চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৩
আয়াত বিনতে নূর
ফারিসের ভিতরে জমে থাকা প্রত্যেকটা ক্ষোভ, ঘৃণা আর রাগ যেন চোখ দিয়েই ঝরে পড়ছে। তার দু’চোখ অস্বাভাবিক লাল, দৃষ্টিতে জমে আছে ভয়ংকর এক তীব্রতা। মনে হচ্ছে বহুদিন ধরে বুকের ভেতর পুঞ্জীভূত হয়ে থাকা আগুন আজ ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে দাবানলের রূপ নিয়ে।
চারপাশের বাতাস পর্যন্ত যেন ভারী হয়ে এসেছে। ঘরের নিস্তব্ধতায় শ্বাস নেওয়ার শব্দটুকুও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সেই নিস্তব্ধতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ফারিসকে দেখে মনে হচ্ছে, সে আর মানুষ নেই—রাগ আর প্রতিশোধে গড়া এক জীবন্ত ঝড়।
জিমে গড়ে তোলা শক্ত পেশিগুলো শার্টের কাপড়ের নিচে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, হাতের মুঠো এতটাই দৃঢ় যে আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে। বাহুর শিরা-উপশিরাগুলো ক্রমশ ফুলে উঠছে, যেন ভেতরে প্রবাহিত প্রতিটি রক্তকণা তার ক্ষোভকে আরও উসকে দিচ্ছে।
আর ফারিসের সেই ভয়ংকর রূপের সামনে পড়ে ছেলেটার অবস্থা আরও করুণ। ভয়ে সে নিজেকে যতটা সম্ভব গুটিয়ে নিয়েছে। মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের হচ্ছে না। মনে হচ্ছে তার গলার স্বর কোথাও হারিয়ে গেছে।
নির্জন ঘরটার পরিবেশ ক্রমশ আরও ভারী হয়ে উঠছে। চারদিকে এমন এক অস্বস্তিকর নীরবতা ছড়িয়ে আছে, যেন সময়ও থমকে গেছে। দূরে কোথাও হয়তো ঘড়ির কাঁটা চলছে, কিন্তু এই মুহূর্তে সেই শব্দও যেন এখানে পৌঁছাতে সাহস পাচ্ছে না।
আর আশ্চর্যের বিষয়, ছেলেটার এই অসহায়, আতঙ্কিত অবস্থাটা দেখে ফারিস যেন এক অদ্ভুত আনন্দ অনুভব করছে। তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা বাকা চিলতে হাসিটা কিছুতেই মিলিয়ে যাচ্ছে না। হাসিটা উচ্চস্বরে নয়, উন্মাদও নয়; বরং ভয়ংকর রকমের নীরব। এমন এক হাসি, যা মানুষকে চিৎকারের চেয়েও বেশি আতঙ্কিত করে তুলতে পারে।
আর ছেলেটা…?
গরম আর ভয়ের চাপে তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে একাকার। টি-শার্টের কাপড় শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘামের ফোঁটা, যা থুতনি ছুঁয়ে মেঝেতে পড়ছে একের পর এক। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এত দ্রুত চলছে যে মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে তা বাইরে থেকে শোনা যাবে।
তার কাছে মনে হচ্ছে, সে কোনো সাধারণ মানুষের সামনে নয়; বরং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো নিষ্ঠুর জল্লাদের সামনে পড়ে আছে। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সে সম্পূর্ণ অসহায়। পালানোর কোনো পথ নেই, সাহায্য চাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ফারিস ধীরে ধীরে একবার ছেলেটার দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে ছিল না কোনো তাড়াহুড়ো, না কোনো উত্তেজনা। বরং ছিল শীতল, হিসেবি এক নীরবতা।
তারপর ঠোঁটের কোণে আবারও ফুটে উঠল সেই বাঁকা হাসি।
হাসিটা ছিল একদম ঠান্ডা। একদম নীরব।
যেন প্রকৃতির বুক চিরে ভয়ংকর কোনো ঝড় আছড়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্ত। চারদিক যখন অস্বাভাবিকভাবে শান্ত হয়ে যায়, বাতাস যখন নিস্তব্ধ হয়ে অপেক্ষা করে, আর আকাশ যখন নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখে ধ্বংসের সমস্ত আয়োজন—
ফারিসের সেই হাসিটাও ঠিক তেমনই ছিল।
নীরব।
কিন্তু ভীষণ ভয়ংকর।
ফারিস একটি কথাও বলল না। নিঃশব্দে ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজাটা বন্ধ হওয়ার ক্ষীণ শব্দটুকু কানে পৌঁছাতেই ছেলেটার মনে হলো, ঘন কালো অন্ধকারের ভেতর কোথাও যেন একফোঁটা আলো জ্বলে উঠেছে। এতক্ষণ বুকের ভেতর জমে থাকা আতঙ্কের পাহাড়ে যেন সামান্য ফাটল ধরল।
সে সত্যিই ভেবেছিল, আজ আর তার রক্ষা নেই।
ফারিসের চোখের সেই ভয়ংকর দৃষ্টি, ঠোঁটের কোণের শীতল হাসি, শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়া দমবন্ধ করা রাগ—সবকিছুই যেন স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছিল, আজকের রাতটাই তার শেষ রাত হতে চলেছে।
কিন্তু কিছু না বলেই ফারিস চলে গেল।
ব্যাপারটা যতটা স্বস্তি দিল, ঠিক ততটাই তাকে ভাবিয়ে তুলল।
সত্যিই কি ফারিস তাকে ছেড়ে দিল?
এত সহজে?
বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল তার।
কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মানুষটার চোখে সে নিজের মৃত্যু দেখেছে, সেই মানুষ হঠাৎ করেই তাকে বাঁচিয়ে রেখে চলে যাবে—এটা মেনে নিতে তার বেশ কিছুটা সময় লাগল।
কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বিষয়টা তার মস্তিষ্কে জায়গা নিতে শুরু করল, তখনই বুকের ভেতর আবার বাঁচার প্রবল আকাঙ্ক্ষা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
হয়তো এখনও সুযোগ আছে।
হয়তো এখনও এখান থেকে বের হওয়া সম্ভব।
এই ভাবনা মাথায় আসতেই ছেলেটা ছটফট করে উঠল।
বাঁধা হাত দুটো প্রাণপণে মোচড়াতে লাগল। দড়ির শক্ত প্যাঁচের বিরুদ্ধে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করতে লাগল সে। মুক্ত হওয়ার শেষ চেষ্টাটুকু করতে লাগল মরিয়া হয়ে।
কিন্তু দড়ির প্রতিটি প্যাঁচ এতটাই শক্ত করে বাঁধা ছিল যে তা খুলে ফেলা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল।
সময়ের হিসাব সে হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই।
কতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছে, তা তার নিজেরও জানা নেই।
বারবার হাত মোচড়াচ্ছে, শরীর ঝাঁকাচ্ছে, বাঁধনের ফাঁক খুঁজছে।
কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থতা।
প্রতিটি চেষ্টা শেষ হচ্ছে হতাশায়।
ধীরে ধীরে হাতের কবজি লাল হয়ে উঠেছে। চামড়া ঘষে ক্ষত হওয়ার উপক্রম। তবুও মুক্তি মিলছে না।
অবশেষে সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে এলে তার বুক থেকে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।
হয়তো আজ আর তার নিস্তার নেই।
হয়তো এই পরিত্যক্ত বাড়ি থেকেই তার জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হবে।
তার জীবিত শরীরটা হয়তো আর কখনো এই বাড়ির বাইরে পা রাখতে পারবে না।
শেষ পর্যন্ত বের হবে শুধু তার নিথর দেহ।
চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ভাঙাচোরা দেয়াল, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ আর ধুলোয় ঢেকে থাকা মেঝে যেন সেই আশঙ্কাকেই আরও বাস্তব করে তুলছিল।
নিস্তব্ধতা এতটাই গভীর যে নিজের দ্রুত হৃদস্পন্দনের শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিল সে।
কোথাও একটা পুরোনো জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকে কঁকিয়ে উঠছিল।
সেই শব্দটাও এই মুহূর্তে অদ্ভুত ভৌতিক লাগছিল।
ধুলোমাখা শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল ঘামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দু।
সেগুলো গরমের কারণে, নাকি মৃত্যুভয়ের কারণে—সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছিল না।
মৃত্যু যখন মানুষের খুব কাছে এসে দাঁড়ায়, তখন শরীরের প্রতিটি অনুভূতিও বদলে যায়।
তার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হচ্ছিল।
অস্থির মনটা বারবার একই প্রশ্নে ফিরে যাচ্ছিল।
এবারের মতো কি তার রেহাই হবে না?
একবার বেঁচে গেলে কি খুব বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেত?
প্রশ্নগুলো উত্তরহীন থেকেই বুকের ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।
হঠাৎ তার ভাবনায় ছেদ পড়ল।
কোথাও থেকে ভেসে এলো পায়ের শব্দ।
ধীর।
ভারী।
নিয়ন্ত্রিত।
টক…
টক…
টক…
প্রতিটি শব্দ যেন নিস্তব্ধ পরিবেশকে চিরে এগিয়ে আসছিল।
আর সেই শব্দ শুনেই ছেলেটার বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষীণ আশার আলোটা ধপ করে নিভে গেল।
কারণ এই পদচারণা সে চিনতে পেরেছে।
ফারিস।
ফারিসের হাঁটার ভঙ্গিতেও এক ধরনের ভয় ছিল।
এক ধরনের ঠান্ডা, নীরব হুমকি।
মনে হচ্ছিল, প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠছে।
আর কয়েক সেকেন্ড পরেই দরজার সামনে এসে দাঁড়াল সে।
ফারিসকে দেখেই শুকনো ঢোক গিলল ছেলেটা।
গলা এমনিতেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।
এখন যেন আরও শুকিয়ে গেল।
মনে হচ্ছিল, গলার ভেতর বালি ঢেলে রাখা হয়েছে।
পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছে।
এই মুহূর্তে এক ফোঁটা পানি পেলেও হয়তো নতুন জীবন ফিরে পেত।
কিন্তু তাকে পানি দেবে কে?
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার চোখে সে এতক্ষণে বুঝে গেছে—তার জন্য করুণা বলে কিছু নেই।
দয়া নেই।
ক্ষমা নেই।
শুধু আছে ভয়ংকর এক হিসেব।
আর সেই হিসেবের দিনই হয়তো আজ।
ফারিসের দিকে তাকিয়ে ছেলেটার চোখে ফুটে উঠল এক অজানা আতঙ্ক।
মনে হচ্ছিল, কোনো মানুষের সামনে নয়—নিজের মৃত্যুর সামনেই বসে আছে সে।
এতটা অসহায় নিজেকে হয়তো জীবনে কখনো লাগেনি।
ঢাকার এক ক্ষমতাশালী ব্যবসায়ীর ছেলে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই সে অভ্যস্ত ছিল অন্য এক বাস্তবতায়।
টাকার জোরে, ক্ষমতার দাপটে, প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়ালে তার অসংখ্য ভুল, অন্যায় আর অপরাধ চাপা পড়ে গেছে।
যত বড় অন্যায়ই করুক, বাবা সবসময় সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
প্রতিবার তাকে বাঁচিয়ে নিয়েছেন।
আইনের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেছেন।
ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে থেকে ছেলেটা ধীরে ধীরে আরও বেপরোয়া হয়েছে।
আর তাকে রক্ষা করতে গিয়ে তার বাবা অজান্তেই তাকে আরও গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছেন।
কিন্তু পৃথিবীর সব হিসেব একদিন না একদিন মিলে যায়।
কথায় আছে—
পাপ কখনো পাপীকে ছেড়ে দেয় না।
হয়তো আজ সেই দিন।
হয়তো আজ তার জীবনের সমস্ত অন্যায়ের হিসেব একে একে মিটিয়ে নেওয়া হবে।
আর সেই হিসেবের সাক্ষী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ফারিস।
ছেলেটা ভীত, কাঁপা চোখে তাকাল ফারিসের দিকে।
অদ্ভুতভাবে ফারিসের মুখে কোনো রাগের বহিঃপ্রকাশ নেই। মুখশ্রী শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতর লুকিয়ে আছে এমন এক গম্ভীরতা, যা চারপাশের বাতাসকেও ভারী করে তুলছে। তার নীরব উপস্থিতিই যেন শব্দের চেয়েও বেশি ভয়ংকর।
কিছু না বলে সে পাশেই পড়ে থাকা একটি পুরোনো, ভাঙাচোরা চেয়ার টেনে আনল।
চেয়ারটার কাঠে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। বিভিন্ন জায়গায় রং উঠে গেছে, পায়ের অংশে জমে আছে ধুলো। এক কোণে ঝুলে থাকা মাকড়সার জাল বাতাসের হালকা স্পর্শে দুলে উঠছে। মনে হচ্ছে বহুদিন ধরে এই পরিত্যক্ত ঘরে কোনো মানুষের পদচারণা হয়নি।
ধীরে ধীরে চেয়ারটায় বসে পড়ল ফারিস।
ঘরের ছাদে ঝুলে থাকা একটি হলুদ, টিমটিমে বাল্ব অল্প আলো ছড়িয়ে রেখেছে চারদিকে। সেই আলো কখনো উজ্জ্বল হচ্ছে, কখনো ম্লান। আলো-ছায়ার খেলার মধ্যে ফারিসের মুখটা আরও কঠিন, আরও রহস্যময় দেখাচ্ছে।
গায়ে জড়ানো কোর্টটা সে আগেই গাড়িতে খুলে রেখেছে।
সাদা শার্টের হাতা ধীরস্থির ভঙ্গিতে কনুই পর্যন্ত গুটাতে গুটাতে কিছুক্ষণ নীরব রইল সে। সেই নীরবতাটুকুই যেন ছেলেটার জন্য সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে উঠছিল।
এরপর ভারী, গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
— “তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী… দু’জন এগারো বছরের শিশু… তাদের জীবনে যে ভয়াবহ ক্ষত তৈরি করা হয়েছে, তার হিসাব জানিস?” রাতের আধারে বাচ্চা গুলো চিৎকার, মেয়ে গুলোর আর্তনাদ বুক কাঁপায় নি তোর সু*য়*রের বাচ্চা..?”
তোর ওই বুড়ো বাপের ব্যবস্হা আমি করবো।দিনের পর দিন যা করেছিস তা সব কিছুর হিসাব আমি আজ নেবো।”
কথাগুলো শুনতেই ছেলেটার শরীর যেন মুহূর্তের মধ্যে শীতল হয়ে গেল।
মনে হলো, বুকের ভেতর জমে থাকা সব সাহস এক নিমিষে কোথাও হারিয়ে গেছে।
এক এক করে অতীতের সব ঘটনা তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল।
যেসব মুখ সে ভুলে যেতে চেয়েছিল…
যেসব কান্না সে কখনো গুরুত্ব দেয়নি…
যেসব আর্তনাদকে সে ক্ষমতার দম্ভে উপেক্ষা করেছিল…
সবকিছু যেন ফিরে এল একসঙ্গে।
মাথার ভেতর বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে লাগল।
তার চোখের গভীরে স্পষ্ট ভয় ফুটে উঠল।
কিন্তু সেটা কি শুধুই মৃত্যুভয়?
হয়তো না।
বরং সে অনুভব করতে শুরু করেছে, নিজের কর্মফলের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ভয় কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
এই মুহূর্তে তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
কীভাবে সে এখান থেকে বাঁচবে?
আসলে তাকে বাঁচাবে কে?
যে মানুষ নিজের জীবনে অন্যের কান্নাকে গুরুত্ব দেয়নি, অন্যের অসহায়তাকে দুর্বলতা ভেবেছে, সে আজ নিজেই অসহায় হয়ে বসে আছে।
আর সেই অসহায়তার অনুভূতি তাকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছে।
মনে হচ্ছিল, যেসব মায়ের বুক খালি হয়েছে, যেসব পরিবারের জীবন অন্ধকারে ডুবে গেছে, যেসব অভিশাপ আকাশে ভেসে বেড়িয়েছে—সব যেন আজ তার চারপাশে নীরবে উপস্থিত।
ভাবনাগুলোর ভারে তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।
শুধু আতঙ্ক আর অনুশোচনার ভার তাকে চেপে ধরছে।
অন্যদিকে ফারিস স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক ক্ষীণ, রহস্যময় হাসি।
হাসিটা আনন্দের ছিল না।
বিদ্রূপেরও ছিল না।
বরং এমন এক হাসি, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ আর বেদনা।
এরপর ফারিস আবারও বলল—
— “তোদের মতো কিছু মানুষরূপী অপরাধীর কারণেই আজ অসংখ্য মেয়ে রাতের অন্ধকারকে ভয় পায়। রাস্তায় বের হওয়ার আগে দশবার ভাবতে হয়। নিজেদের স্বপ্নের পেছনে দৌড়ানোর আগে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করতে হয়।”
তার কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে উঠল।
ঘরের নিস্তব্ধতার মধ্যে প্রতিটি শব্দ স্পষ্টভাবে প্রতিধ্বনিত হলো।
— “একটা অপরাধ শুধু একজন মানুষের ক্ষতি করে না। সেটা ভেঙে দেয় একটা পরিবারকে, নষ্ট করে দেয় একটা ভবিষ্যৎ, কেড়ে নেয় একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।”
ফারিসের চোখের গভীরে জমে থাকা আগুন যেন প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
বাইরে কোথাও বাতাসের শব্দ শোনা গেল।
ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আসা সেই বাতাস মাকড়সার জালগুলোকে হালকা দোল খাইয়ে দিল।
আর সেই নিস্তব্ধ, ধুলোভরা, টিমটিমে আলোয় ভরা ঘরের মধ্যে বসে ছেলেটা প্রথমবারের মতো অনুভব করল—
কিছু হিসাব আছে, যেগুলো থেকে মানুষ যত দূরেই পালাক না কেন, একদিন না একদিন তাকে সেই হিসাবের সামনে দাঁড়াতেই হয়।
— “জানিস? একটা মেয়ের সম্মান শুধু তার নিজের না। ওটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটা পরিবারের স্বপ্ন, একটা মায়ের হাজারো দোয়া, একটা বাবার বুকভরা গর্ব। আর তোরা কয়েক মিনিটের নোংরা লালসার জন্য সবকিছু ধ্বংস করে দিস।”
কথাগুলো বলার পর ঘরটায় আবার নেমে এলো গভীর নীরবতা।
পরিত্যক্ত বাড়িটার ভাঙাচোরা দেয়ালগুলো যেন সেই শব্দগুলোকে নিজেদের মধ্যে আটকে রাখল। বাইরে কোথাও হয়তো শুকনো পাতার উপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই ক্ষীণ শব্দটুকুও ঘরের ভেতরের ভারী পরিবেশকে ভেদ করতে পারছিল না।
হলুদ টিমটিমে বাল্বের আলো মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। আলো-ছায়ার সেই অদ্ভুত খেলায় ঘরটার প্রতিটি কোণ আরও বেশি রহস্যময়, আরও বেশি অস্বস্তিকর লাগছিল।
ছেলেটার বুক ধড়ফড় করে উঠল।
ফারিসের চোখের দিকে তাকিয়ে সে কোনো সাধারণ মানুষের দৃষ্টি দেখতে পেল না। সেখানে যেন জমাট বেঁধে আছে বহু বছরের ক্ষোভ, অসহায়ত্ব, ঘৃণা আর অসংখ্য মানুষের নীরব কান্নার প্রতিধ্বনি।
হঠাৎ ফারিস ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
তার দাঁড়িয়ে ওঠার ভঙ্গিটুকুই ছেলেটার বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিল।
মনে হচ্ছিল, সে কোনো মানুষের সামনে নয়, বরং নিজের কর্মফলের সামনে বসে আছে।
ফারিস কয়েক পা হেঁটে গিয়ে ভাঙা জানালার পাশে দাঁড়াল।
জানালার ফাঁক দিয়ে আসা ম্লান আলো তার মুখের অর্ধেকটা ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে। বাতাসে তার শার্টের হাতা সামান্য দুলে উঠছে।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে সে নিচু, ভারী কণ্ঠে বলল—
— “যখন ওই ছোট ছোট মেয়েগুলো কাঁদছিল, তখন কি একবারও তোদের হাত কাঁপেনি?”
তারপর আরেকটু থেমে বলল—
— “যখন ওরা বাঁচার জন্য মিনতি করছিল, তখন কি একবারও মনে হয়নি ওদেরও একটা পরিবার আছে?”
প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর ছিল না।
থাকার কথাও না।
ছেলেটা মাথা নিচু করে বসে রইল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ঠোঁট ফেটে আসছে। চোখের গভীরে স্পষ্ট আতঙ্ক জমে উঠেছে।
প্রথমবারের মতো হয়তো সে নিজের অপরাধগুলোর প্রকৃত ওজন অনুভব করতে শুরু করেছে।
আর ফারিস…
সে এখনও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।
দৃষ্টি স্থির দূরের অন্ধকারে।
কিন্তু তার ভেতরে যে আরও গভীর কোনো ঝড় বইছে, সেটা বোঝা যাচ্ছিল।
কারণ কিছু ক্ষত থাকে, যেগুলো সময়ও মুছে দিতে পারে না।
কিছু কান্না থাকে, যেগুলোর প্রতিধ্বনি বছরের পর বছর ধরে মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকে।
আর কিছু অন্যায় থাকে, যেগুলোর স্মৃতি মানুষকে বদলে দেয় চিরদিনের জন্য।
ঘরটার ভেতর আবারও নেমে এলো ভয়ংকর নীরবতা।
শুধু টিমটিমে বাল্বটা ধীরে ধীরে দুলছিল।
আর সেই আলো-ছায়ার খেলায় ফারিসের মুখটা ক্রমশ আরও কঠিন, আরও দুর্বোধ্য হয়ে উঠছিল।
হঠাৎ সে আবার কথা বলল।
কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক শীতলতা।
— “তোকে আমি ছেড়ে দিতাম, বিশ্বাস কর। কিন্তু আজ সারাদিনে তোর সম্পর্কে যা জেনেছি, তার পরে যদি তোকে ছেড়ে দিই, তাহলে যাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে তাদের প্রতিই অন্যায় করা হবে।”
কথাগুলো শুনে ছেলেটার বুকের ভেতরটা যেন হিম হয়ে গেল।
— “তোদের মতো মানুষদের জন্যই কত জীবন অন্ধকার হয়ে যায়। কত মানুষ সারাজীবন একটা দুঃস্বপ্ন বয়ে বেড়ায়।”
ছেলেটার মুখ শুকিয়ে এলো।
সে বুঝতে পারছে, অস্বীকার করে কোনো লাভ নেই।
সে করেনি—এ কথা বলার সাহসও তার নেই।
কারণ যে মানুষ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার অতীতের এত কিছু জেনে ফেলেছে, তার সামনে মিথ্যা বলে পার পাওয়া অসম্ভব।
গলা কেঁপে উঠল তার।
কান্নাভেজা, ভাঙা কণ্ঠে বলল—
— “ভাই… প্লিজ… এবারের মতো আমাকে ছেড়ে দিন। আমি কথা দিচ্ছি, আর কখনো কোনো মেয়ের দিকে খারাপ নজরে তাকাব না। আমি যা করেছি, তার জন্য সত্যিই অনুতপ্ত। দয়া করে আমাকে একটা সুযোগ দিন।”
কথাগুলো বলতে বলতেই তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো।
চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু।
ফারিস ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।
প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে ছেলেটার বুকের ধড়ফড়ানি আরও বেড়ে যাচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল, নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দই সে শুনতে পাচ্ছে।
ফারিস তার সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর ঠোঁটের কোণে এক টুকরো বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল—
— “এখন ক্ষমা চাইতে খুব সহজ লাগছে, তাই না?”
ছেলেটা মাথা নিচু করে কাঁপতে লাগল।
— “ভাই, আপনার পায়ে পড়ি… আমাকে ছেড়ে দিন। দরকার হলে আমি নিজে গিয়ে সবার কাছে ক্ষমা চাইব। আমি বদলে যাব। আমি আর কখনো এমন করব না।”
ফারিস আবারও হাসল।
কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা ছিল না।
ছিল তীব্র বিদ্রুপ।
এমন এক হাসি, যা মানুষের বুকের ভেতর অস্বস্তি ছড়িয়ে দেয়।
—” চল তোকে ছেড়ে দিবো, তার আগে পা ধরে ক্ষমা চেয়ে দেখা। তারপর আমি নিজে তোকে বাড়ি পৌঁছে দেবো মাদারবোর্ড।
সে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
চারপাশে আবার নেমে এলো সেই দমবন্ধ করা নীরবতা।
হলুদ আলোয় ধুলো উড়ছিল ধীরে ধীরে।
ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকে এক অদ্ভুত শীতলতা ছড়িয়ে দিচ্ছিল ঘরের ভেতর।
ছেলেটা অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল তার দিকে।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫২
হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নিজের অসহায়ত্বটা এই প্রথম এত গভীরভাবে অনুভব করল সে।
ঠিক তখনই ফারিস ধীরে ধীরে ঘরের একপাশে রাখা টেবিলটার দিকে তাকাল।
টেবিলটার উপর ধুলোর পুরু স্তর জমে আছে। বহুদিনের অবহেলার ছাপ স্পষ্ট সেখানে।
আর সেই মুহূর্তে ছেলেটার মনে হলো, সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে সে জানে না, কিন্তু এই রাত তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে ভয়ংকর রাত হয়ে থাকবে।
