Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৪ (২)

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৪ (২)

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৪ (২)
DRM Shohag

সন্ধ্যা খুব ক’ষ্টে নিজেকে সামলায়। সে দু’র্ব’ল হয়ে গেলে তার সৃজনের কি হবে? বাইরের মানুষ শ’ত্রু হলে তাদের সাথে লড়াই করা যায়। কিন্তু তার ছেলেটার শ’ত্রু যে স্বয়ং তার বাবা। সৃজন হওয়ার আগেও তার বাচ্চাকে মা’র’তে এসেছিল। দু’বছর ঘুরে আজ আবারও এসে সর্বপ্রথম তার বাচ্চাটার দিকেই পি’স্ত’ল উঠিয়েছে। সন্ধ্যা ঢোক গিলল। নিজেকে শ’ক্ত করে উদ্দেশ্যে বলে, “আমার ছেলেকে ছেড়ে দিন।”
কথাটা বলতে বলতে সন্ধ্যা ধীরে ধীরে একপা দু’পা করে এগিয়ে আসে আকাশের দিকে। খুব সর্তকতার সাথে পা ফেলে। সূক্ষ্ম নজরে পরোখ করে সৃজনের অবস্থান, পরোখ করে আকাশকে, সাথে আকাশের ধরে রাখা পি’স্তল। আবারও বলে,

“কি চান আপনি? আপনার কথা আমার আর ভাইয়ার সাথে। আমার ছেলেকে ছাড়ুন।”
সন্ধ্যার বলা কথার চেয়ে সন্ধ্যার সতর্কে ফেলা কদমে আকাশের বেশি মনোযোগ। সন্ধ্যার চতুরতা বুঝতে পেরেছে সে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। কান্নারত সৃজনকে উপরদিকে ছুড়ে মা’রার ভঙ্গি করে। সৃজন আগের চেয়েও ভ’য় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘মাআআআ?”
সাথে সাথে সন্ধ্যার পা থেমে যায়। বুক কেঁপে ওঠে তার। শরীরটা বড্ড কাঁপছে মনে হলো। সামনে এগোতে পারছেনা। তার সৃজন?
ওদিকে সকলের চোখেমুখে আতঙ্ক ফুটে ওঠে। মনে হচ্ছে সৃজন কোনো বল। সৌম্য আব্বু বলে দ্রুত এগিয়ে আসতে নিলে দু’জন পু’লি’শ তাকে টেনে ধরে। সৌম্য’র চোখেমুখে অসহায়ত্ব। চোখ বুজে খুব ক’ষ্টে দু’টো শব্দ উচ্চারণ করল, ‘আল্লাহ প্লিজ!’

আকাশের দৃষ্টি সন্ধ্যার উপর। হাসির পরিমাণ দীর্ঘ হয় তার। মজা পেল বোধয় সন্ধ্যার ওমন ভীতু মুখশ্রী দেখে। সন্ধ্যার দিকে দৃষ্টি রেখেই দু’পা সামনে এগিয়ে ডান হাত পেতে পড়ন্ত সৃজনকে কোলে নেয়।
এই দৃশ্য দেখে সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সন্ধ্যার চোখ থেকে দু’ফোঁটা পানি গড়ালো আবারো। আকাশ তার বাচ্চাটার সাথে কেন এমন করছে? রা’গ, ক’ষ্ট সব হচ্ছে। দৃষ্টি ঘোরে ভীতু সৃজনের পানে তো একবার আকাশের পানে।

এদিকে সৃজন একটি আশ্রয় পেয়ে দু’হাতে আকাশের গলা সাপ্টে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদে। বাচ্চাটা ভ’য়ে কাঁপছে। কি যেন বিড়বিড়িয়ে বলে। আকাশ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে এতক্ষণ বেশ প্রফুল্ল বোধ করলেও এবার মুখটা কেমন যেন থমথমে হয়ে যায়। সৃজনের শরীর কম্পন, সাথে ছেলেটির কান্নায় আকাশ ঢোক গিলল। তাকালো সন্ধ্যার দিকে।
সন্ধ্যা চোখমুখ শ’ক্ত করে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। একটু পর পর ডান হাত দ্বারা ঝাপসা চোখ ডলে স্বাভাবিক করে। চোখ দু’টো লাল। সন্ধ্যা ভীষণ এলোমেলো, সবমিলিয়ে আকাশের চোখে সন্ধ্যাকে ভীষণ সুন্দর এক মেয়ে রূপে ধরা দিল। কিন্তু আকাশের চোখে সবচেয়ে বেশি হাইলাইট হয়, সন্ধ্যার মাথা থেকে ওড়না পড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা। অথচ সন্ধ্যার নিজের দিকে কোনো খেয়াল নেই। মাথা ঢাকার কোনো তাড়া নেই।
যেটা আকাশের কাছে অ’সহ্য লাগলো। চোয়াল শ’ক্ত হলো৷
সন্ধ্যা আগের ন্যায় আকাশের দিকে এগিয়ে আসতে নিলে আকাশ সাথে সাথে সৃজনের মাথায় পি’স্ত’ল ঠেকায়।
সন্ধ্যা এবার রে’গে চেঁচিয়ে বলে,
“আপনার প্রবলেম কি? আমি তো বললাম, আমার আর ভাইয়ার সাথে আপনার কথা। আমার বাচ্চাকে ছাড়ুন।”
আকাশ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“সিইওর! মেইন হিসাব তো তোমার সাথেই হবে। যাস্ট ওয়েট এন্ড সি।”
এদিকে সৃজনের কান্না থেমেছে, সাথে কাঁপুনিও। এতক্ষণ যে ভ’য়টা পাচ্ছিল, এর পরিধি অনেকাংশে কমে এসেছে। সৃজন আকাশের জড়িয়ে ধরে রাখা গলা ছেড়ে সোজা হয়। ভেজা চোখে তাকায় আকাশের দিকে। সৃজনকে নড়তে দেখে একই সময় আকাশ-ও তাকায় সৃজনের দিকে। দু’জনের চোখাচোখি হয়। আকাশ যদিও জানত এই ছেলের চোখদুটোর মণি তার মতোই সোনালি। কিন্তু কাছ থেকে দেখে কেমন যেন অদ্ভুদ লাগলো। সৃজন তার ছোট্ট ছোট্ট দু’হাতে ভেজা চোখমুখ মুছে আদোআদো স্বরে বলে,
“তুমি পুচা। তোমাকে আমি মাল দিব।”
কথাটা বলতে বলতে সৃজন বা হাত উঁচু করে আকাশের গালে থা’প্প’ড় মারার জন্য। সন্ধ্যা ঢোক গিলল। এটা তো সেই আকাশ নয়, যে তার বাচ্চার মা’র সহ্য করবে। এটা এভি, যে আদতে মানুষ নয়। নয়তো একটা বাচ্চার সাথে কিভাবে এমন করতে পারে? সৃজন আকাশকে থা’প্প’ড় দিলে আকাশ না জানি তার ছেলেটাকে না জানি কি করে বসে৷ সন্ধ্যা শব্দ করে ডেকে ওঠে,

“আব্বা?”
সৃজনের হাত থেমে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মায়ের দিকে। সন্ধ্যা নিজেকে সামলে মুখে হাসি ফুটিয়ে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দেখায়। মাকে এমন করতে দেখে সৃজনের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে-ও তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল দেখায়। সৃজনের কাছে এটার অর্থ হলো, ‘কোনো ভ’য় নেই’। সৃজন ভ’য় পেলে সন্ধ্যা এমন করে। এটুকুতেই বাচ্চাটার সব ভ’য় দূর হয়ে গেল। যেমটা এখন হলো।
আকাশ ভ্রু কুঁচকে একবার সন্ধ্যার দিকে তাকায় তো একবার সৃজনের দিকে। এরা মা ছেলে কি করতে চাইছে, সেটাই বোঝার চেষ্টা করছে।

আকাশ যে বেখেয়ালে আছে এটা সন্ধ্যার নজরে এসেছে। সন্ধ্যা মনে মনে হাসল। এরপর হঠাৎ-ই পায়ের গতি বাড়িয়ে একপ্রকার দৌড়ে আকাশের কাছে চলে আসে। আকাশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ধ্যা দু’হাতে গায়ের জোরে আকাশের বুকে ধাক্কা দেয়। আকাশের দৃষ্টি সৃজনের দিকে ছিল। সে বুঝতেই পারেনি। ফলস্বরূপ হাতের পি’স্ত’ল ছিটকে পড়ে যায়। সে নিজেও এক পা পিছিয়ে যায়। সৃজনকে কোলে নেয়া হাত আলগা হয়। সন্ধ্যা আকাশের থেকে সৃজনকে ছিনিয়ে নেয়। সময় ন’ষ্ট না করে সন্ধ্যা উল্টোঘুরে সামনের দিকে এগোতে নিলে আকাশের দু’পাশে দাঁড়ানো লোকগুলো সকলে একসাথে সন্ধ্যার দিকে বন্দুক তাক করে৷ সন্ধ্যা উল্টোদিকে ফিরে থাকায় দেখতে পেল না তার আর সৃজনের দিকে কতগুলো লোক বন্দুক তাক করে রেখেছে৷ কিন্তু সন্ধ্যার ফ্রেন্ড,সৌম্যদের চোখ-মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাইফ বিচলিত কণ্ঠে বলে,

“সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে যা।”
একই সময় আকাশ ডান হাত উঠিয়ে তার পিছনে গার্ডদের উদ্দেশ্যে ইশারায় বোঝায় বন্দুক নামাতে। আকাশের কথা মেনে সকলে বন্দুক নামিয়ে নেয়। কিন্তু সাইফের কথা শুনে আকাশের দৃষ্টি ঘুরে যায় সাইফের দিকে। যে ছেলের দৃষ্টি সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যা-ও দাঁড়িয়ে গিয়ে সাইফের দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায়। ব্যাপারটি আকাশের কাছে মোটেও ভালো লাগলো না। সন্ধ্যার কাজে যতটা না রা’গ হলো, তার চেয়ে কয়েকশো গুণ বেশি রা’গ সাইফের সন্ধ্যাকে নিয়ে কনসার্ন দেখে। আকাশ ডান হাতে তার একটি গার্ডের থেকে বড়সড় বন্দুক নিয়ে চোখের পলকে সাইফের দিকে ছুড়ে মা’রে। বন্দুকটি একদম সাইফের কপাল বরাবর এসে লাগে। সাইফ কপাল চেপে ধরে। বিস্ময় চোখে তাকায় আকাশের দিকে৷ আকাশের রাগান্বিত দৃষ্টি নিজের দিকে দেখে সাইফ ঢোক গিলল।

সন্ধ্যা সাইফকে আ’ঘা’ত পেতে দেখে ঢোক গিলল। পিছন থেকে কি আকাশ…সে আর দাঁড়ালো না। সামনে এক পা এগোতেই আকাশ ঝড়ের বেগে এসে পিছন থেকে সন্ধ্যার লম্বা বেনি টেনে সন্ধ্যাকে নিজের দিকে ধাক্কা দেয়, ডান হাতে সৃজনকে শ’ক্ত হাতে ধরে কে’ড়ে নেয় সন্ধ্যার থেকে। সন্ধ্যা চেঁচিয়ে ওঠে। আকাশ তার ডান বরাবর পিছন দিকে সৃজনকে ছুড়ে মা’র’ল। সৃজন ভ’য় পেয়ে আবারো কেঁদে দেয়। বিড়বিড়ি করে,
“বাতাচ বাবু পুচা।”
আকাশ ঘাড় বাঁকিয়ে শ’ক্ত গলায় আওড়ায়, “কেচ হিম অ্যান্ড রিপিট দ্যাট।”
আকাশের কথা মেনে একজন গার্ড কান্নারত সৃজনকে কেচ ধরে নেয়। আরেকজন এগিয়ে এসে সৃজনের মাথায় পি’স্ত’ল ঠেকায়।

আকাশের লাথি খেয়ে জাবির বুকে ভীষণ ব্য’থা পেয়েছিল। ঠিক করে নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না। কিন্তু সৃজনের মাথায় আবারো পি’স্ত’ল ঠেকাতে দেখে রা’গে শরীর রি রি করে ওঠে। সে দ্রুত উঠে আকাশের দিকে তেড়ে যেতে নিলে সাইফ জাবিরকে টেনে ধরে। জাবির দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“সাইফ ছাড়। ওর সাহস কি হয়, আমাদের বাচ্চার কপালে বারবার পি’স্ত’ল ঠেকিয়ে ক্ষ’ম’তা দেখানোর?”
সাইফ ঢোক গিলল। কান্নারত সৃজনের দিকে চেয়ে বলে,
“প্লিজ জাবির মাথা ঠান্ডা কর। লোকটাকে সুবিধার লাগছে না। আমরা এদিক-ওদিক করলে যদি ও আমাদের সৃজনের কোনো ক্ষ’তি করে দেয়?”
এবার জাবির কিছুটা শান্ত হয়। ইচ্ছে করছে, এই আকাশকে যাস্ট খু’ন করে ফেলতে। তার ফ্রেন্ডের ভাই, বাচ্চা সবার উপর কিভাবে অ’ত্যা’চার করছে! এমপির ছেলে জাবির। র’ক্ত গরম হয় অল্পতেই। তার মাঝে ভদ্রতা, সভ্যতা খুব কমই দেখা যায়। তবে কাছের মানুষদের ব্যাপারে প্রচুর পজেসিভ। এই যেমন বোন সমতুল্য সন্ধ্যার বিপদে মাথা ঠিক নেই।

এদিকে আকাশ বা হাতে সন্ধ্যার লম্বা বেনি পেঁচিয়ে ফেলেছে। ডান হাতে সন্ধ্যার দু’হাত শ’ক্ত করে রেখেছে। সন্ধ্যা ছাড় পাবার জন্য মোচড়ামুচড়ি করে। ছেলের কান্নার আওয়াজে সন্ধ্যার ভেতরটা ছটফট লাগে। এক পর্যায়ে অ’সহ্যরকম কণ্ঠে আওড়ায়,
“অ’মানুষ, জা’নো’য়া’র ছাড় আমায়।”
আকাশ চোখ বুজল। তীব্র রা’গে ফোঁসফোঁস করছে। সন্ধ্যার হাত আর চুল আরও শ’ক্ত করে ধরে। আকাশ চোখ বুজে রেখে তার মাথাটা দু’দিকে নাড়ালো একবার৷ এরপর গলা নামিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“ভাষা সংযত কর। আদারওয়াইজ, তোমার এসব বিহেভ এর ফিডব্যাক তোমার বেবি অ্যান্ড ভাইয়ের দিকে যাবে। তুমি নিশ্চয়ই চাও না তোমার বেবি, ভাইয়ের কোনো ক্ষ’তি হোক, রাইট?”
কথাটা শুনে সন্ধ্যা শান্ত হয়ে দাঁড়ালো। ঢোক গিলল। কেন এমন করছে আকাশ? কি করতে চাইছে? সন্ধ্যা বুঝতে পারেনা। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “কি চাইছেন আপনি?”
আকাশ চোখ মেলে তাকায়। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

“সব বলব মাই ডট.ডট.ডট…..”
সন্ধ্যা অবাক হয় আকাশকে এমনভাবে কথা বলতে শুনে। তবে প্রচন্ড বিরক্তিতে চোখমুখ কোঁচকালো।
এদিকে আকাশ তার বা হাতে পাকানো বেনি সন্ধ্যার ব্লাউজের ভেতর ছেড়ে দেয়। যার কুন্ডলী পিঠ পর্যন্ত পৌঁছায়। সন্ধ্যা কেঁপে ওঠে। বুঝল না আকাশ কি করছে।
আকাশ ডান হাত সরিয়ে বা হাতে সন্ধ্যার দু’হাত ধরে। সন্ধ্যা ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য আরেকবার ছটফট করে উঠল। কিন্তু আকাশ সুবিধা করতে দিল না। আরও শ’ক্ত হাতে সন্ধ্যাকে চেপে ধরে। সন্ধ্যার পিঠ আকাশের বুকের বা পশে এসে ঠেকেছে।
আকাশ আশেপাশে চোখ ঘোরালে চোখেমুখে অজস্র বিরক্তি ভর করে ছেলেটার। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে।
এরপর আকাশ তার ডান হাতে সন্ধ্যার কাঁধে অবহেলে পড়ে থাকা ওড়নাটি সন্ধ্যার মাথায় টেনে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,

“আমি জানি, আমি অ’মানুষ। বাট তোমাকে মানুষ হয়ে থাকতে হবে। আদারওয়াইজ, আমাকে যতটা খারাপ দেখছ, এর চেয়ে কয়েক হাজারগুণ খারাপ হব।”
আকাশের কথাটা শুনে সন্ধ্যা যতটা না অবাক হলো, তার চেয়ে বেশি অবাক হলো আকাশকে তার মাথায় কাপড় টেনে দিতে দেখে। আকাশ কথাটি দ্বারা কি বোঝালো? সন্ধ্যা ১০০% সঠিক বুঝতে না পারলেও আন্দাজ করল, সে কিছুটা খোলামেলাভাবে থাকে, এজন্যই আকাশ কথাটা বলেছে। কিন্তু কেন? সন্ধ্যা সত্যিই বুঝতে পারল না।
আকাশ সন্ধ্যাকে কথাটা বলে মাথা তুলে সৌম্য’র দিকে তাকায়। সৌম্যর অসহায় দৃষ্টিজোড়া কখনো তার ভাগ্নের উপর পড়ছিল তো কখনো তার প্রিয় বোনুর উপর। আকাশ তার দিকে তাকিয়েছে বুঝতে পেরে সৌম্য-ও তাকায় আকাশের দিকে। দু’জনের চোখাচোখি হয়। সৌম্য শ’ক্ত গলায় বলে,
“আমার বোনু আর সৃজনকে ছেড়ে দিন।”

আকাশের চোখেমুখে অসম্ভব রা’গ মিশে। সৌম্য’র কথায় সে হাসল। অতঃপর গম্ভীর গলায় বলে,
“তুই কি জে’লে যাবি না-কি তোর বোনের ছেলেকে আপ্যায়ণ করতে হবে? জে’লে তোকে যেতেই হবে, বাট বেবিকে আপ্যায়ণ করার পর যাবি না-কি আগেই যাবি? কোনটা?”
আকাশের কথা শুনে সন্ধ্যার চোখজোড়া ভিজে যায়। আর পারছেনা সে। ক’ষ্ট হয় না তার সৃজনের শ’ত্রু আছে বলে! ক’ষ্ট হয়, সৃজনের শ’ত্রু রূপে তার স্বামী আর সৃজনের আপন বাবাকে দেখে। তার ভাইটার সাথে এমন জ’ঘ’ণ্য ব্যবহার করার ব্যাপারটি মেনে নিতে পারলেও ছেলের প্রতি আকাশের ব্যবহার মেনে নিতে পারেনা৷ সন্ধ্যা ঢোক গিলে আবারও মোচড়ামুচড়ি করে আর চেঁচিয়ে বলতে নেয়, “ছাড় আ…..”
মাঝ থেকে আকাশ ডান হাতে সন্ধ্যার মুখ চেপে ধরে। বা হাতে সন্ধ্যার দু’হাত আরও শ’ক্ত করে ধরে। ফলস্বরূপ সন্ধ্যা না তো কথা বলতে পারে আর না তো নড়াচড়া করতে পারে!
সৌম্য আকাশের কথায় অবাক না হলেও আতঙ্কিত চোখে তাকায় সৃজনের দিকে। সৃজনের কান্না থেমেছে। তবে চোখ ভর্তি জল। মায়া মায়া চোখ চারিদিকে ঘোরাচ্ছে বাচ্চাটি। সৌম্য আবারো তাকায় আকাশের দিকে। ছোট করে বলে,
“যাচ্ছি। আপনি সৃজনকে ছেড়ে দিন।”
আকাশ রে’গে বলে, “আগে যা। ফাস্ট।”

সৌম্য কয়েক সেকেন্ড আকাশের দিকে চেয়ে রইল। গত দু’বছর আগে আকাশের বয়স কম ছিল, আজ বেশি। অথচ আকাশের মুখে আগের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বলতা। কিন্তু সে আগের চেয়ে বেশ কালো হয়ে গিয়েছে। ব্যাপারটি সৌম্য’র মনে আসার কারণ আছে। গত দু’বছরে সৌম্য যে কতশত চাকরির জন্য এপ্লাই করেছে, প্রতিটি জায়গা থেকে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। একদম হওয়া চাকরি থেকেও তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রথম প্রথম সৌম্য’র অবাক লাগতো। সে এতোটাও অযোগ্য নয় যে একটা নরমাল চাকরি পাবেনা! কিন্তু সে সত্যিই একটা চাকরিও পায়নি৷ এরপর ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিল, আকাশ বাংলাদেশে না থাকলেও সুদূর বিদেশ থেকে তার সুখে থাকার উপায়গুলো কে’ড়ে নিচ্ছিল। এটা না বোঝার কথা না। আকাশ তাকে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সহ্য করতে পারেনা এ কথা তো সেই প্রায় তিনবছর আগেই বুঝেছিল। যদিও তার মনের কথা কাউকে বলেনি, তবে আজ দুঃখ হলো এই ভেবে যে, আকাশ দিনের পর দিন তার সুখ কে’ড়ে নিজের সুখ কুড়িয়েছে বোধয়, যার প্রমাণ হয়ত আকাশের এই উজ্জ্বলতা আর তার মলিনতা৷

সৌম্য ভেবেছিল, সে তার ইরাবতীকে টিউশন করিয়ে অভাবের সংসারেই জীবনটা কাটিয়ে দিবে। চাকরি লাগবেনা তার। মধ্যবিত্তের জীবন তো তার কাছে নতুন নয়। কিন্তু সেইটুকুও আকাশ কে’ড়ে নিল। সে কল্পনাও করেনি, আকাশ তার নামে এভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে জে’লে পাঠিয়ে দিবে। কথাগুলো ভেবে সৌম্য’র দৃষ্টি ঝাপসা হয়। আকাশের শ’ক্ত কণ্ঠে সৌম্য’র ধ্যান ভাঙে,
“তুই কি যাবি? নাকি তোদের বেবিকে কিছু করব?”

সৌম্য তার ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া দ্রুত সরিয়ে নেয়। আর কারো দিকে তাকালো না। উল্টো ঘুরে সামনের দিকে এগোয়।
সন্ধ্যা তার ভাইকে যেতে দেখে ছটফট করে। খুব করে বলতে চাইল, ‘ভাইয়া যেও না।’
কিন্তু মুখ থেকে একটা টুঁ-শব্দটিও করতে পারলো না আকাশ তার মুখ চেপে ধরে রাখায়। মেয়েটার দু’চোখ ফেটে জলকণা গড়িয়ে পড়ে। তার সেই ভাইকে রক্ষা করতে পারলো না। যে তার জীবন বাজি রেখে সবসময় তার বোনুকে আগলে রেখেছিল। সন্ধ্যার বুক ফেটে কান্না এলো। কতগুলো মাস পরিচিত আকাশ থেকে অপরিচিত আকাশ হয়ে যাওয়ার জন্য অনেক ক’ষ্ট পেয়েছে! আকাশ তার ভাইয়ের শখের বাড়ি কে’ড়ে নিয়েছে, তার সাথে কতশত দুর্ব্যবহার করেছে, এতোকিছুর পরও সন্ধ্যা আকাশকে ভুলে থাকতে চেয়েছে, তবে ঘৃ’ণা করেনি। কিন্তু আজ আকাশের প্রতি এতো পরিমাণ ঘৃ’ণা কাজ করছে, এর পরিমাণ হয়ত অপরিসীম।

সৌম্য ধীরপায়ে সামনে এগোয়, ডান হাতে ঝাপসা চোখজোড়া একবার ডলে নেয়। সৌম্য’র মনে হলো, সে তার জীবনের প্রথম চোখের সামনে দেখছে, কোনো বাবা তার নিজের র’ক্তের ছেলেকে বলির পাঠা বানিয়ে খালাতো ভাইকে জে’লে পাঠাচ্ছে। অথচ আকাশের কাছে তার চেয়ে সৃজনের মূল্য হাজারগুণ বেশি হওয়ার কথা ছিল। সৌম্য’র কেন যেন নিজের ভাগ্যের সাথে সাথে আকাশের ভাগ্য দেখেও হাসি পেল। ভাগ্য কতটা খারাপ হলে, বাবা হয়ে অজান্তেই নিজের ছেলের মাথায় বন্দুক ঠেকায়! সৌম্য খুব করে চাইল, আকাশের মৃ’ত্যুর আগের দিন হলেও আকাশের স্মৃতি ফিরে আসুক। কারণ সেটাই হবে আকাশের সবচেয়ে বড় শা’স্তি। সৌম্য চায়, আকাশ শা’স্তি পাক। আকাশের স্মৃতি মুছে যাওয়ার অজুহাতে আকাশের করা অন্যায়ের শা’স্তি মওকুফ করে দিতে চায় না সৌম্য। তার সবচেয়ে প্রিয় দু’টো মানুষ, তার ইরাবতী আর তার বোনু। যারা আকাশের জন্য গত তিনটা বছর অনেক ক’ষ্ট পেয়েছে। আর আজ তার সাথে যুক্ত হলো তার প্রাণপ্রিয় সৃজন। সৌম্য বড় করে শ্বাস নেয়। মনে মনে আওড়ায়,
“যদি আল্লাহ সত্য থেকে থাকেন, তবে এই জমিনের মাটিতেই তিনি আপনার জন্য কঠোর শা’স্তি প্রস্তুত করবেন।”

এদিকে সন্ধ্যার সব ফ্রেন্ডরা হতবাক হয়ে দেখে যায়। সাফা লামিয়ার পিছে দাঁড়িয়ে সেই তখন থেকে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে। লামিয়া একটু পর পর চোখের পানি মুছে নেয়। আর কেউ না চিনলেও সে তো আকাশকে চেনে। মেয়েটির প্রিয় বান্ধবী সন্ধ্যা আর সৌম্য’র জন্য অশ্রুর বন্যা বইছে যেন।
জাবির নিজেকে শান্ত রাখতে পারছে না। একদিকে সন্ধ্যা, আরেকদিকে সৃজন, আরেকদিকে সৌম্য। জাবির আকাশের দিকে আবারও তেড়ে যেতে নিলে সাইফ পুনরায় জাবিরকে আটকে দিয়ে রে’গে বলে,
“জাবির তুই বারবার ভুলে কেন যাচ্ছিস, ওই লোকটার কাছে আমাদের সৃজন আছে। মাথা গরম করে কোনো সমাধান হয়না। প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর।”

জাবির সৃজনের দিকে তাকায়। যার টলমল অবুঝ চোখ চারিদিকে ঘুরছে। এরপর জাবির তাকায় নিঃশব্দে কান্নারত সন্ধ্যার পানে। ঢোক গিলল ছেলেটা। সে যেটা চায়, সেটা হতে কখনো এতো সময় লাগেনি৷ কিন্তু আজ হচ্ছে না। কে এই লোক? তার ফ্রেন্ডদের পিছনে কেন লাগছে? তবে জাবির, সাইফ আর সাফা অবাক হয়েছে আকাশের সোনালি চোখের মণি দেখে। একদম সৃজনের মতো। যদিও এটা বিশেষ পাত্তা দেয়নি। কারণ পৃথিবীতে একই বৈশিষ্ট্যের মানুষ শুধু দু’টো নয় হাজারটা থাকে।
জাবির সন্ধ্যার দিকে চেয়ে ঢোক গিলে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“ওই দেখ আমাদের সাহসী সন্ধ্যা ক’ষ্ট পাচ্ছে। সৃজন আর সৌম্য ভাইয়া ওর কত আপন বল! অথচ ওরা দু’জনেই কত বিপদে! মনে হচ্ছে জীবনের প্রথম একটা খু’ন করব, আর সেটা এই লোক। যাস্ট নিতে পারছি না একে।
এটুকু বলে থামে জাবির। সাইফের দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব। সৃজনের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে রেখে তাদের হাত-পা যে অদৃশ্য বাঁধনে বেঁধে দিয়েছে। কি করবে তারা?

সৌম্য ভেতরে চলে গেলে আকাশ সন্ধ্যাকে নিয়ে উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। তবে সন্ধ্যার হাত, মুখ কোনোটাই ছাড়ল না। এদিক ফেরানোয় সর্বপ্রথম সন্ধ্যার চোখে পড়ে সৃজনকে। যার মাথায় এখনো বন্দুক ঠেকানো। সন্ধ্যার বুকটা হু হু করে উঠল। মাকে দেখে সৃজন দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে ঠোঁট উল্টে কেঁদে দিয়ে বলে,
“মা আমাকে কুলে নাও।”
ছেলের এমন দশায় সন্ধ্যার চোখে অশ্রু জমে। সে আবারও ছটফটালো। অথচ একটুও নড়তে পারলো না। আকাশ সন্ধ্যার উদ্দেশ্যে বলে,

“তোমার বেবিকে সুস্থ চাইলে ভদ্র মেয়ের মতো চুপচাপ আমার সাথে গাড়িতে গিয়ে বসবে। বুঝেছ?”
কথাটা বলে আকাশ সন্ধ্যার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয়। সন্ধ্যা রে’গে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় সৃজনের দিকে চেয়ে। ঢোক গিলে বলে,
“আপনার সব কথা শুনব। আমার বাচ্চাকে ছেড়ে দিন।”
আকাশ ফোঁস শ্বাস ফেলে বলে,
“সিইওর! আগে গাড়িতে উঠে বসো।”
কথাটা বলে আকাশ তার বা হাতের মুঠোয় রাখা সন্ধ্যার দু’হাত ছেড়ে সন্ধ্যার ডান হাত তার বা হাতের মুঠোয় নিয়ে তার গাড়ির দিকে এগোয়। সন্ধ্যা নিরবে আকাশের সাথে পা মেলায়। দৃষ্টি সৃজনের পানে। সৃজন একবার আকাশের দিকে তাকায়, আরেকবার সন্ধ্যার দিকে। বলে,
“মা কুতায় যাচ্চ? আমিও যাবো।”
ততক্ষণে আকাশ তার গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে দিয়েছে। সন্ধ্যা ছেলের দিকে চেয়ে নিজেকে সামলায়। মুখে জোরপূর্বক এক হাসি টেনে বলে,

“একটু পরেই চলে আসব আব্বা। তুমি….”
আকাশ ধমক দিয়ে বলে,
“আমার লেট হচ্ছে।”
সন্ধ্যা রে’গে তাকায় আকাশের দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তুই একটা অ’মা….”
আকাশ সন্ধ্যাকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ির ভেতর বসিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“বাকিটা জানি।”
কথাট বলে শব্দ করে গাড়ির দরজা লাগায় আকাশ। সন্ধ্যার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে লামিয়া আর সাফার কান্নামাখা মুখ দেখে। লামিয়া ইশারা করে,
“আমরা আছি। তুই চিন্তা করিস না।”

সন্ধ্যা দৃষ্টি ঘুরিয়ে ছেলের দিকে তাকায়। সৃজন অবুঝ চোখে চেয়ে আছে মায়ের দিকে। চোখ দু’টো টলমল করছে। মাকে ডাকলে মা তার কাছে আসেনি, এমন কখনো হয়নি। কিন্তু আজ মা তার কাছে আসছে না বলে সৃজনের কান্না পাচ্ছে। ছেলের মনের ভাব বুঝতে পেরে সন্ধ্যার দমবন্ধ লাগে।
ড্রাইভিং সিটে আকাশ উঠে বসলে সন্ধ্যা আকাশের দিকে চেয়ে রে’গে বলে,
“আমার বাচ্চাকে ছাড়ছেন না কেন?”

আকাশ ভাবলেশহীন। যেন সন্ধ্যার কথা শুনতে পায়নি। ফোনে মগ্ন সে। সন্ধ্যার অ’সহ্য লাগে। শুধুমাত্র সৃজনের জন্য সে এখনো শান্ত আছে। আকাশের সাদা কোর্টের ফাঁকে গুঁজে রাখা পি’স্ত’ল চোখে পড়ে সন্ধ্যার। সন্ধ্যা দৃষ্টি উঠিয়ে আকাশের মুখের দিকে তাকালো। আকাশকে একেবারে অন্যমনস্ক দেখে সন্ধ্যা অতি সাবধানতার সাথে আকাশের পিছনে গুঁজে রাখা পি’স্ত’ল ছিনিয়ে নিতে গেলে আকাশ ঝড়ের বেগে সন্ধ্যার উপর ঝুঁকে এসে সন্ধ্যার শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে মেয়েটার মুখ বেঁধে দেয়। প্যান্টের বেল্ট একটানে খুলে শ’ক্ত করে সন্ধ্যার দু’হাত বেঁধে দেয়। এরপর সিল্টবেল্ট লাগিয়ে দেয়। কাজটা আকাশ এতো দ্রুত করল যেন আকাশ এসব করার জন্যই প্রস্তুত ছিল। সন্ধ্যা আকাশের কান্ডে বিস্মিত হয়। আকাশ তো ফোনে মগ্ন ছিল, তাহলে তার কাজ টের পেল কি করে? ছটফট করে মেয়েটা। চোখ দ্বারা ভস্ম করে আকাশকে।

আকাশ তার কাজ শেষ করে ডান হাতের আঙুলগুলো দ্বারা সন্ধ্যার মুখ দু’দিকে নাড়িয়ে বাঁকা হেসে বলে,
“জানি, ভীষণ চতুর মেয়ে তুমি। বাট আমাকে বোকা ভেবে ভুল করো না। ডোন্ট ওয়ারি, তোমার ভাইকে ছাড়ানোর জন্য আমি এক কিউট ব্যবস্থা করেছি। তুমি শুধু আমার কিছু শর্ত চুপচাপ মেনে নিবে, বিনিময়ে তোমার ভাইকে সসম্মানে বাড়ি পৌঁছে দেয়া হবে। আর….ওয়েট।”
কথাটা বলে আকাশ তার গার্ডদের উদ্দেশ্যে বলে, “বেবিকে ছেড়ে দে। কাজ শেষ।”
কথাটা বলে আকাশ ড্রাইভিং সিটে এসে বসে।

আকাশের কথায় একজন গার্ড সৃজনের মাথা থেকে পি’স্তল সরিয়ে নেয়, অপরজন সৃজনকে কোল থেকে নামিয়ে দিলে লামিয়া দৌড়ে এসে সৃজনকে কোলে তুলে নেয়।
সন্ধ্যার চোখে পড়ে দৃশ্যটি। মনে হলো বুকের উপর থেকে বড়সড় এক পাথর সরে গেল। স্বস্তি পায়। আকাশ গাড়ি স্টার্ট দেয়।
সন্ধ্যার কান্না পায়, আজ প্রথম সে তার ছেলের ডাক এভাবে অবজ্ঞা করল। বুক ফেটে যাচ্ছে। নড়াচড়া বা একটা টুঁ-শব্দ কিচ্ছু করতে পারেনা। আর তার ভাই…সন্ধ্যা আর ভাবতে পারেনা। তার সৌম্য ভাইয়াকে সে কিভাবে জে’লে দেখবে? কি ক’ষ্ট! কি দুঃখ! সবকিছুর কারণ তার এককালের প্রাণপ্রিয় স্বামী।
আকাশ তার মতো গাড়ির স্পিড বাড়ায়। চোখেমুখে গাম্ভীর্যের ছাপ। এতো এতো কান্ড ঘটিয়েও তার মাঝে বিন্দুমাত্র আত্মগ্লানির ছাপ দেখা গেল না।

এদিকে সৃজন লামিয়ার গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে বলে,
“কালামুনি, মা আচেনা আমাল কাচে। মা পুচা হয়ি গেচে।”
লামিয়া অসহায় চোখে তাকায়। পাশ থেকে সাফা চোখের পানি ফেলে আর বা হাত সৃজনের মাথায় বুলায়।
সাইফ আর জাবির আকাশের গাড়ির দিকে যেতে নিলে লামিয়া বলে,
“তোরা উনার সাথে পারবিনা। উনি আকাশ ভাইয়া।”
লামিয়ার কথায় সাইফ জাবির দু’জনেই উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। জাবির দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“ও আকাশ, ওকে আকাশেই পাঠিয়ে দিব। ওর জমিনে কোনো জায়গা হবে না।”
জাবির না বুঝলেও সাইফ বুঝেছে লামিয়া কাকে বুঝিয়েছে। অবাক হয়ে বলে, “সন্ধ্যার হাসবেন্ড আকাশের কথা বলছিস?”
লামিয়া উত্তরে বলে,

“হুম। অরুণ ভাইয়ার কাছে শুনেছিলাম উনি এখন ইংল্যান্ডের মাফিয়া কিং। জানিনা কেন দেশে ফিরে আবারো সন্ধ্যাদের জীবন এমন নরক বানাচ্ছে।”
লামিয়ার কথা শুনে সাইফ, জাবির, সাফা তিনজনেই বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আকাশ তো সৃজনের বাবা। বাবা হয়ে ছেলের সাথে কেমন জ’ঘ’ণ্য আচরণ করল ভাবা যায়? এতোদিন গল্প শুনেছে, আজ নিজ চোখে দেখল। সৃজন লামিয়ার গলা ছেড়ে সাইফ আর জাবিরের দিকে চেয়ে কান্নামাখা গলায় বলে,
“ছাইপ মামা, জাবিল মামা আমি মা কাচে যাবো।”

সকলে সৃজনের দিকে তাকায়। জাবির কিছু একটা ভেবে বলে,
“আমি সৌম্য ভাইয়ার কাছে আছি। তুই সৃজনকে নিয়ে সন্ধ্যাদের গাড়ির পিছনে যা।”
কথাটা বলে পকেট থেকে বাইকের চাবি বের করে সাইফের হাতে দেয়। সাইফ বাইকের চাবি নিয়ে সৃজনকে কোলে নিয়ে দ্রুত বাইকে এসে ওঠে। সৃজন বাইক পেয়ে খুশি হয়। কিন্তু মাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে সেই খুশি মিলিয়ে যায়। সাইফ সৃজনের মাথায় একটা চুমু খেয়ে বলে,
“মামা শ’ক্ত করে ধরে বসো। মার কাছে যাচ্ছি।”
সৃজন দু’হাতে বাইক শ’ক্ত করে ধরে খুশি হয়ে মাথা নেড়ে বলে,
“আত্তা আত্তা মা কাচে চলো।”

জাবির কানে ফোন নিয়ে হাসফাস কণ্ঠে বলে, “বাবা প্লিজ কিছু কর। আমার ফ্রেন্ডের ভাই সৌম্য ভাইয়া উনি। বোঝার চেষ্টা কর।”
জাবিরের বাবা থমথমে কণ্ঠে বলে,
“বাবা তুমি আমার কথা বোঝার চেষ্টা কর। এখানে আমার কথায় কোনো কাজ হবেনা। তুমি অন্য এক ফাঁ’সির আসামিকে দেখিয়ে দিলেও আমি সেটা ম্যানেজ করে নিতে পারব। কিন্তু সৌম্য’র ব্যাপার জটিল। ও আটক হয়েছে অনেক উপরমহলের অর্ডারে। কেউ ওকে ছাড়িয়ে নিতে পারবেনা। আমাদের কারো হাতে কিচ্ছু নেই।”
বাবার কথায় জাবির হার মেনে কল কে’টে দেয়। অ’সহ্য লাগছে সবকিছু। এই প্রথম একটা কাজে ব্যর্থ হয়ে রা’গে ফোঁসফোঁস করছে।
সৌম্যকে সেলের ভেতর ঢুকতে বলছিল পু’লি’শ, তখনই জাবির দৌড়ে এসে সৌম্য’র হাত টেনে ধরে বলে, “ভাইয়া দাঁড়ান।”

সৌম্য পিছু ফিরে তাকায়। জাবিরের পিছনে শুধু লামিয়া আর সাফাকে দেখে বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“আমার বোনু কোথায়? আর সৃজন?”
জাবির ঢোক গিলল। লামিয়া এগিয়ে এসে বলে, “ভাইয়া সন্ধ্যা খালাম্মার কাছে গেছে।”
লামিয়া কথাটা সৌম্যকে চিন্তামুক্ত করার জন্য বলল। জাবির আর সাফা-ও মাথা নাড়ালো। সৌম্য ঢোক গিলে বলে,
“আমি জানি তোমরা মিথ্যা বলছ। জাবির তুমি এখান থেকে যাও। আমার বোনু আর সৃজনকে নিয়ে আমার বাসায় রেখে আসবে। যেখানে ইরাবতী আছে।”
জাবির চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। আকাশ সন্ধ্যার স্বামী। সে সন্ধ্যাকে কোথায় নিয়ে গেল, বুঝতে পারছে না। কিন্তু আকাশের কাজে মনে হয়েছে সৃজন আর সৌম্যকে গুটি বানিয়ে সন্ধ্যাকে নিয়ে গেল। সন্ধ্যার কোনো ক্ষ’তি করবে না। এটা তার ছোট্ট এক ধারণা। কিন্তু এখান থেকে সে চলে গেলেই সৌম্যকে সেলের ভেতর যেতে হবে। যেটা সে চাইছেনা। সন্ধ্যাকে অন্তত এটা বলতে পারবে, তারা সৌম্য ভাইয়াকে ওই অন্ধকার ঘরে ঢুকতে দেয়নি। জাবির ফোঁস করে শ্বাস ফেলে পু’লি’শদের উদ্দেশ্যে বলে,

“চার কাপ চাসহ চেয়ার টেবিলের ব্যবস্থা কর। কথা আছে আমার।
একজন পু’লি’শ কিছু বলতে নিলে জাবির গম্ভীর গলায় বলে,
কথাটা সৌম্য ভাইয়ার সাথে। কোনো কথা শুনতে চাইনা।”
জাবিরের মুখের উপর কেউ কথা বলতে পারলো না। সৌম্য জাবিরের কথা শুনে রে’গে বলে,
“আমি তোমাকে কি বললাম জাবির? আমার বোনু আর সৃজনকে আমার বাড়ি দিয়ে আসতে। আর তুমি আমার সাথে চায়ের গল্প করতে চাইছ? এক্ষুনি যাবে তুমি।”
জাবির ঢোক গিলে বলে,
“ওদের কিছুই হবে না। সৃজন সাইফের সাথে আছে। চিন্তা করবেন না ভাইয়া।”
সৌম্য সাথে সাথে বলে,

“আর আমার বোনু?”
জাবির কি বলবে বুঝল না। একটি চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে,
“ভাইয়া আপনি বসুন। আমরা বসে….
তার আগেই সৌম্য রে’গে জাবিরের কলার ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“আবার আমাকে বসতে বলছ? আমি বলেছি না, তুমি আমার বোনু আর সৃজনের কাছে যাবে? কেন আমার অবাধ্য হচ্ছ? তুমি কিন্তু আমার সাথে বে’য়া’দ’বি করছ জাবির!”
জাবির মাথা নিচু করে নেয়। বলে,
“স্যরি ভাইয়া!”
সৌম্য জাবিরের কলার ছেড়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“তোমরা কি বোঝোনা আমার জন্য আমার বোনু, সৃজন ওরা ঠিক কি! কেন আমার কথা ভেবে এখানে পড়ে আছো তোমরা? আমার কিছুই হবেনা। প্লিজ জাবির যাও! রিকুয়েস্ট করছি।”
সৌম্য’র কথায় জাবির, লামিয়া, সাফা অসহায় চোখে তাকায়। কি করবে তারা এখন?

আকাশ সন্ধ্যাকে নিয়ে তাদের বাড়ি এসেছে। বাসায় আসমানী নওয়ান নেই। এজন্য আকাশকে কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি। আকাশ তার ঘরে সন্ধ্যাকে একটি চেয়ারে বসিয়ে চেয়ারের সাথে বেঁধে রেখেছে। কারণটা অবশ্যই সন্ধ্যার অতিরিক্ত ছটফটানো, সাথে সন্ধ্যার চতুরতার ব্যাপারটি আকাশ খুব ভালো করেই জানে।
আকাশ সন্ধ্যার সম্মুখ বরাবর অপর একটি চেয়ারে বসেছে, ডান পা বা পায়ের উপর রাখা। দৃষ্টি সন্ধ্যার রাগান্বিত মুখপানে।
সন্ধ্যা মোচড়ামুচড়ি করতে করতে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“আপনার প্রবলেম কি? আমি আপনার কথা শুনেছি। এবার আমার বাচ্চাকে এনে দিন আমার কাছে।”
আকাশ নিশ্চুপ। মনে হচ্ছে কিছু ভাবছে। আকাশকে চুপ দেখে সন্ধ্যা আগের চেয়েও চেঁচিয়ে বলে,
“জা’নো’য়ার ছেড়ে দে আমায়। আবারো আমার বাচ্চার কিছু করলে তোকে ছাড়বো না আমি।”
আকাশের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। ঠোঁট কা’ম’ড়ে বলে,
“ধরতেই পারলে না, তার আগেই না ছাড়ার কথা ভাবছ। ভেরি গুড। আমিও এটাই ভাবছি। বাট, ভাষা সংযত কর।”
লাস্ট কথাটা ধমক দিয়ে বলে আকাশ। সন্ধ্যা চেঁচিয়ে বলে, “পারবো না।”
আকাশ ডান হাত চাপ দাঁড়িতে চালায় আর গম্ভীর গলায় বলে,
“পারবে পারবে। সব পারবে। যাস্ট সময়ের অপেক্ষা। ভাইকে জে’ল থেকে বের করতে চাও না?”
কথাটা শুনে সন্ধ্যা শান্ত হয়। আকাশ বুঝতে পেটে একটু হাসল বোধয়। ডান পা সামান্য নাড়াতে নাড়াতে গম্ভীর গলায় বলে,

“১ম শর্ত,
হাসবেন্ডকে ভুলে গিয়ে আমাকে বিয়ে করতে হবে।
২য় শর্ত,
ফ্রেন্ডসার্কেল থেকে ছেলে দু’টোকে বের করে দিতে হবে।
৩য় শর্ত,
উইথআউট হিজাব বাইরে বেরোনো নিষেধ। আই মিন লম্বা বেনি হিজাবের তলায় রাখতে হবে।
৪র্থ শর্ত,
বেবিকে দত্তক দিয়ে দিতে হবে।”
আকাশের কথাগুলো শুনে সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। স্বামীকে ভুলে গিয়ে মানে, আকাশ বোঝাচ্ছে সন্ধ্যার স্বামী অন্যকেউ। এটা সন্ধ্যা বুঝেছে। আকাশকে মাঝের দু’টো শর্ত দিতে দেখে শন্ধ্যা অবাক হয়। আর শেষের শর্ত কি বলল? তার বাচ্চাকে দত্তক মানে আরেকজনে দিয়ে দিতে হবে? কথাটা ভাবতেই সন্ধ্যার বুক ছ্যাঁত করে ওঠে। সে তার সৃজনকে ছাড়া ম’রে যাবে। রা’গে সন্ধ্যার শরীর কাঁপছে। তার হাত খোলা থাকলে এখন সত্যি সত্যিই সে আকাশকে একেবারে খু’ন করে ফেলত।
সন্ধ্যা আকাশের দিকে চেয়ে রা’গে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,

“প্রথমত,
আমি আমার হাসবেন্ডকেই সারাজীবন ভালোবাসবো। তাই কোনো জা’নো’য়া’রকে বিয়ে করার প্রশ্নই ওঠেনা।
দ্বিতীয়ত,
সাইফ আর জাবির সারাজীবন আমার ফ্রেন্ড থাকবে। কারণ আমি আর পাঁচজনের মতো অকৃতজ্ঞ নই।
তৃতীয়ত,
এখন থেকে সবসময় চুল ছেড়ে দিয়ে বাইরে বেরবো।
সবশেষে,
তোর চৌদ্দ গুষ্টি মিলেও আমার থেকে আমার বাচ্চাকে আলাদা করতে পারবিনা। জা’নো’য়া’র একটা।
সন্ধ্যার কথা শুনে আকাশ ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করল। চোখেমুখে ক্রোধ জমা হয়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“শর্তগুলো মানলে তোমার ভাই সৌম্যকে মুক্তি দিয়ে দেয়া হবে। শর্ত না মানলে, সৌম্য’র কনফার্ম ফাঁ’সি। দু’টো অপশন। চুজ করবে তুমি। ফলাফল দিব আমি।”
সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। ফাঁ’সি? তার সৌম্য ভাইয়ার ফাঁ’সি? সন্ধ্যা সারা শরীর কারেন্ট শক খাওয়ার মতো কেঁপে ওঠে। আল্লাহ এসব কিসের শা’স্তি দিচ্ছে তাকে?
আকাশ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। গম্ভীর গলায় বলে,

“ওকে তোমাকে শর্ত মানতে হবেনা। আমি ফলাফল দিচ্ছি।”
এরপর আকাশ তার পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল করে। সাথে সাথে রিসিভ হয়। আকাশ বা হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে ফোনের ওপাশের ব্যক্তিকে বলে,
“সৌম্য’র ফাঁ’সি….
মাঝ থেকে সন্ধ্যা চোখ বুজে বহুক’ষ্টে উচ্চারণ করে,
“আমি আপনার সব শর্ত মানবো। আমার ভাইয়াকে ছেড়ে দিন।”
আকাশ বাঁকা হেসে বলে,
“ক্যান্সেল। মামলা উঠিয়ে নাও। দ্যান সৌম্যকে গাড়ি করে সেভলি ওর বাসায় পৌঁছে দাও।”
সন্ধ্যার বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে দু’ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। তার সৃজনকে সে কিছুতেই কোথাও যেতে দিবেনা। আসমানী নওয়ান বাড়ি ফিরলে তার এই জা’নো’য়া’র ছেলেকে সে দেখে নিবে।

আবছা আলোকময় রুমের মাঝখানে একটি পাতা চেয়ারে এক লোক বসা। যার পরনে কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, মুখে কালো রুমাল বাঁধা। অন্ধকারের কারণে ভীষণ অস্পষ্ট লাগে তাকে। শুধু সাদা দু’চোখের মণি দু’টো জ্বলজ্বল করছে। যে চোখ দু’টো র’ক্তিম হয়ে উঠেছে। অজস্র ক্রোধ নুইয়ে পড়ছে যেন। হঠাৎ-ই তার সামনে পাতা একটি কাঁচের টেবিলে গায়ের জোরে একটি লাথি বসায়। টেবিলের উপর রাখা তিনটি হুইস্কির বোতল, দু’টো গ্লাস সহ টেবিলের কয়েক হাত দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে। ভে’ঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় সব। ছেলেটি চিৎকার করে বলে,
“সব প্ল্যান ভেস্তে যাচ্ছে। সব ভেস্তে যাচ্ছে। ওই এভি আর আমার প্রাণকে আলাদা করতে এতকিছু করলাম, সেই এভি আবারো আমার প্রাণের পিছু ছুটছে। নাহ্, এসব হতে পারে নাহ্। আমার সব চেষ্টা বৃথা যেতে পারেনা।”
কথাগুলো বলতে বলতে ছেলেটি ঘরের কোণায় দাঁড়ানো একজন লোকের কাছে এসে লোকটির মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হুংকার ছেড়ে বলে,

“এই ডক্টর, এভিকে কিসের মেডিসিন দিস তুই? ও কেন আবারো আমার প্রাণের দিকে পা বাড়ায়?”
লোকটি থরথর করে কাঁপছে। ভীত কণ্ঠে বলে,
“আমি শুধু মেমোরি ব্লক করে রাখতে পারি। বাট ফিলিংস মে’রে ফেলার মেডিসিন আমার কাছে নেই বস।”
কথাটা সাদা চোখের মণিওয়ালা ছেলেটির বিন্দুমাত্র পছন্দ হলো না। বা হাতে ডক্টরের গলা চেপে ধরে, ডান হাতের পি’স্তল লোকটির মাথায় আরও শ’ক্ত করে চেপে ধরে বলে,
“নেই মানে? আবিষ্কার কর মেডিসিন। নয়তো তোর অস্তিত্ব কেউ খুঁজে পাবে না।”
কথাটা বলে সে ডক্টরকে ধাক্কা মে’রে ফেলে দেয়। চিৎকার করে বলে,
“সৌম্যকে সসম্মানে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে মানে কি? ওকে ছাড়বো না আমি। ছাড়বো না ওকে।”
ছেলেটির প্রতিটি কথায় তীব্র ক্রোধ ফুটে ওঠে। চোখ দু’টো যেন জ্বলছে। ধীরে ধীরে সে দেয়াল ঘেঁষে বসে পড়ে। ডান পায়ের হাঁটু বরাবর পি’স্ত’ল ধরে রাখা ডান হাত রাখে। বা পা মেলে দেয়। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে চোখ বুজে নেয়। চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে কিছু স্পষ্ট দৃশ্য।

“আদর অদীর আদর অদীর আদর অদীর…..
সাত বছরের সন্ধ্যা গাছতলায় বসে অনবরাত এই নাম জপছে। এক পর্যায়ে অ’সহ্য হয়ে সে থেমে যায়। উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত কোমরে রেখে দন্ডায়মান অধীরের দিকে চেয়ে অধৈর্য গলায় বলে,
“তোমার নাম কোনটা?”
১৮ বছরের অধীর সন্ধ্যার কান্ড দেখে হাসতে হাসতে নিচু হয়ে হাঁটুতে ভর দেয়। অনেক ক’ষ্টে নিজেকে সামলে সন্ধ্যার মুখ বরাবর মুখ রেখে বলে,
“কোনোটাই না। দুটোই ভুল। তোর মাথায় তো গোবরও নেই রে প্রাণ। সামান্য একটা নাম মনে রাখতে পারিস না।”
সন্ধ্যা রে’গে বলে,
“তুমিও তো আমার ভুল নাম বলো। আমার নাম সন্ধ্যা আর তুমি সারাদিন প্রাণ প্রাণ কর।”
অধীর ডান হাতে সন্ধ্যার মাথায় একটা টোকা মে’রে বলে, “আমার জন্য তোর নাম প্রাণ। প্রমাণ লাগবে তোর?”
সন্ধ্যা উপরনিচ মাথা নেড়ে বোঝায়, ‘প্রমাণ লাগবে তার।’
অধীর মৃদু হেসে বলে,

“তাহলে দ্রুত বড় হয়ে যা।”
সন্ধ্যার মন খারাপ হয়। এই কথা শুনতে শুনতে তার কান পঁচে গেল। সে জিহ্বা বের করে অধীরকে মুখ কেলিয়ে উল্টোদিকে দৌড় দেয় আর বলে,
“তোমার প্রমাণ তোমার কাছেই রাখো। মিথ্যাবাদী তুমি। শুধু মিথ্যা বল।”
অধীর সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দৌড়ের ফলে ছোট্ট সন্ধ্যার কোমর সমান দুলতে থাকা চুলগুলোর দিকে চেয়ে মৃদু হাসে।

গত পনেরো বছর আগের ছোট্ট একটি ঘটনা ভেবে অধীরের ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে ওঠে। যার প্রভাবে ওঠে সাদা চোখের মণি দু’টো জ্বলজ্বল করে। অজানায় দৃষ্টি রেখে ক্ষীণ স্বরে আওড়ায়,
“আমি মিথ্যাবাদী নই প্রাণ। এটা আমি একদিন ঠিক প্রমাণ করব, দেখে নিস।”

আকাশ এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে নিয়ে একদম সন্ধ্যার সামনে বসে। তার দু’পায়ের মাঝে সন্ধ্যার দু’পা। তবে বডির সাথে টাচ লাগলো না। সন্ধ্যা ঝাপসা চোখজোড়া সরিয়ে নেয়। আকাশ মৃদুস্বরে বলে,
“বিয়ের আগে কোনো ইচ্ছে থাকলে বলতে পারো।”
সন্ধ্যার ইচ্ছে করল এই পৃথিবীতে যত গা’লি আছে, সবধরনের গা’লি এইমুহূর্তে আকাশকে দিতে৷ সে নিজের ইচ্ছে দমন না করে রা’গে ফোঁসফোঁস করতে করতে বলে,
“তুই একটা, জা’নো’য়া’র, অ’মা’নু’ষ, শ’য়’তা’ন। আল্লাহ তোর বিচার করবে।”
আকাশ রে’গে বোম হয়ে যায়। ভস্ম করা দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। এক পর্যায়ে রা’গ কমাতে না পেরে ডান হাত উঠায় সন্ধ্যাকে থা’প্প’ড় মা’রার জন্য। এটা দেখে সন্ধ্যা দ্রুত চোখ খিঁচিয়ে নেয়, মাথাটা একটু পিছিয়ে নেয়।
সন্ধ্যাকে ভ’য় পেতে দেখে আকাশের হাত মাঝপথে থেমে যায়। রা’গ কমল বোধয়। থমথমে মুখে তাকায় সন্ধ্যার মুখপানে। সূক্ষ্ম চোখে পরোখ করে সন্ধ্যাকে।
সন্ধ্যার মাথায় দেয়া ওড়না অনেক আগেই পড়ে গিয়েছে। চুলগুলো ভীষণ এলোমেলো। মুখে মলিনতার ছাপ, সাথে অসম্ভব তেজ।

থা’প্প’ড় দেয়ার জন্য উঠানো হাতের গতি ঘুরিয়ে আকাশ সন্ধ্যার মুখের সামনে আসা এলোমেলো কিছু চুল সন্ধ্যার কানের পিঠে গুঁজে দেয়। সন্ধ্যা কেঁপে ওঠে। সাথে সাথে চোখ মেলে তাকায়। চোখাচোখি হয় আকাশের সাথে।
আকাশ সন্ধ্যার লালিত চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা গলায় বলে,
“দু’বছর আগে এতোটা উগ্র ছিলে না। চালচলনে শালীনতা ছিল। যার ছিটেফোঁটাও তোমার মাঝে এখন দেখতে পাচ্ছিনা।”
থা’প্প’ড়ের বদলে আকাশের এহেন কাজে সন্ধ্যা অবাক হয়৷ অবাক হয়, আকাশকে তার সাথে শান্তভাবে কথা বলতে দেখে। ঢোক গিলল মেয়েটা।
আকাশের কথার উত্তরে সে বিদ্রুপ স্বরে বলে,
“নিজেকে কখনো আয়নায় দেখেননা? আমার দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেকে একবার আয়নায় দেখে নিবেন, ঠিক কতটা অ’মা’নু’ষ আপনি!”
আকাশ দু’হাত আড়াআড়িভাবে বুকে গুঁজে থমথমে কণ্ঠে বলে,
“আমি কখনোই ভালো ছিলাম না। এরকমই আমি। আর এরকমই থাকবো। বাট তোমাকে ভালো মেয়ে হয়ে থাকতে হবে। গট ইট?”
সন্ধ্যা রে’গে উত্তর করে,

“পারবো না। আমাকে ভালো মেয়ে হয়ে থাকতে হবে, এটা কোথায় লেখা আছে?”
আকাশ সূক্ষ্ম হেসে বলে,
“আমার পার্সোনাল ডিকশোনারিতে। আমার প্রতিটি কথা মানতে বাধ্য তুমি।
সন্ধ্যা অ’সহ্য কণ্ঠে বলে,
“কেন বাধ্য হব আমি? সবসময় নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে বাধ্য করবেন তাই তো?”
আকাশ মৃদুস্বরে বলে,

“তুমি বেশি অ’বাধ্য হলে অবশ্যই ক্ষমতা প্রয়োগ করব। এনিওয়ে, ইউ আর মাই ফিউচার ওয়াইফ। কথাটা মাথায় রাখবে, তাহলে তোমার মাঝে বাধ্যগত ব্যাপারটি আপনাআপনি চলে আসবে।”
সন্ধ্যা কি বলবে বুঝল না। আকাশ অন্যকাউকে তার স্বামী ভেবেছে, আর এখন তাকে বিয়ে করতে চাইছে। কিন্তু কেন? গত আড়াই বছর আগে দেশে এসে তো তাকে সহ্যই করতে পারতো না। আর আজ তার সাথে এমন করছে কেন? আকাশের কয়েক সেকেন্ডের ব্যবহারে তার মনে হলো, তার সেই আগের আকাশ তার সামনে বসে আছে। যে সবসময় তার সাথে শান্তস্বরে কথা বলত। কিন্তু সেই আকাশ তাকে একটুও ক’ষ্ট দিত না। আর এই আকাশ তার সবচেয়ে প্রিয় দু’জন প্রাণকে ক’ষ্ট দিয়ে তাকে দুঃখের সাগরে ফেলে দিয়েছে। সন্ধ্যা শান্ত, গম্ভীর, আকাশের সোনালি চোখের মণিতে দৃষ্টি রেখে মনে মনে আওড়ায়,

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৪

“কখনো ভাবিনি, একদিন আপনাকে এতটা ঘৃণা করতে হবে। যে ঘৃণার বোঝা আপনাকে নয়, আমাকেই বেশি বয়ে বেড়াতে হবে। যেখানে দুঃখ-ক’ষ্টের সকল ভার বরাবরই আমার।”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৫