আযদাহা পর্ব ৮
সাবিলা সাবি
হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যার সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ। মিস ঝাংকে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে আরও কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হবে, যদিও তাঁর জ্ঞান ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। ফিওনা ধীর পায়ে ওনার কেবিনের দিকে এগিয়ে যায়, ভেতরে ঢুকে মিস ঝাং-এর শীর্ণ মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে কিছুটা স্বস্তি পায়। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফিওনা পাশে এসে বসে।
“ওহ, মিস ঝাং, কেমন আছেন আপনি এখন? আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম,” ফিওনা বলল, তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে আবেগে। তার অশ্রুসিক্ত নয়ন দেখে বোঝা যায় কতটা উদ্বিগ্ন ছিল সে।
ফিওনার কাছে এই পৃথিবীতে প্রিয়জন বলতে কেবল তার গ্ৰান্ডপা আর মিস ঝাং ছাড়া আর কেউ নেই। তাই তার অন্তরের গভীর থেকে ভয় জাগে—আরও একটি প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়।
মিস ঝাং ধীরে ধীরে ফিওনার দিকে তাকালেন। মুখে কথা বলার শক্তি না থাকলেও এক মৃদু হাসির আভা ফুটে উঠল ঠোঁটের কোণে। তিনি খুব ধীরে ফিওনার হাতের উপর নিজের কম্পিত হাত রাখলেন, তার চোখে এক অব্যক্ত শান্তনার ভাষা। ফিওনার চোখের পানি দেখে তিনি ইশারায় বোঝাতে চাইলেন—”কেদো না, এই দেখো আমিতো একদম সুস্থ হয়ে গিয়েছি।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ফিওনার হৃদয় উথালপাথাল বয়ে যায়, অজান্তেই ও মিস ঝাং-এর হাত চেপে ধরে, সেই স্পর্শের ভেতর থেকে শক্তি সংগ্রহ করে, সেই স্পর্শে লুকানো রয়েছে হারিয়ে না যাওয়ার আশ্বাস।
ফিওনা ধীর হাতে ফোনটি উঠিয়ে নিলো। ফোনের অপরপ্রান্তে গ্র্যান্ডপা। তীব্র উৎকণ্ঠার সুর ফিওনার গলায়, “গ্র্যান্ডপা, মিস ঝাং এর অবস্থা খুবই গুরুতর ছিলো। স্ট্রোক হয়েছে, তবে এখন ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরছে।”
ফোনের ওপাশ থেকে এক অজানা নীরবতা ভেসে এলো, যা গ্ৰান্ডপার উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে গ্র্যান্ডপা বললেন, “ফিওনা, আমি খুবই উদ্বিগ্ন। কিন্তু আমি এখান থেকে এখনই আসতে পারবো না, কাজের চাপ প্রচণ্ড। তবে তোমাকে মিস ঝাং-এর খেয়াল রাখতে হবে,সে এখন খুবই দুর্বল। আর তুমি নিজেও সাবধানে থেকো, ফিওনা।”
গ্র্যান্ডপা’র কণ্ঠে গভীর তাগিদ, আকাশের নক্ষত্রগুলোও মুহূর্তে থমকে দাঁড়ালো। ফিওনা তাঁর প্রতিটি শব্দকে মনের গভীরে অনুভব করলো। সেই শীতল সুরের ভেতর ছিলো অনিশ্চয়তার ছায়া, তার মনের কোণে ভীতির এক অদৃশ্য দানা বেঁধে উঠলো।
“গ্র্যান্ডপা, চিন্তা করো না। আমি মিস ঝাং এর পাশে আছি,” ফিওনার কণ্ঠে মৃদু দৃঢ়তা।”তবে তুমিও সাবধানে থাকবে আমি তোমার জন্যও চিন্তিত।”
ফিওনার অন্তরে এক শূন্যতা, তবে দায়িত্বের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিলো।
ফিওনা হসপিটাল থেকে ক্লান্ত শরীরে ডরমিটরিতে ফিরে আসে। দরজাটা হালকাভাবে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখতে পায় লিয়া বিছানায় বসে, হাতে মোবাইল ধরা। মোবাইলের আলোয় লিয়ার মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়, তবে তার চোখে অজানা চিন্তার ছাপ।
ফিওনাকে দেখেই লিয়া হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ মিশে আছে, “কোথায় ছিলে তুমি? আর ফোন ধরোনি কেন? আমি কতবার কল করেছি জানো? আমি ভীষণ চিন্তিত ছিলাম!”
ফিওনা ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে বসল। লিয়ার উদ্বিগ্ন প্রশ্নগুলো ফিওনার মনে মুহূর্তে বিদ্ধ হলো। ফিওনার মনে হচ্ছিলো, লিয়ার প্রশ্নগুলো তার মনের গোপন রহস্যগুলো উন্মোচন করে দিচ্ছে।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে ফিওনা মৃদু স্বরে বলতে শুরু করলো, “মিস ঝাং হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। তাকে নিয়ে হসপিটালে যেতে হয়েছিল। স্ট্রোক হয়েছিল, তবে এখন অনেকটা সুস্থ। আমি শুধু তার সাথে ছিলাম, তাই ফোনটা খেয়াল করতে পারিনি।”
লিয়ার মুখের রেখায় মৃদু চিন্তার ছাপ পড়ে। তবে ফিওনা সব বললেও জ্যাসপারের বিষয়টি এড়িয়ে যায়, মনের কোন এক গভীর গোপন কোণে সেই স্মৃতিটা একান্ত বন্দি করে রাখলো।
লিয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “তুমি খুব চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলে আমাকে। কিন্তু যাই হোক, এখন তুমি ফিরে এসেছো, এটাই তো সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ।”
কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর ফিওনা ধীরগতিতে উঠে বসে। রাত গভীর, চারদিকে নীরবতা বিরাজ করছে। সে নিজের ল্যাপটপটা টেনে নিয়ে এসে ডেস্কের সামনে চেয়ারে বসল। পর্দার মৃদু আলো তার মুখে পড়তেই তার চিন্তাগুলো আরও গভীর হলো।
সে ই-মেইলটা খুলল—জ্যাসপারের মেইল,মনে অজানা উদ্বেগ। ইনবক্সে এক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর সাহস করে কয়েকটা শব্দ টাইপ করে পাঠাল:
“Hi, I’m Fiona.”
প্রান্তিক নীরবতা তাকে ভীষণভাবে গ্রাস করলো। কোনো উত্তর নেই। ফিওনার মনে হতাশার ছায়া স্পষ্ট হলো, ধৈর্যচ্যুত হতে হতে ল্যাপটপটা বন্ধ করার উপক্রম করলো। ঠিক তখনই পর্দায় শব্দ ভেসে এলো, রিপ্লাই।
“এখনো জেগে? আর এত রাতে টেক্সট?”
ফিওনার চোখে এক ঝলক আলো খেলে গেল। সে জ্যাসপারকে তার মনের ভার একে একে খুলে বলতে শুরু করল—মিস ঝাংয়ের অসুস্থতা, নিজের একাকীত্ব, তার সমস্ত অনুভূতির তিক্ততা, ফিওনার প্রতিটি শব্দ নিজের অন্তরের গোপন কষ্টগুলোকেই ব্যক্ত করছিল।
জ্যাসপার মনোযোগ দিয়ে শুনল, তবে তার মনের গভীরে অপ্রকাশিত অস্থিরতা কাজ করছিল। ফিওনার মেসেজগুলো পড়তে পড়তে তার ভ্রু কুঁচকে উঠল। মনে মনে সে চাপা স্বরে বলল,
“উফ,সাচ আ ব্লাডি ফুলিশ হিউম্যান! এদের ইমোশনগুলো দেখলে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। মানুষের এই আবেগ-অনুভূতি কি এতটাই প্রয়োজনীয়? যাই হোক,আমার মিশন বড়। এতটুকু আবেগী ন্যাকামি সহ্য করতেই হবে।
জ্যাসপার, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ কর। টেম্পার হারালে কিন্তু চলবে না।” নিজেই নিজকে বলতে লাগলো।
তবুও জ্যাসপার তার মুখে কোনো অস্বস্তির ছাপ না ফেলে, বরং তার বার্তায় ফিওনাকে শান্ত করতে শুরু করে:
“ফিওনা, আমি জানি, এই সময়টা এখন তোমার জন্য অন্তত কঠিন। তোমাকে শান্তনা দেয়ার ভাষা আমার নেই তবে এতটুকু বলবো ধৈর্য ধরো, সব ঠিক হয়ে যাবে। আই নো, ইউ আর এ স্ট্রোং গার্ল।”
জ্যাসপারের কথাগুলো মিথ্যা হলেও ফিওনাকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে।নিজেকে সংযত করে রাখতে হবে সে জানে কারণ তার সামনে এক বিশাল দায়িত্ব। মনের ভেতরে বিরক্তির স্রোত উথালপাথাল করলেও বাইরে সে দেখায় ঠান্ডা বুদ্ধিমত্তা।
কিছুক্ষণ আলাপ শেষে, ফিওনা ক্লান্ত মনে জ্যাসপারকে শুভরাত্রি জানিয়ে ঘুমোতে চলে যায়। অপর দিকে, জ্যাসপার কম্পিউটারের সামনে এখনো বসে। ওর মনের গভীরে তীব্র অস্থিরতা জমতে শুরু করে। এতক্ষন যাবত মানবীয় আবেগের সাথে জড়িয়ে থাকা এই ফালতু কথোপকথনগুলো ওর মেজাজের ওপর এক অদ্ভুত ভার তৈরি করছে। ভ্রু কুঁচকে, জ্যাসপার গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে,কিন্তু মনের মধ্যে একটা সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা বারবার ওকে তাতিয়ে তুলছে।
“উফ, কতক্ষণ ধরে এই মানবী মেয়েটার সঙ্গে এত নিরর্থক বকবক করতে হলো!”
জ্যাসপারের মনে ইচ্ছে করছিল মুখ দিয়ে হুংকার ছেড়ে পুরো ল্যাবটাকে আগুনের জ্বলন্ত শিখায় পরিণত করতে। তার শরীরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ড্রাগনীয় শক্তি এক মুহূর্তের জন্যে ছাপিয়ে উঠল,মনে হলো সামান্যতম সুযোগ পেলেই চারিদিকে আগুনের গোলা বর্ষণ করবে। কিন্তু ঠিক তখনই, ল্যাবের দরজায় ধীর পায়ে আরেকজন ড্রাগনের প্রবেশ ঘটে।
জ্যাসপার তার মেজাজ সামলাতে না পেরে টেবিলের ওপর মুষ্টি আঘাত করল। রাগে তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছিল। সেই মুহূর্তে থারিনিয়াস রুমে প্রবেশ করল, মুখে কঠিন এক দৃঢ়তার ছাপ।
সে ধূসর রঙের ড্রাগন, চেহারায় মৃদু দীপ্তি ছড়াচ্ছে, তবে মানবরূপে। তার উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।সে ছিল ভেনাসের অন্যতম শক্তিশালী প্রয়োজনীয় আর জ্যাসপারের প্রিয় ড্রাগন সদস্য, নাম তার থারিনিয়াস।থারিনিয়াসের চোখে বিদ্যুতের মত ঝিলিক, হাতে এক বিশেষ তথ্য নিয়ে সে জ্যাসপারের সামনে দাঁড়াল।জ্যাসপারকে সম্মান প্রদর্শন করে ল্যাবে ঢোকার অনুমতি নিলো।
“প্রিন্স অরিজিন, বিশেষ তথ্য রয়েছে।” থারিনিয়াসের কণ্ঠ গভীর দৃঢ় ছিল,মনে হচ্ছে শতাব্দীকাল ধরে লুকিয়ে থাকা কোনো গোপন বার্তা সে প্রকাশ করতে চলেছে।
জ্যাসপার চোখ তুলে তার দিকে তাকাল, রাগ ও অবসাদ এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সৎবিৎ ফিরে পেলো সে,আর বুঝলো থারিনিয়াস যে বার্তা নিয়ে এসেছে, সেটা অবহেলার নয়।
“কি তথ্য নিয়ে এসেছো, থারিনিয়াস?” জ্যাসপার ধীর অথচ গভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
“প্রিন্স আপনার এই রাগটা আপাতত নিয়ন্ত্রণ করুন,” থারিনিয়াস বলল, কণ্ঠে শীতল নিরাসক্তি। “চেন শিং ওয়াং লি ইতোমধ্যেই এথিরিয়নকে অন্য জায়গায় সরানোর পরিকল্পনা করছে।”
জ্যাসপার থারিনিয়াসের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে গেল। “তারা কি পাগল?” সে কঠিন কণ্ঠে বলল। “তারা জানে না এথিরিয়নকে সরানো মানে কী বিপদ ডেকে আনা!”
থারিনিয়াস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “তারা জানে না, কিন্তু তারা নিজেদের লাভের কথা ভাবছে। এথিরিয়নের ক্ষমতা ব্যবহার করে ওয়াং লি চিরন্তন জীবন পেতে চায়। আর চেন শিং সারা বিশ্বে খ্যাতিমান হবার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে চায়। আমরা যদি দ্রুত কিছু না করি, তাহলে এথিরিয়নের ড্রাগন শক্তি তাদের হাতের মুঠোয় পড়ে যাবে।”
জ্যাসপার তার দাঁতে দাত চেপে ধরে বলল, “আমাদের আর বেশি সময় নেই। আমরা এথিরিয়নকে রক্ষা করতে পারব না যদি তারা আগে পদক্ষেপ নেয়। এখনই কিছু করতে হবে!”
থারিনিয়াস সম্মতি জানিয়ে বলল, “ঠিক প্রিন্স, আমাদের দ্রুত পরিকল্পনা করতে হবে। তারা যেকোনো মুহূর্তে এথিরিয়নকে সড়িয়ে ফেলবে।”
জ্যাসপার তার চোখে শপথের দিপ্তী নিয়ে বলল, “আমি এথিরিয়নকে কিছুতেই সড়িয়ে ফেলতে দেবো না, আর ড্রাগন শক্তি হাসিলও করতে দিবো না ।”
জ্যাসপার গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে কিয়ৎক্ষন নিরবতায় ডুবে থাকল। ভ্রূ কুঁচকে রুমের দেয়ালের দিকে তাকালো মস্তিষ্কে দ্রুত একের পর এক পরিকল্পনার ছায়া খেলা করছে। সে জানে, এই মুহূর্তের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দুই-একদিনের মধ্যেই তাকে সেই মেয়েটিকে—ফিওনাকে—ল্যাবে নিয়ে যেতে হবে।
এই মানবীটিকে ব্যবহার করেই তাকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, কারণ এথিরিয়নকে মুক্ত করার সময় ফুরিয়ে আসছে। জ্যাসপার অনুধাবন করতে পারছিল, যদি এক মুহূর্তও দেরি হয়, তাহলে চেন শিং আর ওয়াং লির অপকৌশল সফল হয়ে যাবে আর এথিরিয়নের শক্তি তাদের হাতের মুঠোয় চলে যাবে।
“যেকোনো উপায়ে তাকে সেখানে নিয়ে যেতে হবে,” জ্যাসপার মনে মনে সংকল্প করল। হাড়ের গভীরে ঠাণ্ডা এক অনুভূতি ওর শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
জ্যাসপারের মস্তিষ্কে এবার আর কোনো সন্দেহ রইল না—এখানে ইতস্তত করার সময় নেই।
স্যামুয়েল হার্ডিং লন্ডনের প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী, তার বিশাল ল্যাবরেটরির মধ্যস্থলে গভীর এক ষড়যন্ত্রে মগ্ন। নিস্তব্ধ রাতে ল্যাবের আলো আধাঁরের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছে মিস্টার চেন শিং তার পাশে অতি সূক্ষ্ম পরিকল্পনার জালে বোনা ওয়াং লি। দু’জনের মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম কূটকৌশল এখন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে—এথিরিয়নকে চীন থেকে সরিয়ে ফেলার জন্য।
“এবার সময় এসেছে, চীন আর নিরাপদ নয়।” চেন শিং ক্ষীণস্বরে বললেন,তার প্রতিটি শব্দ ভারি আর গভীর চক্রান্তের পরিচয় বহন করছে।
ওয়াং লি তার সৎবিত্তের প্রয়োগে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, “আর যদি সেই অভিশপ্ত জ্যাসপার ড্রাগন লন্ডনে এসে হাজির হয়? তাকে বিনাশ করতে হবে। অন্যথায় সে আমাদের সব পরিকল্পনা নস্যাৎ করবে।”
চেন শিং’র ঠোঁটের কোণে এক ঠাণ্ডা হাসি ফুটে উঠল। “জ্যাসপার আসলে তাকে এখানে বন্দী করব, অথবা শেষ করে ফেলব। এথিরিয়ন মুক্ত হতে পারবে না।”
আকাশের বাতাস থেমে গেল। এথিরিয়নের মুক্তি নিয়ে চেন শিং আর ওয়াং লির এই পরিকল্পনা তীক্ষ্ণ, ভয়ঙ্কর আর নিঃসন্দেহে পৃথিবী পরিবর্তনের শক্তি ধারণ করছে।
সকালবেলার সূর্যালোকে ভিজে ভার্সিটির পথ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলো ফিওনা আর লিন। ক্লাস শেষের ক্লান্তি তাদের চেহারায় মাখা থাকলেও, এক কাপ কফির আশায় তারা কফি শপের দিকে পা বাড়ায়। পথের ধারে, এক মুহূর্তে ফিওনার চোখ আটকে গেল—দূরে একটি সাদা রঙের বিলাসবহুল গাড়ি “The Scholar’s Brew”.কফি শপের থেকে একটু সামনেই সেই গাড়িটা দাঁড় করানো যার দরজা ধীরে ধীরে খুলছে। ফিওনার দৃষ্টি বিস্ফোরিত হলো, বিস্ময়ের ঢেউয়ে ভেসে উঠলো মনের গহীন প্রান্তে—সেখানে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাসপার, মাস্ক আর সানগ্লাস ছাড়া।
তার সেই চিরাচরিত শীতল ভঙ্গি আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে, সূর্যের রশ্মিতে বর্ণিত এক দেবদূত। তার রূপ এ জগতের নয়, সোনালী রশ্মির প্রতিফলনে গায়ের উজ্জ্বলতা ঠিকরে পড়ছে, তার সাদা ফর্মাল শার্ট আর কালো প্যান্টের সাথে কোনো মানবিক রূপের ছাপ পড়ছে না। শার্টের তিনটি বোতাম খোলা, হাতা গোটানো,তার প্রতিটি পেশী চিন্ময় শক্তিতে উদ্ভাসিত।
ফিওনার চোখের সামনে এক মূর্ত রূপে ঈশ্বরীয় সৌন্দর্য ধরা দিলো—তার বাম কানে ঝোলানো সাদা পাথরের গোলাকার দুল, যা সূক্ষ্ম অথচ বিশাল। তার গলায় এক অদ্ভুত অলঙ্কারকোনো প্রাচীন যুগের লকেট, যার রহস্য ফিওনার বোধের সীমা ছাড়িয়ে। তার এক হাতে স্মার্ট ঘড়ি আর অন্য হাতে কংকাল-আকৃতির ব্রেসলেট। তার রচার আঙুলের আঙটিগুলো ভয়ঙ্কর ডিজাইন কোনও কালের মনস্টারকে বন্দি করে রাখার মতো।
জ্যাসপার ধীরে ধীরে ফিওনার সামনে অগ্রসর হয়।
তার প্রতিটি পদক্ষেপ মাধ্যাকর্ষণকে অস্বীকার করে, মসৃণ কিন্তু দৃঢ়। সূর্যের সোনালী আভা তার উজ্জ্বল চুলে মিশে গিয়ে সোনালী জ্বলজ্বলে দীপ্তি ছড়াচ্ছে।তার অলিভ-সবুজ চোখে এক ধরণের প্রখর তীক্ষ্ণতা,যা দেখার সাথে সাথে মনের গভীরে পৌঁছে যায়।
ফিওনাকে মুহূর্তেই এক ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। জ্যাসপারের খোলা শার্টের কলার থেকে উঁকি দেয়া ঘাড়ে সযত্নে করা সবুজ রঙের ড্রাগন ট্যাটুটি তার স্বর্গীয়,অথচ ভয়ঙ্কর, অবস্থানের নিদর্শন। জ্যাসপার নিঃশব্দে তার সামনে এসে দাঁড়ায়—
ফিওনার চোখ বিস্ফোরিত, সে নির্বাক।
তবে ফিওনার মনোযোগ টেনে নেয়—জ্যাসপারের ডান ঘাড়ে এক অদ্ভুত ট্যাটু। ট্যাটুটির আকার এতই বিস্ময়কর যে মনে হচ্ছে চামড়ার অংশ, তার শিরা উপশিরার মতো মিশে গেছে শরীরে। সবুজ রঙের এই ট্যাটু, কাঁধ থেকে কানের নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত,ড্রাগনের ছাঁচে গড়া। এর উজ্জ্বলতা এমন যে, স্বাভাবিক ট্যাটু বলে মনে হয় না।
ফিওনার মস্তিষ্কে সমস্ত শব্দ বন্ধ হয়ে গেছে। একমাত্র অনুভূতিটুকু এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যাসপার,যে একাধারে রহস্যময়, ভয়ঙ্কর আর অতুলনীয়ভাবে আকর্ষণীয়।
ফিওনা এক নিমেষে পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি মুহূর্ত স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ,আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যাসপার এক মায়াবী অঙ্কুর— এক অদ্ভুত মূর্তিমান রূপকথার রাজপুত্র।
তবে যে জিনিসটি সত্যিই তাকে হতবম্ব করে রেখেছিল, তা ছিল তার পাশে থাকা লিন। লিনের মুখাবয়ব এক রকম অবশীলন, চোখের পাতা একেবারে আটকে গেছে।সে এক অজানা রাজ্যে হারিয়ে গেছে, যেখানে এতদিন সে কল্পনা করেও দেখতে পায়নি এমন এক সুদর্শন পুরুষ।
লিনের চিত্তাকর্ষক দৃষ্টি তখন জ্যাসপারের ঠোঁটের দিকে নিবদ্ধ- রক্তিম বেগুনি সেই ঠোঁট সুর্যের আলোতে রাঙানো গোলাপের পাপড়ি।
ফিওনার মনোযোগ সম্পূর্ণরূপে লিনের প্রতিক্রিয়ার উপর কেন্দ্রীভূত।
জ্যাসপার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে একটি শক্তিশালী চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়ছে,ফিওনার হৃদস্পন্দন ত্বরান্বিত হয়ে ওঠে।
জ্যাসপার অরিজিন গলা সামান্য খাকিয়ে নিলো। তার কণ্ঠস্বরে অদ্ভুত মাধুর্য ছিল পৃথিবীর সব ক্লান্তি আর বিষাদকে দূরে সরিয়ে এক স্নিগ্ধ অনুভূতি ছড়িয়ে দিলো। “কি হলো, এভাবে কি দেখছো? কোথায় যাচ্ছিলে তোমরা?” প্রশ্নটি ছিল খোলামেলা, কিন্তু তার চোখের চাহনি এক অসীম গভীরতা বয়ে নিয়ে আসলো।
ফিওনা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো, “আপনি ভার্সিটির সামনে এই সময় কি করছেন?”
জ্যাসপার হেসে উত্তর দিলো “এখানে কিছু কাজ ছিল। কিন্তু তোমাকে দূর থেকে দেখলাম তাই চলে আসলাম ভাবলাম আজ ভালো করে আড্ডা দিয়ে যাই।”
লিন, ফিওনার পাশে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ উপলব্ধি করল যে এই সুদর্শন পুরুষটি ফিওনার পরিচিত। সে দ্রুত ফিওনার দিকে তাকাল, ফিওনা বিষয়টি বুঝতে পেরে, সংকোচনমুক্ত কণ্ঠে বলল, “ও হচ্ছে লিন,ও আমার খুব ভালো বন্ধু।
আর এই হল জ্যাসপার অরিজিন,যিনি আমাকে সেদিন বাঁচিয়েছিল।”
লিনের মুখে এক চকচকে হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু তার হৃদস্পন্দন তার সঠিক সঙ্গতি হারিয়ে ফেলছে। সে অনুভব করল, এই ব্যক্তির নাম শুনেই সে প্রায় অজ্ঞান হতে বসেছে। মুহূর্তের মধ্যে, সে ফিওনার উপর ঝুঁকে পড়লো,সব কিছু অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে।
“লিন কি হচ্ছে? স্বাভাবিক থাকো” ফিওনা ফিসফিস করে বলল, “ওনার সামনে এরকম করোনা।”
এখন তাদের সবার মধ্যে এক উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছিল। জ্যাসপার এক পা সামনে রেখে বলল, “চল,কফি শপে যাই। কিছুটা রিফ্রেশ হতে হবে।”
জ্যাসপার আগে আগে হাঁটা শুরু করল। ফিওনা আর লিন একটি অদ্ভুত ঝড়ের মধ্যে নিজেদের ধাক্কা দিয়ে পরে গেল,আর সঙ্গী হিসেবে চললো কফি শপে।
“The Scholar’s Brew”.কফি শপের দরজায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে,গরম বাতাসে স্নিগ্ধতার ঝোঁক বয়ে যায়। ফিওনা কল্পনাতে ডুবে গেল,মনে মনে ভাবতে লাগলো, কি অদ্ভুত এই মুহূর্ত,যেখানে একটি কফি শপের সাথে জীবনের এমন এক অদ্ভুত পরাবাস্তবতার ছোঁয়া লাগছে।
জ্যাসপার চেয়েছিলো ফিওনার সাথে একান্তে কথা বলতে, কিন্তু লিনের উপস্থিতি তাকে ভীষণভাবে বিরক্ত করছিলো। প্রতিটি মুহূর্তে লিন যেন তাদের দু’জনের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাসপার নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলেও,তার ভ্রু কুঁচকে উঠছিলো, মনে হচ্ছিলো ফিওনার সাথে এই অপ্রয়োজনীয় তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
মনে মনে জ্যাসপার ভাবছিল, “এই মেয়েটাকে এখন কি করে সরাবো?”
তবু বাইরে থেকে সে নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করছিলো, মুখে এক চিলতে হাসি রেখে। ফিওনার দিকে তাকিয়ে ভাবল,”কত সহজে এই মানুষগুলো নিজেরাই নিজেদের জন্য এত বড় জটিলতা তৈরি করে!”
কফি শপের একটি নির্দিষ্ট টেবিলে অবশেষে তিনজন বসেছে। পরিবেশটা ছিল স্নিগ্ধ কিন্তু ভেতরে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা বিরাজ করছিল। জ্যাসপারের মস্তিষ্কের ভাঁজে ভাঁজে ছিলো সংকোচ—এই পৃথিবীর খাবার তার ড্রাগনের শারীরিক প্রকৃতির সাথে খাপ খায় না। বুঝেশুনে, গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে, সে অবশেষে অর্ডার করে “সুমাত্রা ডার্ক রোস্ট কফি” এ কফির মিশ্রণে যে ঝাঁঝালো মশলার গন্ধ আর সুমাত্রা দ্বীপের পাথুরে গন্ধ, তা জ্যাসপারের ভেতরের বিস্ময়কে খুঁচিয়ে তোলে, তার রাগান্বিত মনের শান্তির পরশ দেয়।
অন্যদিকে, ফিওনা আর লিন একান্তে মেতে ওঠে নিজেদের আলোচনায়। তারা অর্ডার করেছে Cold Brew Coffee— মৃদু শীতল পানীয়, যার চুমুকে চুমুকে তারা মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করছে। হাসির ফোয়ারা ছড়িয়ে পড়ে দুজনের মাঝে, কথাবার্তা গড়িয়ে যায় সহজে। কিন্তু জ্যাসপারের কফিতে মৃদু চুমুক দিতে দিতে তার রক্তের স্রোত ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিলো।ওদের এই অবাধ হাসিঠাট্টা আর কথাবার্তা তার স্নায়ুকে অসহনীয় ভারে চেপে ধরছিল। জ্যাসপার এতটাই বিরক্ত ছিলো যে তার পুরো মনোবল দিয়ে সেই রাগকে চেপে রাখার চেষ্টা করছিলো।
কিছুক্ষণ পর, হঠাৎ লিনের মোবাইলে একটি কল আসে। জরুরি কারণে তাকে বাসায় ফিরতে হবে।
লিন ফিওনা আর জ্যাসপারকে বিদায় জানিয়ে কফি শপ ছেড়ে চলে যায়। বিদায় নেয়ার মুহূর্তে জ্যাসপারের মনের এক কোণায় স্বস্তির নিঃশ্বাস বইতে শুরু করে—শেষমেশ, ফিওনার সাথে একান্তে কিছু সময় কাটানো যাবে।
কিন্তু ফিওনার মনে ছিল উদ্বেগ। লিনের চলে যাওয়ার পর এই একান্ত মুহূর্তে জ্যাসপারের সাথে একা বসে থাকার অস্বস্তি ক্রমশ বাড়ছিল তার ভেতরে। সেই নিরবতা, চারপাশের সমস্ত শব্দকে ঢেকে দিচ্ছিল।ফিওনা কফিতে একে একে চুমুক দিচ্ছিল ,তবে জ্যাসপারের চোখ থেকে সে কিছুতেই পালাতে পারছিল না।
জ্যাসপার আর সহ্য করতে না পেরে, নিজেই নীরবতার পর্দা ভেঙে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি অস্বস্তি বোধ করছ?”
ফিওনার চোখে মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠলো, কিন্তু সে মুখ থেকে কিছু বলার আগেই, জ্যাসপার আবার বলল, “তোমার চুপ করে থাকাটা বেশ অসহ্য লাগছে। আমার মনে হচ্ছে , তুমি কোনো ব্যাপারে বেশ চিন্তায় আছো।”
ফিওনা মৃদুস্বরে উত্তর দিল, “না… ঠিক তা নয়, আমি শুধু একটু বিভ্রান্ত হয়েছি… আসলে…।”
জ্যাসপার তখন গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ফিওনার মনে দোলা দেওয়া প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সে আগেই জানে। তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে ওঠে, মৃদু, রহস্যময়।
ফিওনার অন্তর্গত অস্বস্তি অবশেষে তার বোধগম্যতার সীমা ছাড়িয়ে গেল। ফিওনা কণ্ঠে এক মৃদু প্রশ্নের সুর তুলে বলল, “আচ্ছা, আপনি কোথা থেকে এসেছেন? আপনাকে দেখে তো চীনের বাসিন্দা মনে হয় না।”
জ্যাসপার নিজের ভেতরের সমস্ত বিচ্ছিন্নতা সংহত করে গম্ভীর সুরে জবাব দিল, “আমি গ্রিসের পেট্রা শহরের অধিবাসী। এখানে এক বিশেষ কাজের খাতিরে এসেছি।”
ফিওনা থমকে গেল, চোখের মণিতে বিস্ময়ের ঝলকানি। “সত্যিই? আপনি গ্রিসের?” তার কণ্ঠের অভ্যন্তর থেকে আবেগ ছলকে উঠল। “জানেন, আমার জন্মও গ্রিসের পেট্রা শহরে! আমার বাবা ছিলেন ওখানকার বিখ্যাত বিজ্ঞানী।”
জ্যাসপারের চোখের কোণায় একপ্রকার হতচকিত অভিব্যক্তি ফুটে উঠল, যদিও তা ছিল খুবই অল্পক্ষণের জন্য। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “তুমি তাহলে গ্রিসের? তবে এখানে চীনে কেন?”
ফিওনা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বিষাদমাখা কণ্ঠে উত্তর দিল,”আমি আমার গ্রান্ডপার কাছে থাকি। আমার মা ছিলেন চীনের, আর বাবা গ্রীসের—তাঁরা দুজনেই এক দুর্ঘট*নায় আমার ছোটবেলায় মা’রা যান।”
জ্যাসপারের মনে মুহূর্তের জন্য এক অপ্রত্যাশিত বিরক্তির স্রোত বয়ে গেল।এসব তার কাছে মানবজাতির চিরস্থায়ী দুর্বলতা। সে মুখে কিছু না বললেও, ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠল, ‘উফ্! শুরু হলো আবার এই বিরক্তিকর মানবিক আবেগের গল্প! এই হিউম্যানরা এমন ইমোশন কোথা থেকে পায়? ভাগ্যিস, আমার ভেতরে এসব অসহ্য আবেগের কোনো প্রোগ্রামিং নেই।’
তার চোখে ভ্রু সামান্য কুঁচকে উঠল, কিন্তু মুখে তখনও রহস্যময় শান্তি বিরাজমান ছিল। ফিওনার এই কথাগুলো তার কাছে ছিল মানসিক এক বোঝার মতো, যা সে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে চাইছিল না।
জ্যাসপারের প্রশ্নটি হঠাৎ ভেঙে দিল ফিওনার চিন্তার ধারা। “খুবই দুঃখজনক ঘটনা তোমার জন্য, দুর্ঘটনা কীভাবে হয়েছিল? আর তুমি তখন কতোটুকু?” সে বলল, কৌতূহল আর অল্প আশঙ্কা মিশ্রিত কণ্ঠে।
ফিওনা একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। “আজকে বাদ দেই। আরেকদিন বলব,” ফিওনা বলল, কিছুটা দুঃখ নিয়ে। অন্তরালে, জ্যাসপার একটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
এবার ফিওনার কৌতূহল আবার জাগল। “আচ্ছা, আপনি চীনে কিসের জন্য এসেছেন?কোন বিশেষ কাজে?” সে প্রশ্নটি করল, কিন্তু তার দৃষ্টি ঘুরে ঘুরে জ্যাসপারের মুখাবয়বের দিকে আসছিল।
জ্যাসপার বিষয়টি ভালোভাবে অনুভব করল। “কি হলো,আমার দিকে তাকাতে অস্বস্তি বোধ করছো?” তার কণ্ঠে এক রাশ মৃদু কৌতূহল ছিল।
ফিওনা কিছুটা লজ্জিত হয়ে বলল, “আপনি আজকে মাস্ক আর সানগ্লাস ছাড়া আসলেন কেনো?”
জ্যাসপার চোখের কোণে এক কৌতূহল নিয়ে বলল, “ওইগুলো একটা বিশেষ কারণ একদিনই পড়েছিলাম, এখন আর দরকার নেই।”
ফিওনা আশেপাশে তাকাতেই দেখতে পেল, সেখানকার প্রতিটি মেয়ের চোখ জ্যাসপারের প্রতি ধাবিত। অসাধারণ সেই যুবকের প্রতি তাঁদের মুগ্ধতা তার মনে অস্বস্তির ঢেউ তুলে দিল। একটি ক্ষণস্থায়ী রাগ উন্মোচিত হল তার মুখাবয়বে। সে দৃঢ়কণ্ঠে বলল, “পরেরবার মাস্ক আর সানগ্লাস পড়েই আসবেন।”
জ্যাসপারের অভিব্যক্তিতে কিছুটা চমক ফুটে উঠল, কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে হাসল। ফিওনার উক্তি জেলাসির ইঙ্গিত ছিল, যা তাদের মধ্যে অস্পষ্ট সীমারেখা সৃষ্টি করছিল। দুজনের মধ্যকার এই টানাপোড়েনের আবহাওয়া, তাদের কথোপকথনের মধ্যে সুতোর মতো দুর্বলতা সৃষ্টি করছিল, যেখানে আবেগের সূক্ষ্ম আঁচড় পড়তে থাকল। তবে এই সবকিছুই ফিওনার দিকে থেকে, জ্যাসপারের দিকে থেকে এসব কেবল তুচ্ছ জিনিস।
“আচ্ছা, কি যেনো জিজ্ঞেস করেছিলাম? আপনার বিশেষ কাজ কি চীনে? আমি কি জানতে পারি?” ফিওনা কিছুটা অনিচ্ছুক কিন্তু কৌতূহলী ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল, তার কণ্ঠস্বরে চাপা উদ্বেগ।
জ্যাসপার টেবিলের উপর হাত রেখে কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল, “হ্যাঁ, অবশ্যই! আসলে আমি একটি সায়েন্স ল্যাব তৈরির কাজ করছি গ্রিসে, তো আমার কিছু ধারণা আর অভিজ্ঞতা দরকার, তাই এখানে এসে কিছু ল্যাব ঘুরে দেখতে চাই।”
দূরে থেকে ফিওনা গলা তুলে জানাল, “ওহ, এইটা তো খুব বড়সড় কাজ! আমার গ্ৰান্ডপা, চেন শিং, চীনের বিখ্যাত বিজ্ঞানী। আমি আপনাকে তার ল্যাবে নিয়ে যেতে পারি।”
জ্যাসপার একটু হতাশার স্বরে বলল, “ও মাই গড, উনি তোমার গ্ৰান্ডফাদার? উনার নাম অনেক শুনেছি। তবে উনি তো আমাকে এলাউ করবেন না।”
ফিওনা দ্রুত বলল, “আরেহ, আমি আপনাকে নিয়ে যাবো! গ্ৰান্ডপা একটা বিশেষ কাজে লন্ডনে গেছেন। এই সুযোগে আপনাকে আমি নাহয় সাহায্য করলাম। এতে তো আর কোনো ক্ষতি নেই, শুধু ল্যাবটা ঘুরেই তো দেখবেন।”
জ্যাসপার বললো,”আর ইউ সওর? তাহলে কবে নিয়ে যাবে ল্যাবে?” জ্যাসপার প্রশ্ন করল, তার কণ্ঠে আগ্রহের ছোঁয়া ছিল।
ফিওনা হাসিমুখে উত্তর দিল, “আগামীকালকেই নিয়ে যাবো। কালকে ভার্সিটির ক্লাস শেষেই।”
ফিওনা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। বিল দেওয়ার জন্য ক্যাশিয়ারের দিকে এগিয়ে যায়, আর জ্যাসপার,প্রতিবাদ করতে চাইলে ফিওনা বাধা দেয় আজকে কফির বিল ফিওনাই দিতে ইচ্ছুক তাই জ্যাসপার কেবল তাকিয়ে থাকলো সেদিকে।
বিল মিটিয়ে ফিওনা যখন ফিরে আসে, জ্যাসপারও ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে আরেকটা কফির অর্ডার করে নেয় হাতের “কফি ট্রাভেল মগ” নিয়ে হাঁটা শুরু করে সেটাই তার সঙ্গী হবে।
কফি শপের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে জ্যাসপার গাড়ির সামনে দাঁড়ায়। সূর্য তখন পশ্চিমাকাশে ম্লান আলো ছড়াচ্ছে, আর সেই আলোতে জ্যাসপারের অলিভ-সবুজ চোখে একধরনের অনবদ্য রহস্যের আভা দেখা যায়। ফিওনা ভার্সিটির দিকে পা বাড়ায়, কিন্তু কিছু দূর গিয়ে পেছনে ফিরে তাকায় জ্যাসপার তখন তার কফির মগের স্ট্রুতে আলতো করে চুমুক দিচ্ছে, কিন্তু তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ফিওনার দিকে—একধরনের অমোঘ তীক্ষ্ণতা,গভীর ভাবনায় নিমগ্ন।
ফিওনা মৃদু হেসে হাত নাড়ে বিদায়ের সংকেত দিয়ে। জ্যাসপার সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানায়, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে দেখা দেয় এক ফ্যাকাশে, রহস্যময় হাসি। ফিওনা আবার সামনের দিকে তাকিয়ে ভার্সিটির পথে হাঁটা ধরে।
জ্যাসপার তখনও দাঁড়িয়ে, কফির স্ট্রতে শেষ চুমুক দিয়ে, ঠোঁটের কোণায় আরও স্পষ্ট হয় তার ঠান্ডা, ব্যঙ্গাত্মক হাসি। মনে মনে বলে, “বোকা মানবী! কত সহজে ভোলানোর মতো। হিউম্যানরা আসলেই খুব বোকা— তারা যা দেখে তাই বিশ্বাস করে।”
গাড়ির দরজা খুলে, গাড়িতে উঠে পড়ে জ্যাসপার ইঞ্জিন চালু করতেই গাড়ির ভেতর থেকে তার মুখে ফুটে ওঠে এক অব্যক্ত আত্মতুষ্টির ছাপ। “কালকের পরিকল্পনা সফল হবেই,” তার নিজের মনেই বিড়বিড় করা। সমস্ত পথ ধরে, তার মাথায় ঘুরছে সেই সুক্ষ্ণ চক্রান্ত, যার শিকার ফিওনা হতে যাচ্ছে,আর ফিওনা বোকা হয়ে তা বুঝতেও পারছে না।
জ্যাসপার জানে, তার উদ্দেশ্য পূরণ হতে আর দেরি নেই।
আযদাহা পর্ব ৭
কেমন ঘটনার পরিণতি অপেক্ষা করছে আগামীকাল? ফিওনাকে কি বিপদের মুখোমুখি হতে হবে? জ্যাসপারের পরিকল্পনা কি সফল হবে, নাকি তা ভেস্তে যাবে? ফিওনা কি তার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে পাবে, নাকি সে জ্যাসপারের অন্ধকার জগতে পা রাখবে?
