Home আযদাহা সিজন ২ আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৫

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৫

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৫
সাবিলা সাবি

দশ দিন কেটে গেছে।…….
সেই ভ্যালেন্টাইন ডের রাতে জ্যাসপার এসেছিল, তারপর থেকে আর তাকে কেউ দেখেনি।পুরো রাজপ্রাসাদ যেন এক নিঃশব্দ জগৎ হয়ে উঠেছে। আকাশের চাঁদ যেমন পূর্ণিমার পর অমাবস্যার অন্ধকারে হারিয়ে যায়,ঠিক তেমনই জ্যাসপারও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।কেউ জানে না সে কোথায়, কবে ফিরবে,আদৌ ফিরবে কিনা।
ফিওনা কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না,কিন্তু তার ভিতরটা যেন শূন্য হয়ে আছে।বুকের মধ্যে কোথাও যেন এক ধরণের টান অনুভব করছে,যা সে নিজেও ব্যাখ্যা করতে পারছে না।জ্যাসপার কেন এভাবে হঠাৎ চলে গেল?এতদিন ধরে কেন কোনো খোঁজ নিলো না?সে কি সত্যিই চলে গেছে,নাকি কোনো নতুন পরিকল্পনা আঁটছে?
এদিকে,লিউ ঝান যেন এই সুযোগটাই চাইছিল।সে জানে,জ্যাসপার যদি আবার ফিরে আসে,তাহলে ফিওনাকে নিয়ে সে আবার নতুন কোনো ফাঁদ পাতবে। তাই লিউ ঝান দ্রুত কিছু একটা করতে চাচ্ছে।

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে রাজপ্রাসাদের বাগানটা যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে।বিশাল বড় ফ্লোরাল ল্যাম্পগুলো মৃদু আলো ছড়াচ্ছে,চারদিকে অদ্ভুত সুন্দর ফুল ফুটে আছে,বাতাসে মিশে আছে এক মোহময় সুগন্ধ।
ফিওনা একা একা হাঁটছে।গাঢ় সবুজ ঘাসের ওপর তার নরম পা দুটো পড়ার সাথে সাথে যেন ভেনাসের সব আবেগ তার দিকে এগিয়ে আসছে।হঠাৎ পেছন থেকে লিউ ঝানের কণ্ঠ শুনে ফিওনা চমকে উঠল।
“তোমার কি মনে হয়,জ্যাসপারের নিরুদ্দেশ হওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে?আমার মনে হচ্ছে,ও আবার নতুন কোনো পরিকল্পনা করছে!” লিউ ঝানের কণ্ঠে ছিল সতর্কতা।
ফিওনা কিছু না বলে সামনে তাকিয়ে রইল।তার মুখভর্তি দ্বিধা।
লিউ ঝান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। “আমাদের কিছু একটা করতেই হবে,ফিওনা।দেবতা আভ্রাহার পরামর্শ দিয়েছেন— যত দ্রুত সম্ভব আমাদের বিয়ে করতে হবে। এতে জ্যাসপার তোমাকে আর দাবি করতে পারবে না।”

ফিওনা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকল।
“বিয়ে?” তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। “কিন্তু…”
“কোনো কিন্তু নয়,ফিওনা।” লিউ ঝান তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “এটাই একমাত্র উপায়।জ্যাসপার হলো থেরনের পুনর্জন্ম।তার ভালোবাসা মানেই ধ্বং*স।আর আমাদের ভালোবাসা মানে সুরক্ষা।তুমি কি বুঝতে পারছো না?”
ফিওনার হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে লাগল।তার পুরো শরীর যেন থরথর করে কাঁপছিল।

ফিওনার মা লিয়ারা দেবতা আভ্রাহার প্রাসাদে গিয়েছিলেন পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য।
দেবতা আভ্রাহার গভীরভাবে চিন্তা করে বললেন, “ফিওনা আর লিউ ঝানের বিয়ে অবশ্যই ভেনাসের মাটিতেই দিতে হবে।এতে জ্যাসপার আর কিছু করতে পারবে না।”
লিয়ারা রাজপ্রাসাদে ফিরে এসে রাজা জারেনকে জানালেন।সিদ্ধান্ত হলো,তিন দিনের মধ্যে ফিওনা ও লিউ ঝানের বিয়ে হবে।

রাত গভীর হয়েছে।পুরো প্রাসাদ নিস্তব্ধ।ফিওনা তার কক্ষে বসে আছে।জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে।
অন্ধকার আকাশের মাঝে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা— পৃথিবী।
সেখানে তাকিয়েই ফিওনা ভাবছে— “জ্যাসপার কোথায়?সে কি ইচ্ছে করেই এতোদিন আসছে না, নাকি সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছে সে?”
তারপর তার চোখ পড়ল হাতে থাকা ব্রেসলেটটির দিকে।সেই ব্রেসলেট,যা জ্যাসপার তাকে ভ্যালেন্টাইন ডেতে দিয়েছিল,যা এখনো তার হাতে চকচক করছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফিওনা।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছে,কিন্তু কেন যেন তার ভিতরে কোথাও শূন্যতা কাজ করছে।
এই শূন্যতা কি জ্যাসপারের জন্য?নাকি নিজের ভাগ্যকে নিয়ে সংশয়ের জন্য?
কোথায় আছে জ্যাসপার?সে কি সত্যিই ফিরে আসবে?
নাকি এটাই সত্যি,যে জ্যাসপার আর ফিরবে না?
ফিওনার হৃদয়ে দোটানা চলতে থাকল।একদিকে জ্যাসপারের দেওয়া ব্রেসলেট—যা তার ভেতরে কিছু একটা অনুভুতি জন্ম দিচ্ছে —আর অন্যদিকে কঠোর বাস্তবতা,যা তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে জ্যাসপার আসলে অতীতের থেরন।

নিয়তি সবকিছুর ওপরে।অতীতে জাইরন আর এলিজিয়ার প্রেমে এক ভয়ংকর মহাপ্রলয় ডেকে এনেছিল থেরন,আর তাই সৃষ্টিকর্তা তাদের নতুন করে সৃষ্টি করেছিলেন,দুই ভিন্ন গ্রহের দুই ভিন্ন জীব হিসেবে,যেন থেরন কখনো তাদের মাঝে না আসতে পারে।তাহলে কেন জ্যাসপার আবার ফিরে এসেছিলো?কেন তাকে এবার সেই ভয়ংকর প্রেমের আকর্ষণে দিয়ে ফিওনাকে দোটানায় ফেলতে চাইছে?
ফিওনা বুঝতে পারল,যদি সে জ্যাসপারকে মেনে নেয়, তাহলে হয়তো ইতিহাস আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে,হয়তো আবার মহাপ্রলয় আসবে।
ফিওনা গভীর নিশ্বাস নিয়ে মৃদু কন্ঠে বলল,”আমি ঠিক কাজটাই করেছি,আমাকে দ্রুত লিউ ঝানকে বিয়ে করতে হবে।প্রিন্স আপনি যতোই আমাকে জোর করে হাসিল করার চেষ্টা করেন না কেনো,আমাদের এক হওয়া সম্ভব নয় এই জনমেও।”
ফিওনা আর কিছু ভাবলো না,শুধু চোখ বন্ধ করল।এই যুদ্ধটা তার হৃদয়ের,কিন্তু সে জানে—সে যদি নিজের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে,তবে হয়তো আবার এক ভয়ংকর পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে পৃথিবী,ভেনাস,আর তার ভালোবাসা……..

মাঝে আরও তিনদিন পেরিয়ে গেছে।আজকের দিনটা অন্যসব দিনের চেয়ে আলাদা,কারণ আজ ফিওনার বিয়ে।তবে এই বিয়ে হবে চুপিসারে,কারও চোখে পড়লে বিপদ আসতে পারে।তাই দেবতা আভ্রাহার আর লিউ ঝানের নির্দেশে এই বিয়ে হবে দেবতা আভ্রাহারের প্রাসাদে,যেখানে খুব কম সংখ্যক মানুষ উপস্থিত থাকবে।
প্রাসাদজুড়ে আজ এক অদ্ভুত নীরবতা।সাধারণত বিয়ের দিনে যে হাসি-আনন্দ,উচ্ছ্বাস থাকে,আজ তার কিছুই নেই।যেন এই বিয়ে কোনো উৎসব নয়,বরং এক যুদ্ধের পূর্ব প্রস্তুতি।
লিউ ঝান ইতিমধ্যে বর সাজা প্রায় শেষ করেছে। সাদা-সোনালি রঙের পোশাকে সে যেন এক রাজপুত্রের মতো লাগছে।তবে তার মুখে একরকম চাপা উত্তেজনা আর অজানা আশঙ্কা।সে জানে,এই বিয়ে শুধুমাত্র ফিওনাকে নিরাপদে রাখার জন্য,কিন্তু তার হৃদয়ের কোথাও একটা আশা রয়ে গেছে— হয়তো একদিন ফিওনাও তাকে আগের জন্মের মতোই ভালোবাসবে অনেক।
অন্যদিকে,ফিওনাকে সাজাতে এসেছে এক দক্ষ বিউটিশিয়ান।তার সাজগোজ শুরু হলেও,সে বারবার আয়নায় নিজেকে দেখছে।

সিলভা,লিয়ারা,আর অ্যালিসা শুধু ফিওনার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।লিয়ারার চোখে অদ্ভুত এক মায়া, একদিকে সে আনন্দিত যে তার মেয়ে নতুন জীবনে পা রাখতে চলেছে,আবার অন্যদিকে তার বুক কাঁপছে— এই বিয়ে কি সত্যিই সুরক্ষার প্রতীক,নাকি আরও বড় কোনো বিপদের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে ফিওনা?
অ্যালিসা মুখে কিছু বলছে না,কিন্তু তার চোখ দুটো আনন্দিত।সে জানে,ফিওনার বিয়ে মানে জ্যাসপারের জন্য তার দরজা খোলা হয়ে যাবে।সে জানে,ফিওনার জন্য হয়তো জ্যাসপার কিছুদিন পাগলামি করবে কিন্তু একটা সময় তাকে মেনে নিবে জ্যাসপার।
ফিওনা আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করলো— সত্যিই কি সে সঠিক কাজ করছে?
ঠিক তখনই এক ঝোড়ো বাতাস জানালার পর্দা উড়িয়ে দিলো।ফিওনার মনে হলো,যেন কেউ তাকে ডাকছে.।

দেবতা আভ্রাহারের প্রাসাদ বিশাল,জ্বলজ্বল করছে এক সোনালি আভায়।চারপাশে নীলাভ শিখার মতো এক অদ্ভুত আলো জ্বলছে,যা দেবতার উপস্থিতি বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।লিউ ঝান,রাজা জারেন ও অন্যান্য রাজপরিবারের সদস্যরা একে একে প্রাসাদে প্রবেশ করল।প্রত্যেকের চেহারায় গম্ভীরতা আর উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট।
দেবতা আভ্রাহারের সামনে মাথা নিচু করে সবাই দাঁড়ালো।তিনি দীর্ঘক্ষণ কারও মুখে কিছু বলার সুযোগ দিলেন না,যেনো সকলের হৃদয় পড়ে নিচ্ছেন।কিছুক্ষণ পর গভীর কণ্ঠে বললেন,
— “তোমরা এসেছো নিয়তির চাকা ঘুরিয়ে দিতে?”
রাজা জারেন এক পা এগিয়ে এসে বললেন,
— “দেবতা আভ্রাহার,আমরা এসেছি সত্য জানতে,এবং ফিওনাকে তার প্রকৃত পথ দেখাতে।আপনি যা নির্দেশ দেবেন,আমরা তা মান্য করব।”
আভ্রাহার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “নিয়তি পরিবর্তন করা সহজ নয়,আর অতীতের স্মৃতি ফিরে আসা মানেই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি।ফিওনাকে রক্ষা করতে চাইলে তাকে তার ভাগ্যের পথেই হাঁটতে দিতে হবে।”
লিউ ঝান এতক্ষণ ধরে চুপ করে থাকলেও এবার মুখ খুলল,
— “কিন্তু যদি তার ভাগ্য তাকে আবারও বিপদের দিকে ঠেলে দেয়,যদি সেই প্রাচীন মহাপ্রলয় আবার ফিরে আসে?”
আভ্রাহার এবার গম্ভীর হয়ে তাকালেন,
— “তাহলে তাকে বেছে নিতে হবে—ভালোবাসা,না কি ধ্বং*স।”

ফিওনাকে নিয়ে যাবে লিয়ারা,সিলভা ও অ্যালিসা
অন্যদিকে,ফিওনা তখনো জানে না কী অপেক্ষা করছে তার জন্য।সে এখনো জ্যাসপারের দেওয়া ব্রেসলেটের দিকে তাকিয়ে আছে,তার অতীতের স্মৃতির ভাঙ্গা টুকরোগুলো একত্র করার চেষ্টা করছে।
লিয়ারা চলে গেলেন ফিওনার জন্য কিছু খাবার আনতে আর অ্যালিসা নিজের ড্রেস ঠিক করতে বের হলো। কক্ষে এখন শুধু বিউটিশিয়ানরা আর সিলভা। বিউটিশিয়ানরা ফিওনাকে সাজাতে ব্যস্ত,তাদের কাজের মধ্যে বেশ কিছু টান টান উত্তেজনা আছে। ফিওনার মনে বিভিন্ন অনুভূতি জাগ্রত হচ্ছে,কিন্তু সেগুলোকে চাপা রাখতে সে চেষ্টা করছে।
সিলভা ফিওনার পাশে এসে দাঁড়াল।তার চোখে একটি সদা উজ্জ্বল দৃষ্টি ছিল। “ফিওনা,আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।হয়তো আগে আমি তোমাকে দেখতে পারতাম না,কিন্তু এখন তুমি আমার বোন।বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন।একবার জুড়ে গেলে আর পেছনে ফিরতে পারবে না।তাই,একবার ভেবে দেখো।তোমার মন যা বলে,তাই করো।মনের বিরুদ্ধে যেও না।”
ফিওনা চুপ করে শুনল,তার মনে নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।সিলভা তার কথাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নিল। বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে সে দ্বিধায় ছিল,কিন্তু সিলভার কথাগুলো তাকে ভাবিয়ে তুলল।
সিলভা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল,হঠাৎ অ্যালিসা ডাকলো সিলভাকে।সিলভা দ্রুত চলে গেলো।কক্ষের মধ্যে শুধুমাত্র বিউটিশিয়ানরা ছিল,যারা ফিওনাকে সাজানোর কাজ করছিল।
এরই মধ্যে প্রাসাদের বাইরে একটি মিউজিক্যাল অর্কেস্ট্রা শুরু হয়েছে,যা রাজ পরিবারের বিয়েতে বিশেষ পরিবেশ তৈরি করেছে।

সুরের তালে তালে প্রাসাদে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে।মিউজিক্যাল অর্কেস্ট্রা বাজতে শুরু করতেই চারপাশের সবাই অবাক হয়ে যায়।বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল,কিন্তু এমন সুরের আগমন তাদের মনকে টেনে নেয়।অর্কেস্ট্রার সুরে চারপাশে একটা উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়েছে।বিভিন্ন ধরনের সুরেলা যন্ত্র বাজানো হচ্ছে।সুরেলা গিটার বাজানো হচ্ছে,যা প্রতিটি সুরে আনন্দ আর স্নিগ্ধতা নিয়ে আসছে।ভায়োলিনের টানেল সুর যেন হৃদয়কে ছুঁয়ে যাচ্ছে,আর পিয়ানোর হালকা সুর মৃদু বাতাসের মতো তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
লিয়ারা,যিনি পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দ্রুত বাইরে এসে উপস্থিত হন,কঠোরভাবে তাদের জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কারা?কে পাঠিয়েছে তোমাদের?”
সঙ্গীতজ্ঞরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে,তবে তাদের মধ্যে একজন সাহস করে বলে,”রাজার আদেশে আমরা এসেছি।রাজা জারেন আমাদের পাঠিয়েছেন। আমরা ব্রাইডকে নিয়ে যেতে এসেছি,আর সঙ্গে সঙ্গে থাকব।”

লিয়ারা কিছুক্ষণ চিন্তা করে।তিনি বুঝতে পারেন যে, রাজা জারেনের আদেশ অমান্য করা সম্ভব নয়।তবে লিয়ারা কিছু বলেন না।তার মনে ছিল,এই মুহূর্তে সুরের চেয়ে কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সঙ্গীতজ্ঞদের পোশাকের দিকে তাকিয়ে লিয়ারা আরো অবাক হন।সবাই সাদা রঙের পোশাক পরিহিত,যেন রাজকীয় পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তৈরি করা হয়েছে।কিন্তু সেই মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী উপস্থিতি চোখে পড়ে।একজন সঙ্গীতজ্ঞ,যার হাতে গিটার,সে সম্পূর্ণ কালো হুডি পরিধান করেছে।তার মাথায় হুডি, চোখে চশমা,আর মুখে মাস্ক রয়েছে।
গিটার বাজানোর সময় তার অঙ্গভঙ্গি আর সুর যেন অন্যরকম কিছু বুঝিয়ে দেয়।এ যেন একটি রহস্যময় ব্যক্তিত্ব,যিনি সাদা পোশাকের মধ্যে কালো রঙের ছোঁয়া এনে দিয়েছে।
“এই সুরগুলো কোথা থেকে আসছে?” ফিওনা অবাক হয়ে ভাবতে লাগল,একদিকে অর্কেস্ট্রার সুরে তার হৃদয়কে শান্তি এনে দিচ্ছে,অন্যদিকে জ্যাসপারের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
অর্কেস্ট্রার সুরগুলো রাজপ্রাসাদকে ঘিরে এক আলাদা জাদু তৈরি করেছে,যেন সারা ভেনাস থেকে আসা সমস্ত প্রেমের গল্প এই মুহূর্তে একত্রিত হয়ে একটি সুরে রূপ নিয়েছে।সিলভা ও অ্যালিসা এই সুর শুনে আনন্দিত হয়ে ওঠে,আর তাদের চোখে-মুখে এক বিশেষ উল্লাসের ছাপ দেখা যায়।

ফিওনাকে ইতিমধ্যে বিউটিশিয়ানরা সাজিয়ে দিয়ে গেছে।তার পরনে ভেনাসের নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের জন্য তৈরি বিশেষ গাউন—একটা স্বপ্নের মতো কিছু,যা পৃথিবীর পোশাকের সংজ্ঞাকেও হার মানাবে।সে এখন দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে,কিন্তু নিজের প্রতিচ্ছবিটা যেন ঠিক চিনতে পারছে না।
ফিওনার গাউন সাদা রঙের,কিন্তু সাধারণ সাদা গাউন নয়—চাঁদের আলো আর নক্ষত্রদের আভা মিশিয়ে তৈরি,যেন গাউনটা নিজের মধ্যেই একধরনের মৃদু জ্যোতি ছড়াচ্ছে।গাউনের নিচের অংশ স্বচ্ছ ,হাঁটার সময় মনে হচ্ছে সে কোনো মেঘের উপর ভাসছে।যখন ফিওনা নড়ে,তখন সেটা আলোর প্রতিফলনে একবার রূপালি,একবার নীলাভ হয়ে ওঠে,ঠিক যেন রাতের আকাশে নক্ষত্রদের আনাগোনা।
তার বাদামি চুল খোলাই রেখেছে,কিন্তু বাতাসে ওজনহীনভাবে উড়ছে,যেন মহাকাশের শূন্য অভিকর্ষে রয়েছে।চুলের মধ্যে দেয়া হয়েছে রূপালি ক্রিস্টালের টুকরো,যা নড়লেই ক্ষীণ আলো বিচ্ছুরিত করছে,ঠিক যেন নক্ষত্রপুঞ্জ।

গলায় পড়ানো হয়েছে একটা বিশেষ নেকলেস,যা শুধুমাত্র ফ্লোরাস রাজপরিবারের প্রিন্সেস ব্রাইডাদের দেওয়া হয়।সেটি তৈরি হয়েছে “লুমিনা স্টোন” দিয়ে,যা ভেনাসের এক রহস্যময় খনিজ,চাঁদের আলোয় সেটি একবার জ্বলজ্বল করে ওঠে।
মেকআপখুবই ন্যাচারাল,কিন্তু চোখের কোণায় দেয়া হয়েছে নীলাভ রঙের একধরনের আভা,যা পৃথিবীর কেউ আগে কখনও দেখেনি।তার চোখের কাজল দেয়া হয়েছে রূপার রঙের,যেন চোখ দুটো রাতের আকাশের মতো দীপ্তিমান দেখাচ্ছে।
ফিওনার হাতের আঙুলে রিং,কিন্তু সেটিও সাধারণ রিং নয়—এটা তৈরি হয়েছে ভেনাসের “ক্রিমসন স্টোন” দিয়ে,যা শুধুমাত্র রাজপরিবারের জন্য সংরক্ষিত।
আর সবচেয়ে ইউনিক জিনিস যেটা সেটা হলো তার পিঠের ওপর স্বচ্ছ রূপালি রঙের হালকা জ্যোতির্ময় আবরণ,যা শুধু বিশেষ কিছু ব্যক্তির জন্য তৈরি হয়—এটি এমন দেখাচ্ছে যেন তার পিঠের ওপর একধরনের মৃদু,সাদা আগুনের মতো আলো ছড়িয়ে আছে,যা ভেনাসের আকাশের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবে!
এই সাজে ফিওনা যেন শুধুই এক রাজকুমারী নয়,বরং আকাশের কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র,এক মহাজাগতিক দেবী লাগছে!
কিন্তু যতই সাজগোজ হোক,এক সমস্যা থেকে যাচ্ছে—গাউনের পেছনের চেইন খোলা!
গাউনের নিচের অংশ এতটাই লম্বা যে সামলাতে ফিওনা হিমশিম খাচ্ছে,মেঝেতে ঢেউয়ের মতো গড়িয়ে পড়ছে সিল্কের মতো স্বচ্ছ এক পরত,যেন সে বাতাসের ওপর ভাসছে।চারপাশে কেউ নেই,সবাই ইতিমধ্যে চলে গেছে।বাইরে গিয়ে কাউকে ডাকবে,সেই শক্তি তার নেই।
ফিওনা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল,নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল।পেছনের চেইনটা বন্ধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে বারবার।চারপাশে কেউ নেই,আর এত বড় গাউন সামলে বাইরে গিয়ে কাউকে ডাকা অসম্ভব।
তখনই…

পেছনে কারও উপস্থিতি টের পেল ফিওনা।
একটা শীতল স্পর্শ!
তার কোমরে শক্তভাবে রাখা দু’টি হাত…
ফিওনার নিঃশ্বাস থমকে গেল।ধীরে ধীরে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো,আর চোখ বড় হয়ে গেল।
জ্যাসপার!
গভীর অরন্যর মতো সবুজ তার চোখজোড়া,গভীর, রহস্যময়।রক্তিম বেগুনি ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি।
একটাও শব্দ উচ্চারণ করল না সে।
নিঃশব্দে হাঁটু গেড়ে বসলো ফিওনার পেছনে।
তারপর…
ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো ফিওনার খোলা পিঠে।
নিচের দিক থেকে চেইনটা একটুখানি তুলে আনলো,তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটের স্পর্শেই বন্ধ করতে লাগলো চেইন।
ফিওনার দেহ জমে গেল,নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল যেন!
শরীর শিউরে উঠল ফিসফিসে গরম নিঃশ্বাসে…
চেইনটা একেবারে ওপরে পৌঁছানোর পর জ্যাসপার থামলো না,গাউনটাকে ঠিকঠাক করে দিলো যেন এটা তারই কাজ।
তারপর ধীর গতিতে উঠে দাঁড়ালো,ফিওনার ঘাড়ের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল—
“এত সহজেই আমি ছাড়া অন্য কারো জন্য ব্রাইড সেজে বসে আছো হামিংবার্ড?”
ফিওনার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।আতঙ্ক,শিহরণ আর এক অজানা অনুভূতির মাঝে দুলতে দুলতে সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো।

জ্যাসপার দাঁড়িয়ে আছে একদম কাছে,ঠিক তার সামনে।চোখে সেই চিরচেনা গভীর দৃষ্টি,ঠোঁটে এক রহস্যময় আধা-হাসি।যে এখন কালো হুডি পরিহিত ছিল,তার চেহারায় মাস্ক বা চশমা ছিল না।তার উজ্জ্বল সবুজ চোখগুলো ছিল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত,যেন ফিওনাকে গভীরভাবে দেখার জন্য প্রস্তুত।
তার উপস্থিতি,রহস্যময়তা আর দৃঢ়তা ফিওনাকে আরও আকৃষ্ট করছিল,যদিও সে জানতো যে এ মুহূর্তটি কতটা বিপজ্জনক।
ফিওনার ঠোঁট কাঁপলো,কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
ঠিক তখনই—
জ্যাসপার হঠাৎই একটা ছোট্ট কাঁচের বোতল খুললো। এক মিষ্টি,অথচ ভারী সুগন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো।
এরপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্যাসপার স্প্রেটা ছুঁড়ে দিলো ফিওনার দিকে!
ফিওনার নাকে সেই সুগন্ধ পৌঁছানো মাত্রই সব কিছু ঘোলা হয়ে গেল।শরীরটা হালকা লাগছে… মাথা ঝিমঝিম করছে…
সে কিছু বলতে চাইল,কিন্তু কণ্ঠ আটকে গেল।
পরের মুহূর্তেই তার পা টলমল করে উঠলো,চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো।
জ্ঞান হারানোর আগে শেষ যা অনুভব করলো—
সে জ্যাসপারের শক্ত বুকে ঢলে পড়ছে!

জ্যাসপার ফিওনাকে কোলে তুলে নিলো,তার লম্বা বড় গাউন পুরো ফ্লোরে ছড়ানো।ফিওনার হাত ঝুলছিল নিচে,আর চুলও তার কোমলভাবে ঝুলে ছিল।সে অচেতন,নিথর কিন্তু জ্যাসপারের শক্ত বাহুর মধ্যে নিরাপদ।
জ্যাসপার ফিওনাকে নিয়ে কক্ষের বারান্দায় গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য নামালো,তারপর ফিওনার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো।ফিওনার হাত দুটো জ্যাসপার তার গলায় জড়িয়ে ধরালো অচেতন অবস্থায়,জ্যাসপার এক ঝলকে ড্রাগন রূপ ধারণ করলো।
ফিওনাকে নিয়ে আকাশে উড়াল দিলো,তার শক্ত পিঠে অচেতন ফিওনা শুয়ে ছিল।বাতাসে তার গাউন উড়ছিল,গাউনের সাদা আর জ্যাসপারের ড্রাগন সবুজ স্কেলের মিশেলে এক অসাধারণ দৃশ্য সৃষ্টি হচ্ছিল।গাউন জ্যাসপারের ড্রাগন রূপের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল,যেন তারা এক নতুন সৌন্দর্যের সৃষ্টি করছে।
আজকের ভেনাসের আকাশ তাদের চারপাশে রঙিন আলো ছড়াচ্ছিল,যা সবুজ আর সাদা রঙে সাজানো।জ্যাসপার আর ফিওনার উড়াল যেন একটি ঐশ্বরিক মুহূর্ত,যেখানে ভেনাসের সমস্ত কষ্ট ও দুশ্চিন্তা মুছে গিয়ে তারা এক নতুন জীবনের সন্ধানে এগিয়ে চলেছে।

লিয়ারা,সিলভা আর অ্যালিসা যখন গভীর ঘুম থেকে উঠলো,তখন প্রাসাদের ভিতর অসংখ্য ড্রাগন সদস্যও অচেতন হয়ে পড়ে ছিল।লিয়ারা মাথা ধরে উঠে বসলো, চোখ মুছে প্রাসাদের বাইরে তাকালো।মিউজিক অর্কেস্ট্রার কোথাও চিহ্ন নেই;পুরো পরিবেশে এক ধরনের শূন্যতা বিরাজ করছিল।
হঠাৎ করে তার মনে পড়লো,প্রায় আধাঘণ্টা আগে,কী যেন এক ক্যামিকেল ছড়িয়ে পড়েছিল—যার ফলে সবাই মুহূর্তের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।ভয়ে ভয়ে সে দৌড়ে ফিওনার কক্ষে গেল,কিন্তু ফিওনার কোথাও দেখা নেই।
তাহলে ফিওনা কোথায় গেল?
লিয়ারা তার হৃদয়ে এক অজানা আতঙ্ক অনুভব করতে লাগলো।ফিওনার জন্য তার চিন্তা ধাবমান হয়ে উঠলো।
“ফিওনা!” সে চিৎকার করে ডাকলো,কিন্তু তার গলার আওয়াজ প্রাসাদের নিস্তব্ধতায় হারিয়ে গেল।
লিয়ারা দ্রুতভাবে চিন্তা করতে শুরু করলো।সে কি তবে ক্যামিকেলের প্রভাবে কোথাও চলে গেছে,নাকি তাকে কেউ নিয়ে গেছে?

লিয়ারার চিন্তা দ্রুতগতিতে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগলো।জ্যাসপার!তার মনে হলো,প্রাসাদের বাইরে যে মিউজিক অর্কেস্ট্রা ছিল,সেখানে জ্যাসপারও ছিল।সে লোকগুলোর মধ্যে একটি মুখ মনে পড়তে লাগলো,যে মুখের চোখগুলো যেন গভীর গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিলো চশমার আড়ালে।কালো অন্ধকারের ন্যায় হুডি পরিহিত লোকটাই প্রিন্স জ্যাসপার ছিলো।
ফিওনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সে সবসময়ই প্রস্তুত ছিল।আর এখন,যখন সবাই অচেতন,তখন সে নিশ্চিত যে জ্যাসপারই সেই গিটারিস্ট যে ফিওনাকে নিয়ে গেছে।লিয়ারা বুঝতে পারছিল,এটাই তার জন্য এক মহা বিপজ্জনক মুহূর্ত।
“মারাত্মক কিছু হতে যাচ্ছে,” সে মনে মনে বললো। “জ্যাসপারকে থামাতে হবে,নাহলে ফিওনাকে হারিয়ে ফেলব।”
সুতরাং,কোনো সময় নষ্ট না করে,সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলো—ফিওনাকে খুঁজে বের করার জন্য আর জ্যাসপারকে প্রতিরোধ করার জন্য এখনই বের হতে হবে।সে দরজা খুলে বাইরে বের হলো,যেন এক নতুন সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে,তার মনের মধ্যে শুধুই ফিওনার নিরাপত্তার চিন্তা।আর তার পেছন পেছন সিলভা অ্যালিসাও দৌড়ে বেরিয়ে গেলো।

এল্ড্র রাজ্য:
এল্ড্র রাজ্য এখন এক গভীর নিরবতা বিরাজমান।কিছু ঘণ্টা আগে যে ঘটনার ঘনঘটা ঘটেছিল,তা এখন যেন এক অনির্বাণ অভিশাপের মতো স্থির হয়ে আছে।
জ্যাসপার ভেনাসে ফিরেছে,যদিও তাঁর পরিকল্পনা ছিল আরো কয়েক দিন সেখানে থাকার।কিন্তু আজকের দিনটি বিশেষ;আজ ফিওনার বিয়ে।এই সংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছানোর পর,আর স্থির থাকতে পারেনি।জরুরি কাজগুলোকে অবহেলা করে দ্রুত সে এল্ড্র রাজ্যের দিকে রওনা হয়।
এখন জ্যাসপারের মধ্যে ক্রোধ আর হতাশার মিলন ঘটেছে।রাজা ড্রাকোনিস,যে তাঁর বাবা,আজকে তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন,উল্টো আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে।রাজা ড্রাকোনিস জ্যাসপারের এ অভিযান আটকানোর চেষ্টা করলেও আজ ব্যর্থ হয়েছেন।পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে,উল্টো জ্যাসপার রাজাকে বন্দি করেছে একটি বক্সে।
ড্রাকোনিস গম্ভীর গলায় বললেন, “তোমার এত সাহস জ্যাসপার,তুমি আমাকে বন্দি করেছো,নিজের বাবাকে!”

জ্যাসপার চোখে দৃঢ়তা নিয়ে উত্তর দিল,“দুঃখিত, ড্রাকোনিস।এছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।কারণ,এখন আমি শুধু জ্যাসপার নই আমি থেরন ও,আমি দুই সত্তার সংমিশ্রণ—যাকে আপনি কয়েক দিন আগে বন্দি করেছিলেন সে শুধু একজন প্রিন্স জ্যাসপার ছিলো,আর আজকে আমার মধ্যে দুটো সত্তার ক্ষমতা তাই আমাকে আর আপনি বন্দি করতে পারবেন না।”
ড্রাকোনিসের চোখে এক চমকপ্রদ বিস্ময়।সে বুঝতে পারছে,তার পুত্রের মধ্যে একটি নতুন শক্তি ও প্রতিজ্ঞা উদয় হয়েছে,যা তাকে থামানো সহজ হবে না।
রাজা ড্রাকোনিসের চোখে বিষণ্ণতা,তিনি বললেন, “মাই সান,তুমি ভুল করছো।নিজের জীবনটা এভাবে ধ্বংস করো না,ফিরে এসো এই ভালোবাসার পথ থেকে।”
জ্যাসপার গভীর শ্বাস নিয়ে উত্তর দিল, “আমাকে ক্ষমা করবেন, ড্রাকোনিস।আমি আপনাকে বন্দি করতে বাধ্য হয়েছি।আজ আমি যে অবস্থানে এসেছি,তার জন্য আপনি দায়ী।আপনার জেদের কারণে।আমি বুঝতে পেরেছি আপনার কাছে নিজের ছেলের চেয়ে এই ভেনাস আর রাজ্যে আপনার কাছে বড়।আমি আগের জন্মে মায়ের ভালোবাসা পাইনি,আর এ জন্মেও সে অভাব অনুভব করছি।আমার এ জন্মের মা যু*দ্ধ করতে গিয়ে সমাধি হয়েছেন।যদি তিনি বেঁচে থাকতেন,তবে নিশ্চয়ই তার ছেলের কষ্ট বুঝতেন,আর তখন আমি তার কাছে এই ভেনাস আর রাজ্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠতাম।”
ড্রাকোনিসের মুখে হতাশার ছাপ।তিনি জানেন,তাঁর পুত্রের মনে কতটা বেদনা,আর তাঁর নিজের জেদের ফলস্বরূপ জ্যাসপারের এই অবস্থান। “তবে তুমি কি মনে করো,আমি তোমাকে হারাতে চাই মাই সান?” তিনি বললেন, “আমার উদ্দেশ্য তো তোমাকে শক্তিশালী করে তোলা,কিন্তু তুমি নিজেকে ধ্বং*সের দিকে নিয়ে যাচ্ছ।”

“শক্তিশালী হতে হলে আমাকে প্রথমে মুক্ত হতে হবে, ড্রাকোনিস,” জ্যাসপার দৃঢ়ভাবে বললো। “আমি আর আপনার শাসন সইতে পারবো না।আমি নিজের পরিচয়ে বাঁচতে চাই—একজন স্বাধীন ও শক্তিশালী ড্রাগন হিসেবে।এখন সময় এসেছে,সত্যিকার অর্থে প্রিন্স হয়ে ওঠা।”
ড্রাকোনিসের মনে হলো,সেদিন যখন তিনি দেবতা আভ্রাহারের কাছে গিয়েছিলেন,সেখানে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনেছিলেন।আভ্রাহার বলেছিলেন, “তোমার পুত্র জ্যাসপারের আগের জন্মের কাহিনী জানলে তোমার হৃদয় ভেঙে যাবে।থেরন যখন ছোট ছিল,তখন সে হারিয়েছে তার মাকে।পরে,তার সৎমা তাকে অত্যাচার করতো অনেক ,যা তার মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিলো।এ কারণে,থেরন রাগী,জেদি আর কঠোর অহংকারী হয়ে ওঠেছিলো;সে তার সৎমাকে ভয় পেতে বাধ্য করেছিল আর পুরো ভেনাসও তার প্রতি ভীত ছিল।”
ড্রাকোনিস বুঝতে পারলেন যে,জ্যাসপারের এই জন্মের মনে যে বেদনা ও ক্ষোভ রয়েছে,তা তাঁর নিজের জেদের ফলস্বরূপ।তিনি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন,“আমি যদি সেদিন সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতাম, আমার ছেলের লাভ ফাংশনাল ডিলিট না করতাম।তাহলে হয়তো আমার পুত্রের এই দুরবস্থা হত না।আমি তাকে রক্ষা করতে পারতাম,কিন্তু আমি ভুল পথে হাঁটলাম।তার মায়ের মৃ*ত্যুর পর,আমি শুধু আমার ক্ষমতা ও অবস্থানের প্রতি মনোযোগ দিয়েছিলাম,জ্যাসপারের অনুভূতিগুলোকে উপেক্ষা করে।”
“জ্যাসপার মাই সান,” তিনি বললেন, “আমি জানি, আমি তোমাকে সঠিকভাবে ভালোবাসতে পারিনি।কিন্তু তাই বলে আমার ভালোবাসা মিথ্যা নয় পুত্র।একজন বাবা হিসেবে আমি তোমার খারাপ চাইনি কখনো।যে ভালোবাসার কারনে আমার ছেলেকে হারাতে হবে আমি কিভাবে সেই ভালোবাসা মেনে নিবো?
জ্যাসপার ড্রাকোনিসকে কঠোরভাবে দেখল আর বলল, “আমার ধ্বংস হোক,আর যাই হোক,আমি আগামী সাত জনমেও ফিওনাকে ছাড়বো না।সে আমার হৃদয়ের অন্তঃস্থল,আর আমি তাকে কারোর কাছে যেতে দিতে পারি না।”

এটা বলে জ্যাসপার থারিনিয়াসের দিকে তাকালো। তার চোখে এক কঠোর সংকল্প ছিল। “থারিনিয়াস,তুমি কি বলো?তুমি কি আমার পাশে থাকবে?”
থারিনিয়াসের মুখে এক ভয়াবহ দ্বন্দ্বের ছাপ দেখা গেল।সে কিছুক্ষণ চিন্তা করে ড্রাকোনিসের দিকে তাকিয়ে বললো, “মাফ করবেন,কিং।আপনি এই রাজ্যের রাজা;আপনার হুকুম সবসময় মান্য করেছি।কিন্তু প্রিন্সের সাথে আমার সম্পর্ক ছোট থেকে এত গভীর যে আমার প্রথম পথচলা,আমার প্রশিক্ষণ—সবকিছু প্রিন্সের হাত ধরেই শুরু হয়েছে।এ কথা বলা সহজ নয়,কিন্তু আজ আমি সত্যি সত্যি জানাচ্ছি,আমি প্রিন্সের পক্ষে আছি।তার পাশে দাঁড়ানোই আমার জন্য গর্বের বিষয়।থারিনিয়াস আজীবন প্রিন্সের সাথে থাকবে,একসাথে যুদ্ধে নেমে পড়বে।আমার প্রতিজ্ঞা এটাই!”
তখন হঠাৎ আলবিরা থারিনিয়াসের কাঁধে হাত রেখে বললো, “শুধু থারিনিয়াস নয়,আলবিরাও থাকবে।ফিওনার জন্য,প্রিন্সের জন্য,আমরা সবাই একত্রে লড়ব।”
এরপর পেছন থেকে অ্যকুয়ারাও কণ্ঠ উচ্চারণ করে বললো, “আমিও থাকবো,প্রিন্স।আমরা সকলেই একসাথে।আপনার যুদ্ধে,আপনার ভরসা হয়ে।”

জ্যাসপার তাদের কথা শুনে আবেগে ভরপুর হয়ে পড়লো।সে হাত রেখেছিল থারিনিয়াসের কাঁধে,আর তখন হঠাৎ করেই এথিরিয়ন জ্যাসপার সামনে এসে বললো, “প্রিন্সের একমাত্র ছোট ভাই এথিরিয়নও থাকবে তার পাশে।আমরা কখনো তোমাকে একা ছাড়বো না, জ্যাসু ভাইয়া!”
ড্রাকোনিসের চোখে কিঞ্চিত ক্ষোভ আর হতাশার ছাপ ছিল।রাজ্যের রাজা হিসেবে তার অঙ্গীকার ছিল জ্যাসপারকে আটকানো।কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। রাজ্যের সবাই,এমনকি রাজ্যের গার্ডসরা,জ্যাসপারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।সে বুঝতে পারছিল যে এই মুহূর্তে তার আর কিছু বলার নেই।
একটু চুপ থেকে ড্রাকোনিস বললো, “তোমরা সবাই আমার পুত্রের পক্ষে দাঁড়াচ্ছ,কিন্তু মনে রেখো,ক্ষমতা কখনো কখনো পিতৃস্নেহকেও ছাড়িয়ে যায়।”
তবে,তার কণ্ঠস্বরের মধ্যে সে হতাশা ছিল,আর তার চোখের পল্লবগুলো যেন বলে দিচ্ছিল যে সে জানে,আজকের এই মুহূর্তে জ্যাসপারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কোনো মানে নেই।রাজ্যের এমন ঐক্য সে আগে কখনো দেখেনি।

“তোমরা যা করতে চাও,তাতে আমি বাধা দেব না,” ড্রাকোনিস বললো, “কিন্তু আমার কথা মনে রেখো,আমি তোমাদের পথে অন্তরায় হতে পারি।আমি এখন হয়তো একা, কিন্তু এই রাজ্যের রাজা আমি।”
আর সেই কথা বলে,সে মলিন হৃদয়ে চুপ হয়ে গেল।তার মনে হয়েছিল,হয়তো এই যাত্রায় তাকে আরোহণ করতে হবে একটি নতুন পথে,যেখানে সে শুধু পিতা নয়,বরং একজন রাজা হিসেবেও পরিবর্তন আনতে পারে।
তখনি তারা সবাই মিলে পরিকল্পনা করেলো।মিউজিক অর্কেস্ট্রার ছদ্মবেশে ফ্লোরাস প্রাসাদে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিলো।এথিরিয়ন খবর এনেছিল যে লিউ ঝান আর রাজা জারেনরা দেবতার প্রাসাদে আছেন।ফ্লোরাস প্রাসাদে এই মুহূর্তে শুধু মাত্র ফিওনা,লিয়ারা ও অন্যান্য সদস্যরা রয়েছেন।তাই এই সুযোগটা কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুতি নিল তারা।
যদিও লিউ ঝান সেখানে উপস্থিত থাকলেও জ্যাসপারের কিছু যায় আসতো না।জ্যাসপার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।তার মনে ছিল ফিওনাকে কিভাবে উদ্ধার করবে।জানতো তার পরিকল্পনা যতই জটিল হোক না কেন,ফিওনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সে প্রস্তুত।মিউজিক অর্কেস্ট্রা যখন প্রাণবন্ত সুর বাজাচ্ছিল,তখন জ্যাসপার ও তার সহযোগীরা অজান্তেই প্রস্তুত হচ্ছিলো ফিওনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
এথিরিয়ন দৃঢ়তার সঙ্গে বললো, “আমরা সফল হবো,আমি জানি।আমাদের সাহসী হতে হবে।ফিওনাকে উদ্ধার করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।”
তখন সকলের মনোযোগ মিউজিকের দিকে আকৃষ্ট হলেও,জ্যাসপারের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ফিওনাকে নিরাপদে বের করে আনা।

জ্যাসপার ইতিমধ্যে ফিওনাকে নিয়ে ভেনাসের আকাশ পাড়ি দিয়েছে।উড্ডয়নের মুহূর্তে,তার হৃদয়ে কাঁপন ছিল—একদিকে ভালোবাসার তীব্র আকাঙ্ক্ষা,অন্যদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়।সে জানতো এই যাত্রা শুধু একটি নতুন গন্তব্য নয়,বরং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
মহাকাশে প্রবেশ করার পর,চারপাশের দৃশ্য ছিল অপার।দূর থেকে উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো জ্বলজ্বল করছিল,যেন তারা সকলেই তাদের অভিবাদন জানাচ্ছিল।ফিওনা অচেতন অবস্থায় জ্যাসপারের পিঠে শুয়ে ছিল,তার গাউন বাতাসে উড়ছিল,যেন মহাকাশের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে।

জ্যাসপার এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করলো—ফিওনাকে নিজের করার জন্য তাকে কতটা লড়াই করতে হবে।পৃথিবীর দিকে তার যাত্রা শুরু হয়েছে,যেখানে ফিওনার জন্য অপেক্ষা করছে এক নতুন জীবন।সে জানত,পৃথিবীতে পৌঁছানোর পর তাদের প্রেমের পরীক্ষা হবে।কিন্তু সে প্রস্তুত ছিল,কারণ সে কোনো ভাবেই ফিওনাকে ছাড়বে না।

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৪

আকাশের বিশালতা যেন তাদের ভালোবাসার গভীরতাকে বোঝাচ্ছিল,আর জ্যাসপার তার হৃদয়ের প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে চললো—“আমি তোমাকে নিরাপদে নিয়ে যাব,হামিংবার্ড।কিছুতেই আমি তোমাকে হারাতে পারবো না।”

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৬