Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৯ (২)

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৯ (২)

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৯ (২)
DRM Shohag

পরদিন,
ঘড়ির কাটা তখন সকাল ১০ টার ঘরে। ঢাকা ভার্সিটির সামনে আকাশ তার গাড়ি থেকে নামে। কোলে সৃজন। আকাশের পরনে সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট। পায়ে কালো কালো সু। সেইম ডিজাইনের সেইম কালারের শার্ট-প্যান্ট সৃজনের পরনেও। পায়ে কালো জুতো। আকাশের মুখে কালো মাস্ক, চোখে সানগ্লাস। মাথায় সাদা রঙের একটি ক্যাপ। সেইম সৃজনের মুখে তার মাপের কালো মাস্ক, কালো সানগ্লাস, মাথায় সাদা ক্যাপ। সৃজনের মন উৎফুল্ল ভীষণ। জায়গাটি তার খুব পরিচিত। মন ভালো হওয়ার কারণ, সে ভেবেছে আকাশ তাকে তার মা আর মায়ের বন্ধুদের কাছে দিতে এসেছে।

আকাশ তীক্ষ্ণ চোখে আশেপাশে নজর বুলায়। তার শত শত গার্ড পুরো ঢাকা ভার্সিটি ঘিরে রেখেছে। তবে সকলের ড্রেস সিভিল, যেন কেউ বুঝতে না পারে৷ সকল গার্ডের কাছে অর্ডার দেয়া আছে, সে আর সৃজন ঢাকা ভার্সিটি প্রবেশ করার পর, একটা পোকাও যেন এই ভার্সিটির ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। আকাশ চারপাশটা ভালোভাবে দেখে লম্বা পায়ে ঢাকা ভার্সিটির ভিতরে প্রবেশ করে। গাড়ি বাইরে পার্ক করারও কারণ আছে। আকাশ চুপচাপ হাঁটতে থাকে সামনে বরাবর। উদ্দেশ্য ভিসির রুম। সৃজন আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখছে। সে বোধয় তার মা আর সাইফ, জাবিরদের খুঁজছে।
আকাশ কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা রুমে আসে। ভিসি আকাশকে চিনতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। একই গেটআপের এতো বড় ছেলে সাথে ছোট বাচ্চা ছেলে। কাউকেই চিনলো না সে। সে কিছু বলার আগেই আকাশ গম্ভীর গলায় বলে, “টাইম থ্রি ডে’স।”

কণ্ঠ চিনতে পেরে ভিসি দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“আকাশ তুমি? তোমাকে একদমই চিনতে পারিনি আমি৷ বসো বসো।”
আকাশ কথাটা বলেই বাইরে যেতে বলে, “প্রয়োজন শেষ।”
ভদ্রলোক আর কিছু বললো না। আগের আকাশকে সেভাবে না চিনলেও মাফিয়া আকাশকে তার বেশ ভালো চেনা আছে। সে সৃজনের দিকে চেয়ে মৃদুহেসে বলে, “এটা কে? তোমার ছেলে না-কি?”
কথাটা শুনে আকাশ ঠোঁট বাঁকালো সামান্য। কিন্তু উপর থেকে শক্ত গলায় বলে, “নো পার্সোনাল কোয়শ্চন, স্যার।”
ভিসি আর কিছু বলল না। ততক্ষণে আকাশ রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। সৃজনের কোনোদিকে মন নেই। সে তার মা আর মামাদের দেখতে ছটফট করছে। জিজ্ঞেস করে,

“আমাল মা কুতায়, চবাই কুতায়?”
আকাশ কিছু বলল না। সে এগিয়ে গিয়ে ভার্সিটির মাঠের একপাশে দাঁড়ায়। সৃজনের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
“আমার কথা শুনলে তোমাকে তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাবো।”
সৃজন মাথা নেড়ে বলে, “আত্তা আত্তা।”
আকাশ সৃজনের চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে সৃজনের শার্টে আটকে রাখে। নিজের সানগ্লাসটারও একই অবস্থা করে। এরপর সৃজনকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। সে সৃজনের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে কয়েকজন লোক একটি বড়সড় সাউন্ড বক্স এনে আকাশদের কাছে। লোকগুলো অন্যকেউ নয়। আকাশের গার্ড। আকাশ বাদিকে ঘাড় ফিরিয়ে চোখ দিয়ে কিছু ইশারা করতেই লোকটি একটি মিউজিক বাজায়। সাথে সাথে সৃজন মাথা উঁচু করে তাকা আকাশের দিকে। আকাশ ভ্রু নাচায়।

সৃজনের মনে পড়ে আকাশ বলেছিল, এই মিউজিক এর সাথে তাকে পা নাচাতে হবে। তাহলে তার মা তার কাছে আসবে। এমনিতেও এসব মিউজিক বাজলে সৃজন নিজে নিজেই পা নাচায়। এটা তার অভ্যাস বলা যায়। সৃজন মিউজিক এর সাথে মিলিয়ে পা নাচায়। ছোট বাচ্চা হলেও কাজটি বেশ নিখুঁতভাবে করছে সৃজন। পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় সৃজনের সাথে পা মিলিয়ে আকাশও সেইমভাবে পা নাচায়। সৃজন তার সম্মুখ বরাবর আকাশকে তার মতো করে পা নাচাতে দেখে অবাক চোখে তাকায়। বাচ্চা ছেলেটি বুঝতে পারে না, আকাশ তার মতো করে কি করে পা নাচাচ্ছে। তবে সে বেশ মজা পেল। আকাশের দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে পা নাচায়৷ আকাশ সৃজনের দিকে চেয়ে মাস্কের আড়ালে চোরা হাসিতে মেতেছে। সত্যি বলতে বাহ্যিকভাবে তাদের দেখে মনে হচ্ছে, তারা এখানে এভাবে নাচার আগে বহুবার প্রাকটিস করেছে, অথচ এ নিয়ে তাদের মাঝে যাস্ট একবার কথা হয়েছে। আর সেটা হলো, আকাশ শুধু সৃজনকে বলেছে ভার্সিটিতে মিউজিক দিলে সে যেন পা নাচায়। ব্যাস এতোটুকুই। সৃজন বাচ্চা হলেও এসব নাচে পরিপক্ব এটা সে খুব ভালোভাবেই জানে।

ইতোমধ্যে আকাশ আর সৃজনকে অনেকেই ঘিরে ধরেছে। যে যার মতো তার ফোনে ভিডিও করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বাবা ছেলের এই সুন্দর দৃশ্য। যদিও তারা কেউ আকাশ বা সৃজন কারোর-ই মুখ দেখতে পাচ্ছে না। দুই বাবা ছেলের মুখে মাস্ক৷ মাথায় ক্যাপ। তবে সানগ্লাস বুকের কাছে রাখার চোখদুটো দৃশ্যমান হলেও নাচের তালে সেভাবে কেউ খেয়াল করল না।
এদিকে সৃজন তো বেজায় খুশি৷ এতোদিন সে একা একা এভাবে নাচতো। তার মা, মায়ের বন্ধুরা, অরুণ, দাদিমা সবাই তার নাচ দেখতো। কেউ সঙ্গ দিতো না। কিন্তু আজ আকাশের সঙ্গ পেয়ে তার খুশি দেখে কে! মাস্কের আড়ালে তার খিলখিল হাসি ফুটে ওঠে। সাউন্ড বক্সের আওয়াজে সে হাসির শব্দ শোনা গেল না। তবে আকাশ সৃজনের চোখ দেখেই বুঝতে পারলো সৃজন হাসছে। আকাশের দু’হাত প্যান্টের পকেটে। ছোট্ট সৃজন আকাশের অনুকরণ করে নিজেও দু’হাত তার প্যান্টের পকেটে রেখেছে। বাবা ছেলে দু’জনের হাস্যজ্জ্বল দৃষ্টি দু’জনের দিকে।
হঠাৎ-ই তীব্র কিছুর শব্দে আকাশের কান সজাগ হয়৷ শব্দটি অতি প্রখর সাথে পরিচিত হওয়ায় আকাশের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে ওঠে। সে আশেপাশে দৃষ্টি ঘোরায়৷ প্রায় ৯০% স্টুডেন্টদের হাতে হাতে ফোন, যেখানে তার আর সৃজনের নাচের ভিডিও রেকর্ড হচ্ছে। আকাশ কিছু একটা ভেবে সূক্ষ্ম হাসলো। লিরিক্সের তালে তালে বাবা ছেলের নাচ একবারের জন্যও থামলো না।

সন্ধ্যা তার ঘরে শুয়ে শুয়ে ছটফট করছে। গতকাল রাতে লামিয়ারা তাকে তাদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলেও সন্ধ্যা যায়নি। দু’দুটো গু’লি লাগায় তার শরীরের অবস্থা একেবারেই ভালো নয়। গতকাল রাতে তার ফ্রেন্ডরা তাকে ভীষণ ক’ষ্টে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। সাইকেলের গতির চেয়েও কম ছিল গাড়ির গতি। এভাবে জাবির গাড়ি চালিয়ে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। রাতে তার সাথে আসমানী নওয়ান ছিল। অবাক করার বিষয় আসমানী নওয়ান একবারো তাকে সৃজনের কথা জিজ্ঞেস করেনি। শুধু তার দেখভাল করছে। সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানকে জিজ্ঞেস করলে ভদ্রমহিলা ঝাপসা চোখে চেয়ে বলে,

“কিসের জন্য দুঃখ করব মা? আমার কপাল খারাপ তাই ছেলে বেঁচে থাকতেও তাকে হারিয়েছি। আর এখন আমার সবচেয়ে প্রিয় নাতিটাকে হারাতে বসেছি, তাও আবার নিজের ছেলের দ্বারা।”
কথাটা ভেবে সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে নোনাপানি গড়িয়ে পড়ে। গতকাল সারাটারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি। কি করে এক করবে? তার সৃজনকে ছাড়া সে যে এর আগে কখনো থাকেনি। সৃজন হওয়ার পর এই প্রথম রাত সৃজনকে বুকে না নিয়ে সারারাত পার করেছে। মায়ের মন কি করে শান্ত হবে? সন্ধ্যার মন অশান্ত। বড্ড অশান্ত। নিয়াজ যতই বলুক চিন্তা না করতে, কিন্তু সন্ধ্যার যে ভীষণ চিন্তা হয়। মা কি করে সন্তানের জন্য চিন্তা না করে থাকবে? সন্ধ্যা ডান হাতে চোখের পানি মুছে নিয়ে পাশ থেকে ফোন নেয় নিয়াজকে কল করবে বলে। সে আর পারছে না তার ছেলেকে ছাড়া থাকতে৷ নিয়াজের থেকে শুনে সে তার ছেলেকে তার কাছেই চাইবে।

কিন্তু সন্ধ্যা ফন হাতে নিয়ে নেট অন করতেই তার ফোনে সমানে নোটিফিকেশন আসতে থাকে৷ ফেসবুকে নোটিফিকেশন, বন্ধুদের থেকে পাওয়া অনেক অনেক মেসেজ সবমিলিয়ে সন্ধ্যার ফোনে একটার পর একটা মেসেজ আসতে থাকে, আর শব্দ হয়। সন্ধ্যার মাথা ধরে যায়। সে না পেরে একটি নোটিফিকেশনে ক্লিক করলে ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ভার্সিটির মাঠে আকাশ আর সৃজনের সেই নাচ। সন্ধ্যা আকাশকে চিনতে না পারলেও সৃজনকে এক দেখায় চিনতে পারে। যেকোনো লিরিক্সের সাথে সৃজনের এরকম হাজারটা নাচ আছে তার, তার বন্ধুদের ফোনে। সৃজনের সামনে লিরিক্স বাজালেই সে নিজে নিজেই এভাবে নাচতে শুরু করে। সন্ধ্যা তার ছেলের গতিবিধি অক্ষরে অক্ষরে বোঝে, তেমন আজো বুঝল। তার দৃষ্টিজুড়ে বিস্ময়। সৃজন ঢাকা ভার্সিটি কি করে? আর এভাবে নাচছেই বা কেন? সবচেয়ে বড় কথা সৃজনের পাশে হুবহু সৃজনের মতো করে এভাবে নাচছেই বা কে? হঠাৎ-ই সন্ধ্যার ফোনে একটি মেসেজ আসে। সন্ধ্যার দৃষ্টি উপরে মেসেজে পড়ে, যেখানে লেখা,

“হেই মেডাম, ছেলের ডান্স কেমন লাগলো? সে আমার কাছে খুব ভালো আছে৷ এবার আপনি নিশ্চিন্তে সুস্থ হতে পারেন। ওহ হ্যাঁ, আপনার ছেলেকে আমি সঙ্গ দিয়েছি। জানি আমি হ্যান্ডসাম। সাথে জানি, আমার উপর থেকে আপনার চোখ ফেরানো দায় হয়ে যাবে। আপনি সিঙ্গেল মাদার এটাও জানি। আপনাকে আমার ভালো লাগে। আপনি চাইলে আমাকে একটা সুযোগ দিতে পারেন। আমি মাইন্ড করবো না।”

লেখাটি পড়ে সন্ধ্যার চোখমুখ কুঁচকে যায়। ভাবলো আকাশ কোন ক্যারেক্টারলেস এর কাছে তার বাচ্চাকে দত্তক দিয়েছে কে জানে! সন্ধ্যা নাচটি আবার দেখল। চেনার চেষ্টা করল লোকটি আসলে কে। কিন্তু একদমই চিনতে পারলো না। আকাশ যে এভাবে নাচতে পারে সে তো এটা জানেই না, এজন্য আকাশকে মাথাতেও আনতে পারলো না। এভাবে নাচার ফলে চোখও দেখতে পারছে না, নয়তো আকাশকে চেনার একটা চান্স ছিল। তবে সৃজনকে দেখে মনটা আগের চেয়ে একটু শান্ত হয়। যদিও সৃজনের মুখ দেখতে পেল না তবে সৃজনের উৎফুল্লটুকু বোধয় তার মা ধরতে পেরেছে। যার ফলে আগের চেয়ে একটু ভালো লাগলো। কিন্তু সে কি তার সৃজনকে আর কখনো কোলে নিতে পারবে না? না না এমন হবে না। নিয়াজ ভাইয়াকে বললে তিনি ঠিক কিছু না কিছু ব্যবস্থা করে দিবেন। কিন্তু এই লোকটা কে? সন্ধ্যা অনেক ভেবেও বুঝল না। তবে অচেনা লোকটির প্রতি তার মাঝে বেশ বিরক্তি দেখা গেল

আকাশ সৃজনকে কোলে নিয়ে ডিভানের উপর বসে আছে। তাদের সামনে ল্যাপটপ। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যাকে। সৃজন গোলগোল চোখে মাকে অনেকক্ষণ থেকে দেখছে। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে বলে,
“মাকে দলতে পালিনা কেনু? পুচা বাতাচ বাবু, মাকে দলতে দাও বুলচি।”
আকাশ ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিল। সৃজনের কথা শুনে সে সৃজনের দিকে তাকায়। মৃদু হেসে বলে, “তোমাকে মাকে ঘোল খাইয়েছি।”
সৃজন অবুঝ নয়নে চেয়ে বলে,

“আমিও গোল কাবো।”
আকাশ সৃজনকে জড়িয়ে নিয়ে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বলে, “এটা শুধু তোমার মায়ের জন্য। তোমাকে আমি চকলেট আর জেলি খাওয়াবো।”
সৃজনের মনটা বড্ড খারাপ। মা ছাড়া যে সে কখনো থাকেনি। কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার। চকলেট, জেলি তার মন ভালো করতে পারলো না। সে ঠোঁট উল্টে কান্নার ভঙ্গি করে বলে,
“আমি মা কাচে যাবু।”
আকাশ মলিন মুখে সৃজনের দিকে তাকালো। তার কাছে এর উত্তর নেই। সে নিরুপায়, সে অসহায়। ঢোক গিলল আকাশ। ছোট করে বলে, “নিয়ে যাবো।”
সৃজন কেঁদে দিবে দিবে ভাব। আকাশ শুধু বলে নিয়ে যাবো, কিন্তু আর নিয়ে যায় না। সৃজন ভাবছে, একবার মায়ের কাছে যেয়ে নিক, এরপর তার ভাষায় বাতাচ বাবুকে অনেক শা’স্তি দিবে।

বায়ানদের বাড়ির ড্রয়িংরুমের সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে আকাশ। তার দু’পাশে দু’জন করে লোক দাঁড়ানো। টি-টেবিলের উপর হরেক রকম ফলমূলসহ বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। সামনে বসা বায়ান আর বায়ানের মা। আকাশ একটি পেপার বের করে বায়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“ঢাকা ধানমন্ডিতে দশ তলা বাড়ি, সাথে একটি কোম্পানির মালিক তুমি। সাথে একটি গাড়ি পাবে। এখানে একটি সাইন করে দাও৷ আশা করি, এবার আমার বোনকে বিয়ে করতে তোমার মাঝে আর কোনো দ্বিধা থাকবে না।”
বায়ান বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশ কি বলল কিছুই বুঝল না সে। অতঃপর বলে,
“আপনি এসব আমাকে কেন দিচ্ছেন?”
আকাশ ভ্রু কুঁচকে বলে,

“তেমার স্ট্যাটাস আমাদের সাথে যায় না, এজন্য বারবার আমার বোনকে তুমি ফিরিয়ে দিচ্ছো। এবার তোমার স্ট্যাটাস আগের চেয়ে উন্নত হবে। আর চুপচাপ আমার বোনকে বিয়ে করে নিবে। দু’বছর রিলেশন করে বিয়ের সময় পিছিয়ে আসছো কোন সাহসে? আমার বোন কি ফেলনা?”
আকাশের লাস্ট কথাটা শক্ত শোনালো। বায়ান আগের চেয়েও বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। দুই বছর রিলেশন মানে, সে শিমুর সাথে দু’বছর তো দূরে থাক, দু’দিনও তো রিলেশনে ছিল না তাহলে আকাশ এসব কেন বলছে?
এদিকে বায়ানের মাও অবাক চোখে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। তার জানা মতে, তার ছেলে একটা মেয়েকে ভালোবাসতো। আর সেই মেয়ে মা’রা যাওয়ার পর তার ছেলে বিয়েতেই রাজি হয়না। কিন্তু আকাশ কেন বলছে তার ছেলে আকাশের বোনের সাথে রিলেশনে ছিল? বায়ানের মা আকাশকে চেনে। বায়ান আগে আকাশদের অফিসে চাকরি করতো, সেই হিসেবে চেনা।
আকাশ কাগজটি সামনে টেবিলের উপর রেখে উঠে দাঁড়ায়। দু’হাত প্যান্টের পকেটে রেখে বায়ানের উদ্দেশ্যে বলে,
“পেপারে সাইন করে রেখো। আগামী তিন দিন পর তোমার আর শিমুর বিয়ে৷ প্রিপেয়ার থেকো।”
কথাটা গুলো বলে আকাশ উল্টোদিকে ঘোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। বায়ান তার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শব্দ করে বলে,

“আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার, আমি শিমুকে বিয়ে করতে পারবো না।”
আকাশের পা থেমে যায়। চোখমুখ শক্ত হলো। ততক্ষণে বায়ান এগিয়ে এসে আকাশের সামনে দাঁড়িয়েছে। আকাশের দিকে চেয়ে বলে, “আমি আপনার বোনের সাথে কোনো রিলেশনে জড়াইনি।”
আকাশ কণ্ঠে বিরক্তি ঢেলে বলে,
“আমি আমার বোনকে বিশ্বাস না করে তোমাকে কেন বিশ্বাস করব? হোয়াই?”
বায়ান কি বলবে বুঝল না। সে খুব ভালো করেই বুঝল শিমু আকাশকে ভুলভাল বুঝিয়েছে। বায়ানের প্রচন্ড রাগ লাগছে। মেয়েটা তার জীবন থেকে পুরো শান্তি কেড়ে নিয়েছে৷ সে দু’দন্ড সকালকে নিয়ে ভাবতে পারেনা এই মেয়ের অত্যাচারে। সে রে’গে বলে,

“আমি অন্যএকজনকে ভালোবাসি স্যার। আপনার মতো ভুলে যাওয়ার স্বভাব আমার নেই। তাই…”
আকাশ রেগে বায়ানের কলার চেপে ধরে। দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“যা জানিস না তা নিয়ে কথা বলবি না। আমাকে ভালো মানুষ ভেবে ভুল করার কোনো প্রয়োজন নেই। নয়তো আমি ভুল করতে শুরু করলে তোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
বায়ান ঢোক গিলে বলে,
“আমাকে মে’রে ফেলুন, কিন্তু আমি আপনার বোনকে বিয়ে করতে পারবো না।”
আকাশের কপালে ভাঁজ পড়ল। বায়ান আর শিমুর রিলেশন আছে এ নিয়ে শিমু তাকে আজ সকালে কয়েকশোটা প্রমাণ দেখিয়েছে। তাহলে বায়ানের রিয়েকশন এমন কেন বুঝতে পারছে না। আকাশ এসব উদ্ভট চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বায়ানের উদ্দেশ্যে বলে,
“তোমার পালানোর কারণ বুঝতে পারছিনা। যেহেতু আমার বোনের সাথে একবার রিলেশনে জড়িয়েছিলে, তাই তোমাকে এই বিয়ে করতে হবে বায়ান। নিজেকে প্রিপেয়ার কর।”
রাগে বায়ান ফেটে পড়ে। শিমুকে হাতের কাছে পেলে যে সে কি করবে নিজেও জানেনা। আকাশ কিছু একটা ভেবে আবারো বলে,

“তুমি মুভ অন করেছ ভেবে ভালো লাগছে। যেটা সবাই পারে না। ক্যারি অন।”
কথাটা বলে আকাশ বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে যায় বায়ানের বাড়ি থেকে। পিছু পিছু আকাশের গার্ডগুলোও যায়।
এদিকে বায়ান তব্দা খেয়ে আছে। আকাশ কি বলে গেল? সে মুভ অন করেছে? কিসের জন্য মুভ অন করেছে? সকালের জন্য? কবে, কখন? আর সবচেয়ে বড় কথা আকাশ সকালকের কথা জানলো কি করে? আকাশের তো কিছু মনেই নেই, তবে? বায়ানের মাথা এলোমেলো লাগে। কিন্তু সে বিয়ে তো কিছুতেই করবেনা। এই শিমুকে এবার সে দেখে নিবে। মেয়েটা তাকে চেনে না। কি পেয়েছে টা কি এই শিমু? তার জীবন নিয়ে মনে হচ্ছে খেলছে।

অধীর একটি অন্ধকার ঘরে ছটফট করতে করতে হাঁটাহাঁটি করছে। একপর্যায়ে থেমে গিয়ে দু’হাতে মাথার চুলগুলো টেনে এদিক-ওদিক টেনে চিৎকার করে বলে,
“ওই এভি কি করছে এসব? ওর বাচ্চাকে কোন গুহায় লুকিয়ে রেখেছে? কি করতে চাইছে ও? ওর তো কিছু মনে নেই। তবে ওই বাচ্চার প্রতি এতো দরদ কেন ওর? একবার সৌম্যকে জেলে দেয়, একবার সৌম্যকে নিজেই বাঁচায়, একবার আমার প্রাণকে বিয়ে করতে চায়, একবার সৃজনকে খেলনা ভাবে, আরেকবার সেই সৃজনকেই কোন গুহায় লুকিয়ে রাখে! ওহহহহ্ কি হচ্ছে এসব?
লাস্ট কথাটা বলতে বলতে ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সামনের দেয়ালে জোরেসোরে একটি পাঞ্চ মারে। টকটকে লালিত চোখদু’টোয় ভস্ম করে দেয়ার প্রতিহিংসা জ্বলছে যেন। এই এভি তাকে পুরো কনফিউজড করে দিচ্ছে। অধীর বিড়বিড় করে,
এভি সৃজনকে আসলেই দত্তক দিয়েছে নাকি আমার হাত থেকে বাঁচাতে তা’মা’শা করছে?
কথাটা বলতে বলতে অধীর মাথা দু’দিকে নাড়াতে নাড়াতে হুংকার ছেড়ে বলে, “প্ল্যান চেঞ্জ, মাই ডেয়ার এভি।
কথাটা বলে শব্দ করে হাসতে লাগলো। বিড়বিড় করল, স্যরি সৌম্য!”
কথাটা বলতে গিয়ে অধীরের চোখের কোণ ভিজে উঠল বোধয়। কিন্তু অধীর সেদিকে পাত্তা দিল না। সে ক্রোধান্বিত হাসিতে ফেটে পড়েছে।

ঘড়ির কাটা তখন দুপুর দু’টোর ঘরে। আকাশ তার বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শিমুর ফোনে মেসেজ করলে শিমু দৌড়ে এসে দরজা খুলে দেয়৷ আকাশ শিমুর দিকে খেয়াল করলে দেখল মেয়েটার চোখমুখ ফোলা। বুঝল এসব কান্নার ফল। আকাশ ভেতরে এসে মৃদুস্বরে বলে,
“আর কাঁদতে হবে না। তিনদিনে বিয়ের শপিং করে ফেলবি। সব ঠিকঠাক।”
কথাটা শুনতেই শিমু খুশিতে আকাশকে সাপ্টে ধরল। সে ভেবেছিল আকাশ আসলে তার অন্যজায়গায় বিয়ে হয়ে যাবে। কিন্তু সে আকাশকে বায়ানের ব্যাপারে বলতেই আকাশ বিনাবাক্যে সব ঠিক করে দেয়ার কথা বলে বেরিয়ে গেল। আর কিছুক্ষণের মাঝে সব ঠিক করে বাড়িও ফিরলো। শিমু জানে সে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু তার বিশ্বাস একবার তার সাথে বায়ানের বিয়ে হয়ে গেলে তাদের মাঝে কিছু একটা থাকবে, যেটা আল্লাহ প্রদত্ত। শিমু আপাতত এটাই চায়। আর কিছু চায়না তার।
আকাশ বা হাতে শিমুর মাথায় রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শিমু আকাশকে ছেড়ে হাস্যজ্জ্বল মুখে বলে,
“তোমাকে অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া!”

আকাশ এর প্রেক্ষিতে কিছু বলল না। আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে মাকে খুঁজল। চোখে পড়ল আসমানী নওয়ান তার ঘর থেকে বেরোচ্ছে। কিন্তু আকাশের দিকে চোখ পড়তেই ভদ্রমহিলার পা থেমে যায়। চোখেমুখে মলিনতা তার। আকাশের অনেক অন্যায় মেনে নিয়েছে সে৷ সন্ধ্যা আর সৌম্যকে অনেক ক’ষ্ট দেয়ার পরও আড়াই বছর পর যখন বাংলাদেশে ফিরল, সে মা হয়ে আকাশকে দূরে না ঠেলে দিয়ে আকাশকে কাছে টেনে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু আর কত? তার নাতিটাকে পর্যন্ত ছাড়লো না। ওইটুকু বাচ্চাকে পর্যন্ত ছাড় দেয়নি। কোথায় রেখেছে কে জানে! এরপরও সে আকাশের মুখে এক গাল ভাত তুলে দিলে সন্ধ্যা আর সৌম্য, সৃজনের সাথে অন্যায় করা হবে। সে আর অন্যায় করতে পারবে না। আসমানী নওয়ান বুকে পাথর চেপে আকাশের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আকাশের মুখের উপর তার ঘরের দরজা আটকে দিল।

মা তাকে দেখে আর ঘর থেকে বেরোলো না। ব্যাপারটি আকাশ খেয়াল করতেই বুকে চিনচিন ব্য’থা হয়। সে যা-ই করুক না কেন, মা এর আগে তাকে এসে বকেছে, তার সাথে চিৎকার করেছে। কিন্তু এই প্রথম মা তাকে কিছুই বলল না, কিছুই করল না। একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিল। আকাশের অসহায় দৃষ্টিজোড়া আসমানী নওয়ানের বন্ধ দরজার পানে।
এদিকে আসমানী নওয়ান আর আকাশের ব্যাপারটি খেয়াল করে শিমুরও মন খারাপ হয়। আকাশকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল, ‘ভাবি, সৌম্য ভাইয়া, সৃজন এদের সাথে তুমি এমন অদ্ভুদ আচরণ কর কেন আকাশ ভাইয়া?’
কিন্তু কথাটা বলার সাহস পেল না। আকাশ নিজেকে সামলে শিমুর দিকে চেয়ে বলে,
“শিমু সন্ধ্যামা….
এটুকু বলে থেমে যায় আকাশ। শিমু বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আকাশ কি বলতে নিচ্ছিল এটা? আকাশ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,

“মেয়েটি কোথায়?”
শিমু অবাক হয়ে বলে,
“তুমি ওটা….
আকাশ ধমক দিয়ে বলে,
“যেটা জিজ্ঞেস করেছি, চুপচাপ অ্যান্সার কর। নয়তো কানের গোড়ায় লাগাবো।”
শিমু ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। আঙুল দিয়ে ইশারা করে একটি রুম দেখিয়ে বলে,
“ভাবি ওই ঘরে ঘুমিয়েছে।”
আকাশ গম্ভীর গলায় বলে,
“এখান থেকে যা।”
শিমু অবুঝ নয়নে বলে, “হ্যাঁ?”
আকাশ ধমকে বলে,
“তোর রুমে যেতে বলেছি।”
শিমু আবারো ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। কি অদ্ভুদ। এই আকাশ ভাইয়া এতো খিটখিটে কেন হয়ে গেছে। বিরক্ত লাগে। সে আর এখানে দাঁড়ালো না। মনটা ভালো আজ। দৌড় দিল তার ঘরের দিকে। তবে আকাশের ভাবসাব কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। কেমন গোলমেলে।

আকাশ সন্ধ্যার ঘরে এসে সন্ধ্যার বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। একদৃষ্টিতে সন্ধ্যার মলিন মুখটার দিকে চেয়ে আছে অনেকক্ষণ যাবৎ। হাঁটুর নিচ পর্যন্ত চুলগুলো ছেড়ে দেয়, যেগুলো বিছানার একপাশে অনেকটা জায়গাজুড়ে লেপ্টে আছে। পরনের শাড়ি বেশ এলোগোছালো। দু’পায়ের পাতা থেকে কিছুটা উপরে উঠে গিয়েছে। বাম পাশের পেটের কাছটা উম্মুক্ত যেখানে ব্যান্ডেজ করা। আকাশ হাঁটু মুড়ে বসল সন্ধ্যার পেট বরাবর। দৃষ্টি ফেলল সন্ধ্যার ভেজা মুখপানে। দেখে বোঝা গেল, সন্ধ্যা কেঁদেছে ভীষণ। কারণটা যে সৃজন এটাও বেশ বুঝল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডান হাত এগিয়ে নিয়ে যায় সন্ধ্যার ক্ষ’ত পেটের কাছটায়। আলতো হাত রাখে সেথায়। বোঝার চেষ্টা করে এখনো কতটা ক্ষ’ত আছে।
সন্ধ্যা নড়েচড়ে ওঠে। মুখে ব্য’থার ছাপ ফুটে ওঠে। আকাশ দ্রুত হাত সরিয়ে নেয়। সন্ধ্যার দিকে চেয়ে ছোট করে বলে, “স্যরি!”

এরপর শাড়ির একটু অংশ টেনে সন্ধ্যার পেটের অংশটুকু ঢেকে রাখে। হাঁটু দু’টো মেঝেতে ঠেকানো অবস্থাতেই একটু একটু করে এগিয়ে আসে সন্ধ্যার পায়ের কাছে। সন্ধ্যার মুখের চেয়ে হাত-পা তুলনামূলক বেশি ফর্সা। কথাটা ভেবে আকাশ একটু হাসলো বোধয়। ডান হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে একটি ছোট্ট বাক্স বের করে৷ বাক্সটি খুলে ভেতর থেকে বের করে দু’টো সোনার নুপুর আর দু’টো সোনার পায়ের রিং। হাতের বাক্সটি বেডের একপাশে রেখে আকাশ সোনার নুপুর দু’টো সন্ধ্যার দু’পায়ে পরিয়ে দেয়। পর পর দু’পায়ের বুড়ো আঙুলের পাশের আঙুল দু’টোতে রিং দু’টো পরিয়ে দেয়। নুপুর আর রিং পরানো সন্ধ্যার পা দু’টো মুগ্ধ চোখে দেখে আকাশ। ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। মুখ এগিয়ে নিয়ে প্রথমে সন্ধ্যার ডান পায়ের রিং বরাবর পায়ের উপর চুমু খায়, এরপর নুপুর বরাবর পায়ের উপর চুমু খায়। সেইমভাবে বাম পায়েও দু’টো চুমু খায়। মাথা তুলে বাম পকেট থেকে একটি আলতার কৌটা বের করে। কৌটার মুখ খুলে কাঁপা হাতে সন্ধ্যার পায়ে আলতা পরিয়ে দেয়। বা পায়ের শেষ পর্যায়ে আসতেই সন্ধ্যা নড়েচড়ে উঠে ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলে,

“কি করছেন?”
সাথে সাথে আকাশের হাত থেকে আলতার কৌটাটি পড়ে যায়। হতদন্ত হয়ে সে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ায়। ঢোক গিলে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। যেন অনেক বড় ধরনের কিছু চু’রি করতে এসে ধরা পড়ে গিয়েছে।
সন্ধ্যার একটু-আধটু ঘুম হালকা হয়েছিল, পায়ে ঠান্ডা কিছু অনুভব করায়। কিন্তু তার ঘরে আকাশকে দেখে সন্ধ্যার ঘুম পুরোপুরি উবে যায়। বিস্ময় চোখে তকায় আকাশের দিকে। ঢোক গিলল মেয়েটা। আকাশকে দেখেই মনে পড়ল আকাশ সৃজনকে কার কাছে যেন দত্তক দিয়ে দিয়েছে৷ আর এজন্য সে তার বাচ্চাটাকে সেই কাল থেকে একটাবার সামনে থেকে দেখতে পায়নি। একটাবার বুকে নিতে পারেনি তার ছোটৃট বাচ্চাকে। সন্ধ্যার চোখজোড়া ভরে ওঠে। সে আকাশের দিকে চেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“আমার বাচ্চা কোথায়?”
আকাশ ঠোঁট চেপে ভাবলেশহীনভাবে বলে, “কতবার বলব, ওকে দত্তক দিয়ে দিয়েছি।”
সন্ধ্যার অ’সহ্য লাগলো। তার বাচ্চাকে আকাশ দত্তক দেয়ার কে? সে চেঁচিয়ে বলে, “সৃজনের বাবা বেঁচে থেকে ম’রে যেতে পারে। কিন্তু ওর মা এখনো বেঁচে আছে। ওকে দত্তক দেয়ার আপনি কে?”
আকাশ থমথমে কণ্ঠে বলে,
“শব্দদূষণ কর না। কানের প্রবলেম হচ্ছে আমার।”
সন্ধ্যার এতো রাগ লাগলো৷ সে আগের চেয়েও শব্দ করে চেঁচিয়ে বলে,
“জা’নো’য়া’র একটা।”
কথাটা বলতেই আকাশ এগিয়ে এসে সন্ধ্যার দিকে ঝুঁকে ডান হাতে সন্ধ্যার মুখ চেপে ধরে। সন্ধ্যার চোখে চোখ রেখে বলে,

“ভুলেও এই ওয়ার্ড আর উচ্চারণ করবে না। আমার হজমের প্রবলেম হয়।”
আকাশের কণ্ঠ নরম। সন্ধ্যার চোখজোড়া ভরে ওঠে। মনে পড়ে নিয়াজের বলা কথা। আকাশ কিছু ইচ্ছা করে করেনা। সন্ধ্যা কি করবে? আকাশ সবকিছু অনিচ্ছায় করলেও করে তো! তার৷ বাচ্চার থেকে তাকে কতদূরে করে দিয়েছে। আকাশ সন্ধ্যার চোখে পানি দেখে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। সন্ধ্যার মুখ চেপে ধরা হাত ঢিলে করে।
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার পাশে বেডের উপর বা পা ভাঁজ করে বসে। ডান পা মেঝেতে রাখে। দু’হাতে সন্ধ্যাকে ধীরে ধীরে টেনে তোলে আকাশ। এরপর আকাশ সন্ধ্যাকে তার বুকের সাথে হেলান দিয়ে বসায়। সন্ধ্যা নড়তে চাইলেও পারলো না। পেটের কাছটায় প্রচন্ড ব্য’থা। তবে শব্দ করে বলে,
“আমাকে ছাড়ুন বলছি। ছোঁবেন না আমাকে।”
আকাশ শুনলো না সন্ধ্যা। সে বা হাতে সন্ধ্যাকে আলতো করে নিজের সাথে ধরে রেখে ডান হাতের মুঠোয় সন্ধ্যার ডান হাত নেয়। এরপর সন্ধ্যার পায়ের দিকে তাকিয়ে সন্ধ্যার কানের কাছে মুখ রেখে মৃদুস্বরে বলে,
“তোমার পা দু’টো সুন্দর লাগছে।”

ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস পড়ায় সন্ধ্যা মৃদু কেঁপে ওঠে। আকাশের কথা শুনে সন্ধ্যার দৃষ্টি তার পায়ের দিকে পড়লে মেয়েটার চোখেমুখে বিস্ময় ভর করে। দু’পায়ে নুপুর, রিং দেখে যতটা না অবাক হলো তার চেয়ে বেশি অবাক হলো, পায়ে পরানো আলতা দেখে। সন্ধ্যার চোখের পাতা কাঁপছে। সন্ধ্যার মনে আছে, তার গলা অপারেশনের দিন সকালে আকাশ তার পায়ে আলতা পরিয়ে দিয়েছিল। আকাশ আলতা পরিয়ে দিলে সেটা বোঝা যায়। কারণ একটু আঁকা বাঁকা হয়। সন্ধ্যা বুঝল, আকাশের হাত কাঁপে। দেখতে অসুন্দর লাগেনা, তবে সন্ধ্যার চোখে ওই খুঁতটুকু ধরা পড়ে যায়। আজও সেই একইভাবে তাকে আলতা পরিয়ে দিয়েছে আকাশ? কেন?
আকাশ সন্ধ্যার পায়ের দিকে দৃষ্টি রেখেই আবারো বলে,

“কে যেন বলেছিল, বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট।”
কথাটা শুনে সন্ধ্যা একটা ঝাঁকুনি খায় মনে হলো।
আকাশ টের পেয়ে একটু হাসলো বোধয়। অতঃপর সে সন্ধ্যাকে আবারো আগের ন্যায় বিছানায় শুইয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। সে উঠতে চাইলেও পারলো না। আকাশ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“আর কতবার সৃজনের ভালো থাকার খবর দিলে তুমি আমাকে এসব গা’লি দেওয়া বন্ধ করবে?”
সন্ধ্যার বুকটা কেমন চিনচিন ব্য’থা করে উঠল। মুখ ফুটে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু গলার কাছে এসে বেঁধে যাচ্ছে। আকাশ এখানে দাঁড়ালো না। উল্টোদিকে ঘুরে যেতে নিলে সন্ধ্যা কাঁপা কণ্ঠে বলে, “শুনুন?”
আকাশ দাঁড়ালো। সন্ধ্যার দিকে ফিরলো। তবে সন্ধ্যার দিকে তাকালো না। তাকলো সন্ধ্যার পায়ের দিকে। সেথায় দৃষ্টি রেখে সন্ধ্যা কিছু বলার আগেই আকাশ বেসুরা গলায় কয়েক লাইন গায়,

“ওওওও তোর পরশে
আমার পরাণ পাথর গলে,
তোরে ছাড়া আমার একটাদিন না ঢলে,
ওই রূপোর ঘরে
রূপের বাতি জ্বেলে,
তোর পায়ের মলের আওয়াজ
গেলি ফেলে।
এটুকু গেয়ে আকাশ উল্টো ঘুরে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বসে যাওয়া গলায় আওড়ায়,
হায় রাব্বা….ওওওওও
হায় রাব্বা….ওওওও”
আকাশের গাওয়া গানে সুরের চেয়ে অসহায়ত্ব বেশি ছিল। বিশেষ করে শেষ দু’টো লাইনে। যেন আল্লাহ্’র কাছে অসহায় কণ্ঠে কিছু আর্জি করছে। সন্ধ্যার দৃষ্টি আকাশের অদৃশ্য হওয়ার পানে। দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। সে কি কিছু বুঝেছে? সে-ই জানে। বুকে অ’সহ্য ব্য’থা করছে।

সৌম্য টিউশন থেকে বাড়ি ফিরছিল। হাতে কিছু বাজার। একটি দেশি মুরগি আর একটু পোলাও এর চাল। অনেকদিন পর একটু ভালো কিছু বাজার করেছে তার ইরাবতীর জন্য। গতকাল মেয়েটাকে থা’প্প’ড় মেরেছে ভাবলেই বুকটায় অ’সহ্য ব্য’থা করে ওঠে। সৌম্য ঢোক গিলে দ্রুত পা চালালো। ভাবলো একটা রিক্সা নিবে। কিন্তু এক সেকেন্ডেই সে ভাবনা চাপা দিল। সে কি করে বিলাসী জীবনযাপন করতে চায়? তার তো এসব মানায় না। সে এখন ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে বাড়ি গেলে কি করে হবে? তার তো চাকরি নেই। আর না তো কখনো হবে! তাকে টিউশনেই চলতে হবে। আর এই ঢাকা শহরে টিউশন করে চলার পর পকেটে ৫০ টাকার মূল্য লাখ টাকার সমান। এটা তার মতো মধ্যবিত্ত ছেলে না বুঝলে আর কে বুঝবে? সৌম্য রিক্সা নিল না। বরং পায়ের গতি বাড়ালো। এই টাকা দিয়ে সে তার ইরাবতীকে আরেকদিন আরেকটা ভালো জিনিস খাওয়াতে পারবে। কথাটা ভেবে সৌম্য মৃদু হসলো। হঠাৎ-ই পিছন থেকে শ’ক্ত কিছু সৌম্য’র পিঠে আ’ঘাত হানে। সৌম্য’র হাত থেকে বাজারে ব্যাগ ছিটকে পড়ে যায়।

সাথে সেও হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। সৌম্য’র মনে হলো তার বুক চেপে আসছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। অনেক ভারী কিছু তার পিঠে আ’ঘাত হেনেছে, সে বুঝেছে। হঠাৎ-ই গো’লা’গু’লির আওয়াজ কানে ভেসে আসে। সৌম্য কোনোরকমে উঠে দাঁড়িয়ে উল্টোদিকে ফিরে তাকায়। চোখজোড়া নিভু নিভু। চোখে পড়ল তার দিকে একজন লোক ছুটে আসছে। যার হাতে পি’স্ত’ল। সৌম্য বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। বুকটা কাঁপে। তার কিছু হলে তার ইরাবতীর কি হবে? সৌম্য আর কিছু ভাবলো না। সে বুঝল তাকে এখান থেকে পালাতে হবে। নয়তো সে ম’রে হবে। আর সে ম’রে গেলে তার ইরাবতীও যে ম’রে যাবে। সৌম্য উল্টোদিকে দৌড় লাগায়। পিছন থেকে থেকে থেকে গু’লি ছুটে আসছে। যেগুলো সৌম্য’র পাশ ঘেঁষে চলে যাচ্ছে। সৌম্য’র দৃষ্টিজুড়ে অসহায়ত্ব। চোখের সামনে বারবার ইরাবতীর মুখটা ভেসে উঠছে। খুব করে আল্লাহ্কে ডাকলো, তার যেন কিছু না হয়। প্রাণপণে ছুটছে ফাঁকা রাস্তায়। পুরো শরীরে কম্পন ছেলেটার।

সৌম্য’র পিছু পিছু অধীর দৌড়াচ্ছে। চোখেমুখে অজস্র ক্রোধ। আশ্চর্যের বিস্ময় অধীরের পিছু আকাশ দৌড়াচ্ছে। যার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অন্ধকারের মাঝে দৌড়ানো অবস্থায় সৌম্যকে টার্গেট করা অধীরের পানে। ডান হাতে একটি বড়সড় হাতুড়ির মতো। একজন মানুষকে থেতলে দেয়ার জন্য এটা যথেষ্ট। আকাশ হঠাৎ-ই তার লক্ষ্য ঠিক রেখে হাতের এই বস্তুটি অধীর বরাবর ছুড়ে মা’রে। আকাশের লক্ষ্য অনুযায়ী বস্তুটি অধীরের একেবারে মাথা থেকে সামান্য নিচে ঘাড় বরাবর গিয়ে লাগে। পিছন থেকে এতো জোরে আ’ঘাত পেয়ে অধীর উল্টে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। বা হাতে ঘাড় চেপে অ’সহ্য ব্য’থা অগ্রাহ্য করে উল্টোদিকে ফিরলে আকাশকে তার দিকে দৌড়ে আসতে দেখে অধীরের দৃষ্টিতে বিস্ময় ভর করে। আকাশের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।

প্রথমবারের মতো অধীরের সাদা চোখের মণিতে আকাশের দৃষ্টি আটকায়। ঠোঁটের কোণে লেপ্টানো হাসি মিলিয়ে যায়। অধীরের মুখ দেখতে চাইল, কিন্তু পারলো না। কারণ অধীর পুরো প্যাকেট, শুধুমাত্র চোখ দু’টো ছাড়া। আকাশ তার পায়ের গতি বাড়ালো। অধীর এক সেকেন্ডও সময় ন’ষ্ট করল না। সে উল্টো ঘুরে সৌম্য’র দিকে দৌড় লাগায়। ডান হাতের পি’স্তল উঠিয়ে সৌম্য’র দিকে একটি গু’লি ছোড়ে। এইবারের গু’লিটি সৌম্য’র ডান হাতে বিঁধে যায়। সৌম্য’র পা থেমে যায়। মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে। বা হাতে ডান হাত চেপে ধরে। সারাদিনের ক্লান্তি, এতোক্ষণের দৌড়ানো, এখন একটি গু’লি সবমিলিয়ে সে আর এগোতে পারলো না। ঠাস করে মাটিতে মাটিতে বসে পড়ে।
তখনই সৌম্য’র মাথার উপর দিয়ে একটা ঝাপ দেয় অধীর। সৌম্য কিছু বোঝার বোঝার আগেই সৌম্য’র মাথার উপর দিয়ে আকাশও একটা লাফ দিয়ে সামনে এগোয়। এবার সে অধীরের পরপর ঝাঁপ দেয়ায় অধীরকে নাগাল পায়। ডান হাতে অধীরের হুডি টেনে ধরে আকাশ। অধীর ব্যাপারটি বুঝতেই সে নিজেই টান মেরে হুডি খুলে ফেলে। ফলস্বরূপ তার হুডি আকাশের হাতে চলে আসে। আকাশ এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। তার সাথে ঠিক কি হলো, এটুকু বুঝতে একটু সময় লাগলো তার। ওদিকে অধীর থেমে নেই। সে সামনে দৌড়ালো। আকাশ অধীরের হুডি ডান হাতে পেঁচিয়ে অধীরের দিকে দৌড়ায় আর বলে,

“ওই কু’ত্তা’র বাচ্চা, দাঁড়া বলছি। সাহস থাকলে সামনে এসে লড়াই কর।”
অধীর আকাশের কথা গায়ে মাখলো না। তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। বিড়বিড় করে,
“সৌম্যকে বাঁচিয়ে আমার ফাঁদে পা দিয়ে দিলি। বোকা এভি!”
তখনই অধীরের সামনে একটি হেলিকপ্টার এসে থামে। অধীর একটা লাফ দিয়ে হেলিকপ্টারে উঠে পড়ে। সাথে সাথে হেলিকপ্টার উপড়ে উঠতে থাকে। আকাশ দৌড়ে এসেও লাভ হলো না। ততক্ষণে হেলিকপ্টারটি অদৃশ্য হওয়ার পথে। আকাশ মাটওতে দাঁড়িয়ে পরাজিত সৈন্যের ন্যায় ফোঁসফোঁস করতে লাগলো। এতোদূর এসেও হাত ফসকে গেল। ডান পা ফুটবল লাথি দেয়ার মতো করে শব্দ করে বলে,
“ড্যাম ইট।”

আকাশের প্রশ্ন জাগে, কে এই ছেলে? তার মাথা কাজ করেনা। চোখদুটো ওমন ভয়ানক সাদা কেন বুঝল না। লেন্স লাগিয়েছে নাকি চোখই ওরকম? এটাও বুঝল না। হাতে পেঁচানো হুডি সামনে মেলে ধরলো। পুরোটা কালো রঙের। তবে হুডির পিছনে সাদা কালারে লেখা, ‘AD..’
এরপরের অক্ষরগুলো মিশে গিয়েছে বোঝা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখানে পাঁচ অক্ষরের একটি নাম ছিল, যার প্রথম দু’টো অক্ষর আছে বাকিগুলো একেবারেই বোঝা যাচ্ছে না। আকাশের কপালে চিন্তার ভাঁজ। সৌম্য’র কথা মনে পড়তেই আকাশ হুডিটি আবারো হাতে পেঁচিয়ে দ্রুত উল্টোদিকে দৌড়ে আসে সৌম্য’র দিকে। ততক্ষণে সৌম্য ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছে। শব্দ পেয়ে সামনে তাকালে দেখল আকাশ তার দিকে এগিয়ে আসছে। এখানে আসলে কি হলো সৌম্য এর কিছুই বুঝল না। তাকে কে গু’লি করেছে এটাও সে বুঝতে পারছে না। শুধু জানে একজন হেলিকপ্টার নিয়ে পালালো। আর আকাশ চেঁচিয়ে তাকে গা’লি দিল। ভাবনার মাঝেই আকাশ দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে সৌম্য’র ডান হাতের শার্টের হাতা টেনে বিচলিত কণ্ঠে বলে,

“গু’লি কি লেগেছে নাকি অন্যকিছু?”
কথাটা বলতে বলতে আকাশ সৌম্য’র দিকে তাকায়। সৌম্য বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। গতকালকেই আকাশকে যে রূপে দেখেছে, আজকেই এমন আকাশকে ঠিক হজম হচ্ছে না। সৌম্য’র দৃষ্টি দেখে আকাশ সৌম্য’র হাত ছেড়ে দেয়। ঢোক গিলে নিজেকে সামলায়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিজেকে একটু গোছালো। এরপর সৌম্য’র দিকে চেয়ে শ’ক্ত গলায় বলে,
“গু’লিটা তোর বুকে লাগলে বেশি খুশি হতাম।”
কথাটা বলে আকাশ সৌম্যকে পাশ কাটিয়ে উল্টোপথে এগোয়। গলায় কাঁটা বিঁধে যাওয়ার মতো জ্বলে উঠল কেন যেন। পায়ের গতি বাড়ালো আকাশ।

এদিকে সৌম্য মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে একজায়গায়। আকাশের বলা কথাটা বারবার কানে বাজে, ‘গু’লিটা তোর বুকে লাগলে বেশি খুশি হতাম।’
সৌম্য কি ছিঁদকাদুনে হয়ে গেছে? তার এতো চোখ ভেজে কেন ইদানীং। তার তো কোনোকালেই ভাই ছিল না। যা আছে, সে শ’ত্রু। এ তো নতুন নয়। তবে সে কেন দুঃখ পায়? সৌম্য ঢোক গিলে ধীরপায়ে সামনের দিকে এগোয়। পকেটে টাকা নেই বাজার করে। চিকিৎসা করাবে কি করে? বাজারগুলোরও বোধয় অস্তিত্ব নেই। তার ইরাবতীর মুখের খাবার নষ্ট করে করে দিল আকাশ। তার হতটাও অচল করে দিল। সৌম্য’র দমবন্ধ লাগলো। এটাই বোধয় তার জীবন।

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৯

আকাশ কিছুদূর গিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে নিয়াজকে মেসেজ করে দেয় এই জায়গার লোকেশনটি। সাথে এটাও লেখে, ‘সৌম্য’র ডান হাতের নিচ থেকে তিন ইঞ্চি বরাবর একটি গু’লি লেগেছে। ইমিডিয়েটলি ওর ট্রিটমেন্ট করাতে।’
মেসেজটি সেন্ড করে আকাশ চারিদিকে দৃষ্টি ঘোরায়। থেকে থেকে সিভিল ড্রেসে লোক দাঁড়ানো। এরা যে এই হুডিওয়ালার লোক, এটা আকাশ বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছে। যার ফলে, সৌম্যকে হেল্প করার ক্ষেত্রে, আকাশের হাত অটোমেটিক শিকলবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। আকাশ হাতের হুডিটির দিকে তাকায়। চোখেমুখে অজস্র ক্রোধ জমা হয়। বিড়বিড় করে,
“কল্পনাতীত বিভৎস এক হ’ত্যার মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাসে তোকে আর আমাকে লিখে রাখবো। তোর নাম থাকবে মৃ’তের তালিকায়, আর আমার নাম থাকবে এক নির্মম খু’নির খাতায়।”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২০