে’লে দেখার ভাগ্য থেকেও সে বঞ্চিত হলো না? মেয়েটা নিজেকে সামলে কোনোমতে বলে,
“চিন্তা কর না ভাবি। আসছি আমি।”
কথাটা বলে সন্ধ্যা কল কে’টে দেয়। এদিকে সাইফ, জাবির এসে দাঁড়িয়েছে এখানে। সন্ধ্যাকে এরকম রিয়েকশন দিতে দেখে সবাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে সন্ধ্যা?”
সন্ধ্যা ঝাপসা চোখে চেয়ে বলে,
“আমার ভাইয়াকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। আমি এখন কি করব?”
সন্ধ্যার কথায় সকলে বিস্মিত হয়। সৌম্য ভাইয়াকে জে’লে কেন নিয়ে যাবে? আজব তো! আপাতত এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বাদ দিল সবাই।
জাবির সৃজনকে কোলে নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলে,
“দ্রুত পুলিশ স্টেশনে চল। সৌম্য ভাইয়াকে লকাপে ঢোকানোর আগেই ওখানে পৌঁছাতে হবে।
সন্ধ্যাকে এখনো থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জাবির সন্ধ্যার দিকে চেয়ে আবারো বলে,
আরে সাহসী রাণী, ভেঙে পড়ছিস কেন? আমরা থাকতে সৌম্য ভাইয়াকে লকাপে ঢোকানোর ক্ষমতা কারো বাপেরও হবেনা। বি পজিটিভ!”
সৃজন আদোআদো স্বরে বলে,
“জাবিল মামাল বাপেল কমতা নেই।”
জাবিল সৃজনকে নিয়ে তার বাইকের দিকে যেতে যেতে বলে,
“এ্যাহ আমার বাপের বহুত ক্ষমতা। আজ দেখাবো চল। কিন্তু তোর বাপের ক্ষমতা নেই। সম্মন্ধিকে পু’লি’শ ধরে নিয়ে যায়। আর তোর বাপ বিদেশ বসে থাকে।”
কথাটা বলতে বলতে জাবির সৃজনকে বাইকে বসিয়ে দিয়ে সে বাইকে উঠে বসে। সৃজন কিছু বলল না। বাইক পেয়ে সে এখন খুশি। দু’হাতে শ’ক্ত করে সামনে ধরে রেখেছে। জাবির বাইক স্টার্ট দেয়। পিছনে সাইফ উঠে বসলে জাবির বাইক স্টার্ট দেয়।
পিছনে সন্ধ্যা স্কুটিতে উঠে স্কুটি স্টার্ট দেয়। সন্ধ্যার পিছনে সাফা।
সন্ধ্যাদের পিছনে লামিয়া তার স্কুটি নিয়ে আসছে।
পু’লি’শ স্টেশনের সামনে এসে সৌম্য পু’লি’শের গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। সাথে তিনজন পু’লি’শ। এগোয় ভেতরে যাওয়ার জন্য। সৌম্য’র হাতে হাতকড়া নেই। সৌম্য পরাতে দেয়নি। সে বলেছে, সে নিজেই আসবে, এসব পরাতে হবেনা। ইরার কথা মনে পড়ছে ভীষণ। কানে বাজছে ইরার কান্না। আজ অনেকগুলো দিন পর আজ আবারো নিজেকে এতোটা অসহায় লাগলো। ঠিক কি করবে, কি করা উচিৎ, ভাবতে পারছে না।
তখনই পু’লি’শ স্টেশনের সামনে এসে দাঁড়ায় সন্ধ্যা, জাবির আর লামিয়ার বাইক, স্কুটি। সন্ধ্যা পিছন থেকে সৌম্যকে দেখল।৷ সে দ্রুত স্কুটি থেকে নেমে বড় বড় পায়ে এগিয়ে যায় আর শব্দ করে ডাকে, “সৌম্য ভাইয়া?”
বোনুর কণ্ঠ পেয়ে সৌম্য’র পা থেমে যায়। পিছু ফিরে তাকালে সন্ধ্যাকে দেখে ঢোক গিলল। সন্ধ্যা পায়ের গতি বাড়িয়ে একপ্রকার দৌড়ে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরে। কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে,
“ভাইয়া তুমি এদের সাথে এখানে কেন এসেছ? ওদের বলনি কেন, তুমি কিছু করনি?”
সৌম্য কি বলবে বুঝল না। সামনে তাকিয়ে সন্ধ্যার ফ্রেন্ডদের দেখে অবাক হলো না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুধু। সৃজন সৌম্যকে দেখে হাত পেতে দেয় আসার জন্য। ডাকে,
“সুম্মো মামা আমাকে কুলে নাও।”
সৌম্য অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। ছোট করে বলে, “নিব আব্বু।”
জাবির এগিয়ে এসে দাঁড়ায় সৌম্য’র সামনে। একজন পুলিশ বলে,
“আ’সা’মির থেকে দূরে থাকুন।”
জাবির ডান হাত উঠিয়ে ধমক দিয়ে বলে, “এ্যাই, তোরা দূরে সর।”
পু’লি’শ তিনজন জাবিরকে দেখে সথে সাথে মাথা নিচু করে নেয়। সৌম্য’র থেকে দূরে সরে বলে, “স্যরি স্যার!”
সৌম্য বিরক্ত হয়ে বলে,
“জাবির, ওরা তোমার গুরুজন।”
জাবির অনুতপ্ত স্বরে বলে,
“স্যরি ভাইয়া!”
এরপর আবারও কিছু বলতে নেয়, তার আগেই সৌম্য বিদ্রুপ হেসে বলে,
“তোমার ফ্রেন্ডের হাসবেন্ডের বাবাকে নাকি আমি মে’রেছি, বুঝলে? এজন্য আমাকে সম্মানের সাথে এখানে এনেছে।”
জাবির, সাইফ, লামিয়া, সাফা সকলে অবাক হয় সৌম্য’র কথায়। সন্ধ্যা তার ভাইকে ছেড়ে বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“ভাইয়া এসব কি বলছ তুমি?”
সৌম্য ঢোক গিলল। জাবির আর সাইফের দিকে চেয়ে বলে,
“বোনুকে সাবধানে বাড়ি পৌঁছে দিও।”
কথাটা বলতেই সন্ধ্যা রে’গে বলে,
“কিসের বাড়ি পৌঁছে দিবে? আমি কোথাও যাবো না তোমাকে রেখে। তুমি জে’লে যেতে চাইছ কেন ভাইয়া? ভাবি তোমার জন্য কাঁদছে। তুমি আমার সাথে বাড়ি যাবে, এসো।”
জাবির বলে,
“ভাইয়া আপনি সন্ধ্যাকে নিয়ে বাড়ি যান। আমি এদিকটা সামলাচ্ছি।”
জাবিরের কথাটা শেষ হতেই পিছন থেকে আকাশের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে, “আচ্ছা? তুই সামলে নিবি?”
পরিচিত কণ্ঠ শুনে সৌম্য সামনে তাকায়। সাথে তাকায় সন্ধ্যা। দু’জনের চোখেমুখে বিস্ময়। তবে সৌম্য বোধয় কমই অবাক হলো। আন্দাজও করেছিল কিছুটা। আকাশ ছাড়া তাদের লাইফ হেল করার মতো আর কে বা আছে! কিন্তু সন্ধ্যার দৃষ্টিতে অসম্ভব বিস্ময়। পায়ের তলা কাঁপছে মনে হলো। চোখজোড়া ভরে ওঠে মুহূর্তেই। কতগুলো মাস পর দেখল আকাশকে। শরীরটা কাঁপছে যেন।
জাবির উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। তাকায় আকাশের দিকে। সাথে সাইফ, সাফা, লামিয়াও তাকায়। সাইফ, জাবির, সাফা কেউ আকাশকে চিনতে পারল না। কারণ তারা আকাশকে নামে চেনে, মুখে নয়। কিন্তু লামিয়া আকাশকে এক দেখায় চিনতে পারে। অবাক হয় প্রচন্ড।
রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে অনেকগুলো গাড়ি দাঁড় করানো। সামনে আকাশ দাঁড়ানো। তার দু’পাশে কয়েকজন লোক। আকাশের পরনে সাদা রঙের স্যুট, প্যান্ট। চোয়াল শ’ক্ত। দৃষ্টি জাবিরের দিকে। জাবির ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। বুঝতে পারছে না লোকটা তার দিকে এভাবে চেয়ে আছে কেন।
আকাশ তাকায় সৌম্য’র দিকে। চোখাচোখি হয় দু’জনের। আকাশ সৌম্য’র দিকে চেয়ে পু’লি’শদের উদ্দেশ্যে হুংকার ছেড়ে বলে,
“মিস্টার সৌম্য এখনো বাইরে কেন? হোয়াই? অ্যান্সার মি বা’স্টা’র্ড।”
সব পু’লি’শ আকাশের হুংকারে থরথর করে কেঁপে ওঠে। সৌম্য নির্জীব চোখে চেয়ে রইল। সন্ধ্যা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। নতুন করে অবাক হলো না। কিন্তু ক’ষ্ট? দুঃখ? সেসব কি করে এড়াবে সে? কথা বলার শ’ক্তি পায় না। মেয়েটা দু’হাতে তার ভাইকে সাপ্টে ধরল। সে তার সৌম্য ভাইয়াকে কিছুতেই জে’লে দিবে না। সে ম’রে গেলেও না। সন্ধ্যার দু’চোখ ফেটে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। অসহায় দৃষ্টিজোড়া আকাশের পানে। হঠাৎ করে আকাশকে দেখে সে কেমন যেন ভেঙে পড়ছে। পারছে না নিজেকে সামলাতে।
ওদিকে জাবির দু’কদম এগিয়ে এসে আকাশের উদ্দেশ্যে বলে,
“এই মিস্টার, উনাকে জে’লে দেয়ার তুই কে? হু আর……
বাকিটুকু বলার আগেই আকাশ হনহন করে এগিয়ে এসে জাবিরের বুক বরাবর জোরেসোরে একটা লাথি মে’রে দেয়। জাবির মোটেও এটার জন্য প্রস্তুত ছিল না৷ ফলস্বরূপ ছিটকে উল্টে পড়ে। কোলে থাকা সৃজন হাত ফসকে পড়ে যায়। ছেলেটা ভ’য়ে চেঁচিয়ে ওঠে। আকাশ ডান হাতে সৃজনের বা হাত টেনে ঝুলিয়ে ধরে থাকে৷ সোনালি চোখদুটো রা’গের চোটে জ্ব’ল’ছে মনে হলো। রাগান্বিত দৃষ্টি ঘুরে আসে সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যা সৌম্যকে ছেড়ে দৌড়ে আসতে নেয় আর চেঁচিয়ে ডাকে, “সৃজন?”
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৩
আকাশ বা হাতে পকেট থেকে পিস্তল বের করে সৃজনের মাথায় ঠেকিয়ে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“এ্যাই স্টপ!”
সন্ধ্যার পা থেমে যায়। বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় আকাশের দিকে। বাবা ছেলের কপালে পিস্তল ধরেছে? এটাও দেখার বাকি ছিল? আবার মনে হয়, সে অবাক কেন হচ্ছে। এটাই তো স্বাভাবিক।
সৃজন মায়ের দিকে চেয়ে কেঁদে দিয়ে বলে, “মা, আমি পলে গিলাম। আমাকি বাচাও।”
ছেলের দিকে চেয়ে সন্ধ্যার বুক ফেটে কান্না আসে। সে কি করবে এখন? দমবন্ধ লাগে তার। মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগে।
