Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২১

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২১

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২১
DRM Shohag

ঘড়ির কাটা তখন ১২ টার ঘর ছাড়িয়েছে। কিন্তু সৌম্য’র মাঝে বাড়ি যাওয়ার জন্য তাড়া দেখা যায় না। সেই একই জায়গায় একইভাবে বসে আছে। ইরাকে কল করে বলেছে, খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে। কথাটা বলেই কল কে’টে দিয়েছে। ইরাকে কিছু বলার সুযোগ টুকু দেয়নি।

তার ভাবনায় সেই ছোট্টবেলার স্মৃতি। যেখানে ছিল তাকে আগলে রাখার জন্য এক বড় ভাই, ছিল তার মমতাময়ী মা, ছিল তার আদুরে বোনু, আর ছিল ভালোবাসার বাবা। সবাইর মাঝে সৌম্য তার রঙিন স্বপ্ন নিয়ে সারাগ্রাম ছুটে বেড়াতো। যেখানে ছিল না কোনো ব্য’থা। ছিল না কোনো দুঃখ। সেসময় সৌম্য এটাই বুঝতো না, আসলে দুঃখ জিনিসটা কি! তাদের ছোট্ট সংসারে ছিল শুধু সুখ আর সুখ। যদিও মাঝে মাঝে বাবা মায়ের সাথে একটু অন্যরকম আচরণ করত। তবে সৌম্য ওসবের মানে সেভাবে বুঝত না। মা বুঝতে দিত না। তবে সৌম্য’র ভাষায় সে তার সেই জীবনে সেই সময়টায় স্বর্গীয় সুখ পেয়েছিল। রোজ রোজ, একটি হাফ প্যান্ট পরে, হাতে বরশি আর পাতিল নিয়ে ছুটত মাছ ধরার জন্য। হাত-পায়ে কাঁদা মাখিয়ে, পাতিল ভর্তি মাছ নিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে মায়ের হাজারটা বকা শুনতো সারাদিন না খাওয়ার জন্য।

শহর থেকে অধীর ভাইয়া গ্রামে গেলে মায়ের বকুনি থেকে বাঁচিয়ে নিত। আরও কতশত রঙিন স্মৃতি জমে আছে, তার হিসাব নেই। সেসব স্মৃতি আজ হারিয়ে গেছে। মা আর অধীর ভাইয়াও মা’রা গেল। সৌম্য’র স্বপ্ন, শখ-আহ্লাদ চাপা পড়ে গেল। এই স্বা’র্থপ’র দুনিয়াকে চিনলো৷ দায়িত্বশীল হয়ে গেল। কাজ করতে শিখলো। ছোট্ট বোনুর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল সেই সৌম্য। তাদের সুখ কোন দূর অজানায় পালালো কে জানে! আজও সেই সুখের দেখা পেল না। এতোগুলো বছর পর সন্ধ্যার মুখে অধীরের নাম শুনে সৌম্য’র কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটিয়ে দেয়ার মতো হয়েছে। সেই তখন থেকে একটু পর পর শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুচছে।
সৌম্য’র থেকে ডানদিকে কয়েক হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে অধীর। প্রায় ৩০ মিনিট যাবৎ একইভাবে দাঁড়ানো সে। পরনে সবসময়ের মতো কালো পোষাক। মুখে রুমাল বাঁধা। মাথায় ক্যাপ। দৃষ্টি সৌম্যতে। সৌম্য’র ডান পায়ের উরুর উপর রাখা ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে বেশ কয়েকবার তাকিয়েছে। একটু পর পর সৌম্য’র চোখ মোছার ব্যাপারটিও তার চোখের আড়াল হয়নি।

অধীর ধীরপায়ে এগিয়ে এসে সৌম্য’র ডানপাশে পাকা রাস্তার সাইডে বসে। শব্দ পেয়ে সৌম্য দ্রুত ডানদিকে ফিরে তাকায়। অধীর-ও ঘাড় বাঁকিয়ে সৌম্য’র দিকে ফেরে। তবে তার মাথা নিচু৷ ডান হাতে এক লিটারের একটি পানির বোতল। যেটা সে সৌম্য’র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মৃদুস্বরে বলে,
“পানি খাও, ভালো লাগবে।”
সৌম্য ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কে আপনি?”

অধীর চোখ তুলে তাকায়। চোখাচোখি হয় দু’জনের। অধীরের সাদা চোখের মণি দেখতে পেয়ে সৌম্য ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। বিস্মিত হয় ছেলেটা। কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়৷ আজ এসব কি হচ্ছে। একবার সন্ধ্যা জিজ্ঞেস করছে, অধীর ভাইয়া সত্যিই মা’রা গিয়েছে কি-না! আর এখন একদম অধীরের চোখের মণির মতো সাদা চোখের মণি দেখে সৌম্য কথা বলার ভাষা হারায়। সৌম্য দু’হাতে চোখ ডলে নেয়, সে চোখে ভুল দেখছে কি-না এই ভেবে। নাহ্ লোকটার চোখের মণি দু’টো আসলেই সাদা। সে একদম ভুল দেখছে না। সৌম্য’র এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, তার পাশে এসে অধীর এসে বসেছে। কথাটা ভেবে সৌম্য বলতে নেয়, “আপনি…..
থেমে যায় সৌম্য। নিজের উপর চরম বিরক্ত হয় সে। একরকম চোখের মানুষ এই পৃথিবীতে হাজারটা আছে। সাদা চোখের মণি হলেই যে সে অধীর হবে এটা কোথায় লেখা আছে? সে বেশি ইমোশোনাল হয়ে যাচ্ছে। সৌম্য তার মাথা সোজা করে চোখ বুজে দু’দিকে মাথা নাড়ায়। নিজেকে সামলায়। পাশে বসা অধীর সৌম্য’র অবস্থা বুঝতে পেরে সূক্ষ্ম হাসলো বোধয়৷ অতঃপর বলে,

“আমি পথিক। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। তোমাকে কাঁদতে দেখে এগিয়ে আসলাম।”
সৌম্য বিব্রতবোধ করে। বিরক্তি কণ্ঠে বলে, “আমি কাঁদছি না। আপনি আপনার কাজে যান।”
অধীর উত্তরে বলে,
“আপাতত আমার কোনো কাজ বলেই তো তোমার পাশে এসে বসলাম। আর আমি তো বলিনি, তুমি বাচ্চাদের মতো করে কাঁদছিলে। তুমি বড়দের মতো করে ভীষণ ম্যাচিউরভাবে কাঁদছিলে। আমি দেখেছি।
সৌম্য কি বলবে বুঝল না। অধীর বোতলটি আরেকটু এগিয়ে দিয়ে আবারো বলে,
চোখেমুখে পানি দাও, ভালো লাগবে।”
সৌম্য অধীরের দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর গলায় বলে,

“ধন্যবাদ আপনাকে। তবে আমার পানি লাগবেনা। আপনি যেতে পারেন।”
অধীর বলতে নেয়, “সৌম….
এটুকু বলে আটকে যায়। ফোঁস করে স্বাস ফেলে বলে,
আমাকে একজন সমাজসেবক ভেবে, এটুকু হেল্প গ্রহণ করতে পারো। একজন সমাজসেবক কাউকে হেল্প করতে না পারলে তার কিন্তু অনেক গিল্টি ফিল হয়। লাইক মি।
সৌম্য’র ভ্রু কুঁচকে যায়। লেকটা অনেক বেশি কথা বলে। তবে কথাগুলো বেশ গোছানো। সৌম্যকে চুপ দেখে অধীর আবারও বলে,

তুমি চাইলে আমাকে তোমার বড় ভাই ভাবতে পারো। তাহলে আমার হেল্প নিতে তোমার সংকোচ লাগবেনা।”
কথাটা শুনতেই সৌম্য’র কেমন যেন অদ্ভুদ অনুভূতি হলো। ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় অধীরের দিকে। অধীরের মাথা নিচু। মুখ দেখতে পেল না। সৌম্য’র মাঝে লোকটির মুখ দেখা নিয়ে তেমন আগ্রহ-ও দেখা গেল না। সে অস্ফুটস্বরে আওড়ায়, “বড় ভাই?”
অধীর হাতের বোতলটি সৌম্য’র পাশে মাটিতে রেখে দৃষ্টি সৌম্য’র পানে রেখে জিজ্ঞেস করে,
“কি নিয়ে এতো দুঃখ পাচ্ছো?”
সৌম্য’র মাথা সোজা। ছেলেটা আজ ভীষণ ইমোশনাল হয়ে পড়েছে। ধরা গলায় বলে,
“আমার তো দুঃখের শেষ নাই বড় ভাই। কোনটা রেখে কোনটা শুনবেন?”

অধীর ঢোক গিলল। সৌম্য কি সুন্দর করে বলল, বড় ভাই। ঠিক ছোটবেলায় সৌম্য মাঝে মাঝেই এভাবে বড় ভাই বলে ডাকতো। অথচ সেসব অতীত হয়ে গেছে। সৌম্য ভুলে গিয়েছে তাকে।
অধীর ভাবে, সৌম্য সামান্য অভাব-অনটন আর থেকে থেকে তার ইরাবতীকে হারানোর ভ’য়েই এতো ক’ষ্ট পাচ্ছে? আর সে যে তার প্রাণকে একেবারে হারিয়ে ফেলেছে। যার একমাত্র কারণ সৌম্য। তার প্রাণকে তার থেকে কে’ড়ে নিয়েছে সৌম্য। এই সৌম্য তার এককালের ছোট ভাই ছিল। অথচ সৌম্য স্বা’র্থপ’রে’র মতো তাকেও ভুলে গিয়েছিল। ক’ষ্ট তো তার পাওয়া উচিৎ। অথচ সৌম্য তাকে এতো ক’ষ্ট দিয়েছে সে এটুকুতেই হাঁপিয়ে গেল? অধীর আরেকবার তাকালো সৌম্য’র আহত হাতটির দিকে। যে হাতে বিকালে সে একটি গু’লি করেছিল। দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব। নিজের অবস্থা দেখে নিজেকে নিয়ে বিদ্রূপ হাসলো অধীর। শ’ত্রুর জন্য সে মায়া দেখিয়ে বেড়ায়। অধীরের খুব জানতে ইচ্ছে করল, সৌম্য তাকে একটুও মনে রেখেছে কি-না! তার ভাবনা অনুযায়ী অধীর জিজ্ঞেস করে,

“তোমার কোনো বড় ভাই নেই?”
কথাটা শুনে সৌম্য’র দমবন্ধ লাগলো৷ দু’হাতের মাঝে মুখ লুকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে,
“ছিল। ছোটবেলার অধীর ভাইয়া। বড়বেলার আকাশ ভাইয়া। অধীর ভাইয়া মা’রা গেল, আর আকাশ ভাইয়া বদলে গেল।”
অধীর খুব স্বাভাবিকভাবে বসে ছিল। সৌম্য’র উত্তরটা শুধু ‘না’ হবে ভেবে সে ভাবলেশহীন হয়েছিল। আবারো সৌম্য’র মুখ ফিরিয়ে নেয়া দেখে, তাকে অস্বীকার করা দেখে নতুন করে দুঃখ পাবে ভাবছিল। কিন্তু সৌম্য’র মুখে নিজের মৃ’ত্যু’র কথাশুনে অধীর বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। সে মা’রা গেছে মানে? সে তো দিব্যি বেঁচে আছে। তবে সৌম্য তাকে মৃ’ত কেন বলছে? অধীর বিস্ময় কণ্ঠে আওড়ায়,
“তোমার অধীর ভাইয়া কবে মা’রা গিয়েছে?”
সৌম্য ঢোক গিলে বলে,

“সে তো অনেক ছোটবেলায় মা’রা গিয়েছে। আমার মা মা’রা যাওয়ারও আগে।”
অধীর কথা বলার ভাষা হারায়। সে ছোটবেলায় কি কখন মা’রা গেল? সৌম্য এসব কি বলছে? অধীরের মস্তিষ্ক এলোমেলো লাগে। সে আবারো জিজ্ঞেস করে,
“সে কিভাবে মা’রা গেল?”
সৌম্য কথার তালে বলে,

“জানিনা। একদিন হুট করেই পুরো গ্রাম ছড়িয়ে গেল আমার অধীর ভাইয়া মা’রা গেছে। আমি বিশ্বাস করছিলাম না। ছুটতে ছুটতে অধীর ভাইয়াদের ভাইয়াদের বাড়ির উঠানে গেলে দেখতে পাই সত্যি সত্যিই সেখানে একটি লা’শ রাখা। আমি ভিড় ঠেলে দৌড়ে সেই লা’শের পাশে গিয়ে দাঁড়ালে দেখতে পাই খাটিয়ায় অধীর ভাইয়া শোয়া। আমি চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠি। অধীর ভাইয়াকে ধরার জন্য একটু হাত বাড়াই, কিন্তু কোথা থেকে যেন অধীর ভাইয়ার বাবা এসে আমার গালে খুব জোরে পাঁচটা থা’প্প’ড় মেরেছিল। আমার নাক-মুখ কে’টেও গিয়েছিল। কিন্তু আমি ওজন্য একটুও কাঁদিনি৷ আমি আমার অধীর ভাইয়ার জন্য কাঁদছিলাম। অনেক ডেকেছিলাম তাকে। কিন্তু অধীর ভাইয়া আমার ডাক শুনলো না। আমাকে আর বোনুকে রেখে চলে গেল না ফেরার দেশে।”
সৌম্য’র গলা বেঁধে আসে। চোখদুটো বড্ড ঝাপসা। অধীর স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। সৌম্য এসব কি বলছে? তার মাথা ভনভন করে ঘুরছে। হিসাব যে মিলছেনা। সে ঢোক গিলে বলে,

“অধীরের বাবা তোমাকে কেন মে’রেছিল?”
সৌম্য মলিন গলায় বলে,
“তারা বিদেশি মানুষ ছিল। অধীর ভাইয়া বড় ঘরের ছেলে ছিল। কিন্তু আমি গ্রামের সাদাসিধে ছেলে ছিলাম। অধীর ভাইয়ার বাবা আমাকে পছন্দ করতো না। সে চাইতো না, অধীর ভাইয়া আমার সাথে মিশুক।”
কথাগুলো বলে সৌম্য একটু থামে। অধীর অবাক হয়ে দেখে সৌম্যকে। সৌম্য একটু হেসে ভাঙা গলায় বলে,
“কিন্তু অধীর ভাইয়ার মন খুব ভালো ছিল। সে তার বাবার ওসব কথা শুনতো না। আর না তো আমাকে কখনো সেসব বুঝতে দিত। আমাকে অনেক আদর করত। বোনুকেও খুব ভালোবাসতো। অধীর ভাইয়া আমার বোনুকে বিয়ে করতে চাইতো। আমারো অধীর ভাইয়াকে আমার বোনুর পাশে দেখার খুব শখ ছিল। আমি তাকে বলেছিলাম, ‘আমি বেঁচে থাকলে আমার বোনু শুধুমাত্র আপনার বউ হবে।’ অধীর ভাইয়া খুব খুশি হতো। মাঝে মাঝে তো খুশিতে প্রায় কেঁদেই ফেলতো। আমাকে যেমন ভাই হিসেবে খুব ভালোবাসতো। আমার বোনুকে বউয়ের মতো করে খুব ভালোবাসতো সে। কিন্তু সেসব কিছুই হলো না। অধীর ভাইয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেল। সব স্বপ্ন ভেঙে গেল।”
কথাগুলো বলে সৌম্য বা হাতে চোখের পানি নিয়ে ছিটকে ফেললো। অধীর অনবরত ঢোক গিলছে। এসব কি মিথ্যে গল্প? না-কি সে যা জানে সেসব মিথ্যে গল্প? কিন্তু সৌম্যকে দেখে তো একটুও অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না তার। সে জিজ্ঞেস করতে চাইল, সৌম্য তাদের আগের গ্রাম ছেড়ে এতো দূর গ্রামে কেন এসেছিল। তার আগে সৌম্য নিজেই বলে,

“সেদিন ছিল শুক্রবার। শুনেছিলাম জুম্মার নামাজ পর অধীর ভাইয়ার জানাজা হবে। আমি সেদিন মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েছিলাম। তারপর সবার পিছু পিছু একটি মাঠে গিয়েছিলাম। ওখানে অধীর ভাইয়ার খাটিয়া নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর অধীর ভাইয়ার বাবা আমাকে দেখে খুব রে’গে যায়। আমাকে ধাক্কা দিয়ে ওখান থেকে বের করে দেয়। আমি এতো কেঁদে কেঁদে বললাম, ‘অধীর ভাইয়া আমার বড় ভাই৷ আমি তার জানাজা পড়ব। আমাকে প্লিজ এই নামাজ পড়তে দেন।’ কিন্তু আমার কথা সে শুনলো না। কেউই কানে নিল না। তার অনেক ক্ষমতা ছিল। তাই, কেউ আমাকে একটু করুণাও করেনি। কিন্তু আমি সেখান থেকে চলে যায়নি। কি করে চলে যাবো? আমার অবুঝ বয়স থেকে যে আমাকে এতো ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে, তার শেষ সময়ে তার পাশে না থাকলে কিভাবে হতো? সবাই নামাজে দাঁড়িয়ে গেলে আমি সবার পিছনে এক কোণায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। জানাজার নামাজ পড়েছিলাম। অধীর ভাইয়ার জন্য কেঁদে কেঁদে অনেক দোয়া করেছিলাম।”
কথাগুলো টানা বলে সৌম্য আবারও থামে। দু’চোখ বেয়ে অগণিত অশ্রুকণা গড়িয়েছে। সৌম্য কেমন নির্জীব হয়ে বসে আছে। কয়েকবার শ্বাস নিয়ে আবারো বলে,

“পরবর্তীতে শুনেছিলাম, অধীর ভাইয়া এক্সিডেন্টে মা’রা গিয়েছে। ওই গ্রামে থাকলে খুব কান্না আসতো। মা, বাবা আমার অবস্থা খারাপ দেখে, ওই গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে জেনেছি, কোনো এক ঝামেলার কারণে বাবা মাকে নিয়ে ওই গ্রামে ছিল কয়েক বছর। বাবার আসল গ্রাম ছিল বগুড়া শহর থেকে গ্রামের দিকে। গ্রামের নাম ‘মিলনের পাড়া।’
সেই গ্রামে আরও পরে যেত। কিন্তু দিন দিন অধীর ভাইয়ার জন্য অস্বাভাবিক হতে দেখে আমরা সেই গ্রাম ছেড়ে একেবারে চলে আসি।”
কথাগুলো শুনতে শুনতে অধীরের চোখ বেয়ে কখন যে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, সেদিকে তার হুশ নেই। এসব কি ঘটে গিয়েছে তার অগোচরে? সে বেঁচে থাকতে তার বাবা কি করে নিজের ছেলের জানাজা পড়ালো? সবচেয়ে বড় কথা তার বাবা যে তাকে আরেক গল্প বলেছিল। সেই গল্প তবে কোথায় গেল? অধীর ঢোক গিলে সৌম্য’র উদ্দেশ্যে বলে,

“যদি কখনো জানতে পারো, তোমার অধীর ভাইয়া এখনো বেঁচে আছে।
কথাটা শুনে সৌম্য একটু হাসলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“এটা সম্ভব নয়। অধীর ভাইয়া বেঁচে থাকলে আমাকে আর বোনুকে কখনো এতো দুঃখ ছুঁতে পারতো না।”
কথাটা শুনতেই অধীর বা হাতে কাঁচা মাটি খামচে ধরে। বুকের বা পাশটায় ধারালো ছু’রি বিঁধে যাওয়ার মতো অনুভূত হয়। ঝাপসা দৃষ্টি মাথা নিচু করে রাখা সৌম্য’র পানে নিবদ্ধ। সৌম্য এতো বড় হয়েও তাকে আজো সেই ছোট্ট সৌম্য’র মতোই ভালোবাসে। আজো তাকে নিয়ে কত স্বচ্ছ ধারণা নিয়ে থাকে? অথচ গত চারবছরে সৌম্যকে সব দুঃখ কেবল সে দিয়েছে। সে সৌম্য’র মুখোমুখি হওয়ার শ’ক্তি হারালো বলে তীব্র দুঃখের ভারে।
সৌম্য দু’হাতে চোখমুখ ডলে নিজেকে সামলে ঘাড় বাঁকিয়ে অধীরের দিকে তাকায়। সাথে সাথে অধীর দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। সৌম্য’র চোখে একবার পড়েছে অধীরের লাল দু’টো চোখ। সে এসব নিয়ে মাথা ঘামালো না। অধীরের উদ্দেশ্যে সে মৃদুস্বরে বলে,

“আপনাকে আমি চিনিনা। তবুও অনেককিছু বলে ফেললাম। সমাজসেবক হিসেবেই বলেছি। আপনাকে ভালো মানুষ মনে হয়েছে আরেকটি মস্ত বড় কারণ, আমার অধীর ভাইয়ার চোখ একদম আপনার মতোই ছিল। আমার আর বোনুর পছন্দের। তাই ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম। আপনি বিরক্ত হলে, দুঃখিত! চিন্তা করবেন না, আপনাকে বড় ভাই ডাকলেও এসব সম্পর্ক কখনো টানবো না। আমার ভাগ্য এতো ভালো নয়, কেউ দু’মাসও ঠিক করে পাশে থাকতে পারে না। একটা বন্ধু ছিল, সে-ও সময়ের সাথে সাথে আমাকে ভুলে গিয়েছে। একটা খোঁজ পর্যন্ত নেয় না আর৷”

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে সৌম্য’র আবারো গলা ধরে আসে। রিহানের হাসিমুখটা ভেসে উঠল চোখের পর্দায়। আজ বছর ঘুরে আসলো, রিহানের দেখা নেই৷ ভুলে গিয়েছে তাকে।
সৌম্য’র শেষ কথা শুনে অধীর চোখ বুজে ঢোক গিলল। মনে মনে আওড়ালো, ‘রিহান’ শব্দটি। অস্থির হলো বড্ড। সে যে সৌম্য’র সব কে’ড়ে নিয়েছে। বন্ধু-ও কে’ড়ে নিয়েছে।
সৌম্য নিজেকে সামলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। অধীরের পিছন দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করে বাড়ির পথে। পা চলছে না। একটু পর পর শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছে নেয়। অধীর নির্জীব মানুষের ন্যায় বসে আছে। টকটকে লালিত অসহায়ত্বে দৃষ্টিজোড়া এলোমেলো পায়ে হাঁটতে থাকা সৌম্য’র পানে।

একটি বিলাশবহুল বাড়িতে মধ্যবয়সী এক লোক ডায়নিং রুমে অনবরত পায়চারি করছে আর ফোনে কারো সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে অধীর। যার চোখেমুখে অজস্র ক্রোধ। ভস্ম করা দৃষ্টি মধ্যবয়স্ক লোকটির পানে। ডান হাতে ধারালো একটি অ’স্ত্র৷ অনেকটা সাবল এর মতো।
মধ্যবয়স্ক লোকটি কথা বলতে বলতে হঠাৎ-ই দরজায় দৃষ্টি পড়লে অধীরকে দেখে তার কথা থেমে যায়৷ অধীরের হাতে অ’স্ত্র সাথে অধীরের দৃষ্টি দেখে লোকটি কেঁপে ওঠে। কিছু বলতে চায় সে, অধীর তাকে সেই সুযোগ দেয় না। ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে বা পায়ে লোকটির বুক বরাবর একটি জোরেসোরে লাথি মা’রে। লোকটি সোফার উপর গিয়ে উল্টে পড়ে৷ হাতের ফোন ছিটকে আরেকদিকে গিয়ে পড়েছে। অধীর লোকটির পেটে বা পা শক্ত করে চেপে ধরে, বা হাতে লোকটির গলা চেপে ধরে। ডান হাতে অস্ত্রটি লোকটির চোখ বরাবর গেড়ে দেয়ার মতো করে রেখে অগ্নি ঝরা কণ্ঠে বলে,

“তুই আর আমার বাপ মিলে এতোদিন আমাকে যে মিথ্যে গল্প বলেছিস, তার ইতি ঘটাবি আজ। বল, ছোটবেলায় আমার বাপ আমার নাম করে কার জানাজা পড়েছিল সেই গ্রামে? সব বলবি। এ টু জেড।”
লোকটি থরথর করে কাঁপতে থাকে। কিছু বলতে নেয়, তার আগেই অধীর টেবিলের উপর রাখা মদের বোতল নিয়ে লোকটির মাথায় গায়ের বারি দিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলে। লোকটি গগণ কাঁপানো চিৎকার করে ওঠে। দু’হাতে মাথা চেপে ধরে। অধীর আধভাঙা কাঁচের বোতল ছুড়ে ফেলে লোকটির কলার টেনে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,
“এক সেকেন্ড টাইম ওয়েস্ট করবি তো, মৃ’ত্যু ছাড়া জা’হা’ন্না’ম দেখিয়ে আনবো।”

লোকটি কাঁপতে কাঁপতে বলে,
“ববলছি বললছি।”
অধীরের শক্ত কণ্ঠ, “কুইক।”
লোকটি হাঁপানো কণ্ঠে বলতে লাগে,
“তোমার বাবা সৌম্য, সন্ধ্যাকে একটুও পছন্দ করতো না। তোমদের আলদা করার অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তোমার সাথে পারেনি। একদিন জানতে পারে, তুমি সন্ধ্যাকে বিয়ে করতে চাও। তখন তোমার বাবা অন্যভাবে প্ল্যান সাজায়৷ তোমাকে ইংল্যান্ডে আটকে বাংলাদেশে আসে। একজনের লা’শ ভাড়া করে, তার মুখে তোমার মাস্ক লাগিয়ে নিয়ে যায় সৌম্যদের গ্রামে। সেখানে গিয়ে সেই লা’শকে পুরো গ্রামবাসীর কাছে নিজের ছেলে মা’রা গিয়েছে বলে চালায়। তার জানাজা পড়ায়। ক’ব’র দেয়। এরপর সৌম্য’র বাবা মাকে হুমকি দেয় সেই গ্রাম ছাড়তে। নয়তো সৌম্য, সন্ধ্যাকে মে’রে ফেলবে। বাচ্চাদের জীবন বাঁচাতে, তারা সেই গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। পরে শুনেছিলাম, ওটা তাদের নিজেদের গ্রাম ছিল না।
এরপর তোমার বাবা সেই গ্রামে থাকা তার জায়গা-জমি সব বিক্রি করে চলে যায় ইংল্যান্ড। তারপর তোমাকে যা বলে, সেসব তো তুমি জানোই।”

কথাগুলো বলা শেষ হওয়ার সাথে সাথে অধীর তার ডান হাতের অস্ত্র লোকটির গলায় গেঁথে দিতে নেয়, তখনি লোকটি চিৎকার দিয়ে ওঠে,
“আমাকে মে’রো না। দয়া করে ছেড়ে দাও।”
অধীর সত্যিই থেমে যায়। লোকটির চোখে চোখ রেখে ঢোক গিলে বলে, “মা’রলাম না। বাবার বন্ধু তুই। দুই বন্ধু মিলে আমার জীবন ধ্বংস করেছিস। অথচ আজব এক পাবলিক আমি! তোকে মা’রতে গিয়ে হাত কাঁপছে। আর বাবাকে এক্সিডেন্টলি মে’রে এখনো বুকে ব্য’থা করছে।”

কথাগুলো বলে অধীর তার হাতের অ’স্ত্র লোকটির পেটের পাশে দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। বের করে আবারো বডির এমন এমন জায়গায় সমানে গেঁথে দেয় আর বের করে, যেখানে আ’ঘা’ত পেলে লোকটা তীব্র ব্য’থায় ছটফট করবে, কিন্তু ম’রবে না। লেকটির চিৎকার বাড়িটির দেয়ালে জোরেজোরে ধাক্কা খায়। অধীর বিন্দুমাত্র দয়া দেখালো না। তার চোখমুখে র’ক্ত দ্বারা ভরে গিয়েছে। কিন্তু হিংস্রতা বিন্দুমাত্র কমলো না। একসময় অধীর থেমে যায়। লোকটির র’ক্তা’ক্ত দেহ লাথি দিয়ে ছুড়ে ফেলে মেঝেতে। হাতের অ’স্ত্রটি ছুড়ে ফেলে। লোকটি ম’র’ণ য’ন্ত্র’ণায় কাতরায়। ঝাপসা দৃষ্টি হিংস্র দৃষ্টির আড়ালে চাপা পড়ে থাকে। সে আর এখানে দাঁড়ায় না। উল্টোঘুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে,
“ভাগ্যিস কাছের মানুষেরা শ’ত্রু হলেও, তাদের মা’রতে গেলে আমার হাত থেমে যায়। নয়তো আমার ছোট ভাই সৌম্য কবেই লা’শ হয়ে যেত!”
কথাটা বলতে গিয়ে অধীরের কণ্ঠ কাঁপলো। ঝাপসা দৃষ্টি আরও খানিক ঝাপসা হলো।

একটি বিশতলা বিল্ডিং এর ছাদের রেলিঙের উপর একদম কর্ণারে দাঁড়িয়ে আছে অধীর। পরনে একটি কালো হুডি, আর কালো প্যান্ট। দু’হাত প্যান্টের পকেটে রাখা। দৃষ্টি অগণিত তারায় জ্বলজ্বল করা আকাশপানে। স্মৃতির পাতা আপনাআপনি উল্টে যায়। ভেসে ওঠে তার চোখে একদিনের দৃশ্য,

অধীরের বাবা গম্ভীর গলায় বলে,
“অধীর তুমি সৌম্য, সন্ধ্যাকে ভুলে যাও এটাই তোমার জন্য ভালো হবে।”
অধীর চিল্লিয়ে বলে,
“অসম্ভব। আমি ওদের কেন ভুলে যাবো? ওরা খুব ভালো। আমাকে খুব ভালোবাসে৷ আর আমিও ওদের খুব ভালোবাসি।”
অধীরের বাবা বিরক্তি কণ্ঠে বলে,

“ভুল জানো তুমি। ওরা তোমাকে ভালোবাসে না। সৌম্য তোমার ভালোবাসাকে অ’ত্যা’চা’রে মনে করে। তাই সে ওই গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছে। যেন তুমি আর ওদের খুঁজে না পাও৷ যেন তোমার থেকে বাঁচতে পারে। ওর বোনকেও তোমার সাথে বিয়ে দিবে না। তোমাকে মিথ্যা বলেছে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সৌম্য ভালো ছেলে নয়। ওদের ফ্যামিলি ভালো নয়। ওরা এরকমই।”
অধীর কথাগুলো শুনে মানলো না। সে চিৎকার করে বলে,
“মিথ্যা বলছ তুমি। সৌম্য এরকম ছেলে নয়। ও আমাকে খুব ভালোবাসে। আর সন্ধ্যাপ্রাণও আমাকে খুব ভালোবাসে। আমি জানি।”

অধীরের বাবা ভীষণ বিরক্ত হয়। এরপর সে কাকে যেন কল করে৷ ওপাশ থেকে সৌম্যদের গ্রামের এক ছেলে, যে সৌম্য’র সমবয়সী। তার গলা শুনতেই চিনতে পারে অধীর। ওপাশ থেকে ছেলেটিকে অধীরের বাবা অধীরকে বলা কথাগুলো জিজ্ঞেস করলে, সেই ছেলেটি অধীরের বাবার কথা অনুযায়ী সব উত্তর পজিটিভভাবে দেয়। অধীর তবুও মানে না। সে চিৎকার করে বলে,
“আমি কখনোই এসব বিশ্বাস করব না। আমি বাংলাদেশ যাবো। সৌম্য’র সাথে সামনাসামনি সব জিজ্ঞেস করব। ও যদি সব স্বীকার করে তবেই আমি বিশ্বাস করব। নয়তো করব না।”
কথাগুলো বলে অধীর বাইরে বেরিয়ে যেতে নিলে অধীরের বাবা অধীরকে টেনে অধীরের ঘরের ভেতর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। চেঁচিয়ে বলে,

“খবরদার আমার অবাধ্য হবে না। সৌম্যরা ভালো মানুষ নয়। আমাদের সাথে ওদের যায় না। আমি যা বলেছি সব সত্য। তোমার ইচ্ছে হলে বিশ্বাস কর, নয়তো কর না। তবে তুমি আর বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতে পারবে না। আর তোমার বিয়ে এই ইংল্যান্ডের সুন্দরী এক মেয়ের সাথেই হবে। এখন তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা কর। এসব ফা’ল’তু চিন্তা মাথা থেকে বের কর।”
কথাগুলো বলে বাইরে থেকে দরজা আটকে দেয়। অধীর বড় বড় পায়ে এগিয়ে এসে দরজা ধাক্কায়। চিৎকার করে বলে,

“বাবা প্লিজ, দরজা খোলো৷ আমাকে সৌম্য’র সাথে কথা বলতে হবে। তোমাদের কাউকে আমাকে বাংলাদেশে নিয়ে যেতে হবে না। আমি একাই যাবো। প্লিজ দরজা খুলে দাও। আমি কখনোই ওদের ভুলে যেতে পারবো না। আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে না দেখে থাকতে পারিনা আমি। বাবা প্লিজ! আমাকে আটকে রেখো না। আমি তোমার সব কথা শুনবো। আমাকে শুধু একবার বাংলাদেশে নিয়ে চলো। বাবা? বাবাআআ? প্লিজ দরজাটা খোলো।”
কথাগুলো বলতে বলতে কিশোর ছেলে অধীর কেঁদে ফেলছিল। অধীরের বাবা ভীষণ কঠোর ছিলেন। অধীর খাওয়া-দাওয়া অফ করে দিয়েছিল। তাতে অবশ্য তার বাবার তেমন পাত্তা ছিল না। অধীর ধীরে ধীরে নিজেই নিজেকে সামলায়। পড়াশোনায় মন দেয়। অনেক বড় হওয়ার অপেক্ষা করে, যেদিন সে নিজেই বাংলাদেশ যেতে পারবে। প্রহর গুনতে থাকে সেদিনের। যেদিন সে আবারো সৌম্য আর তার সন্ধ্যাপ্রাণকে ফিরে পাবে। খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি অধীরকে। ক’দিনের মাথাতেই তার বাবাই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে যায়। অধীর তখনও বাবার কড়া শাসনে ছিল। সে বাবার সাথে সাথেই থাকতো। বাংলাদেশ ফিরে ভীষণ খুশি হয়েছিল। বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ছুটে গিয়েছিল সৌম্যদের গ্রামে। পুরো গ্রাম তন্নতন্ন করে খুঁজেছিল সৌম্য আর সন্ধ্যাকে। সবাই শুধু বলছিল ওরা এই গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছে। আর কারণটা সেটাই বলছিল, যেটা তার বাবা তাকে বলেছিল। সৌম্য তার ভালোবাসা নামক বিরক্তি থেকে বাঁচতে এই গ্রাম ছেড়েছে। অধীর পথহারা পথিকের ন্যায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। গ্রামের একটি মাঠে বসে হাউমাউ করে কেঁদেছিল সৌম্য’র ওমন বিহেবের জন্য। আর তার সন্ধ্যাপ্রাণের জন্য। যাকে দেখতে সে বাবার সাথে হাজারটা অশান্তি করে প্রতিমাসে ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে ছুটে আসতো।

পুরোনো সেই দিনগুলোর কথা ভেবে অধীরের চোখ ঝাপসা হয়। সময়ের সাথে সাথে তার জীবনে কত বদল এসেছিল। কিন্তু সে সৌম্য আর তার সন্ধ্যাপ্রাণকে খুঁজে পাচ্ছিলো না। সে একটাদিন ঠিক করে ঘুমিয়েছিল কি-না, মনে পড়ে না। আজ তো খুঁজে পেয়েছে। তবে এক বাচ্চার মা হিসেবে।
কথাটা ভেবে অধীরের ঝাপসা দু’চোখ চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে৷ তার মনে হচ্ছে, সৌম্যকে এতোএতো আ’ঘা’তের বিনিময়ে সে অনুতাপের দগ্ধআ’গু’নে জ্ব’লেপু’ড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরসহ সারাশরীরে কি ভীষণ জ্ব’ল’ন! যার কোনো নিরাময় নেই।

ঘড়ির কাটা তখন রাত ২ টার ঘরে। আকাশ সন্ধ্যার বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে হসপিটাল থেকে সৃজনের কাছে গিয়েছিল। এরপর সে ঘুমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। ছটফটানো মন নিয়ে এই বাড়ি আসে, যে বাড়িতে তার সন্ধ্যামালতী আছে। কোমল দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে সন্ধ্যার ঘুমন্ত মুখশ্রীতে। ডিম লাইটের আলো সন্ধ্যার ফোলা ফোলা মুখে এসে পড়েছে। আকাশ ধীরপায়ে এগিয়ে এসে সামান্য ঝুঁকে যায় সন্ধ্যার দিকে। ডান হাত বাড়িয়ে সন্ধ্যার হাত ছুঁয়ে দিতে নেয়, তখনই সন্ধ্যার হালকা ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয়, মুখের উপর ছায়ার মতোন কিছু পড়ছে। সন্ধ্যা দ্রুত চোখ মেলে তাকায়। মুখের উপর কারো মুখের ছায়া দেখে চিৎকার দিতে গিয়েও সে থেমে যায়৷ থেমে যাওয়ার কারণ, আকাশের মুখ সে চিনতে পেরেছে। বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় মুখের উপর ঝুঁকে আসা আকাশের মুখের দিকে।
সন্ধ্যাকে চোখ মেলতে দেখে আকাশ ঢোক গিলল। সে সাথে সাথে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। উল্টো ঘুরে পা বাড়ায় রুম থেকে বেরোনোর জন্য। সন্ধ্যা হাত বাড়িয়ে ঘরের টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে ঢোক গিলে বলে,

“আমি জানি, আপনার সব মনে পড়ে গিয়েছে।”
আকাশের পা থেমে যায়। জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। দৃষ্টিজোড়া চঞ্চল। ছোট করে বলে,
“দুই লাইন বেশি বোঝা পাবলিক তুমি। তাই ভুলভাল জানো।”
কথাটা বলে আকাশ আবারো পা চালায়। সন্ধ্যা শব্দ করে বলে,
“একশো লাইন সঠিক বুঝি আমি। খবরদার নাটক করবেন না আমার সাথে।”
সন্ধ্যা এতো জোরে কথা বলায় আকাশ বিরক্ত হলো। উল্টোঘুরে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে রে’গে বলে,
“গলা নামিয়ে কথা বলো।”
সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আকাশ তাকে কাঁদিয়ে রেখে গেল। আর এসে তাকেই রাগ দেখাচ্ছে। সত্যিই আকাশ কত বদলে গিয়েছে! সন্ধ্যা নিজেকে সামলালো। ডান হাতে বিছানায় হাতিয়ে সেই কাগজ খুঁজল, সাথে সাথে পেয়েও গেল। অতঃপর সেই কাগজটি ল্যাম্পের লাইট বরাবর করে আকাশের দিকে তাক করে ধরে বলে,
“এখনও অস্বীকার করবেন?”

আকাশের দৃষ্টি এলোমেলো। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে সন্ধ্যার হাত থেকে কাগজটি কে’ড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললো। আকাশের কাজে সন্ধ্যা বিস্ময় নয়নে তাকায়। দৃষ্টিজোড়া ঝাপসা হয়ে আসে মেয়েটার। আকসশ কাগজের টুকরো গুলে ছুড়ে ফেলে শক্ত গলায় বলে,
“যা তা আমার উপর চাপিয়ে দিবে না। ক’বছর আগে যে পা’গ’লামি করেছ, সেটা আর রিপিট কর না। প্লিজ!”
সন্ধ্যা ঢোক গিলল। যখন আকাশ তাকে সত্যিই ভুলে গিয়েছেল। আর সন্ধ্যা পা’গ’লামি করে আকাশের হাতে চড়-থা’প্প’ড় খেয়েছিল। আকাশ সেইদিনগুলোর কথা বলছে? সন্ধ্যা আকাশের দিকে চেয়ে ধরা গলায় বলে, “কেন করবনা?”
আকাশ চাপা স্বরে বলে,

“কারণ আমি এসব পছন্দ করিনা।”
সন্ধ্যা ঢোক গিলে বলে,
“আপনি মিথ্যা বলছেন।”
আকাশ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
“বলছিনা। তাছাড়া ওই লেখা আমার না।”
সন্ধ্যা এবার কান্নামাখা গলায় বলে,
“আমি আপনার লেখা চিনি। ওটা আপনারই লেখা। আমি জানি।”
আকাশ ঢোক গিলল। সন্ধ্যার দিকে চেয়েই পিছু সরলো কয়েক পা। বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মাঝে পড়েছে সে। হঠাৎ-ই উল্টো ঘুরে বড় বড় পা চালায় ঘর থেকে বেরোনোর উদ্দেশ্যে। সন্ধ্যা চেঁচিয়ে ওঠে,

“আপনি কেন অস্বীকার করছেন, প্লিজ বলুন? আমি জানি আপনার সব মনে পড়েছে। আপনি আমাকে আপনার সন্ধ্যামালতী বলে সম্মোধন করেছেন। ওই লেখা আপনার আমি জানি। আকাশ? শুনুন? যাবেন না। শুভ্র-পুরুষ?”
দরজার কাছে এসে আকাশের পা থেমে যায়। বুক কাঁপছে তার। সন্ধ্যার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। আকাশ ঢোক গিলল। চোখ বুজে নিজেকে সামলাতে চাইলো। কিন্তু সে পারছেনা আবারো সন্ধ্যাকে উপেক্ষা করতে। দিক ফিরিয়ে নেয় সন্ধ্যার দিকে। অসহায় দৃষ্টিজোড়া মেলে সন্ধ্যার কান্নামাখা মুখের দিকে তাকায়।
ইতোমধ্যে সন্ধ্যা ধীরে ধীরে উঠে বসেছে। দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কান্নামাখা গলায় বলে,
“আপনি আমার সৃজনকে সেভ জায়গায় রেখেছেন, তাই না? আমি এটাও বুঝেছি। আমি আর আপনাকে ভুল বুঝবো না। আপনি আসুন না আমার কাছে। আমি গত কয়েক বছরে অনেকবার অসুস্থ হয়েছি। আপনি আসেননি। আমি আজো অসুস্থ হয়েছি। গু’লি খেয়েছি আমি। আপনার সন্ধ্যামালতী অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। একবার আমার কাছে এসে বসুন না! কতবছর হলো আমাকে জড়িয়ে ধরেন না আপনি! কেন দূরে থাকছেন? আমার ভীষণ ক’ষ্ট হয়। প্লিজ আমাকে রেখে যাবেন না। আকাশ?”

আকাশের চোখের কোণ ভিজে উঠল। বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠল। তার সন্ধ্যামালতীর আকুতি ভরা কথাগুলো একেবারে হৃদয়ে গিয়ে বিঁধলো। আকাশ দূর্বল হয়ে পড়ল। এতো আবেগমাখা কথা কি করে উপেক্ষা করবে সে? পারলো না আকাশ। সে প্রেমিক পুরুষের ন্যায় এগিয়ে গেল সন্ধ্যার দিকে। আকাশকে নিজের দিকে এগোতে দেখে সন্ধ্যার কান্নাভেজা মুখে হাসি ফুটল।
আকাশ সন্ধ্যার বেডের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সামান্য ঝুঁকে ডান হাত বাড়ায় সন্ধ্যার চোখের জল মুছে দেয়ার জন্য। দু’জনের আবেগমাখা দৃষ্টি দু’জনাতে। তখনই বাইরে থেকে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হয়। সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। আকাশের ভ্রম কেটে যায়। সে সাথে সাথে চোখ বুজে ঢোক গিলল। কিছু মনে পড়ল বোধয়। চোখ বন্ধ রেখেই মাথাটা দু’দিকে কয়েকবার নাড়ালো। এরপর চোখ মেলে তাকসয়, সন্ধ্যা কিছু বোঝার আগেই আকাশ সন্ধ্যার বাম গালে ঠাস করে থা’প্প’ড় মে’রে দেয়। যেটার জন্য সন্ধ্যা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তার মাথাটা গিয়ে লাগে খাটের বক্সের সাথে। সে হেলে যায় ডানদিকে। আকাশ দ্রুত সন্ধ্যাকে ধরার জন্য হাত বাড়ায়, তখনই একটি কাজের মেয়ে বাইরে থেকে দৌড়ে আসে আর বলতে থাকে,

“আপামণি আপনি ব্য’থা পাইছেন?”
আকাশের হাত থেমে যায়। ঝাপসা দৃষ্টিতে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে থাকে। সন্ধ্যা ধীরে ধীরে মাথাটা উঁচু করে আকাশের দিকে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। বা হাত বাম গালে। দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। এদিকে সন্ধ্যা তাকাতেই আকাশ তার দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। দ্রুত উল্টো ঘুরে ব্যস্ত পা চালায় আর বলে,
“এক্টিং করছিলাম। ভালো লাগলে ইনফর্ম কর। আবারো ট্রাই করব।”
আকাশের কণ্ঠ দৃঢ়। অথচ চোখজোড়া টকটকে লাল সাথে ঝাপসা।
সন্ধ্যা পাশে বসা মেয়েটি সন্ধ্যাকে টেনে তার সাথে জড়িয়ে ধরে। সন্ধ্যার দৃষ্টির বাঁধ ভেঙেছে। কেবল নির্জীব চোখে চেয়ে রইল আকাশের অদৃশ্য হওয়ার পানে।

আকাশ ঘরের বাইরে এসে রেলিঙের কাছে দাঁড়িয়েছে। দু’হাত রেলিঙের উপর ভর দিয়ে রাখা। কানে বাজছে কিছুক্ষণ আগে হসপিটালে বলা নিয়াজের কথাগুলো,
‘আমার মনে হয়, সে তোমার উপর নজর রাখে আকাশ। ব্যাপারটি এমন নয় যে, তোমার সাথে বা পিছনে লোক লাগায়। অথবা সিসিটিভি ক্যামেরা সেট করে নজর রাখে। এতো চতুর মানুষ এই কাজ করবেনা। অন্তত তোমার ক্ষেত্রে তো নয়-ই। কারণ গুটি তুমি। আমি গেইজ করছি, দিনের ২৪ ঘণ্টা-ই তোমার খবর তার কাছে রাখে সে। পয়েন্ট টু বি নোটেড, ২৪ ঘণ্টা। এক সেকেন্ড-ও বাদ দেয় না। আই মিন, তুমি ওয়াশরুমে গেলেও সে জানতে পারে তুমি এখন ওয়াশরুমে। আর এটা একটি মাধ্যমেই সম্ভব। সেটা হলো ডিভাইস। আমার মনে হয়, তোমার বডির কোথাও না কোথাও একটা ডিভাইস আছে। আর এজন্যই সে তোমার প্রতিটি প্ল্যান এতো আগে টের পেয়ে যায়। আর খুব সুন্দর করে ভেস্তে দেয়। এট ফার্স্ট, তোমাকে তার চোখের আড়াল হতে হবে। নয়তো তুমি তোমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। সম্ভব নয়। এরপর সন্ধ্যা আর সৌম্য’র আশেপাশে যারা থাকে, ভুলেও তাদের বিশ্বাস কর না। শুনতে খারাপ লাগলেও বলছি, তোমার মা কেও বিশ্বাস কর না।”

কথাগুলো ভেবে আকাশ ঢোক গিলল। মনটা আর কত ক্লান্ত হবে? আর কত তার সন্ধ্যামালতীকে আ’ঘা’ত করতে হবে তাকে? আর কত প্রিয় মানুষের চোখে ঘৃ’ণার পাত্র হলে তার দুর্ভাগ্যের খাতা পূর্ণ হবে? এর চেয়ে তার মরণ শ্রেয়।
আকাশ তার ডান হাতের দিকে তাকায়। হাতটা কাঁপছে ভীষণ। এই হাত দিয়ে একটু আগেই সে তার ভীষণ আদরের এক নারীকে আ’ঘা’ত করেছে। তার থা’প্প’ড়ে সন্ধ্যামালতীর গালে হয়ত দাগ পড়ে যাবে। সে যে ব্য’থা দিয়েছে তার সন্ধ্যামালতীকে। দা’গ তো পড়বেই। তারও তো ব্য’থা করছে। পুরো বডি ব্য’থা করছে। ভীষণ ব্য’থা করছে। মনে হচ্ছে, কেউ তার কলিজা চিবিয়ে খাচ্ছে। আর সে য’ন্ত্র’ণা’য় ছটফট করছে। অথচ সেসব চোখে দেখা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২০

দমবন্ধকর অনুভূতিতে ঘেরা আকাশের ডানচোখ বেয়ে একফোঁটা নোনাজল তার ডান হাতের উপর পড়ে। সে মনে মনে দোয়া করল, কোনো একদিন তার এই হাত ধ্বংস হয়ে যাক। কারণ এই হাত তার সন্ধ্যামালতীকে সুখের চেয়ে দুঃখ-ই বেশি দিয়েছে।

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২২