এই অবেলায় পর্ব ১৪
সুমনা সাথী
সকাল সকাল তালুকদার বাড়িতে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। বৌভাতের বিশাল আয়োজন। নিমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকা দীর্ঘ; তাই শেষ মুহূর্তে কোনো কিছুই আর বাতিল করা সম্ভব হয়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী সকালেই নিযানাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ে আসা হবে এবং দুই পক্ষের মূল অনুষ্ঠান এই বাড়িতেই সম্পন্ন হবে। নবনী ধোঁয়া ওঠা কফির মগ হাতে শোয়ার ঘরে ঢুকেই দেখল ঘর খালি। দিব্যকে একটু আগেই এখানে দেখেছিল। এখন সে নিরুদ্দেশ। বিছানার ওপর একরাশ জামাকাপড় অগোছালো হয়ে পড়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে দিয়া তার আলমারি উজাড় করে পছন্দের সব ড্রেস বের করে রেখে গেছে। বাপ-মেয়ে কারোরই দেখা নেই। নবনী কফির মগটা হাতে নিয়ে কৌতূহলবশত পাশের জিম রুমটায় উঁকি দিতেই দৃশ্যটা দেখে থমকে গেল। বাপ-বেটি মিলে সেখানে রীতিমতো যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছে। চার বছরের দিয়ার হাতেও তার পুচকে সাইজের বক্সিং গ্লাভস।সে দিব্যর সাথে লড়াইয়ে মত্ত। দিয়া বেশ হুকুমের সুরে বলছে,
‘পাপ্পা, ডাউন ডাউন! এবার দিয়া মারবে!’
মেয়ের আবদার রাখতে দিব্য কিছুটা নিচু হতেই দিয়া কচি হাতের এক ঘুষি বসিয়ে দিল তার মুখে। অমনি দিব্য এমন এমন ভাব করল যেন প্রচণ্ড চোট পেয়েছে! সে যন্ত্রণার অভিনয় করে মেঝের ম্যাট্রেসের ওপর সটান শুয়ে পড়ল।দিয়া খুশিতে আত্মহারা হয়ে লাফাতে লাফাতে চিৎকার করে উঠল,
‘ইয়াআআ! দিয়া চ্যাম্পিয়ন!’
দিব্য উঠে বসে মেয়ের উচ্ছ্বসিত মুখটা দেখে শব্দ করে হেসে ফেলল। নবনী দরজায় দাঁড়িয়ে অপলক চেয়ে রইল সেই হাসির দিকে। দিব্য তালুকদার সচরাচর গম্ভীর থাকতেই পছন্দ করে কিন্তু হাসলে তাকে যে কতটা মোহনীয় লাগে তা নবনী জানে। মাঝে মাঝে তার খুব ইচ্ছে করে সামনে গিয়ে বলতে ‘একটু হাসুন না মশাই। হাসলে তো আর ট্যাক্স দিতে হয় না! এত অহংকার কিসের!’ হঠাৎ দিয়ার নজর পড়ল দরজায় দাঁড়ানো নবনীর ওপর। সে মহা উৎসাহে হাতছানি দিয়ে ডাকল,
‘মাম্মা কাম কাম! দেখো দিয়া আর পাপ্পা ডিসুম ডিসুম করছে। দিয়া বেশি জোর… না কী যেন বলে? ভুলে গেছি!’
দিব্য ঘাড় ঘুরিয়ে নবনীর দিকে তাকাল। তার চোখে তখনো হাসির রেশটুকু লেগে আছে। নবনী মৃদু হেসে দুজনের দিকে এগিয়ে এল। বলল,
‘শক্তিশালী!’
দিয়া গর্বিত ভঙ্গিতে বুক ফুলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ!’
দিব্য ম্যাট্রেস ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। নবনী বিনাবাক্যে কফির কাপটা তার দিকে বাড়িয়ে দিতেই দিব্য সেটা হাতে নিল। গরম কফিতে প্রথম চুমুকটা দিয়েই এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলো সে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল ইহান। সে আসতেই দিয়া উৎসাহ নিয়ে বলল,
‘জানিস ইহান, আজকেও দিয়া চ্যাম্পিয়ন!’
ইহান একটু দম নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। হতাশ ভঙ্গিতে নিজের মাথায় হাত রেখে বলল,
‘আরে বুদ্ধু! চাচ্চু তোকে ইচ্ছে করে জিতিয়ে দেয়। চ্যাম্পিয়ন করে দেয়। তুই কিচ্ছু বুঝিস না!’
কথাটা শোনামাত্রই দিয়ার খুশিতে ভরা মুখটা মুহূর্তেই মেঘলা হয়ে গেল। সে রাগী দৃষ্টিতে ইহানের দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই কোমরে হাত দিয়ে বাবার দিকে ফিরল। বিচারকসুলভ ভঙ্গিতে। জানতে চাই এটা কি সত্যি? দিব্য অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে অত্যন্ত নিরীহ মুখ করে দুদিকে মাথা নেড়ে বোঝাতে চাইল যে ইহান একদম মিথ্যা বলছে। সাথে সাথে সে ইহানকে চোখের ইশারায় শাসিয়ে দিল যেন আর একটা শব্দও না বাড়ায়। ইহান পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সুর পাল্টে ফেলে বলল,
‘আরে ধুর ওসব বাদ দে! তুই আমার সাথে চল। তোকে দারুণ একটা জিনিস দেখাব।’
দিয়ার কৌতূহল সব রাগ ছাপিয়ে উপচে পড়ল। সে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল,
‘কী জিনিস?’
‘সেটা গেলেই দেখতে পাবি। সারপ্রাইজ!’
দিয়া এক মুহূর্তও আর দেরি করল না। উৎসাহিত গলায় বলল,
‘আচ্ছা চল!’
দিয়া ইহানের পিছু পিছু ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই জিম রুমটায় নিস্তব্ধতা নেমে এল। নবনী লক্ষ্য করল দিব্যর সারা শরীর ঘামে ভিজে সিক্ত। তার পরনের কালো টিশার্ট’টা শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। কপাল আর গাল বেয়ে ঘামের বিন্দুগুলো গড়িয়ে পড়ছে। নবনী পাশের তাক থেকে একটা পরিষ্কার সাদা বর্ণের তোয়ালে তুলে নিয়ে দিব্যর দিকে বাড়িয়ে ধরল। দিব্য তখনো কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। সে চোখ তুলে নবনীর দিকে তাকাল। নবনী তার সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে টিকতে না পেরে অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিল। দিব্যর মনের কোণে কাল রাতের সেই মুহূর্তটা ভেসে উঠতেই এক অদ্ভুত অপরাধবোধ কাজ করল। মেয়েটি কাল নিজের সবটুকু আবেগ দিয়ে তার কাছে ধরা দিতে চেয়েছিল অথচ সে ছিল নির্বিকার। কিন্তু মনের ওপর জোর খাটানো কি এতই সহজ? এক অজানা আশঙ্কা আর দোটানায় সে বারবার থমকে যায়। সে চায় না তাড়াহুড়ো করে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের সম্পর্কের এই পবিত্রতা ধূলিসাৎ হয়ে যাক। দিব্যকে চুপ করে থাকতে দেখে নবনী নিচু স্বরে বলল,
‘কী হলো, এটা নিন। আব্বু আপনাকে খুঁজছিলেন। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিচে যেতে বলেছেন।’
দিব্য ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে কিছুটা এগিয়ে এল। কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
‘আমি তো খাচ্ছি। তুমি তো চাইলে একটু সাহায্য করতেই পারো তাই না?’
নবনী চট করে দিব্যর চোখের দিকে চাইল। ইশারা বুঝতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। দিব্যর গভীর মায়াবী চোখের মণি দুটো যেন হাসছে। নবনী বেশিক্ষণ সেই সম্মোহনী দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। আড়ষ্টতায় চোখ সরিয়ে নিল। কম্পিত হাতে তোয়ালেটা দিব্যর কপালে ঠেকিয়ে ঘাম মুছতে শুরু করল। দিব্য উচ্চতায় বেশ লম্বা হওয়ায় নবনীকে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছিল। দিব্য তা লক্ষ্য করল। আচমকা এক হাতে নবনীর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল সে। নবনীর হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। দিব্য আলতো করে নবনীকে তুলে নিজের পায়ের পাতার ওপর দাঁড় করিয়ে দিল। নবনীর সারা শরীর এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল। এত কাছ থেকে সে দিব্যর হৃদপিণ্ডের ধকধকানি পর্যন্ত অনুভব করতে পারছে। অথচ দিব্য একেবারে ভাবলেশহীন। যেন কিছুই হয়নি! নবনী কাঁপা কাঁপা হাতে দিব্যর মুখটা মুছে দিয়ে যখনই একটু স্বস্তি পেতে চাইল। ঠিক তখনই দিব্য মাথাটা সামান্য উঁচু করে গলার দিকটা দেখিয়ে দিল। নবনী একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুহূর্তে দিব্যর গম্ভীর, মোলায়েম কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে গুঞ্জরিত হলো,
‘নবনী, তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?’
নবনীর তখন মনে হলো তার শরীর নয় বরং মনটাই আজ বড্ড এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। দিব্যর এই হঠাৎ প্রকাশ করা অধিকারবোধ তাকে যেমন আনন্দ দিচ্ছে। তেমনি এক অজানা অস্থিরতায় আচ্ছন্ন করে ফেলছে। নবনী ভ্রু কুঁচকে বিস্ময় নিয়ে তাকাল। মাথা নেড়ে না বোঝালো। দিব্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ধূর্ত হাসির রেখা ফুটে উঠলো। সে দমবার পাত্র নয়। পুনরায় বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল,
‘এত কাঁপছ যে?’
নবনী কোনো জবাব দিতে পারল না। তার গাল দুটো ততক্ষণে লাল হয়ে গেছে। না তাকিয়েও সে দিব্যর চোখের সেই কৌতুকভরা চাউনি অনুভব করতে পারছিল। লোকটা কত বড় ধুরন্ধর! সব বুঝতে পেরেও ইচ্ছা করে তাকে এভাবে জ্বালাচ্ছে। অথচ বাইরে এমন একটা গাম্ভীর্য ধরে রেখেছে যে মনে হচ্ছে খুব বড় কোনো জীবন-মরণ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছে। নবনীর আর সহ্য হলো না। সে মৃদু মাথা নেড়ে দিব্যর পায়ের ওপর থেকে নেমে এল। অতঃপর একপ্রকার ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার দ্রুত প্রস্থান আর লজ্জামাখা মুখটা দেখে দিব্য এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পরক্ষণেই তার প্রাণখোলা হাসি পুরো রুমটাতে প্রতিধ্বনিত হলো।
আনতাসাদের বাড়িতে প্রস্থানের সময় ঘনিয়ে এসেছে। দিব্য দিয়াকে কোলে নিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রইল। কাব্য অত্যন্ত সন্তর্পণে কলরবকে নিয়ে এল। দিব্যর ইচ্ছা হলো ভাইকে জড়িয়ে ধরে দুটো সান্ত্বনার কথা বলতে। কালকের জন্য সরি বলতে। কিন্তু কলরবের ওই নির্লিপ্ত আর নিথর চাহনি দেখে তার কণ্ঠস্বর যেন গলার কাছেই আটকে গেল। কলরব একবারের জন্যও কারো দিকে তাকাল না। যেন সে এই পৃথিবীর অংশই নয়। তাকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে কাব্য এগিয়ে এল দিব্যর কাছে। দিব্য ইশারায় কলরবের হাতের ব্যান্ডেজের কথা জানতে চাইলো। গতরাতের উন্মত্ততা আর কাঁচ ভেঙে হাত কাটার পুরো ঘটনাটা নিচু স্বরে ব্যক্ত করল কাব্য। শুনে দিব্যর বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে বিষণ্ণ গলায় বলল,
‘ওকে একটু বোঝাস কাব্য। এভাবে পাগলামি করে তো আর জীবন চলে না। বাস্তবতা সবসময় আমাদের কল্পনার মতো রঙিন হয় না; অনেক সময় আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও নিয়তিকে মেনে নিতে হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা ওর সাথে যার বিয়ে হয়েছে সে আমাদের নিযানা। ওই মেয়েটার সাথে আমি কোনো অন্যায় হতে দিতে পারব না।’
কাব্য জানালার কাঁচের ওপাশে বসে থাকা নিস্তেজ কলরবের দিকে একবার তাকাল। তারপর দিব্যর কাঁধে হাত রেখে ধীরস্বরে বলল,
‘একটু শান্ত হ। ওকে কিছুটা সময় দে। অবনী মারা যাওয়ার পর তুই কি এক দিনেই স্বাভাবিক হতে পেরেছিলি? ওর আঘাতটা তো আরও টাটকা। তবে আমার মনে হয় না ও নিযুর সাথে কোনো রুক্ষ ব্যবহার করবে। তুই তো জানিস আমরা সবাই নিযুকে কতটা ভালোবাসি।’
দিব্যর দৃষ্টি তখন এদিক-ওদিক কাঙ্ক্ষিত একজনকে খুঁজে ফিরছিল। তাকে না পেয়ে সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
‘কায়েফ কোথায় রে? কলরবকে যদি কেউ শান্ত করতে পারে তবে সেটা ও-ই। ও কেন এখনো আসছে না?’
কাব্য একরাশ বিরক্তি আর দুশ্চিন্তা নিয়ে জবাব দিল,
‘ওই ছাগলটার যে আবার কী হলো কে জানে! সকালে নাস্তার টেবিলে আসেনি। কুহু ডাকতে গিয়েছিল। বলল ওর শরীর নাকি ভালো না। যাবে না। সকাল থেকে ওর ওই চাঁদমুখ একবারও দেখতে পেলাম না।’
দিব্যর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। কায়েফের মতো প্রাণবন্ত ছেলের এমন আচারণ স্বাভাবিক ঠেকল না তার কাছে। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আচ্ছা বাদ দে, আমাদের তো এখনই ফিরতে হবে। এমনিতে খুব বেশি লোকজন তো আর যাচ্ছে না। তুই বরং যাওয়ার আগে একবার ওকে দেখে আসতিস। শরীরটা যদি বেশি খারাপ না হয় তবে এই বিয়েতে ও যাবে না বলবে এটা বিশ্বাস করা একটু কঠিন।কলরবের সাথে ওর বন্ধুত্বের কথা তো জানিস৷’
কাব্য পা চালিয়ে গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে ঘড়ির দিকে তাকাল,
‘এখন চল। দেরি হয়ে যাচ্ছে। ফিরে এসে না হয় ওকে দেখে নেব।’
বরযাত্রী পৌঁছাতে খুব একটা সময় লাগল না। দুই বাড়ির দূরত্ব অতটাও না। নিযানাকে নিয়ে ওরা দ্রুতই রওনা হলো তালুকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাড়িতে পা রাখতেই শুরু হলো বৌভাতের জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা। দুধ-আলতা গায়ের রঙের নিযানাকে যখন লাল টুকটুকে বেনারসি আর ভারী সোনার গহনায় সাজিয়ে স্টেজে বসানো হলো। তখন তাকে অপার্থিব সুন্দরী লাগছিল। পাশে বসে আছে কলরব। তার চোখেমুখে কোনো আনন্দের লেশ নেই বরং এক তীব্র ও অবদমিত আক্রোশ যেন ঝরে পড়ছে প্রতিটা নিঃশ্বাসে। অলেখা বেগমের সুবাদে কলরব পেয়েছে ধবধবে ফর্সা গায়ের রং। বিপরীতে আরশাদ তালুকদারের গায়ের রং চাপা হওয়ায় দিব্য আর কুহু দুজনেই কিছুটা শ্যামলা বরণ পেয়েছে। তবে আজ এই বৈরিতার মাঝেও পাশাপাশি বসা নবদম্পতিকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন বিধাতা নিজ হাতে তাদের মানানসই করে গড়েছেন। দুইজনকে খুব সুন্দর মানিয়েছে। খাওয়া-দাওয়ার ধুম পড়ে গেছে চারদিকে। দিয়া আজ বড্ড অবাধ্য হয়ে উঠেছে। কিছুতেই খেতে চাইছে না। নবনী যখন দিয়াকে সামলাতে ব্যস্ত ঠিক তখনই দিব্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর তার কানে এল। অবচেতন মনেই সেদিকে তাকাতেই নবনীর বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। দিব্যর সামনে দাঁড়িয়ে আছে অসীম!
নবনী নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল। এই মানুষটাকে সে ঘৃণা করতে চায়। তার স্মৃতি ধুয়েমুছে ফেলতে চায়। ইদানীং সংসারের চাপে অসীমকে মনে করার ফুরসত পায় ও না। তবুও বুকের গভীরে লুকানো সেই পুরনো ক্ষতটা আজ যেন বড্ড বেশি টনটন করে উঠল। পৃথিবীতে সবচেয়ে অপছন্দের কাউকে ভালোবাসা যতটা কঠিন তার থেকে কয়েকগুন বেশি কঠিন ভালোবাসার মানুষকে ঘৃণা করা। নবনী কাছে আসতেই অসীমের অস্বস্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল। মেরুন রঙের শাড়ি আর মানানসই অলঙ্কারে নবনীকে আজ এতটাই স্নিগ্ধ আর মোহনীয় দেখাচ্ছে যে অসীমের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে না কেন তার এমন হচ্ছে। তার পাশেই তো দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটি। যার জন্য সে নবনীকে অবলীলায় ত্যাগ করেছিল। অসীমের কাছে এই মেয়েটিকেই নবনীর চেয়ে সেরা মনে হয়েছিল এবং তারা খুব শীঘ্রই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চলেছে। দিব্য অসীমের পাশে থাকা মেয়েটিকে ইশারায় দেখিয়ে নবনীকে উদ্দেশ্য করে বলল,
‘নবনী, উনি অসীমের বাগদত্তা। কয়েক দিনের মধ্যেই উনাদের বিয়ে। তুমি ওনাকে একটু ওদিকটায় নিয়ে যাও তো। দেখো, ওনার যেন কোনো অসুবিধা না হয়।’
নবনীর দৃষ্টি মেয়েটার ওপর স্থির হলো। মেয়েটির পরিপাটি মেকআপ আর আধুনিক পাশ্চাত্য পোশাক তাকে এক অন্যরকম আভিজাত্য দিয়েছে। স্বীকার করতেই হয়। সে অসম্ভব সুন্দরী। অসীমের পাশে তাকে বেশ মানিয়েছেও। নবনীর বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য দুমড়েমুচড়ে গেল। তবে কি এই রূপের চাকচিক্যই ছিল তাকে অনায়াসে ত্যাগ করার মূল কারণ? মেয়েটা সৌজন্যের হাসি হেসে হাত বাড়িয়ে দিল,
‘হ্যালো, আমি রশনী।’
নবনী নিজের ভেতরের ঝড় গোপন করে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুলল। হাত মিলিয়ে ধীর গলায় বলল,
‘আমি নবনী। আসুন আমার সাথে। আর হ্যাঁ, অসীম এবং আপনাকেও কনগ্রাচুলেশন।’
অসীম শুধু এক পলক নবনীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তাতে অপরাধবোধ ছিল নাকি অবজ্ঞা তা বোঝা গেল না। রশনী নবনীকে একবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসল। তারপর আড়চোখে দিব্যর দিকে তাকিয়ে পুনরায় নবনীর দিকে ফিরে বলল,
‘ধন্যবাদ।’
অনুষ্ঠান তখন শেষের দিকে। গোধূলির আলো ফিকে হয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রম। তালুকদার বাড়িতে এক ভারী স্তব্ধতা নেমে এল। আনতাসারা নিযানাকে রেখে বিদায় নেবেন। প্রথা অনুযায়ী এটি ব্যতিক্রম হলেও বিচ্ছেদের মুহুর্তটা তো একই করুণ। নিযানা তখনো পাথরপ্রতিম। তার চোখে জল নেই। মুখে হাসি নেই। এক কিশোরী বধূর যে চাঞ্চল্য থাকার কথা তার বদলে সেখানে বিরাজ করছে এক গুমোট নির্লিপ্ততা। আনতাসা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন কিন্তু নিযানা সবার আড়ালে অত্যন্ত সন্তর্পণে নিজেকে মায়ের বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিল। আনতাসা অবাক হলেন না; তিনি জানেন মেয়ের এই পাহাড়সম অভিমান গলতে সময়ের প্রয়োজন। নিযানার বাবা, নওয়াজ চৌধুরী এগিয়ে এলেন। কম্পিত হাতে কলরবের হাতের ওপর নিযানার কোমল হাতটি রাখলেন। পৃথিবীর যেকোনো বাবার জন্য এটিই বোধহয় সবচেয়ে দহনকাল। নিজের তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নটাকে সারাজীবনের জন্য অন্য কারো জিম্মায় সপে দেওয়া। নওয়াজ চৌধুরীর চোখের কোণ অশ্রুতে চিকচিক করে উঠল। তার কণ্ঠস্বর আবেগে থরথর করে কাঁপছে। ধরা গলায় বললেন,
‘দেখো কলরব, আজ সবাই দেখছে আমি আমার মেয়েকে বিদায় দিচ্ছি কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি নিজের কলিজাটা ছিঁড়ে তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি। ছোটবেলা থেকে ওকে ফুলের টোকাটি পর্যন্ত লাগতে দিইনি। বড্ড আদরে আগলে রেখেছি ওকে। পারলে সারা জীবন নিজের বুকের ভেতরেই ওকে লুকিয়ে রাখতাম কিন্তু নিয়তির কাছে আমি নিরুপায়। তবুও এই ভেবে কিছুটা শান্তি পাচ্ছি যে। ওকে কোনো অচেনা পরিবেশে পাঠাতে হচ্ছে না। সত্যি বলতে এই মুহূর্তে আমি ওর বিয়ে দিতে একদমই প্রস্তুত ছিলাম না; শুধু তোমার বাবা আর ফুফুর সনির্বন্ধ অনুরোধে মত দিয়েছি। আজ থেকে তোমাদের সম্পর্কের সমীকরণ বদলে গেল। সংসার বড় কঠিন জায়গা বাবা। এখানে মান-অভিমান থাকবেই। কিন্তু তুমি ওকে বিয়ে করেছ মানেই এই নয় যে। ওর সাথে খুশি করার অধিকার পেয়ে গেছ।’
কলরব পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চারপাশের এই কান্নাকাটি, উপদেশ আর আবেগি পরিবেশটাকে চরম ‘ন্যাকামি’ বলে মনে হচ্ছে। বুকের ভেতরটা তার বিষাক্ত হয়ে আছে। পরিস্থিতির চাপে সে কেবল মুখ বুজে সবটুকু সহ্য করে যাচ্ছে। নওয়াজ চৌধুরী নিজের চশমাটা মুছে নিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর আবারও অত্যন্ত ভারাক্রান্ত গলায় বললেন,
‘যদি কখনো কোনোদিন মনে হয় তুমি আর আমার মেয়ের সাথে থাকতে পারছ না কিংবা ওকে সহ্য করা তোমার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে; তাহলে তুমি নিযানাকে কিছু বোলো না। সরাসরি আমাকে খবর দিও। আমি যেভাবে আজ ওকে তোমার হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি; ঠিক সেভাবেই ওকে আমার বুকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব।’
পরিস্থিতি কিছুটা হালকা করতে আরশাদ তালুকদার এগিয়ে এসে নওয়াজ চৌধুরীর কাঁধে হাত রাখলেন। অভয় দিয়ে তিনি মৃদু স্বরে বললেন,
‘কী সব বলছ ভাই! আমার ওপর কি তোমার বিন্দুমাত্র ভরসা নেই? নিযানা শুধু তোমার মেয়ে নয়। ও তো আমাদের ও মেয়ে। ছোট থেকে দেখছি ওকে। তুমি নিশ্চিত থাকো। ও এখানে আগের মতো আদরেই থাকবে।’
নওয়াজ চৌধুরী মৃদু হাসলেন। তিনি আরশাদ তালুকদারের হাত চেপে ধরে ধরা গলায় বললেন,
‘না না ভাইয়া, আপনার ওপর বিশ্বাস থাকবে না কেন? তবে দিনশেষে নিযানাকে তো কলরবের সাথেই বাকিটা জীবন কাটাতে হবে। আমি শুধু ভবিষ্যতের কথা ভেবে বলছি। কলরব আমার মেয়েটাকে অন্তত কোনো আঘাত দিয়ো না। আমি বেঁচে থাকতে সেটা সহ্য করতে পারব না। ওর খেয়াল রেখো কেমন?’
আরশাদ তালুকদার আবারও আশ্বস্ত করলেন। নওয়াজ চৌধুরী যখন নিযানার দিকে তাকালেন। এতক্ষণ পাথর হয়ে থাকা মেয়েটি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক বুক হাহাকার নিয়ে সে ডুকরে কেঁদে উঠল এবং ঝাপটে ধরল তার বাবাকে। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকা নিযানাকে দেখে নওয়াজ চৌধুরীও শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শেষ কবে তিনি এভাবে কেঁদেছিলেন? তা হয়তো স্মৃতির পাতায় ধুলো জমে গেছে। বেশ দীর্ঘ সময় নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় নিলেন নওয়াজ চৌধুরী ও তার পরিবার। ওরা বিদায় নিতেই শুরু হলো গৃহপ্রবেশের আনুষ্ঠানিকতা। ছেলের বউ হিসেবে অলেখারই বরণ করে নেওয়ার কথা ছিল কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল। অনেক অনুনয়-বিনয় আর বোঝানোর পরেও তিনি নিজের ঘরের দরজা খুললেন না; সকাল থেকে একবারের জন্যও বের হননি তিনি। অলেখার এই অনুপস্থিতি উপস্থিত আত্মীয়স্বজনের মাঝে এক অস্বস্তিকর গুঞ্জনের সৃষ্টি করল। শেষমেশ কোনো উপায় না পেয়ে মাজহা একাই ওদের বরণ করে ঘরের ভেতর প্রবেশ করালেন।
নিযানা নিপুণভাবে সাজানো ফুলশয্যার ওপর আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। ঘরের দরজার ওপাশে হইহুল্লোড় দলা পাকিয়েছে। কাজিনদের ছোটখাটো একটা দল রীতিমতো ব্যারিকেড দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে কাব্য আর কলরবের বন্ধুরা ওকে একপ্রকার জোর করেই টেনেহিঁচড়ে দরজার সামনে নিয়ে এসেছে। দলের মূল হোতা মৌনিতা বেশ চড়া গলায় দাবি তুলল,
‘পুরো পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগবে। তবেই দরজা ছাড়ব। জলদি বের করো ভাইয়া!’
কলরবের দুচোখে তখন রাজ্যের নির্লিপ্ততা। সে এক মুহূর্ত মৌনিতার দিকে তাকিয়ে থেকে অত্যন্ত নিরুত্তাপ গলায় জবাব দিল,
‘আমার কাছে এই মুহূর্তে পঞ্চাশ টাকাও নেই। ছাড়লে ছাড়ো। নয়তো অন্য কোনো ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ছি। এই মস্ত বড় বাড়িতে শোয়ার মতো ঘরের অন্তত অভাব নেই।’
কথাটা ঘরের ভেতরে নিযানার কানে পৌঁছাতে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। এটা কলরব। ওর থেকে এই ধরনের অসংলগ্ন উত্তর ছাড়া আর কী-ই বা আশা করা যায়! এদিকে মৌনিতা তো রীতিমতো আকাশ থেকে পড়ল। পরিস্থিতি যে কতটা সঙ্গিন সেটা সে আঁচ করতে পারলেও। এই মুহূর্তে কলরবকে আর বেশি রাগানোর সাহস পেল না। সে কিছুটা চুপসে গিয়ে করুণ স্বরে বলল,
‘এটা কেমন কথা ভাইয়া? তোমার ভাই-বোনেরা কত আশা নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। আর আজকে তোমাদের বাসর রাত! তুমি কেন অন্য ঘরে শুতে যাবে?’
কলরব কোনো প্রত্যুত্তর করল না। তার আসলে এই সাজানো-গোছানো ঘরের ভেতর পা রাখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। বুকের ভেতর যে আগ্নেয়গিরিটা দাউদাউ করে জ্বলছে; তাতে যেন সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়ে এই বন্দী দশা থেকে মুক্ত হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। কাব্য ছোট ভাইয়ের এই অস্থিরতা বুঝতে পেরে পকেট থেকে একটি টাকার বান্ডিল বের করে মৌনিতার দিকে বাড়িয়ে দিল।
‘এখানে যা আছে তা নিয়েই আপাতত খুশি থাকো। আর পথ ছাড়ো। এমনিতে অনেক রাত হয়ে গেছে। তুমি বড় ভাবি হও একটু তো চক্ষুলজ্জা থাকা উচিত! দেবরের পকেটের শোচনীয় অবস্থাটা কি বুঝতে পারছ না?’
মৌনিতা টাকার বান্ডিলটা হাতে নিয়ে একটু মুখ ভেঙিয়ে বলল,
‘আসছে! বুঝেছি বলেই তো কম চেয়েছি।’
কাব্য বাঁকা হেসে টিপ্পনী কাটল, ‘এটা যদি তোমার কাছে ‘কম’ হয় তবে বেশি চাইলে কি ওর ভাগের সম্পত্তি ও লিখে নিতে চাইতে?’
মৌনিতা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল, ‘বাজে কথা বলো না তো কাব্য! এখানে ঠিক কত আছে শুনি?’
কাব্য নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দিল, ‘যত আছে ততই আছে। এটায় নিতে হবে। উপায় নেই।’
‘নাটক না করে পরিমাণটা বলো!’
‘ত্রিশ।’
মৌনিতা চোখ কপালে তুলে বলল, ‘অসম্ভব! ত্রিশ হাজারে হবে না। আমাদের দাবি পঞ্চাশ।’
কাব্য একটু বিরক্তই হলো। সে কলরবের কাঁধে হাত রেখে দরজার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ঠিক আছে, তোমাকে নিতে হবে না। এই কলরব, চল আমার সাথে। তুই আজ অন্য ঘরেই থাকবি। আমার তোর কথা আগেই মানা উচিত ছিলো।’
মৌনিতার আত্মবিশ্বাস টিকলো না। মিনমিন করে বলল,
‘আচ্ছা ঠিক আছে, হয়েছে! ভাইয়া এই ঘরেই থাকুক। কিন্তু তুমি আজ নিজের ঘরে ঢুকতে পারবে না। তোমাকে আজ অন্য ঘরেই কাটাতে হবে। এই তোমরা সবাই চলো আমার সাথে!’
কথাটা বলেই মৌনিতা বিজয়ের হাসি হেসে দলবল নিয়ে করিডোর ধরে হাঁটা ধরল। চারপাশ থেকে কাজিনদের হো হো হাসির শব্দ ভেসে এল। কাব্য অত্যন্ত নিরীহ আর করুণ চোখে মৌনিতার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বিড়বিড় করে বিরক্ত গলায় বলল,
‘তুমি সবসময় সুযোগ পেলেই আমাকে জব্দ করো তাই না? স্বামী নির্যাতনের কোনো জুতসই কেস যদি থাকত; তবে তুমি কক্ষনো জেল থেকে বের হতে পারতে না মৌনিতা! সারা জীবন ওখানেই ঘানি টানতে হতো তোমাকে।’
কাব্যর এই অসহায় উক্তিতে করিডোরে হাসির রোল আরও একবার উঠল। কাব্যসহ বাকিরা চলে যাওয়ার পর করিডোরের কোলাহল এক নিমিষেই মিলিয়ে গেল। কলরব স্তব্ধ হয়ে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রইলো। বাইরের পৃথিবীর শব্দগুলো গায়েব হতেই নিযানার বুকের ভেতরটা কেমন এক অজানা অস্বস্তিতে মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের বর্তমান অবস্থানের কথা ভাবতেই তার সর্বাঙ্গে এক সূক্ষ্ম কাঁপন খেলে যাচ্ছে। হৃদস্পন্দন যেন অবাধ্য হয়ে নিজের কানেই আছড়ে পড়ছে বারবার। রক্তিম স্বচ্ছ ওড়নার ঘোমটার আড়াল থেকেও নিযানা স্পষ্ট টের পেল। কলরব ঘরে ঢুকেছে। এই চঞ্চল, খামখেয়ালি ছেলেটা আজ থেকে তার স্বামী। তার সারা জীবনের সঙ্গী। ভাবতেই নিযানা এক অদ্ভুত আড়ষ্টতায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল। একটা অন্যরকম অনুভূতি যা আগে কখনো সে অনুভব করেনি।
এই অবেলায় পর্ব ১৩
কিন্তু কলরব কোনো বাক্যব্যয় করল না। এমনকি নিযানার ঘোমটা সরিয়ে একবার দেখার সামান্য চেষ্টাও করল না সে। অত্যন্ত নিরাসক্ত ভঙ্গিতে আলমারি থেকে নিজের পোশাক বের করে নিয়ে নিঃশব্দে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। পরক্ষণেই ওয়াশরুম থেকে ঝরনার অবিরাম জল পতনের শব্দ ভেসে আসতে লাগল। বেশ অনেকটা সময় পার হয়ে গেল কিন্তু কলরব বের হওয়ার কোনো নামগন্ধ নেই। নিযানা এবার বেশ বিরক্ত হয়ে উঠল। বিরক্তিতে সে নিজেই নিজের ঘোমটাটা এক ঝটকায় সরিয়ে সেদিকে তাকাল। জীবনে আজই প্রথম শাড়ি পরেছে সে। তার ওপর ভারী গয়নার বিড়ম্বনা। শাড়ির ভাঁজে আর গয়নার ভারে সে রীতিমতো নাজেহাল হয়ে পড়েছে। আর সামান্য একটা শেরওয়ানি আর কোট পরে এই ছেলের কী এমন অসহ্য কষ্ট হলো যে; যুগের পর যুগ ধরে এভাবে গোসল করতে হচ্ছে!
