Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৬ (২)

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৬ (২)

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৬ (২)
মারিয়াম ফুল

রুদ্র সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চিন্তিত চোখে মেহেরের দিকে তাকাল,
“কী হয়েছে, মেহের? এভরিথিং ইজ ফাইন? মেহের?”
মেহেরের গলা বুজে এলো। কেবল দু-চোখ বেয়ে নোনা জলের তোড় নেমে এলো, ভেঙে পড়া গলায় শব্দ বের হলো—”বাবার… বাবা আর নেই…”
বলার সাথে সাথেই মেহেরের শরীরটা একপাশে ঢলে পড়ল, আর সে মেঝের ওপর অঝোর ধারায় কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“মেহের… মেহের! মিসেস… অ্যারোফোবিয়া…”
এক হাতে বুকে আঁকড়ে থাকা ছোট্ট প্রাণটাকে শক্ত করে চেপে ধরে, অন্য হাত বাড়িয়ে কোনোমতে মেহেরকে সামলে তুলল রুদ্র। “আসো… সোফায় বসো…”
মেহের দুই হাতে মুখ ঢেকে হু-হু করে কেঁদে উঠল। তার কান্নার প্রতিটি কাঁপুনি যেন রুদ্রর বুকে এসে আঘাত করছিল। রুদ্র বেশ সাহস করেই মেহেরের কাছে এসে বসল। তারপর ধীর, নিচু স্বরে বলল,

“সিলেট যাবে?”
মেহের লাল হয়ে যাওয়া চোখে রুদ্রর মুখের দিকে তাকাল। চোখে অসীম অসহায়ত্ব।
“নিয়ে যাবেন আমায়?”
রুদ্র চোখের পাতা নামিয়ে নীরব সম্মতি দিল। “রেডি হও… ৩০ মিনিটের ভেতর বের হতে হবে। লাস্ট ফ্লাইট ১/৩০ ঘণ্টা পর…”
মেহেরের আর কোনো বাক্যস্ফুট হলো না। শুধু নিষ্প্রাণ কণ্ঠে বিড়বিড় করল, “আমি রেডি আছি… এভাবেই যাব…”
রুদ্র একপলক ছেলের দিকে তাকাল। তার নিষ্পাপ মুখটা ঘুমে একদম ঢুলে পড়েছে। মেহেরকে লিভিং এরিয়ায় বসিয়ে রেখে সে ছেলেকে কোলে নিয়ে মেহেরের ঘরে গেল। নরম তোশকে অবুজ শিশুটিকে সাবধানে শুইয়ে দিয়ে, চোখে যা পড়ল অগোছালোভাবে লাগেজে ঢুকাতে লাগল। বিশেষ করে বাচ্চার কয়েকটি ঠান্ডার পোশাক আর খেলনা লাগেজে ভরে নিল। লাগেজ টেনে, অন্য হাতে ছেলেকে বুকে চেপে ঘর থেকে বের হলো সে।
মেহের মাথা তুলে রুদ্রর দিকে তাকাল। দৃষ্টি ঝাপসা, চোখের জল চোখের কোণে জমে শুকিয়ে আসছে। চারপাশের পৃথিবীটা কেমন অবাস্তব ঠেকছিল তার কাছে।

“বেবিকে নিয়ে নিচে নামো, বাকি জিনিস নিয়ে আমি অ্যাপার্টমেন্ট লক করে আসছি,” বলে ঘুমন্ত শিশুটিকে মেহেরের প্রসারিত বাহুতে সঁপে দিল রুদ্র। “রাখতে পারবে?”
মেহের লাল হয়ে ওঠা নাকের ডগা আর চোখের কোণ সামলে অস্পষ্ট স্বরে জবাব দিল, “হ্যাঁ…”
তীব্র আকুলতায় কেঁদে কেঁদে মেহেরের মুখ-চোখ রক্তিম হয়ে উঠেছে, নাকের ডগা রক্তজবার মতো লাল। মেহেরের এই অসহায়, ভেজা রূপটা দেখে রুদ্রর বুকের বাঁ পাশটায় ভারী মোচড় দিল। ইচ্ছে করছিল মেয়েটাকে দু-হাতে বুকের ভেতর চেপে ধরে বলতে—
‘কেঁদো না মেহের, কিচ্ছু হয়নি, আমি আছি তো…’ কিন্তু বরাবরের মতোই এক অদৃশ্য অনীহা আর দ্বিধা তার ঠোঁট দুটো আটকে দিল। মুখ ফুটে একটি শব্দও বের হলো না।
ঘণ্টা চারেক পর—সায়েদ বাড়ির চত্বর।
রুদ্র আর মেহের এয়ারপোর্ট থেকে সায়েদের বাড়িতে এসেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। তাদের আসার কিছুক্ষণ আগেই হামজা চৌধুরী ও রেহানা চৌধুরীও সেখানে পৌঁছেছেন। মির্জা জানিয়েছিল, তাঁদের বাবার মৃত্যুর খবর হামজা চৌধুরীকে কল দিয়ে ।

বিয়ের পর এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় মেহের মনে মনে কসম খেয়েছিল—এ ভিটেয় আর কোনো দিন পা দেবে না। ভেবেছিল এ বাড়ির প্রতিটা ইট-কাঠ আর মানুষগুলোকে তীব্র ঘৃণায় ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু আজ বাবার নিঃশব্দ প্রস্থান সেই সব মিথ্যে জেদ চুরমার করে দিয়েছে। নিজের রক্তের ওপর ঘৃণা ধরে রাখা যে কত কঠিন, তা সে নিজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে টের পাচ্ছে। কেউ তো কম অন্যায় করেনি তার আর তার নিষ্পাপ সন্তানটার সাথে!
হঠাৎ মেহেরের মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠল শেষবারের দৃশ্যটা। প্রপার্টি পেপার্স হাতে বাবা যখন এসেছিলেন, কত জীর্ণ, কত বিধ্বস্ত লাগছিল মানুষটাকে !
সেদিন বাবাকে বড্ড অবহেলা করে তাড়িয়ে দিয়েছিল মেহের। আজ সেই কুঁজো হয়ে যাওয়া পিঠ, ধবধবে সাদা পাকা দাড়ি আর কাঁপতে থাকা হাত দুটো চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছে। ছোটবেলায় বাবা তো তাকে কাঁধে বসিয়ে পুরো এলাকা ঘুরে বেড়াতেন। বাবা বাড়ি ফিরতে দেরি করলে ছোট্ট মেহের নিঝুম দরজার গোড়ায় বসে থাকত; রাত ১২টা বাজুক আর ১টা, বাবা না ফেরা পর্যন্ত সে ঘুমাত না। মির্জা আর মাশফি যেখানে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যেত, কিন্তু মেহের জেগে থাকত বাবার আশায়। আর একটু বড় হওয়ার পর, সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেও সে না খেয়ে বসে থাকত—কখন বাবা আসবে, একসাথে খাবে।
সায়েদ কামিনী ছোট থেকেই বেশ কড়া মেজাজের ছিলেন, উঠতে-বসতে শাসন করতেন। মেহের বাবার কাছে গিয়ে নালিশ ঠুকত মায়ের নামে ,

“বাবা দেখো, মা আজকে সবার সামনে বকেছে!” আর সায়েদ ইমরান এক গাল হেসে মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে তুলে নিতেন।
অথচ বাবা আর ফিরে আসবেন না। কোনোদিনও আসবেন না। তার মনে হচ্ছে, যেদিকেই তাকাচ্ছে, সেদিকেই বাবার শূন্যতাটা চোখে পড়ছে।
মেহের জানে না তার ছেলে এখন কার কোলে আছে। শেষবার লিভিং রুমে রুদ্রর কাছে রেখে সে একছুটে দোতলায় নিজের পুরোনো ঘরে চলে এসেছিল। বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড়ে নিঃশ্বাস নেওয়া দায়; তাদের কৌতূহলী চোখের সামনে সে নিজেকে দাঁড় করাতে পারছে না, তার যেন খাঁচায় বন্দি পাখির মতো দম আটকে আসছে।
এখনো হাসপাতাল থেকে সায়েদ ইমরানের নিথর দেহটা বাড়িতে এসে পৌঁছায়নি। উঠানজুড়ে স্বজনদের আনাগোনা, চারপাশে চাপা গুঞ্জন আর ভারী এক শোকের পরিবেশ। এর মাঝেই রেহানা চৌধুরী আর হামজা চৌধুরী প্রথমবারের মতো নিজেদের নাতিকে কোলে তুলে নিয়েছেন। নাতিকে দেখার আনন্দটা মনে যতই উচ্ছ্বাস জাগাক, এই শোকের সময়ে সেই আনন্দ প্রকাশ করার কোনো সুযোগ নেই। দুজনেই নিজেদের আনন্দটুকু চেপে রেখেছেন।
রেহানা চৌধুরীর কোলে ছোট্ট শিশুটিও যেন চারপাশের কিছুই বুঝতে পারছে না। এত ভারী পরিবেশের মাঝেও সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট মুখটায় লেগে আছে নিষ্পাপ প্রশান্তি।
আশেপাশের আত্মীয়রা ফিসফিস করছে , “আহা! ইমরান ভাই এত ভালো মানুষ ছিলেন…” অন্য একজন বললেন , “নামাজি, পরহেজগার মানুষ ছিলেন …আল্লাহ তার বেহেস্ত নসিব করুক ”

দুনিয়ার মানুষের একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। কেউ মারা গেলে হঠাৎ করেই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যায় সবাই। অথচ বেঁচে থাকতে কত দ্বন্দ্ব, কত রেষারেষি কে -কার থেকে দুনিয়ার বুকে এগিয়ে যাবে, সেই প্রতিযোগিতার যেন শেষ নেই।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। মৃত সায়েদ ইমরানকে ঘিরে আজ সবার মুখেই শুধু তার গুণগান। অথচ মানুষ বেঁচে থাকতে কত কতভাবে বিচার করা হয় মানুষকে ! মৃত্যু যেন মুহূর্তেই মানুষের সব অভিযোগ, সব দ্বন্দ্বের ওপর একটা পর্দা টেনে দেয়।
বেশ কিছুক্ষণ পর মেহের নিজের ঘরের দরজার পর্দা ঠেলে বের হয়ে এলো। পিছনে ফিরে অগোছালো ঘরটার দিকে একনজর তাকাতেই তার ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। চোখ দুটো লাল, চেহারায় গভীর শূন্যতা। জামার হাতা দিয়ে চোখের জল মুছে সে পা বাড়াল। ঠিক তখনই দূর থেকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাতাসের বুক চিরে কানে এসে ধাক্কা দিল।
রুমের বাইরে কয়েকজন মধ্যবয়সী মহিলা পান চিবুতে চিবুতে গল্প করছিলেন। একজন বললেন, “মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসেছে,” পাশ থেকে অন্য একজন ফোড়ন কাটলেন, “উনার কপাল ভালো, মেজো ছেলেও ইউকে থেকে ফিরেছে, মরে যাওয়ার আগে তো ছেলেটাকে দেখতে পেলেন ।”

মেহের কারো দিকে তাকাল না, জড়বৎ পায়ে নিচে নেমে এলো। অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনে আঙিনায় জড়ো হওয়া মানুষগুলো নড়েচড়ে বসল। কয়েকজন মহিলা মৃতদেহ দেখার জন্য এগোতে চাইলে এক বৃদ্ধা বাধা দিয়ে বললেন,
“যেয়ো না, শুধু তার মেয়ে আর ছেলের বউ দেখতে পাবে। তোমাদের পর্দা-বিধান আছে।”
মেহের সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই রুদ্র তার এই টলমল অবস্থা দেখে দ্রুত এগিয়ে এলো। হাত বাড়িয়ে মেহেরকে সামলাতে চাইল, কিন্তু মেহের হাতের তালু উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। “লাগবে না… আমার ছেলে কই?”
রুদ্র চোখের ইশারায় মায়ের কোল দেখিয়ে দিল। “মায়ের কাছে ঘুমাচ্ছে।”
মেহের আবার রুদ্রর দিকে তাকাল। কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেল, কারণ ঠিক সেই মুহূর্তেই সায়েদ ইমরানের নিথর দেহটা আঙিনার নির্দিষ্ট খাটিয়ায় এনে নামানো হয়েছে ।
মির্জা বাবার নিথর দেহের ওপর আছড়ে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,
“বাবা… বাবা, চোখ খোলো! সেদিন না বলেছিলে, আমার ছেলেকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে, কাঁধে করে নিয়ে বেড়াবে? তুমি আরেকটু পরে যেতে পারতে না, বাবা?”
তার কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু সায়েদ ইমরান আর কোনো সাড়া দিলেন না। যে মানুষটা একটু আগেও আপনজনদের মাঝে ছিলেন, আজ তিনি নিস্তব্ধ, নিশ্চুপ। মাটির শরীর মাটির টানেই শান্ত হয়ে শুয়ে রইল।

চার মাস দশ দিনের কড়া ইদ্দতের বিধিনিষেধের কারণে সায়েদ কামিনীকে এত পুরুষের সামনে আনা হলো না। বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে তাকে সোজা তার ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো।
মেহের পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে সবকিছু ঘটছে, অথচ যেন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। একটু দূরে মেঘলা আর নূর একে অপরকে আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
হঠাৎ মেহেরের চোখ গিয়ে থামল নূরের কোলে থাকা শিশুটার দিকে। ছোট্ট ছেলেটা মায়ের গায়ে মুখ গুঁজে ছিল। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে মুখটা তুলে চারপাশের সবার দিকে তাকাতে লাগল। নিষ্পাপ সেই চোখ দুটোয় কোনো আতঙ্ক নেই, নেই মৃত্যুর অর্থ বোঝার ক্ষমতা। সে তো জানেই না, এই বাড়িতে আজ এমন একজন মানুষ নেই, যার স্নেহ পাওয়ার কথা ছিল তার।
মেহেরের বুকটা হঠাৎ কেমন করে উঠল। তিন ভাইবোনের চেহারার গড়ন একই রকম হওয়ায় তাদের সন্তান দুটোকেও দেখতে প্রায় একই লাগছে । নূরের আর মির্জার ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে মেহেরের মনে হলো, যেন নিজের ছেলেকেই দেখছে।
এই নিষ্পাপ প্রাণটা তো জানেই না, সে কোনোদিন তার দাদার ভালোবাসা পাবে না।যতটুকু স্নেহ পাওয়ার কথা ছিল—
সেটুকুও সে এত ছোট্ট বয়সে বুঝে ওঠার আগেই হারিয়ে ফেলল। অথচ বড় হয়ে হয়তো এই মানুষটার কথা শুনবে সবার মুখে, গল্পে গল্পে জানবে….. ।

মাশফি চোয়াল শক্ত করে নিজের কান্না চেপে রাখল। বড় ভাইকে কোনোমতে ধরে টেনে তুলল সে, “ভাইয়া, শান্ত হও… বাবার রুহ কষ্ট পাবে। আমাদের দায়িত্ব এখন বাবার জন্য দোয়া করা।”
কথাগুলো অন্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে বললেও মাশফির নিজের বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করছিল। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল আইসিইউ-এর বাইরের সেই আতঙ্কময় মুহূর্তটা।
হঠাৎই ডিউটি ডাক্তার আর একজন নার্স ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এসে বলেছিলেন,
“আপনাদের রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। একজন ভেতরে আসুন।”
কথাটা শুনেই মাশফি আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি। প্রায় ছুটে গিয়েছিল আইসিইউর ভেতরে। আর সেখানে গিয়েই দেখেছিল—বাবার বুকটা শেষ নিঃশ্বাসের ভারে ধীরে ধীরে উঠছে-নামছে। চোখ দুটো স্থির হয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

কাঁপা ঠোঁট দুটো কয়েকবার নড়ে উঠল।
“আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার…”
তারপরই সব থেমে গেল।
স্থির হয়ে গেল সায়েদ ইমরানের চোখ দুটো। থেমে গেল বুকের ওঠানামা। আর সেই মুহূর্তেই চিরতরে ছিন্ন হয়ে গেল দুনিয়ার সব মায়ার বন্ধন।
কিছুক্ষণ পর মেহের ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বাবার মাথার কাছে এসে বসল। শেষ বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে বাবার মুখে। সেই মুখটা আজ কেমন অদ্ভুত শান্ত, অসীম স্নিগ্ধ লাগছে—যেন জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, অভিমান আর ব্যথা পেরিয়ে তিনি অবশেষে শান্তি পেয়েছেন।
মেহের কাঁপা হাতে বাবার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। তারপর মুখটা বাবার কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ভাঙা, আক্ষেপভরা সুরে ফিসফিস করে বলল,
“আমার ছেলেটাকে দেখলে না, বাবা? যাওয়ার আগে নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছিলে, প্রায়শ্চিত্তও করেছিলে… কিন্তু আমার ছেলেটাকে একবারও দেখে যেতে পারলে না।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে মেহেরের গলা ভারী হয়ে এল। চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রু।
“দেখা হবে তোমার সঙ্গে আমার আবার… তবে এপারে নয়, ওপারে। আমাকে একেবারে এতিম করে দিলে, বাবা…এতিম করে দিলে”

মেহের আবারও নিজের কাঁপতে থাকা হাতটা বাবার হিমশীতল কপালে রাখল। তারপর পরম মায়ায় ধীরে ধীরে পুরো মুখে হাত বুলিয়ে দিল। তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল।খুব আস্তে, ভাঙা গলায় বলল,
“তুমি জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটা পাও, বাবা। তোমার প্রতি কোনো অভিযোগ রাখতে পারলাম না… রাখতে…. পার..লাম না বাবা ।”
এমন সময় আত্মীয়রা এসে তাড়া দিলেন, “দেরি হচ্ছে, জানাজার সময় পেরিয়ে যাবে… লাশ বের করতে হবে।”
মেহেরের নির্বাক চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েকজন মহিলা তাকে তুলে ধরতে এলেন। মেহের হাত সরিয়ে দিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল, “আমি উঠতে পারব… ধরা লাগবে না।” মাটিতে ভর দিয়ে সবটুকু শক্তি একত্র করে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।
হামজা চৌধুরী নিচু স্বরে রেহানা চৌধুরীকে বললেন, “মেহের এখানেই থাকুক, জানাজা শেষ করে আমি এসে তোমাদের নিয়ে যাব। মেয়েটাকে একটু সামলাও।”
রেহানা চৌধুরীর বুকটা মেহেরের এমন নিথর, পাথর হয়ে যাওয়া চেহারা দেখে হাহাকার করে উঠল। মেয়েটার চোখে পানি নেই, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই—যেন কান্নার সবটুকুও কোথাও গিয়ে জমাট বেঁধে গেছে।
তিনি পাশে থাকা রুদ্রর কোলে ঘুমন্ত নাতিটাকে তুলে দিয়ে বললেন,

“তাতিন, তোর ছেলেকে ধর। আমি মেহেরকে দেখি… মেয়েটার চোখ-মুখ কেমন যেন হয়ে গেছে।”
রুদ্রের কোলে নিষ্পাপ প্রাণটাকে দিয়ে রেহানা চৌধুরী ধীরপায়ে মেহেরের দিকে এগিয়ে গেলেন। মেহেরের কাঁধে রেহানা চৌধুরীর হাতের স্পর্শ পড়তেই এতক্ষণ নিজেকে শক্ত করে রাখা মেহের আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
মুহূর্তেই যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল তার বুকের ভেতর জমে থাকা সব শক্ত বাঁধ। আছড়ে পড়ল রেহানা চৌধুরীর বুকে। কান্নায় ভেঙে পড়ে হাহাকার করে বলল,
“মা! আমি এতিম হয়ে গেলাম, মা… আমার বাবা আর কোনোদিন আমাকে ডাকবে না….”
বুকের ভেতর এতক্ষণ চেপে রাখা আর্তনাদ এবার অঝোর কান্না হয়ে বেরিয়ে এলো।
“মা, আমার এখানে দম বন্ধ হয়ে আসছে! আমি আর পারছি না… আমি আর পারছি না, মা। চারদিকে শুধু বাবাকে দেখতে পাচ্ছি… মনে হচ্ছে, বাবা এই তো আমার পাশে আছে। একটু পরেই বুঝি আমাকে ডাকবে…”
মেহেরের কণ্ঠ ক্রমেই কান্নায় ডুবে গেল। রেহানা চৌধুরী তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে নীরবে তার মাথায় হাত বুলিয়ে যেতে লাগলেন।

“যাব মা, আমরা এখান থেকেই চলে যাব…”
অন্যদিকে, শেষ গোসলের জন্য সায়েদ ইমরানকে নিয়ে যাওয়া হলো। উঠানের বাতাস মুহূর্তেই স্বজনদের কান্নার ভারে ভারী হয়ে উঠল। কেউ নীরবে চোখের পানি মুছছিলেন, কেউ আবার কান্না থামাতে না পেরে বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন। শেষ গোসল শেষে সাদা কাফনে মুড়ে দেওয়া হলো মরদেহ। এরপর জানাজার উদ্দেশ্যে তাকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হলো।
অল্প কিছু সময়ের ব্যবধানেই বাড়িটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে এলো। একটু আগেও যেখানে স্বজনদের কান্না আর মানুষের আনাগোনায় মুখর ছিল , সেখানে এখন নেমে এসেছে ভারী নীরবতা। জানাজা শেষে দূরের আত্মীয়রা একে একে বিদায় নিতে লাগলেন।
বাড়িতে থাকা স্বজনরা থমথমে মুখে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
রুদ্র জানাজায় যায়নি। এই শোকের ভিড়ে কেউ তা আলাদা করে খেয়ালও করেনি জানাযায় গেল কিনা । সে যে এত দূর থেকে ছুটে আসবে, সেটাই বা কে ভেবেছিল? তাছাড়া লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতায় তার কখনোই আগ্রহ ছিল না। তার সমস্ত মনোযোগ আটকে ছিল মেহেরের সেই ব্যাকুল মুখের দিকে। মেহেরের কষ্টটা যেন বিষাক্ত কাঁটার মতো বারবার তার নিজের বুকেও বিঁধছিল।

কিছুক্ষণ আগেই এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় রুদ্রকে ‘জামাই মানুষ’ বলে মেহেরের ঘরে বসিয়ে দিয়ে গেছেন। রুদ্রও আর কোথাও যায়নি। নিঃশব্দে ছেলেটাকে কোলে নিয়ে সেখানেই বসে আছে।
এই বাড়িতে আজই তার দ্বিতীয়বার পা রাখা। বিয়ের দিন শুধুই লিভিং এরিয়াতে পা রেখেছিল।
প্রথমবারের মতো মেহেরের ঘরটার দিকে ভালো করে চোখ বোলাল রুদ্র ।ছেলেটা অবশ্য ঘুমে ঢুলুঢুলু। সারাদিন একটুও জ্বালাতন করেনি। করলে রুদ্রই বা কীভাবে সামলাত, সেটাও সে জানে না।
রুদ্র মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল, ‘মেহের কি সত্যি এই বাড়িতে থেকে যাবে? নাকি চলে যাবে?’ তারপর আবার ভাবল, ‘থাকলে থাকুক… কিন্তু আমার ছেলেকে নিয়ে থাকবে?”
তারপর ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তোকে ছাড়া এখন আবার আমাকে একা থাকতে হবে নাকি? ব্রো, আমি এখানে থাকব না—কেউ যদি বলে আমাকে এখানে থাকতে? লোকজন কী বলবে? রাইহাম চৌধুরী রুদ্র শ্বশুরবাড়িতে থাকছে… ?”
কথাটা শেষ করতেই…কোলে থাকা ছেলের ছোট্ট শরীরটা নড়ে উঠতেই রুদ্র আবার স্বস্থানে ফিরে এলো। আলতো করে বাচ্চার মাথায় হাত বুলাল।
জানাজার নামাজ শেষ করে মির্জা, মাশফি, হামজা চৌধুরীসহ পরিবারের পুরুষরা বাড়ি ফিরে এলেন। বাড়িটাকে কেমন ফাঁকা আর অচেনা লাগছে… মাশফি, মির্জার বুকের ভেতরটা এক শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে—

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৬

কাউকে কোনো কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই, হঠাৎ পুলিশের কয়েকটি গাড়ি এসে সায়েদ বাড়ির সামনে থামল। একে একে গাড়ি থেকে নেমে এলেন বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। মুহূর্তের মধ্যেই তারা বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেললেন। দু-একজন সদস্য দ্রুত মূল ফটকের দিকে এগিয়ে গেলেন, বাকিরা ছড়িয়ে পড়লেন বাড়ির দুই পাশজুড়ে।
ঘটনার আকস্মিকতায় উপস্থিত সবাই যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা—হঠাৎ এই পুলিশ আসার কারণটা কী?

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৭