Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২২

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২২

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২২
DRM Shohag

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সৌম্য ফ্রেশ হয়ে চুলায় ভাত বসিয়েছে। ফজর নামাজ পড়ে ইরা আর সে আবারো ঘুমিয়েছিল। এরপর ইরার ঘুম ভাঙেনি। সৌম্য’র ঘুম ভেঙেছে। সে ইরাকে না ডেকে নিজে নিজেই টুকটাক কাজ করার চেষ্টা করছে। চোখেমুখে একধরনের উৎফুল্লতা। এর পিছনে কারণ আছে।
সৌম্য গত ক’বছরে একটি টিউশন ঠিকঠাক দু’মাস পড়াতে পারেনি৷ একটি টিউশন পেলেই এক থেকে দু’মাসের মাথায় তারা সৌম্যকে নিষেধ করে দিত। সৌম্যকে কারণটাও বলত না। শুধু বলত, আর আসতে হবে না। সৌম্য দু-তিন মাস পর পর নতুন টিউশন খুঁজে বেড়াতো, কখনো পেত আবার কখনো নয়। সৌম্য অবাক হয়ে কেবল নিজের ভাগ্যকে দেখত। না কোথাও চাকরি হত, আর না তো ঠিকঠাক টিউশন পেত। পেলেও সেটা থাকতো না।

গত কয়েকটা বছর তার এভাবেই চলেছে। শেষে এসে তো একেবারে মামলায় আটকে চাকরি পাওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে গেল। এ সবকিছুর পিছনে যে আকাশ আছে, এটা সৌম্য বুঝত। চাকরি না পেয়ে টিউশন করে যে তার ইরাবতীকে একটুখানি সুখী করবে, সেটাও কখনো পারেনি সৌম্য। মাঝে মাঝে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করত। আকাশ কেন তার জীবনের সাথে এমন করছিল, সে জানতো না। তবে সে কখনো তার ইরাবতীর সাথে দু’দন্ড বসে প্রাণখুলে হাসতে পারেনি। নিজেকে স্বামী হিসেবে ব্যর্থ মনে হতো। মাস পেরিয়ে গেলেও সে তার স্ত্রীর মুখে দু’মুঠো ভালো খাবার তুলে পারেনি৷

মাটির চুলার পাড়ে বসে, পুরোনো দিনের কথা ভেবে সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আজো সেই দুর্দিন থেকে সে মুক্তি পায়নি৷ তবে আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠার পর তাকে দু’জন কল করে বলে তাদের পড়াতে যেতে। যারা গত এক সপ্তাহ আগে সৌম্যকে ১০ দিনের টাকা দিয়ে না করে দিয়েছিল। সৌম্য সেই সামান্য কয়েকটা টাকা নিয়ে ক’দিন চলছিল। আর একটি টিউশন পড়াচ্ছিল। পাশাপাশি আরও টিউশন খুঁজছিল। কিন্তু পাচ্ছিল না। গতকাল সেই সামান্য টাকার শেষ অংশ থেকেই তার ইরাবতীর জন্য বাজার করেছিল, কিন্তু সেগুলো নিয়ে আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। কিন্তু সকাল সকাল আগের দু’টো টিউশন আবারো পেয়ে সৌম্য’র মনটা ভীষণ ভালো। তিনটে টিউশন পড়াতে পারলে সামনের মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো আসবে। যা দিয়ে খুব ভালো না চললেও মোটামুটি চলতে পারবে। পাশাপাশি আরও দু’একটা টিউশন খুঁজে পেয়ে গেলে আরেকটু ভালো হবে৷

ওদিকে ভাত হওয়ার পথে। সৌম্য বা হাতে চুলার ভিতর থেকে খড়ি বের করে রাখে। পাতিলের মুখ ভালোভাবে ঢেকে দেয়, যেন ভাত ফুটে যায়। বেশ কিছুক্ষণ পর ঢাকনা সরিয়ে দেখল ভাত ফুটেছে। এরপর সৌম্য চুলা থেকে ভাত নামিয়ে নেয়। দু’হাতে লুঙ্গি ভালোভাবে ভাঁজ করে বসে পিড়ার উপর। এরপর ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিয়ে ভাতের ভেতর থেকে বড় বড় তিনটে আলু বের করে একটি বাটিতে রাখে। ধীরে ধীরে আলুগুলো ছিলে আলুভর্তা করে। এরপর একটি ডিম ভেজে, সবকিছু নিয়ে রান্নাঘরের পাড় থেকে ঘরে চলে আসে। সৌম্য ইরাকে নিয়ে ঢাকা শহরে থাকলেও এদিকটা অনেকটা গ্রামের মতো।

সৌম্য ঘরে এসে আলুভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে নিল। ভাজা ডিম নিল না। তার খাবার শেষে ইরার জন্য একটি প্লেটে ভাত বেড়ে তার এক পাশে আলু ভর্তা রাখে, তার পাশে ডিম ভাজা রাখে। এরপর প্লেটটি ঢেকে বেডের পাশে একটি ছোট্ট টেবিলের উপর রেখে দেয়। তারপর সৌম্য রেডি হয়ে নেয়। সব কাজ করতে করতে প্রায় ১০ টা বেজে গিয়েছে। যে দু’জন স্টুডেন্ট কল করেছিল, তারা দু’জনেই আজ থেকেই পড়তে চায়। তাদের মাঝে একজন সকাল ১১ টা থেকে পড়তে চেয়েছে। সৌম্য এজন্যই রেডি হচ্ছে। এতো আগে রেডি হওয়ার কারণ, হেঁটে যেতে হবে। আপাতত মাসের শেষে পকেটে রিক্সা ভাড়া-ও নেই। সৌম্য’র পরনে একটি কুচকানো নীল রঙের শার্ট আর একটি কালো জিন্স প্যান্ট। কাপড়গুলো হালকা কুচকানো হলেও সৌম্য দু’হাত দিয়ে যথাসম্ভব টেনে টেনে সোজা করে নিয়েছে। ভাবছে সামনের মাসে তার ইরাবতীকে দু’টো শাড়ি কিনে দিবে৷ প্রায় কয়েক মাস পেরিয়েছে, ইরাকে একটা সুতাও কিনে দেয়া হয়নি৷
ওদিকে ইরার ঘুম হালকা হয়েছে। গতরাতে সৌম্য দেরি করে ফেরায় সে অনেক রাত জেগেছিল। তাই আজ ঘুম ভাঙতে এতো লেট হলো। ঘুমুঘুমু চোখ মেলে সৌম্যকে রেডি হতে দেখে ইরা ধীরে ধীরে উঠে বসে। ডান হাতে চোখ ডলে জিজ্ঞেস করে,

“কোথায় যাচ্ছো?”
সৌম্য দু’পায়ের প্যান্ট গিরার উপর পর্যন্ত গুটাতে গুটাতে গম্ভীর গলায় বলে, “কাজ আছে। খেয়ে নিও। টেবিলের উপর খাবার রাখা আছে। আমার ফিরতে লেট হবে।”
কথাটা বলতে বলতে সৌম্য’র প্যান্ট গুটানো শেষ হয়। সে আর দাঁড়ালো না। বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। একবারো তাকালো না ইরার দিকে। ইরা মলিন মুখে চেয়ে রইল। সৌম্য আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে তাকে একবার হলেও জড়িয়ে ধরত। কপালে চুমু খেত। কত সুন্দর করে কথা বলে তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। কিন্তু এখন একবারো তার দিকে তাকায় না পর্যন্ত। গতকাল রাতে বাড়ি ফিরেও তার দিকে তাকিয়ে একবার কথা বলেনি। সৌম্য আর প্রয়োজনের বেশি কথা বলে না। কথাগুলো ভেবে ইরার চোখের কোণ ভিজে উঠল। সৌম্য আবার কবে স্বাভাবিক হবে? ততদিন সে বাঁচবে তো? তার বাচ্চা পৃথিবীতে আসা পর্যন্ত যেন আল্লাহ তাকে হায়াত দেয়। সেদিন সৌম্য’র সকল অভিমান ভেঙে যাবে। ইরা শাড়ির আঁচলের কোণা দিয়ে চোখ মুছে নেয়। চোখ পড়ে প্লেটের পাশে টেবিলের উপর রাখা একগুচ্ছ সতেজ শিউলি ফুল। ইরা এগিয়ে এসে দু’হাতের মুঠোয় ফুঠোয় ফুলগুলো নেয়।

তারা গ্রামের দিকটায় থাকায় এখানের পরিবেশ অনেকটা গ্রামের মতো। তাদের বাড়ি থেকে দু’বাড়ি পর একটি শিউলি ফুলের গাছ আছে। যেখান থেকে প্রায়ই সৌম্য একমুঠো করে ফুল এনে তাকে দেয়। সকাল সকাল এমন সতেজ শিউলি ফুল ভীষণ ভালো লাগে ইরার৷ সৌম্য’র এটুকু ভালোবাসায় মেয়েটার মুখে হাসি ফুটল। সকল মন খারাপ জানালা দিয়ে পালালো।
দরজার আড়ালে দাঁড়ানো সৌম্য ইরার হাসিটুকু দেখে নিজেও প্রশান্তিময় হাসলো। হাজারো অভিমানের ভিড়ে প্রিয় মানুষের জন্য ছোট্ট ছোট্ট ইচ্ছে পূরণ করতে ভুলে যায়নি সৌম্য। তার সামর্থ্যের মাঝে সে সর্বোচ্চটাই করে তার ইরাবতীর জন্য। সৌম্য আর দাঁড়ালো না এখানে। লেট হচ্ছে তার। ব্যস্ত পায়ে চলে গেল তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

অধীর একটি পরিত্যক্ত ২০ তলা বিল্ডিং এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সবসময় যে বেশভূষায় থাকে, নিজেকে আবৃত করে রাখে এখনও সেভাবেই আছে। মনে পড়ে, সে যখন নিজে নিজে স্ট্যাবলিস্ট হতে শুরু করেছিল তখন ঢাকায় একটু একটু করে এই বিল্ডিংটি গড়েছিল। তখনও তার সৌম্য আর সন্ধ্যাকে খোঁজ করা বন্ধ হয়নি। সে সৌম্যদের খোঁজ করার পাশাপাশি সৌম্যকে দেয়া সেই কথা রাখছিল। ছোটবেলায় সৌম্যকে বলেছিল, ‘সে দু’টো ব্যবসা করবে৷ একটি সৌম্য’র আরেকটি তার।’ সেই কথা অনুযায়ীই সে এই বিল্ডিংটি বানিয়েছিল সৌম্য’র জন্য। কোম্পানি গড়েছিল সৌম্য’র জন্য। উদ্দেশ্য ছিল, যেদিন সৌম্য, সন্ধ্যাদের খুঁজে পাবে, সেদিন সৌম্যকে এই কোম্পানি বুঝে দিবে। তবে অবশ্যই সৌম্য’র সাথে সব ঠিকঠাক করার আগে সৌম্যকে শা’স্তি দিবে, এতো বছর তার সাথে দূরত্ব তৈরী করার জন্য, তার সন্ধ্যাপ্রাণকে তার থেকে দূরে রাখার জন্য।

তবে সে খুব বেশি কিছু বলবে না বলেই ঠিক করেছিল। তার লক্ষ্য ছিল, যেদিন সে সৌম্য আর সন্ধ্যাকে খুঁজে পাবে, সেদিনই সে তার সন্ধ্যাপ্রাণকে বিয়ে করে নিবে। কিন্তু সেসব হয়নি। সে যখন তার সন্ধ্যাপ্রাণকে পুরোপুরি খুঁজে পেল, ততদিনে সন্ধ্যা বিবাহিত সাথে প্রেগনেন্ট। অধীর কেবল বিস্ময় চোখে দেখেছিল সৌম্য আর সন্ধ্যাকে। সে সৌম্যকে দেয়া কথা না ভুলে না গেলেও সৌম্য তাকে দেয়া কথা ভুলে গিয়ে, বোনকে আরেকজনের সাথে বিয়ে দিয়ে, নিজে পছন্দের মানুষের সাথে কত সুখী ছিল! অথচ সে বছরের পর বছর প্রতিটি রাত ছটফট করে ম’রে’ছে তার সন্ধ্যাপ্রাণের জন্য। এরপরই সে সৌম্য’র প্রতি এতোটা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠল। মিথ্যে গল্পের পিছনে ছুটে কত দুঃখ দিল সৌম্যকে!

অধীর গতকালকেই জেনেছে, সন্ধ্যার কিভাবে বিয়ে হয়েছিল, কিভাবে সৌম্য’কে না জানিয়ে সন্ধ্যাকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। সন্ধ্যার গলার স্বর নষ্ট হয়েছিল, সেটা আবার ফিরেও এসেছে। সে হারিয়ে যাওয়ার পর সৌম্য, সন্ধ্যা তার মা হারায়। আর তারপর সন্ধ্যা, সৌম্য’র স্ট্রাগল। সে এতো এতো খোঁজ নেয়ার পরও বাবার বন্ধুর জন্য এতোদিনে সত্যটুকুই জানতে পারছিল না।
কথাগুলো ভেবে অধীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অনেকগুলো কারণে এই সৌম্য’র জন্য গড়া কোম্পানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর তারপর তার সন্ধ্যাপ্রাণকে বিবাহিত দেখে এই কোম্পানি আর চালু করেনি। পিছন থেকে কারো কণ্ঠে অধীরের ধ্যান ভাঙে,
“বস, সৌম্য স্যারের টিউশনে ফিরিয়ে দিয়েছি।”
অধীর গম্ভীর গলায় বলে,
“গুড।
এরপর সামনে বিল্ডিংয়ের দিকে ইশারা করে বলে,

আগামী দু’দিনের মধ্যে এই বিল্ডিংয়ের সব ঠিকঠাক দেখতে চাই। নেক্সট এক উইক এর মাঝে কোম্পানি সম্পূর্ণ আগের মতো অপেন করতে হবে। কোম্পানির নাম হবে ‘Shoummo Industries’। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার মেইন্ট পয়েন্ট গুলোয় দশ তলা করে একেকটি বিল্ডিং হবে। সবগুলো সেইম ক্যাটাগরি। ঢাকার বিল্ডিং হবে মেইন অফিস। বাকিগুলো হবে
‘সৌম্য ইন্ডাস্ট্রিস’ কোম্পানির শাখা। ইংল্যান্ডে যে দু’টো শাখা বন্ধ আছে, ওগুলোও অপেন হবে। নাম সেইম। কোম্পানির ‘Owner and CEO’ সৌম্য। এই লেখা কোম্পানির মেইন অফিসহ প্রতিটি শাখায় সৌম্য’র পিকসহ প্রিন্ট করা থাকবে। গট ইট?”
অধীরের সামনে মাথা নিচু করে রাখা দাঁড়ানো লোকটি দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“জ্বি বস।”
অধীর ছোট করে বলে, “গুড।”
এরপর দৃঢ় পায়ে জায়গাটি প্রস্থান করে।

দেখতে দেখতে পেরিয়েছে সাতদিন। সন্ধ্যা এখন আগের চেয়ে একটু সুস্থ হয়েছে। ধীরে ধীরে হাঁটাচলা করতে পারে। কিন্তু মনটা বড্ড খারাপ। এক সপ্তাহ হলো না তো সৃজনকে দেখতে পায়, আর না তো তার ছেলেটার কণ্ঠ শুনতে পায়৷ এ কয়টাদিনে ছেলেটার জন্য কতশত কণা যে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে তার হিসাব নেই। তার সাথে এক সপ্তাহ আগে সেদিন রাতে আকাশের মা’রা থা’প্প’ড় তো আছেই। স্বামীর কাঁধে মাথা রাখার সুখ সে যে আর দ্বিতীয়বার পাবে না, তা সে খুব ভালো করেই বুঝেছে। কিন্তু সৃজনের জন্য মন যে খুব বেশি পোড়ে, সে কথা কাকে বলবে? তার বাচ্চাকে কোথায় রেখেছে আকাশ? সে কি আর তার সৃজন আব্বার দেখা পাবে না? কথাটা ভাবতেই সন্ধ্যা ছটফটিয়ে উঠল। এমন হলে তার বেঁচে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে।

এই কয়দিনে সে নিজেই নিজেকে কত মিথ্যা বুঝ দিয়ে নিজেকে সামলে রেখেছে শুধু সেই জানে৷ মনে হচ্ছে কত যুগ হলো তার সৃজন তাকে মা বলে ডাকে না। কখন কি খেয়েছে, ঠিক মতো খাচ্ছে কি-না! ঠিক করে ঘুমাচ্ছে কি-না! মাকে ছাড়া ভালো আছে কি-না! তাকে না দেখে কান্না করছে কি-না! এতো এতো ভাবনা নিয়ে সন্ধ্যা মাথা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। চোখদু’টো ঝাপসা হয়। সন্ধ্যা আশেপাশে তাকালো। আসমানী নওয়ানকে ডাকতে গিয়েও থেমে গেল সে। মনে পড়ল আসমানী নওয়ান বাসায় নেই।

গত ছয়দিন আগে আসমানী নওয়ান বাংলাদেশের বাইরে গিয়েছেন। সন্ধ্যার অবাক লাগে, তাকে এভাবে অসুস্থ রেখে তার আম্মাজান কোথায় চলে গেল! বলে গিয়েছে ব্যবসার কাজে গিয়েছে। কিন্তু সন্ধ্যার অবাক লাগে। গত কয়েকবছর আসমানী নওয়ান যেটুকু পেরেছে টুকটাক ব্যবসা সামলিয়েছে। কখনো বিদেশ যায়নি। আর তার অসুস্থ অবস্থায়, সৃজনকে খুঁজে না পাওয়ার এই দুঃসময়ে আসমানী নওয়ানের ব্যবসায় কি এমন কাজ পড়ে গেল যে, সে এই দেশ ছেড়েই চলে গেল। সন্ধ্যার মনে আছে, গত ছয়দিন আগে, ভরসন্ধ্যায় আসমানী নওয়ান বিধ্বস্ত অবস্থায় বাইরে থেকে ফিরে সর্বপ্রথম সন্ধ্যার ঘরে আসে। এরপর সন্ধ্যার গালে হাত রেখে বলে,
“সাবধানে থাকিস মা। আমি তোকে আগলে রাখার জন্য সারাজীবন থাকবো না৷ এতোদিন যেভাবে শ’ক্ত থেকেছিস। আমি না থাকলেও সেরকমই থাকিস। আমার সৃজন দাদুভাইকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করিস। যদি তোর আর আকাশের পরিণতিতে বিচ্ছেদ থেকে থাকে,, তবুও তোদের মাঝে সৃষ্ট পবিত্র ভালোবাসাকে কখনো হারাতে দিস না।
একটা কথা সবসময় মনে গেঁথে রাখবি জান্নাত,

‘সহজ সরল মানুষ, সবার নিশানা।’
আর তাই সবসময় আমার দৃঢ় প্রাচীরের ন্যায় সাহসী জান্নাত হয়ে বাঁচবি। কেউ যেন তোকে ভাঙতে না পারে। তুই ভেঙে গেলে আমার সৃজন দাদুভাইকে কে রক্ষা করবে জান্নাত?”
সন্ধ্যা অবাক হয়ে বলেছিল,
“কি হয়েছে আম্মা? এসব কেন বলছ? আর তোমার কি হয়েছে বলো তো? তোমাকে ঠিক লাগছে না।”
আসমানী নওয়ান চোখ মুছে বলেছিলেন, “একটু অপেক্ষা কর। আমি ফ্রেশ হয়ে তোর ঘরে আসছি। তোর সাথে আমার খুব দরকারি কিছু কথা আছে।”

কথাটা বলে আসমানী নওয়ান চলে যায়। সন্ধ্যা অপেক্ষা করতে করতে রাত ১২ টা বাজিয়ে ফেলে। অথচ আসমানী নওয়ানের দেখা পায় না। অসুস্থ হওয়ায় বিছানা থেকে নামতে পারছিল না। সে ফোন হাতে নেয় আসমানী নওয়ানকে কল করার জন্য। কিন্তু নোটিফিকেশন চেক করলে দেখে আসমানী নওয়ানের নাম্বার থেকে একটি ছোট্ট মেসেজ এসেছে। মেসেজটি ছিল,
“সন্ধ্যা আমাকে ব্যবসার কাজে আর্জেন্ট বিদেশ যাওয়া লাগছে। সাবধানে থাকিস।”

মেসেজটি পড়ে সন্ধ্যা কতক্ষণ যে থম মেরে ছিল জানা নেই। এরপর কাজের লোককে জিজ্ঞেস করলে তারা সন্ধ্যাকে জানায়, আসমানী নওয়ানকে তারা দেখেনি। আর তিনি বাড়ির কোথাও নেই৷ সন্ধ্যার সবকিছু অবাক লাগছিল। আজো লাগে। প্রথমত আসমানী নওয়ান সবসময় তাকে জান্নাত বলে ডাকে। এখানে সন্ধ্যা বলেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা সে আসমানী নওয়ানকে জানার পর থেকে তাকে কখনো বিদেশ যেতে দেখেননি, সে হুট করে বিদেশ চলে গেল? আর আসমানী নওয়ানকে সেদিন একটু অস্বাভাবিক লাগছিল। তাকে কি যেন বলবে বলছিল৷ সব কেমন ধোঁয়াশা করে, তাকে অসুস্থ রেখে তার আম্মা কই যে হারালো!
কথাগুলো ভেবে সন্ধ্যা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আসমানী নওয়ান সেদিন তার আর আকাশের বিচ্ছেদের কথা কেন বলেছিল, আর বারবার সৃজনকে রক্ষা করার কথাই বা কেন বলেছিল? তারপর তাকে দরকারি কি কথা বলতে চেয়েছিল। সব ভেবে সন্ধ্যার মাথা এলোমেলো লাগে।

আসমানী নওয়ান বাসায় নেই জেনে এই কয়দিন লামিয়া সন্ধ্যার কাছে থেকেছে। সন্ধ্যা আজ একটু সুস্থবোধ করায় সে লামিয়াকে নিয়ে হসপিটাল যাবে নিয়াজের সাথে দেখা করতে। তার সৃজনের খোঁজ করতে। সে আর পারছে না তার জানটাকে ছাড়া থাকতে। তাছাড়া আসমানী নওয়ানের সৃজনকে রক্ষা করার কথার কারণে দুশ্চিন্তা হয়। যদিও সে আন্দাজ করে সৃজন আকাশের কাছে সেইভ আছে, কিন্তু মন খচখচ করে। মায়ের মন। এতোদিন ছেলেকে না দেখে শান্ত থাকতে পারেনা।

ঘড়ির কাটা সকাল প্রায় ১১ টার ঘরে। সন্ধ্যা আর লামিয়া নিয়াজের সাথে দেখা করার জন্য হসপিটালের থার্ড ফ্লোরে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যার দৃষ্টি এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। সন্ধ্যার চোখে পড়ে, তাদের থেকে কিছুটা দূরত্বে নিয়াজ দাঁড়িয়ে একজন লোকের সাথে কথা বলছে। সন্ধ্যাকে দেখে নিয়াজ হাত দিয়ে ইশারা করে একটু দাঁড়াতে বলে। সন্ধ্যা অপেক্ষা করে। পাশে দাঁড়ানো লামিয়া নিয়াজের দিকে চেয়ে বলে,
“তোর এই পাতানো ভাইয়ের বয়স তো মনে হয় বহুত। ব্যাটা বিয়ে করে না কেন? এ যে বুড়ো হচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই?”
সন্ধ্যা বিরক্তি নিয়ে তাকায় লামিয়ার দিকে। বলে,

“উনি আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক বড়। এসব কি ভাষা ইউস করছিস?”
লামিয়া মেকি হেসে বলে,
“সে যে বড় সেটা তো আমিও জানি। কিন্তু বয়স বোঝা যায় না। কি সুন্দর হ্যান্ডসাম। আমার কি মনে হয় জানিস, এই ডক্টরগুলো নিশ্চয়ই সৌন্দর্যের গোপন টিপস ফলো করে। হাউ সুইট তোর পাতানো নিয়াজ ভাই।”
কথাগুলো উৎফুল্ল মনে বলতে বলতে ঘাড় সোজা করে সামনে তাকায়, উদ্দেশ্য দূরে দাঁড়ানো নিয়াজকে দেখবে৷ কিন্তু বেচারিকে আর ক’ষ্ট করে দূরে চোখ রাখতে হলো না৷ একদম নিজের সামনে নিয়াজকে দেখে লামিয়া ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। নিয়াজকে নিজের দিকে থমথমে মুখে চেয়ে থাকতে দেখে লামিয়া ঢোক গিলল। ইশ! লোকটা বোধয় তার সব কথা শুনে নিয়েছে। কথাটা ভেবে লামিয়ার হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল। টেনশনে বিড়বিড়িয়ে আওড়াতে লাগলো,

“বিসমিল্লাহ্, আস্তাগফিরুল্লাহ্, সুবহানআল্লাহ্, বাঁচাও আল্লাহ্।”
লামিয়াকে এভাবে বিড়বিড় করতে দেখে নিয়াজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করছে, “কি বলছ?”
লামিয়া ঢোক গিলে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“স্যরি সন্ধ্যার ভাই। আমি ভুল করে করে আপনাকে হ্যান্ডসাম আর সুইট বলে ফেলেছি। আসলে আপনি বুড়ো-ই।”
লামিয়ার কথা শুনে নিয়াজ হতভম্ব হয়ে বলে, “মানে?”
লামিয়া কাঁদোকাঁদো মুখ করে তাকায়। ইয়া আল্লাহ্ সে এমন ভুলভাল বলছে কেন? এদিকে পাশ থেকে সন্ধ্যা লামিয়ার অবস্থা দেখে কপাল চাপড়ায়। সে ডান হাতে লামিয়ার মুখ চেপে ধরে নিয়াজের উদ্দেশ্যে বলে,
“ভাইয়া ওর কথায় কিছু মনে করবেন না। ও একটু বেশি কথা বলে।”

নিয়াজ এই নিয়ে আর কিছু বলল না। সে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় লামিয়ার থেকে। এরপর সন্ধ্যার উদ্দেশ্যে বলে,
“বুঝেছি। বাঁচাল নিয়ে চলাফেরা কর তুমি। সে যাক, কিছু বলবে?”
সন্ধ্যা আড়চোখে লামিয়ার দিকে তাকালো। দেখল লামিয়া নিয়াজের দিকে রে’গে তাকিয়ে আছে। লামিয়াকে কেউ বাঁচাল বললে সে অনেক রে’গে যায়। যেমনটা এখন হয়েছে। সন্ধ্যা আপাতত এসব পাত্তা দিল না। সে লামিয়ার মুখ চেপে ধরে রেখেই নিয়াজের উদ্দেশ্যে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“ভাইয়া আমার সৃজন কোথায়? কতদিন হয়ে গেল, ওকে দেখিনা! প্লিজ সৃজনকে আমার কাছে এনে দিন ভাইয়া।”
তখনই পিছন থেকে আকাশ বলে ওঠে, “নিয়াজ সন্ধ্যামালতী…….
এটুকু বলেই থেমে যায় আকাশ, দৃষ্টি সন্ধ্যার দিকে পড়লে। এদিকে সন্ধ্যা আকাশের দিকে থমথমে দৃষ্টিতে তাকায়। আকাশ ঢোক গিলল। নিয়াজ সামান্য ডানদিকে ঘুরে একবার আকাশের দিকে তাকায় তো একবার সন্ধ্যার দিকে তাকায়। লামিয়াও ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। তার মানে সন্ধ্যা সত্যিই বলত, আকাশের স্মৃতি আসলেই ফিরেছে। এদিকে সন্ধ্যা দ্রুত পায়ে আকাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শক্ত গলায় বলে,

“নাটকবাজ কোথাকার!”
আকাশ ঢোক গিলল। দৃষ্টি সন্ধ্যাতে। সন্ধ্যা আবারো বলে,
“আমার বাচ্চা কোথায়?”
আকাশ জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজায়। নিজেকে সামলে দৃষ্টি ফোনে নিবদ্ধ করে গম্ভীর গলায় বলে,
“নেই সৃজন, দত্তক দিয়েছি ওকে। আর কতবার…”
বাকি কথা বলার আগেই সন্ধ্যা আকাশের কোর্টের কলার চেপে ধরে বলে, “আমি ফিডার খাই না। সব বুঝি আমি। আপনার সব মনে পড়েছে। কিন্তু এখনও আমাকে অস্বীকার করছেন কেন? বিদেশের মাটিতে থেকে কি ধলা, সাদা, সুন্দরী মেয়েদের মনে ধরেছে? তাই বউ-বাচ্চাকে স্বীকার করতে খুব প্রবলেম হচ্ছে আপনার, তাইনা? আমি তো কালো মেয়ে। এখন আর আমাকে পছন্দ হয়না।”
আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। বুকে চিনচিন ব্য’থা হলো। পিছন থেকে নিয়াজ ধমক দেয় সন্ধ্যাকে,

“সন্ধ্যা চুপ কর।”
সন্ধ্যা ঝাপসা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশের কলার থেকে হাত সরিয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“আমাকে স্বীকার করতে হবে না আপনাকে। শুধু আমার সৃজনকে আমার কাছে দিয়ে দিন। আপনি চাইলে ডিভোর্স দিয়ে দেন আমাকে।”
কথাটা শুনতেই আকাশ ডানহাতে সন্ধ্যার গাল শক্ত করে চেপে ধরে। রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যা ব্য’থা পেয়ে চোখমুখ কুঁচকে নেয়। আকাশ কিছু বলতে নেয়, তার আগেই নিয়াজ আকাশকে ডেকে ওঠে, “আকাশ?”
আকাশের ভ্রম কাটে। তাকায় নিয়াজের দিকে। কিছু একটা ভেবে সন্ধ্যার গাল ছেড়ে দেয়। চোখ বুজে শ্বাস নেয়। এরপর চোখ মেলে আর সন্ধ্যার দিকে তাকায় না। আর না তো কোনো কথা বলে। সে বড় বড় পায়ে নিয়াজের রুমে গিয়ে গায়ের জোরে দরজা আটকে দেয়। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা সন্ধ্যা, লামিয়া কেঁপে ওঠে। সন্ধ্যার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। নিয়াজ এগিয়ে এসে বলে,

“আমাকে ভরসা কর তো সন্ধ্যা?”
সন্ধ্যা ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকায় নিয়াজের দিকে। নিয়াজ মৃদু হেসে বলে, “অনেক তো অপেক্ষা করলে। আর দু’টো দিন অপেক্ষা কর। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি যা চাইছ, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু পাবে। এখন বাড়ি যাও। তুমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ না।”
কথাগুলো বলে নিয়াজ লামিয়ার দিকে তাকালে দেখল লামিয়া চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে একটু বিব্রত হয়। এই মেয়ে এমন অদ্ভুদ কেন কে জানে! সে নিজেকে সামলে বলে,
“সন্ধ্যাকে বাড়ি পৌঁছে দাও।”
লামিয়া কোমরে হাত দিয়ে বলে,
“ও বাবা, বান্ধবী দেখে তার ঘাড়ে কাজ চাপাচ্ছেন কেন? আপনি তো সন্ধ্যার ভাই। নিজে পৌঁছে দিলেই তো পারেন। যতসব মুখে মুখে বলা পাবলিক!”
নিয়াজ লামিয়ার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায়। এদিকে লামিয়া কথাগুলো বলে দম নেয়। আসলে তার আকাশের উপর রা’গ হচ্ছিল তার বান্ধবীকে ক’ষ্ট দেয়ার জন্য। তাই তার বন্ধুকে একটু ঝেড়ে দিল। এরপর সে সন্ধ্যার হাত টেনে বাইরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে নিয়াজকে মুখ ভেঙায়। নিয়াজ কি রিয়েকশন দিবে বুঝল না। সে লামিয়ার দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে, “অ’সভ্য মেয়ে।”

এরপর সে তার রুমে চলে যায়। ভেতরে এসে দেখল আকাশ থমথমে মুখে বসে আছে৷ আকাশের হাতে একটি কাগজ। যেখানে নিয়াজে কয়েক হাতে লাইন লেখা,
“আকাশ তোমার হার্টের একদম কাছাকাছি জায়গায় একটি ছোট্ট ডিভাইস সেট করা আছে। যেটার মাধ্যামে কেউ তোমাকে ২৪ ঘণ্টা ট্র্যাক করে। অর্থাৎ তোমার সব কথা সে শুনতে পায়। তোমার আশেপাশে সামান্য একটি শব্দ হলে সেটা তার কাছে পৌঁছায়। এটা অপারেশন করে বের করতে হবে৷ বাট ডিভাইসটি যেহেতু হার্টের কাছাকাছি। তাই অপারেশনে অনেক বেশি রিস্ক।”
এমন নয় যে, আকাশ লেখাটি আজ প্রথমবার পড়ছে। সেসহ নিয়াজ আরও দু’দিন আগে জেনেছে এটা। আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের কাগজটি রেখে একটি কলম নিয়ে কাগজের একটি কোণায় লেখে,
“আজ রাতেই অপারেশনের ব্যবস্থা কর নিয়াজ। কুইক।”
লেখাটা লিখে কাগজটি নিয়াজের দিকে বাড়িয়ে দেয়। নিয়াজ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। আকাশ আর এখানে বসে না। সে ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে যায় নিয়াজের অফিস রুম থেকে।

গভীর রাত। ঘড়ির কাটা তখন ৩ টার কাছাকাছি হবে। সন্ধ্যা জায়নামাজে বসে ফোঁপাচ্ছে। আকাশের ইচ্ছাকৃত অবহেলা, সৃজনকে কাছে না পাওয়া, আসমানী নওয়ানকে পাশে না পাওয়া সবমিলিয়ে সন্ধ্যার অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। চোখে ঘুম ধরা দেয় না। ওজু করে দু’রাকাত নামাজ পড়ে হাত তুলে কতক্ষণ দোয়া করল কে জানে। এরপর জায়নামাজ থেকে আর ওঠার শ’ক্তি পায় না। একসময় কাঁদতে কাঁদতে জায়নামাজের উপরই উপুড় হয়ে পড়ে। কান্না থামে না মেয়েটার।

দরজায় দাঁড়ানো আকাশ অসহায় চোখে চেয়ে আছে সন্ধ্যার দিকে। গত এক ঘণ্টা যাবৎ সে ঘুমন্ত সৃজনকে কোলে নিয়ে সন্ধ্যার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যার কান্না তার সারা বুকে অসহনীয় ব্য’থা ছড়িয়ে দেয়। চোখের কোণ ভেজা। সে ঢোক গিলে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। শব্দহীন পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঘুমন্ত সৃজনকে বিছানার মাঝখানে শুইয়ে দেয়। এরপর কম্বল টেনে ঢেকে দেয় সৃজনকে। অনেকক্ষণ মলিন মুখে চেয়ে রইল সৃজনের দিকে। বুকটা কাঁপছে। সে সৃজনকে সন্ধ্যার কাছে দিয়ে হসপিটাল যাবে অপারেশনের জন্য। রাত বেছে নেয়ার কারণ কেউ যেন জানতে না পারে। কিন্তু তার অপারেশনে রিস্ক। অনেক রিস্ক। জীবন-মরণের প্রশ্ন উঠে আসে। আকাশ শেষবারের মতো এই চেষ্টাটাই করতে চায়। যদি ম’রে যায়, তবে তার সন্ধ্যামালতী আর এই ফুলের মতো বাচ্চাটির সাথে আর কখনো দেখা হবে না। কথাটি ভাবতেই দমবন্ধ লাগলো। আকাশ নিজেকে সামলালো। সৃজনের কপালে ছোট্ট করে একটা চুমু খেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এরপর এগিয়ে এসে সন্ধ্যার পাশে দাঁড়ায়। যে মেয়েটা এখনো উপুড় হয়ে বুকভাঙা কান্নায় ব্যস্ত। আকাশ ধীরে ধীরে সন্ধ্যার পাশে হাঁটু মুড়ে বসল। হাতে একটি বক্স, যেটা একদম সন্ধ্যার পাশে রেখে দিল। এরপর শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে সামান্য ঝুঁকে সন্ধ্যাকে টেনে তোলে। সন্ধ্যা কিছু বোঝার আগেই আকাশ ডান হাতে সন্ধ্যার মুখ চেপে ধরে। সন্ধ্যাকে শ’ক্ত করে তার বুকে চেপে ধরে। বা হাতে সন্ধ্যার মাথা থেকে ওড়না ফেলে দিয়ে সন্ধ্যার গলায় মুখ গুঁজে দেয়।

হঠাৎ এহেন কান্ডে কান্নারত সন্ধ্যা হতভম্ব হয়ে যায়। এক মুহূর্তের জন্য তার কান্না পুরোপুরি থেমে যায়। অন্ধকারের মাঝে কে তাকে এভাবে ধরেছে বুঝল না। মুখ চেপে ধরায় টুঁ-শব্দটিও করতে পারছে না। সন্ধ্যা মোচড়ামুচড়ি করে। কিন্তু বিন্দুমাত্র সুবিধা করতে পারেনা। দু’মিনিটের মাথায় সে নিজেই চুপ হয়ে যায়। সে চেনে আকাশের গায়ের গন্ধ। এটা যে আকাশ সন্ধ্যার চিনতে অসুবিধা হলো না। সে বিস্মিত হলো সাথে কিছুটা শান্তও হলো। টের পেল গলায় টপটপ করে বৃষ্টির ফোঁটায় ন্যায় পানি পড়ছে। সন্ধ্যার গা শিরশির করে উঠল। আকাশ নিজেকে সামলাতে চাইলো। কিন্তু সে বোধয় ব্যর্থ হলো। সন্ধ্যার গলা থেকে মুখ সরিয়ে সন্ধ্যার কানে ঠোঁট চেপে একেবারেই শব্দহীন উচ্চারণ করল,

“আমার সন্ধ্যামালতী তুমি। স্যরি সোনা বউ!”
আকাশের কথাটা ভীষণ আস্তে ছিল, যেটা আকাশ নিজেই শুনতে পায়নি। কিন্তু সন্ধ্যার কানের কাছে ঠোঁট চেপে বলায় কথাটা সন্ধ্যার কানে মৃদুভাবে বেজে উঠল। সন্ধ্যার পুরো শরীর ঝাঁকুনি খায়। দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। ঠিক কতগুলো বছর পর আকাশ তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরেছে, ঠিক কতগুলো বছর পর আকাশ তাকে সোনা বউ বলে ডাকলো। সন্ধ্যার বুকে অ’সহ্য ব্য’থা শুরু হয়। সুখের ব্য’থা এটা। সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু আকাশ এখনো মুখ চেপে ধরে রাখায় সে কিছু বলতে পারে না। ভাবনার মাঝেই হঠাৎ-ই আকাশ সন্ধ্যাকে ছেড়ে হতদন্ত পায়ে বেরিয়ে যায় সন্ধ্যার রুম থেকে। সন্ধ্যা বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। একপ্রকার দৌড়ে বের হয় ঘর থেকে। আশেপাশে তাকিয়ে খোঁজে আকাশকে। কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। সন্ধ্যা এদিক-ওদিক তাকিয়ে আকাশকে খোঁজে আর শব্দ করে ডাকে, “আকাশ?”

কিন্তু কেউ সাড়া দেয় না। সন্ধ্যা হু হু করে কেঁদে ওঠে। ডান হাত কাঁপা অবস্থায় নিয়ে গলায় ঠেকায়। যেখানটা আকাশের চোখের পানিতে ভিজে গিয়েছে। সন্ধ্যা কান্নামাখা গলায় আওড়ায়,
“আপনি আবার কোথায় হারালেন আকাশ? প্লিজ আসুন না আমার কাছে। আমার খুব ক’ষ্ট হয় আপনাকে ছাড়া থাকতে।”

কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ সন্ধ্যার দৃষ্টি মেঝেতে পড়ে। পায়ের কাছে একটি বক্স পড়ে থাকতে দেখে সন্ধ্যা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কান্না থামিয়ে ধীরে ধীরে বসে বক্সটি হাতে নেয়। এরপর বক্সের ঢাকনা খুলে ভেতরে দেখতে পায়, একমুঠো খানিক সন্ধ্যামালতী ফুল। ফুলগুলে একেবারে সতেজ, তাজা। মনে হচ্ছে মাত্র গাছ থেকে ছিঁড়ে আনা হয়েছে। সন্ধ্যা অবাক চোখে চেয়ে দেখে। তার মনে পড়ে, একসময় আকাশ তাদের গ্রামে জমি কিনে নিয়ে সন্ধ্যামালতী গাছের বাগান করেছিল। কিন্তু সময়ের সাথে একদন আকাশ নিজেই সেই বাগান অস্তিত্বহীন করে দিয়েছিল। আজ এই ফুলগুলো দেখে তার আকাশের কাজ ছাড়া আর কারো কথা মাথায় আসলো না। দু’চোখ বেয়ে চোখের পানি অনবরত গড়িয়ে পড়ছে। এরপর সন্ধ্যা খেয়াল করে, গোপালি রঙের সন্ধ্যামালতী ফুলগুলোর মাঝে একটি গোলাপি কাগজ ভাঁজ করে রাখা। সন্ধ্যা ফুলগুলোর মাঝ থেকে কাগজটি হাতে নিয়ে বক্সটি কোলের উপর রেখে, ধীরে ধীরে কাগজটির ভাঁজ খোলে। হাতের বাহু দ্বারা চোখ মুছে কাগজের লেখাগুলো পড়তে শুরু করে,

“যেদিন থেকে আমার স্মৃতিতে আবারো আমার সন্ধ্যামালতী অধ্যায় যুক্ত হলো। সেদিন থেকে আমি ভীষণ ভীতু হয়ে গেলাম। আমার সকল সাহস নিমিষেই ফুরিয়ে গেল। সন্ধ্যামালতীর সামনে তার শুভ্র-পুরুষ রূপে দাঁড়ানোর সাহস ফানুসের ন্যায় হাওয়ায় উড়ে গেল। গত এক বছরে অনেক চেষ্টা করেছি আমার সন্ধ্যামালতীর সামনে দাঁড়ানোর সাহস যেগানোর। ভেবেছিলাম, যেদিন আমার লক্ষ্যে পৌঁছে যাবো, সেদিনই আমি আমার সন্ধ্যামালতীর সামনে তার শুভ্র-পুরুষ রূপে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবো। কিন্তু আমি আজো সেই সাহস যোগাতে পারিনি সন্ধ্যামালতী। জেনে, না জেনে তোমাকে শত শত ক’ষ্ট দিয়ে আমি নিজের কাছে ল’জ্জি’ত, ঘৃ’ণি’ত, তিরস্কৃত, ধিকৃত, বিধ্বস্ত, ক্লান্ত। ভীষণ ক্লান্ত আমি।

আমার কেউ নেই সন্ধ্যামালতী। সবাই পর হয়ে গিয়েছে। মা আমাকে দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। একটা বউ আর ছোট ভাই আছে যাদের চোখে আমি চক্ষুশূল। আর একটা বাচ্চা আছে, যে আমাকে চেনেই না৷
আচ্ছা সন্ধ্যামালতী, আমার পাপ কি খুব বেশি ছিল? যে কারণে তুমি আমার বাচ্চাটাকে আমার একটা ছবি দেখিয়ে ভুল করেও কখনো বলোনি,
‘আব্বু এইটা তোমার বাবা।’
ভালো বাবার জায়গায় নাহয় নি’কৃষ্ট বাবা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে! তবুও তাকে জানাতে, এই অধম তার এক হতভাগা আব্বু।

আমার বাচ্চাটা জানেনা বাবা কেমন হয়, সে তার বাবার নামটা পর্যন্ত জানেনা। জানো সন্ধ্যামালতী? এসব দেখে আমার খুব ক’ষ্ট হয়। বুক ফেটে যায়। যখন মনে হয়, আমার সবাই থেকেও কোথাও কেউ নেই তখন সারা শরীরে কি অসহনীয় জ্ব’লন ধরে, তা কি করে বোঝাই তোমায়? থাক সেসব কথা। যেমন কর্ম করেছি, তেমন ফল পাচ্ছি। আমার কর্মে তুমি পাহাড়সম দুঃখ ছাড়া সুখ পাওনি, আমি তা জানি সন্ধ্যামালতী। তবে তোমার দুঃখের কথা সবাই জানতো। তাই তোমার দুঃখ বেশি। কিন্তু আমার দুঃখের খোঁজ কেউ কখনো করেনি। অনেকে তো আমাকে অনুভূতিহীন ভাবে। যাদের মাঝে আমার সন্ধ্যামালতী অন্যতম।
আল্লাহ্’র কাছে শেষ আর্জি, তিনি যেন আবারো আমাকে সব ভুলিয়ে দিয়ে নতুন করে তোমার নামে প্রেমের অধ্যায় গড়ার সুযোগ দেয়। নয়তো আমার মৃ’ত্যু-ই হোক আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তি। যেখানে থাকবে না আমার প্রতি কারো ঘৃ’ণা, থাকবে না কোনো বিতৃষ্ণা।

সবশেষে আমার বাচ্চা জানবে, ‘আকাশ ভিরাজ নওয়ান’ নামে তার একজন আব্বু ছিল, যে মৃ’ত। সৃজনের মুখে আব্বু ডাক শুনতে না পাই, সে আমাকে তার আব্বু হিসেবে চিনবে। এতেই আমি স্বার্থক।
নিজের যত্ন নিও সাথে আমার বাচ্চার। আর শোনো, তুমি ভীষণ সুন্দর সন্ধ্যামালতী। তোমার গায়ের রঙ শ্যামলা বলে আমার পছন্দের তালিকায় এই রঙটা একদম শীর্ষে স্থান পেয়েছে। আমার সন্ধ্যামালতীর গায়ের রঙ নিয়ে আর কখনো কটাক্ষ করে কথা বলো না। বিশ্বাস কর, ভীষণ ক’ষ্ট হয়। বুক জ্ব’লে যায়। তোমার শুভ্র-পুরুষের দৃষ্টি তার প্রিয় শ্যামলা গড়নের মায়াবতী সন্ধ্যামালতী ছাড়া আর কারো উপর আটকায় না।
আমার ব্যক্তিগত সন্ধ্যামালতী,
গত এক বছরে তোমার জন্য খুব যত্নে গড়ে তোলা একটি সন্ধ্যামালতী বাগানের একমুঠো সন্ধ্যামালতী সতেজ ফুলের ভালোবাসা তোমাকে।
ইতি
তোমার শুভ্র-পুরুষ

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২১

আকাশ মাত্র বাড়ি থেকে বেরিয়ে ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে তার গাড়ির দিকে। হাতে খুব বেশি সময় নেই। ইতোমধ্যে নিয়াজ বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে। কিন্তু পায়ের গতি চাইলেও বাড়াতে পারছে না। নিজেকে ভীষণ দুর্বল লাগছে। একটু পর পর ঝাপসা হয়ে আসছে দৃষ্টি, যা শার্টের হাতা দিয়ে মুছে নিচ্ছে বারবার আকাশ। বড্ড বুকে ব্য’থা করছে। ভীষণ শূণ্যতা কাজ করছে। মায়ের সাথে দেখা করতে না পারায় ক’ষ্টের পরিমাণ বহুগুণে বেড়েছে। সে জানেনা মা কোথায় গিয়েছে। মা তার উপর ভীষণ অভিমান করেছে৷ কতদিন হয়ে গেছে তার সাথে কথা বলে না! সাথে তার সন্ধ্যামালতী আর একমাত্র জানবাচ্চা সৃজনকে রেখে মৃ’ত্যুর দিকে ধাবিত হওয়ার য’ন্ত্র’ণা হু হু করে বেড়েই চলেছে। আকাশ এতো চাপ সহ্য করতে না পেরে দাঁড়িয়ে যায়। ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া মাথার উপর উম্মুক্ত আকাশপানে রেখে শ্বাসকষ্টের রোগীর ন্যায় শব্দ করে ডেকে ওঠে,
“আল্লাহ্?”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৩