Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ১৬

এই অবেলায় পর্ব ১৬

এই অবেলায় পর্ব ১৬
সুমনা সাথী

নিযানার জন্য আজকের এই দুপুরটা যেন অগ্নিপরীক্ষার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে মেয়েটির শৈশব-কৈশোর কেটেছে বইয়ের পাতায় আর শৌখিনতায়। রান্নাঘরের চৌকাঠ মাড়ানো যার কাছে ছিল এক দুর্লভ ঘটনা। আজ তাকেই রান্না করতে হয়েছে। অনেক জল্পনাকল্পনা আর কসরত শেষে সে যখন খাবার পরিবেশন করল তখন ড্রইংরুমের বড় ঘড়ির কাঁটা বেশ খানিকটা গড়িয়ে গেছে। খাবার টেবিলে সবার গম্ভীর মুখচ্ছবি আর থমথমে পরিবেশ দেখে নিযানার বুঝতে বাকি রইল না যে কোথাও মস্ত বড় কোনো ভুল সে করে ফেলেছে। আড়ষ্ট হয়ে টেবিলের এক কোণে দাঁড়িয়ে সে লক্ষ্য করল। সবার পাতে তার স্বহস্তে বানানো ‘বিশেষ খাবার’ উঠেছে। সকাল থেকে এক প্রকার অনাহারে থাকা অলেখাকে কলরবই এক প্রকার জেদ করে টেবিলে এনেছে। টেবিলে বসার পর থেকেই অলেখার মুখাবয়বে বিরক্তির রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। নিজের পাতের দিকে একবার তাকিয়ে তিনি অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে চোখমুখ কুঁচকে নিযানার দিকে চাইলেন। তাঁর কণ্ঠে ঝরল বিদ্রূপ,

‘বাহ! এই রান্নার জন্য তো তোমাকে আস্ত একটা নোবেল দেওয়া উচিত বউমা! বাঙালি পরিবারে দুপুরে ভাতের বদলে পাস্তা খাওয়ার রেওয়াজ কবে থেকে শুরু হলো। তোমরা কেউ কি এই বাড়িতে কখনো কাউকে দেখেছ?’
উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে অলেখার দিকে তাকাল। তাঁর ব্যবহারে মনে হচ্ছে নিযানা সত্যিই অচেনা কেউ। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক আগন্তুক। অলেখার প্রতিটি কথা যেন তপ্ত সীসার মতো নিযানার কানে বিঁধল। সে অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে নিচু স্বরে আমতা আমতা করে বলল,
‘মামি, আসলে আমি…!’
বাকি কথাগুলো আর মুখ ফুটে বেরোল না। অলেখা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন এবং রূঢ় স্বরে শুধরে দিয়ে বললেন,
‘উঁহু! মামি নয়, মা বা আম্মা বলে ডাকবে। আমাদের সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলেছে নিযানা। সেটা মনে রেখো। আর তোমাকে নতুন বউ হিসেবে পরিবারের সবার জন্য দুপুরের খাবার তৈরি করতে বলা হয়েছিল। বিকেলের নাস্তা নয়। এটা ঠিক কী করেছ তুমি?’

অলেখার কাঠখোট্টা আর তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে এল। উপস্থিত সবাই জানত অলেখা রেগে আছেন। তাই কেউ কথা বলার সাহস পেল না। নিযানা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে ধরা গলায় বলল,
‘আই অ্যাম স্যরি। আসলে আমি একদমই রান্না করতে জানি না। অনেক রাত পর্যন্ত পড়ার অভ্যাস থাকায় মাঝরাতে খিদে পেলে আমি প্রায়ই নিজের জন্য পাস্তা করে খেতাম। সহজ মনে হওয়ায় ভাবলাম সবার জন্য এটাই করি। তাছাড়া ভাবিও বলেছিল যেকোনো একটা কিছু করলেই চলবে, তাই…!’
অলেখা তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠলেন, ‘তাই নাকি? তোমার মায়ের কাছে মেয়েকে বিয়ের যোগ্য মনে হলো অথচ শ্বশুরবাড়িতে আসার আগে যে এসব ন্যূনতম কাজ শিখিয়ে দিতে হয়; সেটা মনে ছিল না? কিছু না শিখিয়েই মেয়েটাকে আমার ছেলের ঘাড়ে এভাবে ঝুলিয়ে দিল! কী ভেবেছেন তিনি? আমার ছেলে আর আমি কি সারা জীবন তোমাকে রান্না করে খাওয়াব?’

নিযানা মুহূর্তেই পাথরের মতো জমে গেল। অপমানে আর বিস্ময়ে তার চোখের কোণ দুটো অশ্রুতে টলমল করে উঠলো। মাথাটা নিচু করে সে নিজের কান্না লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কায়েফ আড়চোখে নিযানার সেই আরক্ত মুখ আর থরথর করে কাঁপা ঠোঁটজোড়া দেখল কিন্তু তার তো আজ সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। সে শুধু নিজের মুঠো শক্ত করে বসে রইল। তবে কলরবের ভাবভঙ্গি দেখে সে আরও বেশি অবাক হলো; কলরব কোনো প্রতিবাদ তো করলই না বরং তার নির্বিকার চাহনিতে এক অদ্ভুত উপভোগের আভাস ফুটে উঠল। আরশাদ তালুকদার স্থির থাকতে পারলেন না। গম্ভীর কণ্ঠে ধমকে উঠলেন,
‘অলেখা! তুমি কিন্তু এবার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছ। এসব কী ধরনের কথা? একটা মেয়ে রান্না না-ই জানতে পারে। সময় হলে সব শিখে যাবে। তাছাড়া বাড়ির বউ কিছু একটা রেঁধেছে। সেটাই তো বড় কথা।’
অলেখা দ্বিগুণ তেজে ফুঁসে উঠলেন, ‘বাড়াবাড়িটা আসলে তুমি করছ! কবে থেকে তুমি সংসারের ভিতরের বিষয়ে নাক গলাতে শুরু করলে? এই দায়িত্বটা আমার। তুমিই তো বলেছিলে সব সিদ্ধান্ত আমি নেব। তুমি কিছু বলবে না। তাহলে আজ কেন প্রতিবাদ করছ? ও তোমার বোনের মেয়ে বলে?’

আরশাদ তালুকদার নিজেকে কিছুটা সংযত করলেন। এই মুহূর্তে কথা বাড়ানো মানে জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মাজহা নরম স্বরে বললেন,
‘আপা, এবারের মতো ক্ষমা করে দাও না। তাছাড়া মৌনিতাও তো প্রথম দিন নুডলস রান্না করেছিল। আমরা কি অখুশি হয়েছিলাম?’
অলেখা মাজহার দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকালেন,
‘মৌনিতা তোমার বউমা মাজহা। তুমি বড্ড সরল আর নরম মনের মানুষ। তাই সবাইকে প্রশ্রয় দাও। কিন্তু আমি তেমন নই। আমার ছেলের বউয়ের দোষ-গুণ আমি অবশ্যই বিচার করব।’
মাজহা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। দীর্ঘদিনের সংসারে অলেখার এই রুদ্রমূর্তি তিনি আগে কখনো দেখেননি। বিশেষ করে মৌনিতাকে আলাদা করে ‘তোমার বউমা’ বলাটা তাকে বড্ড ব্যথিত করল। দিব্য বিরক্ত হয়ে বলল,
‘আম্মু, প্লিজ! এবার অন্তত থামো। অনেক সময় আছে শাসন করার। পরে বোলো। এখন কি তোমার মনে হয় না সবাইকে শান্তিতে খেতে দেওয়া উচিত?’

অলেখা দিব্যর কথার কোনো উত্তর দিলেন না। দিব্যর ওপর জমানো অভিমান তাঁর মনে পাহাড়সম হয়ে আছে। তিনি ছেলের দিকে না তাকিয়েই মৌনিতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
‘আমি এসব ছাই পাস খাব না। মৌনিতা, আর যা রান্না হয়েছে আমাকে তা-ই দাও। আমার এমনিতেও খিদে নেই।’
মৌনিতা নিঃশব্দে অলেখার সামনে থেকে পাস্তার প্লেটটি সরিয়ে নিল। অন্য একটা প্লেট তাকে দিলো। টেবিলের বাকিরা নিযানার তৈরি করা খাবার মুখে দিতে শুরু করল। আচমকায় কলরব মাত্র এক চামচ পাস্তা মুখে দিয়েই এমনভাবে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল; যেন কোনো বিষাদগ্রস্ত বস্তু তার রসনায় ঠেকেছে। পরক্ষণেই সে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। উপস্থিত সবার বিস্মিত দৃষ্টির তোয়াক্কা না করে সামনের প্লেটটা সজোরে ঠেলে দিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
‘এসব অখাদ্য কোনো সুস্থ মানুষ খেতে পারে? আমার খাওয়ার রুচিটাই মাটি হয়ে গেছে। আমি খাব না!’
পুরো ডাইনিং হল মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কলরবের এই অসংলগ্ন আর রূঢ় আচরণে আরশাদ তালুকদার রাগে ফুঁসে উঠলেন। তাঁর মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। কিন্তু কলরব কাউকে কোনো কৈফিয়ত দেওয়ার অবকাশটুকু দিল না। তড়িৎ পা ফেলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কাব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ গলায় বলল,

‘এই ছেলেটার সমস্যা টা কী? পাস্তাটা মোটেও এতটা খারাপ হয়নি যে খাওয়া যাবে না। আমার তো বেশ ভালোই লাগছে। সত্যিই নিযু, অপূর্ব হয়েছে রে!’
কাব্য শেষ কথাটা নিযানার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল। যাতে ওর ভেতরের ভাঙাচোরা মনটাকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া যায়। দিব্যও ভাইয়ের কথায় সায় দিয়ে নিযানার রান্নার প্রশংসা করল। নিযানা ম্লান হেসে চট করে হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানিটুকু মুছে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে কায়েফও বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। কাব্য ভীষণ বিরক্ত হয়ে ধমকে উঠল,
‘তোর আবার কী সমস্যা? তোর কাছেও যদি অখাদ্য মনে হয়। তবে মুখে বলার দরকার নেই। চুপচাপ এখান থেকে দূর হ তো!’
কায়েফ খুব নিচু স্বরে বলল, ‘আমার খাওয়া শেষ। আর কিছু খাব না।’
কথাটা বলেই সে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল। নিযানা খেয়াল করল কায়েফের প্লেটে যতটা পাস্তা দেওয়া হয়েছিল তার সবটায় সে খেয়েছে। এতটুকু অপচয় করেনি সে। মাজহা অবশ্য ছেলেকে আর জোর করলেন না; কায়েফের শরীরের অবস্থা এমনিতেই ভালো নয়। ভাবলেন হয়তো সত্যিই তার আর কিছু মুখে তুলতে ইচ্ছা করছে না। কলরবের প্রকাশ্য অপমান নিযানার মনে একটা গভীর ক্ষত তৈরি করল।

সাদা রঙের একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে থামল দিব্যর গাড়ি। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে রাত গড়িয়েছে। দিব্য গাড়ি থেকে নেমে নবনী আর দিয়াকে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা পার্ক করতে গেল। বাড়ির ছোট লোহার ফটক থেকে শুরু করে বিশাল উঠোন পর্যন্ত আলোকসজ্জা। কৃত্রিম ফুলের সমারোহ। দামি পর্দা আর সুসজ্জিত চেয়ার-টেবিলের বিন্যাসে পুরো পরিবেশটা এক স্বপ্নিল রূপ ধারণ করেছে। নবনী বাড়িটা চেনে। চেনা পথে তার স্মৃতির ধুলোবালি উড়ছে।
দিব্য এসে ওদের পাশে দাঁড়াল। বলল,
‘কী হলো, ভেতরে চলো।’

নবনী শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। দিব্য এক হাতে দিয়ার ছোট্ট নরম হাতটি ধরল। অন্য বলিষ্ঠ বাহুটি বাড়িয়ে দিল নবনীর দিকে। চোখের ইশারায় তাকে সেই বাহু আঁকড়ে ধরার আমন্ত্রণ জানাল সে। নবনী আর কোনো সংকোচ করল না। দ্বিধাহীনভাবে দিব্যর বাহু জড়িয়ে ধরল। অতঃপর বাড়ির ভেতরে পা রাখল। ভেতরে তখন অতিথিদের উপচে পড়া ভিড়। তাদের পৌঁছাতে বোধহয় কিছুটা বিলম্বই হয়ে গেছে। দিব্যকে দেখামাত্রই অসীম তড়িৎ গতিতে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল। পরনে কুচকুচে কালো স্যুট-প্যান্ট, চোখেমুখে একরাশ উচ্ছ্বাস। কিন্তু দিব্যর হাত ধরে তার অতি নিকটে দাঁড়িয়ে থাকা রক্তজবা রঙের শাড়িতে আবৃত নবনীকে দেখেই অসীম যেন মাঝপথে থমকে গেল। নবনী খেয়াল করেছে। দিব্য আজ যতগুলো শাড়ি এনেছে তার বেশির ভাগই লালের সমাহার। অথচ এই মানুষটাই নাকি লাল রং সহ্য করতে পারে না! নবনীর দুহাত ভর্তি টকটকে লাল বেলভেট চুড়ি। গলায় আর কানে লাল ডায়মন্ড কাট নেকলেস। মানানসই মেকআপ আর ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিকে তাকে আজ অপার্থিব এক মায়াবী সুন্দরীর মতো লাগছে। অসীমের বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। সামান্য দূরেই দাঁড়িয়ে আছে তার হবু স্ত্রী। সেও আজ লাল পোশাকে সেজেছে। কিন্তু নবনীর সেই দীপ্তিময় সৌন্দর্যের কাছে তার হবু স্ত্রীর রূপ যেন এক নিমিষেই ম্লান হয়ে গেল। অসীম এক অদ্ভুত অপরাধবোধ আর অপ্রস্তুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল। নীরবতা ভেঙে দিব্য বেশ সহজ গলায় বলল,
‘কনগ্রাচুলেশন অসীম! আসতে কি খুব বেশি দেরি করে ফেললাম? রাগ করলে নাকি আবার?’
দিব্যর কথায় ঘোর কাটলো অসীমের। একরাশ অস্বস্তি নিয়ে সে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল। আমতা আমতা করে বলল,

‘আরে না না স্যার! কী বলছেন এসব? রাগ কেন করব? আসুন আসুন। আমি আসলে আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ওইদিকের টেবিলটায় বসবেন চলুন।’
দিব্যর কণ্ঠস্বর তখনো আগের মতোই শান্ত। সে নবনীর দিকে এক পলক তাকিয়ে অসীমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
‘আসলে তোমার ম্যাডামের সাজগোজের জন্যই কিছুটা দেরি হয়ে গেল। অবশ্য ম্যাডামই বা বলছি কেন? তোমাদের তো বেশ পুরোনো পরিচয়। গভীর সম্পর্ক ছিল তোমাদের মধ্যে, তাই না?’
নবনী হতভম্ব হয়ে দিব্যর দিকে তাকাল। দিব্য আগে থেকেই তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল। এক তীক্ষ্ণ, অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি তার। সেই চোখের ভাষায় কী ছিল? নবনী মুহূর্তেই চোখ সরিয়ে নিল। অসীম যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘জি?’
দিব্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে কথাটি সামলে নিয়ে বলল,
‘বলতে চাইছি ফ্রেন্ডশিপের কথা। তোমরা তো ক্লাসমেইট ছিলে। তাই না? পূর্ব পরিচিত।’
অসীম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জোর করে মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ স্যার, একদম ঠিক বলেছেন। তাই তো! আসুন বসবেন চলুন। দিয়া মামণি, চলো সোনা।’

অসীম দিয়ার হাত ধরে ওদের আগে আগে হাঁটতে শুরু করল। নবনীর তীক্ষ্ণ নজর অসীমকে অস্বস্তিতে ফেলছে। বুকের ভেতরটা রাগ, ঘৃণা আর এক বিচিত্র আফসোসের মিশ্রণে কুঁকড়ে যাচ্ছে। অসীম তাকে অবজ্ঞা করেছিল। আজ অসীমের সামনে দিব্যর বাহুডোরে রাজকন্যার মতো দাঁড়িয়ে থাকাটা যেন এক মধুর প্রতিশোধ। ওরা গিয়ে স্টেজ সংলগ্ন একটি সুন্দর টেবিলে বসল। সামনেই চমৎকার একটি স্টেজ সাজানো হয়েছে। যেখানে অসীমের হবু স্ত্রী রশনী তার বান্ধবীদের সাথে নাচে মেতেছে। মেয়েটি বেশ ছন্দময় ভঙ্গিতে নাচছে। হঠাৎ দিব্যর পকেটে থাকা ফোনটা সজোরে বেজে উঠল। নবনী ওর দিকে তাকাতেই দেখল দিব্যর কপালে চিন্তার ভাঁজ। ফোনের স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে ‘নিযানা’র নাম। কোনো জরুরি কারণ ছাড়া নিযানার এই অসময়ে ফোন করার কথা নয়। চারদিকে উচ্চস্বরে গান চলায় এখানে কথা বলা অসম্ভব। দিব্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
‘নবনী, তোমরা একটু বোসো। আমি কলটা রিসিভ করে আসছি। মনে হচ্ছে বেশ আর্জেন্ট কিছু।’
দিয়া মাথা নেড়ে বলল, ‘ওকে পাপ্পা।’

দিব্য দ্রুত পায়ে ভিড় ঠেলে বাইরের দিকে এগিয়ে গেল।
স্টেজ থেকে একটু দূরেই একটি বড় টেডি বিয়ারের পোশাক পরা জোকার বাচ্চাদের জাদুকরী সব কসরত আর বল ঘোরানোর খেলা দেখাচ্ছে। চারদিকে শিশুদের খিলখিল হাসিতে ভরে উঠছে। দিয়া সেই জাদুর মায়ায় আটকে গিয়ে দুই চোখ বড় বড় করে সেদিকে চেয়ে থাকল। সে নবনীর কাছে আবদার করে বলল,
‘মাম্মা, আমিও একটু কাছে গিয়ে দেখবো? সবাই কত মজা করে খেলছে!’
জায়গাটা নবনীর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই। খুব একটা দূরে নয়। নবনী হাসিমুখে সম্মতি দিতেই দিয়া প্রজাপতির মতো ডানা মেলে সেদিকে উড়ে গেল যেন। অন্য বাচ্চাদের ভিড়ে মিশে গিয়ে সেও খেলায় মেতে উঠল। নবনী দূর থেকে হাত নেড়ে ওকে সাহস দিচ্ছিল।
‘একেই বুঝি মেঘ না চাইতে বৃষ্টি বলে, তাই না নবনী?’
খুব চেনা অথচ বিষাক্ত এক কণ্ঠস্বর আচমকা কানে আসতেই নবনী চমকে ফিরে তাকাল। অসীম দাঁড়িয়ে আছে ঠিক ওর পেছনেই। তার ঠোঁটের কোণে লেপ্টে আছে এক কুৎসিত বিদ্রূপাত্মক হাসি। নবনী বিরক্তিতে কুঁচকে যাওয়া গলায় ছোট করে বলল,

‘মানে?’
অসীম একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ধীর পায়ে নবনীর পাশে এসে দাঁড়াল। আড়চোখে দূরন্ত দিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘বিয়ে না করেও এক বাচ্চার মা! বিষয় টা আসলেই বেশ হাস্যকর, তাই না নবনী? তুমি কী ছিলে আর আজ কী হয়ে গেছ! সবই কি তবে টাকার মায়া?’
অসীমের প্রতিটি শব্দ যেন নবনীর আত্মসম্মানে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। কিন্তু সে দমে গেল না। চিবুক উঁচু করে অত্যন্ত শান্ত অথচ ধারালো গলায় পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
‘কেন? তোমার খুব আফসোস হচ্ছে? তুমি কি চেয়েছিলে আমি তোমার বিরহে পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই?’
অসীম নিচু স্বরে বলল, ‘না না, তেমনটা চাইব কেন সোনা? আফটার অল একসময় তো তোমাকে সত্যিই বড্ড ভালোবাসতাম, তাই না?’

অসীমের মুখে ‘ভালোবাসা’ শব্দটি শুনে নবনীর সর্বাঙ্গ ঘৃণায় রি রি করে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘মুখ সামলে কথা বলো অসীম! কার সাথে কথা বলছ? সেই হিতাহিত জ্ঞানটুকু কি হারিয়ে ফেলেছ? তুমি এখন একজন বিবাহিত নারীর সামনে দাঁড়িয়ে আছ। ভুলে যেয়ো না।’
অসীম কুৎসিত হেঁসে বলল, ‘ভেবেচিন্তেই বলছি বেবি। তোমার ওই সো-কল্ড ‘সুগার ড্যাডি’ ওহ্ সরি, দুলাভাই থেকে স্বামী হওয়া লোকটাকে কি তোমার পুরনো প্রেমিকের গল্প বলেছ? দিব্য তালুকদারকে আমি যতটা চিনি। তোমার অতীত জানলে সে তোমাকে এক মুহূর্ত সহ্য করবে না। তবে দেখতে তো বেশ খাসা হয়েছ। দিন কয়েক ভোগ করে ঠিকই ছুড়ে ফেলবে। এমন সুযোগ কে মিস করতে চাইবে বলো।’
নবনীর কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বেরোতে লাগল। অপমানে রি রি করে উঠল তার সর্বাঙ্গ। সে প্রচণ্ড আক্রোশে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হিসহিসিয়ে বলল,

‘জাস্ট শাট আপ অসীম! নিজের সীমা অতিক্রম করো না। নয়তো ফল খুব খারাপ হবে।’
অসীম একটা পৈশাচিক তাচ্ছিল্য হাসল। ‘খারাপ আর কী করবে? আমার চাকরি খাবে? স্বয়ং ‘দ্যা গ্রেট’ দিব্য তালুকদারেরও সেই ক্ষমতা নেই। আর ভুলটা কী বলেছি? মানতেই হবে বসের চয়েস আছে। নিজে কাক হলেও ময়ূর ঠিকই খুঁজে নিয়েছে। যদিও তার পাশে তোমাকে বড্ড বেমানান লাগছে। তবে মালটা সে ঠিকঠাকই…’
নবনীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে হাত উঁচিয়ে সজোরে চড় মারতে যেতেই অসীম খপ করে তার কবজিটা ধরে ফেলল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘নো বেবি, এই ভুল আর কোরো না। তোমার মতো মেয়েরা ওই দিব্য তালুকদারেরই যোগ্য। ভালোই হয়েছে যে আমি তোমাকে সময়মতো ছেড়ে দিয়েছি। টাকার জন্য তোমরা যার তার গলায় ঝুলে পড়তে পারো। বাই দ্য ওয়ে, হুরপরী সেজে তো এসেছ ওই কাকটার সাথে। একবার রশনীকে দেখেছ? জুটি আমাদের মতো হয়। আমাদের পাশাপাশি দেখলে তোমার চোখ জুড়িয়ে যাবে। আসছি এখন, কুল!’

অসীম সেখান থেকে চলে গেল। নবনী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। সে বলতে চেয়েও কিছু বলতে পারলো না। অসীমর মুখ থেকে এমন জঘন্য কথা শোনার পর নবনীর পৃথিবীটা যেন দুলতে লাগল। সে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। নিজেকে যতটাই শক্ত দেখানোর চেষ্টা করুক না কেন; অসীমের বিষাক্ত কথাগুলো তিরের মতো তার হৃদয়ে বিঁধেছে। গলা শুকিয়ে আসছে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। নোনা জলের আবরণে ঢাকা চোখে সে সামনের স্টেজের দিকে তাকাল। সেখানে তখন অসীম আর রশনীর আংটি বদল হচ্ছে। চারদিকে হাততালির রোল। তারা একে অপরের আঙুলে আংটি পরিয়ে হাসিমুখে পোজ দিচ্ছে। নবনী অনুভব করল, তার বুকের ভেতরের সেই পুরনো ক্ষতটা আজও বড্ড কাঁচা; সেখান থেকে যেন অঝোরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। প্রচণ্ড এক যন্ত্রণায় তার শ্বাস আটকে আসতে চাইল। নিঃশব্দে তার দুই গাল বেয়ে অশ্রুধারা নামতে শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তে কাঁধে কারো বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ পেতেই নবনী চমকে উঠল। কিন্তু সে নিজেকে লুকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না। সে আজ ঠিক করে ফেলেছে। দিব্যর কাছে লুকানো বাকি সবটুকু সত্য আজ বলে দেবে। যা হওয়ার হবে। অন্তত এই অপমানের বোঝা নিয়ে সে আর বাঁচতে চায় না। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই সে কাঙ্ক্ষিত সেই মানুষটিকে দেখতে পেল। দিব্য তালুকদার তার স্বভাবজাত শান্ত ও গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

‘কী হয়েছে নবনী? আচমকা কাঁদছ কেন তুমি? তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?’
নবনী কান্নায় ভেঙে পড়লো। কিছু বলতে পারছে না। কাঁপা গলায় বলল,
‘আমাকে কি একটু বাড়ি নিয়ে যাবেন? আমি আর এক মুহূর্তও এইখানে থাকতে চাই না।’
দিব্য লক্ষ্য করল নবনীর সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে ধীরস্থিরভাবে মাথা নেড়ে সায় দিল। শান্ত স্বরে বলল,
‘হ্যাঁ, অবশ্যই। চলো এখনই বেরিয়ে পড়ি।’
নবনী ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোখ দুটি জলে টইটম্বুর। সে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘আমি বোধহয় হেঁটে যেতে পারব না।’
দিব্য কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকাল। ‘এমন অদ্ভুত কথার মানে কী নবনী? আমরা কি এখানে হেঁটে এসেছি নাকি? গাড়ি তো গেটের বাইরেই রাখা আছে।’
‘আমি ওই গাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার কথাই বলছি। আপনি কি আমাকে কোলে তুলে নিতে পারবেন না?’
দিব্য যেন আকাশ থেকে পড়ল। নবনীর মতো আত্মসম্মানী আর লাজুক একটা মেয়ে এমন কথা বলতে পারে; তা তার কল্পনার অতীত ছিল। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে সে জিজ্ঞেস করল,
‘মজা করছ নবনী? আমি দিয়াকে নিয়ে আসছি।’
নবনী একরোখা ভঙ্গিতে ধরা গলায় বলল, ‘আমি বিন্দুমাত্র মজা করছি না।’
দিব্য কয়েক পলক নবনীর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে বলল,
‘ওকে।’

ব্যাস, সেটুকুই। পলক ফেলতেই নবনী নিজেকে আবিষ্কার করল দিব্যর বলিষ্ঠ বাহুডোরে। দিব্য তাকে অতি সহজে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। নবনী দুহাতে দিব্যর গলা জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট কাঁপছে অনবরত। যেন কিছু একটা বলার জন্য ছটফট করছে। দিব্য শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘আর কিছু কি বলতে চাও?’
নবনী দিব্যর চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়ল। একটু সময় নিয়ে বলল,
‘আমি আপনাকে আমার ফেলে আসা অতীতের কথা বলেছিলাম মনে আছে? তখন আমি আপনাকে সেই মানুষটার নাম বলিনি। কারণ আপনিও কোনো আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু আজ আমি আপনাকে সবটা বলতে চাই…’
ঠিক সেই মুহূর্তে দিয়া পাশে এসে দাঁড়াল। তার ডাগর দুচোখে একরাশ বিস্ময়; নিজের বাবা-মাকে এমন অবস্থায় দেখে সে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। অনুষ্ঠানের সবার নজর তখনো স্টেজের রোশনাইয়ে আটকে আছে। নবনী কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। তার গলা বুজে আসছিল। দিব্য একচিলতে ম্লান হেসে বলল,

‘অসীম? এতে আর নতুন কী আছে নবনী? চলো, এবার যাওয়া যাক।’
নবনী চরম বিস্ময়ে পাথরের মতো জমে গেল। তার ঠোঁট নড়ে উঠল অস্ফুট স্বরে,
‘কীভাবে? আপনি জানলেন কী করে?’
দিব্যর কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস। বলল, ‘ভুলে যেয়ো না, আমি দিব্য তালুকদার। সামান্য এইটুকু তথ্য জানার জন্য আমার কেবল একটি ফোন কলই যথেষ্ট ছিল। তুমি এতটা দুর্বল আমি ভাবতে পারিনি। তুমি না করলে আমি কখনোই তোমাকে নিয়ে এখানে আসতাম না। দিয়া মাম্মা, চলো সোনা।’
দিব্য এক হাতে নবনীকে আগলে রেখে অন্য হাতে নিচু হয়ে নবনীর জুতো জোড়া তুলে নিল। নবনী নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করল,
‘এতটুকু অন্তত বলুন, আপনি কবে থেকে এই সত্যিটা জানেন?’
দিব্যর উত্তর সংক্ষিপ্ত। ‘যেদিন তুমি আমায় সবটা বলেছিলে তার ঠিক পরের দিন রাত দশটা থেকে।’
নবনী কথা হারিয়ে ফেলল। এই মানুষটা এতদিন ধরে সব জেনেও কতটা স্বাভাবিক আর নির্বিকার ছিল! তার এই গাম্ভীর্যের আড়ালে যে কতটা গভীর সমুদ্র লুকিয়ে আছে; তা নবনী আজ প্রথম অনুভব করল। আর কি কি জানে লোকটা। দিয়া দিব্যর কোটটা আলতো করে টেনে ধরে ডাগর চোখে চেয়ে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘পাপ্পা, মাম্মার কি শরীর খুব খারাপ? মাম্মা কেন হাঁটছে না?’

দিব্য শান্ত মুখে শুধু মাথা নাড়ল। বাবার হাত থেকে নবনীর শৌখিন হিল জোড়া সযত্নে নিজের ছোট্ট হাতে তুলে নিল দিয়া। এক হাতে জুতো আর অন্য হাতে দিব্যর হাত শক্ত করে ধরে সে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘মাম্মা, তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? পাপ্পা, আমরা কি সেই ‘বড় বিল্ডিং’টায় মাম্মাকে নিয়ে যাব?’
দিয়া আগে সবসময় দিব্যর সাথে থাকতো। তাই হাসপাতাল তার চেনা। আর এখনো দিব্যর হাসপাতালকে ‘বড় বিল্ডিং’ বলে ডাকে। নবনী মেয়ের চোখেমুখে এমন অকৃত্রিম উদ্বেগ দেখে নিজের বুকের ভেতরের ঝড়টাকে মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল। সে মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘না সোনা, আমার অতটাও কষ্ট হচ্ছে না। বাড়িতে গিয়ে তুমি আমাকে একটু আদর করে দিলেই আমি একদম ঠিক হয়ে যাব।’

ঠিক সেই মুহূর্তে ভিড় ঠেলে অসীম আর রশনী ওদের একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল। নবনীকে দিব্যর বলিষ্ঠ বাহুডোরে এভাবে আবিষ্কার করে অসীমের সর্বাঙ্গ অপমানে আর ঈর্ষায় রি রি করে উঠল। একটু আগে নবনীর একাকীত্বের সুযোগ নিয়ে সে যে বিষাক্ত কথাগুলো উগলে দিয়েছিল। দিব্যর এই প্রোটেকটিভ রূপ দেখে সেগুলো যেন বুমেরাং হয়ে তার নিজের বুকেই বিঁধছে। রশনী কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
‘কী হয়েছে ওনার? এনিথিং রং?’
দিব্যর কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা নেই। গাম্ভীর্য নিয়ে সে স্বাভাবিকভাবে জবাব দিল,
‘তেমন কিছু না। হুট করে মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল ওর। এখন শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে। আমাদের এখনই বেরোতে হবে।’
অসীম নিজেকে সামলে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে কৃত্রিম সৌজন্যের সুরে বলল,
‘এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন স্যার? কিছুই তো খেলেন না এখনো।’

দিব্য ধীরস্থিরভাবে বলল, ‘খাওয়াদাওয়া না হয় অন্য কোনোদিন হবে। তোমাদের বিয়েতে তো আসছিই। আসলে বাড়িতে থেকেও একটা ইমার্জেন্সি কল এসেছে তাই আর এক মুহূর্ত দেরি করা সম্ভব নয়। তোমরা এনজয় করো।’
দিব্যর ‘ইমার্জেন্সি’র বিষয়টা অসীমের কাছে অযুহাত লাগলো। অজুহাত আর নবনীকে আগলে রাখার ভঙ্গিটা অসীমের সামনে একটা রূঢ় বার্তা পৌঁছে দিল। তার সামান্য ধারনা হলো সে যতই ছোট খাটো আঘাতই করুক না কেন, নবনী এমন একটা আশ্রয়ে আছে যেখানে তার পৌঁছানো অসম্ভব। দিব্য আর এক সেকেন্ডও সেখানে না দাঁড়িয়ে নবনীকে নিয়ে পার্কিং লটের দিকে পা বাড়াল। তার এক হাতে দিয়ার হাতটা ধরা। দিয়া তার ছোট্ট কদমে বাবা-মায়ের সাথে হাঁটতে লাগল। নবনী অবাক হয়ে দেখলো এই বেপরোয়া লোকটাকে। এতগুলো মানুষকে ও পরোয়া করলোনা৷ নবনীর নেহাত ছেলেমানুষী করে নেওয়া পরীক্ষায় দিব্য তালুকদার একশতে একশ।

নিযানা নিজের ঘরের ভেতর অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। নিয়মমাফিক বিয়ের পর আজ বিকেলের দিকেই কলরব আর নিযানা তাদের পৈতৃক বাড়িতে অর্থাৎ আনতাসাদের ওখানে এসেছিল। সাথে কুহুও আছে। কিন্তু সন্ধ্যার অন্ধকার নামার আগেই কলরব কাউকে কিছু না বলে হুট করে কোথাও বেরিয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটা এখন রাত দশটার ঘর ছুঁইছুঁই অথচ কলরবের কোনো পাত্তা নেই। নিযানা বারবার তার নাম্বারে ডায়াল করছে কিন্তু প্রতিবারই সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর জানিয়ে দিচ্ছে। ফোনটি বর্তমানে বন্ধ। আনতাসাও কলরবের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতি ক্রমশ অস্বাভাবিক ঠেকলে নিযানা বাধ্য হয়ে দিব্যকে ফোন করে সবটা জানায়।

এই অবেলায় পর্ব ১৫

নিযানা জানলার কাছে গিয়ে অন্ধকারের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। মনে মনে এক বিষাক্ত তিক্ততা দানা বাঁধছে। যদি এটা তার বাবার বাড়ি না হতো। যদি এখানে তার পরিবারের সম্মান জড়িয়ে না থাকত। তবে কলরব নামক এই মানুষটা গোল্লায় গেলেও বোধহয় নিযানা কোনোদিন তার খোঁজ করার প্রয়োজন মনে করত না। কিন্তু এখন সে এক অদৃশ্য শিকলে বন্দি।

এই অবেলায় পর্ব ১৭