ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৯
মারিয়াম ফুল
মাদার ডি’সুজার শেষ কথাটা মেহেরের কানের কাছে যেন এক তীব্র ঘূর্ণি তৈরি করল। মাদার মৃদু হেসে বলেছিলেন, “কখনো কখনো হৃদয় যে উত্তরটা অনেক আগেই জেনে বসে থাকে, আমাদের এই জটিল মাথাটা সেটাকে মেনে নিতে একটু বেশিই দেরি করে ফেলে।”
মাদারের এই ধারণার ওপর মেহের মনে মনে এক তিতা হাসল। দুনিয়ার মানুষ কত সহজ করে ভালোলাগা আর ভালোবাসার অঙ্ক মিলিয়ে ফেলে! তিনি কত অনায়াসে একটা জটিল সমীকরণকে সরল করে দিলেন। কিন্তু তিনি তো জানেন না এই সম্পর্কের পেছনের নির্মম সত্যটা। তিনি জানেন না যে এই বিয়েটা আসলে কোনো পবিত্র বন্ধন নয়, একটা নিখাদ লোক-দেখানো খাঁচা মাত্র। ওনার ধারণা পুরোপুরি ভুল। মেহের খুব ভালো করেই জানে ওর মনে রুদ্রর জন্য কোনো স্থান নেই, আর থাকা সম্ভবও না। যে মানুষটা ওকে প্রতি পদে পদে অপমান করেছে, তার প্রতি কোনো অনুভূতি থাকা তো দূরের কথা! মেহের স্রেফ পরিস্থিতির চাপে, নিয়তির এক অদ্ভুত খেলায় এখানে এসে আটকে আছে।
তবে মাদারকে এত কিছু ভেঙে বলার কোনো প্রয়োজন মনে করল না ও। ও ভাবল, মাদার হয়তো ভাবছেন সাধারণ দম্পতিদের মধ্যে যেমন চিলতে রাগ বা অভিমান থাকে, ও রুদ্রর সাথে তেমন কোনো কারণে মান করে আছে, তাই এভাবে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। মেহের নিজের মুখাবয়ব একদম স্বাভাবিক রাখল। ওর চোখে কোনো কিছু আড়াল করার ছটফটানি ছিল না, কোনো লুকানো অনুভূতির কাঁপন ছিল না; ছিল কেবলই এক ধরণের উদাসীনতা।
মেহের নিজের হাতটা মাদারের ওল্টানো মুঠো থেকে আলতো করে ছাড়িয়ে নিল। তারপর হালকা হাসল । নিজের ভেতরের এই জটিল কুয়াশাকে আর না ঘেঁটে ও চায়ের কাপটা তুলে নিল। চায়ের ওপর জমে থাকা পাতলা সর সরিয়ে ও একটা চুমুক দিল। চায়ের এলাচের সুগন্ধও অবশ্য ওর চারপাশের এই থমথমে একাকীত্বকে দূর করতে পারল না। একাকীত্ব জিনিসটা চায়ের সুবাসের চেয়েও অনেক বেশি তীব্র।
খানিকটা সময় পার হওয়ার পর রুদ্র অফিস ঘরে ফিরে এলো। ওর কপালে হালকা ঘামের বিন্দু জমাল, চুলগুলো কিছুটা উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে। বাতাসে উড়ছে কয়েকটা চুল। তবে বোঝা গেল, ও বাচ্চাদের সাথে সময় কাটিয়ে বেশ চনমনে আর ফুরফুরে মেজাজে আছে। রুদ্রকে আসতে দেখে মাদার ডি’সুজা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন :
“বাচ্চাদের সাথে তো বেশ ভালো সময় কাটালে রুদ্র। এবার মেহেরকে নিয়ে একটু আমাদের বাগানটা ঘুরে দেখাও। ও তো এতক্ষণ একাই বসে ছিল।”
রুদ্র মেহেরের দিকে এক পলক তাকাল। তীব্র কিন্তু ক্ষণস্থায়ী এক দৃষ্টি। তারপর মাদারের দিকে ফিরে বিনীত সুরে বলল, “হ্যাঁ মাদার, আমি ওকে নিয়েই একটু বের হচ্ছিলাম। সন্ধ্যে নামার আগেই ওকে জায়গাটা একটু ঘুরিয়ে দেখাই।”
মেহেরের আর ‘না’ করার কোনো সুযোগ রইল না। এক ধরণের ভদ্রতার খাতিরেই ওকে মাথা নাড়তে হলো। তাছাড়া এতিমখানা জায়গাটা ওর নিজেরও মন্দ লাগেনি, একটা ছায়া ছায়া শান্তি আছে এখানে। ও চায়ের কাপটা সাবধানে টেবিলে রেখে আলতো করে উঠে দাঁড়াল। বাইরের হিমেল হাওয়াটার কথা মাথায় রেখে নিজের গায়ের কালো কাশ্মীরি শালটা আর একবার কাঁধের ওপর ভালো করে জড়িয়ে নিল ও।
তারা দুজনে যখন অফিস ঘর থেকে বের হয়ে এল, ততক্ষণে বিকেলের আলো ফুরিয়ে এসেছে। চারপাশের আকাশটা আরও কিছুটা গাঢ়, এক অদ্ভুত লালচে-বেগুনি রঙ ধারণ করেছে। দিনের আলো আর রাতের অন্ধকারের এই সন্ধিক্ষণটা বেশ মায়াবী হয়। এতিমখানার এই বিশাল চত্বরের এক কোণে একটা ছোট, শান্ত লেকের মতো আছে। লেকের চারপাশটা বড় বড় কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছে ঘেরা। ঋতুচক্রের নিয়মে ঝরে পড়া শুকনো পাতাগুলো জুতো দিয়ে মাড়িয়ে তারা দুজনে একদম নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল। চারিপাশে কেবল পাতা মচমচ করার শব্দ।
দুই জনের মাঝখানে বেশ কিছুটা দূরত্ব। যেন এক অদৃশ্য দেয়াল তাদের সমান্তরাল রেখে দিয়েছে। মেহের চারপাশের উদাসীন প্রকৃতিটা দেখছিল। হালকা বাতাসে রুদ্রর হুডির হুডটা সামান্য দুলছে।
রুদ্রই প্রথম এই জমাট বাঁধা নীরবতা ভাঙল। ও লেকের পাড়ে একটা পুরনো, শ্যাওলা ধরা কাঠের বেঞ্চের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেহেরের দিকে সরাসরি না তাকিয়েই বলল, “জায়গাটা কেমন লাগল তোমার?”
মেহের লেকের স্থির, শান্ত জলের দিকে তাকাল। যেখানে আকাশের বেগুনি আভা প্রতিফলিত হচ্ছে। ও মৃদু স্বরে বলল, “খুব সুন্দর। ঢাকা শহরের এত কাছে এমন শান্ত একটা জায়গা আছে, আমার জানা ছিল না। এখানে এসে মনটা কেমন যেন হালকা হয়ে যায়।”
রুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুক চিরে আসা সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ বাতাসে মিলিয়ে গেল। ও কাঠের বেঞ্চের ওপর এক হাত রাখল।আকাশের দূর সীমানার দিকে তাকিয়ে ও বলল, “ফ্লাইটের পর যখন আমার মাথাটা একদম জ্যাম হয়ে থাকে, কিংবা যখন এই দুনিয়ার চারপাশের ভন্ডামি আর কোলাহল আমার আর সহ্য হয় না, তখন আমি এখানে চলে আসি। এই বাচ্চাদের নিষ্পাপ হাসির মাঝে কোনো ভেজাল নেই, কোনো স্বার্থ নেই। ওদের দেখলে মনে হয়, জীবনের জটিলতাগুলো আসলে আমাদের নিজেদের তৈরি। প্রকৃতি খুব সহজ, আমরাই একে কঠিন করি।”
রুদ্রর মুখে এমন কথা শুনে মেহের কিছুটা অবাক হলো। যে মানুষটাকে ও চেনে অন্য রূপে, তার মুখে এই রূপান্তর ভাবা যায় না। তবে মনে মনে অবাক হলেও ও মুখে বিন্দুমাত্র কিছু প্রকাশ করল না। ওর মুখাবয়ব রইল পাথরের মতো শান্ত। একটা নিভে যাওয়া উনুনে যেমন নতুন করে হাওয়া দিলেও আগুন জ্বলে না, মেহেরের মনটাও ঠিক তেমন হয়ে আছে ।মাদারের কথা শোনার পর থেকেই মেহেরের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি কাজ করছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, কোথাও না কোথাও কিছু একটা ঠিক নেই। কিন্তু সেই অস্বস্তির কারণটা সে নিজেও খুঁজে পাচ্ছে না।মেহের নিজের ভেতরের এই অস্বস্তিকর জড়তা কাটাতে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এখানে নিয়মিত আসেন?”
“আগে আসতাম,” রুদ্র এবার মেহেরের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে এনে বলল। ওর চোখ দুটো এই আবছা আলোতেও যেন মেহেরের মনটা পড়ে ফেলতে চাইল। ও বলল, “গত এক বছর ধরে ফ্লাইটের শিডিউল আর অন্যান্য ঝামেলার কারণে আসা হয়নি। আজ তোমাকে সাথে নিয়ে এলাম, কারণ আমার মনে হয়েছিল এই বন্দী অ্যাপার্টমেন্টের চারটে দেয়াল তোমাকে দমবন্ধ করে মারছে।
মেহের লেকের জলের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরে , কিছুটা নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আপনি আমার কথা ভাবছেন?”
রুদ্রর ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত বিষণ্ন হাসির রেখা ফুটে উঠল। ও নিচু হয়ে লেকের পাড় থেকে একটা ছোট চ্যাপ্টা পাথর কুড়িয়ে নিল। তারপর হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর নিখুঁত টোকায় পাথরটা লেকের জলের ওপর ছুঁড়ে দিল। পাথরটা জলের বুকে একটা, দুটো, তিনটে লাফ দিয়ে টুক করে তলিয়ে গেল। রুদ্র শান্ত গলায় বলল, “না। একজন বাচ্চার মায়ের কথা ভাবছি।”
বলেই ও আবারও নিচু হয়ে আরেকটা পাথর তুলে নিল। সেটাকেও জলের বুকে ছুঁড়ে দিয়ে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলল, “তুমি আমাকে লম্পট, লুচ্চা, নোংরা, জুয়াড়ি, মাদারী, নেশাখোর ভাবো, তাই না?”
রুদ্রর মুখ থেকে এমন সব অপ্রত্যাশিত শব্দ শুনে মেহের যেন কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। ও চট করে চোখ তুলে রুদ্রর দিকে তাকাল। এমন একটা শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশে এই ধরণের শব্দগুলো বড্ড বেমানান ঠেকল ওর কাছে। ও নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল, “না! ওরকম কেন ভাবব?”
রুদ্র এবার মেহেরের দিকে সোজাসুজি তাকাল। “না, মিস অ্যারোফোবিয়া, তুমি আমাকে ওরকমই ভাবো।”
মেহের ভেতরে ভেতরে ভীষণ বিস্মিত হলো। ওর বুকের ভেতর একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে গেল। ও কি সত্যিই রুদ্রকে এমন ভাবে? হ্যাঁ, ও তো ঠিক এটাইভাবে । কিংবা হয়তো এই কদিন আগেও ভাবত। কিন্তু গত কয়েকটা দিনে রুদ্র নিজের কর্মকাণ্ড দিয়ে ওকে এতটাই অবাক করেছে যে, মেহেরের আগের সেই ধারণার দেয়ালগুলো কেমন যেন নড়বড়ে হয়ে গেছে।
মেহেরের মনে পড়ে গেল তাদের বিয়ের প্রথম রাতের কথা। রুদ্রর নিষ্ঠুর কথাগুলো সেদিন মেহেরের বুকে তীরের মতো বিঁধেছিল, ভীষণ খারাপ লেগেছিল ওর। একটা সম্পূর্ণ অজানা, অচেনা মানুষের সাথে একই ছাদের নিচে বাকিটা জীবন কাটাতে হবে—এই ভাবনাটুকুই মেহেরকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল। তখনো তো অন্তুর লাশটা হয়তো মাটির সাথে ঠিকমতো মিশেও যায়নি! মেহেরের নিজের পরিবারের মানুষগুলো, যাদের ও নিজের ভাবত, তারা ওর সাথে যে চরম বিশ্বাসঘাতকতা আর নির্মমতা করল, তারপর থেকে অন্য কোনো মানুষকে বিশ্বাস করার ক্ষমতাটাই ও হারিয়ে ফেলেছিল।
তারপর রুদ্রর ওপর মেহেরের রাগ আর জেদটা আরও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল সেদিন, যেদিন রুদ্র বিন্দুমাত্র সত্য না জেনে, কোনো কিছু না বুঝে সোজা মেহেরের চরিত্র নিয়ে কথা তুলেছিল। মেহেরের গর্ভের নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে অবলীলায় ‘পাপ’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিল। সেই চরম অপমানের দহন মেহের এখনো ভোলেনি। অথচ, রাগের মাথায় মেহের রুদ্রর সেই সব ভালো দিকগুলোও একদম ভুলে গিয়েছিল, যা রুদ্র আসলে মেহেরের জন্য আড়ালে বা প্রকাশ্যে করেছে। চারপাশের পরিস্থিতি আর মেহেরের ভেতরের ক্ষতগুলো কখনো রুদ্রর ভালো রূপটাকে সহজভাবে দেখতেই দেয়নি। মেহের মনে মনে ভাবল, দূর থেকে দাঁড়িয়ে কাউকে এক ঝটকায় বিচার করে ফেলা কতটাই না সহজ, অথচ আদতে সেটা কতটা অনুচিত!
মেহের নিজের মনের এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব লুকিয়ে রুদ্রর কথার পিঠে মাথা নেড়ে মৃদু একটা হ্যাঁ-সূচক সায় দিল। অর্থাৎ, ও স্বীকার করল যে একসময় ও সত্যিই রুদ্রকে ওভাবেই দেখত।
মেহেরকে মাথা নাড়তে দেখে রুদ্র এবার হো হো করে শব্দ করে হেসে উঠল। ও হাসতে হাসতেই বলল, “শোনো মিস অ্যারোফোবিয়া… তুমি আমাকে যতটুকু ভালো দেখেছ বা ভাবছ, আমি আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি খারাপ। তোমার ধারণারও বাইরে। অতীতে আমি কী কী করেছি, সেটা তোমার জানা নেই। সো, আমার থেকে যত পারো দূরে দূরে থাকবে। তা… উদ্ধার পাচ্ছি কবে? যাচ্ছ কবে?”
রুদ্রর এই বাঁকা ত্যাড়ছা কথার পিঠে মেহেরও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও বলল, “তাড়িয়ে দিতে চাইছেন?”
রুদ্র এবার মেহেরের দিকে এক কদম এগিয়ে এসে পাল্টা প্রশ্ন করল, “থাকতে চেয়েছ?”
মেহের মুহূর্তের মধ্যে নিজের চোখ দুটো লেকের জলের দিকে নামিয়ে নিল। এক বুক দীর্ঘশ্বাস চেপে অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল, “না, থাকতে কেন চাইব? আমি মুক্তি চাই… এই মিথ্যে, লোক-দেখানো সম্পর্কটা থেকে মুক্তি চাই।”
রুদ্র আবারও হাসল। যেন মেহেরের এই উত্তরটা ওর আগেই জানা ছিল। ও উদাসীন গলায় বলল, “বললে না তো যে কবে যাবে?”
মেহের একটু ভেবে নিয়ে বলল, “হয়তো এই মাসের শেষের দিকেই চলে যাব…”
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল, “হুম, তোমার ভাই ভিসা করিয়ে নিয়েছে, তাই তো?”
মেহের এবার মাথা দুলিয়ে বলল, “হুম।”
“তোমার বাবা কি তোমাদের ছোটবেলায় হরলিক্স, কমপ্ল্যান এসব কিছু খাওয়াননি?”
রুদ্রর এই আকস্মিক এবং অদ্ভুত কথায় মেহেরের কপালে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ের কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। ও কিছু বুঝতে না পেরে রুদ্রর দিকে ভ্রুকুটি করে তাকাল।
রুদ্র ওর চাউনি দেখে আবার বলে উঠল, “নাইন মান্থস-এর প্রেগন্যান্সি নিয়ে কোনো এয়ারলাইন্স তোমাকে ফ্লাই করার পারমিশন দেবে না। তার ওপর আবার তোমার এই হাই ব্লাড প্রেশার! সো, ঈদ মোবারক! তোমার ভিসার ডেট ডিলে হয়ে গেল…”
মেহের রুদ্রর মুখের দিকে চেয়ে একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। ও তো এই কথাটা একবারের জন্যও ভেবে দেখেনি! সত্যি তো, এই অবস্থায় ডাক্তার বা এয়ারলাইন্স কেউই তো ওকে একা এত বড় জার্নি করতে দেবে না। মেহেরের মনের ভেতর এক তীব্র বিরক্ত আর হতাশার মেঘ জমে উঠল। তার মানে, ওকে আবারও থাকতে হবে এখানে? এই বন্দী অ্যাপার্টমেন্টে, এই মানুষেরই আশেপাশে? তখন তো বাচ্চার পৃথিবীর আলো দেখার সময় ঘনিয়ে আসবে! মেহের এক অজানা আশঙ্কায় লেকের জলের দিকে চেয়ে রইল …..
ঠিক তখনই এতিমখানার ভেতরের বিল্ডিংগুলো থেকে মাগরিবের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে এল। চারপাশের শান্ত ও গোধূলির আলোয় সেই আজানের শব্দ যেন নিস্তব্ধতা বয়ে নিয়ে এল। আজানের পবিত্র ধ্বনি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই দুজনের মাঝখানের সেই বাক্যবিনিময়টা আচমকা থেমে গেল। এক মুহূর্ত আগের সেই চড়া সুর, আক্রোশ আর অভিমানের মেঘ যেন আজানের শব্দে এক লহমায় স্তিমিত হয়ে গেল।
মেহের নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু লুকিয়ে কিছুটা ব্যস্ত ভঙ্গিতে গায়ের শালটা টেনে বলল, “আজান দিয়ে দিয়েছে। আমাদের এবার ফেরা উচিত, ক্যাপ্টেন সাহেব।”
রুদ্র আর কথা বাড়াল না। লেকের পাড় থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল ও। নিজের বাঁ হাতের ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “হুম, চলো। সন্ধ্যা নেমে গেলে এই রাস্তায় আবার গাড়ি চালানো মুশকিল হবে। লকডাউনের কারণে চারপাশ এমনিতেই বেশ থমথমে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হলেও পরিবেশটা ভালো না।”
তারা দুজনে আবার মাদার ডি’সুজা আর হাসিম চাচার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য অফিস ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। বিদায় নেওয়ার সময় মাদার মেহেরের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মেহেরের চোখের দিকে তাকিয়ে ইশারায় আবার সেই মিষ্টি হাসিটা হাসলেন, যা মেহেরকে এক অদ্ভুত অপরাধবোধে ফেলে দিল। মেহের মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল— মাদারকে ও কীভাবে বোঝাবে যে ওনার ভাবনার সাথে তাদের এই নির্মম বাস্তবতার কোনো মিলই নেই! এ এক নিখাদ অভিনয়, একটা খাঁচা।
গাড়িতে ওঠার পর চারপাশটা যেন খুব দ্রুত পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে গেল। ঢাকার বাইরের এই অঞ্চলটায় শহরের মতো নিয়ন আলোর ঝলকানি নেই, তাই অন্ধকারটা এখানে অনেক বেশি ঘন। রুদ্র গাড়ি স্টার্ট দিয়ে হেডলাইটটা জ্বালিয়ে দিল। তীব্র সাদা আলোর ফোকাসটা পিচঢালা অন্ধকার নিঝুম রাস্তার ওপর গিয়ে পড়ল। যেন সেই আলো অন্ধকারকে চিরে একটা পথ তৈরি করে নিচ্ছে।
ফিরতি পথে গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা একদম নিঝুম, নিস্তব্ধ হয়ে রইল। কোনো টু শব্দ নেই। মেহের জানালার বাইরে তাকিয়ে অন্ধকার ঢাকা শহরের আবছা অবয়বের দিকে চেয়ে রইল। জানালার কাচটা সামান্য নামানো। সেখান দিয়ে আসা হালকা হিমেল হাওয়া ওর কুর্তির হাতা আর হিজাবের ফাঁক গলে বেরিয়ে থাকা দু-একটা আলগা চুল ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
ওর মনে কোনো প্রেম বা অনুভূতির দোলাচল ছিল না রুদ্রের জন্য , ছিল কেবল নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরণের গভীর অনিশ্চয়তা আর ক্লান্তি। এই যে লন্ডনে যাওয়া আটকে গেল, এখন ও কী করবে? এই দমবন্ধ করা খাঁচায় আর কতদিন?
রুদ্র আর মেহেরের মধ্যে কোনো কথা হলো না বেশ কিছুক্ষণ। গাড়ির ইঞ্জিনের মৃদু আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর, রুদ্র ড্রাইভিং করতে করতে হঠাৎ একদম আনমনে, যেন নিজের অজান্তেই মেহেরকে একটা প্রশ্ন করে বসল, “ইউকে তে চলে গেলে কি কখনো মনে পড়বে আমাকে… মিস অ্যারোফোবিয়া?”
মেহের এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। রুদ্রর এই অদ্ভুত কৌতূহল বা হেয়ালিকে ও স্রেফ উপেক্ষা করতে চাইল। ও চুপ করেই রইল। মেহের কোনো উত্তর দিচ্ছে না দেখে রুদ্রও আর জোরাজুরি করল না। ও ভাবল, হয়তো অবান্তর একটা প্রশ্ন করে ফেলেছে। ও আবার সোজা রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালানোয় মন দিল।
কিন্তু গাড়ির ভেতরের এই নীরবতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ করেই ভেতর একটা খুব মৃদু, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শোনা যেতে লাগল। রুদ্র প্রথমে ভাবল ওর ভুল হচ্ছে, কিন্তু পরক্ষণেই শব্দটা স্পষ্ট হলো। ও একবার সামনের রাস্তার দিকে তাকাল, তারপর চট করে মেহেরের দিকে তাকাল। মেহের কাঁদছে! ও নিজের মুখটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে, জানালা দিয়ে একদম উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিঃশব্দে ফুপিয়ে চলেছে। কান্নাটা ও আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু ওর কাঁধের কাঁপুনি বলে দিচ্ছে ভেতরের ঝড়টা কতটা তীব্র।
রুদ্রর বুকটা এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল। ও তিনবার মেহেরকে ডাকল, “মেহের… মেহের… মেহের!”
মেহের কোনো উত্তর দিল না, ও একইভাবে মুখ লুকিয়ে কেঁদেই চলল। রুদ্র এবার সত্যিই কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। ওর মনের ভেতর এক ঝটকায় হাজারটা দুশ্চিন্তা ভর করল। ও ব্যাকুল হয়ে বলল, “ডেলিভারি? মেহের? বেবি? ও মাই গড! মেহের, কষ্ট হচ্ছে তোমার? কোনো পেইন হচ্ছে? হেয় অ্যারোফোবিয়া গার্ল, কথা বলো!”
মেহেরের কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেল, কিন্তু ও মুখ চেপে রাখায় আওয়াজ তেমন বের হচ্ছে না। রুদ্রর মাথায় তখন হুলস্থুল পড়ে গেছে। ও মনে মনে হিসাব মেলাতে লাগল। এখন তো ওর আট মাস চলছে। আট মাসে কি বেবি হয়ে যাওয়া সম্ভব? রুদ্র কোনো হিসাব মিলাতে পারল না। ও এক চরম আতঙ্কে ছটফট করতে লাগল। ওর মাথায় এলো—ওয়াটার ব্রেক হচ্ছে না তো?কিন্তু এই প্রশ্নটা মেহেরকে কীভাবে করবে, তা রুদ্রের জানা নেই। অকারণেই ভীষণ অস্বস্তি আর অপ্রস্তুত লাগছে তার। মনে হচ্ছে, এসব নিখাদ মেয়েলি ব্যাপার। সে চাইলে জিজ্ঞেস করতেই পারে, কিন্তু মেহেরকে নয়….কারণ মেয়েটা কখন কোন কথায় তির্যক দৃষ্টি ছুড়ে তেতে ওঠে, তার কোনো ঠিক নেই। রুদ্র আপাতত সেই ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।
মেহের এবার নিজের চোখের হাতটা সরিয়ে মুখ তুলে রুদ্রর দিকে তাকাল। গাড়ির ড্যাশবোর্ডের হালকা আলোয় রুদ্র দেখল, মেহেরের চোখ-মুখ একদম লাল হয়ে গেছে। ফর্সা গাল দুটোতে কান্নার কারণে এক লালচে আভা ধারণ করেছে, চোখ দুটো পানিতে টলমল করছে।
রুদ্র একদম ব্যাকুল, অসহায় হয়ে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল, “পেইন হচ্ছে খুব? হাসপাতালে যাব?”
মেহের নিজের ওড়না দিয়ে চোখটা মুছে উঠল, “না, কিছু হয়নি।”
“তাহলে কাঁদছ কেন এভাবে? আমি তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম!” রুদ্রর গলার স্বরে এবার কিছুটা রাগ আর এক বুক স্বস্তির মিশ্রণ ঘটল। বেচারা সত্যিই ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। যদি সত্যি সত্যি এই মাঝরাস্তায় মেহেরের ডেলিভারি পেন উঠে যেত, তবে ওকে নিয়ে কোথায় যেত ও? হসপিটাল? ও তো জীবনেও কোনো হসপিটালে সহজে যেতে চায় না, ওখানের পরিবেশ ও সহ্য করতে পারে না। রুদ্র একটা দীর্ঘ বুকফাটা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করল।
মেহের অবশ্য রুদ্রর এই রাগত স্বর শুনেও আর কিছু বলল না। ও রুদ্রকে বলল বটে যে কিছু হয়নি, হয়তো মুড সুইংস প্রেগন্যান্সিতে যা খুব স্বাভাবিক। রুদ্রও সেটা ভেবেই শান্ত হলো। অথচ মেহের মনে মনে খুব ভালো করেই জানে, এটা কোনো মুড সুইংস ছিল না। হঠাৎ করেই ওর মনে হচ্ছে, ওর বুকের ওপর কে যেন এক বিশাল পাথরের টুকরো এনে বসিয়ে দিয়েছে। একটা তীব্র নিশ্বাস নেওয়ার জায়গাও যেন অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এই কান্নার উৎসটা কোথায়? রুদ্রর ওই হুট করে করা প্রশ্নটা? নাকি এই রমণী দেশ ছেড়ে চেনা পরিমণ্ডল ছেড়ে চিরকালের মতো চলে যাবে— সেই লুকানো দুঃখ? মেহের নিজেই নিজের এই অনুভূতির হিসাব মেলাতে পারল না। ও শুধু জানালার বাইরে চেয়ে রইল।
রুদ্র গাড়ি চালাতে চালাতে কিছুটা শান্ত হয়ে বলল, “এখন অ্যাপার্টমেন্টে যাই?”
মেহের আর কোনো কথা না বলে, স্রেফ মাথা নেড়ে হ্যাঁ-সূচক সম্মতি জানাল। ওর আর কথা বলার মতো শক্তি ছিল না।
সেই দিনের পর কেটে গেছে আরও তিন-তিনটি দিন।
আজকের সকালটা রুদ্র কিংবা চৌধুরী পরিবারের জন্য বিন্দুমাত্র শুভ ছিল না। এই তো কিছুক্ষণ আগেই রুদ্রর বাবা হামজা চৌধুরী রুদ্রকে ফোন দিয়ে বিপর্যস্ত গলায় একটা খবর দিয়েছেন। খবরটা শুনে রুদ্রর মাথার ভেতরটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে।
সিলেটে তাদের যে বিশাল কাপড়ের ফ্যাক্টরি আর টেক্সটাইল মিল ছিল, সেই ফ্যাক্টরিটা নাকি গত রাতে কে বা কারা সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দিয়েছে! আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে কোটি কোটি টাকার সুতো, কাপড় আর মূল্যবান যন্ত্রপাতি। শুধু তাই নয়, তাদের ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট ব্যবসার একটা বড় চালানের মালও বন্দরে আটকে নষ্ট হয়েছে। একই সাথে পরপর দুটো এত বড় বড় লস বা আর্থিক ক্ষতি চৌধুরী পরিবারকে এক ধাক্কায় একদম কোণঠাসা করে ফেলেছে। কোটি কোটি টাকার মালামাল এভাবে এক রাতের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেল!
হামজা চৌধুরী ফোনে বললেন, “প্রাথমিক সন্দেহ ফ্যাক্টরির বেশ কয়েকজন শ্রমিকের ওপর, রুদ্র। সামনে নির্বাচন, চারপাশের পরিবেশ এমনিতেই উত্তপ্ত। কিন্তু শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে এত বড় ক্ষতি ব্যাকস্টেজে থেকে কে করাল, সেটা কেউ ভেবে পাচ্ছে না।”
রুদ্রর বাবা এখন সিলেটে একাই আছেন। এই ঝামেলা, পুলিশ-প্রশাসন, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি—সব একা সামাল দেওয়া ওনার এই বয়সে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রুদ্রর সামনে আর কোনো উপায় নেই। দেশে যখন আছেই, তখন এই বিপদের দিনে বাবাকে একা ফেলে রাখা যায় না। সিলেটে গিয়ে নিজের চোখে দেখা দরকার আসলে হচ্ছেটা কী, কারা এই নোংরা খেলার পেছনে আছে।
তাছাড়া ওদিকে আরেকটি বড় ঝামেলাও মাথাচারা দিয়ে উঠেছে। তাদের অপজিশন পার্টি বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সোলেমান খানের ছেলেপেলেরা নাকি রটিয়েছে যে, চৌধুরী বাড়ির লোকজন তাদের পার্টির কিছু ছেলেকে মারধর করেছে। রুদ্রর ব্যক্তিগতভাবে এই পলিটিক্যাল বা রাজনৈতিক ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই, ও এসব থেকে সবসময় দূরেই থাকে। কিন্তু তাদের এই পারিবারিক বিজনেস বা ব্যবসাগুলো যদি এখন ও নিজে দাঁড়িয়ে না সামলায়, তবে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। বাবার এই রাজনীতির নেশার জন্য তাদের ফ্যামিলির ওপর দিয়ে কম ঝড়-ঝাপটা যায়নি!
রুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর বাবা কত সহজে প্রায়ই তাকে বলতেন,
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৮ (২)
“পাইলটগিরি ছেড়ে দাও রুদ্র, এসে আমাদের বিজনেস দেখো।” কিন্তু রুদ্রের এই করপোরেট দুনিয়ায়, এই এভিয়েশন সেক্টরে নিজের যোগ্যতায় একটা নিজস্ব জায়গা বানাতে তাকে কতটা রক্ত পানি করতে হয়েছে, কতটা কষ্ট করতে হয়েছে সেটা শুধু সে-ই জানে….বাবার তৈরি সাম্রাজ্যে এসে বসাটা যত সহজ, নিজে শূন্য থেকে কিছু তৈরি করাটা ততটা সহজ নয়।
