ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৮
অনামিকা আহমেদ
ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। ইতোমধ্যেই মির্জা বাড়িতে ঈদ উৎযাপন এর তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। যে যতটুকু পারছে কাজে হাত লাগাচ্ছে, আর দাদি তার সূক্ষ্ম নিক্ষেপ করে সেই কাজের তদারকি করছে। তিনি বেজায় সচেতন মানুষ, চুল চেরা ক্রুটিও তার চোখে বড় আকার ধারণ করে। বিশেষ করে আমরিন কে বকতে বকতে তিনি নাজেহাল করে দিচ্ছেন। এতে তাকে একপাক্ষিক ভাবে দোষ দেওয়া যায় না, আমরিন ও কাজে ফাঁকি দেওয়ার তাল বাহানা করতে থাকে সবসময়।
ঘরের বাইরের করিডোর দিয়ে নিচে মানুষগুলোর হই হুল্লুর আর কাজ ভাগাভাগি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই রূপের। ইশতিহার এর কড়া নির্দেশে তার নিচে নামা বারণ। সে ইচ্ছা করেই দোতলার রুম বেছে নিয়েছে যেনো রূপ এসবের মধ্যে যেতে না পারে।
ইশতিহার আগেও রূপের ব্যাপারে অধিক সচেতন ছিল। গ্রামের কোনো ছেলের নজর যেনো রূপের ওপর না পরে সেজন্য সে আগে ভাগেই কতক বডিগার্ড পাঠিয়ে দিত, মির্জা বাড়ির আশেপাশে তখন একটা কাক পক্ষীও দাঁড়াতে পারত না। আশ্চর্যের ব্যাপার যে ইশতিহার এর এই নীরব ভালোবাসার কথা আজ পর্যন্ত রূপ জানতেও পারেনি। তবে এইবার হয়তো ভালোবাসাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, নয়তো একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মাথায় নিজের বউ এর পা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার চিন্তা কি করে আসল। হ্যাঁ, এইবার আর ইশতিহার কোনো রিস্ক নেয়নি, আসামি দের মতো রূপ কে মোটা শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে তারপর হাসপাতালে ডিউটি করতে গেছিল, শিকলের এক প্রান্ত রূপের পায়ে আরেক প্রান্ত বিছানার সাথে বাধা ছিল। টেনেটুনে কোনোমতে রূপ করিডোর পর্যন্ত যেতে পারলেও সিঁড়িতে পা রাখতে পারত না।
যেদিন রাতে ইশতিহার শিকল দিয়ে রূপের পা বেঁধেছিল সেদিন রূপ শুধু অবাক চোখে চেয়েছিল কিন্তু মুখ দিয়ে একটা টু শব্দ পর্যন্ত করতে পারেনি। কারণ ইশতিহার এর এই বিশ্বাস আর আস্থার জায়গাটা সে নিজেই ভেঙেছিল। ইশতিহার এর বারবার বারণ করা সত্ত্বেও রূপ নিজে যেচে বিপদে পড়েছে সেই সাথে তাদের অনাগত সন্তান কে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু তাই বলে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে পশুর মতো বেঁধে রাখবে?
আমরিন সেদিন মুখ ভেংচিয়ে গা জ্বালানো কত কথাই না শোনালো রূপ কে। গ্রামের মানুষকে ডেকে ডেকে বলল,
” পাগলামির ও একটা সীমা থাকে, কিন্তু এমন পাগলামি আমি কস্মিনকালেও দেখিনি। বউ কে শিকল পরিয়ে কিনা বর কাজে যায়? নিশ্চয়ই মেয়ের চরিত্রে সমস্যা আছে নয়তো বর এতটুকু বিশ্বাস করতে পারে না? পোয়াতি যেমন আমরা হইনি, পুরো সংসার সামলে তিন তিন খানা বংশধর এনেছি এই বাড়ির। ম*রে গেছি আমি নাকি পালিয়ে গেছি অন্য লোকের সাথে। যত্তসব আদিখ্যেতা।”
কথাগুলো রূপের কানেও আসে। গ্রামে তাদের নিয়ে চর্চা হচ্ছে ভীষণ। কিন্তু ইশতিহার এর এসব নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। তার যা করার সে সেটাই করবে তাতে কার কি হলো সেসব দেখার সময়
ইশতিহার এর নেই।
সেদিন রাতে রূপ রাগে অভিমানে ভাত না খেয়ে শুয়ে ছিল। বিছানায় ওপাশ ফিরে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে শুধু চোখের পানি ফেলছিল। হঠাৎ রুমে কারো পায়ের আওয়াজ শুনে রূপ তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে ঘুমের ভান করতে থাকে। কিন্তু রূপ তে জানে না এ ইশতিহার মির্জা। রূপের নাড়ি নক্ষত্র তার চেনা। রূপ কি করতে পারে আর কি না পারে সেসব কিছু তার কাছে পানির মতো পরিষ্কার।
” ঠিকমতো অভিনয় টাও করতে পারিস না। গাল ফুলিয়ে অভিমান করা আর আমার কথার অবাধ্য হওয়া ছাড়া আর কী পারিস সেটা আমাকে জানাস তো রূপ। আর নাটক করে ঘুমানোর ভান করতে হবে না। খাবার এনেছি, উঠে খেয়ে নে।”
ইশতিহার এর কথা শুনতেই রূপ চমকে উঠে। ইশতিহার এর দিকে ঘুরে একবার চোখাচোখি করে আবারও চোখ বুঝে রূপ বলে,
” দরদ দেখিয়ে খাবার এনেছেন কেনো? খাবার তো মানুষে খায়, আমি তো পশু, জানো*য়ার। আমি খাবো না নিয়ে যান।”
ইশতিহার এক মুহুর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। পরমুহুর্তেই গলাটা ভারী করে বলে উঠে,
” খাবি না?”
” না খাবো না।”
রূপের সোজাসাপ্টা উত্তর জানান দিচ্ছে রূপের অভিমান কমেছে। ইশতিহার চোখ নামিয়ে খাবারটা বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বলে,
” আচ্ছা খাস না। না খেতে চাইলে জোর করবো না। আমি খাবারটা আপাতত টেবিলের ওপর রাখছি, গোসল সেরে এসে রান্নাঘরে রেখে আসব।”
এই বলে ইশতিহার একটা ট্রাউজার আরেকটা টাওয়াল গলায় ঝুলিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায়। ইশতিহার চলে যেতেই রূপ খাবারের ওপর হামলে পড়ে। সেই কখন থেকে ক্ষুধায় কাতর সে কিন্তু ইশতিহার কে শিক্ষা দেওয়ার জন্য পেতে পাথর চেপে বসে ছিল সে।
খাবারগুলো গোগ্রাসে খেয়ে রূপ কোনো রকমে মুখ টা মুছে বিছানার ওপর হাত পা ছুঁড়ে শুয়ে পড়ে। পরম শান্তিতে তার চোখে ঘুম জেঁকে ধরতে বেশি সময় লাগে না। ইশতিহার গোসল সেরে টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে এসে দেখে রূপ খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। ইশতিহার এতে মুচকি হেসে প্লেট বাটিগুলো নিচে নিয়ে যায়।
ঈদের আর কয়েকদিন আছে মাত্র। তাই রাস্তায় ভীষণ রকমের জ্যাম। প্রায় একঘণ্টা ধরে ইশতিহার এর গাড়ি একই জায়গায় দাঁড়ানো। এভাবে বাড়ি ফিরতে গেলে জে কাল সকাল হয়ে যাবে ইশতিহার সেটা ভালই বুঝতে পারছে। তাই আর দেরি না করে ড্রাইভার কে গাড়িটা তাদের শহরের মেনশনের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যেতে বলে সে হাটা দেয় বাড়ির উদ্দেশ্যে।
গ্রামের পুরো বাড়িটা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে ইশতিহার এর নির্দেশে। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ ধরে বাড়ির প্রতিটা ক্যামেরা বন্ধ দেখাচ্ছে। প্রথমে এটা নেটওয়ার্কের সমস্যা ভেবে উড়িয়ে দিলেও এখন সেটা ইশতিহার এর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারেন্ট চলে গেলেও জেনারেটর এর ব্যবস্থা আছে। নিশ্চয়ই এখানে আমরিন এর হাত আছে, এটা ভেবেই ইশতিহার রাস্তার ফুটপাত ধরে জোর কদমে এগোতে থাকে।
বাড়ি পৌঁছলে ইশতিহার এক মুহুর্ত নিচে দাঁড়ায় না। সে হন্ত দন্ত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। সুলেখা বেশ কয়েকবার ইশতিহার কে ডাকে কিন্তু তার সাড়া দেওয়ার সময় নেই।
নিজের রুমে আসতেই ইশতিহার এর এক নিরবিচ্ছিন্ন অন্ধকারের সাথে সাক্ষাৎ হয়। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে কোনো মানুষের অস্তিত্ব না পেয়ে সে রুমের বাতি জ্বালালে রূপের অস্তিত্ব খুঁজে পায় না। রুমের শীতল অবস্থা দেখে বোঝাই যাচ্ছে অনেকক্ষণ এই রুমে কোনো মানুষের আনাগোনা হয়নি।
ইশতিহার চঞ্চল হাতে গায়ের এপ্রন আর স্টেথোস্কোপ টা বিছানার ওপর ছুঁড়ে মেরে রুমের চারপাশে রূপ তে খুঁজতে থাকে। এই সময় এক আননোন নম্বর থেকে ইশতিহার এর ফোনে কল আসে। না চাইতেও বিরক্তির সাথে সেটা রিসিভ করলে ওপাশ থেকে এক চেনা কন্ঠ ভেসে আসতে থাকে।
ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৭
” কি খুব কষ্ট হচ্ছে নিজের স্ত্রী কে খুঁজে না পেয়ে তাই না ইশতিহার? আমারও খুব কষ্ট হয়েছিল যখন শুনেছিলাম রূপ কে তুই বিয়ে করেছিস আর ওর গর্ভে তোর সন্তান বড় হচ্ছে। আজকে হিসাব বরাবর করবো ইশতিহার শুনে রাখ, আমি বেঁচে থাকতে তোর সন্তানকে আমি এই পৃথিবীর আলো দেখতে দিবো না। আর রূপ তে তুই কি করে খুঁজে পাশ আমিও সেটা দেখব।”
