চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৯
আয়াত বিনতে নূর
অন্যান্য দিনের মতো আজও নতুন এক সকালে সূচনা হলো।ঢাকা শহর আবারও জেগে উঠলো নতুন রূপে। ভোরের নরম আলো ধীরে ধীরে কংক্রিটের অট্টালিকাগুলোর গায়ে লেপ্টে গেল, যেন ক্লান্ত শহরটাকে আদর করে জাগিয়ে তুলছে। দূরে কোথাও পাখির কিচিরমিচির, কোথাও আজানের শেষ ধ্বনি সব মিলিয়ে এক শান্ত অথচ ব্যস্ততার পূর্বাভাস দেওয়া সকাল।
চৌধুরী বাড়ির ভেতরটাও ঠিক তেমনি নীরব অথচ জীবন্ত। ফজরের নামাজ শেষ করে সবাই আবার যে যার ঘরে ফিরে গেছে। বিশাল বাড়িটার করিডোরে শুধু কাজের মেয়েদের পায়ের শব্দ, থালা-বাসনের টুংটাং আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা হালকা মশলার গন্ধ সব মিলিয়ে সকালটা ধীরে ধীরে জমে উঠছে।
ঘড়ির কাটায় তখন সাড়ে সাতটা ছুঁইছুঁই।
এই সময়েই বিছানার পাশে পড়ে থাকা ফারিসের ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো নিঃশব্দ সকালের বুক চিরে। ফারিস বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে নিশিতার বুক থেকে মাথা তুললো।
নিশিতা এখনো গভীর ঘুমে, মুখে শিশুর মতো শান্তি, এলোমেলো চুলগুলো গাল ছুঁয়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্য ফারিসের বিরক্তি মিলিয়ে গেল—ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু ফোনের শব্দ থামছে না। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো নিহান এর কল।ফারিস ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কাঁপা কাঁপা, উদ্বিগ্ন গলা,
“স্যার… সর্বনাশ হয়ে গেছে।”
ফারিসের কণ্ঠ এক নিমিষে কঠিন হয়ে গেল।
“হোয়াট হ্যাপেন্ড?”
“স্যার আমাদের NS গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রি র টেন্ডারের সব ডকুমেন্টস কাল রাতে কেউ এসে চুরি করে নিয়ে গেছে। আমি বুঝতেই পারছি না স্যার, এত সিকিউরিটি থাকা সত্ত্বেও এটা কীভাবে সম্ভব!”
কথাটা শুনে ফারিসের চোখে মুহূর্তেই ঘুমের চিহ্ন উধাও হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো, আঙুলগুলো অজান্তেই মুঠো পাকালো।ঘরের ভেতরের নরম সকালের আলো যেন হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। ফারিস ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। নিশিতা ঘুমের ঘোরে একটু নড়লো, কিন্তু জাগলো না। ফারিস একবার ওর দিকে তাকালো এই শান্ত মুখটার সঙ্গে বাইরের ঝড়ের কোনো মিল নেই।
“নিহান, অফিসে কেউ ঢুকেছে মানে ইনসাইড হেল্প ছাড়া এটা সম্ভব না,”
ফারিস নিচু কিন্তু ভয়ংকর শান্ত কণ্ঠে বলল।
“সিসিটিভি ফুটেজ চেক করো। গার্ডদের কাউকে যেতে দিও না। আমি আসছি অফিসে একটু পরে। ততক্ষণ তুমি ম্যানেজ করো।”
নিহান ওপাশ থেকে তাড়াহুড়ো করে বলল,
“জ্বি আচ্ছা স্যার,”
তারপর কলটা কেটে দিলো। এত বড় একটা খবর শোনার পরও ফারিসের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। না বিস্ময়, না রাগ, না উদ্বেগ সেই আগের মতোই গম্ভীর, স্থির, শান্ত মুখশ্রী। যেন ভেতরে কী চলছে তা কেউ বুঝতেই পারবে না।
ফারিস ধীরে ধীরে ফোনটা পাশে রেখে নিশিতার দিকে তাকালো।
নিশিতা তখনও গভীর ঘুমে, মুখে এক অদ্ভুত শান্তি লেগে আছে। এলোমেলো চুল গাল ছুঁয়ে আছে, নিঃশ্বাসের ওঠানামা খুবই মৃদু। ওর এই নিষ্পাপ, মায়া মাখা মুখটার দিকে তাকাতেই ফারিসের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক সূক্ষ্ণ হাসি ফুটে উঠলো।
মুহূর্তের জন্য যেন সব চিন্তা থেমে গেল।
ব্যবসা, টেন্ডার, চুরি সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হওয়া অদৃশ্য চাপটা গলে গিয়ে শুধু রয়ে গেল এই শান্ত সকাল আর ঘুমন্ত মেয়েটা। ফারিস ধীরে ধীরে ঝুঁকে নিশিতার কপালে খুব নরম করে একটা চুমু খেলো।
চুমুর স্পর্শে নিশিতা একটু নড়েচড়ে উঠলো, ভ্রু কুঁচকে আবার সোজা করলো, তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে ফেললো। ঘুম জড়ানো চোখে সামনে ফারিসকে দেখে ও অবাক হয়ে এক গাল হাসলো, তারপর উঠে বসলো। চুলগুলো কাঁধের ওপর পড়ে আছে, চোখে এখনো ঘুমের ছাপ। ফারিসের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“আপনি এতো সকালে উঠে গেছেন? কিছু হয়েছে ফারিস ভাই?”
ফারিস একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে বলল,
“আরে তেমন কিছু না। একটু পরেই অফিসে যাবো এজন্যই উঠে পড়লাম। আচ্ছা তুই বস, আমি শাওয়ার নিয়ে আসি।”
কথা শেষ করেই ফারিস ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। নিশিতা ওর দিকে তাকিয়ে রইলো, আর ফারিস বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল শান্ত, স্বাভাবিক, অচেনা-রকম স্থির পদক্ষেপে।
ফারিসের কথা শেষ হতেই নিশিতা একটু ইতস্তত করে বলল,
“আপনি একটু বসুন ফারিস ভাই আমি আগে শাওয়ার নিয়ে আসি। না মানে নিচেও তো যেতে হবে তাই আরকি।”
ফারিস নিশিতার কথাগুলো শুনে ঠোঁটের কোণে বাকা একটা হাসি টেনে বলল,
“ওকে, তাড়াতাড়ি যা। কিন্তু হ্যাঁ তাড়াতাড়ি বের হয়ে পড়বি। আর একটা কথা এখন থেকে বাড়ির সবাই জানে তুই ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরীর বউ। তোর সম্মানটা তোকে বুঝিয়ে দিয়েছি নিশি। এখন থেকে আর কোনো লুকোচুরি নেই।”
কথাগুলো খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেও প্রতিটা শব্দ যেন নিশিতার বুকের ভেতর গিয়ে ধাক্কা মারলো। মুহূর্তেই তার মুখের রঙ বদলে গেল।
বাড়ির সবাই জেনে গেছে মানে রিয়া জানে, অহনা জানে, বড়রা জানে সবাই জানে।
আগেরবারের সেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি, ভুল বোঝাবুঝি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সবকিছু যেন একসাথে মাথার ভেতর ফিরে এলো। যদি আবার কিছু হয়?
যদি আবার কেউ প্রশ্ন তোলে? যদি রিয়া বা অহনা আবারও ভুল বোঝে? মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো। হৃদস্পন্দন একটু দ্রুত হয়ে গেল। নিশিতা চিন্তিত গলায় ধীরে ধীরে বলল,
“সবাই জেনে গেছে? তাহলে যদি আবারও কোনো ঝামেলা হয় ফারিস ভাই তাহলে কী হবে?”
ওর কণ্ঠে স্পষ্ট ভয়, অনিশ্চয়তা আর এক অদ্ভুত দুশ্চিন্তার ছাপ যেন সামনে কী অপেক্ষা করছে তা বুঝতে পারছে না, কিন্তু অশান্তির আভাস ঠিকই টের পাচ্ছে। ফারিস নিশিতার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিছু হবে না। সব আমি সামলে নিয়েছি। আর কেউ কিছু বললে এত কিছু গায়ে মাখবি না। আব্বু শুধু বলেছে আমার আর তোর বিয়ের কথা এখন বাইরে বলা হবে না। তোর ১৮ বছর পূর্ণ হলে সবাইকে জানিয়ে দেবে। তাই বাইরের লোক না জানুক, বাড়ির সবাই জানুক যে তুই আমার বউ।”
তারপর একটু থেমে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আচ্ছা এখন এসব বাদ দে। যা গিয়ে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হ।”
নিশিতা আর কোনো কথা বাড়ালো না। চুপচাপ, লক্ষী মেয়ের মতো ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
সময় তো থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে ঘড়ির কাটায় সাড়ে আটটা। নিশিতা শাওয়ার নিয়ে বের হতেই ফারিস বাথরুমে ঢুকলো।
এদিকে বাড়ির সকালের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে।
সব গিন্নিরা ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে এসে কাজ দেখছেন। বাড়ির কর্তারা অফিসে যাওয়ার জন্য যে যার মতো রেডি হচ্ছে। এর মাঝেই তানভীকা ভেজা চুল কাঁধে ফেলে নিচে নেমে এলো।
ড্রয়িং রুমটা পুরো ফাঁকা। চারিদিকে এক ধরনের নীরবতা শুধু রান্নাঘর থেকে হাতা-খুন্তির টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। তানভীকা ভয়ে ভয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘরে ঢুকতেই দেখলো আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী কাজ করছেন। নিশিতা চুপচাপ গিয়ে আফিয়া চৌধুরীর পাশে দাঁড়ালো।
নিশিতাকে দেখে আফিয়া চৌধুরীর চোখে এক ঝলক খুশি ফুটে উঠলেও তিনি তা প্রকাশ করলেন না। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“কি হয়েছে? কিছু লাগবে তোর নিশি?”
নিশিতা মাথা নিচু করে ধীর গলায় বলল,
“আসলে বড় আম্মু একটু পর ফারিস ভাই অফিসে যাবে, তাই পাস্তার সালাদ বানাতাম আরকি।”
নিশিতার কথা শুনে আমেনা চৌধুরী মনে মনে বললেন,
“মেয়েটা তাহলে এবার বড় হচ্ছে, আস্তে আস্তে।আর আমার ছেলেটারও খেয়াল রাখা শিখছে।”
তারপর তিনি নিশিতার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“দেখো নিশি, আগে তুমি শুধু এই বাড়ির মেয়ে ছিলে। কিন্তু এখন মেয়ের সাথে বউও। তাই দায়িত্ব নিতে শিখো। আমরা তো চিরকাল থাকবো না। আর ফারিস তোমার স্বামী তাকে আর দ্বিতীয়বার ভাই ডাকতে যেন না শুনি। আর তোমার বড় মা এখন সম্পর্কে তোমার শাশুড়ি, তাই তাকেও মা বা আম্মু বলো।”
নিশিতা মাথা নিচু করে ধীর গলায় বলল,
“আচ্ছা আম্মু আমি সব কথা মেনে চলবো।”
ওর কণ্ঠে লজ্জা, সংকোচ আর এক ধরনের অস্বস্তি স্পষ্ট ছিল। শব্দগুলো বললেও ভেতরে ভেতরে যেন নিজেকে নতুন করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে আফিয়া চৌধুরীর চোখে-মুখে এক আলাদা খুশির ঝিলিক ফুটে উঠলো।মনে মনে বললেন,
এক মাত্র তুই পারবি নিশি, আমার ছেলেটাকে ঠিক করতে, ওর ভালো-মন্দ দেখতে।
কিন্তু মনের কথাগুলো তিনি মুখে আনলেন না।
সবকিছু আগের মতোই গম্ভীর ভঙ্গিতে ঢেকে রেখে বললেন,
“তোকে কিছু করতে হবে না। আবার হাত পুড়িয়ে বসে থাকবি, তখন আবার তোমার স্বামী আমাদের বলবে তার বউকে দিয়ে কাজ করানোর কোনো দরকার নেই। ওদিকে গিয়ে চুপচাপ বসো।”
নিশিতা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই আফিয়া চৌধুরী বললেন,
“রান্না আমি তোমাকে পরে নিজের হাতে সব শিখিয়ে দেবো।”
নিশিতা আর কিছু বলল না। চুপচাপ রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেল। রান্নাঘর থেকে বের হয়েই দেখলো বাড়ির দুই কর্তা কথা বলতে বলতে ডাইনিং টেবিলে বসছেন। আর সিঁড়ি দিয়ে রিয়া আর তনয়া নামছে।
আরাফাত চৌধুরী আর আলতাফ চৌধুরীকে দেখে নিশিতা একটু থেমে গেল, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তাদের দিকে। নিশিতাকে দেখেই আরাফাত চৌধুরী নিজের জায়গা থেকে উঠে তার কাছে এলেন। নিশিতা হঠাৎই একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। মনে মনে ভাবলো যদি বিয়ের বিষয় নিয়ে কিছু বলেন! তবুও নিজেকে সামলে শান্ত মুখে তার সামনে দাঁড়ালো। আরাফাত চৌধুরী নিশিতার মাথায় স্নেহভরা হাত রেখে বললেন,
“আমার বেপরোয়া, বদমেজাজি, রাগী, গম্ভীর, অবাধ্য ছেলেটাকে দেখে রাখিস মা। তোর উপর ছেড়ে দিলাম ওকে। দোয়া করি, জানো তোমরা সুখী হও।কোনো ঝড়-ঝাপটা যেন তোমাদের জীবনে না আসে। আমার ছেলেটাকে মানুষ করার দায়িত্ব তোমাকে দিলাম মা।”
কথাগুলো শুনে নিশিতার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠলো। তবুও সে মিষ্টি করে হাসলো, ধীরে মাথা নাড়ালো। তারপর বলল,
“আচ্ছা বড় আব্বু… আমি চেষ্টা করবো।”
আরাফাত চৌধুরী যেন খুশি হয়েও পুরোপুরি খুশি হতে পারলেন না। নিশিতার দিকে তাকিয়ে একটু মৃদু গলায় বললেন,
“আমি কি এখনো তোর বড় আব্বু নিশি?”
নিশিতা একটু লজ্জা পেয়ে মাথা এদিকে-ওদিকে নাড়িয়ে বলল,
“নাহ্ তো…”
আরাফাত চৌধুরী মিষ্টি করে হেসে বললেন,
“তাহলে আব্বু বলে ডাকবি মা।”
নিশিতা মাথা নাড়িয়ে ধীরে বলল,
“আচ্ছা আব্বু।”
দূর থেকে রিয়া সব দেখে বলল,
“কি রে নিশু! তুই তো আমার ভাবি হয়ে গেলি! এবার তোর সব জিনিস আমার। সামনেই না ভাইয়া আর তোর জন্মদিন আসছে একসাথে তখন তোকে পুরো লুটে নিবো নিশুর বাচ্চা!”
রিয়ার কথা শুনে নিশিতা সহ উপস্থিত সবাই হেসে ফেললো।তনয়া আফসোসের ভঙ্গিতে বলল,
“সব লুকিয়ে লুকিয়েই করলি রে! আমার মনে হয় না আর বিয়ে হবে। আমার ছোট বোনের আগে বিয়ে হয়ে গেল, তাও আমার বিয়ে হলো না আফসোস!”
আবারও সবাই হেসে উঠলো। তারপর আরাফাত চৌধুরী, আলতাফ চৌধুরী, রিয়া আর তনয়া সবাই একসাথে ডাইনিং টেবিলে বসলো।
নিশিতা দূর থেকে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। মনে মনে বলল ,
যাক, সব ঠিকঠাকই আছে। বাড়ির সবাই সবকিছু মেনে নিয়েছে। রিয়াও আর অভিমান করে নেই।
আর করবেই বা কি করে নিশিতা তো সব বলতেই চেয়েছিলো, কিন্তু সময়ের অভাবে বলা হয়নি।
তনয়াও হয়তো বুঝতে পেরেছে, ফারিসই নিষেধ করেছিল এসব বলতে।
নাহলে নিশিতা তো চুপ করে থাকার মেয়ে নয়।
এদিকে বাড়ির কাজের মেয়েরা এক এক করে সব খাবার ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে দিয়ে গেল।
নিশিতা মনে মনে ভাবলো,
আজ সে নিজেই সবাইকে পরিবেশন করে খাওয়াবে। যেই ভাবা, সেই কাজ। চটপট এগিয়ে গিয়ে এক এক করে সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে শুরু করলো।
তার মাঝে আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী সবার প্লেটে জ্যাম দিয়ে ব্রেড পরিবেশন করতে থাকলেন।
এদিকে ফারিস শাওয়ার নিয়ে এসে ক্লোজেট খুলে
Giorgio Armani ব্র্যান্ডের ফর্মাল স্যুট আর
Nike ব্র্যান্ডের জুতা বের করে রাখলো। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছে ব্রাশ করে নিলো। একেবারে পরিপাটি, নিখুঁত ফর্মাল লুকে রেডি হলো। নিজের ব্যবহার করা পারফিউম Roja Haute Luxe খুব সামান্য স্প্রে করলো। এমনিতেই পারফিউমটা খুব স্ট্রং, কিন্তু ফারিস এতে অভ্যস্ত।
সব প্রস্তুতি শেষ করে ধীরে ধীরে নিচে নামলো।
ফারিসকে আসতে দেখে নিশিতা এক গাল হাসলো।
কিন্তু একই সময় আরাফাত চৌধুরীর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। নিশিতার বুঝতে বাকি রইলো না বাবা আর ছেলের মধ্যে এখনো একটা অদৃশ্য দূরত্ব আছে। সে কিছু বললো না, চুপচাপ সব লক্ষ্য করলো। ফারিস নিচে এসে নিজের বরাদ্দ করা চেয়ারে বসলো। নিশিতা আর দেরি না করে ফারিসের প্লেটে পাস্তার সালাদ তুলে দিলো।
ফারিস কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেতে শুরু করলো।
ঠিক তখনই আরাফাত চৌধুরী ফারিসের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“এখন আর তুমি একা নও ফারিস। তোমার সাথে এখন আমাদের বাড়ির মেয়েটাও আছে। তাই বলছি এই বেপরোয়া ভাব বাদ দাও। আমাদের মেয়েটার জীবনটা নষ্ট করো না।”
কথাগুলো শোনার সাথে সাথে পুরো বাড়ির পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল। চামচের শব্দ থেমে গেল, কারো কথা নেই। সবাই একসাথে ফারিসের দিকে তাকিয়ে রইলো সে কী উত্তর দেয়, সেটাই যেন এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ফারিস একদম শান্ত কিন্তু গম্ভীর।
প্রথম কথাগুলো শুনেও সে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কিন্তু শেষের কথায় ধীরে চামচটা নামিয়ে রেখে বলল,
“আব্বু এখন ওর জীবনটা শুধু ওর একার নেই।
ওর সাথে আর আমার সাথে ও পুরোপুরি জড়িত।
আই হোপ আমি বোঝাতে পারছি আমি কী বলতে চেয়েছি।”
তার কণ্ঠে ছিল না কোনো উচ্চস্বরে প্রতিবাদ,
কিন্তু কথাগুলোর ভেতরে ছিল অদ্ভুত দৃঢ়তা।
আরাফাত চৌধুরী আর কিছু বললেন না।
চুপ করে বসে রইলেন। ফারিস চামচটা রেখে উঠে দাঁড়ালো। নিশিতার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আমি আসছি। ফিরতে রাত হবে।
সিলেবাস শেষ করবি আমি এসে পড়া ধরবো।”
এই বলেই গটগট পায়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।
ফারিসকে চলে যেতে দেখে নিশিতার মনটা হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে গেল। সে কিছু না বলে চুপচাপ উপরে নিজের রুমে চলে গেল। এদিকে আফিয়া চৌধুরী বিরক্ত হয়ে বললেন,
“তোমার সমস্যা কী বলো তো? সকাল সকাল ছেলে মেয়েগুলোর মন খারাপ করে দিলে। এই শোনানো অভ্যাসটা তুমি কবে বাদ দিবে তা তুমিই ভালো জানো।”
কথা শেষ করে তিনিও নিজের রুমে চলে গেলেন।
আরাফাত চৌধুরী আর কিছু বললেন না। চুপচাপ বসে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর আলতাফ চৌধুরীর সাথে তিনিও অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলেন।
এদিকে রিয়া আর তনয়াও চুপচাপ যে যার রুমে চলে গেল। বাড়িটা আবার নীরব হয়ে গেল সকালের সেই হাসি-আনন্দ যেন কোথাও মিলিয়ে গেল।
কিছুদিন বাদেই পরীক্ষা, তাই রিয়াও পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছে। রুমে গিয়ে দরজা আটকে সোজা পড়তে বসলো। এদিকে নিশিতাও নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। তারপর জোরে একটা শ্বাস ছাড়লো মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা একটু হলেও কমলো।
পড়ার টেবিলের দিকে এগুতে এগুতে মনে মনে বলল,
এই বিয়ে নিয়ে যদি আবারও কোনো ঝামেলা হয় ফারিস ভাই আর বড় আব্বুর মাঝে আমি তো চাই না আবার নতুন করে কিছু শুরু হোক। এইসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ ফারিসের কথাগুলো মনে পড়লো,
“সব আমি সামলে নেবো।”
নিশিতা চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড বসে থাকলো। তারপর নিজেকে শক্ত করে বলল,
“না, এখন এসব ভাবলে চলবে না। সামনে পরীক্ষা।
বই খুলে পড়তে শুরু করলো। দুই সপ্তাহও বাকি নেই।”
পাতা উল্টানোর শব্দ আর কলমের খসখস শব্দে ঘরটা ভরে উঠলো।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৮
এদিকে ফারিস রেডি হয়ে নিজের অফিসে না গিয়ে সোজা তালুকদার ইন্ডাস্ট্রির সামনে গাড়ি থামালো। গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে একবার গভীরভাবে তাকালো তার বাদামি চোখ দুটোতে তখন ঠান্ডা হিসেবি দৃষ্টি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আর কিছু না ভেবে সোজা অফিসের ভেতরে ঢুকে গেল। সিকিউরিটি আটকাতে গিয়েও আটকালো না। কারণ ফারিসকে সবাই এক নামেই চেনে বিশ্বের টপ ১৫ এর মধ্যে থাকা একজন বিজনেসম্যান। তার সামনে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পর্যন্ত হলো না কারও।
