Home ডার্কসাইড ডার্কসাইড পর্ব ২৫

ডার্কসাইড পর্ব ২৫

ডার্কসাইড পর্ব ২৫
জাবিন ফোরকান

কি উদ্দেশ্য এই জীবনের?কি অর্থ অমূলক বেঁচে থাকার?প্রতি পদে পদে হারাতে হারাতে ভাগ্য আজ নিঃস্ব।ক্রুর ভাগ্য হাসছে নিষ্ঠুরতার হাসি। দয়া নেই, মায়া নেই তার নিয়ন্ত্রণে। যন্ত্রণাকে কেন্দ্রীভূত করে যেন সাফল্যের ভরপুর উদঘাটন।হৃদয়ের বিষাদ পরিমাপের কোনো যন্ত্র বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়নি।যদি হয়ে থাকতো,তবে আজ কি যন্ত্রণা পরিমাপের মাপকাঠি ছাড়িয়ে যেতো?
কি অদ্ভুত এক মেলবন্ধন ভাগ্যের তাইনা?ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়েছে ১২ টা ২২। আজ ২১ শে সেপ্টেম্বর।একটি অশুভ দিন।রচিত হতে যাচ্ছে অপর এক বিষাদের উপাখ্যান।
কক্ষে এসে পৌঁছেছে চারুলতা এবং নিহাদ। বিলাল রেমানের বাহুডোরে মুখ গুঁজলো চারু,অপরদিকে নিহাদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো সম্মুখে।
ইউনূস রহমানের দূর্বল হাতখানা আঁকড়ে ধরে রেখেছে রোযা। অশ্রু তার চেহারা উপচে ভাসিয়েছে বক্ষ পর্যন্ত।একটি মাত্র বাক্যই সে বারংবার উচ্চারণ করে চলেছে,

– দাদু…প্লীজ, আমাকে ছেড়ে যেও না তুমি!আমি যে একদম একা হয়ে যাবো!
নাতনীর বিধ্বস্ত অবয়বপানে চেয়ে বাঁধ ভেঙেছে মৃ*ত্যুপথযাত্রীর অশ্রুর ধারাও।শীর্ণ হাতের আঙ্গুল তখনো আগলে নেয়ার চেষ্টায় নিজের আপন মানুষটিকে।রোযার কন্ঠে অনুভূতিরা সব দলা পাকিয়ে গিয়েছে।কান্নার দমক ব্যাতিত আর কিছুই নির্গত হচ্ছে না।যে মানুষটার জন্য তার জীবনে বেঁচে থাকা,যার কোলে বড়ো হওয়া,যার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে চলা….তার এই জগতে জীবিত থাকার একমাত্র কারণ আজ দূরে সরে যাচ্ছে।মেনে নেয়া সম্ভব কি?পিতা মাতা বিদায় নিয়েছে বোধবুদ্ধি সৃষ্টি হওয়ারও আগে, ভালোবাসার চাচাও হয়েছে পর।একমাত্র সম্বল দাদু,কিভাবে সম্ভব তাকে বিদায় দেয়া?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– চ…চড়ুই… কেঁদো না।
জীর্ণ হাতটি নিজের গালে চেপে ধরলো রোযা।ঝাপসা তার দৃষ্টি।থেকে থেকে কেঁপে উঠছে আবেগের তাড়নায়।
– দাদু…দোহাই লাগে তোমার! যেও না…
– যেতে যে হবেই চড়ুই।আমি ওপারের ডাক শুনতে পাচ্ছি।
– না! তোমাকে ছাড়া আমি কিভাবে বাঁচবো দাদু?
অন্তিম মুহূর্তেও মৃদু হাসার প্রচেষ্টা করলেন ইউনূস।অল্প একটু মাথা কাত করে তাকালেন পাশে মেঝেতে বসে থাকা আসমানের উদ্দেশ্যে।তার দৃষ্টি লক্ষ্য করে কাছে ঝুঁকে এলো সে।
– আমার…চড়ুইকে তোমার হাতে সোপর্দ করে দিয়ে গেলাম বাবা।মেয়েটা জীবনে কোনোদিন সুখ পায়নি।ওকে একটু দেখে রেখো।কখনো কষ্ট দিও না।
আসমান একদৃষ্টে চেয়ে থাকলো শুধু।তার দৃষ্টির সামান্য প্রজ্জ্বলন ছাড়া অভিব্যক্তিতে অধিক কোনো পরিবর্তন এলোনা।

– না দাদু, প্লীজ তুমি চুপ করো!তোমার কিছু হতে দেবো না আমি!এক্ষুনি তোমাকে হাসপাতালে…
ইউনূসের চোখ উল্টে এলো,কোটরের শেষ প্রান্তে গিয়ে ঠেকলো দৃষ্টি।দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টানলেন,ফুলে উঠলো বুক।
– ভালো থেকো আমার চড়ুই,সুখে থেকো…আমি ছিলাম, আছি, থাকবো তোমার পাশে… ছায়া হয়ে, প্রার্থনা করব তোমার সুখী জীবনের….
– তুমি…তুমি..
– আমাকে মাফ করে দিস বাবা,তোর কথা রাখতে পারলাম না।তোর চড়ুইকে একলা করে দিয়ে আমি তোর কাছে চলে আসছি… আসছিই বাবা….

ফিসফিসে কন্ঠস্বরজুড়ে আবর্তিত হলো শব্দগুচ্ছ।এক পিতার মরহুম ছেলের উদ্দেশ্যে আবেদন।আপনমনে বিড়বিড় করে দাদুকে কালেমা পড়তে খেয়াল করলো রোযা।অতঃপর….
আঁকড়ে ধরে রাখা হাতটি শিথিল হয়ে পড়ল, বুজে এলো চোখের পাতা।সেই বদ্ধ নয়ন বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে নামলো বালিশে।রোযার হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেলো।প্রশস্ত দৃষ্টিতে সে শুধু শূন্যতা নিয়ে তাকিয়ে থাকলো দৃশ্যপটে।
ছুটে এলো নার্স।রোযার হাত থেকে ইউনূসের হাত টেনে নিয়ে কব্জি পরীক্ষা করলো।স্পর্শ করলো ঘাড়ের স্পর্শকাতর অংশ।মুহূর্তেই কালো ছায়ায় আচ্ছাদিত হলো নার্সের মুখ,ছলছলে হয়ে পড়ল দৃষ্টি।বাড়ির কর্তা আসমানের দিকে তাকালো সে, ডানে বামে মাথা নাড়ালো।

– ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন…
রীতিমত ফিসফিস করে উচ্চারণ করলেন বিলাল।তাতে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ঝট করে ঘুরে তাকালো রোযা।না চাইতেও তার কন্ঠ চি*রে বেরিয়ে এলো আর্তচিৎকার।
– কি বলছেন বাবা?আমার দাদু বেঁচে আছে!দাদু!
নিথর দেহের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো রোযা।তার আর্তনাদে প্রকম্পিত হয়ে উঠলো সমগ্র স্থান।প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো প্রতিটি বিলাপধ্বনি।

– দাদু!ওঠো দাদু….তুমি এভাবে আমাকে ফেলে যেতে পারো না!আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে..আমিও আব্বুর কাছে যাবো,আম্মুর কাছে যাবো…আমাকে নিয়ে যাও প্লীজ!দাদু…ও দাদু!
নার্স রোযাকে স্পর্শ করলেও ঝটকা দিয়ে সে সরিয়ে দিলো তাকে।ক্রুব্ধ কন্ঠে জানালো,
– খবরদার বলছি আমাকে কেউ স্পর্শ করবে না!দাদু…ও দাদু ওঠো না!এই দেখো,আমাকে দেখো।তোমাকে ছাড়া আমি কি নিয়ে বাঁচবো? কার জন্য বাঁচবো?ফিরে আসো তুমি,ফিরে আসো তোমার চড়ুইয়ের কাছে।
রুমে উপস্থিত সকলেই তার এমন বিদ্ধস্ত অবস্থায় অন্তরে করুণ এক বিষাদ অনুভব করলো।তারা হয়ত জানে না এই একটামাত্র মানুষের জন্য রোযা নিজের জীবনকে নিয়ে জুয়াখেলায় মেতেছিল।আজ সেই মানুষটিই সকল জাগতিক বন্ধন ছিন্ন করে চলে গেলো তাকে একলা ফেলে।মানা সম্ভব তার পক্ষে কোনোদিন?

– দাদু!
বিলালের ইশারায় চারুলতা এগোলো।পিছন থেকে রোযার কাঁধে হাত রেখে তাকে সামলাতে চাইলো।কিন্তু আর্তনাদ কোনকিছুতেই আজ দমন হবার নয়।নিষ্ঠুর ভাগ্য আজ জীবনের সর্বশেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে।কিভাবে নিজেকে শান্ত করবে রোযা?
– একটু শান্ত হও আরিয়া…
– লিভ মি!
এক ধাক্কায় চারুকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিলো রোযা।অদ্ভুত আক্রোশ এবং বেদনা তার কোমল চেহারাজুড়ে।পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে আজ শান্ত করতে সক্ষম নয়।রুখতে সক্ষম নয় অনুভূতির জোয়ার।

– দাদু প্লীজ…ও দাদু…দেখো না একবার,আমি জানি তুমি ঠাট্টা করছো…একবার শুধু চোখ খোলো, দেখো আমাকে… নাহলে কিন্তু আমি খুব রাগ করবো!
উল্টো ঘুরল নিহাদ,চোখের পানি আড়াল করতে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।রোযার চুল এলোমেলো হয়ে পড়েছে,পোশাকের ওড়নাও মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।কোনো খেয়াল নেই তার।সে ব্যাস্ত নিজের দাদুর সঙ্গে।কেউ তার বিলাপ ঠেকাতে সক্ষম নয়।
অবশেষে উঠলো আসমান। ধীরপায়ে ঘুরে এলো বিছানার এপাশে।চারুলতা তাকে এগোতে দেখে সরে দাঁড়িয়ে জায়গা করে দিলো।মেঝে থেকে ওড়না তুলে রোযার গায়ে ছড়ালো আসমান।বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করলোনা রোযা।সে হারিয়েছে আপন জগতে।কান্নার দমকে দমকে তার সম্পূর্ণ চেহারা রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে।মাথাটা চক্কর দিচ্ছে।থেকে থেকে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।তবুও অবসান নেই এই যন্ত্রণার।

– দাদু…
ইউনূস রহমানের নিথর দেহের উপর ঝুঁকতে গেলে আসমানের বলিষ্ঠ হাত তাকে ঠেকালো।এক টানে সরিয়ে আনলো পিছনে।ফিরে চাইলো রোযা।হাঁপানি হচ্ছে তার, সম্পূর্ণ ধোঁয়াশা দৃষ্টিতে।আসমানের হাতের আঙ্গুলসমূহ ঠেকলো তার সিক্ত গালে।মুছে দিলো অশ্রুধারা।যদিও পরক্ষণেই তা পুনরায় ভিজলো নতুন বারিধারায়।আবেগের নিগূঢ়তা সহ্যসীমার বাইরে পৌঁছলো।ইন্দ্রিয় ক্ষমতা যেন দপ করেই নিভে গেলো। হেলে পড়তে গেলো রোযা একপাশে,কিন্তু তাকে আটকালো আসমানের বাঁধন।কি হলো,কেমন অনুভূত হলো রোযা বলতেও পারবেনা।হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো সে আসমানের কোমর,মুখ গুজলো।কান্নার দমক ম্রিয়মাণ গুঞ্জনে পরিণত হলো, অশ্রুফোটায় ভিজতে আরম্ভ করলো আসমানের পরিধানের ফতুয়ার অংশ। কোনোপ্রকার বাঁধা দিলোনা সে রোযাকে।আনমনে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলো তার মাথা, উপরে নিচে শান্তভাবে বুলিয়ে যেতে থাকলো সান্ত্বনার নীরব প্রবাহ।

তার দৃষ্টি আবদ্ধ হয়ে থাকলো বিছানায় শুয়ে থাকা প্রাণহীন বৃদ্ধের জীর্ণ মুখপানে।অদ্ভুত এক প্রশান্তি তার চোখেমুখে।তবুও তা পরিপূর্ণ নয়।নিজ আত্মাকে পরিতৃপ্ত হয়ত সেদিনই অনুভূত হবে যেদিন তার চড়ুই এই জগতে সুখের দেখা পাবে।
এই হারানোর বেদনা আসমানের জন্য নতুন নয়।

পুরান ঢাকার নিকটবর্তী এক গোরস্থান অঞ্চল।যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সারি সারি কবর।যাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা বাঁধাই করে বহু যত্নে রেখেছে আপনজনের শেষ ঠিকানাস্থলকে।যাদের সামর্থ্য কিংবা ইচ্ছা নেই, তাদের আপনজনেরা পরে রয়েছে অবহেলায়, মাটির নিচে। উঁচু নেই প্রান্ত,মিশেছে সমতল হয়ে ভূমির সাথে।এমনি শুকনো পাতা এবং কাঠের বেড়ায় আচ্ছাদিত দুই কবরের পাশে খো*ড়া সম্পন্ন হয়েছে তৃতীয় তিন হাত মাটির ঘরটি।নিজের ছেলে বউয়ের পাশে দাফ*ন হতে চান,এমনি অন্তিম ইচ্ছা ছিল ইউনূস রহমানের।
সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী পরিহিত অবস্থায় একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন বিলাল রেমান এবং নিহাদ।উভয়ের দৃষ্টিই কবরের দিকে।অপরদিকে অনেকটা দূরে একটি গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো রোযা।তার কাঁধে হাত রেখে যেন নিজের অস্তিত্বের সান্ত্বনা প্রদান করে চলেছে চারুলতা।যদিও তার নিজের হৃদয়েই ঘূর্ণিপাক উঠেছে।পুনরায় এমন দৃশ্যের মুখোমুখি সে।সেই মাটির তীব্র ঘ্রাণ,আগরবাতির ভূতুড়ে নির্যাস। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে বায়ুতে মিলিয়ে যাওয়া।সম্মিলিত তাকবীরধ্বনি।স্মৃতির পাতায় তাজা হয়ে উঠেছে এক বিষাদখচিত দৃশ্য। দাঁতে দাঁত পিষে নিজ অনুভূতি এবং অশ্রু উভয়েই নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে সে।

রোযার ঠিক বিপরীত প্রান্তের গাছের কাছে নিঃশব্দ দন্ডায়মান আসমান।পরিধানে তার ধবধবে শুভ্র ফতুয়া এবং প্যান্ট।চেহারা যথারীতি আচ্ছাদিত মাস্কের অন্তরালে।তবে আজ বর্ণ পাল্টেছে তা,ধারণ করেছে শুভ্রতা।নিগূঢ় দৃষ্টি তার আবদ্ধ রোযার অবয়বে।গতকাল সারারাত থেকে থেকে কাদতে থাকা মেয়েটি আজ সম্পূর্ণ নির্বিকার।যেন বাস্তবতা তাকে আঘা*ত করেছে চরমভাবে।অধিক শোকে পাথর অবস্থা।চেহারা ফুলে ফেঁপে উঠেছে,দৃষ্টি ধারণ করেছে টকটকে বর্ণ।উষ্কখুষ্ক এলোকেশ,চারুর কঠোরতায় খোঁপা বেঁধেছে।মাথায় ঘোমটা তুলে নির্বাক সে চেয়ে আছে, কবরের পানে।দৃষ্টিতে একঝাঁক শূন্যতা।এর পূর্বে ওই প্রাণোচ্ছল নয়নে এতটা হাহাকার লক্ষ্য করেনি আসমান।

অবশেষে যেন সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটলো।গোরস্থানের বাইরে এসে থামলো একটি অডি গাড়ি।দরজা খুলতেই ভেতর থেকে সাদা সুট পরিহিত লম্বা পাতলা এক ভদ্রলোক এবং সালোয়ার কামিজ পরিহিত এক রমণীকে লক্ষ্য করা গেলো। উভয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রবেশ করলো অভ্যন্তরে।রোযার দিকে তাকালো আসমান,কিন্তু বিশেষ কিছু প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেলোনা।
কবরের কাছে রাখা খাটিয়ার দিকে অগ্রসর হলো তারা। কারো কোনোপ্রকার অনুমতি ছাড়াই কাফনের কাপড় সরিয়ে মুখদর্শন করলো।ভদ্রলোকের চেহারা কিছুটা বিষাদপূর্ণ হলেও রমণীর মাঝে বিশেষ পরিবর্তন নেই।এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় চেহারা ঢেকে উঠে দাঁড়ালো ভদ্রলোক।কিছুটা দূরে থাকা রোযাকে উদ্দেশ্য করে দৃপ্ত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,

– আমার বাবা মা*রা গিয়েছেন গতকাল রাতে আর আমি জানলাম এখন? জানাজাটুকু পড়ার সুযোগ পেলাম না?
নিঃশব্দ রোযা।দৃষ্টিও অব্যক্ত।এগিয়ে গেলো সে।পরোয়া করলোনা কিছুর। খপ করে তার কাঁধ চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলো,
– শরীর বিকিয়ে দুটো টাকা ইনকাম করে নিজেকে কি মনে করে ফেলেছিস?আমার বাবার গুরুতর সংবাদ আমাকে না দেয়ার কি কারণ?
– এটা গোরস্থান।ভদ্রভাবে কথা বলুন মিস্টার আজাদ!
স্থির কন্ঠে বললো রোযা।রমণী এগোলো,হেসে জানালো,
– বাহ্ বাহ্,এখন নিজের চাচাকে নাম ধরে ডাকারও আস্পর্ধা করা হচ্ছে?
রোযা তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চাচাকে বললো,

– আপনাদের যে কবরস্থ করার আগে একবার মুখদর্শনের সুযোগ দিয়েছি এই বেশি।দাদুর আত্মা নিশ্চয়ই এটি সমর্থন করেন না।তবুও আমি কাজটি করেছি,হাজার হোক ছেলে তো তার!আর কথায় কথায় আমার বাবা,আমার অধিকার বলতে বিন্দুমাত্র লজ্জা হচ্ছে না?আমার জীবন থাকতে আমি আপনার মতন একটা কুলাঙ্গারকে কোনোদিনও আমার দাদুর জানাজায় অংশ নিয়ে তাকে অপবিত্র করতে দিতে পারতাম না!
– ইউ…
ক্ষীপ্র গতিতে এগোলো আজাদের হাত,উদ্দেশ্য রোযাকে আ*ঘাত করা।কিন্তু তার পূর্বেই শক্তিশালী বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে গেলো তার কব্জি,তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলো চারুলতা।

– আমি জীবনে প্রচুর বেহায়া নির্লজ্জ দেখেছি,কিন্তু আপনার মতন উন্নত পর্যায়ের গর্ধব বেয়াদব দেখিনি মিস্টার, যে নিজের বাবার মৃ*ত্যু নিয়েও ঝামেলা করে!
এক ঝটকায় আজাদের হাত সরিয়ে দিতেই নিজের কব্জি আঁকড়ে ধরলো সে ব্যথায়।স্ত্রী ক্রুব্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,

– বিহেভ ইওরসেল্ফ মিস!আপনি কোনো গুরুজনের সঙ্গে অসভ্যতামি করতে পারেন না ওকে?
– ওহ?গুরুজন তাহলে মর্জিমত যে কাউকে চড় দিতে পারে তাইনা?গুরুজন মাই ফুট!
– আপনি কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করছেন!
– দোহাই লাগে আপনার!আমার দাদুকে শান্তিতে জীবিত থাকতে দেননি যখন, অন্তত শান্তিতে যেতে দিন!
রোযার উত্তেজিত কন্ঠে সকলে ক্ষণিকের জন্য স্থবির হলো।মেয়েটির দৃষ্টি উপচে নামা অশ্রু একটু হলেও যেন নাড়লো হৃদয়কে। আজাদ গলা খাকারি দিয়ে শুধালো,

– তোর নাগরের অভাব নেই।এখন কি নাগরানি ধরেছিস?কি এক দিনকাল পড়লো পৃথিবীতে!
– যার যেমন রুচি!
ঘৃণায় মুখ বিকৃত করে উচ্চারণ করলো আজাদের স্ত্রী।
– আমার মনে হয় আপনার মেইন পয়েন্টে সমস্যা আছে।জীবনে এমন গাইবলদমার্কা কথা এর আগে আমি কোনোদিন শুনিনি।
– এই মেয়ে…তুমি কিন্তু…
আঙুল উঁচু করে কিছু বলতে যাচ্ছিল আজাদ।কিন্তু হঠাৎ ধ্বনিত হলো,
– আঙুল নিচে।
কন্ঠজুড়ে এক প্রগাঢ় শক্তি ছিল যার দরুণ আজাদ ভ্যাবাচেকা খেয়ে নিজের অজান্তেই আঙুল নামিয়ে নিলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো।পকেটে হাত ভরে সন্নিকটে দাঁড়ানো এক পর্বতসমান কাঠিন্যঘেরা অস্তিত্ব। আজাদের দৃষ্টি লক্ষ্য করে একটু ঝুঁকে পুনরায় বিড়বিড় করলো,

– আউট!
– হোয়াট?
– মৃ*তদেহ দেখতে এসেছেন,দেখেছেন। নাউ গেট আউট।
– আমার বাবা,আমার ভাতিজি,আমার পারিবারিক বিষয়,মাঝখানে আপনি বলার কে?
এক মুহুর্ত চেয়ে থাকলো আসমান।পরক্ষণে নির্বিকার কন্ঠে জানালো,
– আমার পরিবার,আমার বোন,আমার স্ত্রী!আমার স্ত্রীর ইচ্ছা আমার কর্তব্য…. সো গেট আউট অব হার সাইট বিফোর আই থ্রো ইউ আউট মাইসেলফ!
হতচকিত হয়ে একবার রোযা,আরেকবার আসমানের দিকে তাকালো আজাদ এবং তার স্ত্রী।

– ওহ,এই ব্যাপার?নাগর ধরেছ তাহলে?তাইতো বলি চিকিৎসার এত টাকা কিভাবে আসে?নিজেকে সত্যিই বিকিয়েছ?
চাচীর প্রশ্নের প্রতিবাদ ভিন্ন কাউকে করতে না দিয়ে রোযা এগোলো দৃপ্ত পদক্ষেপে।কঠোর কন্ঠে জানালো,
– আমার স্বামী,আমার স্বামীর টাকা,আমি খরচ করেছি আমার মর্জিমত।তাতে আপনার মতন এক বিষধর সংসার ভাঙা সাপের মাথাব্যথার কারণ দেখিনা।
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো যেন চাচী।

– যদি আজ শোকের দিন না হতো তোমাকে ঠাটিয়ে একটা চড় দিতাম!তুমি জানো আমার বাবা কে?তার কানে যদি একবারের জন্যও কথাটা ওঠে যে…
– নিজের বাবার দোহাই দিয়ে চলেছেন,স্বামীর নয়?তাকে নিয়ে গৌরব করার কিছু নেই বুঝি?থাকবে কিভাবে?কুলাঙ্গারকে নিয়ে গৌরবের কিছু থাকতে পারেনা।
– সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ কিন্তু!
– বাবাকে বলবেন আপনার?বলুন তবে।
– তুমি জানোনা আমি চাইলে তোমাকে দশবার কিনতে পারি!
– আমি চাইলে আপনার বাবার গোটা ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে কিনতে পারি।
শিউরে উঠে আসমানের দিকে চেয়ে থাকলো চাচী।

– এত অর্থের বড়াই অথচ শ্বশুরের চিকিৎসার জন্য দুটো পয়সা বের হলোনা।আরেন্ট ইউ ডিজিটাল বেগার?
বাকরুদ্ধ, জ্ঞানশূন্য আজাদ এবং তার স্ত্রী। আজাদের ঠিক পিছনে এসে থামলো নিহাদ, কাঁধে হাত দিয়ে জানালো,
– আপনাকে একটা সুপরামর্শ দেই?যদি নিজের মুখ রক্ষা করতে চান, দয়া করে বেরিয়ে যান।রাস্তা এখনো খোলা আছে,কতক্ষন থাকবে নিশ্চয়তা নেই।
না চাইতেও একটা ঢোক গিললো আজাদ।এক পলক শুধু তাকালো রোযা এবং আসমানের দিকে।তারপরই স্ত্রীর হাত ধরে টানতে টানতে জোরপূর্বক পাড়ি জমালো গোরস্থানের বাইরে।তাদের অডি কয়েক মুহূর্তেই আড়াল হলো দৃষ্টিসীমার।
কয়েক মুহূর্তের প্রগাঢ় নীরবতা।তারপর বিলাল রেমানের কন্ঠস্বর ধ্বনিত হলো।

– আজকের দিনে এমন করোনা।ছেলেরা কাছে এসো, লা*শ দাফন করতে হবে।
এগিয়ে গেলো আসমান এবং নিহাদ।দুইজন হুজুর এবং কয়েকজন কর্মী রয়েছে।কয়েক মিনিটের মাথায় তাকবীরধ্বনিতে পরিপূর্ণ হলো সমগ্র পরিবেশ। দূর থেকে অস্পষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো রোযা।নিজের দাদুর কাফনে মোড়ানো দেহ সমাহিত হতে দেখলো সম্পূর্ণ দৃষ্টি মেলে।

অতিবাহিত হয়েছে তিনদিন।
ভয়াল ২১ শে সেপ্টেম্বর পেরিয়ে ধরিত্রী আজ পদার্পণ করেছে ২৪ শে সেপ্টেম্বরে। রেমান পরিবারের ২১ শে সেপ্টেম্বর ঘিরে আয়োজিত মিলাদের ব্যাপারটি পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পরবর্তী মাসে।রোযার দাদুর মৃ*ত্যুর পর সকলেরই অন্তর বিষন্ন হয়ে রয়েছে।

নিজের ভিন্নজগতে বসবাস করছে রোযা।দাফনের সময় তাকে তুলনামূলক স্বাভাবিক মনে হলেও পরবর্তী মুহূর্তে বোঝা যায় সত্যিকারের মানসিক অবস্থা।তিনদিন যাবৎ সে নিজের রুম থেকে বের হয়নি।খাবারের ঠিকঠিকানা নেই।সকলের ব্যর্থতার পর স্বয়ং বিলাল রেমানের জোরাজুরিতে আধখানেক রুটি পাকস্থলীতে প্রবেশ করতে দিয়েছে সে।এটুকুই।আসমানের সম্পূর্ণ পেন্টহাউজ যেন হঠাৎ করেই অমানিশায় ছেয়েছে।কেউই হলরুমের পর্দা টেনে দেয়না আর।কিচেনে কাজ করতে দেখা যায়না কাউকে।নিহাদের সঙ্গে খুনসুটি কিংবা ঝগড়ায় মাতেনা কেউ। কাউচে বসে গল্পের বইয়ে মুখ ডুবানো সত্তা আজ নিজেকে করে রেখেছে চার দেয়ালের মাঝে বন্দী।সকলের মাঝে থেকেও যেন সে নেই।অস্তিত্বহীন এক সত্তা এই পৃথিবীর বুকে।

রাত প্রায় নয়টা। সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসলো আসমান।কেমন শূন্যতায় ঘেরা হলরুমটি তার পছন্দ হলোনা।ধীরপায়ে কিচেনে গেলো।ফ্রিজ খুলে নিজের জন্য একটা জুসের বোতল বের করতেই কি যেনো মনে হলো।কিছু সবজি আর চিকেন কিউব বের করে নিলো সাথে। দ্রুতহাতে ইন্ডাকশনে পাত্র চড়িয়ে ঢাললো পানি।উষ্ম হয়ে আসতেই কিউব, সবজি এবং পরিমাণমত মশলা দিয়ে স্যুপ তৈরী করতে সময় লাগলো প্রায় বিশ মিনিট।তার সঙ্গে দুটো পাউরুটি টোস্ট করে নিলো।ট্রে তে গুছিয়ে কেবিনেটে দুহাত রেখে একটা নিঃশ্বাস ফেললো সে।কি করছে সে?কেনো করছে?ধারণা নেই।

মস্তিষ্ক বিরোধিতা করার আগেই ট্রে নিয়ে এগিয়ে গেলো নিচতলার করিডোরে।মাঝখানের অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গার বাতি জ্বালিয়ে দরজার দিকে তাকালো। লক করা।ইতস্তত অনুভূতি চেপে মৃদু শব্দে করাঘাত করলো।কোনো উত্তর নেই।কয়েক মিনিট অপেক্ষার পর হাল ছেড়ে উল্টো ঘুরল।দরকার কি?ভাবলো হৃদয়।কিন্তু এমন অস্বস্তি কেন হচ্ছে?কি যেন ভাবলো আবার।পরক্ষণে দ্রুত এসে পিনকোড চাপলো। পেন্টহাউজের রুমগুলোয় জরুরী মুহূর্তে প্রবেশের জন্য পিনকোড সিস্টেম রয়েছে।রোযা যদি নিজের রুমের টা বদলে না থাকে তাহলে….

খুট করে খুলে গেলো দরজা।অবিলম্বে ভেতরে প্রবেশ করলো আসমান।
প্রথমেই ধাক্কা খেলো গুমোট আঁধারে। আবদ্ধতা পরিবেশজুড়ে।তবে এমন অনুভূতিতে অভ্যস্ত নিশাচর আসমানের দৃষ্টি মুহূর্তেই অসঙ্গতি ধরতে সক্ষম হলো। কাচের দেয়ালের জানালা খুলে দেয়া হয়েছে।হুহু করে ঢুকছে বাতাস।তার সামনে একটি টুলের উপর দাঁড়ানো মেয়েলী অবয়বটি।
রোযা!
পা বাড়িয়ে রেখেছে বাইরে,অবলীলায়। ঝাঁপ দেয়ার প্রস্তুতি।এগিয়ে যাচ্ছে সে,ভারসাম্য ছেড়ে দিয়েছে শরীর।
ট্রে ফেলে বিছানা টপকে ছুটলো আসমান।তড়িৎ গতিতে পাকড়াও করলো রোযার কোমর।শক্তিশালী টানে তাকে নিয়ে আছড়ে পড়লো মেঝেতে।ধস্তাধস্তি আরম্ভ হলো তৎক্ষণাৎ,

– ছে…ছেড়ে দাও আমাকে!যেতে দাও…আমি দাদুর কাছে যাবো!আমি আব্বু আম্মুর কাছে যাবো!
আসমানের হাত সজোরে আঘাত হানলো রোযার মুখের পাশের বেডসাইড টেবিল বরাবর।কম্পনে তরঙ্গ খেলে টেবিলের উপর থেকে ধপাস করে একটি কাঁচের ফুলদানি মেঝেতে ছিটকে পড়লো। কাচ ছিটকে উঠলেও কারো জখম হলোনা।শুধুমাত্র হতচকিত করে তুললো রোযাকে।বের করে আনলো তার আপন জগৎ হতে। ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ফেলতে ফেলতে আসমানের কৃষ্ণগহ্বরে দৃষ্টিপাত ঘটালো রোযা।কপোল সিক্ত হলো তার অশ্রুতে।

– আই ওয়ান্ট টু ডা*ই সো ব্যাড…প্লীজ লেট মি!
ভিক্ষা চাইলো সে, মৃ*ত্যুভিক্ষা।
– কি*ল মি…

ডার্কসাইড পর্ব ২৪

দ্বিতীয়বার অধর হতে শব্দদুটি নির্গত হওয়ার সাথে সাথেই ঘটলো ঘটনাটি।উঠে বসলো আসমান,রোযার হাত ধরে এক টানে আছড়ে ফেললো নিজের বিস্তৃত বক্ষমাঝে।উভয় বাহু শক্তিশালী উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলো তার অবাধ্য সত্তাকে।স্থির হয়ে থাকলো রোযা,সম্পূর্ণ স্থির।নিগূঢ় এক উষ্ণতার চাদর মুহূর্তেই আচ্ছাদিত করে নিলো তার সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে।
– বোকা মহিলা।
কর্ণগোচর হলো,আবেগে উদ্ভাসিত হলো বুক,সিক্ত হলো সমস্ত অন্তর হতে শরীরের রোমকূপ পর্যন্ত।

ডার্কসাইড পর্ব ২৬