এই অবেলায় পর্ব ১৩
সুমনা সাথী
বিয়ের আসরের জমকালো আলোকসজ্জা কলরবের চোখে মুহূর্তেই যেন বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধতে লাগল। ইরার পালিয়ে যাওয়ার সংবাদটা যখন ওর কানে পৌঁছাল কলরব যেন এক মুহুর্তে জীবন্ত এক পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব? এ তো কোনো নিছক পারিবারিক সম্বন্ধ ছিল না; তারা তো একে অপরকে ভালোবেসে সারাজীবন একসাথে থাকার শপথ নিয়ে এই ছাদনাতলায় বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে কি সেই সব প্রতিশ্রুতি কেবলই বালির বাঁধ ছিল? চারদিকের কোলাহল, আলোকসজ্জা; সবকিছুই কলরবের কাছে ঝাপসা আর অর্থহীন মনে হতে লাগল। কাঁপাকাঁপা হাতে সে নিজের ফোনটা বের করল। বারবার ইরার নাম্বারে ডায়াল করল সে। রিং হলো কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া এলো না। কয়েকবার বিফল চেষ্টার পর হুট করেই মোবাইল স্ক্রিনে একটা মেসেজ ভেসে উঠল। প্রতিটি শব্দ যেন কলরবের হৃদপিণ্ডে হাতুড়ির ঘা মারল,
‘সরি কলরব। আমি তোমাকে মন থেকে কখনোই ভালোবাসতে পারিনি। আমার পক্ষে এই বিয়েটা করা সম্ভব না। আই অ্যাম সরি। পারলে ক্ষমা করে দিও।’
কলরবের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো তার। ঠিক সেই মুহূর্তে আরশাদ তালুকদার কঠিন মুখে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সাথে কাজি সাহেবও উপস্থিত। তিনি পাশে দাঁড়ানো দিব্যর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
‘দেখো দিব্য, ও যখন বলেছিল এই মেয়েটাকেই বিয়ে করতে চায়। আমি নিজের মতামতের তোয়াক্কা না করে ওর ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলাম। অথচ নিযানা জন্মানোর পরেই আমি মানতাসাকে কথা দিয়েছিলাম যে ওকেই আমি কলরবের বউ করে ঘরে তুলব। নিজের সেই কথা ভেঙেও আমি ওর সুখের কথা ভেবেছি। আর এখন? এই শত শত মানুষের সামনে আমাকে এই অপমানের বিষ পান করতে হচ্ছে! এর আগে ও নিজের খেয়ালখুশিমতো চলেছে। কিন্তু এখন আমার কথা ওকে শুনতে হবে। কলরবকে আজ নিযানাকেই বিয়ে করতে হবে। এটাই আমার শেষ কথা।’
কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা কায়েফের মনে হলো পায়ের তলার মাটি বুঝি দুলে উঠেছে। এক তীব্র ভূমিকম্পে তার সাজানো পৃথিবীটা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। চারদিকের সবকিছু তার চোখে অন্ধকার হয়ে এলো। মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন যেন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করল কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে শুধু স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল। অথচ কলরবের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে কেমন যেন নিস্তেজ। প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। একদৃষ্টিতে মোবাইলের ওই মেসেজটার দিকে তাকিয়ে আছে। দিব্য ধীরপায়ে কলরবের পাশে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখল। কলরব যখন চোখ তুলে তাকাল সেই দৃষ্টিতে কোনো তেজ ছিল না। ছিল কেবল শূন্যতা। দিব্য নিচু স্বরে বলল,
‘আর কোনো ঝামেলা করিস না ভাই। আমি তোর কাছে রিকোয়েস্ট করছি।’
কলরবের মস্তিষ্ক তখন এক জনমানবহীন ধূসর মরুভূমি। ন্যায়-অন্যায় কিংবা ভালো-মন্দের হিতাহিত জ্ঞান তার ভেতর থেকে লোপ পেয়েছে। দিব্যর অনুরোধের বিপরীতে সে কোনো শব্দ খরচ করল না। শুধু যান্ত্রিকভাবে একবার মাথা নাড়ল। দিব্য লক্ষ্য করল, কলরবকে একদমই স্বাভাবিক দেখাচ্ছে না। তার দুচোখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ফর্সা মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। কায়েফ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কলরব সম্মতি দিয়েছে? এই চরম সত্যটা হজম করতে গিয়ে তার মুষ্টিবদ্ধ হাতজোড়া থরথর করে কাঁপতে লাগল। কিন্তু এই মুহূর্তে তার কিছুই করার নেই। কোনো প্রতিবাদ জানানোর অধিকারও নেই। এই রূঢ় উপলব্ধি তার বুকের ভেতরটাকে নির্মমভাবে দুমড়েমুচড়ে দিল। সে ভালো করেই জানে নিযানা মুখ ফুটে ‘না’ বলবে না। হয়তো তার মতামত নেওয়ার প্রয়োজনটুকুও কেউ বোধ করবে না। ছোটবেলা থেকেই নিযানার ওপর মানতাসা বেগমের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। আদরের আড়ালে শাসনের যে কঠিন দেয়াল দিয়ে তাকে ঘিরে রাখা হয়েছে। তা কায়েফের অজানা নয়।
কায়েফের আজ বারবার মনে হতে লাগল। অন্তত একবার যদি সে নিযানাকে বলতে পারত যে সে তাকে কতটা ভালোবাসে তবে হয়তো আজ লড়ার মতো একটা ভিত্তি থাকত। কিন্তু এখন সবটাই হাতের নাগালের বাইরে। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে সবটুকু ফিকে হয়ে গেছে। কায়েফ টলমল পায়ে ভিড় থেকে সরে গেল; এই দৃশ্য চাক্ষুষ করার মতো কলিজা তার নেই। অতঃপর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো। কাজি সাহেব যখন কলরবকে ‘কবুল’ বলতে বললেন সে কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই বাধ্য ছেলের মতো তা উচ্চারণ করল। পরক্ষণেই কাজি সাহেব অন্দরে নিযানার কাছে গেলেন। ইরার জন্য সাজানো সেই কক্ষেই নিযানাকে বসানো হয়েছে। পরনের লেহেঙ্গাটা বদলানোর সুযোগও হয়নি। শুধু মাথায় একটা ভারী ওড়না টেনে দেওয়া হয়েছে ঘোমটার মতো। মানতাসা পাথরের মতো মেয়ের পাশে বসে আছেন। নিযানা টলমল চোখে বারবার মায়ের দিকে তাকাল।
মানতাসা মেয়ের সেই অব্যক্ত ভাষা বুঝেও নিষ্ঠুরভাবে উপেক্ষা করলেন। তিনি নিজেও নিরুপায়। খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর পর এই দুই ভাই তাকে আগলে রেখেছেন। বাবার মমতা দিয়ে বড় করেছেন। আজ সেই ভাই যখন নিজের সম্মানের দায়ে হাতজোড় করে তার মেয়েকে চাইছেন। তখন ‘না’ বলার ক্ষমতা তার ছিল না। নিযানাকে তিনি সব বুঝিয়েছেন। নিযানা বুঝেওছে; তবুও তার কিশোরী মনে মায়ের প্রতি এক পাহাড়সম অভিমান জমা হলো। কাজি সাহেব যখন বিয়ের কালাম পড়ছিলেন, নিযানার কাছে সবকিছু এক দুঃস্বপ্নের মতো মনে হতে লাগল। সত্যিই কি তার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে? অথচ এতগুলো বছরে বিয়ের চিন্তা একবারও তার মনে আসেনি। কিংবা আসতে দেওয়া হয়নি। কড়া শাসনের শৃঙ্খলে তার বন্ধুদের সাথে মেলামেশার পরিধিও ছিল নির্দিষ্ট গণ্ডিতে। সে কখনো সেই গণ্ডি পেরোনোর সাহস পায়নি। নিজের জীবনের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে সে আজ কেবল একরাশ তিক্ততা খুঁজে পেল। এই ঘোরের মধ্যেই কখন যে বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে গেল। তা সে টেরই পেল না। বিয়ের পর সেখানে কেউই মুহূর্তকাল অপেক্ষা করলো না। রওনা দিল তালুকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। সমস্ত ধকল আর পরিস্থিতির আকস্মিকতায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল।
তালুকদার বাড়ির জমকালো উৎসবের আমেজ যেন এক নিমেষেই কর্পূরের মতো উবে গেছে। সারা বাড়িতে এখন থমথমে নিস্তব্ধতা। আরশাদ তালুকদারের ব্যক্তিত্ব আর কঠোর শাসনের সামনে কারো সচরাচর টুঁ শব্দ করার সাহস নেই; তাই পরিস্থিতির আকস্মিকতায় ক্ষুব্ধ হলেও বাড়ির সবাই হাসি মুখে তার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। কিন্তু এই থমথমে শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাল অনন্তের দেওয়া একটি সংবাদ। সে জানাল, কলরব কারো নিষেধ না মেনে বাইক নিয়ে হুট করে কোথাও বেরিয়ে গেছে। ওরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে আটকাতে পারেনি। ছেলের এমন ঔদ্ধত্যে আরশাদ তালুকদারের কপালে রাগে শিরাগুলো জেগে উঠল। মানতাসা কলরবের প্রেমের বিষয়টি জানতেন না; আরশাদ তালুকদার অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই তথ্যটি কেবল তার বোন নয় বরং পুরো আত্মীয়সমাজ থেকে গোপন রেখেছেন। নিজের আভিজাত্য আর বংশের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি সত্যটাকে ধামাচাপা দিয়ে মিথ্যার এক চাদর বিছিয়েছিলেন। সবাই জানতেন এটা পারিবারিক ভাবে ঠিক করা বিয়ে। অনন্ত ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আরশাদ তালুকদার তার স্ত্রী অলেখার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলেন। শোয়ার ঘরে এখন কেবল তারা দুজন। গম্ভীর কণ্ঠে তিনি প্রশ্ন করলেন,
‘কোথায় তোমার গুণধর ছেলে? এমন একটা কাণ্ড ও কী করে ঘটাতে পারে? এখন আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে আমি কী জবাব দেব? মানতাসাকেই বা কী বলব? বলো আমাকে, কোথায় গেছে ও?’
অলেখার ভেতরটা অপমানে আর রাগে টগবগ করে ফুটছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভ্যাসবশত তিনি নিজেকে সংযত রাখলেন। নিচু অথচ দৃঢ় গলায় জবাব দিলেন,
‘আমি কীভাবে জানব ও কোথায় গেছে? আর বারবার ‘আমার ছেলে’ বলে কী বোঝাতে চাইছ তুমি? কলরব কি তোমার কেউ নয়?’
আরশাদ তালুকদার বসা থেকে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ক্রোধে দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,
‘বাজে কথা বোলো না অলেখা! এমন কোনো কাজ নেই যা ও তোমাকে না জানিয়ে করে। এই মুহূর্তে ওকে খুঁজে বের করো। নইলে এই বিশৃঙ্খলা আমি আর সহ্য করব না।’
অলেখা তীব্র কণ্ঠে বলেন, ‘বিয়ের সময় তো আমাকে জানানোর প্রয়োজনও বোধ করলে না। আর ও? ও তো তোমার সেই বাধ্য ছেলে। যে নিজের ইচ্ছের বিসর্জন দিয়ে তোমার আজ্ঞা পালন করেছে। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছো কী করলে এটা? হ্যাঁ, মানছি মেয়েটা পালিয়েছে কিন্তু তোমার কাছে ছেলের জীবনের চেয়ে আভিজাত্য আর লোকদেখানো সম্মানটাই বড় হলো? এই বিয়ের শিকলে বেঁধে ছেলেটাকে তুমি ভেতর থেকে শেষ করে দিলে! একটিবারও ওর মানসিক অবস্থার কথা ভাবলে না?’
আরশাদ তালুকদার বিন্দুমাত্র দমলন না; বরং তাঁর কণ্ঠে ঝংকার দিয়ে উঠল দ্বিগুণ তেজ। কঠোর দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তিনি গর্জে উঠলেন,
‘সব দোষ তোমার ওই গুণধর ছেলের! ওর অপরিণামদর্শী আচরণের কারণেই আজ পরিস্থিতির এই চরম অবনতি। তাছাড়া সেই মুহূর্তে বিয়েটা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল কি? হ্যাঁ, আমার কাছে আমার বংশমর্যাদা, আভিজাত্য আর সম্মান সবার উপরে। তোমার ছেলে আজ অবধি এমন কোনো কাজ করেনি যাতে সেগুলো বজায় থাকে।’
অলেখার দুচোখে যেন আগুনের ফুলকি ঠিকরে বেরোচ্ছে। তিনি পুনরায় বললেন,
‘সব সময় ‘আমার ছেলে, আমার ছেলে’ করো অথচ ছেলেদের জীবনের কোনো বড় সিদ্ধান্তে আমার মতামতের কি কোনো মূল্য আছে? দিব্যর বিয়েটাও তো তোমার বোনের প্ররোচনায় ঠিক করলে। তখন কি আমার কথা ভেবেছিলে? পরিবারের শান্তির খাতিরে আমি চুপ ছিলাম। কিন্তু তুমি তো অনুশোচনা করার বদলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করলে। কেন নিযানাই কেন? আর কোনো মেয়ে কি ছিল না পৃথিবীতে? এটাও কি তোমার বোনেরই কোনো কূটকৌশল?’
‘জাস্ট শাট আপ অলেখা! নিযানাকে আমি নিজে পছন্দ করেছি। ও আনতাসারের একমাত্র মেয়ে। সে যে আমার এক কথায় তার মেয়েকে তোমার ওই উশৃঙ্খল ছেলের সাথে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছে। এটা তোমার ছেলের সাত কপালের ভাগ্য, বুঝেছ?’
অলেখা ধীরস্থিরভাবে বললেন, ‘অতশত যুক্তি আমি শুনতে চাই না। আমি শুধু জানি, এই বিয়েতে আমার ছেলে সুখী নয়। অনেক সহ্য করেছি আমি আর নয়। আমিও এই বিয়ে মানি না। আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে আমার ছেলেকে আমার চোখের সামনে চাই। যদি ওর গায়ে বিন্দুমাত্র আঘাতের চিহ্ন দেখি। তবে মনে রেখো এর পরিণাম তোমার কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ হবে।’
‘তোমার মানা না মানায় এখন আর কিছুই যায় আসে না। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আর তোমার ছেলে সুস্থ শরীরে ফিরলেও তার সাথে খুব একটা সদ্ভাব হবে বলে আশা করো না।’
বরফশীতল গলায় কথাগুলো ছুড়ে দিয়েই গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আরশাদ তালুকদার। অলেখা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদময় তাচ্ছিল্যের হাসি। এই অবজ্ঞা তাঁর কাছে নতুন নয়। তবে আজকের আঘাতটা যেন কলিজার গভীরে গিয়ে লেগেছে। স্মৃতিরা ভিড় করে এলো অলেখার মনে। তাঁর বড় ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিধবা হলো। ভরা যৌবনে মেয়েটার মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে গেল। অলেখা চেয়েছিলেন মেয়েটাকে নিজের দিব্যর বউ করে ঘরে তুলতে। অন্তত নিজের আপনজন হিসেবে মেয়েটা একটু আশ্রয়ের ঠিকানা পেত। কিন্তু আরশাদ তালুকদার সেই প্রস্তাব এক নিমেষেই নাকচ করে দিয়েছিলেন। তাঁর সাফ কথা ছিল। তিনি ইতিমধ্যেই দিব্যর বিয়ের ফয়সালা করে ফেলেছেন। এত বড় অপমান সহ্য করেও অলেখা সেদিন সবুর করেছিলেন। পরিবারের শান্তির খাতিরে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু যখন থেকে জানতে পেরেছেন যে এই সবকিছুর পেছনে আনতাসা। তখন থেকেই তাঁর বুকের ভেতর এক চোরা অভিমান দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। আর আজকের এই আকস্মিক ঘটনা সেই ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনকে এক তীব্র ক্ষোভে পরিণত করেছে।
অস্থিরতায় পায়চারি করতে করতে আরশাদ তালুকদার অবশেষে একটি সাময়িক সমাধানের পথ খুঁজে বের করলেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে তিনি আনতাসার সাথে নিযানাকে আপাতত তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। যুক্তি দিলেন। ভোর হলে নতুন করে বর গিয়ে কনেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ে আসবে। আনতাসা ও মনে মনে এটাই চেয়েছিলেন; কারণ তার একমাত্র মেয়ের বিয়েটা এভাবে নিরানন্দ আর বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে শেষ হোক তা কোনো মা-ই চায় না। ওরা বিদায় নিতেই আরশাদ তালুকদার বুক চিরে এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। বিদ্ধস্ত কলরব ফিরে এলো। ড্রয়িং রুমের আবহাওয়া তখনো টানটান উত্তেজনায় থমথমে। কলরবের পদধ্বনি শোনামাত্র উপস্থিত সবাই বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। দিব্য ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ওর পথ আগলে দাঁড়াতেই কলরব অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ফেলল। দিব্য কড়া গলায় বলল,
‘কোথায় ছিলিস তুই এতক্ষণ? এটা কোন ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ কলরব?’
কলরব মাথা তুলল না। তার কণ্ঠস্বর নিস্তেজ, ‘পথ ছাড়ো ভাইয়া। এসব আর ভালো লাগছে না। তোমরা বিয়ে করতে বলেছ। আমি কথা রেখেছি। এখন দয়া করে আর অন্য কিছুর জন্য আমাকে বাধ্য কোরো না।’
দিব্য সরলো না বরং তার কণ্ঠস্বর আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল,
‘বিয়ে করেছিস তো কী হয়েছে? তুই কি কারো ওপর দয়া করেছিস? শুধু কবুল বললেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? এমনিতে তোর খামখেয়ালিপনার জন্য আজ আমাদের অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে। এখন নতুন করে আর ঝামেলা না বাড়ালে কি হচ্ছিল না?’
কলরব এবার স্থির থাকতে পারল না। আক্ষেপ নিয়ে সরাসরি দিব্যর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘বিয়েটা কি আমি নিজের ইচ্ছায় করেছি ভাইয়া? এই গুরুভার দায়িত্ব কি আমি চেয়ে নিয়েছি? হ্যাঁ তোমাদের কথা শুনে আমি পুরো সততার সাথে, নিয়ম মেনে বিয়েটা করেছি। কিন্তু বিয়েটা তোমাদের প্রয়োজনে, তোমাদের আভিজাত্য বাঁচাতে দিয়েছ। তাই এর বাকি দায়ভারও তোমরাই পালন করো। মাঝখান থেকে আমাকে কেন টানছ?’
দিব্যর ধৈর্য বাঁধ ভেঙে গেল। সে কঠোর স্বরে গর্জে উঠল,
‘মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? কী সব আবোল-তাবোল বকছিস তখন থেকে! আমরা দায়িত্ব নেব মানে কী? বিয়ে তুই করেছিস। এখন কি সংসারটাও অন্য কেউ করে দেবে?’
‘আমার আর সহ্য হচ্ছে না এসব! আমাকে কি একটা বারও সময় দেওয়া উচিত ছিল না? তোমরা আমাকে পেয়েছটা কী? যে যখন ইচ্ছা যা খুশি করিয়ে নেবে? আব্বু যখন নিজের পছন্দমতো বিয়েটা দিয়েই দিয়েছেন। তখন সংসারটাও আব্বুকেই করতে বলো…’
বাকি কথাগুলো আর পূর্ণতা পেল না। দিব্যর শক্ত হাতের একটা প্রচণ্ড চড় কলরবের গালের ওপর আছড়ে পড়ল। আকস্মিক এই শব্দে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সবাই যেন পাথরের মতো জমে গেল। অপমানে আর যন্ত্রণায় কলরব স্তব্ধ হয়ে একপাশে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দিব্য রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কাঁপছে। ঠিক সেই মুহূর্তে অলেখা ঝড়ের বেগে ছুটে এসে কলরবের সামনে দাঁড়ালেন। দিব্যর দিকে আঙুল উঁচিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে গর্জে উঠলেন তিনি,
‘খবরদার দিব্য! ওর গায়ে দ্বিতীয়বার হাত তোলার চেষ্টা করবি না। তাহলে ফল খুব খারাপ হবে। ও ভুল কী বলেছে শুনি?’
দিব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করল। মায়ের এই অযৌক্তিক প্রশ্রয় তাকে আরও বিচলিত করে তুলল। সে শান্ত গলায় বলল,
‘আম্মু, প্লিজ! তুমি ওকে আর প্রশ্রয় দিও না। এই মুহূর্তে তোমার উচিত ওকে শাসন করা অথচ তুমি উল্টো ওকে সমর্থন করছ?’
অলেখা পিছপা হলেন না। তিনি জেদ ধরে বললেন,
‘করেছি, বেশ করেছি! কলরব, তুই এখন ঘরে যা।’
স্ত্রীর অবাধ্যতা দেখে আরশাদ তালুকদার গর্জে উঠলেন,
‘তুমি কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি করছ অলেখা! এভাবে ওকে মাথায় তুললে ও রসাতলে যাবে। এমনতে বাকি কিছুই রাখেনি।’
অলেখা সেদিকে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করলেন না। তিনি অপলক দৃষ্টিতে দিব্যর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ছলছল চোখে কাঁপা গলায় বললেন,
‘নিজের ছোট ভাইয়ের গায়ে হাত তুলছিস তুই? এত সাহস কোথায় পেলি দিব্য? আজ তুই প্রমাণ করে দিলি তোর শরীরে তোর বাবার রক্ত বইছে। কিন্তু আমি যে তোকে পেটে ধরলাম। নিজের রক্ত পানি করে লালন-পালন করলাম; তার কি কোনো দাম নেই? এই শিক্ষায় বড় করেছি তোকে যে অকারণে নিজের ভাই-বোনদের ওপর হাত তুলবি?’
দিব্যর কণ্ঠে আর্তনাদ ফুটে উঠল, ‘আম্মু! এসব কী বলছ তুমি? কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? আর অকারণে? ওর কথাবার্তার ঔদ্ধত্য কি তোমার চোখে পড়ল না?’
অলেখা থামলেন না। তার দুচোখে অদ্ভুত কাঠিন্য। তপ্ত গলায় বললেন,
‘হ্যাঁ, সব দেখেছি। আর এটাও দেখেছি যে ওর কোনো দোষ নেই। নবনী, সামলাও নিজের বরকে! আমার ছেলেকে শাসন করার সাহস যেন ও দ্বিতীয়বার না দেখায়। কলরব, চল আমার সাথে!’
দিব্য যেন মুহুর্তে পাথর হয়ে গেল। অলেখার এই অচেনা রূপ সে আগে কখনো দেখেনি। বিশেষ করে ‘আমার ছেলে’ শব্দ দুটো তীরের মতো তার কানে বিঁধতে লাগল। অলেখা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালেন না; কলরবের হাত শক্ত করে ধরে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন। কলরব নিজেও মায়ের এই আচরণে যারপরনাই বিস্মিত। সে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বারবার পেছন ফিরে দিব্যর সেই আহত আর বিমর্ষ মুখটার দিকে তাকাল। বসার ঘরে শুনশান নীরবতা বিরাজমান। আরশাদ তালুকদার ধীরপায়ে এগিয়ে এসে দিব্যর কাঁধে হাত রাখলেন। অত্যন্ত মৃদু স্বরে বললেন,
‘মায়ের কথায় কিছু মনে করিস না। জানি না ওর আজ কী হয়েছে। ছেলের চিন্তায় নিজের মাথাটাও বোধহয় বিগড়ে গেছে। তোরা বরং ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। কাল সকাল থেকে অনেক ধকল যাবে।’
দিব্য শুধু যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে সায় দিল, ‘হ্যাঁ, আব্বু।’
আরশাদ তালুকদার নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। নবনী শোয়ার ঘরে ফিরে এসেছে। দিব্য ওর পিছু পিছু ঘরে ঢুকল। নবনী দেখল দিয়া ঘুমিয়ে আছে। ও বিছানাটা ঠিক করে নেওয়ার আগেই দেখল দিব্য কোনো কথা না বলে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। নবনী অবাক হয়ে ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
কলরব ধীর পায়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করল। ঘরজুড়ে তখনো গোলাপ আর রজনীগন্ধার মায়াবী সুবাসের মেলা। রঙিন পর্দা আর নিপুণভাবে সাজানো আলোকসজ্জায় পুরো ঘরটি এক স্বপ্নপুরীর রূপ নিয়েছে। কিন্তু এই চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যই মুহূর্তের মধ্যে কলরবের বুকের ভেতর এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের সৃষ্টি করল। যার উপস্থিতিতে এই আয়োজন সার্থকতা পেত সেই মানুষটিই আজ নেই। গত কয়েক ঘণ্টা বাইক নিয়ে পাগলের মতো সম্ভাব্য সব জায়গায় ইরাকে খুঁজেছে সে কিন্তু কোনো হদিস মেলেনি। সে শুধু নিজের হাজারো প্রশ্নের উত্তর চেয়েছিল। যা আজও অজানাই রয়ে গেল। হঠাৎ বিছানার দিকে নজর পড়তেই কলরবের বুকটা ধক করে উঠল। ধবধবে সাদা চাদরের ওপর রক্তলাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে নিখুঁত একটি হৃদপিণ্ড আঁকা। যার মাঝখানে লেখা ‘ই প্লাস কে’। দৃশ্যটি দেখামাত্রই কলরব যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক উন্মাদে পরিণত হলো। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে মুহূর্তেই তছনছ করে দিল সাজানো বিছানাটা। সাথে পুরো ঘরের সবকিছু। কিন্তু সব লণ্ডভণ্ড করেও তার তপ্ত হৃদয়ে শান্তি মিলল না। উন্মত্তের মতো ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে সর্বশক্তি দিয়ে এক ঘুষি বসাল আয়নাটার ওপর। ঝনঝন শব্দে চুরমার হয়ে কাঁচের হাজারো টুকরো ছড়িয়ে পড়ল পুরো মেঝেতে।
অলেখা বোধহয় ছেলের খোঁজেই এদিকে আসছিলেন। ঘরে পা দিয়েই আতঙ্কে তার আত্মা কেঁপে উঠল। পুরো ঘর যেন এক রণক্ষেত্র! মেঝেতে অগোছালোভাবে নিস্তেজ হয়ে বসে আছে কলরব। একটি হাঁটুর ওপর রাখা তার ক্ষতবিক্ষত হাতটি থেকে অবিরাম ধারায় লাল রক্ত চুইয়ে পড়ছে। অথচ কলরবের অভিব্যক্তিতে যন্ত্রণার রেশমাত্র নেই; সে পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে আছে। সাদা টাইলসের মেঝেটা তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছে। অলেখা হাহাকার করে ছুটে গিয়ে ছেলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। অস্থিরভাবে তাকে ধাক্কা দিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন,
‘কলরব! আব্বু আমার। কী করেছিস এসব তুই?’
কলরব ধীরে মায়ের দিকে মুখ তুলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে এক ফালি বিষণ্ণ হাসি ঝুলিয়ে অত্যন্ত নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
‘আমি একদম ঠিক আছি আম্মু। তুমি ভয় পেয়ো না। আমি মরব না।’
ছেলের এমন মরণপণ উদাসীনতা দেখে অলেখা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তিনি পাগলের মতো কাব্যকে ডাকার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কলরব তখনো রক্তস্নাত মেঝেতে ওইভাবেই একা বসে রইল।
নবনীর কৌতূহল ক্রমেই আশঙ্কায় রূপ নিল। এই রাতের বেলায় লোকটা আবার নতুন কোনো ঝামেলার সৃষ্টি করবে না তো? তবে তাকে খুব বেশিদূর খুঁজতে হলো না। তাদের ঘরের ঠিক পাশের ঘরটি থেকেই একটা ছন্দময় সশব্দ আঘাতের আওয়াজ ভেসে আসছিল। ঘরটি মূলত জিমের সরঞ্জাম দিয়ে সাজানো। যা দিব্যসহ বাড়ির ছেলেরা নিয়মিত ব্যবহার করে। নবনী ঘরের ভেতরে পা রাখতেই আতঙ্কে শিউরে উঠল। দিব্যর গায়ের মেরুন শার্টটা ঘামে ভিজে সপসপে হয়ে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। কপাল আর গাল বেয়ে ঘাম ঝরছে অঝোরে। সে উন্মত্তের মতো পাঞ্চিং ব্যাগের ওপর একের পর এক ঘুষি চালিয়ে যাচ্ছে। নবনী বুঝতে পারল এটা দিব্য তালুকদারের পুঞ্জীভূত রাগের এক ভয়ংকর বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এই মধ্যরাতে নিজের শরীরকে এভাবে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে হয় না।
নবনী কালবিলম্ব না করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঠিক পাঞ্চিং ব্যাগটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। দিব্য প্রচণ্ডভাবে চমকে গেল। তার উদ্যত হাতটা মাঝপথেই থেমে গেলেও পেছনের দিকে সরে যাওয়া ভারী ব্যাগটা দোল খেয়ে ফিরে এসে সজোরে নবনীকে ধাক্কা দিল। আকস্মিক এই ধাক্কায় নবনী ভারসাম্য সামলাতে না পেরে সরাসরি গিয়ে পড়ল দিব্যর প্রশস্ত বুকের ওপর। দিব্য নিজের দুহাতে খপ করে আগলে নিল তাকে। পরক্ষণেই গম্ভীর কণ্ঠের ধমক ভেসে এলো,
‘তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? এই ব্যাগের ধাক্কা না খেয়ে যদি ভুল করে আমার ঘুষিটা তোমার মুখে পড়ত। তবে কী হতো একবার ভেবে দেখেছ?’
নবনীর হৃৎপিণ্ড তখন সশব্দে কাঁপছে। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে তার। সে কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে মাথা তুলে দিব্যর চোখের দিকে চাইল। দিব্যও তখন নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল বিধায় দুই জোড়া চোখ এক হয়ে গেল। নবনী অতি মৃদু স্বরে বলল,
‘আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে আঘাত করতে পারতেন না। সত্যিই কি পারতেন?’
মেয়েটার সেই সরল চাহনি আর সহজ স্বীকারোক্তিতে দিব্যর ভেতরে জমে থাকা ক্রোধের পাহাড়টা যেন মুহূর্তেই ধসে গেল। তার খুব হাসি পেল কিন্তু বাইরের গাম্ভীর্য বজায় রেখে সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
‘আমার ওপর এত বিশ্বাস তোমার?’
এই অবেলায় পর্ব ১২
নবনীর সাজগোজ এখনো অমলিন। ঠোঁটে মাখানো গাঢ় লাল লিপস্টিকটা মৃদু আলোয় চকচক করছে। এত কাছ থেকে নবনীর মায়াবী মুখটা পরখ করতে গিয়ে দিব্যর নিজের গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল। নবনীর সরে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই বরং সে যেন এক সম্মোহনে আটকা পড়ে আছে। দিব্যর পুরুষালি মনে তখন কিছু অবাধ্য ইচ্ছা প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়েছে তার পক্ষে। এক অজানা আবেশে দিব্য যখন নবনীর শ্রীমুখের খুব কাছে এগিয়ে এল। নবনীর বুকের ভেতরটা তখন তীব্র আশঙ্কায় ধক করে উঠল। দুজনের ওষ্ঠের দূরত্ব যখন নূন্যতম। নবনী তখন আড়ষ্টতায় চট করে চোখ দুটো বুজে ফেলল। হৃদস্পন্দন তখন তার কানে বাজছে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক মুহূর্ত কেবল উষ্ণ নিঃশ্বাসের পরশ ছাড়া আর কিছুই অনুভব করতে পারল না সে। নবনী দ্বিধাভরে চোখ দুটো মেলতেই দেখল, দিব্যর সেই গভীর আর তীক্ষ্ণ চোখ দুটো তাকে বিদ্ধ করছে। পরক্ষণেই দিব্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে এল,
‘আমার সময় লাগবে নবনী।’
