এই অবেলায় পর্ব ১৫
সুমনা সাথী
দরজায় খট করে শব্দ হতেই নিযানা সচকিত হয়ে উঠল। বুকের ভেতরের অবাধ্য কাঁপনটা মুহূর্তেই তীব্রতর হলো। নিজেকে নিজে শান্ত করার চেষ্টা করল ও। আশ্চর্যের বিষয় তো! এ তো সেই চেনা কলরব। একে এত ভয় পাওয়ার কী আছে? কলরব ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল। তার পরনে এখন কালো প্যান্ট আর একটি কালো টি-শার্ট। ভেজা চুলগুলো সাদা তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নার দিকে তাকিয়ে কলরব একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আরশাদ তালুকদার দক্ষ হাতে ঘরের সবকিছুই প্রায় আগের মতো করে দিয়েছেন; ভাঙা আয়নাটাও বদলে নতুন লাগানো হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই যে গত রাতে এই ঘরটি এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। নিযানা বিছানায় বসে আড়চোখে কলরবকে দেখছিল।
মনে মনে একরাশ বিস্ময় দানা বাঁধল তার। ছেলেটা কথা বলছে না কেন? অন্তত এটুকু তো বলাই যায়। নিযানা, তুইও ক্লান্ত, ফ্রেশ হয়ে নে অথবা ঘুমিয়ে পড়। কোনো সৌজন্যবোধ কি ওর নেই? ঠিক তখনই নিযানার মনে পড়ল মৌনিতার শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো। মৌনিতা বারবার বলেছিল, কলরব ঘরে এলে তাকে যেন অন্তত একবার সালাম করা হয়। নিযানার প্রচণ্ড সংকোচ আর আড়ষ্টতা বোধ হলো। তবুও সে বিছানা ছেড়ে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। কলরব তখন হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকাতে ব্যস্ত। নিযানা পা টিপে টিপে ওর কিছুটা কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই আয়নার প্রতিবিম্বে তার ছায়া ভেসে উঠল। কলরব ড্রায়ার থামিয়ে ঝট করে পেছনে ঘুরে তাকাল। সে কিছুই বলল না। শুধু তীক্ষ্ণ আর হিমশীতল দৃষ্টিতে নিযানার আপাদমস্তক বিদ্ধ করতে লাগল। নিযানা আড়ষ্টতায় কুঁকড়ে গেলেও নিয়ম রক্ষার খাতিরে নিচু হয়ে সালাম করতে চাইল। কিন্তু এক মুহূর্তের ব্যবধানে কলরব ছিটকে অনেকটা পেছনে সরে গেল। তার কণ্ঠস্বর কড়া,
‘সমস্যা কী তোর? ঠিক কী চাস তুই?’
নিযানা বিস্ময়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। পুরোপুরি বোকা বনে যাওয়ার মতো অবস্থা তার। আশ্চর্য! সে আবার কী চাইবে? সে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
‘এটা তো নিয়ম। ভাবি বলেছে আমাকে করতে। তাই করা। নয়তো আমারও কোনো শখ নেই তোমার পায়ে পড়ার।’
নিযানার এই সোজাসাপ্টা উত্তর যেন আগুনের ওপর ঘি ঢালল। কলরব আচমকা এগিয়ে এসে নিযানার একটি বাহু সজোরে চেপে ধরে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে আনল। কলরবের এই আকস্মিক রুক্ষ আচরণে নিযানা পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। ওর চোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি ঠিকরে বের হচ্ছে। নিযানা এই অহেতুক রাগের কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পেল না। সে যখন বিমূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তখন কলরব দাঁতে দাঁত পিষে অত্যন্ত ধিক্কারের স্বরে বলল,
‘পায়ের পড়ার শখই যদি না থাকবে। তবে এই বিয়েটা করতে রাজি হয়েছিস কেন?’
রাগের বশবর্তী হয়ে কলরব নিযানার বাহুতে সজোরে চাপ প্রয়োগ করল। ব্যথায় নিযানার চোখমুখ কুঁচকে এল। তার সুকোমল ত্বকে কলরবের আঙুলের ছাপ বসে যাচ্ছে। এই আচরণের গূঢ় রহস্য তার বোধগম্য না হলেও অবজ্ঞা আর অপমানের তীক্ষ্ণ শরগুলো ঠিকই তার বুক বিদ্ধ করল।চোখের কোণ দুটো মুহূর্তেই চিকচিক করে উঠল অশ্রুর ভারে। সে রুদ্ধ গলায় বলল,
‘লাগছে আমার! ছাড়ো, কী করছ তুমি?’
কলরব ছাড়লো না। অন্যহাতে নিজের বুকের বাঁ পাশে সজোরে আঘাত করল। উন্মত্তের মতো চিৎকার করে বলে উঠল,
‘লাগুক! আমারও এখানে প্রচণ্ড লাগছে। যখনই তোকে চোখের সামনে দেখছি। আমার মনে, মস্তিষ্কে, শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে এক ভয়াবহ যন্ত্রণা হচ্ছে। তুই কেন এমনটা করলি নিযানা?’
নিযানার মস্তিষ্ক যেন এক নিমেষে শূন্য হয়ে গেল। কলরব তাকে এতটা অপছন্দ করে? তাকে বিয়ে করতে হয়েছে বলে এতটা কষ্ট হচ্ছে ওর? নিযানা নিজেকে সামলে নিয়ে ধরা গলায় বলল,
‘তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি কেন এই বিয়েটা করেছি। তুমি যে কারণে ‘না’ বলতে পারোনি। আমিও ঠিক সেই কারণেই আজ এই সাজে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।’
কলরব ওর কথায় বাধা দিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে উঠল,
‘উঁহু! আমার আর তোর কারণ মোটেও এক নয় নিযানা। আমি ইরাকে ভালোবাসতাম। সেটা কি তুই জানতিস না? আব্বুকে এই বিয়েতে রাজি করাতে আমাকে কতটা অপমান আর লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে তা জানিস? শেষমেশ আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল বলেই কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু তুই? তুই তো তোর বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের মেয়ে। তোকে কি কেউ জোর করত? আর আমি? আমি তো কোনোকালেই তোর পছন্দের তালিকায় ছিলাম না। তবে কেন শেষ মুহূর্তে এই বিয়েতে রাজি হলি? একবার ‘না’ কি করতে পারলি না?’
নিযানার কানের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। বুকের গভীর থেকে এক অসহ্য যন্ত্রণার ঢেউ আছড়ে পড়ল তার কণ্ঠে। এতক্ষণ সব অপমান সব অবজ্ঞা নিভৃতে সয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও কলরব অন্য কাউকে ভালোবাসত; এই সত্যটা যেন তপ্ত সীসার মতো তার কানে বিঁধল। নিযানা কথা হারিয়ে ফেলল। তার নির্বাক উপস্থিতি দেখে কলরব পুনরায় কর্কশ স্বরে ধমকে উঠল,
‘তুই অবশ্য কী-ই বা বলবি? জীবনে তো কখনো মায়ের কথার ওপর কথা বলার সাহস পেলি না। সারাক্ষণ ‘হ্যাঁ মাম্মি, জি মাম্মি’ করে তো জীবনটা কাটিয়ে দিলি। বাইরে নিজেকে বড্ড স্মার্ট দেখাস অথচ আসলে তুই একটা বুদ্ধিহীন নিরেট বস্তু! কিন্তু বিয়ের মতো একটা বিষয় নিয়ে তুই সমঝোতা করলি কী করে? তাও আবার আমার সাথে? আমার সাথে তো তোর কোনোদিনই মতের হতে দেখিনি। তুই আমি আকাশ আর মাটির মতো। নাকি অন্য কোনো বিষয় ছিল? ঝগড়া করতে করতে কি শেষে ভালোবেসে ফেলেছিলিস আমায়? হুহ্?’
নিযানার সারা গা রাগে রি রি করে উঠল। ছেলেটার অসভ্যতা আর সীমা লঙ্ঘন করা কথাবার্তা তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল ওর। একহাতে গাল বেয়ে পড়া নোনা জলটুকু মুছে নিয়ে ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
‘তোমাকে ভালোবাসব? আমি? সিরিয়াসলি কলরব তালুকদার? নিজের আকাশকুসুম স্বপ্ন থেকে এবার একটু বাস্তবে ফিরে এসো। আমি আবারও বলছি। তোমাকে বিয়ে করার বিন্দুমাত্র শখ বা রুচি আমার ছিল না। কেবল পরিবারের বাধ্যবাধকতায় এই জাহান্নামে পা দিয়েছি!’
কলরব তাচ্ছিল্যে করে হাসল। তার চোখের মণি দুটো তখনও আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে। নিযানার আরও কাছে মুখ নিয়ে ধীর স্বরে বলল,
‘সেটা হলেই বরং আমার জন্য মঙ্গল। একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ নিযানা আমি ইরাকে পাগলের মতো ভালোবাসি। এই বিয়েটা কেবল আব্বুর সম্মান বাঁচাতে করেছি। কারণ আমার উপায় ছিলোনা। তোরা সবাই মিলে ঠান্ডা মাথায় আমাকে এই ফাঁদে ফেলেছিস! খবরদার আমার সাথে একদম ‘বউ বউ’ আচরণ করতে আসবি না। আমিও মরে যাচ্ছি না তোর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য। যার নিজেরই ভালোবাসার কেউ নেই। সে অন্যকে কী ভালোবাসবে? তোর বাবা-মা যদি তোকে সত্যিই ভালোবাসতো তবে তোর ক্যারিয়ার আর স্বপ্নের কথা চিন্তা না করে এভাবে আমার গলায় তোকে ঝুলিয়ে দিতেন না।’
কলরবের প্রতিটা শব্দ যেন বিষমাখানো তীরের মতো নিযানার আত্মসম্মানে বিঁধল। পুরো শরীরটা কেঁপে উঠল। এক তীব্র যন্ত্রণায় তার অন্তরাত্মা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। নিজের কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব শান্ত রেখে বলল,
‘মুখ সামলে কথা বলো কলরব। তুমি কিন্তু নিজের সীমা অতিক্রম করছ!’
কলরব হাসল। তার চোখে অনুসূচনার লেশমাত্র নেই। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
‘সত্যি কথা সবসময় তেঁতোই হয় নিযানা। আমি আমার সীমার মধ্যেই আছি। তোর সাথে কথা বলার রুচিটুকুও আমার নেই। এখন সর এখান থেকে!’
কলরব একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে নিযানাকে সরিয়ে দিল। তারপর টান টান হয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। নিযানা তখনো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। তার বুকের ভেতরটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে। হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে। জীবনে কখনো এতটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর অপমানের মুখোমুখি সে হয়নি। নিযানার মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। নিঃশব্দে তার গাল বেয়ে তপ্ত অশ্রুর ধারা নামতে শুরু করল। খানিক বাদেই কলরবের বিরক্ত কণ্ঠস্বর আছড়ে পড়ল,
‘সং-এর মতো দাঁড়িয়ে না থেকে অন্য কোনো ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ছিস না কেন? আলোর জন্য আমার সমস্যা হচ্ছে। ঘুম পাচ্ছে আমার।’
নিযানা বিস্ময়ভরা চোখে কলরবের দিকে তাকাল। এই ছেলেটাকে সে কোনোদিন শত্রু ভাবেনি বরং ওর উশৃঙ্খল কাজগুলো নিয়ে দুষ্টুমি আর মজা করাই ছিল নিযানার স্বভাব। অথচ সেই কলরব আজ তাকে আবর্জনার মতো ঘর থেকে বিদায় করতে চাইছে! সমান্য সম্মানবোধ কি তার জন্য আসছেনা। নিযানার আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করল না। সে দুহাতে চোখের পানি মুছে জিজ্ঞেস করল,
‘আমি কেন যাব?’
কলরব শান্ত গলায় জবাব দিল, ‘তুই যাবি না তো কে যাবে? এটা আমার ঘর।’
নিযানা মাথা উঁচু করে দাঁড়াল। দৃঢ়স্বরে বলল, ‘ভুল করছ কলরব। আজ থেকে এটা আমারও ঘর!’
ঘরের কৃত্রিম আলোয় দুজনের দৃষ্টির বিনিময় হলো। কলরব পুনরায় কোনো তিক্ত বাক্যবাণ ছোড়ার আগেই নিযানা ক্ষিপ্র পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের মূল আলোটা নিভিয়ে দিয়ে এক ঝটকায় নীলচে ড্রিম লাইটটা জ্বালিয়ে দিল সে। অন্ধকারের প্রতি তার আজন্ম এক ভয় কাজ করে। এক অদ্ভুত ফোবিয়া। কলরবের থেকে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখেই সে বিছানার এক কোণে শুয়ে পড়ল। কলরব মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। ওয়াশরুমে এতক্ষণ ধরে সে মনে মনে এই ছকটাই কষেছিল যে। বাবা-মায়ের এই আদুরে রাজকন্যাকে চরম অপমান আর রুক্ষ আচরণে অতিষ্ঠ করে তুলবে। ভেবেছিল নিযানা অভিমানে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে এবং এই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সম্পর্কের সেখানেই ইতি ঘটবে। কিন্তু এই মেয়ে তো তার সব হিসাব ওলটপালট করে দিচ্ছে! নিযানা ভাঙা গলায় বলল,
‘তোমার খুব বেশি সমস্যা হলে তুমি অন্য ঘরে চলে যেতে পারো।’
কলরবের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
‘দেখ নিযানা, এসব জেদ করে কোনো লাভ হবে না। তোকে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া বা স্পর্শ করা তো দূরের কথা; তোর মুখটাও আমি দেখতে চাই না। তার চেয়ে ভালো হয় নিজের মাকে সব খুলে বল আর এই নাটক শেষ কর। চলে যা এখান থেকে!’
নিযানা শান্ত গলায় বলল, ‘মুক্তি তোমার প্রয়োজন। তাই ডিভোর্সের কথা তুমিই গিয়ে তোমার বাবাকে বলো। কষ্ট যখন তোমার তখন লড়তে তোমাকেই হবে। আমি কেন তোমার অসভ্যতার জন্য সবার কাছে ছোট হতে যাব? আর একটা কথা শুনে রাখো খবরদার! স্বপ্নে বা ঘুমের ঘোরেও আমাকে স্পর্শ করার দুঃসাহস দেখাবে না।’
কলরব রাগে বিড়বিড় করে বলল, ‘খুব পস্তাবি তুই নিযানা। অনেক পস্তাবি!’
নিযানা আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। একরাশ কান্না দলা পাকিয়ে তার গলা আটকে দিয়েছে। সে কলরবের দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে রইল। নিজের মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। শত চেষ্টা করেও অবাধ্য চোখের জল সে আর রুখতে পারছে না। বিপরীত দিকে মুখ করে শুয়ে আছে কলরব। আচমকা তার পৌরুষদীপ্ত চোখ দুটোও ছলছল করে উঠল। জীবনের অঙ্কটা এত কঠিন কেন? কেন মুহূর্তের ব্যবধানে সবকিছু এমন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল? এই মেয়েটাকে তো সে কোনোদিন স্বপ্নের ঘোরেও নিজের পাশে ভাবেনি। বরং অন্য কারো আমানত হিসেবেই সে নিযানা কে দেখে এসেছে। আগলে রেখেছে। অথচ আজ নিয়তি তাকে কোথায় এনে দাঁড় করাল! সবচেয়ে বেশি তাকে দগ্ধ করছিল কায়েফের কথা। প্রেমিকা হারানোর যন্ত্রণার চেয়েও প্রিয় বন্ধু আর ভাইয়ের প্রতি করা এই বিশ্বাসঘাতকতার বোঝা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সে কীভাবে কায়েফের মুখোমুখি হবে? নিযানার মৃদু ফোঁপানির শব্দ কলরবের কানে আসছে।মেয়েটা কাঁদছে। এক বুক অভিমান আর অপমান নিয়ে।
রাতের গাঢ় অন্ধকার চিরে ভোরের আলো ফুটতেই ধরণী এক স্নিগ্ধ আভায় জেগে উঠল। চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। রোদের তেজও ধীরে ধীরে চড়াও হতে শুরু করেছে। দিব্য অভ্যাসমতো অনেক আগেই উঠেছিলো। শরীরচর্চা শেষ করে ঘরে ঢুকতেই তার চোখে পড়ল এক অপূর্ব দৃশ্য। নবনী আর দিয়া দুজন দুজনার নিবিড় আলিঙ্গনে গভীর ঘুমে মগ্ন। দিয়া ছোট হাতে নবনীকে পরম নিশ্চিন্তে জড়িয়ে ধরে আছে। নবনী নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে চেষ্টা করছে এই মাতৃহীন মেয়েটার শূন্যস্থান পূরণ করতে। ওদের এই অকৃত্রিম বন্ধন দেখলে ঘুণাক্ষরেও বোঝার উপায় নেই যে ওদের রক্ত এক নয়। দিব্যর মনের কোণে আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলে গেল। তার মনে হলো। নবনীকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তটি ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সঠিক সিদ্ধান্ত। বাইরের কোনো অচেনা মেয়ে কি পারত দিয়াকে এমন নিঃস্বার্থভাবে আগলে রাখতে?
দিব্যর কেবল নিজের মনের ওপর আক্ষেপ হয়। যদি তার মনটা একটু নরম হতো। তবে হয়তো সম্পর্কের এই বৃত্তটা পূর্ণতা পেত। তবুও তার মনে এক অজানা ভয় কাজ করে। নবনী কি তাকে কোনোদিন মন থেকে আপন করে নিতে পারবে? হৃদয়ের টান যদি জোরালো না হয়। তবে জাগতিক সব সম্পর্কই বৃথা। দিব্য ওদের দিকে চেয়ে মৃদু হাসল। পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল বিছানার পাশে। নিচু স্বরে ডাকল,
‘নবনী, নবনী উঠে পড়ো। আর কতক্ষণ ঘুমাবে? দিয়া মাম্মা, উঠে পড়ো তো সোনা। আজ তোমার স্কুল আছে।’
নবনী ঘুমের আবেশে মুখটা একটু কুঁচকালো। দিব্যর তা দেখে হাসি পেলেও সে আবারও ডাকল। এবার নবনী ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। দিয়া অবশ্য কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে উল্টো দিকে ঘুরে পুনরায় ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল। নবনী পিটপিট করে চোখ মেলতেই সামনে দিব্যর শান্ত চেহারাটা ভেসে উঠল। মুহূর্তেই সে একরাশ সংকোচ আর আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল। উঠে বসে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
‘আজকেও আপনি আগে উঠে গেছেন! আপনাকে কতবার বলেছি আপনি যখনই জাগবেন আমাকে ডেকে দেবেন। ছিঃ ছিঃ কত বেলা হয়ে গেছে!’
নবনী তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নামতে গেল। দিব্য তার অস্থিরতা দেখে অত্যন্ত ধীর গলায় বলল,
‘শান্ত হও নবনী, রিল্যাক্স! অতটাও বেলা হয়নি। কাল রাত অবধি তোমরা সবাই অনুষ্ঠান নিয়ে বড্ড খাটাখাটনি করেছ। তাই ভাবলাম আরেকটু ঘুমাও। অহেতুক ডাকার প্রয়োজন মনে করিনি।’
নবনী কিছুটা আমতা আমতা করে অপ্রস্তুত গলায় বলল,
‘আপনি বুঝবেন না। বাড়িতে কত মেহমান। বড়রা সবাই জেগে গেছেন নিশ্চয়ই। আপনি কি আজ একটু কষ্ট করে দিয়াকে জাগিয়ে রেডি করে দিতে পারবেন? আমাকে একটু জলদি নিচে যেতে হবে।’
দিব্য ওর অস্থিরতা দেখে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল,
‘আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যাও। দিয়াকে আমি দেখে নিচ্ছি।’
নবনী কালবিলম্ব না করে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সিঁড়ির মুখে মাজহার সাথে দেখা হতেই তিনি নিচু স্বরে বললেন কলরব আর নিযানাকে ডেকে দিতে। বড়রা গিয়ে নতুন দম্পতির দরজায় কড়া নাড়াটা কেমন যেন দেখায়। তাই নবনীকেই দায়িত্বটা নিতে হলো। নবনী ধীর পায়ে কলরবের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা হাহাকারে ভরে উঠল। এই বাড়িতে আসার পর থেকে সে কলরবকে সবসময় এক চঞ্চল, প্রাণবন্ত ছেলে হিসেবেই দেখেছে। যার হাসিতে সারা বাড়ি মুখরিত থাকত। সেই ছেলেটার বিয়ের আনন্দ মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল। ভাবতেই নবনীর ভীষণ মন খারাপ হলো। ভালোবেসে না পাওয়ার দহন যে কতটা প্রখর তা নবনীর চেয়ে ভালো আর কে জানে! তবুও সে মনে মনে দোয়া করল। নিয়তি যেন এই নবদম্পতিকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। যার ভাগ্যে যাকে লেখা আছে তার কাছে তার শান্তি মিলুক। সেখানে যেন অতীতের সব জরা ধুয়ে মুছে নতুন করে সুখের সূর্য ওঠে। দরজায় কয়েকবার আলতো করে ধাক্কা দিয়ে নবনী ডাকল,
‘ভাইয়া, দরজা খোলো। তোমরা কি উঠেছ? নিযানা?’
দরজার শব্দ আর নবনীর ডাকে নিযানার তন্দ্রা ছুটে গেল। এমনিতে সারারাত ঠিক করে ঘুমাতে পারেনি। শেষ ভোরের দিকে কখন যেন একটু চোখ লেগেছিল। উঠে বসতেই সারা শরীরে এক অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করল ও। রাগের মাথায় কাল রাতে ভারী শাড়ি আর গয়না কিছুই খোলা হয়নি। সেই অবস্থাতেই সারারাত পড়ে ছিল। বিছানার পাশে তাকাতেই দেখল কলরব সেখানে নেই। এত সকালে ছেলেটা কোথায় গেল? অথচ দরজা তো ভেতর থেকেই বন্ধ। নিযানা ভাবল কলরব হয়তো ওয়াশরুমে আছে। তাই সে নিজেই গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। নবনী দরজায় নিযানাকে দেখে স্নিগ্ধ হেসে বলল,
‘গুড মর্নিং! আসলে নিচে সবাই তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে তো। তাই ডাকতে এলাম। ভাইয়া কি এখনো ঘুমাচ্ছে?’
নিযানা ক্লান্ত চোখে মাথা নাড়ল। ধীর স্বরে বলল, ‘গুড মর্নিং। তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভেতরে এসো না।’
নবনী ঘরের ভেতর পা রাখতেই থমকে গেল। কলরবকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কোথায় গেল ছেলেটা। নিযানার দিকে তাকিয়ে নবনী থমকালো। মেয়েটার টানা টানা চোখ দুটো আজ ফোলা। সারা মুখে একরাশ বিষণ্ণতা লেপ্টে আছে। নবনী অভিজ্ঞ মানুষ। সে বুঝতে পারল নিযানা কতটা বিধ্বস্ত। তাকে আর কোনো অপ্রস্তুত প্রশ্নে জর্জরিত না করে আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করে নিযানার হাতে রাখল। এগুলো কেনার পর তারাই গুছিয়ে রেখেছিলো। শান্ত গলায় বলল,
‘একটু ফ্রেশ হয়ে এটা পরে নিচে চলে এসো, কেমন?’
ঠিক সেই মুহূর্তেই করিডোর থেকে দিব্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। সে বেশ উচ্চস্বরে নবনীকে ডাকছে। নিযানা কোনো কথা বলল না। শুধু একবার ম্লান চোখে নবনীর দিকে তাকাল। নবনী তাকে আশ্বস্ত করে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। মনে মনে একটু বিরক্তও হলো সে। একটু পর পর এভাবে ডাকার কী আছে! করিডোরে পা রাখতেই দিব্যর মুখোমুখি হলো সে। দিব্যর কপালে বিরক্তির ভাঁজ। সে কিছুটা কড়া গলায় বলল,
‘কখন থেকে তোমায় ডাকছি? কী এমন করছিলে ভেতরে?’
নবনীর মেজাজ সত্যি একটু বিগড়ে গেল। এই বিশাল বাড়িতে ডাকলেই কি সবসময় শোনা যায়? তবুও নিজের বিরক্তিটুকু মনের আড়ালে চেপে রেখে শান্ত গলায় পালটা প্রশ্ন করল,
‘আপনার কোনো দরকার ছিল?’
দিব্যর কণ্ঠে গাম্ভীর্য নেমে এল। বলল, ‘হ্যাঁ। তুমি তো অসীমকে চেনো, তাই না?আজ রাতে ওর এনগেজমেন্ট আছে। আমাদের সেখানে যেতে হবে।’
নবনী থমকে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। দিব্য পুনরায় বলল,
‘আজ নিয়মমতো নিযানা রান্না করবে। তাই দুপুরের খাবারটা বাড়িতেই খেতে হবে। ভাবছি আজ আর অফিসে যাব না। তোমাকে আর দিয়াকে নিয়ে একটু শপিংয়ে বেরোব।’
নবনী এবার আকাশ থেকে পড়ল। সে অবাক চোখে দিব্যর দিকে তাকিয়ে রইল। বাড়িতে এখনো মেহমানের ভিড়, সবাই সকালের নাস্তা সেরে তবেই বিদায় নেবে। এই বাড়ির বড় বউ হিসেবে তার কাঁধে কি কোনো দায়িত্ব নেই? সে আমতা আমতা করে বলল,
‘আসলে… আমি কেন? বাড়িতে এখনো কত মেহমান আছে। তাছাড়া আমার তেমন কিছু কেনারও নেই।’
দিব্যর গম্ভীর গলায় বলল, ‘নবনী, তুমি আগে আমার বউ পরে এই বাড়ির। আর কেনাকাটার কি কোনো শেষ আছে? তোমাকে তো বিয়ের সময়ও তেমন বিশেষ কিছু দেওয়া হয়নি। এমনকি আমি খেয়াল করেছি। তুমি এর মধ্যেই একই শাড়ি কয়েকবার পরেছ। আজ রাতে একটা বিশেষ অনুষ্ঠানে যাবে। নতুন কিছু তো পরা উচিত।’
নবনী ক্ষণিকের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এই কাঠখোট্টা লোকটা তাকে এত সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করে! নবনীর ছোটখাটো প্রতিটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করে? বিস্ময় কাটিয়ে নবনী বলল,
‘ভাইয়ার বিয়ে উপলক্ষে তো কত কিছুই কেনা হলো। আপনি একটু বোঝার চেষ্টা করুন। আজ মেহমানদের রেখে আমার বাইরে যাওয়াটা মোটেও শোভন দেখাবে না। সবাই মনে মনে কী ভাববে বলুন তো?’
দিব্যর কপাল কুঁচকে এল। চোখের দৃষ্টিতে নেমে এল এক শীতল কাঠিন্য। কড়া গলায় প্রশ্ন করল,
‘তার মানে তুমি আমাকে রিজেক্ট করছো?’
নবনী বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়ে বলল, ‘এ্যাঁ? কী বলছেন এসব?’
দিব্য এক পা এগিয়ে এসে ওর খুব কাছে দাঁড়াল। ‘শোনো নবনী, দিব্য তালুকদার কারো সেকেন্ড অপশন হয়ে থাকতে শেখেনি। আমি যেখানে থাকব সেখানে আমার প্রাধান্যই সবার আগে হওয়া চাই। অথচ তোমার কাছে আমার চেয়ে এই বাড়ির মেহমান আর লৌকিকতা বড় হয়ে গেল? ইদানীং তুমি আমার সাথে বড্ড বেশি জেদ করছ।’
নবনী হতভম্ব হয়ে দিব্যর দিকে তাকিয়ে রইল। কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে লোকটা! সামান্য একটা শপিংয়ের বিষয়কে সে ‘প্রত্যাখ্যান’ আর ‘ইগো’র পর্যায়ে নিয়ে গেল? নিজেকে সারাক্ষণ গম্ভীর আর বয়স্ক ভাবা এই মানুষটার চিন্তাভাবনা এত অপরিণত আর জেদি হতে পারে। তা নবনীর কল্পনার বাইরে ছিল। ইচ্ছা করছিল মুখের ওপর কড়া দুটো কথা শুনিয়ে দিতে; লোকটা কি জানে না যে বাড়ির লোক কোনো কথা শোনালে সেটা নবনীকেই শুনতে হবে? কিন্তু নিজের স্বভাবজাত ধৈর্য দিয়ে সে নিজেকে সামলে নিল। শান্ত গলায় বলল,
‘আপনি ভুল বুঝছেন। আমি ওভাবে বলতে চাইনি। একটা কাজ করুন, আপনি একাই চলে যান। আমার জন্য শাড়ি নিয়ে এলেই হবে। আর হ্যাঁ, সাথে ম্যাচিং চুড়ি আনতে ভুলবেন না কিন্তু!’
নবনী যখন চুড়ির কথাটি বলল দিব্যর তপ্ত মেজাজ যেন এক মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ভুলটা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারল। মৃদু মাথা নেড়ে নিচু স্বরে বলল,
‘আচ্ছা। আর কিছু আনতে হবে?’
নবনী দুপাশে মাথা নেড়ে না সূচক ইশারা করল। দিব্য আর এক মুহূর্ত দেরি না করে গটগট পায়ে চলে গেল। নবনী ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল। লোকটা একটা রহস্যময় ধাঁধা।
নিযানা বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বিছানার ওপর বসে রইল। চারদিকের নিস্তব্ধতা যেন তাকে গ্রাস করতে চাইছে। হঠাৎ তার মনে এক খটকা লাগল। কলরব কি আদৌ ওয়াশরুমে আছে? সংশয় নিয়ে সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল এবং ওয়াশরুমের দরজায় একটা হালকা ধাক্কা দিল। আশ্চর্যের বিষয়, কোনো বাধা ছাড়াই দরজাটা একটা শব্দে খুলে গেল। ভেতরে উঁকি দিয়ে নিযানা দেখল। পুরো জায়গাটা শূন্য। নিযানার বিস্ময়ের সীমা রইল না। একটা বন্ধ ঘর থেকে আস্ত একটা মানুষ এভাবে কর্পূরের মতো উবে গেল কী করে? তবে এই রহস্য নিয়ে বেশিক্ষণ মাথা ঘামানোর বিলাসিতা তার নেই। সময়ের কাঁটা দ্রুত ছুটছে। সে তড়িঘড়ি করে একটা দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল সারল। শরীরের ক্লান্তি আর মনের গ্লানি দুই-ই ধুয়ে ফেলতে চাইল। কিন্তু বিপদ ঘটল গোসল সেরে বেরোনোর পর। শাড়িটা নিয়ে সে অথৈ সাগরে পড়ল। জীবনে কোনোদিন নিজের হাতে শাড়ি পরার অভিজ্ঞতা তার নেই। ঘরের দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিয়ে বারবার চেষ্টা করতে লাগল কিন্তু শাড়ির ভাঁজগুলো যেন অবাধ্য কোনো সাপের মতো তার হাত ফস্কে বেরিয়ে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় বলিষ্ঠ একটা করাঘাত পড়ল। নিযানা চমকে উঠে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘কে?’
বাইরে থেকে চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘আমি কুহু। কী করছিস ভেতরে? আমি কি আসতে পারি?’
নিযানা বেশ স্বস্তি পেল। গায়ে দ্রুত শাড়িটা কোনোমতে পেঁচিয়ে সে হন্তদন্ত হয়ে দরজা খুলে দিল। কুহু ভেতরে পা রাখতেই নিযানার বিধ্বস্ত আর চিন্তিত চেহারা দেখে থমকে গেল। নিযানা তড়িৎ গলায় বলল,
‘খুব ভালো হয়েছে তুই এসেছিস! কুহু, দয়া করে আমাকে একটু সাহায্য কর। আমি কিছুতেই এই শাড়িটা পরতে পারছি না।’
কুহু ধীর পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকল। নিযানার ভেজা চুল আর সতেজ অবয়ব দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল। সে নিযানাকে আপাদমস্তক পরখ করে কৌতুক মেশানো স্বরে বলল,
‘এক মিনিট দাঁড়া তো বাপু! তোকে না বড্ড জোর করে এই বিয়েতে রাজি করানো হয়েছিল? এর মধ্যেই দেখছি সব তিক্ততা ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেলেছিস! উঁহু উঁহু ব্যাপার কী বল তো?’
নিযানা মুহূর্ত কয়েকের জন্য পাথরের মতো নিথর হয়ে কুহুর দিকে তাকিয়ে রইল। কুহুর কথার ভেতরের ইঙ্গিতটা যখন তার মাথায় পরিষ্কার হলো তখন লজ্জার চেয়ে এক পাহাড়সম বিরক্তি আর ঘৃণা তার চোখেমুখে ভর করল। সে দাঁত চেপে ধমক দিয়ে উঠল,
‘জাস্ট শাট আপ কুহু! কী সব কথা বলছিস তুই? ছিঃ!’
কুহু খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে সে নিযানার একদম কাছে এসে দাঁড়াল এবং এক আঙুলে নিযানার গলার কাছে ইশারা করে বলল,
‘করলে বুঝি দোষ নেই আর বললেই দোষ? যদি সবটাই বাজে কথা হয় তবে তোর গলার এই দাগটা কিসের শুনি? এবার বল দেখি। এটাও কি আমার সাজানো কথা?’
নিযানা স্তম্ভিত হয়ে গেল। কুহুর কথায় নিজের গলার ওপর হাত বুলিয়ে সে এক ছুটে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গলার একপাশে লালচে হয়ে ওঠা সেই কালশিটে দাগটা স্পষ্ট ফুটে আছে। অসাবধানী কেউ দেখলে এটাকে অন্য কোনো গভীর সম্পর্কের চিহ্ন ভাবতে বাধ্য। নিযানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিল। আয়নার প্রতিবিম্বে নিজের ক্লান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,
‘তুই যা ভাবছিস মোটেও তেমনটা নয় কুহু। সারারাত ওই ভারী হারটা পরে ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হয়তো তারই ছাপ। কিংবা খোলার সময় কোনোভাবে লেগেছে। এবার দয়া করে তোর ওই উর্বর মস্তিষ্কের বাজে চিন্তাগুলো বন্ধ কর আর আমাকে এই শাড়িটা পরতে সাহায্য কর।’
কুহু হুট করে নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। যেন খুব বড় কোনো অনর্থ ঘটিয়ে ফেলেছে। তার চোখ দুটো ভয়ে বড় বড় হয়ে উঠল। সে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
‘ওরে বাবা! নিযানা, ভাইয়া কি ঘরেই আছে নাকি? আল্লাহ! আমি কী সব আজেবাজে কথা বলে ফেলেছি। তুই আমাকে আগে থামালি না কেন?’
নিযানা কুহুর অস্থিরতা দেখে কিছুটা ম্লান হাসল। সে ধীর পায়ে ওর কাছে এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল,
‘তোর গুণধর ভাই আপাতত ঘরে নেই। সুতরাং নিচিন্তে থাক। কোনো বিপদ নেই তোর।’
কুহু এবার স্বস্তির শ্বাস ফেলল। মনে মনে নিজের ওপরই বিরক্ত হলো সে। আজকাল কেন যে তার জিভের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না! আজ যদি কলরব এই কথাগুলো শুনত তখন। নিজেকে সামলে নিয়ে সে রাশভারী ভঙ্গিতে ধমক দিয়ে উঠল,
‘মেয়েমানুষ হয়েছিস অথচ এখনো একটা শাড়ি ঠিকমতো পরতে পারিস না? ছিঃ ছিঃ!’
নিযানা ভ্রু কুঁচকে পাল্টা প্রশ্ন করলো, ‘কেন, তুই বুঝি খুব পারিস?’
‘নাহ্, আমিও তো পারি না!’
নিযানা কুহুর দিকে চাইতেই কুহু এক গাল জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলল। নিজের অপ্রস্তুত ভাব ঢাকতে সে চটপটে গলায় বলল,
‘আরে বাবা, আমার কি বিয়ে হয়েছে নাকি? বিয়ের আগে ঠিক শিখে যাব দেখিস। তুই অত চিন্তা করিস না তো। আমি বরং নিচ থেকে ভাবিদের কাউকে ডেকে নিয়ে আসছি। ওরাই তোকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেবে।’
নিযানা চট করে কুহুর হাত চেপে ধরল। এই মুহূর্তে কাউকে ডাকা মানেই একরাশ কৌতূহলী প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া। যা তার বর্তমান মানসিক অবস্থায় সহ্য করা কঠিন। সে বাধা দিয়ে বলল,
‘কাউকে ডাকার দরকার নেই। তাতে আরও বেশি লজ্জার ব্যাপার হবে। বরং তোর ফোনটা দে। তাতেই কাজ হয়ে যাবে।’
কুহু অবাক চোখে তাকাল, ‘ফোন দিয়ে কী করবি?’
‘রেসিপি দেখব!’
কুহুর চোখ কপালে উঠল, ‘কিসের রেসিপি?’
নিযানা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আরে বাবা, টিউটোরিয়াল দেখব বলছি। দিবি কি না সেটা বল?’
কুহু হাসতে হাসতে তার বাম হাতে থাকা ফোনটা এগিয়ে দিল। এরপর শুরু হলো এক মহাযুদ্ধ।ইউটিউবের ভিডিও দেখে কয়েকবার কুঁচি ঠিক করে আর পিনের খোঁচা খেয়ে অবশেষে তারা শাড়িটা ঠিকঠাক অঙ্গে জড়াতে সক্ষম হলো। কুহু নিযানাকে বাড়ির বিশাল উঠোনে নিয়ে এল। বাড়িতে এখনো আত্মীয়স্বজনের সরব উপস্থিতি। মেহমানদের আপ্যায়নের জন্য বাবুর্চি বসানো হয়েছে। উঠোনের একপাশে সারি সারি চেয়ার-টেবিল পেতে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কুহু নিযানাকে নিয়ে একটি টেবিলে গিয়ে বসল। সেখানেই আগে থেকে মৌনিতা বসে ছিল। নিযানাকে একা দেখে মৌনিতা কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকাল। কৌতুহলী স্বরে প্রশ্ন করল,
‘ভাইয়া কোথায় নিযানা? তুমি একা কেন? ভাইয়া কি এখনো ঘুমাচ্ছে নাকি?’
মৌনিতার এই সাধারণ প্রশ্নে নিযানার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। উত্তর তার কাছে নেই৷ চারপাশের এই উৎসুক দৃষ্টির সামনে তাকে এক মিথ্যা অভিনয়ের আস্তরণ পরে থাকতে হচ্ছে। মৌনিতার কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর যখন সে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল। ঠিক তখনই মৌনিতার ঠোঁটের কোণে প্রসন্ন হাসি ফুটে উঠতে দেখে নিযানা পেছন ফিরে তাকাল। বিস্ময়ে তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। কলরব ধীর পায়ে বাড়ির ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসছে! এটা কীভাবে সম্ভব? যে মানুষটা ঘরে ছিল না। যাকে আসার পথে কোথাও দেখা গেল না। সে এভাবে ভেতর থেকে আবির্ভূত হলো কী করে? নিযানা ভাবল, হয়তো রাতে সে অন্য কোনো ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু বাড়ির এত মানুষের ভিড়ে কেউ কি তাকে লক্ষ্য করেনি? কলরব নির্বিকার ভঙ্গিতে গিয়ে বসলো তার বন্ধুদের আড্ডার মাঝে। কিছুক্ষণ বাদে মাজহা অনেকটা জোর করেই কায়েফকে টেনে নিয়ে এলেন। কায়েফের অবয়ব দেখে কলরবের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এক রাতের ব্যবধানে ছেলেটার শ্রী যেন ধুয়েমুছে গেছে; তাকে দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘদিনের কোনো কঠিন রোগে সে শয্যাশায়ী ছিল। কলরবের সাথে দৃষ্টি বিনিময় হতেই কলরব তড়িৎ গতিতে চোখ সরিয়ে নিল। কুহু ব্যতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘ভাইয়া, কী হয়েছে তোমার? এসেছে নাকি?’
কায়েফ শুধু মৃদু মাথা নাড়ল। শরীরে জ্বরের তপ্ত আঁচ ছিল ঠিকই তবে তার চেয়েও বেশি ভর করেছিল গত রাতে খাওয়া একগাদা ঘুমের ওষুধের ঘোর। চোখের পাতাগুলো যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে আসছে। তবুও মাজহা তাকে ছাড়েননি। তিনি বললেন,
‘সামান্য একটু জ্বর এসেছে বলে কি ঘরবন্দি হয়ে থাকবি নাকি? যা সোনা, গিয়ে তোর ভাইদের সাথে বস। দেখবি মনটা ভালো লাগবে।”
মাজহা ‘ভাই’ বলতে কলরবকেই ইশারা করলেন। কলরব একবার মুখ তুলে তাকাল কিন্তু কায়েফ সেই আহ্বানে সাড়া দিল কি না বোঝা গেল না। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে কুহুর পাশের চেয়ারটিতে ধপ করে বসে পড়ল। মাজহা ছেলের এমন বিমর্ষ আচরণে মনে মনে অবাক হলেও মুখে কিছু বললেন না বরং তার জন্য খাবারের থালা আনতে চলে গেলেন। খাওয়া শুরু হয়েছে। নিযানা আড়চোখে একবার কলরবের দিকে তাকাল; বন্ধুদের সাথে সে বেশ স্বাভাবিক অথচ কাল রাতের সেই বিধ্বংসী কলরবের সাথে এই মানুষটার কোনো মিল নেই। নিযানা হঠাৎ বিসুম খেল। কায়েফের দৃষ্টি অজান্তেই নিযানার ওপর গিয়ে পড়ল এবং পরক্ষণেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। লাল রঙের শাড়িতে নিযানা আজ যেন এক মূর্তিমতী বিষাদ-সুন্দরী। নাকে ছোট একটি নাকফুল, হাত ভর্তি চুড়ি আর গলায় সরু সোনার হার সব মিলিয়ে শুভ্র তনুতে তাকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে। কায়েফ জানে এই সৌন্দর্য দেখার অধিকার তার নেই। এমনকি তাকানোটাও মস্ত বড় অপরাধ। তবুও পোড়া মন মানতে চাইল না। এই সাজ তো তারই প্রাপ্য ছিল। এই রূপের অর্ঘ্য তো তাকেই দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিয়তি আজ তাকে এক করুণ দর্শকের আসনে বসিয়ে দিয়েছে। মৌনিতা মুচকি হেসে নিযানার দিকে জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে রসিকতা করল,
‘কী হলো নিযানা? সাবধানে খাও। বর তো তোমারই। পরেও অনেক দেখার সময় পাবে।’
নিযানা প্রবল অস্বস্তিতে লাল হয়ে গেল। কায়েফ আর এক মুহূর্ত সেখানে বসে থাকতে পারল না। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে তার। সে বসা থেকে ঝট করে উঠে দাঁড়াল। কাউকে কিছু না বলে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল। দূর থেকে কলরব নিস্পলক দৃষ্টিতে কায়েফের প্রস্থান দেখল।
বাইরের কাঠফাটা রোদ আর অসহ্য যানজটের ধকল সয়ে ঘণ্টাখানেক পর দিয়াকে নিয়ে ঘরে ফিরল দিব্য। বাড়ির উৎসবমুখর হইচই এখন অনেকটাই স্তিমিত; আত্মীয়স্বজন আর মেহমানদের অধিকাংশ বিদায় নিয়েছেন। কেবল পরিবারের সদস্যরাই এখন অবশিষ্ট। নবনী তখন আপনমনে আলমারি গোছাতে ব্যস্ত ছিল। দিয়াকে ঘরে ঢুকতে দেখেই সে হাতের কাজ ফেলে দুহাত বাড়িয়ে দিল। দিয়া এক ছুটে এসে নবনীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নবনী মেয়েটার নরম গালে পরপর কয়েকটা চুমু এঁকে দিল। দিয়া অত্যন্ত উৎসাহী গলায় বলল,
‘মাম্মা, তুমি জানো দিয়া আজকে কী করেছে?’
নবনী এক রাশ আগ্রহ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী করেছে আমার সোনা মা?’
দিয়া নিজের কপালে এক হাত ঠেকিয়ে হতাশ গলায় বলল,
‘উফ মাম্মা! আমি তো এখনো বলেইনি। তবে তুমি জানবে কী করে? আজকে আমাদের ক্লাসে একটা ড্রয়িং কম্পিটিশন ছিল। এবার বলো তো দিয়া সেখানে কী করেছে?’
দিব্য বলল, ‘তুমি না বললে মাম্মা তো কিছুই বুঝতে পারছে না। তুমিই বলে দাও !’
মুহূর্তেই নবনীর নজর গেল দিব্যর দিকে। দিব্য একহাতে পানির বোতল খোলার চেষ্টা করছে। পরক্ষণেই নবনীর চোখ আটকে গেল বিছানার ওপর। সেখানে কম করে হলেও দশ-পনেরো শপিং ব্যাগ স্তূপ করে রাখা। নবনী চোখ বড় বড় করে সেদিকে তাকিয়ে রইল। কি আছে এতে? দিব্য তালুকদার কি পুরো দোকানটাই আজ ঘরে তুলে নিয়ে এসেছেন? দিয়া নবনীর মনোযোগ ফেরাতে আবার বলল,
‘মাম্মা, তুমি কি আমার কথা শুনছ?’
নবনী নিজেকে সামলে নিয়ে বলল। ‘হ্যাঁ সোনা, বলো না কী হয়েছে?’
‘দিয়া আজ প্রতিযোগিতায় থার্ড হয়েছে!’
নবনী ওর গালে আরেকটা চুমু দিয়ে বলল, ‘বাহ! অনেক অনেক অভিনন্দন আমার সোনা মাকে।’
দিয়া এবার ওর গলায় ঝোলানো চকচকে মেডেলটা নবনীকে দেখিয়ে বলল,
‘এই দেখো আমার মেডেল! মাত্র তিনজনকে প্রাইজ দেওয়া হয়েছে। পাপ্পা বলেছে দিয়া হচ্ছে ‘বেস্ট’। ফার্স্ট হওয়া মানে ‘গুড’ সেকেন্ড হওয়া মানে ‘বেটার’ আর থার্ড হওয়া মানে হলো ‘বেস্ট’। দিয়া সবসময় বেস্ট তাই না মাম্মা?’
নবনীর বিস্ময়ভরা চাহনি একবার দিয়ার ওপর দিয়ে ঘুরে দিব্যর নির্লিপ্ত মুখে গিয়ে থমকে গেল। দিব্য তখন পানি পানের ফাঁকে মৃদু এক কৃত্রিম কাশি দিল। যেন দিয়াকে শেখানো সেই অদ্ভুত ‘বেস্ট’ তত্ত্বে তার কোনো হাতই নেই। নবনী শুধু আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল,
‘হ্যাঁ সোনা, সত্যিই তো। আচ্ছা চলো। এবার আমরা চটপট গোসলটা সেরে নিই।’
দিয়াকে গোসল করিয়ে আর পরিপাটি করে সাজিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার পর নবনী পুনরায় দিব্যর মুখোমুখি হলো। দিব্য তখন সোফায় আয়েশ করে হেলান দিয়ে বসেছে। মুখে সেদিনের মতো একটা শিট মাস্ক লাগানো। কোলের ওপর ল্যাপটপ রেখে সে গভীর মনোযোগে কাজ করছে। নবনীকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দিব্য বলল,
‘এখনো ওভাবে সং-এর মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? ব্যাগগুলো খুলে দেখো। শাড়িগুলো তোমার পছন্দ হয় কি না।’
নবনীর কানে ‘শাড়িগুলো’ শব্দটা বাজল। ‘গুলো’ মানে কি অনেকগুলো? সে ধীর পায়ে দিব্যর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
‘দেখুন, জীবনের সব ক্ষেত্রে সবসময় শ্রেষ্ঠ বা ‘বেস্ট’ হতে হবে এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। আপনি একটা বাচ্চাকে অহেতুক এসব ভুল ধারণা না শেখালেই ভালো করবেন। একজন মানুষ সব বিষয়ে পারদর্শী হবে না; এটাই তো প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। দিয়ার যদি কোনো ক্ষেত্রে খামতি থাকে তবে সেটা ওকে বুঝতে দেওয়া উচিত। তাই বলে এভাবে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে ওকে বাস্তবের আড়ালে রাখাটা কি ওর জন্য ক্ষতিকর নয়?’
দিব্য ল্যাপটপ থেকে নজর না সরিয়েই ধীরস্থিরভাবে জবাব দিল,
‘তুমি যখন এখন ওর জীবনে চলেই এসেছো তবে তুমিই না হয় ওকে সঠিকটা শিখিয়ে দিও। আসলে আজ ওর মন খুব খারাপ ছিল ফার্স্ট হতে পারেনি বলে। তাই ওভাবে বলেছি। আজ হয়নি তো কী হয়েছে। কাল ঠিকই হবে।’
নবনীর আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে হলো না। এই অটল আর যুক্তিবাদী মানুষটার সাথে তর্ক করা মানে অরণ্যে রোদন। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানার ওপর রাখা ব্যাগগুলো একে একে খুলতে শুরু করল এবং মুহূর্তেই সে পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। গুনে দেখল একটা বা দুটো নয়। পাক্কা একডজন শাড়ি! পাশে রাখা দুটো ব্যাগে দিয়ার জন্য দারুণ সুন্দর দুটো ফ্রক। আর বাকি দুটো ব্যাগ খুলতেই একের পর এক চুড়ির বাক্স বেরিয়ে আসতে লাগল। প্রতিটি শাড়ির সাথে রং মিলিয়ে দুই ডজন চুড়ি। ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইন ও আছে। নবনী বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। অবাক গলায় বলল,
‘আপনি… আপনি এসব কী করেছেন? এতগুলো শাড়ি আর এত চুড়ি আনার কোনো মানে হয়?’
দিব্য শান্ত গলায় বলল, ‘তুমিই তো আমায় বলেছিলে।’
‘আমি তো কেবল একটা শাড়ির কথা বলেছিলাম!’
‘তুমি চুড়ির কথাও বলেছিলে।’
নবনী অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু তাই বলে এতগুলো?’
নবনীর বিস্ময় কাটছেই না। দিব্য ল্যাপটপ থেকে নজর না সরিয়েই ধীরস্থিরভাবে যুক্তি দিল,
‘দেখো নবনী, প্রথমত তুমি নির্দিষ্ট করে শাড়ির সংখ্যা বলোনি। আর বলেছিলে ম্যাচিং চুড়ি আনতে। এখন আমি যদি কেবল এক ডজন চুড়ি আনতাম আর পরে তোমার অন্য কোনো শাড়ি পরতে ইচ্ছে হতো। তখন কী হতো? আমি একই কাজ দুবার করতে পছন্দ করি না। তাই একবারে সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি।’
নবনী স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল। এই লোকটার অদ্ভুত যুক্তি আর মেপে মেপে কথা বলা তাকে বারবার থমকে দেয়। সে বিড়বিড় করে বলল,
‘তাই বলে পুরো দোকান তুলে নিয়ে আসবেন? আপনি তো অহেতুক অপচয় করাও পছন্দ করেন না।’
এবার দিব্য ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে নবনীর চোখের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে গভীর গাম্ভীর্য নেমে এল। ধীর স্বরে বলল,
‘এখানে অপচয় কোথায় নবনী? তুমি হয়তো জানো না। স্ত্রীর পেছনে ব্যয় করা প্রতিটি টাকা সদকার সওয়াব হিসেবে গণ্য হয়। আর বিয়ের পর এই প্রথম তুমি আমার কাছে কিছু চাইলে। এত ভাবার কিছু নেই। তাছাড়া শাড়ি তো তুমি সবসময়ই পরো। এগুলো তো আর ফেলে দেওয়ার জিনিস নয়। তাই অপচয় হওয়ার চান্স নেই।’
নবনীর বলার মতো আর কোনো কথা খুঁজে পেলনা। শুধু মৃদু মাথা নাড়ল। লোকটা তো এমনই৷ অদ্ভুত। নবনীকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে দিব্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। নিজের মুখে লাগানো শিট মাস্কটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
‘কী হলো? এভাবে কী দেখছো? তুমিও কি মুখে লাগাতে চাও? আমি তো আগেও অফার করেছিলাম। চাইলে লাগাতে পারো।’
এই অবেলায় পর্ব ১৪
নবনীর প্রথমে কিছুটা বিরক্তি লাগলেও পরক্ষণেই তার মনে পড়ল অসীমের এনগেজমেন্টের কথা। অসীমের সেই হবু স্ত্রীর মুখটা মনে পড়তেই নবনীর জেদ চড়ে গেল। হাজার হোক সে ও তো মেয়ে। ঈর্ষা হওয়াটায় স্বাভাবিক। আজ তাকে সত্যিই অনন্যসুন্দরী হয়ে উঠতে হবে। নিজের অজান্তেই সে মৃদু মাথা নেড়ে সায় দিল। দিব্য মনে মনে বেশ অবাক হলো। নবনী যে সত্যি রাজি হবে তা সে ভাবতেও পারেনি; কথাটি সে নিছক মজা করতেই বলেছিল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘ওই ড্রয়ারেই রাখা আছে। নিজের পছন্দমতো একটা বের করে নাও।’
