ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪০ (৩)
মারিয়াম ফুল
“আমা….আমার মেয়ে। ও আমার মেয়ে ছিল,মিস অ্যারোফোবিয়া ।”
রুদ্রর মুখের এই একটা বাক্যে মেহেরের পুরো পৃথিবীটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ও অবিশ্বাস্য চোখে রুদ্রর দিকে চেয়ে রইল। রুদ্রর অতীতে এমন একটা অধ্যায় আছে, ও একটা সন্তানের বাবা ছিল—সেটা মেহেরের কল্পনারও বাইরে ছিল।
রুমে তখন এক পিনপতন নীরবতা। কেবল বাইরের ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দ আর জানালার কাচে বাতাসের ধাক্কা ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। মেহেরের চোখ দুটো যেন স্থির হয়ে গেছে রুদ্রর মুখের ওপর।
রুদ্র অ্যালবামের পাতাটার ওপর থেকে হাত সরাল না। ওর আঙুলগুলো তখনো সেই ছোট্ট বাচ্চাটার হাসিমুখের ওপর আলতো করে বুলিয়ে যাচ্ছিল, যেন ও স্পর্শ করলেই ছবিটা জীবন্ত হয়ে উঠবে। রুদ্রর চোখের সেই জেদ, কাঠিন্য এখন আর কোথাও নেই।সেখানে কেবল এক অফুরন্ত হাহাকারের ছায়া।
মেহের নিজের শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিল। ওর গলার স্বর বুজে আসছিল, তাও ও নিজেকে সামলে নিয়ে খুব মৃদু, প্রায় ফিসফিসানি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার… আপনার মেয়ে? কিন্তু ও… ও এখন কোথায়?”
রুদ্র একটা দীর্ঘ, ভারী শ্বাস ফেলল। সেই শ্বাসের সাথে যেন বুকের ভেতর জমে থাকা বহু বছরের পাথরটা একটু নড়ে উঠল। ও অ্যালবামটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল, তারপর ঘরের সেই ছোট দোলনাটার দিকে তাকাল, যেটা এখন একদম শূন্য পড়ে আছে।
“ও নেই,”
রুদ্রর গলার স্বরটা এক অদ্ভুত রকমের নিস্পৃহ শোনাল, যা মেহেরের বুকের ভেতরটা মুচড়ে দিল।
মানুষ যখন অতিরিক্ত তীব্র কোনো কষ্টের মুখোমুখি হয়, তখন তার কান্না ফুরিয়ে যায়। রুদ্রর গলার স্বরটাও তেমনই শোনাল একদম শান্ত, নিস্তরঙ্গ। কিন্তু সেই শান্ত স্বরটা মেহেরের বুকের ভেতরটা এক লহমায় মুচড়ে দিল।
রুদ্র ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সেই দোলনাটার পাশে বসল। ওর বসার ভঙ্গিটার মধ্যে কেমন যেন এক গভীর ক্লান্তি আর নিঃস্বতা প্রকাশ পাচ্ছিল। মেহের পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। রুদ্র দোলনাটার ওপর নিজের অবশ হাতটা রাখল। শূন্য দোলনাটা সামান্য দুলে উঠতেই রুদ্রর ঠোঁটের কোণে একটা ম্লানহাসির রেখা ফুটে উঠল। ও বলতে শুরু করল,
“অনাবিয়া… আমার অনাবিয়া… ওর নাম অনাবিয়া। সময়টা ছিল ২০০৮ সাল। এসএসসি শেষ করেই আমি ইউএসএ চলে যাই হায়ার স্টাডিজের জন্য। আমেরিকার ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো শহর… ভাইয়ার কথা মনে আছে তোমার, মেহের?”
মেহের আলতো করে মাথা দুলালো। ও জানে, রুদ্রর বড় ভাই রেদওয়ান চৌধুরীর কথা। কতবার যে রেহানা চৌধুরীর মুখে রেদওয়ান আর তাঁর স্ত্রীর গল্প শুনেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কখনো প্রশংসা, কখনো স্মৃতিচারণ—কথায় কথায় তাঁদের প্রসঙ্গ চলে আসতই।
রুদ্র দোলনাটার দিকে তাকিয়েই আস্তে আস্তে অতীতে হারিয়ে যেতে লাগল। ওর গলার স্বর সময়ের গভীরে ডুব দিল,
” ভাইয়া আরও কয়েক বছর আগেই ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো শহরে চলে গিয়েছিল। সেখানে আইন নিয়ে পড়াশোনা করছিল। ভাইয়ার কাছেই থাকতাম আমি। সেখানে গিয়ে সে একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে, নাম তুষা চৌধুরী। তুষা ভাইয়ার ব্যাচমেট ছিল। As time went by, they slowly fell in love with each other.(সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা ধীরে ধীরে একে অপরের প্রেমে পড়ে গেল…)
আমাদের জীবনটা তখন ফ্লোরিডার ওই রোদেলা দিনগুলোর মতোই ঝলমলে, সুন্দর কাটছিল। ভাইয়া আর তুষার বিয়েটা সে সময়ে ওখানেই খুব ধুমধাম করে হয়। তুষার মা-বাবা আগে থেকেই আমেরিকায় থাকতেন, তাই বিয়েটা ওখানেই হয়েছিল। অবশ্য তাঁদের বিয়ের সময় মা-বাবাও যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন । ”
রুদ্র একটু থামল। তার দৃষ্টি তখন আর দোলনায় নিবদ্ধ নয়।যেন বহু দূরের কোনো স্মৃতির ভেতর হারিয়ে গেছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে অতীতের একের পর এক দৃশ্য।
“তাদের বিয়ের এক বছর পার হতেই বাবার সাথে আমার তুমুল ঝগড়া হয়ে গেল। বাবা চাইলেন আমি পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে আসি, ওনার রিয়েল এস্টেটের বিজনেসটা হ্যান্ডেল করি। বাবার সমস্ত আশা ছিল ভাইয়াকে ঘিরে। তিনি চেয়েছিলেন, ও-ই ব্যবসার হাল ধরবে। কিন্তু ভাইয়া নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকায় বাবার সেই আশা এসে থামল আমার কাছে। তিনি ধরে নিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত আমিই ব্যবসার দায়িত্ব নেব।
ভাইয়া তো বাবার কথা শোনেনি…ভাইয়া নিজের -ল প্র্যাকটিস আর ওখানকার জীবন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত ছিল। ভাইয়া কথা শোনেনি বলেই বাবা সমস্ত চাপ আমার ওপর দিতে লাগলেন।
ইউ নো মেহের, আমাদের সমাজ, আমাদের পরিবারগুলো সবসময় চায় তাদের ফ্যামিলির সো-কল্ড ঐতিহ্য ছেলেরা টেনে নিয়ে যাক। কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে না, নিজের কোনো ইচ্ছে আছে কি না। ”
রুদ্র একবার মেহেরের দিকে তাকাল। মেহের কোনো কথা বলল না। ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসছিল। ও নিজেকে রুদ্রর আরও একটু কাছে নিয়ে গিয়ে পাশে দাঁড়াল, যেন এই নিঃশব্দ দূরত্বটুকু কমিয়ে ও রুদ্রর ভেতরের ঝড়টাকে ভাগ করে নিতে চায়।
রুদ্র আবার বলতে থাকল,
আমি কারও ইচ্ছার জন্য নিজের স্বপ্ন বা ভালো লাগার সঙ্গে কখনোই আপস করতে পারতাম না। তাই একদিন বাবাকে স্পষ্ট করেই বলেছিলাম, ‘আমি পাইলট হতে চাই। ব্যবসা আমার দ্বারা হবে না, বাবা।’
সেদিন বাবার সঙ্গে ভীষণ ঝগড়া হয়েছিল। একপর্যায়ে রাগের মাথায় তিনি বলে ফেলেছিলেন, ‘আজ থেকে আমাকে বাবা বলে ডাকবি না।’
কথাটা বুকের ভেতর এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, আমিও জেদ করে বাবার সঙ্গে একেবারে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
সেই কঠিন সময়ে ভাইয়া আর ভাবি আমার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সময় নিজের গতিতে যেতে লাগল, আমিও পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ভাইয়া আর তুষার কোলে এর ঠিক এক বছর পর এলো একটা ছোট্ট পরি… আমাদের অনাবিয়া।”
‘অনাবিয়া’ নামটা উচ্চারণ করতেই রুদ্রর গলা কেঁপে উঠল। শব্দগুলো যেন আর গলার বাইরে আসতে চাইছিল না। সে ধীরে ধীরে চোখ দুটো বন্ধ করল। কিছু কষ্ট এতটাই গভীর হয়, তা আর চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ে না…বুকের একেবারে গভীরে, নীরবে পাথরের মতো জমে থাকে।
“অনাবিয়ার চাচা কম, আমি আসলে ওর বাবা ছিলাম বেশি। সারাক্ষণ ওর পেছনে লেগে থাকতাম। পুরো ফ্যামিলির সবাই বলত, ও দেখতে নাকি একদম আমার মতো হয়েছে। এই ছোট ছোট দুটো হাত, এই ছোট ছোট দুটো পা… ও আমাকে ‘পাপা’ বলে ডাকত, মেহের! পাপ….
আর ভাইয়াকে ডাকত ‘ডেডা’ বলে। ভীষণ দুষ্টু ছিল আমার মেয়েটা, সারাবাড়ি মাথায় তুলে রাখত। কোনো কারণে ল্যাব বা ফ্লাইটের ট্রেইনিংয়ের জন্য যদি রাতে ফিরতে লেট হতো, ও ঘুম থেকে জেগে শুধু আমার গলার আওয়াজ খোঁজার জন্য ছটফট করত। মা-বাবা, ভাইয়া-ভাবি কেউ যখন ওকে সামলাতে পারত না, আমার কোলের মধ্যে আসলেই ও এক সেকেন্ডে শান্ত হয়ে যেত।”
রুদ্র দোলনাটার ভেতর হাত বাড়িয়ে দিল। সেখানে একটা ছোট, পুরনো উলের টুপি পড়ে ছিল। ওটা হাতে তুলে নিয়ে ও নিজের গালের সাথে ছুঁইয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“জানো মেহের, মানুষ যখন খুব সুখে থাকে, তখন সে ভুলে যায় যে সুখ জিনিসটা খুব ক্ষণস্থায়ী। আমার মেয়েটা পর্দার পেছনে লুকিয়ে থাকত। ভাবত আমি ওকে দেখতে পাচ্ছি না। আমি যখন ওকে খুঁজে পাওয়ার ভান করে এদিক-ওদিক তাকাতাম, ও খিলখিল করে হেসে পর্দা সরিয়ে আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। সেই হাসির শব্দটা এখনো… এখনো আমার এই কানে এসে বাজে মেহের! মাঝে মাঝে মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়, মনে হয় অনাবিয়া ফিসফিস করে আমার কানে বলছে—
‘পাপা, আমি এখানে!’
আমি অন্ধকারের মধ্যে হাতড়াই, কিন্তু হাত ভর্তি শুধু শূন্যতা ছাড়া আর কিছু পাই না।”
“ওর বয়স যখন ঠিক তিন বছর, বাবা হুট করে আমাদের সবাইকে দেশে আসতে বললেন। তুষা ভাবিও জেদ ধরল, ও-ও দেশে আসবে, অনেকদিন দেশের মাটিতে পা রাখা হয় না। আমি বাবার ওপর তখনো প্রচণ্ড রেগে ছিলাম। কিন্তু বাবা যখন দীর্ঘ তিন বছর পর আমাকে নিজে কল দিয়ে কেঁদে ফেললেন… বাবার কান্না শুনে আমার ভেতরের সমস্ত রাগ-অভিমান এক নিমেষে ভেঙে গেল। ভাবলাম, ধুর! নিজের বাবার সাথে আর কতদিন এভাবে দূরত্ব রাখা যায়? আমরা সবাই মিলে দেশে এলাম। সময়টা ছিল ২০১৩ সালের একদম শেষ দিক।”
রুদ্রর হাতের আঙুলগুলো দোলনার কাঠ শক্ত করে চেপে ধরল। আঙুলের গাঁটগুলো টানটান হয়ে সাদা হয়ে উঠেছে, যেন বুকের ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা সেই মুঠোর ভেতরেই আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
“দেশে আসার পর প্রথম কয়েকটা দিন আমরা সবাই খুব খুশি মেজাজে কাটাচ্ছিলাম। চারদিকে একটা উৎসবের আমেজ ছিল।
১ নভেম্বর ছিল আমার দাদার মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে মা–বাবা একটি এতিমখানার অনাথ শিশুদের খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।মা আর বাবা সকাল সকালই ওই এতিমখানায় চলে গিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে যখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছিল, ভাবি হঠাৎ বলল সে-ও যাবে।
ভাইয়া তখন জরুরি এক কাজে বাড়ির বাইরে ছিল। আমি ভাবিকে বললাম,
— চলো ভাবি, ভাইয়া যেহেতু নেই, আমিই তোমাদের নিয়ে যাই।ভাবি আর অনাবিয়াকে নিয়ে গাড়ি বের করলাম। কিছুক্ষণ পরই আমরা এতিমখানার উদ্দেশে রওনা দিলাম। এতিমখানায় পৌঁছানোর পর অনাবিয়াকে দেখে মনে হচ্ছিল, জায়গাটা ওর বেশ পছন্দ হয়েছে। বাচ্চাদের সঙ্গে দিব্যি খেলছিল, গল্প করছিল। কখনো একজনের কোলে, তো কখনো আরেকজনের কোলে গিয়ে বসছিল। অল্প সময়েই সবার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল সে।
যখন আমরা ফেরার জন্য গাড়িতে উঠলাম, ঠিক মাঝরাস্তায় ভাইয়া আমাদের কল দিল। বলল ও কাজ শেষ করে ওই পথেই ফিরছে, আমরা যেন ওকে রাস্তা থেকে তুলে নিই। ভাইয়াকে গাড়িতে তোলার পর অনাবিয়া হুট করেই খুব কান্নাকাটি শুরু করল। ও কিছুতেই গাড়িতে বসে থাকতে চাচ্ছিল না। ভাবি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
‘রুদ্র, আর কোথাও যাওয়ার দরকার নেই, চলো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাই।’ ভাইয়াও বলল, ‘হ্যাঁ রুদ্র, রাত হয়ে যাচ্ছে, এখন বাড়ি যাওয়াটাই ভালো হবে।’
কিন্তু আমি… আমার সেই জেদ! আমি তাদের কারো কথাই শুনলাম না! আমি ভাবলাম একটু পাহাড়ি টিলার ভেতরের নির্জন রাস্তাটা দিয়ে ঘুরে আসলে হয়তো অনাবিয়ার মনটা ভালো হবে, ও শান্ত হবে। তাদের সমস্ত বারণ, সমস্ত অনুনয় উপেক্ষা করে আমি ওই অন্ধকার, সরু পাহাড়ি রাস্তার দিকে গাড়িটা ঘুরিয়ে দিলাম। নিয়তি বোধহয় এভাবেই মানুষকে টেনে নিয়ে যায়, মেহের। আমরা ভাবি আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি,
অথচ আমরা আসলে ধ্বংসের দিকে হেঁটে যাই।”
রুদ্রর বুকের ওঠা-নামা তীব্র হতে লাগল। ও দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে ডুকরে উঠল,
” ড্রাইভিং করতে করতে -ই আমি ভাইয়ার সাথে একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম… । ঠিক তখনই… ঠিক তখনই এক সেকেন্ডের মধ্যে কোত্থেকে একটা আস্ত ট্রাক আমাদের গাড়ির সামনে এসে তীব্র বেগে ধাক্কা দিল! মেহের… এত কম সময়ে, চোখের পলকে যে কী হয়ে গেল, আমি কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না! একটা বিকট ধাতব শব্দ… আর এক ঝটকায় আমাদের আস্ত গাড়িটা ছিটকে গিয়ে ধুমড়ে-মুচড়ে রাস্তার পাশে পড়ে গেল।ভাইয়া জানালার কাচ ভেঙে ছিটকে গিয়ে পড়ল পাহাড়ের একটা খাড়া টিলার ওপর।”
রুদ্রর পুরো শরীরটা তখন কাঁপছে, এবার মেহেরও কিছুটা কেঁপে উঠল। ও বুঝতে পারছিল, আসলে কী বলতে যাচ্ছে রুদ্র।
“চারপাশে তখন এক সুনসান, ভয়ঙ্কর নীরবতা। পুরো হাইওয়েটা যেন একটা শ্মশান হয়ে গেছে। গাড়ির ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। আমার জ্ঞানটা যখন কয়েক সেকেন্ড পর কোনোমতে ফিরল, আমি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ভাঙা দরজা ঠেলে বের হলাম। শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল, কিন্তু আমার সেদিকে কোনো খেয়াল ছিল না। আমি কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে, রক্তাক্ত অবস্থায় ভাইয়ার কাছে দৌড়ে গেলাম। ভাইয়ার মাথাটা যখন আমি আমার কোলের ওপর তুলে নিলাম… ! ভাইয়ার পুরো মাথা ফেটে ফোঁটা ফোঁটা তাজা র*ক্ত আমার হাত বেয়ে মাটিতে পড়ছিল। ভাইয়া তখন আধো-আধো গলায়, খুব কষ্ট করে নিশ্বাস নিতে নিতে বলল…
‘রু… রুদ্র… তুষা… তুষা… বাঁচা রুদ্র… আমার মেয়েটা… আমার মেয়েটা ওই গাড়ির ভেতর আছে… আগে ওখানে যা…!’ আমি কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না! মাথাটা পুরো ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গিয়েছিল। আমি ভাইয়াকে ওখানেই রেখে কোনোমতে পাগলের মতো দৌড়ে গাড়ির কাছে গেলাম।”
রুদ্রর চোখের সামনে যেন সেই বিভীষিকাময় দৃশ্যটা আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে, ও বাতাসে হাতড়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে চিৎকার করে উঠল,
“গাড়ির দরজাটা লক হয়ে গিয়েছিল মেহের! আমি অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু ওটা খুলতে পারলাম না! গাড়িটা উল্টে চাকাগুলো ওপরের দিকে ঘুরছিল। আমি আবার দৌড়ে ভাইয়ার কাছে গেলাম। ভাইয়া তখন চোখ দুটো কোনোমতে খুলে আমার শার্টের কলারটা শক্ত করে ধরল। ওর মুখ দিয়ে তখন র*ক্ত বেরিয়ে আসছিল। ও বলল… ‘রুদ্র… তুষা প্রেগন্যান্ট, রুদ্র…! তুষা আবার মা হতে চলেছে… আমার বাচ্চাদের বাঁচা ভাই…! আমি হয়তো আর বাঁচব না … আমার তুষাকে বাঁচা… ও এত কষ্ট সইতে পারবে না…!’ ”
মেহের কথাগুলো শুনে নিজের পেটের ওপর দু’হাত শক্ত করে চেপে ধরল। ভয়, যন্ত্রণা আর এক অজানা আশঙ্কায় মুহূর্তেই ওর ভেতরটা অবশ হয়ে এলো। ধীরে ধীরে চোখ তুলে রুদ্রর দিকে তাকাল সে। যে মানুষটাকে সবসময় অটল, কঠোর,পাথরের মতো দেখেছে, সেই মানুষটাই আজ যেন নিজের ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
রুদ্র মেঝের ওপর নিজের হাত দুটো আছড়াতে আছড়াতে বলতে লাগল, “আমি আবার দৌড়ে গেলাম গাড়ির দিকে! কী করব, কীভাবে তাদের বের করব, মাথায় কিচ্ছু কাজ করছিল না! পাশ থেকে একটা ভাঙা কাঠের লাঠি কুড়িয়ে নিয়ে আমি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে গাড়ির পেছনের জানালার গ্লাসটা ভাঙলাম। কাচ ভেঙে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে আমি কোনোমতে আমার
অনাবিয়াকে কোলে তুলে নিলাম… আর ঠিক তখনই… ঠিক তখনই আমার সাদা শার্টটা ওর তাজা রক্তে এক লহমায় লাল হয়ে গেল। কিন্তু ওর নিশ্বাস তখনো কোনোমতে ধীর গতিতে চলছিল। আমি চিৎকার করে উঠলাম… ইয়া আল্লাহ! এটা কী করলা তুমি! আমি অনাবিয়াকে রাস্তার পাশে একটা ঘাসের ওপর শুইয়ে দিয়ে আবার গাড়ির ভেতর হাত বাড়ালাম ভাবিকে বের করার জন্য। কিন্তু ধুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া সিটের মাঝে ভাবির শরীরটা এমনভাবে আটকে ছিল যে আমি কোনোভাবেই তাকে টানতে পারছিলাম না। ভাবি ততক্ষণে তীব্র যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে গেছে। ওদিকে আকাশের অবস্থা খুব খারাপ ছিল, মুষলধারে বৃষ্টি আর ঝড় শুরু হয়ে গিয়েছিল।
রুদ্রর গলার আওয়াজটা এবার এক ভয়ঙ্কর আর্তনাদে রূপ নিল…
“আমি আবার দৌড়ে ভাইয়ার কাছে গেলাম। ভাইয়া তখনো কোনোমতে নিশ্বাস টানছিল। ও জিজ্ঞেস করল… ‘আম… আমার মেয়ে… আমার মেয়ে ঠিক আছে তো রুদ্র…?’ আমি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগলাম… ‘কেউ কি আছেন?
দয়া করে কেউ এগিয়ে আসুন! আমার ভাই-ভাবিকে বাঁচান! কেউ কি নেই এই দুনিয়াতে…?’ অথচ মেহের… সেই রাতে আমার ওই বুক-ফাটা ডাক শোনার মতো কোনো একটা মানুষও সেখানে ছিল না!
আমার চারপাশের বাতাস শুধু আমারই কান্নার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত করে আমার কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছিল। ভাইয়া আমার হাতটা তার বুকের ওপর চেপে ধরে, আমার কোলের মধ্যেই নিজের শেষ নিশ্বাসটুকু ত্যাগ করল।যে ভাই আমাকে নিজের কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছিল, যে আমার আদর্শ ছিল, সে আমার কোলের ওপর ছটফট করতে করতে মারা গেল, আর আমি স্রেফ চেয়ে চেয়ে দেখলাম! আমার দম আটকে আসছিল, মনে হচ্ছিল আমি নিজেই মরে যাই। কিন্তু আমার ভেঙে পড়লে তখন চলত না, কারণ ভাবি তখনো গাড়ির ভেতর আটকে আছে !
আমি আবার ভাবির কাছে ছুটে গেলাম। ঠিক তখনই ভাবির জ্ঞান ফিরল। ও তখনো গাড়ির ভেতর আটকে আছে। ও কাতরাতে কাতরাতে বলল… ‘রুদ্র… আমার মেয়ে কই? অনাবিয়া কই? রেদওয়ান কোথায়? ওরা ঠিক আছে তো…?’ অথচ ভাবি জানতই না যে ততক্ষণে ভাইয়া এই দুনিয়ার সমস্ত মায়া ত্যাগ করে চলে গেছে! আমি ভাবিকে একটা জঘন্য মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বললাম,
‘হ্যাঁ ভাবি, ভাইয়া আর অনাবিয়া বাইরে বের হয়েছে, ওরা ঠিক আছে। তুমি প্লিজ বের হওয়ার চেষ্টা করো।’ ঠিক তখনই গাড়ির ইঞ্জিনের দিক থেকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করল!
মানুষ যখন জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায়, তখন অনেক অদেখা সত্যও যেন হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।হয়তো ভাবিও বুঝতে পেরেছিল, তার হাতে সময় আর বেশি নেই।
আগুনের দাউদাউ শিখা আর আমার চোখের পানি—দুটোই যেন তাকে এক নিমিষে সত্যিটা বুঝিয়ে দিয়েছিল। সেখান থেকে জীবন্ত ফিরে আসার আর কোনো পথ খোলা নেই।
‘তোমার… তোমার ভাইয়া কোথায় রুদ্র? তাকে একটা কথা বলার ছিল…
আমি প্রেগন্যান্ট, রুদ্র…! ও এখনো জানে না… ওকে বলে দিও এই দুনিয়াতে আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। তুমি এখান থেকে চলে যাও, রুদ্র! আমার মেয়েটাকে নিয়ে তুমি এখনই এই মুহূর্তেই চলে যাও! আমি ভেবেছিলাম আজকে বাড়ি ফিরে তাকে এই সারপ্রাইজটা দেব… অথচ আর বলা হলো না। তাকে আমার হয়ে বলে দিও… আমি দুনিয়াতে তার সন্তানটাকে আনতে পারলাম না! আমাকে মাফ করে দিতে বলো তাকে! কথা দাও রুদ্র… আমার অনাবিয়াকে তুমি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি আগলে রাখবে…!’
ভাবি গাড়ির ভেতর থেকে আগুনের হলকার মাঝেই আরও একটু ঝুঁকে এলো।তার গায়ের কাপড় তখন পুড়তে শুরু করেছে! সে চিৎকার করে বলল… ‘চলে যাও এখান থেকে! আগুন ছড়িয়ে পড়ছে,
রু…দ…! তুমি এখনই আমার মেয়ে…মেয়েকে নিয়ে যাও…!’
আমার হাতে আর কিছুই করার ছিল না। বাধ্য হয়েই ভাবিকে ওই অবস্থায় রেখে অনাবিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে, না চাইতেও নিজের সাধ্যমতো ওই জ্বলন্ত গাড়ি থেকে দূরে রাস্তার দিকে দৌড়াতে লাগলাম।
হঠাৎ করেই পেছন থেকে একটা বিকট, কানফাটানো বিস্ফোরণের শব্দ হলো! আমি পেছনে ঘুরে তাকালাম… দেখলাম পুরো গাড়িটা একটা আগুনের কুণ্ডলী হয়ে শূন্যে ভাসছে!
ভাবি ওই গাড়ির ভেতরেই জ্যান্ত পুড়ে ছাই হতে লাগলো ।অনাবিয়াকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আমি দৌড়াচ্ছিলাম। আর বারবার কাঁদতে কাঁদতে বলছিলাম,
‘আল্লাহ… এক ফোটা বৃষ্টি নামিয়ে দাও, একটু পানি দাও । এই ছোট্ট বাচ্চাটার মাথা থেকে মায়ের ছায়াটা কেড়ে নিও না। আল্লাহ… ওকে এত বড় শাস্তি দিও না… একবার… শুধু একবার রহম করো।’
কিন্তু আকাশটা সেদিন আমার কোনো দোয়ারই জবাব দেয়নি। আগুনের লেলিহান শিখাগুলো আরও উঁচু হয়ে উঠছিল, আর আমার বুকের ভেতরটাও ততক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল।
ওই মুহূর্তে আর কোনো উপায় না পেয়ে বাবাকে ফোন করলাম। আঙুল কাঁপছিল, বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছিল অস্বাভাবিকভাবে। রিং হচ্ছিল একটার পর একটা। মনে হচ্ছিল, বাবা যেন ফোনটা না ধরেন। আবার এইও চাইছিলাম, তিনি যেন দ্রুত ধরেন। এমন অদ্ভুত টানাপোড়েনে আগে কখনও পড়িনি।
—হ্যালো?
বাবার কণ্ঠটা কানে আসতেই যেন সব শব্দ হারিয়ে গেল। কতবার যে মুখ খুলে কিছু বলতে চেয়েছি, নিজেই জানি না। কিন্তু প্রতিবারই গলায় এসে আটকে গেল কথাগুলো। ওপাশে বাবা বারবার ডাকছিলেন,
—কী হয়েছে রুদ্র ? কথা বলছিস না কেন? সবাই ঠিক আছে তো?
আমি উত্তর দিতে পারছিলাম না। কী বলতাম? কীভাবে বলতাম?
“বাবা… তোমার বড় ছেলে আর তার বউ আর নেই…তোমার ছোট ছেলের জেদের কারণে মারা গেছে? ”
এতটুকু বাক্য উচ্চারণ করতেও যেন বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। আমি বলতে চেয়েও বলতে পারলাম না … হঠাৎ মনে হলো, পৃথিবীটা যেন আমার চারপাশে ঘুরে উঠেছে। মাথার ভেতর প্রচণ্ড একটা আঘাতের মতো অনুভূতি হলো। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। শেষবারের মতো শুধু অনাবিয়াকে আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরেছিলাম। এরপর আর কিছুই মনে নেই। সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলাম।
“আমার নিজের পিঠ, পেট, হাত-পায়ের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। গাড়ির ভাঙা কাচ আর আগুনের ছিটকে আসা টুকরোয় আমার পুরো বডি ইনজিউর্ড হয়েছিল। আমার জ্ঞান ফিরল পুরো ১৭ ঘণ্টা পর, হাসপাতালের বেডে। চোখ মেলতেই প্রথমে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। চারপাশের সাদা দেয়াল, অপরিচিত মুখ আর শরীরজুড়ে অসহ্য যন্ত্রণা—সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো দুঃস্বপ্নের ভেতর আছি।
কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বাস্তবতাটা বুঝতে শুরু করলাম, তখন উপলব্ধি করলাম—আমার চারপাশের সবকিছু যেন শেষ হয়ে গেছে। যে জীবনটাকে কয়েক ঘণ্টা আগেও স্বাভাবিক মনে হয়েছিল, মুহূর্তের মধ্যে সেটাই বদলে গেছে চিরদিনের জন্য।
জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারলাম, দুর্ঘটনার প্রায় দেড় ঘণ্টা পর আমাদের উদ্ধার করা হয়েছিল। ফোন ট্র্যাক করে আমাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছিল।
হাতে তখনও ক্যানোলা লাগানো। শরীর দুর্বল, মাথা ভারী, তবুও হঠাৎ যেন বুকের ভেতর একটা অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো—অনাবিয়া কোথায়? আমার মেয়েটা কোথায় আছে?
এক মুহূর্তও আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারলাম না। ক্যানোলার ব্যথা, শরীরের ক্লান্তি—কিছুই তখন মনে হচ্ছিল না। উঠে বসেই কাঁপা গলায় চিৎকার করে উঠলাম,
“অনাবিয়া কোথায়? আমার মেয়ে কোথায়?”
আমার কণ্ঠের আতঙ্কে চারপাশের সবাই থমকে গেল। আমি বারবার একই কথা বলতে লাগলাম। চোখের সামনে শুধু আমার মেয়ের মুখ ভাসছিল। মনে হচ্ছিল, যতক্ষণ না তাকে নিজের চোখে দেখছি, ততক্ষণ কোনো শান্তি নেই।
আমার সেই অস্থিরতা আর কান্না দেখে ডাক্তাররা শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ওই দিকটায় নিয়ে গেলেন….
মেহেরের মনে হলো, যেন তার নিজেরই শ্বাস আটকে আসছে। শুকনো ঠোঁট নাড়িয়ে বিড়বিড় করে বলল,
— কোন দিকটায়…?
“যেখানে আমার মেয়ের বডি রাখা ছিল।”
“মর্গের বরফ শীতল ঘরে ও যখন শুয়ে ছিল মেহের, আমার মনে হচ্ছিল ও বুঝি স্রেফ ঘুমিয়ে আছে। ও তো এভাবেই ঘুমাতো। আমি ওর কপালে চুমু খেলাম, ওর গালে হাত দিয়ে ডাকলাম—বললাম,
“মাম্মা ওঠো, পাপা এসেছে”
তোমার জন্য চকোলেট এনেছি। তুমি যা চাইবে আজকে পাপা তাই দেবে, প্লিজ কথা বলো!’ কিন্তু ও উঠলো না মেহের! যে মেয়েটা আমাকে দেখামাত্রই দূর থেকে দু হাত বাড়িয়ে আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত, সে আজ একটা সাদা কাপড়ের নিচে নিস্প্রাণ, বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে শুয়ে আছে।
ডাক্তাররা যখন চাদরটা দিয়ে ওর ও মুখটা ঢেকে দিচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল আমার কলিজাটা বুক থেকে টেনে বের করে নেওয়া হচ্ছে। আমি ওখানেই হাঁটু গেড়ে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। ডাক্তাররা বলছিলেন… ওর মাথার ইনজুরি আর ইন্টারনাল ব্লিডিং এত বেশি ছিল যে ওকে বাঁচানো নাকি অসম্ভব ছিল।
আমার মনে হলো… আল্লাহ কি আসলেই এত নির্দয় হতে পারেন? একটা মানুষের কাছ থেকে এক রাতে ওনার দেওয়া সমস্ত কিছু এভাবে কেড়ে নিতে পারেন উনি? আমি খুব বেশি একটা নামাজি বা ধার্মিক ছিলাম না মেহের, কিন্তু সেদিন… সেদিন হাসপাতালের মেঝেতে মাথা কুটে আমি কেঁদেছিলাম। এই রাইহাম চৌধুরী রুদ্র আল্লাহর দরবারে হাত তুলে ভিখারির মতো দয়া ভিক্ষা চেয়েছিল!
‘ইয়া আল্লাহ! আমার এই ছোট পাখিটাকে বাঁচিয়ে দাও! ওর বাবা-মায়ের সাথে হাশরের ময়দানে আমি কীভাবে মুখ দেখাব? আমি যে তাদের কথা দিয়ে এসেছি যে আমি অনাবিয়াকে আগলে রাখব! ইয়া আল্লাহ, আমার কোনো দোষের শাস্তি তুমি আমার এই নিষ্পাপ আমার মেয়েটাকে দিও না! তুমি চাইলে আমাকে মেরে ফেলো, আমার জানটা এখনই কবজ করে নাও, তাও আমার অনাবিয়াকে ওর পাপার কাছে ফিরিয়ে দাও…!’ ”
“অথচ তোমার আল্লাহ আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিল, মেহের… বলো তো, আমি কী পাপ করেছিলাম? কী এমন অপরাধ ছিল আমার?
আট বছর… পুরো আটটা বছর। একটা রাতও আমি নির্ভয়ে ঘুমাতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই আগুনটা আবার জ্বলে ওঠে। অনাবিয়ার কান্না কানে বাজে। মনে হয়, আমি আবার সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি—হাত বাড়িয়েও কাউকে বাঁচাতে পারছি না।
স্বপ্নে কতবার যে ও এসেছে… ছোট্ট ছোট্ট আমার দিকে তাকিয়ে বলেছে, ‘তুমি খুনি, পাপা… তুমি খুনি। তুমি আমার মাম্মামকে মেরে ফেলেছ। আমার ডেডাকেও আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছ। সেদিন কেন গিয়েছিলে ওই রাস্তায়? কেন? তুমি আমাকে বাঁচতে দিলে না, পাপা…’
তারপর আরেকটা কণ্ঠ শুনতে পাই… যে কণ্ঠটা কোনোদিন পৃথিবীর আলোই দেখেনি। মনে হয়, সে আমাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘চাচ্চু… ও চাচ্চু
আমার অপরাধটা কী ছিল? আমাকে পৃথিবীটা দেখতে দিলে না কেন?’
জানো, মেহের… মানুষ যখন নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে যায়, তখন তার জন্য কোনো আদালতের শাস্তির দরকার হয় না। প্রতিটা রাত, প্রতিটা নিঃশ্বাস, প্রতিটা স্বপ্ন তাকে শাস্তি দেয়। আমি আট বছর ধরে সেই শাস্তিই ভোগ করছি। আমি বেঁচে আছি… কিন্তু একদিনের জন্যও মুক্তি পাইনি।
আমি কাউকে বাঁচাতে পারলাম না! কাউকে না। পারলাম না আমার কলিজার টুকরো অনাবিয়াকে বাঁচাতে, পারলাম না আমার ভাইকে বাঁচাতে, পারলাম না আমার ভাবিকে বাঁচাতে! আমি তাদের কথা দিয়েছিলাম … কিন্তু আমি আমার কথা রাখতে পারিনি, মিস অ্যারোফোবিয়া!
ছোটবেলায় খেলনা নিয়ে জেদ করলে ভাইয়া তার খেলনাটা আমাকে দিয়ে দিত।আবারও সেদিন… নিজের সবচেয়ে আদরের ছোট্ট পুতুলটাকে আমার ভরসায় রেখে গিয়েছিল।কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে… সেই পুতুলটাকেও আমি হারিয়ে ফেললাম।
রুদ্র এবার দুই হাতে নিজের মুখটা ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। তার চওড়া কাঁধ দুটো কাঁপছিল। রুদ্র মেহেরের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“জানো মেহের , ওকে প্রথমবার আমিই কোলে নিয়েছিলাম… আর শেষবারও নিজের হাতেই কবরে শুইয়ে দিয়েছি।
তোমার আল্লাহ সেদিন আমার প্রার্থনা শুনলেন না কেন, মেহের? কেন আমার মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখলেন না?
মেহের… এখন আর কেউ আমাকে ‘পাপা’ বলে ডাকে না। কেউ চকোলেট খাওয়ার বায়না করে না। কেউ ছোট্ট দু’হাত দিয়ে আমার বুক জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে না।
শুধু একটা নিঃশব্দ শূন্যতা… আর প্রতিটা নিশ্বাসে আমার মেয়ের না-থাকার যন্ত্রণা।”
রুদ্রর প্রতিটি বাক্য শুনে মেহেরের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসছিল। মেহেরের এতক্ষণে চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু রুদ্রর কথাগুলো শুনে সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হঠাৎ হেঁচকি তুলে কান্না করতে শুরু করল। মেহের নিজের কান্না কোনোভাবেই থামাতে পারছিল না।
রুদ্রর মতো একটা শক্তপোক্ত পুরুষকে এভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে দেখে মেহেরের নিজের বুকটাও যেন ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছিল। ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সমস্ত সামাজিক দূরত্ব, সমস্ত দ্বিধা ভুলে মেহের ছুটে গিয়ে মেঝেতে বসা রুদ্রর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
রুদ্রর কাঁপতে থাকা কাঁধে হাত রাখার জন্য মেহের হাত বাড়াল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে থেমে গেল। অদৃশ্য কোনো এক সংকোচ যেন তাকে আটকে দিল। শেষ পর্যন্ত শুধু রুদ্রর শার্টটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল সে।
মেহেরের এই ছোট্ট স্পর্শেই রুদ্র যেন নিজের ভেতরের শেষ বাঁধটুকুও হারিয়ে ফেলল। এত বছরের জমে থাকা কষ্ট, অপরাধবোধ আর না বলা যন্ত্রণা চোখের জলে বেরিয়ে এলো।
মেহের শুধু নীরবে মাথা নাড়ল। চোখের দৃষ্টিতেই বোঝাতে চাইল—এভাবে ভেঙে পড়ো না। কিন্তু ঠোঁট দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে শুধু রুদ্রর শার্ট আঁকড়ে ধরে নিজের চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করল।
মেহের বুঝতে পারছিল, রুদ্রর রাগ, কঠোরতা আর উগ্রতার আড়ালে লুকিয়ে আছে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষদের হারিয়ে যেতে দেখার যন্ত্রণা । এমন এক ক্ষত, যা আট বছর ধরে তাকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে পুড়িয়ে চলেছে।
রুদ্র মেহেরের আশ্রয়ে থেকে সোফার ওপর মাথাটা এলিয়ে দিয়ে ছাদের দিকে তাকাল, তার চোখে এখন কেবলই এক অনন্ত শূন্যতা,
“তোমার আল্লাহ সেদিন আমার প্রার্থনা শুনলেন না কেন, মেহের? কেন আমার ওই নিষ্পাপ মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখলেন না? ও তো কোনো পাপ করেনি! তবে ওর সাথে কেন এমন হলো? কেন ও আমাকে একা ফেলে চলে গেল? মানুষের জীবন এত সস্তা কেন, মেহের? এক সেকেন্ডের ব্যবধানে কীভাবে একটা পুরো পরিবার ধুলোয় মিশে যায়?”
মেহের কী বলবে, বুঝে উঠতে পারল না। রুদ্রর কথার কোনো উত্তর খুঁজে পেল না সে। শুধু অসহায় দৃষ্টিতে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল।
রুদ্র ঠোঁটের কোণে একটা তিক্ত হাসি ফুটিয়ে তুলল।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪০ (২)
— কারণ কোনো আল্লাহ নেই, মেহের… কোনো ওপরওয়ালার অস্তিত্ব নেই। থাকলে এত কিছু আমার সঙ্গে ঘটতে দিত না। আমি বিশ্বাস করতাম… কিন্তু এখন আর করি না।
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— মানুষ একাই তার কষ্ট নিয়ে বাঁচে, মেহের। নিজের হারানোর ভার নিজেকেই বয়ে বেড়াতে হয়।
