গোধুলির শেষ বিকেলে তুমি আমি পর্ব ২৯

গোধুলির শেষ বিকেলে তুমি আমি পর্ব ২৯
Raiha Zubair Ripti

সূর্যাস্তের সাথে সাথে পৃথিবীতে অন্ধকার নেমে আসে। গোধূলির পরে আসে সন্ধ্যা, আর সন্ধ্যা যতই বাড়তে থাকে রাতের আগমণ ততই ত্বরান্বিত হয়। রাত মূলত প্রত্যেক মানুষের বিশ্রামের সময় বিশেষ কোন আনন্দঘন মুহূর্ত ও ভালোবাসার সময় কাটাবার জন্য রাতের জুড়ি নেই। তেমনই অনেক আশা নিয়ে উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছাঁদে সাদমান৷ ছাঁদের ওপর পাশে গায়ে হলুদের স্টেজ। বসে আছে সানজিদা। তার আশেপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লোকজন। পুরো ছাঁদ টা মরিচ বাতি দিয়ে সাজানো। ঝলমলে করছে সেই বাতির আলোয় পুরো ছাঁদ। সাদমান বারবার ঘড়ি দেখছে। রজনী কেনো আসছে না? সন্ধ্যার পর এক বারের জন্য ও তাকে দেখতে পারে নি সাদমান। শাফায়াত সাদমান কে ছাঁদের উল্টোপাশে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে বলে-

-“ একা একা দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?
সাদমান পাশে ফিরলো। শাফায়াত কে দেখে বিরস মুখে বলল-
-“ একটু পর দোকলা হবো। তুমি তোমার বউয়ের কাছে যাও,গো। আমাকে মিঙ্গেল হবার জন্য স্পেস দাও।
শাফায়াত বুঝলো না কথার মানে। সেজন্য ভ্রু কুঁচকে বলল-
-“ মিঙ্গেল হবি মানে?
-“ মিঙ্গেল মানে সিঙ্গেলের স টা বাদ দিয়ে ম টা লাগালে তো মিঙ্গেল ই হয়।
-“ মাথাটা গেছে নাকি একদম?
-“ হয়তো। এখন যাবে তুমি এখান থেকে?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শাফায়াত চলে আসলো। একটু পরই ছাঁদের দরজা দিয়ে রজনী কে প্রবেশ করতে দেখলো সাদমান। লেমন কালারের শাড়ি, শরীরে কাঁচা ফুলের গহনা। মাথায় বেলি ফুলের গাজরা। একদম সাদমান কে শেষ করে দেওয়ার মতো লুক। রজনী স্টেজের দিকে চলে গেলো। তা দেখে সাদমানের মুখ চুপসে গেলো। আশ্চর্য মেয়েটার কি মনে নেই তাকে যে সে অপেক্ষা করতে বলেছিল! এদিকে যে সাদমান অপেক্ষা করছে সেটা কি তার নজরে যায় নি?

রজনী রুয়াতের পাশে এসে বসলো। রুয়াত মুচকি হাসি উপহার দিলো। শারমিন বেগম সানজিদার গালে হলুদ ছুঁইয়ে দিচ্ছে। রুয়াতের পালা আসতেই রুয়াত শাফায়াত এক সাথে চলে যায়। সেই সুযোগে সাদমান এসে রজনীর পাশে বসে। রজনী ঘাড় বেঁকিয়ে তাকায়। সাদমান রাগান্বিত হয়ে তাকিয়ে আছে। এই রাগান্বিত চেহারা দেখে রজনীর মনে হলো সে তো সাদমান কে কিছু বলতে চেয়েছিল। নিজের মনকেই ইচ্ছে মতো বকে নিলো রজনী। মিহি কন্ঠে বলল-
-” সরি সাদমান। আমার একটু ও খেয়াল ছিলো না।
সাদমান গম্ভীর মুখে বলল-

-“ ইট’স ওকে। এখন তো মনে পড়েছে। তো এখন বলুন।
-“ এখানেই?
-“ এখানে বলতে না চাইলে আপনাকে নিয়ে কি নির্জন জায়গায় যাব?
-“ জায়গা টা একটু নির্জন হলে ভালো হয়।
-“ ওকে তাহলে চলুন।
সাদমান রজনীর হাত ধরে ছাঁদ থেকে নেমে গেলো বাগানে। এখন বাগানে কারো বেশি আনাগোনা নেই। সবাই ছাঁদে ব্যস্ত। রজনী কে দোলনায় বসিয়ে নিজেও বসলো। তারপর বলল-
-“ এবার বলুন।
রজনীর বুক টা ধুকপুক করছে। সব শোনার পর সাদমান কেমন রিয়াকশন করবে সেটা ভেবে। লম্বা করে শ্বাস নিলো। তারপর বলল-

-“ আপনি তো জানেন আমি সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত, তার উপর ডিভোর্সেস। আরো একটা ক্ষুত আছে। বলতে পারেন ক্ষুত না অপূর্ণতা আছে আমার জীবনে। আমাকে বিয়ে করলে কখনও বাবা ডাক শুনতে পারবেন না…..
সাদমান সহসা রজনী কে জড়িয়ে ধরলো।
-“ লাগবে না বাবা ডাক শোনা। আমি বাচ্চা ছাড়াই কাটিয়ে দিব আপনার সাথে বাকি জীবন। আপনি শুধু থেকে যান,গোটা বিশ্ব কে দেখিয়ে দিব সব পুরুষ এক না,বাবা ডাক টাই সব কিছু না,সবার উর্ধ্বে ভালোবাসা,আর প্রিয় মানুষটার হাত ধরে বিপদে-আপদে হাতটা শক্ত করে ধরে পাশে থাকা।
রজনী জোর করে সাদমানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বলল-

-“ আবেগে ভেসে কি সব বলছেন সাদমান! হুশে আসুন। কোনো পুরুষই এমন মেয়ে চায় না। আপনি কেনো চাচ্ছেন?
-“ কারন আমি সব পুরুষের কাতারে পড়তে চাই না। আমি অনেক আগেই এই কথাটা জেনেছি। রুয়াত বলেছে আমায়। আমরা বাহিরের দেশে গিয়ে উন্নতমানের চিকিৎসা করাবো। তাতেও না হলে টেস্টটিউব পদ্ধতি অনুসরণ করবো একান্তই দরকার হলে। তবুও আমার আপনাকেই চাই রজনী।
-“ পাগলামি করছেন সাদমান। বাস্তবতা দেখুন। দিন শেষে আপনার আফসোস হবে আমাকে নিয়ে। অন্য দিকে আমি আপনার সিনিয়র। লোক সমাজে চলতে পারবেন না।

-“ আফসোস! হ্যাঁ অবশ্যই আফসোস হবে আপনাকে জীবনে না পেলে। আপনি আমার এক সূক্ষ্ম অনুভূতি রজনী । আপনি আমার শখের না বরং অধিক প্রিয় একটা মানুষ। আপনি ছাড়া আর কাউকে এতো করে চাই নি,আর না এতো মায়া করে ভালোবেসেছি। কাউকে নিয়ে এতো করে কল্পনা জল্পনা ও করি নি। জানেন প্রতিদিন ঘুমের ঘোরে আপনাকে নিয়ে আমার কল্পনায় পাড়ি জমাই। সেখানে ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর আছে। সেই ঘরে আপনাকে নিয়ে সংসার সাজাই। ইশ কি সুন্দর সেই কল্পনা জানেন? আমি প্রতিবার চাই ঘুম টা ভাঙুক আমি না জাগি।

কারন জাগলেই স্বপ্নটা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। যখনই আমি ঐ কুঁড়েঘর অব্দি পৌঁছে গিয়ে ভেতরে ঢুকতে চাই কোনো এক অপ্রত্যাশিত কারনে আমার ঘুম ঠিক ঐ মূহুর্তেই ভেঙে যায় । আমার সারাটাদিন অস্থিরতায় কেটে যায়। আপনি বুঝেন আমার এই অস্থিরতা? একটু ফিল করবেন? করুন না। খুব কি ক্ষতি হবে একজন জুনিয়র কে জীবন সঙ্গী করলে? আমি তো জেনে শুনেই আপনাকে চাইছি। সমাজ কে পরোয়া করি না আমি। ট্রাস্ট মি আপনার একটা কথার ও অবাধ্য হবো না। সবাই তো বেস্ট বউ হতে চায়। আমি না হয় বেস্ট স্বামী হয়ে দেখাবো। আপনি যেমন আছেন তেমনই থাকবেন। এক চিমটি ও বদলাতে হবে না নিজেকে। বরং আমি না হয় পাহাড় সমান নিজেকে বদলাবো। তবুও আমাকে আপনার ভাগ্যের সাথে জুড়ে নিন। এই যে ধরুন না রাস্তার ভিক্ষুক যেমন ভিক্ষা চায়। আমিও আপনাকে আমার জন্য ভিক্ষা চাচ্ছি।

ব্যাক্তিত্ববান মানুষটাও নির্দিষ্ট একজনের কাছে ভীষণ বেহায়া হয়। এই যে দেখুন তার উদাহরন টা আমি নিজেই। আমিও কিভাবে যেনো সেই খাতায় নাম দিয়ে ফেলেছি। আপনি প্লিজ বিশ্বাস ভরসা করে একবার আমায় আপনার হাত টা ধরতে দিন।
রজনী কি বলবে? কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে আজ সে! এই ছেলেটা এতো করে চাইছে কেনো! রজনীর যে ভয় হয় এতো ভালোবাসা দেখলে। তার কপালে কি সইবে এতো ভালোবাসা?
সাদমান রজনী কে চুপ থাকতে দেখে বলল-

-“ চুপ কেনো রজনী কিছু বলুন না। আপনি হ্যাঁ বললেই আমি বাবা আর মা কে আসতে বলবো বিডি আপনার আর আমার বিয়ে নিয়ে কথা বলতে।
-“ আরেক টু ভেবে দেখুন না সাদমান। সারাটা জীবনের ব্যাপার। মত বদলাতেও পারে।
-“ আপনি এখনও আমায় চেনেন নি রজনী। আমি যা বলি তাই করি। আমার আপনাকে পেলে আর কোনো কিছু নিয়ে আফসোস থাকবে না জীবনে।
রজনী আমতাআমতা করে বলল-

-“ আ….আমাকে একটু ভাবার সময় দিন।
-“ ভাবাভাবির কি আছে? আচ্ছা যান,আজকের রাত টা দিলাম ভাবার সময়। সারা রাত না ঘুমিয়ে জেগে থেকে ভাববেন। ফজরের আজান হতেই আমি আপনার দোরগোড়ায় এসে হাজির হবো।
-“ বেশ।
-“ তাহলে এখন চলুন আমেজে মেতে রই।
সাদমান রজনীর হাত ধরে চলে গেলো।

রাত টা হই হুল্লোড় করে কাটালো সবাই। তারপর যে যার রুমে চলে গেলো। রুয়াত শাফায়াত নিজেদের রুমে এসে বেলকনি তে বসে আছে। রুয়াতের বায়না সে শাফায়াত এর কাঁধে মাথা রেখে কিছুক্ষণ বসে থাকবে। সারাদিন ছুটোছুটি করে বউ এর মুখে এমন আব্দার শুনে ক্লান্ত থাকার পরও মানা করতে পারে নি শাফায়াত । তার বউ টা তার কাছে বেশি কিছু তো চায় না,চায় শুধু একটু একাকী সময়। রুয়াত শাফায়াত এর কাঁধে হাত রাখলে শাফায়াত আলতো করে কোমড় চেপে ধরে। রুয়াত এক হাত দিয়ে শাফায়াত এর বুকের পাঞ্জাবি খামচে ধরে। কিছুক্ষন নীরব থেকে রুয়াত বলল-

-“ মানুষ কে ততক্ষণ চেনা যায় না যতক্ষণ না সেই মানুষটির সংস্পর্শে কেউ না আসে তাই না?
-“ হু। আমাকে চিনতে পারলে নাকি আমার সংস্পর্শে এসে?
-“ ভীষণ বাজে ভাবে চিনেছি আপনায়।
চোখ টিপে হেঁসে বলল রুয়াত। শাফায়াত কথার মানে বুঝে মুচকি হাসলো।
-“ আপনার হাসি অনেক সুন্দর আপনি জানেন সেটা?
-“ তুমি বললে দেখে আজ জানলাম।
-“ মিথ্যা কথা। এর আগে কেউ বলে নি?

-“ না।
-“ কেউ প্রশংসা ও করে নি?
-“ উমমম না মনে হয়।
-“ এহ মিথ্যুক একটা। এতো হ্যান্ডসাম ছেলে তার নাকি কেউ প্রশংসা করে নি। জবার তো করার কথা। ও যা ছ্যোবলা প্রকৃতির মেয়ে।
-“ হোয়াট ইজ ছ্যোবলা? ছ্যোবলা কি?
-“ সেটার সম্পূর্ণ মানে ভালোভাবে আমিও জানি না, তবে এটা মানে মেবি কেঁড়ে কেঁড়ে নেওয়া বা ছ্যাচড়ামো করা,বা বেলেহাজ হয়ে পিছু পড়ে থাকা।
শাফায়াত চোখ ছোট ছোট করে বলল-

-“ আর কিছু নেই?
-“ থাকলেও আপাতত মনে পড়ছে না। আচ্ছা জঞ্জাল জবা আসলো না কেনো?
-“ জানি না তো।
-“ কেনো জানেন না?
-“ তুমি কেনো জানো না?
-“ আমি তো ওকে দেখতে পারি না।
-“ আর আমি মনে হয় ওকে ভীষণ দেখতে পারি।
-“ আপনার না এক্স ছিলো ও।
-“ আমি কি ওর সাথে প্রেম করছি নাকি যে এক্স হবে।
-“ তাহলে বিয়ের কথা উঠেছিল কেনো?

-“ ফুপিই এনেছিল প্রস্তাব বিয়ের। আম্মাও রাজি ছিলো একটু। কিন্তু আমি রাজি ছিলাম না। কাজিন হিসেবে ও ঠিক আছে বাট বউ হিসেবে না।
-“ বউ হিসেবে আমি নিশ্চয়ই ঠিক?
একটু প্রাউড ফিল নিয়ে বলল রুয়াত। শাফায়াত রুয়াতের হাতের পিঠে চুমু খেয়ে বলল-
-“ শুধু ঠিক না,একদম পারফেক্ট।
রুয়াত হেসে ফেললো।

এদিকে সাদমান রুমে আসার পর থেকে শুধু হাসফাস করছে। ঘুম তো মোটেও আসছে না। শুধু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে রজনী কি বলবে সেটা ভেবে। একবার বিছানায় গড়াগড়ি করছে তো আরেক বার বেলকনি গিয়ে বসছে,আবার রুমে এসে পায়চারি করছে। এভাবেই ভোরের আজান অব্দি কাটালো। সাদমান আর রুমের ভেতর থাকলোই না। সাদমান সোজা রজনীর রুমের সামনে এসে দরজায় টুকা দিলো। রজনী যেনো সাদমানেরই অপেক্ষায় ছিলো। আওয়াজ পেতেই দরজা খুলে দিলো। সাদমান হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকলো,এবং সরাসরি জিজ্ঞেস করলো-

-“ আপনার উত্তর টা মিস রজনী?
রজনী এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল-
-“ আমি রাজি।
কথাটা যেনো বিদ্যুৎের ন্যায় এসে প্রবেশ করলো সাদমানের কানে। সাদমান তার কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না। সত্যি রজনী এটা বলেছে! সাদমানের তো নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি মনে হচ্ছে। তার ভালোবাসা কে তার আল্লাহ পাইয়ে দিচ্ছে। এই খুশি সে কিভাবে প্রকাশ করবে বুঝে উঠতে পারছে। রজনীর হাত সহসা মুঠোয় নিল। তারপর ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিয়ে বলল-

গোধুলির শেষ বিকেলে তুমি আমি পর্ব ২৮

-“ ধন্যবাদ রজনী আমাকে বিশ্বাস ভরসা করার জন্য। আমার যে কি খুশি লাগছে বলে বুঝাতে পারবো না। আমি এখনই বাবা মা কে বিডি আসতে বলছি।
সাদমান চলে গেলো। রজনী নির্নিমেষ চোখে চেয়ে দেখলো সাদমানের যাওয়া। এতো খুশি এই ছেলেটা শুধু হ্যাঁ বলাতেই!

গোধুলির শেষ বিকেলে তুমি আমি পর্ব ৩০