Home আযদাহা সিজন ২ আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৪

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৪

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৪
সাবিলা সাবি

ফ্লোরাস রাজপ্রাসাদের আকাশ আজ ঘন মেঘে ঢাকা।
কক্ষের ভেতরে নীরবতা।লিউ ঝান মাথা,হাত ও পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় বিছানায় হেলান দিয়ে আছে।চোখ দুটো বন্ধ,নিঃশ্বাস ভারী।ব্যথা যেন তার শরীরের প্রতিটি শিরায় ধুকপুক করছে,তবুও মুখে কোনো অভিযোগ নেই।
ফিওনা দাঁড়িয়ে আছে কক্ষের এক কোণে তার কপালেও ব্যান্ডেজ বাঁধা,চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।সে চুপচাপ লিউ ঝানের পাশে এসে দাঁড়াল,কিন্তু কোনো শব্দ করল না।রাজা জারেন সোফায় বসে আছেন।
ফ্লোরাস রাজ্যের প্রতিটি কোণে ইতোমধ্যে এ ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়েছে।কেবল একজনই এতদিন অন্ধকারে ছিলেন—রাজা জারেন।আজ তিনি সব শুনলেন—জ্যাসপারের সঙ্গে ফিওনার সম্পর্ক,ফিওনার স্মৃতিভ্রংশ,তাদের পূর্বজন্ম,এমনকি থেরনের গল্পও।

রাজা জারেন নির্বাক।
তিনি জানতেন জ্যাসপার আর অ্যালিসার বিবাহ ঠিক করা হয়েছিল,কিন্তু আজ বুঝলেন—জ্যাসপার কখনোই তার কন্যাকে ভালোবাসেনি।বাস্তবটা এতদিন তিনি বুঝতে পারেননি,বরং এক ভুল সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য জোর করছিলেন।
কঠিন চোখে তিনি ফিওনার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো।
“তুমি কি এখনো জ্যাসপারকে ভালোবাসো?”
প্রশ্নটা বাতাসের মতো হালকা হলেও,ফিওনার শরীর যেন একটা ধাক্কা খেলো।তার ঠোঁট কেঁপে উঠেলো।
ফিওনার কণ্ঠ দৃঢ়,কিন্তু ভেতরের দ্বন্দ্ব লুকোনো নেই।
“মামা,প্রিন্স জ্যাসপারের বিষয়ে আমার কিছুই মনে নেই,” ফিওনার কণ্ঠে এক ধরনের শূন্যতা বাজল। “তবে বর্তমানে যা জানি,তা হলো—সে অতীতের থেরন।আমি জানি না,নিয়তি আমাদের জন্য কী লিখেছে।তবে যা-ই হোক,এবার আমি নিয়তির বিরুদ্ধে দাঁড়াব না।”

সে একটু থামল,গভীর শ্বাস নিল।তার চোখে ঝলসে উঠল এক নতুন প্রত্যয়।
“কিন্তু আমার জন্য আর কেউ মরবে না।আমি আর কারও জীবন নষ্ট হতে দেবো না।”
তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে লিউ ঝানের দিকে গেল।ব্যান্ডেজে মোড়া শরীর,গভীর নিদ্রায় ক্লান্ত একটি প্রাণ—তার জন্য এত কিছু সহ্য করেছে।
ফিওনার কণ্ঠ নরম হলো,কিন্তু দৃঢ়তায় ভরা।
“আমার এখন একটাই লক্ষ্য—মিস্টার লি কে রক্ষা করা।”
রাজা জারেন তার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ রইলেন।বাইরে বাতাসের সঙ্গে সঙ্গত করে বজ্রপাতের শব্দ শোনা গেল,যেন প্রকৃতিও বুঝতে পারছে—আজ এখানে ইতিহাসের মোড় ঘুরতে চলেছে।

রাজা জারেন আর কিছু বললেন না।ফিওনার কথাগুলো যেনো এখনো তার মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।তিনি একবার ফিওনার দিকে তাকালেন,তার চোখে গভীর চিন্তার ছায়া। তারপর ধীরপায়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন,যেনো কিছু ভাবার জন্য একান্তে সময় দরকার।
ফিওনা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। বাতাসে যেন এক অদৃশ্য ভারী চাপ,যা বুকের ভেতর দমচাপা অনুভূতি সৃষ্টি করছে।
ঠিক তখনই দরজার কাছে ধীর পায়ে কেউ এসে দাঁড়ালেন।
ফিওনার মা,লিয়ারা।
ক্লান্ত শরীর, মুখে অবসাদের ছাপ, তবুও চোখে মায়ের অসীম মমতা। হাতে একটি ট্রে, তাতে কিছু তাজা ফল রাখা। তিনি ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে বসলেন, যেখানে লিউ ঝান নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে।
“কেমন আছো লিউ ঝান?” তার কণ্ঠে ছিলো মাতৃস্নেহের কোমলতা।
লিউ ঝান চোখ খুলতে চেষ্টা করলো, কিন্তু ক্লান্তির ভারে সে পারেনি।
লিয়ারা তার কপালে আলতো করে হাত রাখলেন। “তোমার জন্য কিছু ফল এনেছি।খেয়ে নাও বুঝেছ?”
তারপর ফিওনার দিকে তাকালেন। মেয়ের মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু চোখের গভীরে এক কঠোর সংকল্প দেখা যায়।

“তোমরা যা-ই সিদ্ধান্ত নাওনা কেনো,বুঝেশুনে নিও,” লিয়ারার কণ্ঠ ছিলো নরম, কিন্তু তার গভীরে ছিলো এক গভীর অভিজ্ঞতার ছায়া।
ফিওনা মাকে দেখে কিছু বলতে পারলো না। শুধু তার দৃষ্টি চলে গেল লিউ ঝানের দিকে।
এখন তার একটাই লক্ষ্য—লিউ ঝানকে রক্ষা করা, যেকোনো মূল্যে।
ফিওনার মা লিয়ারা ধীর পায়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন, কিন্তু যাওয়ার আগে একবার মেয়ের দিকে তাকালেন। ফিওনার চোখে যে কঠোর সংকল্প ছিল,তা মা বুঝতে পারলেন।তিনি কিছু বললেন না,শুধু এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে চলে গেলেন।
কক্ষটি এখন নিস্তব্ধ।শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসের মৃদু শব্দ।
ফিওনা ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে বসল।লিউ ঝান চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে শুয়ে আছে,তার মুখে ক্লান্তির ছাপ, ডান হাতটি ব্যান্ডেজ করা,গলায় ঝোলানো,নড়াচড়া করা অসম্ভব।
ফিওনা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল,তারপর ট্রের ওপর রাখা ফলগুলোর দিকে তাকালো।কাটা চামচ হাতে নিলো,তারপর এক টুকরো আপেল তুলে লিউ ঝানের মুখের সামনে ধরলো।

“খেয়ে নিন মিস্টার লি ,” ফিওনার কণ্ঠে আদেশের কঠোরতা থাকলেও গলায় ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা।
লিউ ঝান আস্তে আস্তে মুখ খুললো। ফিওনা চামচটা এগিয়ে দিলো, আর সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও খেয়ে নিলো।
কক্ষের ভেতর যেনো এক ধরনের নীরব বোঝাপড়া তৈরি হলো।
ফিওনা একটার পর একটা ফল খাইয়ে দিতে লাগলো, আর লিউ ঝান ধীরে ধীরে খাচ্ছিলো।
কখন যে বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, তা কেউ খেয়াল করেনি।
ফিওনা তখন হাতের চামচটা থামিয়ে লিউ ঝানের দিকে তাকালো। তার চোখে ছিলো এক অদ্ভুত অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি। কণ্ঠটা একটু নরম হয়ে গেল, যেন নিজের চিন্তাগুলো নিজেই স্পষ্ট করতে চাইছে।
“আচ্ছা, আমি যখন এলিজিয়া নামটা নিয়ে কথা বলছিলাম, আপনি তখন কেন আমাকে জিজ্ঞেস করেননি আমি কেন এই নামের কথা বললাম?”

লিউ ঝান চোখের পাতা কাঁপিয়ে তাকালো ফিওনার দিকে। তার চোখে ছিলো ক্লান্তি, কিন্তু কণ্ঠটা ছিলো শান্ত।
“ফিওনা, আমি কিভাবে জানবো তোমাকে কেউ চিঠি আর ফুল দিতো?” সে একটু বিরতি নিয়ে যোগ করলো, “আমাকে কি বলেছিলে?আর তুমি এখন এই নাম,চিঠি এসব নিয়ে কেন এতো ভাবছো?”
ফিওনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তার চোখের গভীরে যেন হাজারো প্রশ্ন। সে জানে,কিছু উত্তর সে নিজেই খুঁজে পাচ্ছে না।অতীতের সব টুকরো টুকরো স্মৃতি একসাথে মিলে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো স্পষ্ট রূপ পাচ্ছে না।
লিউ ঝান ফিওনার গভীর চোখে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, যেন তার প্রতিটি শব্দ বিশ্লেষণ করছে। তারপর ধীরে কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললো,
“সত্যি করে বলো তো, তুমি কি আমাকে ভালোবেসেছিলে? নাকি যে চিঠি দিতো, তাকে?”
ফিওনা সামান্য কেঁপে উঠলো। তার হাতের চামচটা থেমে গেল লিউ ঝানের ঠোঁটের কাছে।এক মুহূর্তের জন্য তার ভেতরে যেন এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করলো।

সে ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেললো, “এখন এসব কথা বলে কি লাভ?”
লিউ ঝানের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো, কিন্তু সে কিছু বললো না।
ফিওনা একটু বিরতি নিয়ে বললো, “আমি তো শুধু বললাম… কারণ আরডন ভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম, প্রিন্স থেরন নাকি ফুল ভালোবাসতেন না কখনো।
তার বাড়ির সামনে তার সৎমা একাবার একটি বাগান করেছিলেন,আর সে সেটি পুড়িয়ে ফেলেছিলো!কারণ তার নাকি ফুল দেখলে অসহ্য লাগতো।”
ফিওনা লিউ ঝানের চোখে তাকালো,যেন নিজেকেই বোঝাতে চাইছে, “তাহলে আমাকে কেনো ফুল‌ দিতো আর তার মতো একজন ড্রাগন…সে কিনা চিঠি ও লিখতো?এটা ভেবেই আমি অবাক হয়েছিলাম,আর কিছু না।তাই ভাবছিলাম।”
তার কথার শেষে কক্ষের ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। লিউ ঝান গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, যেন ফিওনার কথার প্রতিটি ছত্র পড়ে নিচ্ছে,তার মন পড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সে কি সত্যিই বুঝতে পারছে, নাকি ফিওনাও নিজেই জানে না তার মনের গভীর সত্য?
লিউ ঝান ফিওনার চোখে গভীর দৃষ্টি রেখে বললো,

“ফিওনা, একটা কথা বলি শোনো… ওই জ্যাসপার, মানে থেরন ও কিন্তু আমাকে মারতে চেয়েছিলো অতীতে আর এবার ও সেটাই করেছে।ও কিন্তু এবার ও এভাবে ছেড়ে দেবে না।নিশ্চয়ই কোনো না কোনো পরিকল্পনা করবেই।তাই বলছি,চলো তুমি আর আমি আজই পৃথিবীতে ফিরে যাই।এমন কোনো জায়গায় চলে যাই,যেখানে ও আমাদের খুঁজে পাবে না।”
ফিওনা লিউ ঝানের কথায় চমকালো না,যেন সে জানতই এমন কিছু আসবে।ঠোঁট কামড়ে একটু থামলো,তারপর নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বললো,
“মিস্টার লি,আপনি ওকে চেনেন না।”
তার চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ফুটে উঠলো, যেন সে নিশ্চিত কিছু জানে।
“আমি পৃথিবী কেনো,এই মহাবিশ্বের যে প্রান্তেই যাই না কেনো…ও আমাকে খুঁজে বের করবেই।”
তার কণ্ঠস্বর নিঃসংশয়,যেন তার কথার মধ্যে কোনো অনুমান নেই,আছে শুধু অভিজ্ঞতা।যেন সে নিজের ভাগ্যকে নিজেই পড়ে ফেলেছে আগেই।
লিউ ঝান এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলো।তারপর ধীরে ধীরে বললো,

“তাহলে তুমি কি চাও ফিওনা? সারাজীবন ওর অন্ধকার ছায়ার নিচে কাটিয়ে দিতে?”
ফিওনা কোনো উত্তর দিলো না। শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন আকাশের তারা গুলোতে নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজছে।
ফিওনা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলো, দূরের আকাশে যেন তার চোখ আটকে গেছে। ধীরে ধীরে সে বললো,
“আমি আমাকে নিয়ে চিন্তা করছি না,মিস্টার লি। ও আমাকে মেরে ফেলবে না…কিন্তু আপনাকে মারবে। তাই বলছি,আপনি পৃথিবীতে ফিরে যান।”
তার কণ্ঠস্বর নরম, কিন্তু কঠোর বাস্তবতার ভারে ঝুঁকে পড়েছে।
লিউ ঝান কিছুক্ষণ ফিওনার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর এক হাতে ফিওনার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেললো।
“কি বলছো তুমি,ফিওনা?” তার কণ্ঠে অবিশ্বাস আর অভিমান একসঙ্গে মিশে গেলো। “শত বছর পর, এত কষ্টের পর তোমাকে ফিরে পেয়েছি আমি।যেখানে আমাদের ভাগ্য আমাদের এক করার জন্য একটা সুযোগ দিয়েছে,আর তুমি বলছো আমি তোমাকে রেখে একা চলে যাবো?ওই ভয়ংকর রাক্ষসটার কাছে?”
তার চোখে একরাশ যন্ত্রণা ফুটে উঠলো,যেন ফিওনার এই কথাগুলো তার হৃদয়ে ধারালো ছুরির মতো বিধেছে।
ফিওনা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো,যেন সে নিজেকেই বোঝাতে চাইছে। কিন্তু তার ভিতরে যে ঝড় বইছে, সেটা লিউ ঝানও বুঝতে পারছে।

সারারাত কেটে গেলো।ভোরের আলো ফুঁটে উঠতেই ফিওনা ব্যস্ত হয়ে পড়লো।হাতে একটা ট্রে নিয়ে ধীরে ধীরে সে লিউ ঝানের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলো।খাবারের সুগন্ধে ঘরটা ভরে উঠেছে—উষ্ণ স্যুপ,হালকা ব্রেড,আর কিছু ফল।
ড্রইং রুমে বসে ছিলেন রাজা জারেন,লিয়ারা,অ্যালিসা,আর সিলভা। সকালের আলো কক্ষের ভেতর ছড়িয়ে পড়লেও বাতাস ভারী ছিলো।কাল রাতের ঘটনার পর থেকে কারোর মনই ভালো নেই।
অ্যালিসা ফুঁসছিলো রাগে।তার চোখমুখ কঠিন হয়ে আছে,দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে একপাশে।সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না,সে নিজকে বোঝাতে চাইছে জ্যাসপার নয়,বরং লিউ ঝানই ফিওনার বর্তমান!
ফিওনা কারও দিকে না তাকিয়ে লিউ ঝানের কক্ষে প্রবেশ করলো।ভেতরে ঢুকে দেখলো,লিউ ঝান তখনো বিছানায় শুয়ে আছে,হয়তো গভীর চিন্তায় ডুবে ছিলো।
ফিওনা ধীরে ধীরে তার পাশে বসল,ট্রে-টা সামনে রেখে বললো,”সকালের খাবার নিয়ে এসেছি। উঠে বসুন,একটু খেয়ে নিন তারপর আবার ঔষধ খেতে হবে আপনাকে।”
লিউ ঝান চোখ খুলে ফিওনার দিকে তাকালো।তার চোখে গভীর ক্লান্তি,কিন্তু তাতে একটা প্রশান্তিও ছিলো—যেন ফিওনাকে কাছে পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে।

“তুমিই খাইয়ে দেবে?” লিউ ঝান নরম কণ্ঠে বললো, একটুকরো দুষ্টুমি মিশিয়ে।
ফিওনা গম্ভীর মুখে বললো, “আপনার হাত তো ব্যান্ডেজ করা,তাই খাওয়ানো ছাড়া উপায় নেই।”
লিউ ঝান মৃদু হাসলো,”তাহলে তো আমার ব্যান্ডেজ খুলতে আরও দেরি করা উচিত।”
ফিওনা কোনো উত্তর দিলো না,কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটা সামান্য হাসির আভাস ফুটে উঠলো।
বাইরে তখনো অ্যালিসার মুখ রাগে লাল হয়ে আছে। সে ধৈর্য হারিয়ে বললো, “আমি আর এক মুহূর্তও এসব সহ্য করতে পারছি না !”
রাজা জারেন তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শান্ত হও, অ্যালিসা। এটা শুধু তোমার নয়, আমাদের সবার পরীক্ষার সময়।”
কিন্তু অ্যালিসার চোখেমুখে স্পষ্ট ছিলো—সে এত সহজে শান্ত হবে না।

কিয়ৎক্ষন বাদে জ্যাসপারের আগমন ছিলো হঠাৎ, অপ্রত্যাশিত—এক তীব্র ঝড়ের মতো।হনহনিয়ে প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করতেই তার পেছনে ছায়ার মতো চললো থারিনিয়াস,এথিরিয়ন,আলবিরা এবং আরও কয়েকজন ড্রাগন সদস্য।তাদের উপস্থিতি মুহূর্তেই চারপাশের বাতাস ভারী করে তুললো।
প্রাসাদের লোকেরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো,কিন্তু কারোরই সাহস হলো না সামনে এগিয়ে কিছু বলার।তবে একমাত্র যিনি সাহস করলেন,তিনি ছিলেন লিয়ারা—ফিওনার মা।
লিয়ারা দৃঢ় পায়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন, হাত বাড়িয়ে পথ রোধ করলেন।তার চোখে ছিলো এক মায়ের শঙ্কা,কিন্তু তাতেও ভয় ছিলো না,ছিলো এক অদ্ভুত শক্তি।
“এক ধাপও এগোবে না,জ্যাসপার!” তার কণ্ঠ কঠোর ছিলো।
কিন্তু আলবিরা এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করেই ঝট করে তার হাত ধরে একপাশে সরিয়ে দিলো।লিয়ারা ধাক্কা সামলাতে পারলেও দুলে উঠলেন,কিন্তু পড়লেন না।
ঠিক তখনই, কোনো দেরি না করে জ্যাসপার ঠাস করে দরজা খুলে দিলো।
প্রাসাদের ভেতরে যেন এক নিমেষে শীতলতা নেমে এলো।
দরজা খুলতেই চোখের সামনে যে দৃশ্য ভেসে উঠলো, তাতে জ্যাসপারের চোখ মুহূর্তেই আগুনের মতো লাল হয়ে উঠলো।

ফিওনা বিছানার পাশে বসে আছে।তার হাতে কাটা চামচ,আর সে খুব যত্ন নিয়ে লিউ ঝানকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে।লিউ ঝানের ঠোঁটের কোণে একটা নরম হাসি খেলা করছে।
এই দৃশ্য যেন ছুরির মতো বিদ্ধ হলো জ্যাসপারের বুকে।
তার সমস্ত শরীর ক্রোধে কাঁপতে লাগলো।চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো,হাতের আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠলো।
ফিওনা তখনো তাকে খেয়াল করেনি।
কিন্তু লিউ ঝান প্রথমে বুঝতে পারলো।ধীরে ধীরে তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো,সে কেবল ফিওনার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো, “ফিওনা, …”
ফিওনা অবাক হয়ে তাকাতেই দেখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাসপার।
তার দৃষ্টি একেবারে অন্ধকার,আগুনের মতো লাল।
এক মুহূর্তের জন্যও সে ফিওনার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো না—তার দৃষ্টি ছিলো সেই হাতের দিকে,যে হাত দিয়ে ফিওনা লিউ ঝানকে খাওয়াচ্ছিলো।

পরবর্তী মুহূর্তে, জ্যাসপার ধীর পায়ে এগিয়ে এলো, তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন প্রলয়ের সংকেত বহন করছে।
ফিওনা বুঝতে পারছিলো,আজও কিছু একটা ঘটতে চলেছে—গতকালকের চেয়েও ভয়ংকর কিছু।
জ্যাসপারের চোখের আগুন যেন কক্ষটাকে পুড়িয়ে দেবে।সে এক টানেই ফিওনাকে বসা থেকে দাঁড় করিয়ে দিলো,তার আঙুলগুলো ফিওনার কব্জিতে শক্ত হয়ে চেপে বসলো।
“তুমি কী করছিলে?” জ্যাসপারের কণ্ঠ যেন বজ্রের মতো গম্ভীর, কিন্তু তাতে ছিলো দাবানলের মতো ক্রোধ।
ফিওনা ভয়ে কেঁপে উঠলো,তার হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেলো।কালকের কথা মনে পড়ে গেলো—জ্যাসপারের রাগ,তার অবিশ্বাস,তার সেই বন্য শক্তি।আজও কি সে একইরকম কিছু করবে?
বাকিরা তখন ছুটে এসেছে।
“ছেড়ে দাও ওকে,জ্যাসপার!” লিয়ার প্রথমেই বলে উঠলেন। তার চোখে ছিলো বিস্ময় আর ক্ষোভ।
“জ্যাসপার,শান্ত হও!” রাজা জারেন ধীর কণ্ঠে বললেন, যদিও তিনিও জানতেন,জ্যাসপারকে শান্ত করা এত সহজ নয়।
কিন্তু জ্যাসপার কিছু শুনলো না।তার পুরো মনোযোগ ফিওনার দিকে।

“তুমি আমার ছিলে,তুমি আমার আছো,আর চিরকাল আমারই থাকবে!” জ্যাসপারের কণ্ঠ যেন এক শপথের মতো গর্জে উঠলো।
তার হাতের শক্তি আরও বেড়ে গেলো,ফিওনার নরম ত্বকের ওপর তার আঙুলের চাপ লাল দাগ ফেলে গেলো।
“তোমার কি মনে পড়ছে না?” জ্যাসপার ফিসফিস করে বললো, তার চোখে এক অদ্ভুত তীব্রতা।”আমি তো তোমার জন্য পুরো অতীতটাই পুড়িয়ে ফেলেছি,ফিওনা।আমি ইতিহাস বদলেছি,ভবিষ্যত লিখছি।তুমি কীভাবে ভুলে গেলে আমি কে?”
ফিওনা শ্বাস নিতে পারছিলো না,তার শরীর জমে আসছিলো। কিন্তু সে নিজেকে দুর্বল দেখাতে চাইলো না।
“আমি কিছুই ভুলিনি,,” ফিওনা চোখ তুলে সরাসরি তাকালো তার লালচে দৃষ্টি জুড়ে থাকা পুরুষটার দিকে। “কিন্তু আপনার এই অধিকারবোধ… আমি কখনো আপনার সম্পত্তি ছিলাম না,আর হবোও না।”
ঘরে মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এলো।
জ্যাসপারের চোখ বিস্ফারিত হলো।
এই প্রথম কেউ তাকে এইভাবে প্রত্যাখ্যান করলো।

লিউ ঝান তখন ধীরে ধীরে উঠে বসলো, ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেও তার চোখে ছিলো এক ধরণের অদম্য জেদ।
“ফিওনা একা তার সিদ্ধান্ত নেবে,” লিউ ঝান শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললো। “তাকে জোর করার অধিকার তোমার নেই,প্রিন্স অফ ভেনাস।”
জ্যাসপার ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে লিউ ঝানের দিকে তাকালো।তার ঠোঁটের কোণে এক ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠলো। “আমাদের কথার মাঝখানে একদম কথা বলবি না তুই।”
জ্যাসপার ফিওনার দুই বাহু চেপে ধরে আরও কাছে টেনে নিলো,তার দৃষ্টি এতটাই তীব্র যে ফিওনা চোখ ফেরানোর সুযোগও পেলো না।
“কি ভেবেছিলে?” তার গম্ভীর কণ্ঠে যেন বিদ্যুৎ কাঁপলো। “আমি সারাজীবন ওখানেই বন্দী থাকবো? তোমাকে এমনি এমনি ছেড়ে দেবো?”
ফিওনা কিছু বলতে পারলো না। বুকের মধ্যে তার হৃদস্পন্দন তীব্র হয়ে উঠলো,যেন ভয় আর শঙ্কার এক অদৃশ্য দড়িতে বাঁধা পড়েছে।
কিন্তু হঠাৎ লিউ ঝানের কণ্ঠে সেই দড়িটা ছিঁড়ে গেলো।

“ওকে ছেড়ে দাও, প্রিন্স!” লিউ ঝানের কণ্ঠ স্পষ্ট, দৃঢ়। “তুমি আবারও ভুল করছো।”
কিন্তু জ্যাসপার একটুও পাত্তা দিলো না। বরং তার ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো।
“ভুল?” সে ফিসফিস করে বললো, চোখের গভীরে অদ্ভুত এক উন্মাদনা। “আমার জন্য ভুল বলে কিছু নেই,।আমি যা চাই,তা পাই।আমি যা লিখি,তাই নিয়তি হয়।”
তার আঙুলের চাপ আরও দৃঢ় হলো ফিওনার বাহুর ওপর, এতটাই যে ফিওনার চোখ জলে ভরে উঠলো, যদিও সে নিজেকে দুর্বল দেখাতে চাইলো না।
“আমি তোমাকে তোমার অতীত থেকে ছিনিয়ে এনেছি,” জ্যাসপার ফিসফিস করে বললো,তার গরম নিঃশ্বাস ফিওনার গালের কাছ দিয়ে ছুঁয়ে গেলো।”তুমি আমার হবে একমাত্র,তুমি থেরনের ছিলেনা,এলিজিয়া যদি থেরনেকে ভালো নাও বেসে থাকে,তাতে কি আসে যায়?এই জন্মে প্রিন্সের হামিংবার্ড শুধু প্রিন্সকেই ভালোবেসেছে।
লিউ ঝান এবার ধীরে ধীরে উঠে বসলো, কষ্ট হলেও তার মুখে এক অদম্য জেদ।
“ফিওনা তার নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে,” সে শান্ত অথচ কঠিন কণ্ঠে বললো। “তাকে জোর করার অধিকার তোমার নেই,প্রিন্স।”

জ্যাসপার ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে লিউ ঝানের দিকে তাকালো।
তার চোখে তীব্র অগ্নিশিখার ঝলক।
লিয়ারা সামনে এগিয়ে এলেন, চোখেমুখে ক্রোধ আর উৎকণ্ঠার মিশ্র অনুভূতি।
“জ্যাসপার! কি করছো তুমি?” তার কণ্ঠ কাঁপছিলো, কিন্তু দৃঢ় ছিলো। “আমার মেয়েকে ছেড়ে দাও! তুমি এটা করতে পারো না। নিয়তি তোমাকে মানতেই হবে!”
জ্যাসপার বিরক্তির সাথে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো, যেন এইসব কথাবার্তায় সে একদমই আগ্রহী নয়।
“উফ, মাদার-ইন-ল…” সে এক হাত দিয়ে কপালে হাত রেখে বললো, “একটু শান্তিতে কথা বলতে দিন তো!আপনারা সবাই এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?কেমন যেন লাগছে,এখানে কোনো সিনেমা চলছে না!”
সে এক ঝটকায় ফিওনাকে কাছে টেনে নিলো,যেন বুঝিয়ে দিতে চাইলো,কার সিদ্ধান্ত এখানে শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে।
“আমি জানি না তোমরা কোন নিয়তির কথা বলছো,” তার চোখ জ্বলছিলো। “কিন্তু একটা কথা শুনে রাখো, আমি নিজেই আমার ভাগ্য লেখার ক্ষমতা রাখি।আর এই মেয়েটা?এটা আমার!শুধু আমার!”
প্রাসাদজুড়ে যেন এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা নেমে এলো।সকলেই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো,পরবর্তী মুহূর্তে কী ঘটতে চলেছে,কেউ জানে না।
লিউ ঝান দাঁতে দাঁত চেপে জ্যাসপারের দিকে তাকিয়ে রইলো,তার চোখে অসহায় ক্ষোভ স্পষ্ট।সে কিছুই করতে পারছে না—তার ড্রাগনের শক্তি এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি,আর তার শরীর দুর্বল,হাত-পা ব্যান্ডেজে মোড়ানো।

তার মুষ্টি শক্ত হয়ে উঠলো,কিন্তু সে জানে, এই অবস্থায় জ্যাসপারের বিরুদ্ধে কিছু করা সম্ভব নয়।ফিওনার চোখে আতঙ্কের ছায়া,অথচ সে নিজের কষ্ট চেপে রাখার চেষ্টা করছে।
“জ্যাসপার,ছেড়ে দাও ওকে,” লিউ ঝান দৃঢ় কণ্ঠে বললো,যদিও কণ্ঠের গভীরে একটা অস্পষ্ট ব্যথা লুকানো ছিলো। “তুমি আবার ও ভুল করছো।”
জ্যাসপার এক মুহূর্তের জন্য থামলো,তারপর বিদ্রূপের হাসি হাসলো।
“ভুল?”সে ফিওনার চিবুক ধরে তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। “তাহলে বলো,হামিংবার্ড।আমি কি সত্যিই ভুল করছি?”
ফিওনা কোনো উত্তর দিলো না, তার চোখেমুখে দ্বিধা, ভয়, আর এক অজানা আবেগ খেলা করছে।
লিউ ঝান এবার নিজেকে ধৈর্য ধরতে পারলো না। সে ধীরে ধীরে উঠে বসলো,ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেলেও জোর করে নিজেকে শক্ত করে রাখলো।
“ওকে কষ্ট দিও না,জ্যাসপার।” তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভিতরে যেন আগুন জ্বলছে। “ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না।”
জ্যাসপার এবার সত্যিই বিরক্ত হলো।
“ভালোবাসা?” সে হেসে উঠলো, ঠান্ডা, নির্মম সেই হাসি। “আমার কাছে ভালোবাসা মানে,আমি যা চাই, সেটা আমি নিয়েই নিই। নিয়তি আমাকে যা দেয়নি,সেটা আমি নিজেই কেড়ে নেব।আর ফিওনা আমার।এটা কখনোই বদলাবে না।”

প্রাসাদের পরিবেশ আরও থমথমে হয়ে উঠলো, যেন এক ধ্বংসাত্মক ঝড় আসতে চলেছে।
জ্যাসপার ফিওনার চোয়াল শক্ত করে ধরলো,চোখে যেন এক দাবানল জ্বলছে।গাঢ় কণ্ঠে ফিসফিস করে বললো—
‘নিয়তির সব কঠোর নিয়ম ভেঙে তুমি যদি আমার হয়ে যাও,তাতে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে?আকাশ কি তার নীলিমা হারাবে?নক্ষত্ররা কি পথ ভুলে যাবে? সময়ের গতিধারা স্থির হয়ে যাবে?ভেনাস গ্ৰহ উল্টো চক্রে ঘুরবে?যদি ভালোবাসাই একমাত্র সত্য হয়,তবে সে সত্যের জন্য নিয়তি বদলালে অপরাধ কোথায়? বরং লাভটাই বেশি… তুমি আমি একসাথে,এক অভিন্ন সত্তায়,এক শ্বাস,এক স্পন্দনে আবদ্ধ হয়ে যাবো!’
তার কণ্ঠে ছিল একধরনের দাবি,যেন এই সত্যের বাইরে কিছুই সে মানতে রাজি নয়।ফিওনার হৃদয় ধকধক করে উঠলো,সে জানে,এই ড্রাগন পুরুষ যা চায়,তা সে করেই ছাড়বে।”
ফিওনা জ্যাসপারের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পিছিয়ে আসার চেষ্টা করল,কিন্তু জ্যাসপার তার কব্জি শক্ত করে টেনে নিলো নিজের দিকে।মুহূর্তের মধ্যেই সে ফিওনাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল,এক হাত তার কোমরে শক্ত করে চেপে ধরল,আর অন্য হাত মৃদু অথচ দৃঢ়ভাবে তার গলার কাছে আড়াআড়ি বাঁধল,যেন ফিওনার প্রতিটি শ্বাস এখন তার নিয়ন্ত্রণে।

ফিওনার হৃদস্পন্দন থেমে গেলো এক মুহূর্তের জন্য। তার পিঠ জ্যাসপারের শক্ত শরীরের সাথে মিশে গেলো, বুকের ভেতর একটা অজানা আতঙ্ক আর উত্তেজনার ঢেউ খেলে গেলো। জ্যাসপারের উষ্ণ নিঃশ্বাস তার গলার কাছে স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছিল, আর তার কণ্ঠস্বর একেবারে ফিসফিস করে তার কানের কাছে গর্জন তুলল—
“ভেবেছিলে পালিয়ে যাবে আমার কাছ থেকে?”
ফিওনা দুহাতে জ্যাসপারের বাঁধন আলগা করতে চাইল,কিন্তু সে আরও গভীরভাবে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। তার শক্ত বাহুর মাঝে ফিওনা ছোট্ট,অসহায় পাখির মতো কেঁপে উঠছিল।
“ছাড়ুন আমাকে!” ফিওনার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।
কিন্তু জ্যাসপার নিঃসাড়, তার দখলদারি স্পষ্ট। সে যেন পুরো ভেনাসকে জানিয়ে দিতে চায়—ফিওনা তার,শুধু তারই।
ফিওনার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিলো। জ্যাসপারের শক্ত বাহু তার চারপাশে শক্ত হয়ে এঁকে বসেছিল, যেন তার অস্তিত্বের দাবিতে পুরো বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
“ছাড়ুন আমাকে, প্রিন্স!” ফিওনা ছটফট করে উঠলো,কিন্তু তার কণ্ঠস্বর কেঁপে গেলো, যেন সে নিজেই নিশ্চিত নয়, সত্যিই কি মুক্তি চায় কিনা।

জ্যাসপারের শ্বাস তার গালে অনুভূত হলো, কণ্ঠস্বর আরও গাঢ় হয়ে উঠলো—
“তোমার হৃদয়ের গহীনে উঁকি দিতে পারি,হামিংবার্ড।তুমি বলতে পারো না,আমার ছোঁয়ায় তোমার মন কেঁপে ওঠেনা।তুমি বলতে পারো না,আমার অস্তিত্ব তোমার শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয় না।”
ফিওনার চোখ বুজে এলো,তার হৃদপিণ্ড এমন বেগে ধকধক করছিলো যে মনে হচ্ছিলো,সে যদি আরেকটু দাঁড়িয়ে থাকে,তাহলে সে নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে।
চারপাশে সবাই জমে গেছে। রাজা জারেন, লিয়ারা, অ্যালিসা, লিউ ঝান—সবাই দমবন্ধ করে দেখছিলো এই দৃশ্য। লিউ ঝানের চোখ ক্রোধে ধূসর হয়ে উঠছিলো,কিন্তু সে অসহায়।
ফিওনা ধীর কণ্ঠে বললো,”ভালোবাসা জোর করে হয় না,প্রিন্স।এটা অর্জন করতে হয়,ছিনিয়ে নেওয়া যায় না।”
জ্যাসপার হাসলো, এক তিক্ত বিদ্রূপে ভরা হাসি।
“ভালোবাসা?আমি জানি না ভালোবাসা কী,ফিওনা।কিন্তু জানি, তোমাকে ছাড়া আমি পূর্ণ নই। জানি, তোমাকে হারালে আমি নিজেকেও হারাবো।”

তার কণ্ঠে ছিল এক অসম্ভব আকুতি,একরোখা দাবি।
ফিওনা চোখ বন্ধ করলো,নিঃশ্বাস ফেললো ধীরে,তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বললো—
“তাহলে শিখুন,প্রিন্স ভালোবাসা কী,তা শিখুন।আমি আপনার ক্রীতদাস নই,আমি আপনার বন্দিনী নই।আমি আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেবো,আপনি নন!”
এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেলো। বাতাস থমকে গেলো,নক্ষত্রেরা যেন অপেক্ষা করলো পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য।
জ্যাসপারের চোখে ক্ষণিকের জন্য কিছু একটার ছায়া নেমে এলো—হতবাক,নাকি আহত,বোঝা গেলো না।
ফিওনার দেহ এখনও জ্যাসপারের শক্ত বাহুর মাঝে বন্দী।সে ছটফট করছিল,কিন্তু জ্যাসপারের বাঁধন এতটাই দৃঢ় ছিল যে,মুক্তির কোনো উপায় নেই।তার উষ্ণ শ্বাস ফিওনার কানের কাছে স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছিল,কণ্ঠস্বরে ছিল এক অদ্ভুত মায়াবী গম্ভীরতা,যেন তার প্রতিটি শব্দ হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।
জ্যাসপারের গলা দিয়ে একটা হালকা নিঃশ্বাস বের হলো, তারপর গাঢ় স্বরে ফিসফিস করে বললো—

“ভেনাসের রাজপ্রাসাদে হয়তো আমাদের ভালোবাসার স্থান নেই,হয়তো এ প্রেম বিধানের বিরুদ্ধাচরণ,তবু বলো,আমার বাহুডোরে একবার নিজেকে বিলিয়ে দিলে কি সত্যিই মহাবিশ্ব থমকে যাবে?”
ফিওনার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।তার সমস্ত শরীর কাঁপছিল এই পুরুষের দাবির সামনে,এই অবিনশ্বর দখলদারির সামনে। কিন্তু জ্যাসপার থামলো না,তার কণ্ঠে যেন আকাশভাঙা বজ্র ধ্বনি—
“ভালোবাসা কি নিয়ম মানে?যদি তোমায় নিজের করে নেই,তবে কি সত্যিই দেবতারা রুষ্ট হবে?নাকি তারাও মেনে নেবে যে আমাদের প্রেমের চেয়ে মহৎ কিছু নেই?”
ফিওনার চোখে জল জমে উঠল।এই ড্রাগনের ভালোবাসা এতটাই ভয়ংকর,এতটাই দাবিদার,যে সে জানে—এ থেকে পালানোর পথ নেই।
জ্যাসপার এবার ফিওনার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে আরও গভীর স্বরে বললো—
“ভেনাসের আকাশে যদি আমাদের ভালোবাসার জন্য জায়গা না থাকে,তবে আমি নিজেই এক নতুন আকাশ সৃষ্টি করবো! বলো,তুমি কি আমার পাশে থাকবে?”
ফিওনার ঠোঁট কাঁপছিল।সে কিছু বলতে চাইল,কিন্তু কণ্ঠ আটকে গেলো।
জ্যাসপার এবার ফিওনার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো, তার গভীর সবুজ চোখ ফিওনার চোখে স্থির হয়ে থাকলো, যেন সে ফিওনার আত্মার ভেতর পর্যন্ত দেখছে। তার কণ্ঠস্বর আরেক ধাপ নিচু, আরেক ধাপ গভীর হলো—

“নিয়তির লিখিত বিধান যদি আমাদের বিচ্ছিন্ন রাখে,তবে আমি সে বিধান নিজ হাতে বদলে দেবো!বলো তুমি কি আমার সাথে সেই বিপ্লবে নামতে চাও?”
ফিওনার চোখ বড় হয়ে গেলো। এই পুরুষ… সে নিয়ম ভাঙতে চায়,সে ভাগ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়,শুধু তার জন্য।
কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। কেউ কোনো শব্দ করছিল না।
ফিওনা কি সত্যিই এই ড্রাগনের সাথে সমস্ত সীমানা ভেঙে এগিয়ে যাবে?নাকি সে নিজেই তার ভালোবাসাকে অস্বীকার করবে?
লিয়ারার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।সে দ্রুত এগিয়ে আসতে চাইলে, হঠাৎ আলবিরা তার সামনে এসে দাঁড়াল, ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বন্দুকের নল সরাসরি লিয়ারার কপালে ঠেকিয়ে দিল।
এক মুহূর্তের জন্য পুরো কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
অন্যদিকে,এক ড্রাগন সদস্য রাজা জারেনকে পিছন থেকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।অ্যালিসা আর সিলভা ভয়ে কুঁকড়ে গেছে,নিঃশ্বাস ফেলতেও যেন ভয় পাচ্ছে।থারিনিয়াস আর এথিরিয়ন কক্ষের এক কোণে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

লিয়ারা দম নিয়ে চিৎকার করে উঠল, “জ্যাসপার, তুমি তোমার লিমিট ক্রস করছো!তোমার সাহস কীভাবে হয়? কোন অধিকারে তুমি আমার মেয়েকে স্পর্শ করছো?”
তার কণ্ঠে ছিল প্রচণ্ড রাগ আর অসহায় ক্ষোভ, কিন্তু জ্যাসপারের ঠোঁটের কোণে এক নিষ্ঠুর হাসি খেলে গেল।তার চোখের গভীরে এক দুর্বার আগুন জ্বলছিল,যা কোনো বাধা মানতে জানে না।
লিয়ারার রাগে শরীর কাঁপছিল,কিন্তু আলবিরার বন্দুকের স্পর্শ তাকে এক মুহূর্তের জন্য স্থির থাকতে বাধ্য করল। অন্যদিকে, রাজা জারেনের হাতে শেকল পরানোর মতো কঠিন বাঁধন ছিল সেই ড্রাগন সদস্যরা।অ্যালিসা আর সিলভা কোনায় দাঁড়িয়ে ভয়ে শ্বাস আটকে রেখেছে,যেন সামান্য শব্দ করলেই ঝড় তাদের উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
জ্যাসপার ধীর পায়ে লিয়ারার সামনে এগিয়ে এল।তার চোখে ছিল বিদ্রুপের ঝলক,ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি।মাথা সামান্য কাত করে বলল—

“মাদার-ইন-ল,আপনি কি সত্যিই জানেন না?আপনার মেয়েকে গভীরভাবে স্পর্শ করা অনেক আগেই শেষ। ওহ,অপেক্ষা করুন… হয়তো আপনাকে একটা ছোট ধারণা দেওয়া উচিত!”
তার গলা নীচু হয়ে গেল,যেন প্রতিটি শব্দ আগুনের মতো ছুঁড়ে মারছে।
এতক্ষণেও জ্যাসপার ফিওনাকে এক ইঞ্চি ছাড়েনি।তার বাহুর বাঁধন আরও শক্ত হলো,যেন সে নিজের দাবি প্রমাণ করতেই চায়।ফিওনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
লিয়ারার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল মুহূর্তে।সে বুঝতে পারছিল না,এই ড্রাগনের ঔদ্ধত্যের শেষ কোথায়?
কক্ষের বাতাস থমকে গেল।রাজা জারেন ধমকের স্বরে কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু সেই ড্রাগন সদস্যরা তার বাঁধন আরও শক্ত করলো।
জ্যাসপার এক ঝটকায় ফিওনাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল,তার চোখে ছিল তীব্র এক দাবিদার আগুন। ফিওনার চুল মুঠো করে ধরে সে তার মুখটা সামনের দিকে টেনে আনল,আরেক হাতে গাল চেপে ধরে এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে রইল তার বড় বড় ভয়ভীত চোখের দিকে।
তারপর কোনো সুযোগ না দিয়েই,নিজের দাবিকে অস্বীকার করার সব পথ বন্ধ করে,ফিওনার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।

ফিওনা আতঙ্কে দুই হাত দিয়ে জ্যাসপারকে ধাক্কা দিতে চাইলো,কিন্তু তার শক্তির কাছে যেন একটুও টললো না সে। তার পাঁজর বাঁধা পড়ে গেছে জ্যাসপারের কঠোর বাহুতে, আর চুলের মুঠো ধরে রাখা শক্তিতে সে যেন একটুও নড়তে পারছে না।
ঠিক তখনই, লিউ ঝানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
“জ্যাসপা-র!”
তার কণ্ঠ যেন পুরো প্রাসাদ কাঁপিয়ে দিলো।সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই থারিনিয়াস আর এথিরিয়ন দুই দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ধরে ফেলল,শক্ত করে দু’হাত বাঁধলো। লিউ ঝান ছটফট করছে,কিন্তু তার ব্যান্ডেজ বাঁধা শরীরে শক্তি নেই জ্যাসপারের কবল থেকে ফিওনাকে ছিনিয়ে আনার।
লিয়ারা আর রাজা জারেন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন—তারা এ দৃশ্য সহ্য করতে পারছেন না।
লিউ ঝান রাগে ফুঁসতে লাগল,চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে রইল। তার হৃদয়ে আগুন জ্বলছে,কিন্তু সে কিছুই করতে পারছে না।

আর সেই মুহূর্তে,জ্যাসপারের দখলদারি চুম্বনে ফিওনা অনুভব করলো এক ভয়ঙ্কর সত্য—এ থেকে মুক্তি নেই। জ্যাসপার যা চায়,তা ছিনিয়ে নিতে পিছপা হবে না।
টানা দশ মিনিট পর জ্যাসপার অবশেষে ফিওনার ঠোঁট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল,কিন্তু তার হাতের শক্ত বাঁধন একটুও শিথিল হলো না।ফিওনা ততক্ষণে লজ্জা,অপমান আর ঘৃণায় মাথা নিচু করে ফেলেছে,তার শরীর কাঁপছে,চোখ দুটো জলে ভরে উঠছে।
জ্যাসপার এবার চোখ সরিয়ে লিউ ঝানের দিকে তাকাল, ঠোঁটের কোণে এক ঠান্ডা, নির্মম হাসি খেলল।
“শোন,” তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক অহংকার,”আমার ব্যবহৃত জিনিস আমি কাউকে ভাগ দেই না,এক ফোঁটা ও না।”
তার কথায় পুরো কক্ষ মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
জ্যাসপার এবার আরেক ধাপ এগিয়ে এলো, লিউ ঝানের দিকে তাকিয়ে আরও নিচু স্বরে, আরও নির্মমভাবে বললো—

“আর তুই? তুই কেমন নির্লজ্জ! একজনের ব্যবহার করা জিনিসের দিকে নজর দিস?শোন,তোকে একটা মজার প্রস্তাব দেই… আমার সাথে ল্যাবে চল।
জ্যাসপার একপাশে মাথা কাত করে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বললো,”ভেনাসের বায়োমেট্রিক স্ক্যানার দিয়ে এক সেকেন্ডেই বের করে দেখিয়ে দেই।ফিওনার শরীরের কোষের গভীরে কার ডিএনএ এর ছাপ আছে।”
সে থামলো,ফিওনার দিকে একঝলক তাকিয়ে আবার বললো,”ভেবেছিস,পৃথিবীর সস্তা টেস্ট কিট দিয়ে কিছু লুকানো যাবে?এখানে ক্রোনালিজম স্ক্যান আছে,যা কোষের শেষ আপডেটেড জেনেটিক এনকোডিং দেখায়।তুই নিজেই দেখে নিবি,তার কোষে কার অস্তিত্ব মিশে আছে।”
তার ঠোঁটের কোণে এক ঠান্ডা,বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল।
লিউ ঝান দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে রাখলো,যেন নিজের ক্ষোভের বিস্ফোরণ আটকানোর শেষ চেষ্টা করছে। তার শিরাগুলো ফুলে উঠছে,কিন্তু সে কিছুই করতে পারছে না।
লিয়ারা,রাজা জারেন, অ্যালিসা—সবাই স্তব্ধ।
আর ফিওনা?তার মনে হলো, সে যেন এক দুঃস্বপ্নের মাঝে আটকে গেছে, যেখানে মুক্তির কোনো পথ নেই।
রাজা জারেনের কণ্ঠ কঠোর হয়ে উঠলো।

“জ্যাসপার,তুমি এতটা অসভ্য আর বেয়াদব হতে পারো,তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি!তোমার বাবা,ভেনাসের কিং ড্রাকোনিস,এমন এক সন্তান জন্ম দিয়েছে,যে নিজের রক্তের ঐতিহ্য ভুলে গেছে?তুমি ভেনাসের প্রিন্স হয়ে এভাবে কথা বলতে লজ্জা করলো না?”
জ্যাসপার তখন হেসে উঠলো, ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের ছাপ।
“ওহ, আঙ্কেল-ইন-ল…! আপনি তো মনে হচ্ছে একটু বেশি মুখ চালাচ্ছেন আজ!আমার স্বভাবের ব্যাপারে তো আপনি জানতেনই না,তাই এখন দেখে নিন। “আমি জন্ম থেকেই এমন, শুধু আপনার দেখার সুযোগ হয়নি আগে। কিন্তু এখন দেখছেন, এটাই আমার আসল রূপ!”
তার চোখে আগুনের মতো দখলদারি, অথচ ঠাণ্ডা তীক্ষ্ণ হাসি যেন ধারালো ছুরির মতো কেটে দিচ্ছে রাজা জারেনের মর্যাদার গর্ব।
জ্যাসপার ঠাণ্ডা হেসে লিউ ঝানের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলো, যেন তার প্রতিটি শব্দে তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ লুকিয়ে আছে।

“তোকে আমি চাইলে কালকেই শেষ করে দিতে পারতাম,” জ্যাসপার ফিসফিস করে বললো, লিউ ঝানের গায়ে হালকা ঝুঁকে। “কিন্তু তুই এখন সামান্য একটা মানব,আর দুর্বল! তোর মতো একটা অপূর্ণ শক্তির জীবকে মেরে আমি আমার ইমেজ নষ্ট করতে চাই না।” সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, ঠোঁটের কোণে সামান্য তাচ্ছিল্যের ছাপ। “তুই আগে তোর আসল ফর্মে আয়, তারপর দেখা হবে।”
লিউ ঝান নির্ভয়ে জ্যাসপারের চোখে চোখ রাখলো, তার গলায় ছিলো অটল দৃঢ়তা।
“কে বলেছে আমি সাধারণ? কে বলেছে আমি দুর্বল?” তার কণ্ঠস্বর ছিলো অবিচল, যেন এক অদৃশ্য শক্তি তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। “প্রিন্স, দুর্বলতা কাকে বলে তুমি জানো? দুর্বলতা হচ্ছে যার চোখে ভয় থাকে। যার হাত শক্তিশালী, কিন্তু মন দুর্বল—সেই সত্যিকারের দুর্বল!”
লিউ ঝান এক পা এগিয়ে এলো, এতক্ষণ বন্দী থাকা সত্ত্বেও তার শরীরের প্রতিটি পেশিতে আত্মবিশ্বাস টানটান হয়ে উঠলো। “দেখো আমি তোমার চোখে চোখ রেখে কথা বলছি, জ্যাসপার। আমার চোখে কোনো ভয় দেখতে পাচ্ছো?”
কক্ষের বাতাস মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠলো, দুজনের দৃষ্টির লড়াইয়ে যেন বিদ্যুৎ ঝলকাচ্ছে। বাইরে বজ্রপাত হলে হয়তো এমনই শোনাতো, কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল জ্যাসপারের চোখের গভীরে জমে থাকা দখলদারির দাবানল আর লিউ ঝানের অনড় প্রতিরোধ।
জ্যাসপার ফিওনার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক বিদ্রুপের হাসি টেনে বললো, “তুমি কি দেখে ওই জন্মে একটা পাতি সেনাপতিকে ভালোবেসেছিলে, হামিংবার্ড?” তার গলায় ছিল অবজ্ঞা, কিন্তু চোখে জ্বলছিলো ঈর্ষার অগ্নিশিখা।

লিউ ঝান এবার নিজেই উত্তর দিলো, গলা শক্ত রেখে বললো, “তোমার বোধহয় ধারণা নেই, এই ‘পাতি’ সেনাপতি তখন কোন কোন যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলো। আর তুমি ভাবছো আমি এখনো সেই সাধারণ হিউম্যান?তুমি কি সত্যিই এতটা অন্ধ?” সে এক পা এগিয়ে এলো, চোখে ছিল দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। “আর হ্যাঁ,ভেবে দেখো,ফিওনা যখন তোমার মতো এক অহংকারী প্রিন্সকে রেখে আমাকে ভালোবেসেছিল,তখন সেটা কি বোঝায়?বোঝায় যে সে তোমাকে ভালোবাসেনি কখনোই।”
জ্যাসপারের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেলো।তার মুখ কঠোর হয়ে উঠলো,চোখের শিরাগুলো ফুলে উঠলো রাগে।বাতাস যেন থমকে গেলো, চারপাশের সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেললো।
এক ঝটকায় পাশে থাকা একটা ফুলদানি তুলে নিয়ে লিউ ঝানের মাথায় ছুঁড়ে মারতে গেলো,কিন্তু ঠিক শেষ মুহূর্তে থেমে গেলো।তার নড়াচড়া এত দ্রুত ছিলো যে,লিউ ঝান ছাড়া বাকিরা ধাক্কা খেয়ে পেছনে সরে গেলো।
লিউ ঝান কিন্তু এক চুল নড়েনি,তার চোখে কোনো ভয় ছিল না—এটাই যেন জ্যাসপারকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুললো।

“ইউ বা*স্টার্ড!” জ্যাসপার গর্জে উঠলো, হাতের শক্তি সংবরণ করতে না পেরে ফুলদানিটা ধরে পাশের পিলারের দিকে ছুঁড়ে মারলো। এক বিকট শব্দে সেটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো, কাচের টুকরোগুলো ছিটকে পড়লো মেঝেজুড়ে।
ফিওনা কেঁপে উঠলো,বাকিরাও শঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
কক্ষের পরিবেশ এতটাই উত্তেজনায় ঠাসা ছিল যে, মনে হচ্ছিল এখান থেকে আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটতে দেরি নেই।
জ্যাসপারের মাথার ভেতর লিউ ঝানের সেই কথা বারবার প্রতিধ্বনি হতে লাগলো—
“তোমাকে ভালোবাসেনি।”
তার শিরাগুলো টান টান হয়ে উঠলো, শ্বাস ভারী হয়ে এলো। এই শব্দগুলো যেন তার অস্তিত্বকে আঘাত করছিল, যেন কেউ তার বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে হৃদয়টা মুঠো করে চেপে ধরেছে। রাগে চোখ ধূসর হয়ে উঠলো, আশেপাশের সবকিছু ভেঙে ফেলার তীব্র তাড়না অনুভব করলো। সে আরেকটি ফুলদানি তোলার জন্য হাত বাড়াতেই—

একজোড়া কোমল হাত তার কবজি চেপে ধরলো।
জ্যাসপার হতচকিত হয়ে পিছনে ফিরে তাকালো। ফিওনা।
তার চোখ পানিতে ভিজে গেছে, মুখটা লালচে, ঠোঁট কাঁপছে। কিন্তু হাতটা শক্ত করে জ্যাসপারের হাত ধরে রেখেছে।
সেই মুহূর্তে যেন ঝড় থেমে গেলো।
জ্যাসপার তাকিয়ে থাকলো ফিওনার চোখে, যেখানে রাগ নেই, নেই কোনো অভিযোগ—শুধু একটা গভীর আবেদন, যেন বলতে চাইছে—”থামো, আর কোরো না।”
জ্যাসপার নিঃশ্বাস নিলো ধীরে, রাগের আগুন এক নিমিষেই নিভে গেলো।
পরের মুহূর্তেই সে ফিওনাকে হঠাৎই নিজের বুকের বাঁ পাশে জাপটে ধরলো। তার শক্ত বাহুর মধ্যে ফিওনা ক্ষুদ্র, ভগ্ন, কিন্তু উষ্ণ।
“হামিংবার্ড…” জ্যাসপার ফিসফিস করে বললো, “দেখো, এখানে কান পেতে শোনো। আমার হৃদস্পন্দন কী বলছে, বলো তো?”
ফিওনা বাধ্য হয়ে কানের পাশটা তার বুকের সঙ্গে ঠেকালো।
ধুক… ধুক… ধুক…

অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে চলছে জ্যাসপারের হৃদস্পন্দন।
ফিওনার চোখের পাতা কেঁপে উঠলো। তার হাত এখনও জ্যাসপারের ব্লেজার শক্ত করে ধরে আছে, যেন নিজেকে ছাড়াতে চাইছে, কিন্তু শরীর অনড়।
জ্যাসপার গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিলো, মুখটা ফিওনার চুলের কাছে নামিয়ে বললো, “এটা কি তোমাকে কিছু বোঝাচ্ছে না?”
ফিওনা কোনো উত্তর দিলো না, শুধু চোখ বন্ধ করলো। কারণ সে জানে, তার নিজের হৃদস্পন্দনও একদম একই ছন্দে বাজছে।

জ্যাসপার ফিওনার মুখটা দু’হাতে শক্ত করে ধরে রাখলো, তার সবুজ চোখে একটা স্থির সিদ্ধান্তের ছাপ। ফিওনার ঠোঁট কাঁপছিল,সে কিছু বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু জ্যাসপার কোনো সুযোগ দিলো না।
“আমি এখন যাচ্ছি,” তার কণ্ঠ গভীর, দৃঢ়,”তবে খুব তাড়াতাড়ি সবকিছু গুছিয়ে তোমাকে নিতে আসবো, একবারের জন্য আমার কাছে।”
তার আঙুলগুলো ফিওনার গালের ওপর আরও একটু চেপে বসলো,যেন তাকে পুরোপুরি নিজের মধ্যে বন্দি করে রাখতে চাইছে।
“বি রেডি, হামিংবার্ড।”
ফিওনার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠলো, সে কিছু বলতে যাবে, কিন্তু জ্যাসপার আবার থামিয়ে দিলো।
“আর হ্যাঁ,” এবার তার কণ্ঠে একটা হালকা শাসানি মিশে গেলো, “তুমি এখানে থাকছো বলে ভুলেও ওই পাতি সেনাপতিটাকে নিজের কাছে আসতে দেবে না। ও যেন তোমাকে স্পর্শ না করে—এক ফোঁটাও না। আমি বলে দিলাম।”

তার চোখের আগুন ফিওনার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নামিয়ে দিলো।
তারপর, কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই, জ্যাসপার হঠাৎই সরে গেলো, এক ঝটকায় নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলো ফিওনার কাছ থেকে।
ফিওনা নিঃশ্বাস ফেললো ধীরে, বুঝতে পারলো—জ্যাসপার চলে যাচ্ছে। তবে বেশি সময়ের জন্য নয়।
সে ফিরে আসবে।খুব তাড়াতাড়ি।
জ্যাসপার ধীর পায়ে লিউ ঝানের দিকে এগিয়ে গেলো। তার চোখে খেলা করছিল ঠান্ডা উপহাস। বিছানার পাশে রাখা ফলের প্লেট থেকে একটা লাল টুকটুকে আপেল তুলে নিলো, তারপর সেটায় আলতো করে এক কামড় বসিয়ে নিলো। আপেলের রস তার ঠোঁটের কিনার ছুঁয়ে গেলো,কিন্তু সে পরোয়া করলো না,বরং আরও স্বাচ্ছন্দ্যে চিবোতে লাগলো।
তারপর এক মুহূর্ত থেমে লিউ ঝানের দিকে তাকিয়ে বললো, “ওহ সরি, তুই তো এখন অসুস্থ, দুর্বল। এই আপেলটা তোর কাজে লাগবে।”
সে আরও এক কামড় খেলো, তারপর হঠাৎই একটা নাটকীয় ভঙ্গিতে হাসলো।
“আসলে তোর তো আমার ব্যবহার করা জিনিসের দিকে হাত বাড়াতে বেশ আনন্দ লাগে, তাই না?”
জ্যাসপার খুব ধীরগতিতে আপেলটা লিউ ঝানের সামনে রেখে দিলো।
“এই নে, আমার ব্যবহৃত জিনিসের স্বাদ নিতে তোর এত শখ, এটা রেখে দিলাম। তোর নিশ্চয়ই খুব প্রয়োজন হবে। খেয়ে নিস।”

তার ঠোঁটের কোণে একপাশে তাচ্ছিল্যের হাসি লেগেই রইলো। লিউ ঝান চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো, কিন্তু তার চোখের আগুন বলে দিচ্ছিলো—সে এই অপমানের হিসাব রাখছে, প্রতিটা শব্দ গেঁথে নিচ্ছে নিজের মধ্যে।
জ্যাসপার হনহন করে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো, তার দীর্ঘ ছায়া মেঝেতে বিস্তৃত হচ্ছিল। চোখে ছিলো প্রবল দম্ভ, আর ভেতরে কিছুর মোচড়, যা সে দেখাতে চায়নি। তার পেছন পেছন এথিরিয়ন,থারিনিয়াস, আর বাকি ড্রাগন সদস্যরা চুপচাপ অনুসরণ করলো। তাদের ভারী পায়ের শব্দ কক্ষে প্রতিধ্বনিত হলো, যেন এক রাজকীয় বিদায়ের সংকেত।
ফিওনা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। চোখের কোনায় অশ্রুর কোলাহল, কিন্তু ঠোঁট শক্ত, অনুভূতিগুলো জড়িয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত টানাপোড়েনে।
ঠিক তখনই, লিয়ারা ছুটে এলো ফিওনার দিকে। তার চোখে উদ্বেগ, শঙ্কা, আর ভালোবাসার এক বিশুদ্ধ ছাপ। সে কোনো দ্বিধা না করেই ফিওনাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিলো, যেন এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সমস্ত আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠাকে সরিয়ে দিতে চায়।
“ফিওনা! আমার মেয়ে, তুমি ঠিক আছো তো?” লিয়ারার কণ্ঠ কাঁপছিল, যেন এক মায়ের ভয়ানক দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে ওঠার পর প্রথম আর্তনাদ।
ফিওনা কিছু বললো না, শুধু নিঃশব্দে মায়ের উষ্ণ আলিঙ্গনে নিজেকে সঁপে দিলো। তার শরীরটা হালকা কাঁপছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে মায়ের স্নেহই ছিলো তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

তারপর একে একে সবাই কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো। অ্যালিসার রাগ তখনো কমছে না। সবাই চলে যাওয়ার পর শুধুমাত্র কক্ষে রয়েছে লিউ ঝান আর ফিওনা। অনেকক্ষণ নীরবতার পর ফিওনা লিউ ঝানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি ঠিক আছেন?”
লিউ ঝান মাথা নাড়লো। ফিওনা তখন আবার বললো, “সরি, আসলে আমার কিছু মনে নেই। পৃথিবীতে থাকতে আমার আর এই প্রিন্সের মধ্যে কী হয়েছিল?”

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৩

লিউ ঝান তখন ফিওনাকে থামিয়ে দিলো, “হুশশ, ইটস ওকে। এখানে তোমার কোনো দোষ নেই, তুমি তো আর জানতেই না আমাদের আগের জন্মের কথা। যা হয়েছে, হয়েছে। সেটা পাস্ট, এখন বর্তমান ভাবো। এই থেরন যে বর্তমানে প্রিন্স জ্যাসপার, ও কিন্তু কিছু না কিছু পরিকল্পনা করবে। আগের জন্মের মতোই ফাঁদ পাতবে আমাদের। তার আগেই এমন কিছু করতে হবে, যাতে ও তোমাকে কোথাও নিয়ে যেতে না পারে।”
ফিওনা চুপ করে আছে। ফিওনা নিজেও বুঝতে পারছে না, আসলে করবে তো করবেটা কী?

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৪ (২)