গোধুলির শেষ বিকেলে তুমি আমি পর্ব ২৪

গোধুলির শেষ বিকেলে তুমি আমি পর্ব ২৪
Raiha Zubair Ripti

নতুন এক সকাল৷ পাখির কিচিরমিচির শব্দে ভরে উঠেছে চারিপাশ। সূর্যের রশ্মি চোখে পড়তেই রুয়াত চোখ খিঁচে ধরে। বা হাত মুখের উপর দিয়ে সূর্যের রশ্মি কে আড়াল করতে চাইলে আকস্মিক ঘাড়ে গরম অনুভব হলে ফট করে চোখ মেলে তাকায় রুয়াত। শাফায়াত তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। রুয়াত চুখ কচলে ভালো করে তাকালো।

মাথা ঝিমঝিম করছে সাথে শরীর টাও ব্যথাও করছে। ঘুমন্ত শাফায়াত কে কি সুন্দর ই না লাগছে। রুয়াত আলতো করে শাফায়াত এর চুলে হাত বুলিয়ে মাথায় চুমু খেয়ে গলার কাছ থেকে শাফায়াত এর মাথা টা সরিয়ে শোয়া থেকে উঠতেই নিজেকে অদ্ভুত রকমের লাগলো। নিজের দিকে ভালো করে তাকাতেই চোখ কপালে উঠে গেলো। তড়িঘড়ি করে চাদর টেনে জড়িয়ে নিলো শরীরে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ফ্লোরে চোখ যেতেই দেখে জামাকাপড় গুলো এলোমেলো ভাবে পড়ে আছে। রুয়াত চোখ বন্ধ করে মনে করতে চাইলো রাতে কি হয়েছিলো তার সাথে। কিন্তু মনে করতে পারছে না। তার আবছা আবছা মনে আছে সে শাফায়াত কে মহুয়ার জন্য রুম থেকে বের করে দিয়েছিল। শাফায়াত মহুয়া নিয়ে ফিরেছিল। রুয়াত খেয়েছিল মহুয়া টা। তারপর কি হয়েছে? রুয়াত ভাবতে শুরু করলো।

এদিকে শাফায়াত এর ঘুম ভেঙে গেছে রুয়াতের চাদর টান দেওয়ার সময়ই। চোখ মেলে তাকিয়ে রুয়াত কে চাদর জড়িয়ে আকাশকুসুম ভাবতে দেখে শোয়া থেকে উঠে বসলো। রুয়াতের কানের কাছে মুখ টা নিয়ে কানের ললিতে হাল্কা করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলে-
-“ বসে বসে কি ভাবছো?
রুয়াত চমকে উঠলো। ফ্লোরে থাকা কাপড় গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল-
-“ আমাদের মধ্যে কি সব হয়ে গেছে?
শাফায়াত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। প্যান্টের চেইন লাগাতে লাগাতে বলল-
-“ কেনো মনে নেই?
-“ না।

শাফায়াত হাফ ছাড়লো। বিরবির করে বলল-“ থ্যাংক গড মনে নেই। তা না হলে বারবার মনে পড়তো ঐ সময়ের ঘটা ঘটনা গুলো।
-“ আমাদের মধ্যে সব হয়ে গেছে রুয়াত। গোসল করা উচিত এখন। যেতে পারবা নাকি কোলে করে নিয়ে যাব?
রুয়াত ভ্যাবলা কান্তর মতো বলল-
-“ যদি হয়েই থাকে সব কিছু তাহলে আমার মনে পড়ছে না কেনো?
শাফায়াত রুয়াতের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে-
-“ আমার ভুল হয়ে গেছে। তোমাকে মনে করানোর জন্য ভিডিও করে রাখা উচিত ছিলো। নেক্সট টাইম ক্যামেরা অন করে তারপর কাছে আসবো।

-“ না থাক। আপনি যখন বলেছেন তখনই হয়তো সত্যি ই হয়েছে আমাদের মধ্যে সেসব।
শাফায়াত উল্টো ঘুরে পিঠ টা দেখিয়ে বলে-
-“ সি রুয়াত। কি করেছো রাতে খামচি দিয়ে দেখো।
রুয়াত তাকালো। পুরো পিঠে খামচির দাগে লাল হয়ে আছে। রুয়াত কাচুমাচু হয়ে বলে-
-“ খুব ব্যথা লাগছে?
-“ তোমার ব্যথার থেকে নেহাতই কম। এখনও কি ব্যথা করছে শরীর?
রুয়াত উপর নিচ মাথা ঝাকালো।

-“ ওসবের জন্য ই আমার শরীর এতো খারাপ করছে?
-“ শুধু ওসব না। মহুয়ার ও ইফেক্ট আছে। এখন চলো গোসল করবে।
-“ এক সাথে?
শাফায়াত দুষ্ট হাসি দিয়ে চোখ টিপে বলে-
-“ তুমি চাইলে আমার কোনো সমস্যা নেই।
রুয়াত ত্বরিত গতিতে বলে উঠল-
-“ না না আমি একাই গোসল করবো। আপনি জাস্ট জামাকাপড় ওয়াশরুমে রেখে আসেন।
শাফায়াত আলমারি খুলতে খুলতে বলে-

-“ কি রেখে আসবো? ইনার নাকি টি-শার্ট?
রুয়াত ছিঃ করে উঠলো। শাফায়াত ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
-“ ছিঃ করছো কেনো?
-“ আপনি এসব বলছেন কেনো?
-“ ওমা কাল রাতে না তুমি এসব পড়ে নায়েকা সেজেছিলে।
-“ আমি নায়েকা সেজেছিলাম! অবাক হয়ে বলল।
-“ হ্যাঁ। আমি কি মিথ্যা বলছি নাকি?
-“ সত্যি?

-“ হ্যাঁ। যাই বলো না কেনো তোমাকে মারাত্মক হ*ট লাগছিলো। মাথা আউলিয়ে দিয়েছিলা। হলিউড হলিউড ফিল আসছিলো। ইচ্ছে করছিলো আরো..
-“ হয়েছে এখন সেলোয়ার-কামিজ রেখে আসেন ওয়াশরুমে। বকবক না করে।
রুয়াত শাফায়াত কে সম্পূর্ণ কথাটা শেষ ও করতে দিলো না। শাফায়াত সেলোয়ার-কামিজ ওয়াশরুমে রেখে আসে। রুয়াত চাদর সহকারে ওয়াশরুমে ঢুকে তারপর শরীর থেকে চাদর টা খুলে দরজা একটু ফাঁকা করে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল-

-“ চাদর টা ধরুন।
শাফায়াত এগিয়ে আসলো। চাদর সহকারে রুয়াতের হাত হাল্কা টান দিলে রুয়াত শক্ত করে ওয়াশরুমের দরজা চেপে ধরে বলে-
-“ এই একদম টান দিবেন না হাত ধরে। হাত ছাড়েন।
শাফায়াত হাত ছাড়লো না। বরং মাথাটা রুয়াতের মুখে কাছে এনে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলে-
-“ এখন বুঝি লজ্জা পাচ্ছো?
রুয়াত দরজা আটকাতে আটকাতে বলে-

-“ তো পাবো না?
শাফায়াত বাহির থেকে বলল-
-“ রাতে কোথায় ছিলো এই লজ্জা টা?
-“ মহুয়ার ভেতর।
শাফায়াত হেঁসে ফেললো। মিনিট বিশেক পর রুয়াত বের হলো টাওয়াল মাথায় করে। শাফায়াত বিছানায় বসে ছিলো। সদ্য গোসল করে আসা রুয়াত কে দেখে দু ঢোক গিললো। তার অনুভূতি গুলো আবার জেগে উঠছে। পরপর জোরে শ্বাস নিলো শাফায়াত। এরজন্য ই কাছে তেমন আসতে চায় নি শাফায়াত। একবার কাছে আসলেই এরপর শুধু শরীর জুড়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। রুয়াত টাওয়াল টা বেলকনিতে মেলে দিয়ে রুমে এসে শাফায়াত কে থম মেরে বসে থাকতে দেখে রুয়াত বলে উঠল-

-“ বসে আছেন কেনো? যান গোসল করে আসেন।
শাফায়াত রুয়াত কে টেনে নিজের কোলে বসালো। ঘাড়ে থুতনি ঠেকিয়ে আলতো করে গলায় চুমু খেলো। ডান হাত চলে গেলো রুয়াতের কামিজ ভেদ করে উন্মুক্ত পেটে। রুয়াত চোখ বন্ধ করে ফেললো। শাফায়াত ঘোর লাগা কন্ঠে মাদকতা মিশিয়ে বলল-
-“ আমাকে তো কন্ট্রোল লেস করে ফেলছো রুয়াত। এখন কি হবে আমার? দিন-রাত শুধু এখন তোমাকে কাছে পাওয়ার বাহানা ঘুরপাক খাবে।

রুয়াত ফট করে চোখ খুলে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। কোমড়ে হাত দিয়ে বলল-
-“ আপনার ভাবসাব ভালো ঠেকছে না শাফু। যান গোসল করে আসেন।
শাফায়াত উঠে দাঁড়ালো। তারপর ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলল-

-“ বিকেলে কিন্তু ঢাকা ব্যাক করবো রুয়াত। জামাকাপড় গুলো তাড়াতাড়ি ওয়াশ করে রোদে শুকাতে দাও।
রুয়াত কথাটা শুনে মাথায় ওড়না দিয়ে বাহিরে চলে আসলো। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই দেখে জবা উঠানে বসে আছে। দৃষ্টি তার তাদের রুমের বেলকনির দিকে। রুয়াতের মনে শয়তানি বুদ্ধি উদয় হলো। আশেপাশে কেউ আছে কি না দেখে নিলো। নাহ্ কেউ নেই। রুয়াত মুচকি হাসতে হাসতে এগিয়ে আসলো। জবার পাশে দাঁড়িয়ে মাথা থেকে ওড়না টা খুলে চুল গুলো কে ঝাড়তে লাগলো। আকস্মিক শরীরে পানি ছিটে আসায় জবা ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো। রুয়াত কে দেখে রাগ সপ্তম আকাশে। বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে রেগে বলল-

-“ এই কানা নাকি তুমি। দেখছো না আমি বসে আছি। আমার মুখের সামনে এসেই তোমাকে চুল ঝাড়তে হবে?
রুয়াত অপরাধীর মতো মুখ করে বলল-
-“ ওপস সরি আপু। খেয়াল করি নি তোমায়।
-“ চোখ কি ভ্যান্টি ব্যাগে করে রেখে আসছো নাকি রুমে যত্তসব।
-“ ভ্যান্টি ব্যাগে তো রাখি নি আপু। তবে শাফুর বুক পকেটে রেখে আসছি। তা না হলে আস্ত তুমি টাকে কি করে নজরো আসলো না আমার!

জবা মুখ হা করে কিছু বলতে নিবে আর তখনই বেলকনি চোখ যায়। শাফায়াত খালি গায়ে টাওজার পড়ে টাওয়াল দিয়ে চুল মুছে বেলকনি তে মেলে দিচ্ছে। রুয়াত জবা কে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে দৃষ্টি অনুসরণ করে বেলকনি তে তাকাতেই চোখ তার কপালে। তার জামাই খালি গায়ে রয়েছে। আর এই মেয়ে হা করে তাকিয়ে আছে! রুয়াতের ইচ্ছে করলো শাফায়াত কে আস্ত চিবিয়ে খেতে। আর এই মেয়েকো ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে। রাগ আর সামলে রাখতে না পেরে জবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে-

-“ অন্যের জামাই এভাবে হা করে তাকিয়ে দেখতে লজ্জা করে না?
জবা দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। তবে দমো গেলো না।
-“ আমার চোখ আমি যেখানে ইচ্ছে সেখানে তাকাবো। তোমার কি?
-“ আমার কি মানে? আমার জামাই এর দিকে তাকাবা কেনো? তোমার জামাই নাই? তোমার জামাই কে ভিডিও কল দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখো।

-“ এতো সমস্যা হলে জামাই কে পর্দায় রাখো। তাহলে আমার চোখ যাবে না যত্তসব।
জবা চলে গেলো। রুয়াত রাগে ফুঁসতে লাগলো। এতো সুন্দর দিনটার মুডের ১২ টা বাজিয়ে দিলো।
সাদমান নিচে নেমে রুয়াত কে এমন ফুঁসতে দেখে বেলি গাছের নিচে বসে বলে-
-“ আরে রুয়াত রেগে আছো কেনো? মহুয়ার রেশ এখনও কাটে নি?
রুয়াত তাকালো।

-“ মহুয়ার রেশ কেটে গেছে ভাইয়া তবে জবার রেশ এখনও যাচ্ছে না জীবন থেকে। মেয়েটা এতো বেয়াদব কেনো? শাফুর দিকে হা করে তাকায় থাকে বেয়াদব মেয়েটা।
-“ ও ওমনি। বাদ দাও ওর কথা। আর কাল রাতের জন্য সরি রুয়াত।
রুয়াত ভ্রু কুঁচকালো।
-“ সরি কেনো?
-“ আমার আনা মহুয়া খেয়ে তুমি পাগলামি করেছো।
-“ আরে ধূর বাদ দেন তো। ভাগ্যিস মহুয়া খাইছিলাম। তা না হলে কি আর ও….
রুয়াত চুপ হয়ে গেলো। কি রেখে কি বলে ফেলছিলো এখনই।

-“ এই মহুয়া কই পাওয়া যায় সাদমান ভাইয়া?
-“ কেনো?
-“ আসলে অনেক টেস্ট তো তাই।
-“ না না বলা যাবে না। ব্রো ওটার নাম ও মুখে আনতে নিষেধ করছে।
-“ আরে বলেন আপনার ব্রো জানতে পারবে না।
-“ ঐ তো…
-“ সাদমান।

গম্ভীর কন্ঠে ডেকে উঠলো শাফায়াত। রুয়াত সাদমান দু’জনেই তাকালো। সাদমান বসা থেকে উঠে বলে-
-“ ব্রো আমি বলতে চাই নি। আর বলবো না। আসছি কেমন?
সাদমান চলে গেলো। রুয়াত মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো। কথাই বলবে না এই পুরুষের সাথে।
সাদমান উপরে এসে নিজের রুমের দিকে যেতে নেওয়ার সময় দেখে রজনীর রুমের দরজা খোলা। ফোনে হেঁসে হেঁসে কথা বলছে। সাদমান এগিয়ে আসলো। রজনী ফোন টা মুখের সামনে ধরে ফ্লায়িং কিস ছুঁড়ে দিয়ে বলছে-
-“ আই লাভ ইউ। খুব তাড়াতাড়ি আমাদের দেখা হবে।

গোধুলির শেষ বিকেলে তুমি আমি পর্ব ২৩

ব্যাস আর শুনতে পারলো না সাদমান। কেমন পা দুটো অসার হয়ে আসলো। রজনী কাউকে ভালোবাসি বলছে! হৃৎস্পন্দন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেলো। রজনী কি তার ভাগ্যে নেই? এতো করে চেয়েও কি সে রজনী কে পাবে না? আচ্ছা রজনী কাকে ভালোবাসি বললো? নওফিল নাকি ডক্টর উমর কে?

গোধুলির শেষ বিকেলে তুমি আমি পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here