Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৯

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৯

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৯
DRM Shohag

চারপাশে বনজঙ্গল। এখানে থেকে ঘণ্টাখানেক হাঁটলেও মানুষের হদিশ পাওয়া যাবেনা। এমন একটি জায়গায় আকাশের একটি দোতলা বাড়ি বানানো আছে, যেখানে আকাশ সৃজনকে এনেছে। চারিদিকে বনজঙ্গল হলেও বাড়ির চারপাশটা কিছুটা দূরত্ব জুড়ে ফাঁকা করে রাখা, যাতে বাড়ি থেকে বের হলেই হঠাৎ কেউ এমন বনজঙ্গল দেখে ভ’য় না পেয়ে যায়৷
আকাশ সৃজনকে নিশে রান্নাঘরে এসেছে। বাইরে থেকে অনেক খাবার আনিয়ে রাখা আছে এই বাড়ি। কিন্তু আকাশ সেসব সৃজনকে দিল না। সে সৃজনের পছন্দের পাস্তা রান্না করছে মনোযোগ দিয়ে। সৃজনকে রান্নাঘরের একটি তাকের উপর পা ঝুলিয়ে বসিয়ে রেখেছে। সৃজন কি আর চুপচাপ বসে থাকার ছেলে? সে হাতের কাছে যেটাই পাচ্ছে সেটাই উল্টেপাল্টে দেখছে।

আকাশ চা’কু দ্বারা পেয়াজ, ক্যাপসিকাম সহ আরও প্রয়োজনীয় যা যা লাগে সেসব কা’ট’ছে আর একটু পর পর আড়চোখে সৃজনকে খেয়ালে রাখছে। বা হাতে যে গু’লিটা বিঁধেছিল, এট সে কিছুক্ষণ আগে নিজে নিজেই বের করেছে হাত থেকে। এরপর বা হাতে একটি ছোট্ট রুমাল পেঁচিয়ে রান্নার কাজে লেগে পরেছে। তাড়াহুড়ো করছে সে। কারণটা অবশ্যই সৃজন। রাত ১২ টা বাজতে চলল, অথচ সৃজন এখনও কিচ্ছু খায়নি। এই ভাবনাটুকুই আকাশের কাজের স্পিড ক্ষণে ক্ষণে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সৃজন এতক্ষণ একজায়গায় বসে থেকে থেকে বিরক্ত হয়। সে হাতের ছোট ছোট পাত্রগুলো রেখে তাকের উপর উঠে দাঁড়ায়। এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে চুলার কাছে দাঁড়ায়। আকাশ নিচু হয়ে একটি পাত্র উঠাচ্ছিল৷ এজন্য তার চোখে পড়েনা সৃজন এদিকটায় এসেছে। অবুঝ সৃজন সামনে আর তেমন কিছু না পেয়ে, চুলার উপর উঠিয়ে দেয়া গরম পানির পাত্রে হাত লাগায়। সাথে সাথে ছ্যাঁকা খেয়ে শব্দ করে কেঁদে দেয়। ওদিকে আকাশ সৃজনের কান্নার আওয়াজ পেয়ে দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সৃজনের ব্যাপারটি চোখে পড়তেই আকাশের চোখেমুখে ভীতি ফুটে ওঠে। সে এক সেকেন্ডও সময় ন’ষ্ট না করে দ্রুত বা হাতে চুলার উপর থাকা পানির পাত্রটি উল্টে ফেলে দেয়। গরম ফুটন্ত পানিসহ পাত্রটি আকাশের বা পায়ের উপর এসে পড়ে। অথচ এই কারণে আকাশের মাঝে বিন্দুমাত্র ব্য’থার ছাপ দেখা গেল না। তার সম্পূর্ণ মনোযোগ সৃজনে। সে ব্যস্ত হয়ে ডানহাতে সৃজনকে ঝট করে কোলে তুলে নেয়। এরপর পাশেই ট্যাপের নিচে সৃজনের ডান হাতটি ধরে রাখে।

ছ্যাঁক খাওয়া হাতের উপর ঠান্ডা পানি পড়ায় সৃজন একটু আরাম পায়, কান্নার বেগ কমে আসে তার৷ আকাশ নলকূপের নিচে তার বা হাতের মাঝে সৃজনের ছোট্ট হাতটি রেখে, সৃজনের হাত আলতো হাতে বুলিয়ে দেয়। একটু পর পর সৃজনকে দেখে। ততক্ষণে সৃজনের কান্না একেবারে থেমেছে। চোখে টইটুম্বুর পানি নিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আদোআদো স্বরে বলে,
“কুব বিতা পাইচি। অনেক গলম লাগচিল।”
আকাশ সৃজনের হাত ট্যাপের নিচ থেকে উঠিয়ে, সৃজনের নরম তুলতুলে হাতে একটি ছোট্ট চুমু খেয়ে মৃদুস্বরে বলে,
“ঠিক হয়ে যাবে।”
সৃজন অবুঝ নয়নে চেয়ে বলে,
“ককন টিক অয়ে যাবে?”
আকাশ বা হাতে সৃজনের কান্নাভেজা মুখ মুছে দিয়ে ছোট করে বলে, “এখন।”

এরপর রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে বা পা চিনচিন করে উঠল। দৃষ্টি নিচু করে পায়ের দিকে তাকালে দেখল গরম পানিরসহ পানির পাত্র তার পায়ের উপর পড়েছে। এ নিয়ে আকাশের মুখে ব্য’থার ছাপ না ফুটলেও, চোখেমুখে অদ্ভুদ এক ঝিলিক দেখা গেল। স্মৃতির পাতায় কিছু উঁকি দিয়েছে হয়ত। এমন ঘটনা তার সাথে আগেও ঘটেছিল। আর সেদিন কেউ একজন বরফ নিয়ে দৌড়ে তার পায়ের কাছে বসে পায়ে বরফ লাগিয়ে দিচ্ছিল। আকাশ ঢোক গিলল। ভ্রুম কাটাতে চোখ বুজে মাথা এদিক-ওদিক নাড়ালো দু’বার৷ এরপর দ্রুতপায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
ড্রয়িং রুমে এসে আকাশ সৃজনকে ডিভানের উপর বসিয়ে দেয়। এরপর একটি মলম এনে যত্ন করে সৃজনের হাতে লাগিয়ে দেয়। সৃজনের গালে হাত দিয়ে মৃদুস্বরে বলে, “ব্য’থা আছে আর?”
সৃজন উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,

“ই না। বিতা বালো অয়ি গেচে।”
আকাশের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। হঠাৎ সে খেয়াল করে তার ডানপায়ের কাছে নরম কিছু ঘেঁষছে। আকাশ সামান্য ঝুঁকে তার পোষা বিদেশি বিড়াল দেখে মৃদু হাসলো। নিচু হয়ে বিড়ালটিকে কোলে তুলে নেয়। মালিকের স্পর্শ পেয়ে বিড়ালটি আদুরে ভাব ধরে আকাশের সাথে লেপ্টে থাকে। আকাশ আলতো হাতে বিড়ালটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পাশে বসা সৃজন, আকাশ আর বিড়ালটির দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। বিড়ালটির দিকে আঙুল তাক করে বলে,

“ইটা বিলাল। ওকে তুমি কুলে নিচ কেনু? তুমি শুদু আমাকি কুলে নাউ, বুচ্চ বাতাচ বাবু?”
সৃজনের কথা শুনে আকাশ অবাক চোখে তাকায়। কি হলো কে জানে হঠাৎ-ই ফিক করে হেসে দেয়। সৃজন এই প্রথম আকাশে এভাবে হাসতে দেখে অদ্ভুদভাবে তাকায়। আকাশ তার উরুর ডান পাশে বিড়ালটিকে রেখে বা পায়ের উরুর উপর সৃজনকে নিয়ে সৃজনের মাথায় একটা চুমু খায়। এরপর বিড়ালটির দিকে তাক করে বলে,
“ওর নাম কোকো। ও তোমার বন্ধু হতে চায়। তুমি ওর বন্ধু হবে না?”
সৃজন বিড়ালটির দিকে চেয়ে বলে,
“কুকো, তুমি আমার বুন্দু অতে চাও?”
বিড়ালটি মিআউ করে ওঠে। লেজ নাড়ায়। সৃজন কি বুঝল কে জানে! সে শব্দ করে হেসে বলে,
“হু হু। কুকো আমাল বুন্দু অতে চায়। কি মুজা!”

কথাটা বলে বা হাত কোকোর মাথায় দিয়ে বুলায়, একটু আগে ঠিক যেভাবে আকাশ কোকোর মাথায় হাত বুলাচ্ছিল।
আকাশ সৃজনকে ডিভানের উপর বসিয়ে পাশে কোকোকে বসিয়ে দেয়। সৃজন কোকোর সাথে খেলায় ব্যস্ত। কোকোও বোধয় বুঝল সৃজনই তার একমাত্র ভালো বন্ধু। আকাশ সৃজনের চারপাশে কুশন রেখে রান্নাঘরের দিকে যেতে নিয়ে ব্য’থায় বাম পা টা সামান্য কুঁকড়ে নিল। দৃষ্টি নিচু করলে চোখে পড়ল তার বা পা টকটকে লাল হয়ে আছে। ঠোসার মতো কিছু উঠেছে হয়ত। আকাশ সেই পায়ের দিকে চেয়েই ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে যায়। মুখে বিন্দুমাত্র ব্য’থার ছাপ নেই। না তো সেখানে মলম লাগানোর তাড়া আছে! বরং পায়ের এই সামান্য ব্য’থাকে উপহাস করে আকাশ একটু হাসলো।

প্রায় ১০ মিনিটের মাথায় আকাশ পাস্তা রান্না করে নিয়ে সৃজনের পাশে এসে বসে। সৃজন এখনও কোকোর সাথে খেলায় ব্যস্ত। এটুকু সময়েই তাদের মাঝে বেশ ভাব হয়ে গেছে। আকাশ সন্তুষ্টির নজরে দেখল সৃজন আর কোকোকে। খেলায় ব্যস্ত থাকা সৃজনের মুখে আকাশ একটু একটু করে পাস্তা তুলে দেয়। সৃজন কোকোর সাথে আদোআদো স্বরে কথা বলে আর খায়। এভাবেই আকাশ সৃজনকে প্রায় সব পাস্তা খাইয়ে দেয়। বাটির এক কোণায় খুব সামান্য পাস্তা পড়ে আছে। পাস্তাটুকু চামুচে ভরে আকাশ সৃজনের দিকে নিতে গিয়েও কি যেন ভেবে থেমে যায়। পাস্তা ভর্তি চামুচটি বাটিতে রেখে দু’হাতে কোকোকে সৃজনের কোল থেকে মেঝেতে নামিয়ে দেয়। সৃজন চেঁচিয়ে ওঠে,

“আলে আলে আমাল বুন্দুকে দাও।”
আকাশ সৃজনের দু’হাত তার দু’হাতের মাঝে নিয়ে ঢোক গিলে বলে,
“আব্বু আমাকে একবার খাইয়ে দিবে?”
আকাশের কণ্ঠে মৃদু কম্পন। দৃষ্টি জুড়ে বুকভরা কিসের যেন আশা বাঁধা। ছোট্ট সৃজন আকাশের মনোভাব কিছুই বুঝল না। কিন্তু তাকে আব্বু বলে ডাকায় সৃজন ঠোঁট উল্টে বলে,
“তুমি আমাকে আব্বু বুলচ কেনু? ইটা তো আমাল সুম্মো মামা বুলে, তুমি আল বুলবানা। বুচ্চ বাতাচ বাবু?”
‘তুমি আল বুলবানা’ সৃজনের বলা এই কথাটা শুনে আকাশের মনে হলো, এই পৃথিবীতে তার মতো অসহায় ব্যক্তি বোধয় আর একটাও নেই। অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সৃজনের দিকে।
আকাশকে চুপ দেখে সৃজন আকাশের বলা খাওয়ানোর কথাটা ভেবে হঠাৎ হেসে ফেলল শব্দ করে। হাসতে হাসতে বলে,

“বল্ল মানুচেরা চোট্ট মানুচকে কাওয়ায়। আল তুমি বল্ল মানুচ অয়ে চোট্ট মানুচের হাতে কেতে চাও।
কথাটা বলে সৃজন থামে। কারো কর্মকান্ডে হাসি লাগলে তাকে জোকার বলে। এটা সে অরুণের মুখে শুনেছিল। সে অনুযায়ী সৃজন আকাশের দিকে চেয়ে আবারো হাসতে হাসতে বলে,
জুকাল বাতাচ বাবু কুতাকাল।”
কথাটা শুনে আকাশের মুখখানা আরও মলিন হয়। আকাশকে হাসতে না দেখে সৃজন একা একাই হাসি থামায়। তার ছোট্ট মস্তিষ্কে নাড়া দেয়, মা যখন তার কাছে কিছু চায় তখন সে সেটা না দিয়ে হাসলে মা-ও হাসে না। অর্থাৎ মন খারাপ করে থাকে। তার মতে আকাশও তার হাতে খেতে চেয়েছে৷ কওন্তু সে না খাইয়ে দেয়ায় আকাশ মন খারাপ করে আর হাসছে না। তাই সৃজন বাটিতে রাখা চামুচে থাকা পাস্তাটুকুর অর্ধেক টুকু ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে উঠে দাঁড়ায় একদম আকাশের মুখের সামনে। ডান হাত আকাশের মুখের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

“নাও, কাও বাতাচ বাবু। আল হাচো।”
সৃজন দাঁড়িয়ে যাওয়ায়, তার মুখ একদম আকাশের মুখ বরাবর হয়েছে। সৃজনের কাজে আকাশ শীতল দৃষ্টিতে তাকায়। সে সত্যি সত্যিই হা করলে সৃজন তার ছোট্ট ডান হাতে আকাশের মুখের ভেতর পাস্তা দিয়ে দেয়। আকাশ পাস্তাটুকু মুখে নিয়ে সৃজনের দিকে চেয়ে মুখ নাড়ায়। সৃজন আকাশকে খাইয়ে দিয়ে হাসে, কাজটা তার বেশ লাগলো। সৃজন আবারো নিচু হয়ে চামুচে পড়ে থাকা বাকি পাস্তাটুকু হাতের মুঠোয় নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এটাও আকাশকে খাওয়াতে নিয়ে থেমে যায় সৃজন। বাটি যে ফাঁকা এটা সে দেখেছে। এটা তার খুব পছন্দের। কিন্তু সব শেষ হওয়ায় মন খারাপ হলো। সে মত পাল্টে ফেলে এই পাস্তাটুকু নিজে খাওয়ার জন্য নিজের দিকে হাত বাড়িয়ে হা করতে নিলে, আকাশ বা হাতে দ্রুত সৃজনের হাত টেনে ধরে। বিচলিত কণ্ঠে বলে,

“তেমার হাতে ময়লা আছে। এটা তোমার খাওয়া যাবেনা।”
কথাটা শুনে বিচক্ষণ সৃজন এর বিরোধিতা করল না। কারণ হাত না ধুয়ে মা-ও তাকে কখনো খেতে দেয় না। সে খেতে নিলে মা-ও এভাবেই আটকে দেয়। সে যেহেতু হাত ধোয়নি, তাই তার হাতে যে ময়লা আছে এটা সে বুঝল। কিছু একটা ভেবে সে আকাশের দিকে চেয়ে বলে,
“তায়লে তুমি আমাল ময়লা আতে কেয়িচ কেনু?”
কথাটা শুনে আকাশ মৃদু হাসল। সৃজনের হাত এগিয়ে এনে এই পাস্তাটুকুও তার মুখে নিয়ে খাবারটুকু গিলে নেয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“কারণ আমি ভালো মানুষ নই। আমার মনেও ময়লা।”
কথাটা সৃজনের ঠিক পছন্দ হলো না। আকাশ তাকে কোলে নেয়, তাকে চুমু খায়, ব্যথা পেলে মলম লাগিয়ে দেয়। তাকে তার পছন্দের খাবার খাইয়ে দেয়। এতোসবের পর সৃজনের মন মানলো না, আকাশ ভালো নয়। সে তার ভাবনা অনুযায়ী বলে,

“ই না। বাতাচ বাবু বালো।”
আকাশ শীতল দৃষ্টিতে তাকায় সৃজনের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ সৃজনকে দেখল। এরপর সৃজনের হাত ধুইয়ে দিয়ে সৃজনকে পানি খাওয়ায়। সাথে সৃজনের মুখ মুছে দেয়। বাটি টি-টেবিলের উপর রেখে সৃজনকে ডিভানের একপাশে বসিয়ে দেয়। সৃজনের পিছনে কুশন রেখে সে সৃজনের দু’পাশের ফাঁকে মাথা রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। আকাশের কোমর পর্যন্ত ডিভানের উপর জায়গা হয়, বাকিটুকু মেঝেতে ছড়িয়ে রাখে। চোখজোড়া বন্ধ। দু’হাত বুকে আড়াআড়িভাবে গুঁজে রেখে মৃদুস্বরে বলে,
“চুলগুলো টেনে দাও তো আব…..
আব্বু বলতে গিয়ে থেমে গেল আকাশ। একটু আগে সৃজনের বারণ করার কথা মনে পড়ল। আকাশ ঢোক গিলল। আর কিছু বলল না।
আকাশকে এভাবে শুয়ে পড়তে দেখে সৃজন আকাশের দু’গালে তার ছোট ছোট দু’হাত রেখে মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে বলে,

“তোমাল কি অয়িচে বাতাচ বাবু? অচুক অয়িচে অচুক?”
আকাশ ছোট করে বলে, “হুম।”
সৃজন সাথে সাথে জিজ্ঞেস করে,
“কি অচুক”
আকাশ চোখ বুজে রেখেই মলিন গলায় বলে, “যে অসুখের কোনো ঔষধ নেই, সেই অসুখ।”
সৃজন অবুঝ নয়নে চেয়ে আওড়ালো, “ওচুদ নেই কেনু?”
আকাশ কিছু বলল না। তার চোখের সামনে ভাসলো সন্ধ্যার রাগান্বিত মুখে বলা তিনটা শব্দ, ‘তুই একটা জা’নো’য়া’র।’
যেটা সন্ধ্যা সবসময় বলে থাকে। চোখের পর্দায় ভাসে, পুলিশ স্টেশনের সামনে দাঁড়ানো সৌম্য’র অসহায়ত্বে ভরা পানিতে টইটুম্বুর দৃষ্টি।
আকাশ ভেতরে ভেতরে ছটফট করল খুব। তবে উপর থেকে শান্ত, নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল ছেলের পায়ের কাছে। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ব্যক্তিদের কাতারে ফেলতে ভুলল না। কেন এসব অনুভূতি আকাশের? সে নিজেই জানে।

প্রায় এক ঘণ্টা যাবৎ নিয়াজ হসপিটালের সামনে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যাকে তার ফ্রেন্ডরা নিয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা লামিয়ার বাড়ি থাকবে বলে গিয়েছে। নিয়াজ সন্ধ্যাকে আবারো ভালোভাবে বুঝিয়ে বলেছে, সৃজন যেখানে আছে নিরাপদে আছে। ওর জন্য টেনশন না করতে। সন্ধ্যা আর সৃজন যেখানে সেখানে নিরাপদ নয়, তাই এখন সৃজনের থেকে একটু দূরত্ব মানতে হবে। সন্ধ্যা বোধয় বুঝেছে। সন্ধ্যাদের পিছু পিছু আকাশের গার্ড গিয়েছে। এটা সন্ধ্যা খেয়াল না করলেও নিয়াজ খেয়াল করেছে। সে সন্ধ্যাকে কিছু বলেনি। আকাশের ব্যাপারে কিছু না বলাই সবচেয়ে বেটার অপশন বলে মনে হয় নিয়াজের। এসব ভাবনা অনেক আগেই চাপা পড়ে গেছে ঘণ্টাখানেক আগে ঘটে যাওয়া শিমুর ঘটনায়। তার মস্তিস্ক জুড়ে শুধু শিমু বিচরণ করছে। যে মেয়েটাকে ভাবতে ভাবতেই তার জীবন পার হয়ে যাচ্ছে। পাওয়া আর হচ্ছে না। নিয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে উল্টো ঘুরতে নিলে কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে বিরক্ত হয়। ডানদিকে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালে সৌম্যকে দেখে মুখে ফিটে ওঠা বিরক্তির ছাপ দূর হয়ে যায়। কিছু বলতে নিয়ে থেমে সৌম্য’র চোখের দিকে তাকিয়ে। নিয়াজ ঢোক গিলল। ভাবছে সন্ধ্যার খবর সৌম্য’র কানে পৌঁছেছে হয়ত। সন্ধ্যা তো প্রায় ঠিক হয়েই গিয়েছে৷ তাহলে অযথা আবার কে সৌম্যকে এই খবরটা দিতে গেল। কথাটা ভেবে নিয়াজ বিরক্ত হলো বেশ। তার ভাবনার মাঝেই সৌম্য ভাঙা স্বরে বলে,

“নিয়াজ ভাইয়া আপনি জানতেন, আমার ইরাবতী কন্সিভ করেছে?”
কথাটা শুনে নিয়াজ কি বলবে বুঝল না। সন্ধ্যার ব্যাপারটি সৌম্য জানেনা ভেবে সে স্বস্তি পেলেও ইরাকে নিয়ে তার মস্তিষ্কে নতুন করে চিন্তা জড়ো হলো। প্রায় এক মাস আগে ইরা হসপিটালে একাই এসে টেস্ট করিয়েছিল। রিপোর্ট পজেটিভ আসার পর নিয়াজ ভীষণ ভ’য় পেয়েছিল। এরপর সে ইরাকে ব্যাপারটি জানালে ইরা তাকে জানায়,
‘এটা এক্সিডেন্টলি ছিল না। সে ইচ্ছে করে কন্সিভ করেছে।’

নিয়াজ ভীষণ অবাক হয়েছিল। ইরাকে বকেছিলও খুব। ইরা তো জানতো ইরা কখনো বাচ্চা নিতে গেলে সে বাঁচবে না, তবুও কেন এমন করল! ইরা সেদিন তার কাছে বসে কেঁদেছিল। বড় ভাই ভেবে তার কাছে তার ছোট্ট ছোট্ট দুঃখ তুলে ধরেছিল। সৌম্য’র বাবা হওয়ার অসহায়ত্বের কথা ইরার মুখে আরও অসহায় লাগছিল শুনতে। নিয়াজ বলার মতো কিছুই পায়নি। এরপর সে ইরাকে একটি ভালো গাইনির আন্ডারে ট্রিটমেন্টে রেখেছে। ইরা তাকে জানিয়েছিল, সৌম্যকে না বলতে। সে আস্তে আস্তে সৌম্যকে বুঝিয়ে বলবে। এইতো আজ সৌম্য জেনে ছুটে এসেছে। ছেলেটাকে কি বিধ্বস্ত লাগছে! এমন লাগবেই না-ই বা কেন! ইরার মতো পেসেন্ট কন্সিভ করে বেঁচে গিয়েছে, এটা খুবই রেয়ার। বাচ্চার পাঁচ-ছয় মাস হলেই রোগীর জীবনের ঝুঁকি ৯০% বেড়ে যায়। তাহলে ইরার কি হবে? এসব ভেবে তার নিজেরই ভ’য় লাগে। সে সৌম্যকে কিভাবে সান্ত্বনা দিবে?
সৌম্য তার দু’হাতের মাঝে নিয়াজের দু’হাত জড়িয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,

“আমার ইরাবতীকে বাঁচিয়ে দিন নিয়াজ ভাইয়া। আপনি তো জানেন, আমি ওকে কতটা ভালোবাসি! আমি ওকে ছাড়া কিভাবে থাকবো, বলুন? ইরাবতী খুব স্বার্থপর হয়ে গিয়েছে। ও আমার কথা ভাবেনি। আপনি প্লিজ কিছু করুন। আপনি তো ডক্টর! একটু চেষ্টা করে আমার ইরাবতীকে বাঁচিয়ে দিন না নিয়াজ ভাইয়া!”
নিয়াজ অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সৌম্য’র দিকে। ছেলেটা কেমন বাচ্চাদের মতো কথা বলছে। মনে হচ্ছে সৌম্য কিছুই বোঝে না। পড়াশোনা না জানা মানুষ যেমন না বুঝে ডক্টরের কাছে অনুরোধ করে, সৌম্যকে এখন তেমনই একজন লাগলো। নিয়াজকে চুপ দেখে সৌম্য নিয়াজের হাত ছেড়ে দিল। ডানদিকে ফিরে দাঁড়িয়ে দু’হাতে ঝাপসা চোখজোড়া ডলে ভাঙা গলায় বলে,

“আ’ত্ম’হ’ত্যা করা ম’হা’পা’প। নয়তো আমি আজ সত্যিই ম’রে যেতাম। ইরাবতীকে ছাড়া কিভাবে বাঁচতে হয়, সেই উপায়টাই তো আমি ভুলে গিয়েছি।
এটুকু বলে সৌম্য নিয়াজের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে,
বেশি আবেগি কথা বলে ফেলছি বোধয়। ওই যে নাইন, টেনে পড়া বাচ্চাদের মতো,, তাই না নিয়াজ ভাইয়া? কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার আজ নিজেকে নিজের কাছে ওদের চেয়েও ছোট লাগছে। আম.আমার ইচ্ছে করছে এই রাস্তায় বসে হাউমাউ করে কেঁদে সবাইকে বলতে, সবাই যেন আমার ইরাবতীর জন্য দোয়া করে দেয়। যেন আমার ইরাবতী অনেকবছর বেঁচে থাকে।
যখন শুনেছিলাম, ইরাবতীর অন্যজনের সাথে বিয়ে হয়ে গিয়েছে, তখনও এতো কষ্ট হয়নি। আসলে পাওয়ার পর হারানোর যন্ত্রণা অনেক হাজারগুণ বেশি। আর যেসবে যন্ত্রণা বেশি, আল্লাহ্ বেছে বেছে সেসবই আমার জন্য বরাদ্দ করে।”

কথাটা বলতে বলতে সৌম্য’র দৃষ্টিজোড়া ঝাপসা হয়। গলা বেঁধে আসে। নিয়াজ এগিয়ে এসে সৌম্যকে জড়িয়ে ধরে। সৌম্য ধরল না। চোখ বুজে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিয়াজ কিছু বলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। সে ভেবে পায় না, তাদের সবার জীবন এতো এলোমেলো কেন। সে, সৌম্য, ইরা, শিমু, বায়ান, আকাশ, সন্ধ্যা সবশেষে রিহানটাও ভালো নেই। সে আজকেই জেনেছে রিহানের ব্যাপারটা। সবার জীবন কত বিচ্ছিরিভাবে অগোছালো। নিয়াজ নিজেকে সামলায়। সৌম্যকে ছেড়ে দু’হাতে তার লালিত চোখজোড়া ডলে সৌম্য’র কাঁধে হাত রেখে বলে,
“সবকিছুর মালিক আল্লাহ্। আল্লাহ রাখলে কারো মা’রার ক্ষমতা নেই সৌম্য। আল্লাহ্ চেয়েছেন বলেই ইরা কন্সিভ করেছে। এবার স্বামী হিসেবে তোমার ইরার পাশে থাকা প্রয়োজন। জানি ইরার লাইফ রিস্কে। কিন্তু এমন কিন্তু নয়, ইরার মতো পেসেন্ট আজ পর্যন্ত একটাও বেঁচে ফেরেনি। বরং ইরার চেয়েও ভ’য়া’নক অবস্থায় থাকা রোগী মৃ’ত্যুর সাথে লড়াই করে বেঁচে ফিরেছে। তাই তুমি কখনোই ভাববে না ইরা কন্সিভ করেছে মানে ও ম’রে যাবে। আল্লাহ চাইলে তোমার চেয়ে তোমার ইরাবতীর হায়াত দীর্ঘ হবে ইনশাআল্লাহ। তুমি আমার কথা বুঝেছ, সৌম্য?”
সৌম্য ঝাপসা চোখে চেয়ে রইল নিয়াজের দিকে। নিয়াজ আবারো সৌম্যকে আবারো জড়িয়ে ধরে সৌম্য’র পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,

“মেয়েদের প্রেগনেন্সির টাইমটায় অনেক সাপোর্টের প্রয়োজন হয় সৌম্য। প্লিজ তুমি এভাবে ভেঙে পড়ো না। দেখবে ইরার কিচ্ছু হবে না। জানো তো, বান্দা আল্লাহর উপর যেমন ধারণা রাখে, আল্লাহ তার বান্দার সাথে তেমনি আচরণ করে। তোমার ভাবনা পজিটিভ কর, দেখবে সব পজিটিভ হবে। চেয়ে দেখ, আমরা সবাই আছি তোমার পাশে।”
সৌম্য নিয়াজের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। ভাঙা গলায় বলে,
“আর থাকবেন না আমার পাশে।”
নিয়াজ অবাক চোখে তাকায় সৌম্য’র দিকে। সৌম্য মলিন হেসে বলে,
“আপনি ঠিকই বলেছেন, আমার শক্ত হয়ে ইরাবতীর পাশে থাকা উচিৎ। আপনি একদম আমার বড় ভাইয়ের মতো আমাকে বুঝিয়ে বললেন। আমি বুঝেছিও। কিন্তু আমি জানি, এসব সাময়িক। আপনার প্রতি আমার মাঝে বড় ভাইয়ের স্নেহ, মায়া, মমতা ছড়িয়ে একটা নির্দিষ্ট সময় পর আপনিও সবার মতো হারিয়ে যাবেন। আমি কাউকে দোষ দিইনা। আসলে আমার ভাগ্যটাই এমন। আসি ভাইয়া।”
কথাগুলো বলে সৌম্য চলে যেতে নিলে নিয়াজ সৌম্য’র হাত টেনে ধরে আটকে দেয়। কি বলবে বুঝতে পারছে না৷ সৌম্য যে কথাগুলো আকাশকে ইন্ডিকেট করে বলেছে সে জানে। এ ব্যাপারে সে কিছু না বলল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“গাড়িতে উঠে বসো। অনেক রাত হয়েছে। বাসায় পৌঁছে দিই।”
সৌম্য’র মনে পড়ল আকাশও তাকে তার গাড়িতে ওঠার জন্য জোর করত। সে এসবে অভ্যস্ত ছিল না বলে সে গাড়িতে উঠতে চাইতো না। কিন্তু আকাশ তাকে ধমকিয়ে গাড়িতে ওঠাতো৷ আর আজ সেই আকাশ তাদের সাথে কি নিকৃষ্ট আচরণটাই না করেছে! সৃজনকে পর্যন্ত ছাড় দেয়নি। তার বাড়িটা সেই কবেই ধ্বংস করে দিয়েছে! সৌম্য তার ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া এলোমেলোভাবে চারিদিকে ফেললো। নিজেকে সামলে নিয়াজের হাত থেকে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সামনের দিকে যেতে যেতে বলে,
“এসব বড়লোকদের গাড়ি আমার জন্য নয় নিয়াজ ভাইয়া। আমি একাই চলে যেতে পারবো। আপনি শুধু একটু কষ্ট করে আমার ইরাবতীর জন্য দোয়া করে দিবেন। ইরাবতী না বাঁচলে আমিও যেন ম’রে যাই। এছাড়া আর কিছু চাইনা আমার।”
কথাগুলো বলতে বলতে সৌম্য জায়গাটি প্রস্থান করে। শার্টের হাতা দিয়ে কতবার যে চোখ মুছল। মনে হচ্ছে কোনো ছোট বাচ্চা। নিয়াজ মলিন মুখে চেয়ে রইল। সে সৌম্যকে কি বলবে? তার তো নিজেরই কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

সৌম্য তার বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার ছিটকিনি বাইরে থেকে আটকানো। সৌম্য ঢোক গিলল এখান থেকে চলে যাওয়ার আগে ইরাকে থা’প্প’ড় মা’রার দৃশ্যের কথা ভেবে। কাঁপা হাতে দরজার ছিটকিনি খুলে ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে দৃষ্টি দিলে দেখল ইরা দরজার পাশে দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে। হাত-পা ছেড়ে দেয়া। সৌম্য ভ’য় পেল। দ্রুত দরজা আটকে ইরার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে। দু’হাতে ইরাকে টেনে বুকে জড়িয়ে নেয়। ডান হাতে ইরার মুখ এদিক-ওদিক নাড়ালে বুঝল ইরা ঘুমিয়ে পড়েছে। অতিরক্তি কান্নার ফলে থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। বাম পাশটা পোড়া দাগ থাকলেও, গালের ডান পাশ ফর্সা। যেখানে দু’টো থা’প্প’ড়ের দশ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। সৌম্য অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সেদিকে। বিয়ের এতোগুলো বছর পর এই প্রথম ইরার গায়ে আজ হাত তুলল সে। নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগলো। সৌম্য ইরাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় এনে শুইয়ে দেয়। তখনই ইরার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমঘুম চোখে সামনে সৌম্যকে দেখে ধড়ফড় করে উঠে বসে দু’হাতে সৌম্য’র গলা জড়িয়ে ধরে। ভেজা কণ্ঠে বলে,

“তুমি এসেছ সৌম্য? আমি ভেবেছিলাম তুমি আসবে না। আম.আমি অনেক স্যরি সৌম্য!”
কথাগুলো বলতে বলতে ইরার দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে জলকণা গড়িয়ে পড়ে। সৌম্য শক্ত হয়ে বসে রইল। সে হাত বাড়িয়ে ধরল না ইরাকে। ঢোক গিলে ইরাকে নিজের থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে দৃষ্টি অন্যদিকে রেখে ছোট করে বলে, “ঘুমাও।”
কথাটা বলে সৌম্য উল্টোদিকে হয়ে শুয়ে পড়ল। ইরা অসহায় চোখে তাকালো। সৌম্য’র এমন ব্যবহার সে কিভাবে সহ্য করবে? সৌম্য এমন একটা মানুষ, যে রা’গ করতে পারেনা বলে মনে হয় ইরার। তার হাজারটা অবাধ্যতায়ও সৌম্য হাসিমুখে সয়ে নিয়েছে। সেই মানুষটা হঠাৎ এতো বদলে গেলে ইরা কি করে থাকবে? দু’চোখ বেয়ে আরও কয়েক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ে মেয়েটার। এগিয়ে এসে সৌম্য’র পাশে সৌম্য’র গা ঘেঁষে শুয়ে ডান হাতে সৌম্য’র পেট জড়িয়ে ধরে। মুখ সৌম্য’র পিঠে ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। সৌম্য ঢোক গিলল। ইরা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে,

“আমার খুব ইচ্ছে করত, আমার বাচ্চা তোমাকে বাবা বলে ডাকবে। আমার খুব ক’ষ্ট হতো, যখন তুমি বাড়ি ফিরে প্রতিরাতে একটা বাচ্চার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলতে। আমারও তো মা হতে ইচ্ছে করে। আমি কি করতাম সৌম্য?”
কথাগুলো বলতে বলতে আবারো ফোঁপায়। সৌম্য’র ডান চোখ বেয়ে একফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে বালিশে এসে পড়ল। বুকটা কি অসহ্য ব্য’থা করছে কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। দমবন্ধ হয়ে আসছে।
ইরা বেশ কয়েকবার ডাকলো সৌম্যকে। সৌম্য সাড়া দিল না। আর না তো এদিক ফিরল। শক্ত হয়ে পড়ে রইল সেদিকে। প্রায় অনেকটা সময় পর ইরার আর কোনো সাড়া না পেয়ে সৌম্য ডান হাতে চোখ মুছে এদিক ফিরে তাকায়। দেখল ইরা গুটিশুটি মেরে শুয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে। সৌম্য একটি পাতলা কম্বল টেনে ইরাকেসহ তাকে কম্বলে মুড়িয়ে নিল। ইরাকে শ’ক্ত করে বুকে চেপে ধরল। উষ্ণতা পেয়ে ঘুমের ঘোরে ইরা আরেকটু চেপে সৌম্য’র দিকে। সৌম্য বড় করে শ্বাস টানলো। ইরার মাথায় ঠোঁট চেপে চোখ বুজে বিড়বিড়িয়ে বলে,

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৮

“মানুষের পূর্ণতার রাস্তা হয় সহজ, আমার রাস্তা বরাবরই কঠিন। কিন্তু দিনশেষে আমার খাতা পূর্ণ। ঠিক যেমন শত বাঁধার পেরিয়ে তুই আমার বউ, তাতে আমি পূর্ণ। আল্লাহ বারবার আমার পরীক্ষা নিতে ভালোবাসে। তাহলে আমি কেন পরীক্ষা দিতে পিছিয়ে যাবো? জানি আমার সফলতার রাস্তা কাঁটায় ভর্তি। কিন্তু আমি আমার ইরাবতীর জন্য সব কাঁটা মাড়িয়ে, সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, তোকে আর আমার রাজকুমার নয়তো রাজকুমারীকে আমার এই ছোট্ট কুঁড়েঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসব ইনশাআল্লাহ।”
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে অদ্ভুদ এক অনুভূতি হলো। চোখের কোণ ঘেঁষে আরেকফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে ইরার মাথায় এসে পড়ল।

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৯ (২)