Home আযদাহা সিজন ২ আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৪ (২)

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৪ (২)

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৪ (২)
সাবিলা সাবি

রাতের আকাশ যেনো নীলাভ-রূপালি এক স্বপ্ন।জানালার বাইরে ফিওনা তাকিয়ে আছে,তার দৃষ্টি আটকে গেছে ভেনাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটির দিকে—পৃথিবী।এত দূরে থেকেও সেই গ্রহের টান সে অনুভব করছে।আজকের দিনটা বিশেষ,ভালোবাসার দিন,ভ্যালেন্টাইনস ডে।অথচ তার জীবন থেকে ভালোবাসা যেনো একেবারেই অনুপস্থিত ছিলো তখন।পৃথিবীতে থাকতে সে কখনো কাউকে ভালোবাসেনি, কারো সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্কও হয়নি।

মৃদু শীতল বাতাস বয়ে চলেছে।ফিওনার মনে পড়ে গেলো,পৃথিবীতে থাকাকালীন সময়ে শুধু মিস্টার চেন শিং-ই ছিলো যে প্রতি বছর তাকে গোলাপ আর উপহার দিতো।কিন্তু সেই স্মৃতির উষ্ণতা তাকে আজ সান্ত্বনা দিতে পারছে না।বরং অস্থির করে তুলছে।
হঠাৎ করেই বারান্দার গ্রিলের ছায়ায় যেনো একটা অবয়ব দুলে উঠলো!
ফিওনার বুক ধক করে উঠলো।সে ধীরে ধীরে ছায়ার উৎসের দিকে এগিয়ে গেলো।
ফিওনার ভ্রু কুঁচকে গেলো।এত রাতে, কিসের ছায়া…?
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো,বাতাসটা কেমন যেন ভারী লাগছে।রাজকীয় দরজা ঠেলে বাইরে বের হতেই এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস আটকে গেলো।
“প্রিন্স জ্যাসপার!”
শুকনো ঠোঁটে তার নামটা উচ্চারণ করতেই চোখের সামনে স্পষ্ট হলো তার উজ্জ্বল অলিভ গ্রিন চোখের ঝিলিক।ব্ল্যাক মেরুন কম্বিনেশনের ব্লেজার সুটে দাড়িয়ে আছে জ্যাসপার।চন্দ্রালোকের নরম আলো পড়ে জ্যাসপারের চেহারাকে যেনো আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
জ্যাসপার সামান্য হেসে একপাশে হেলে দাঁড়ালো,তার ঠোঁটের কোণে পরিচিত সেই বিদ্রুপমাখা হাসি।
ফিওনা বিস্ময়ে তাকিয়ে বললো “আপনি এতো রাতে এখানে?
জ্যাসপার কোনো উত্তর না দিয়ে তার পেছন থেকে এক হাত বের করলো,আর ফিওনার সামনে ধরা হলো এক বিশাল ফুলের তোড়া।কালো র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো,তবে সেটার আকর্ষণ শুধু রঙ বা আকারে নয়

—এতে প্রায় একশোটা ফুল!
একশোটা ভিন্ন ভিন্ন ফুল।
ফিওনার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো।
প্রতিটি ফুল তার চেনা,তার পছন্দের গোলাপ,অর্কিড,লিলি,ক্যামেলিয়া,চেরি ব্লসম,এমনকি ছোট ছোট জংলি ফুলও আছে জ্যাসপার কি আসলেই এত মনোযোগ দিয়ে জেনেছিলো কোন ফুল সে পছন্দ করে? ফিওনা তো কখনো কাউকে বলেনি,তবুও…
সে বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো,বুকের ভেতর কোথাও যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি দোলা দিলো।
জ্যাসপার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বিদ্রুপ হাসি নিয়ে বললো “এগুলো শুধু তোমার জন্য,হামিংবার্ড।আশা করি,এগুলো নিয়ে অন্য কোনো পাতি সেনাপতির কথা ভাববে না।”
জ্যাসপার ফুলের তোড়াটা ফিওনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,”হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে, মাই লাভ,মাই হার্ট। উইল ইউ বি মাই ভ্যালেন্টাইন, হামিংবার্ড?”

ফিওনার হাত কেঁপে উঠলো।ফুলের মিষ্টি সুবাস তার নাকে এসে ধাক্কা দিলো।সে তো জানে না কী বলবে,কী করবে!তবুও,ফুলের লোভ সামলাতে না পেরে আস্তে করে বুকেটটা নিলো।
“থ্যাঙ্ক ইউ…এখন আপনি যান।কেউ দেখলে সমস্যা হবে,প্লিজ!”
জ্যাসপার একরকম অবজ্ঞার হাসি হাসলো। “ওফ! কী বলো!আজকের রাতটা আমি তোমার সাথে কাটাবো। দাঁড়াও,তোমার জন্য আরও কিছু আছে।”
সে তার পকেট থেকে একটা ছোট,বিলাসবহুল বক্স বের করলো।তারপরে ফিওনার হাত ধরে কক্ষের ভেতরে নিয়ে গেলো।
বক্স খুলতেই ফিওনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো।একটা নজরকাড়া ব্রেসলেট।সাদা-নীল আভায় ঝলমল করছে,যেনো দ্যুতির স্রোত বইছে।বক্সটা খুলতেই যেনো এক মুহূর্তে ভিতরটা ঝলমল করে উঠলো।এক নজরেই বোঝা যাচ্ছে,এটা কোনো সাধারণ ব্রেসলেট নয়।যেন কোনো জাদুকরি আলো ছড়িয়ে পড়ছে এর মধ্য থেকে।পাথরগুলো এতটাই উজ্জ্বল যে মনে হচ্ছে,যেন তারা নিজেরাই আলো উৎপন্ন করছে।
জ্যাসপার হাসলো। “সুন্দর,তাই না?সুন্দর তো হবেই, কারণ এটা ভেনাসের সবচেয়ে দামি স্পেশাল হিরা দিয়ে বানানো।এই রত্ন পৃথিবীতে থাকলে,মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দিয়েও পেতে না।”
ফিওনা চোখ সরাতে পারছিল না।তবুও ফিওনা সাথে সাথে মাথা নাড়লো।ব্রেসলেটটা নিতে চাইলো না।মুখটা শক্ত করে বললো,”আমি এত এক্সপেনসিভ ব্রেসলেট কেন নেবো?এটা আমি পরবো না!”
জ্যাসপার একটুও পাত্তা না দিয়ে বললো,”তুমি আমার কাছে এই ব্রেসলেটের চেয়েও বেশি এক্সপেনসিভ, হামিংবার্ড।”

ফিওনা স্তব্ধ হয়ে শুনছিল।জ্যাসপার তখন ধীরে ধীরে ব্রেসলেটটা তুলে ধরে ফিওনার কব্জির কাছাকাছি আনলো,তার চোখে যেন একটা রহস্যময় চাহনি।ফিওনার কব্জি শক্ত করে ধরে ব্রেসলেটটা পরিয়ে দিলো।ফিওনা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
কিন্তু ঠিক তখনই ঘটলো বিস্ময়কর কিছু!জ্যাসপার তার বাম হাত ফিওনার ব্রেসলেট পরা হাতের কাছে আনতেই, হঠাৎ ক্লিক করে একটা শব্দ হলো!
“টক”
ফিওনার ব্রেসলেটের ঝুলন্ত অংশ জ্যাসপারের ব্রেসলেটের ঝুলন্ত অংশের সাথে চুম্বকের মতো আটকে গেলো।
ফিওনা দ্রুত হাত সরাতে চাইল,কিন্তু পারলো না!মনে হলো যেন দুটো ধাতব চুম্বক পরস্পরের দিকে আকৃষ্ট হয়ে গেছে।
ফিওনা তখন ও ব্রেসলেটটা তড়িঘড়ি করে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো “এটা কী!?”
জ্যাসপার একটু রহস্যময় হাসি দিলো। “সারপ্রাইজ!”
জ্যাসপার আসলে এই ব্রেসলেটটা সাধারণ কোনো অলংকার হিসেবে তৈরি করেনি।সে ফিওনার দেয়া ব্রেসলেটটা নিয়ে নিজের ল্যাবে গবেষণা করেছিল।ভেনাসের ড্রাগন টেকনোলজির মাধ্যমে সে এমন একটা সিস্টেম বানিয়েছে।

এই ব্রেসলেটে ব্যবহার করা হয়েছে “গ্র্যাভিটনিক ম্যাগনেটিক ফিল্ড”, যা সাধারণ চুম্বকের চেয়ে শতগুণ বেশি শক্তিশালী।কিন্তু এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর কাজ করে।
ফিওনার ব্রেসলেট আর জ্যাসপারের ব্রেসলেট—দুটোতেই ইনবিল্ট ন্যানো-ম্যাগনেটিক সেন্সর আছে,যা নির্দিষ্ট দূরত্বে আসার সাথে সাথে একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে আর লক হয়ে যাবে।
ফিওনা নিজের হাত ছাড়াতে ছটফট করছে আর হতভম্ব হয়ে বললো,”এটা… এটা খুলছে না কেন?”
জ্যাসপার চোখ টিপে বললো,”এটা খুলবে না হামিংবার্ড।যতক্ষণ না আমি চাইবো।”
ফিওনা হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো
“প্রিন্স! এটা ছাড়ুন!”
জ্যাসপার মিটিমিটি হাসলো। “আমি ছাড়ছি না?এটা ব্রেসলেটের কাজ।তুমি আমাকে ছেড়ে দিতে চাইলেও,আমি তোমাকে ছাড়তে পারবো না।”
ফিওনার মন কেমন যেন দুলে উঠলো।
“আপনি সবসময় এরকম করেন,আমাকে কন্ট্রোল করার জন্য কিছু না কিছু বানিয়ে ফেলেন!”
জ্যাসপার তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
“এটা কন্ট্রোল করার জন্য না,এটা আমাদের ভাগ্যকে একসাথে বাঁধার জন্য।”
ফিওনা এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে থাকলো।
ফিওনা তখন খেয়াল করলো,জ্যাসপারের হাতের ব্রেসলেটটা!যেনো কোথাও আগে দেখেছে।ফিওনা অনুভব করলো ব্রেসলেটটা তার চেনা চেনা লাগছে।
হঠাৎ করেই একটা পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেলো।

ফিওনার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।সে বিস্ময়ে চেয়ে রইলো জ্যাসপারের হাতে থাকা ব্রেসলেটটার দিকে।ঠিক একইরকম,হুবহু এক—স্পষ্ট মনে পড়ছে,এই ব্রেসলেটটা তো তার বাবা-মায়ের দেয়া,ছোটবেলা থেকে সবসময় হাতেই থাকত।কিন্তু পৃথিবীতে যখন জ্ঞান ফিরেছিল,তখন এটি তার হাতে ছিল না।ভেবেছিল হারিয়ে গেছে।
ফিওনার চোখ বিস্ফোরিত হলো!
“আপনি .. এই ব্রেসলেট কোথায় পেলেন!?”**
জ্যাসপার নিঃশব্দে হাসলো,কিন্তু কিছু বললো না।শুধু এক ঝটকায় ফিওনাকে কাছে টেনে আনলো,আর দু’জনের হাত তখনো চুম্বকের মতো আটকে আছে।
ফিওনার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো।
জ্যাসপার তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “এই ব্রেসলেট তুমি নিজে আমাকে পড়িয়ে দিয়েছিলে, হামিংবার্ড।”
ফিওনার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল।কীভাবে সম্ভব? যদি সত্যিই সে জ্যাসপারকে এই ব্রেসলেট দিয়েই থাকে, তবে নিশ্চয়ই জ্যাসপার তার খুব কাছের কেউ ছিলো। এই ব্রেসলেট তো তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান, সবচেয়ে ব্যক্তিগত স্মারক!
ফিওনা এক ধাক্কায় পেছনে সরে গেল,কিন্তু হাত ছাড়াতে গিয়ে আবিষ্কার করল,সেটা সম্ভব নয়। জ্যাসপারের হাতে থাকা ব্রেসলেট আর তার নিজের ব্রেসলেট একসঙ্গে লেগে গেছে,যেন চুম্বকের আকর্ষণে আবদ্ধ হয়ে আছে।

“এটা… এটা কীভাবে সম্ভব?” ফিসফিস করে বলে উঠল ফিওনা।
জ্যাসপার ফিওনাকে আরো কাছে টেনে নিল,তাদের হাত এখনও একসঙ্গে আটকানো।তার কণ্ঠে ছিল এক রহস্যময় কোমলতা,”তুমি আমার কেউ ছিলে না,তাহলে কি এই বিশেষ জিনিসটা নিজে হাতে আমাকে দিতে?”
ফিওনার হৃদয় যেন তীব্র গতিতে দৌড়ে চলেছে। সে অনুভব করছে কিছু একটা সত্যি ছিল তাদের মাঝে—কিছু অজানা, কিছু অবর্ণনীয়,যা হয়তো সময়ের অতলে হারিয়ে গিয়েছে।
তার হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠলো।মানে সে সত্যিই একসময় জ্যাসপারকে দিয়েছিলো?তবে কি জ্যাসপার সত্যিই তার জীবনে মুল্যবান কেউ ছিল?তার অনুভূতিগুলো এত পরিচিত কেনো লাগছে?
কিন্তু তারপরই তার মনে পড়লো… জ্যাসপার শুধুই জ্যাসপার নয়।সে থেরন,সেই অতীতের রাজপুত্র,কিন্তু এই রাজপুত্র অতীতে এক মহাপ্রলয়ের জন্ম দিয়েছিল।ফিওনা জানে এই ভালোবাসা কেবল হৃদয়ের ব্যাপার নয়,বরং নিয়তির কঠোর শৃঙ্খলেও বাঁধা।
ফিওনা ধীরে ধীরে নিজের হাত সরিয়ে নিতে চাইলো,কিন্তু চুম্বকীয় শক্তি তাকে আটকে রেখেছে।
জ্যাসপার ফিওনাকে ছেড়ে একটু সরে দাঁড়ালো ফিওনার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

“তুমি কি কিছু মনে করতে পারছো,হামিংবার্ড?”
ফিওনা কোনো উত্তর দিলো না।তার চোখ ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো,কিন্তু সে মুখ শক্ত করে ফেললো।
“যদি আমি তোমার অতীতের কেউ হয়ে থাকি,তবে সেটাই তো সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে আমি তোমার বর্তমানেও থাকার যোগ্য,তাই না?”জ্যাসপারের কণ্ঠস্বর গভীর,কিন্তু নরম।যেন সে ফিওনার মনে তৈরি হওয়া দ্বিধা পড়তে পারছে।
ফিওনা চোখ বন্ধ করলো,মনে পড়লো একটাই কথা—
“যদি নিয়তি বদলে যায়,তবে মহাপ্রলয় আবার আসবে সব ধ্বং*স হবে পুনরাবৃত্তি হবে অতীত…”
ফিওনা শক্ত গলায় বলল, “আপনি এখন যান এখান থেকে।”
তার কণ্ঠে কোনো অনুভূতি ছিল না, যেন সে নিজেকেই বোঝাতে চাইছে। কিন্তু চোখের ভাষা তাকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছিল—সেখানে ছিল এক অজানা টান, এক অদৃশ্য দ্বিধা।
জ্যাসপার চুপচাপ তাকিয়ে রইল,কোনো প্রতিবাদ করল না।ধীরে ধীরে নিজের ব্রেসলেট স্পর্শ করল,আর মুহূর্তের মধ্যে ফিওনার হাতের ব্রেসলেট থেকে সেই অদৃশ্য বন্ধন খুলে গেল।
“এটার কন্ট্রোল আমার কাছে ছিল,” নরম কণ্ঠে বলল জ্যাসপার,যেন বোঝাতে চাইল, সে চাইলে এই বাঁধন খুলতে পারত অনেক আগেই—কিন্তু সে করেনি।

ফিওনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল জ্যাসপারের দিকে,তার হাতের কাছে থাকা ব্রেসলেটটাকে অনুভব করল,যেন সেটাও কিছু বলতে চাচ্ছে।
জ্যাসপার ধীরে ধীরে এক পা সামনে এগিয়ে এলো।ফিওনা নড়েচড়ে উঠল,মনে হলো সে হয়তো পিছু হটবে,কিন্তু পা পিছলালো না।
জ্যাসপার এক নিঃশ্বাসে তার গালের কাছে হাত রাখল। গভীর,নীরব এক স্পর্শ।
ফিওনা হতভম্ব হয়ে জ্যাসপারের দিকে তাকিয়ে রইল।তার বড় বড় চোখে বিস্ময়ের ঝলক,ঠোঁট সামান্য ফাঁকা,যেন কোনো প্রতিবাদ করতে গিয়েও থেমে গেছে।
জ্যাসপার তার গালের ওপর হাত রেখেই মৃদু হেসে বলল, “আজ রাতে আমি তোমার কাছেই থাকবো,কোথাও যাবো না।” তার কণ্ঠ ছিল গভীর,আত্মবিশ্বাসে ভরা,যেন এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
ফিওনার হৃদস্পন্দন থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।কিন্তু পরক্ষণেই তার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করল।

“কি… কি বলছেন আপনি?” ফিসফিস করে বলল সে, গলা যেন শুকিয়ে এসেছে।
জ্যাসপার একপলক তার মুখের অভিব্যক্তি লক্ষ করল, তারপর মৃদু হেসে বলল, “তুমি বুঝতে পারছো না,আমি কি বলছি?”
ফিওনার মন উন্মোচনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল,যেন সময়ের নদীতে সে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছে।জ্যাসপারের হাতের উষ্ণতা তার গালের মসৃণ ত্বকে যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছে,আর সেই স্পর্শে তার হৃদয় কাঁপছিল।
“ভয় পাচ্ছো,হামিংবার্ড?,” জ্যাসপার তার গভীর,গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলো।”
ফিওনার চোখ বড় হয়ে গেল।তাঁর ভেতরের অনুভূতি যেন এক সময়ের গন্ডোগোল;একদিকে শঙ্কা,অন্যদিকে অজানা আশার আভাস।
জ্যাসপার তখন ধীরে ধীরে এক গভীর চুম্বন দিলো তার কপালে।সেদিনের সমস্ত আতঙ্ক যেন মেঘের মতো উড়িয়ে দিল। “আজ আমি কিছুই করবো না,” সে বলল, “তোমাকে আগে একবারে নিজের করে নেই। তারপর,তুমি চাইলে ও আর আমার স্পর্শ থেকে পালাতে পারবে না ।”
ফিওনার শ্বাস গলা থেকে আটকে গেল।কীভাবে এমন কথা বলার সাহস পায় জ্যাসপার?সে কি জানে,এই মুহূর্তটি তাকে অজানা রহস্যের গভীর সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে?

ফিওনার চোখ বন্ধ হয়ে এলো।হৃদয়ের যে কোমলতা আর আকর্ষণ অনুভব করছে,সেটাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় ছিল না।কিন্তু সেই সঙ্গে ভয়ে বুকের মধ্যে একটা চাপা অনুভূতি কড়মড় করতে লাগল।
জ্যাসপারের কাছ থেকে পালাতে পারবে?কি অসম্ভব।যদিও মনে পড়ে,এই অঙ্গীকারের ঠিক পাশেই অদৃশ্য এক দেয়াল ছিল।পুনর্জন্মের স্মৃতিগুলো তাকে সবসময় তাড়া করে যাচ্ছে।।
জ্যাসপার এক নিঃশ্বাসে বলল, “গুড নাইট, হামিংবার্ড। ঘুমিয়ে পড়ো। “আমাকে যেতে হবে। তোমাকে একবারে আমার করার জন্য অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা বাকি।” তার গম্ভীর কণ্ঠস্বরে মিষ্টি এক ছোঁয়া ছিল।

ফিওনার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছিল। তার মন সরল কিন্তু মনে মেঘের ঘনঘটা।
জ্যাসপার জ্যাসপার বারান্দার দিকে হাঁটলো, একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,”খুব শিঘ্রই ফিরে আসবো তোমাকে নিতে।” এই কথাগুলো বলেই সে বারান্দার দিকে গিয়ে ড্রাগন রূপ ধারণ করতে লাগলো।
জ্যাসপার তার গা থেকে এক চিরাচরিত মহিমা তৈরি করে ড্রাগন রূপ ধারণ করতে শুরু করেছে।বিশাল পাখা,দীপ্তিমান সবুজ স্কেল,সবকিছু মিলিয়ে যেন সে এক কিংবদন্তী রূপে পরিণত হচ্ছে।
ফিওনার একদম ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো,তার চোখ জ্যাসপারের দিকে,যে এক লহমায় ড্রাগনের শিখরে পরিণত হলো।বিশাল পাখাগুলো উড়ে গেল আকাশে,যেন চাঁদের আলোতে ভেসে উঠেছে।
অন্ধকারে একটি তারকার মতো উজ্জ্বল হয়ে,জ্যাসপার আকাশের গভীরে মিলিয়ে গেল।কিন্তু ফিওনার হৃদয় একটা অজানা শুন্যতা গ্রাস করলো।

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৪

তার চোখের সামনে জ্যাসপার ড্রাগন হয়ে আকাশের গভীরে মিলিয়ে গেল।ফিওনা সেখানেই তাকিয়ে রইলো,কেবল এক নিঃশ্বাসে এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল—কীভাবে সে এতটা কনফিউজড হয়ে গেল?
আকাশের নীলিমা তাকে মনে করিয়ে দিল,ভালোবাসা শক্তিশালী,কিন্তু সেটি আবারও নিয়তির বিরুদ্ধে যাবে?তার হৃদয়ে আতঙ্ক ছিল—এই বোধটা সে কখনোই মুছে ফেলতে পারবে না।

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৫