ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৭
মারিয়াম ফুল
মেহেরের ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। আমি কে উনার যে উনি আসবেন? পরক্ষণেই মেহের আবার তড়িৎ বেগে নিজেকে ধমকালো।ও কি কোনোভাবে রুদ্রের জন্য অপেক্ষা করছে? না,না ও কেনই বা রুদ্রর অপেক্ষা করবে ?
ঠিক তখনই বিচারক এজলাসে এসে আসন গ্রহণ করলেন।
রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি উকিল — ব্যারিস্টার রাশেদ দাঁড়িয়ে নথিপত্র নাড়াচাড়া করতে করতে কথা বলতে শুরু করলেন। মেহেরের কানের ভেতর সব কথা স্পষ্ট ঢুকছিল না, কিন্তু যখনই আইনজীবী উচ্চস্বরে
“Accused” (আসামি) শব্দটা উচ্চারণ করলেন, মেহেরের মনে হলো কেউ তার গায়ে একটা চাবুকের আঘাত করল। মিথ্যা অপবাদে তার পুরো শরীরটা এক নিমেষে রি রি করে উঠল।
মেহেরের পক্ষে দাঁড়িয়ে আইনজীবী শারাফাত হোসেন তখন বিচারককে বলছিলেন,
“ইউর অনার, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট আসতে এখনো দু- সপ্তাহ বাকি। আজ আমার মক্কেলের জেলের ভেতর প্রথম শ্রেণীর বন্দী বা ডিভিশন পাওয়ার অধিকার নিয়ে আবেদন করছি। তিনি একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী। জেলের সাধারণ হাজতি ওয়ার্ডের পরিবেশ তাঁর শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।”
মেহের তার চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। কাঠগড়ার লোহাটা সে আরও জোরে খামচে ধরল, যেন এই লোহার রডগুলোই এখন তার বেঁচে থাকার একমাত্র খুঁটি। তার অনাগত সন্তানকে পৃথিবীর মানুষ আজ এই আদালতের চার দেয়ালে দাঁড়িয়ে আসামির সন্তান হিসেবে চিনছে এই অপমান সে কীভাবে সহ্য করবে? গলার কাছটা তার কান্নায় বুজে আসছিল, কিন্তু সে কাদলো না ।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এর বিরোধিতা করে কিছু নথিপত্র বিচারকের টেবিলের সামনে রাখলেন। কাগজের পাতা উল্টানোর সেই খসখস শব্দটা মেহেরের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের চেয়েও জোরে বাজছিল। বিচারক কিছুক্ষণ দুই পক্ষের আইনজীবীদের কথা শুনলেন, তারপর নথিপত্রে সই করতে করতে রায় ঘোষণা করলেন:
“আসামির বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে কারাবিধি অনুযায়ী তাকে অবিলম্বে সাধারণ হাজতি ওয়ার্ড থেকে সরিয়ে ‘ডিভিশন’ সেলে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেওয়া হলো। আরও দুই সপ্তাহ পর ময়নাতদন্তের রিপোর্টসহ মূল মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।”
বিচারকের হাতুড়ির সেই ‘ঠক ঠক’ শব্দটা পড়ার পর পুরো কোর্টরুমে এক মুহূর্তের জন্য এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। ফ্যানের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটাও যেন সেই নীরবতায় মিলিয়ে গেল। মেহেরের বুকের ভেতর কোথাও কোনো স্বস্তির নামগন্ধও ছিল না। শুধু একটা ভারী শূন্যতা। ডিভিশন পাওয়া মানে তো মুক্তি নয়, তা কেবল একটা খাঁচা থেকে অন্য খাঁচায় স্থানান্তরিত হওয়া।
রায় ঘোষণা শেষ হতেই হামজা চৌধুরী এগিয়ে আসলেন, সাথে রেহানা চৌধুরী। রেহানা চৌধুরী আর নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারলেন না; তিনি দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন মেহেরকে। হামজা চৌধুরী গভীর আক্ষেপ আর বেদনার মুখে বলে উঠলেন, “চিন্তা কোরো না আম্মু। আমি আছি। কথা দিলাম, খুব শীঘ্রই তোমাকে সসম্মানে এখান থেকে নিয়ে যাব।”
পাশে থাকা একজন কনস্টেবল তখন তাড়া দিচ্ছে, “আর সময় নেই, উনাকে নিয়ে যেতে হবে স্যার। জলদি করুন।”
মেহের চোখ তুলে তাকাল। রেহানা চৌধুরী আর হামজা চৌধুরীর মনে মনে একটা তীব্র ভয় কাজ করছিল—যদি এখন মেহের রুদ্রর কথা জিজ্ঞাসা করে বসে, তবে তারা কী উত্তর দেবেন? কিন্তু মেহের কোনো জিজ্ঞাসা করল না ।
অন্য পাশে সায়েদ কামিনী আর ইমরান সাহেব দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেহেরের কাছে যাওয়ার জন্য ইমরান সাহেব ছটফট করছিলেন, নিজের মেয়ের এই অবস্থা দেখে তাঁর ভেতরের পিতৃ স্নেহ যেন দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। যখন সায়েদ কামিনী মেহেরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন ,যতই হোক, তিনি তোমা। মেয়ের খারাপ চাননি কোনদিন । সায়েদ কামিনি সবসময় ভেবেছেন, টাকা থাকলেই মেয়েকে সুখে রাখা যাবে। অথচ জীবনের সব সুখ টাকা দিয়ে কিনা যায় না।
অন্তুর মৃত্যুর জন্য তাঁর মনে কোনো অনুতাপ নেই এখনোি। তবুও নিজের মেয়েকে এই ভাঙতে দেখা, নিঃশব্দে কষ্টে ডুবে যেতে দেখা, তাঁর ভেতরের সব শক্ত আবরণও যেন ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছে। মুখে না বললেও, বুকের ভেতরটা যে প্রতিনিয়ত পুড়ে যাচ্ছে, সেটা লুকানো আর সম্ভব হচ্ছে না।
মেহের যখন খেয়াল করল সৈয়দ কামিনী এগিয়ে আসছেন তীব্র এক বিতৃষ্ণা নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। চায়না সে তাদের সাথে দেখা করতে, বাবার পায়ে কি কম পড়েছিল তাকে একটা সুযোগ দেওয়ার জন্য, অন্তুকে নিয়ে সংসার করার জন্য ? নাকি তার নিজের মা তার বাচ্চাকে মারার চেষ্টা করতে পিছুপা হয়েছিল ঐ? তার বাবা তো সেদিন চলে গিয়েছিল ওই রুম থেকে তাকে একা রেখে ,সেদিনটা তো সে একাই লড়েছিল। আর তার মা গর্ভপাত করানোর জন্য কি সেই দিন অ্যাবরশন পিল জোর করে তাকে খাওয়ায়নি তাকে?
সে সাথে সাথে পাশে থাকা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, “চলুন।”
নিয়ে যাওয়া হলো মেহেরকে, অবশেষে মেহেরকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বিশেষ ডিভিশন সেলে নিয়ে আসা হলো।
এই সেলটি জেলের সেই দমবন্ধ করা সাধারণ ওয়ার্ডের মতো নয়—
সেখানে যেখানে শত শত কয়েদির গাদাগাদি, মেঝের স্যাঁতসেঁতে চটের ওপর ঘুমানোর তীব্র যন্ত্রণা, আর বাতাসে শুধু ঘাম ও নোংরার গন্ধ ভাসত,এই ডিভিশন সেলের পরিবেশ তার চেয়ে আরেকটু ভালো । মেহেরকে দেওয়া হয়েছে একটি নিভৃত ছোট রুম। ঘরের এক কোণে পাতা আছে একটি একক লোহার খাট, মাথার ওপর একটি ফ্যান, একপাশে ছোট একটি কাঠের টেবিল আর চেয়ার। এখানে কারাবিধি অনুযায়ী রয়েছে একটি নিজস্ব এটাচড বাথরুমের সুবিধা, যার জন্য সাধারণ হাজতিদের মতো লাইনে দাঁড়ানোর লাগবে না আর, একদিন থেকেই তার মনে হয়েছিল জেলখানা কোন আজাব থেকে কম নয় ।
লোহার বালতি থেকে ঢেলে দেওয়া অ্যালুমিনিয়ামের মোটা, দাগধরা থালার সেই পাতলা ডাল আর শক্ত রুটি তাকে গিলতে হয়েছে তাকে । পরিবর্তে কারাবিধির বিশেষ নিয়ম অনুযায়ী তার সামনে এসেছে সিভিলিয়ান পরিচ্ছন্ন পাত্রে জেলের বিশেষ ডায়েট—
প্রতিদিন সকালের জন্য পুষ্টিকর খাঁটি দুধ, সেদ্ধ ডিম এবং তাজা ফল।
কিন্তু জেলের এই বস্তুগত সুবিধা মেহেরের ভেতরের সেই তীব্র একাকীত্ব, অপমান আর আতঙ্ককে এক বিন্দুও কমাতে পারল না। জেলের একজন নারী ডাক্তার এসে মেহেরের প্রাথমিক মেডিকেল চেকআপ করলেন এবং তার প্রেশার মেপে কড়া গলায় ওয়ার্ড্রেসকে বললেন,
“আসামির প্রেশার খুব হাই, আর ও প্রচণ্ড ট্রমার মধ্যে আছে। গর্ভের বাচ্চার জন্য এটা একদম ভালো নয়। একে টাইমমতো ওষুধ দেবেন আর কোনো ভারী কাজ একদম দেওয়া যাবে না।”
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর মেহের খাটের এক কোণে হাঁটু দুটো বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বসে রইল। তার চোখের জল শুকিয়ে এখন গালে দাগ পড়ে গেছে।
অন্য দিকে, রুদ্র কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না যে সামান্য একটা মেয়ের জন্য তার নিজের জন্মদাতা বাবা তার ওপর হাত তুললেন।তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল। অভিমানে আর তীব্র অস্থিরতায় সে সকাল বেলাতেই নিজের ডিউটিতে চলে যায়। ঠিক এক সপ্তাহ পর সে ডিউটিতে । আজ তার কানাডার ফ্লাইট। তারপর পরিকল্পনা, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া।এখন সে ককপিটে বসে আকাশ চিরে প্লেন চালাচ্ছে।
আকাশের বুকে যখন বিশাল এয়ারক্রাফট ডানা মেলে ছুটে চলেছে, ককপিটে বসে প্লেন চালানো অবস্থাতেও মন শান্ত ছিল না তার । মেঘের পর মেঘ কেটে যাচ্ছে, কিন্তু তার মনে বলছে —
এতদিন ধরে সে মেহেরকে যেভাবে চিনে এসেছে, মেহের কি সত্যিই তেমন না-কি….
সে কি কাউকে খুন করতে পারে? না, মেহের কিভাবে কাউকে খু’ন করতে পারে ? একটা বিড়াল দেখলেই যে মেয়েটা ভয়ে কুঁকড়ে যায়, সে কীভাবে একটা মানুষকে গুলি করে গলার নলি কেটে মারবে? এটা অসম্ভব!
রুদ্রের নিজের যুক্তি আর আবেগ অনবরত যুদ্ধ করে চলছিল যেন তার বিরুদ্ধে ।
আর মেহেরের বেবি.. ওহ গড!
রুদ্রর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ওই ইনোসেন্ট বাচ্চাটাও তো মেহেরের সাথে জেলের ভেতর সাফার করছে। আর মেহেরের মেডিকেল কন্ডিশন তো এমনিতেই ভালো না। আর কেউ যদি জানতে পারে যে মেহের আসলে চার মাসের প্রেগন্যান্ট… হোয়াট দ্য হেল! আর কয়েকদিন পর তো এটা পাঁচ মাসে পড়বে!
রুদ্র নিজের মাথা ঝাঁকাল, কোনোভাবেই সে প্লেন চালানোয় মনোযোগ ঠিক করতে পার ছিল না। তার চোখের সামনে বারবার মেহেরের ফ্যাকাশে, অসহায় মুখটা ভেসে উঠছিল, যদিও মেহেরকে সে একবারও দেখেনি , যখন থেকে মেহেরকে কারাবন্দি করা হয়েছে ।
কানাডায় প্লেন ল্যান্ড করার পর রুদ্র আর সেখানে এক মুহূর্তও দেরি করল না। সেখান থেকে সোজা কানেক্টিং ফ্লাইট ধরে সে চলে গেল আমেরিকার ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো শহরে। এই শহরে তার জীবনের দীর্ঘ ৮টি বছর কেটেছে। এখানকার প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি গলি তার চেনা।
অরল্যান্ডোর নীল আকাশ, দুপাশে সারিবদ্ধ পাম গাছের সারি, আর ঝলমলে রোদে ভেজা মসৃণ হাইওয়েটা এক নিমেষে রুদ্রকে অতীতের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। এখানে ভাইয়ের সাথে কত সুন্দর মুহূর্ত কেটেছে তার। ডাউন্টাউনের লেক ইওলার পাশে বিকেলে হেঁটে বেড়ানো, ইউনিভার্সাল স্টুডিওর জমজমাট রাইডগুলোতে চিৎকার করা, আর ভাইয়ের সাথে কফির মগ হাতে বারান্দায় বসে খুনসুটি করে কাটানো রাতগুলো সবকিছু স্মৃতির পাতায় জীবন্ত হয়ে ধরা দিল।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৬
অথচ আজ অরল্যান্ডোর এসেও রুদ্রর বুকের ভেতরটা ফাঁকা লাগছিল। সে খুব ভালো করেই জানে, অতীতে কাটানো দিনগুলো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। বর্তমানের এই জটিলতা, মেহেরকে নিয়ে তৈরি হওয়া এই মানসিক দ্বন্দ্ব এবং বাবার সাথে দূরত্বের ক্ষত তাকে একাকীত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছি যেন আবার, আট বছর আগের মত। ভাই হারানোর ক্ষত আজও সে সামলে উঠতে পারেনি…
