তাকদিরে তুমি পর্ব ১৩
মোনালিসা মেহরোজ
আসিফ বেড়িয়ে যাওয়ার পর কেটে গেছে অনেকটা সময়। ফাতিহা পাথরের ন্যায় বসে ছিলো। বুকে খানিক অভিমান জমেছে পুরুষটির প্রতি। সে ধৈর্য ধরে আছে, তবে আর কতদিন? নাহ্, তার ধৈর্যের ইতি ঘটেনি। তবে মানুষটা কবে সঠিক পথে ফিরে আসবে সে ভাবনায় ব্যাকুল রমণী। আসিফ তার স্বামী। তাকে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও তার। ধৈর্য ধরে আস্তে আস্তে মানুষটার উপর নিজের প্রভাব ফেলাতে চাইলেও তা যেনো হচ্ছে না। ফাতিহার ভদ্রতা, ধৈর্য, আসিফের প্রতি তার অগাধ নমনীয়তায় পুরুষটি ঠিক হওয়ার বদলে দিগুণ বিগড়ে যাচ্ছে। সহজ থেকে সবটা করতে চেয়েছিলো ফাতিহা, এখনো সহজ’ই আছে। তবে পুরুষটি বোধহয় তার মর্ম দিতে রাজি নয়।
তবে ফাতিহা এটাও বুঝতে পারছে, সবটা আসিফের দোষ নয়। বরং আসিফের সুযোগ নিচ্ছে অন্য কেউ। ফাতিহার বিরুদ্ধে তাকে উস্কে দিচ্ছে কেউ। নইলে আসিফ যতই উগ্র হোক—যখন তখন সেই উগ্রতার প্রকাশ ঘটে না।
ফাতিহা ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বাগানে ফোঁটা নানান ধরনের সুগন্ধি ফুলের পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেলাতে লাগলো ছায়া নামক মেয়েটার সমীকরণ। ছায়া যে এসবের সাথে যুক্ত তা ফাতিহা হলপ করে বলতে পারে। তবে এরপর সে কি করবে সেই ভাবনায় মগ্ন হলো রমণী। কপালের ক্ষ*ত তেমনি আছে। র*ক্ত জমে গেছে সেথায়। তবে ফাতিহার মনোযোগ তার ক্ষ*ত আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হলো। সে ব্যস্ত হলো আসিফের ভাবনায়।
মাঝখানে আরো দু’টো দিন কেটে গেছে। সবকিছু খানিক স্বাভাবিক আছে। আসিফ-ফাতিহার দিন কাটে ঠিক আগের মতোই।
মির্জা বাড়ির ড্রয়িংরুমে আজ আবারও হালকা কোলাহল। সেন্টার টেবিলের উপর সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা ফাতিহার হাতের তৈরি সুস্বাদু পায়েস। শশুড় খেতে ভালোবাসে জানার পর ভিষন উৎফুল্ল হয়ে বানিয়েছে সে। আর এখন তা আযান মির্জার সামনে দিয়ে তীব্র আগ্রহ নিয়ে বসে আছে বাবা সমতুল্য মানুষটার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। এবাড়িতে আসার পর থেকে বাবা নামক মানুষটার অভাব খুব একটা অনুভব করেনি সে। আযান মির্জার মেয়ে নেই, তাই বোধহয় পুত্রবধূ রূপে বাড়িতে প্রবেশ করা রমণীটা তার কাছে ভিষন আদুরে!
সোফায় বসে আছেন সায়না মির্জা। তার বিপরীতে আযান মির্জা। কয়েক মুহূর্ত আগেই অফিস থেকে ফিরেছেন তিনি। আর ফিরেই সামনে পান পায়েসের বাটি। দু’জনের মাঝখানে বসে আছে ফাতিহা। আযান মির্জা অনেক্ক্ষণ যাবৎ এক দৃষ্টে পায়েসের পানে তাকিয়ে আছেন। তার মুখের ভাব বুঝে উঠতে পারছে না ফাতিহা। বুকটা দরুদরু করছে কেমন। আযান মির্জা সেই তখন থেকেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে পায়েসের দিকে তাকিয়ে আছেন। না হাতে তুলছেন না মুখে। না-তো ভালোমন্দ কোন কথা বের হচ্ছে তার মুখ দিয়ে। সায়না মির্জা স্বামীর মনের ভাব হয়তো বুঝলেন! তাই তো তার চোখে জল।
খনিকবাদে পায়েসের পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অতি যত্নে তা হাতে তুলে নিলেন আযান মির্জা। ফাতিহার বুকটা শুকিয়ে এলো৷ এই পর্যায়ে ফাতিহা লক্ষ করলো আযান মির্জার চোখজোড়া কেমন আনন্দে টইটম্বুর। বুকখানা ফুলে উঠেছে গর্বে। আযান মির্জা যখন চামচের সাহায্যে প্রথমবার পায়েসটা মুখে তুলে চোখ বুঁজলেন, তখন তিনি অনুভব করলেন—এ যেনো সাক্ষাৎ তার মায়ের হাতের স্নেহমাখানো অতি যত্নের তৈরি মিষ্টান্ন। ভিষন তৃপ্তি অনুভব করলেন তিনি। চোখবুঁজে একের পর এক চামচ দিয়ে মুখে পুড়লেন পায়েস। পাশেই সায়না মির্জা চোখে পানি নিয়ে তাকিয়ে আছেন স্বামীর পানে। আর ফাতিহার চোখ থমকে গেছে। অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলো নিজের মাঝে।
আযান মির্জার মা মা*রা গেছেন বহুবছর। তখন থেকেই পায়েস খুব একটা মুখে তোলেন না তিনি। মাঝেমধ্যে স্ত্রী রান্না করলেও খুব একটা আগ্রহ দেখান না। অথচ আজ যখন সায়না মির্জা জানালেন ফাতিহা ঠিক তার মায়ের মতো করে অতি মমতায় পায়েস রান্না করছে তার জন্য, তখন অদ্ভুত শীতলতায় স্তব্ধ হয়ে গেছিলেন আযান মির্জা। চুপচাপ বসে পরেছিলেন সোফায়। ফাতিহাকে তিনি বরাবরই মেয়ের মতো স্নেহ করেন। বিয়ের দীর্ঘ বারো বছরের মাথায় আসিফ জন্মায়। নানান চিকিৎসা, প্রতীক্ষার পর আসিফ পৃথিবীতে এলেও দ্বিতীয় সন্তানের মুখ তারা দেখতে পাননি। অথচ আযান মির্জার শখ ছিলো ফুটফুটে এক মেয়ের। তবে ভাগ্যে তা ছিলো না। হয়তো ফাতিহা আসবে বলে!
আযান মির্জা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সবটুকু পায়েস শেষ করে লম্বা শ্বাস ফেলেন। ফাতিহা দম খিঁচে ছিলো। তবে সে অনুভব করতে পারছে বেশ, এই পায়েস নিয়ে শশুড়ের মনে কোন অভিযোগ নেই। বরং তিনি তৃপ্তি অনুভব করেছেন। যা তার মুখে সুস্পষ্ট ফুটে উঠছে। তবুও মানুষটার মুখে একটুখানি প্রশংসা শোনার আশায় মুখিয়ে রইলো রমণী। আর ফাতিহার সকল অপেক্ষাতে জল ঠেলে আযান মির্জা ধপ করে উঠে দাঁড়ালেন। এবং ধপাধপ পা ফেলে চলে গেলেন নিজের ঘরে।
ফাতিহাসহ সায়না মির্জা সেদিকে তাকিয়ে রইলেন নিষ্প্রাণ চোখে। ফাতিহা বুঝে উঠতে পারলো না এর মানে। তবে সায়না মির্জা মৃদু হাসলেন। ফাতিহার মাথায় হাত বুলিয়ে অতি মমতার সহীত বলে উঠলেন—-
—একটু একা থাকতে দাও। পরে শুনে নিয়ো পায়েসের প্রশংসা।
সায়না মির্জার কথায় মৃদু হেসে মাথা নাড়লো ফাতিহা। টেবিলের উপর রাখা পায়েসের বাটিটার দিকে একবার তাকালো সে। তারপর আলতো হাতে আরেকটা ছোট কাঁচের বাটিতে পায়েস তুলে নিলো। উপর থেকে কিশমিশ আর কুচানো বাদাম ছড়িয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে নিলো। চামচটাও পাশে রেখে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো শাশুড়ির দিকে একপলক তাকিয়ে। নিচ থেকে সায়না মির্জা তাকিয়ে রইলেন পুত্রবধূর যাওয়ার পানে।
ফাতিহার কপালের চোট তিনি খেয়াল করেছিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে কিভাবে কে*টেছে তা ফাতিহা বলে নি। তবে সায়না মির্জা বেশ আন্দাজ করতে পারছেন এটা আসিফের’ই কাজ। তবুও মেয়েটার মনে কোন অভিযোগ নেই আসিফের প্রতি। বরং কি যত্নে স্বামীর জন্য পায়েস সাজিয়ে নিয়ে যাচ্ছে রমণী! সায়না মির্জার চোখজোড়া ভরে ওঠে অশ্রুতে।
ঘরের দরজাটা আধখোলা ছিল। ফাতিহা সামনে এসে দাঁড়িয়ে আস্তে করে ভেতরে উঁকি দিতেই দেখলো, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আসিফ। দুই হাত প্যান্টের পকেটে। দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে নিশ্চুপ। মুখে কোন অনুভূতির ছাপ নেই। ফাতিহা ধীরে ভেতরে ঢুকে দরজাটা টেনে দিলো।
—একটু সময় হবে?
কোনো উত্তর এলো না অপরপাশ থেকে। থমথমে নিস্তব্ধতা ভেদ করে ফাতিহা এগিয়ে এসে টেবিলের উপর বাটিটা রাখলো।
—আপনার জন্য পায়েস এনেছি।
আসিফ এবার মুখ ফিরিয়ে তাকালো। চোখ দুটো আগের মতোই নির্লিপ্ত তার। তবে কপালে সুক্ষ্ম ভাজ। সেই ঘটনার পরেও যে ফাতিহার ভেতরে কোন পরিবর্তন নেই তা বেশ অবাক করে দিয়েছে আসিফকে। তবুও তা সে প্রকাশ করতে পারলো না।
—নিয়ে যাও।
পায়েসের পানে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠলো
আসিফ। ফাতিহা ওড়নাটা আর একটু বাড়িয়ে
শান্ত গলায় বললো—
—একবার খেয়ে দেখুন।
—বলেছি না, নিয়ে যাও।
—অনেক যত্ন করে বানিয়েছি।
আসিফ বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকালো। মেয়েটা যে নাছোরবান্দা একগুঁয়ে তা সে বুঝতে পেরেছে। তবে সেও কম কিসে?
—তাতে আমার কি? আমি বানাতে বলেছিলাম?
ফাতিহা থমকালেও স্বর বদলালো না। বরং আগের মতোই অটল থেকে আওড়ালে—
—আব্বাজান খেয়েছেন। তাই ভাবলাম আপনাকেও একটু দিই….।
—আমি আব্বা নই।
কথাটা তীব্র শুষ্কভাবে বললো আসিফ। ধপধপ পা ফেলে ভেতরে এগিয়ে এলো। ফাতিহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার বললো—
—জানি। তবুও এক চামচ খেলে…
—তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারো না? কতবার বলতে হবে তোমায়? প্রথমবার বললাম তা কি শুনতে অসুবিধে হয়েছে? দ্বিতীয়বারও বলতে হবে ঘটা করে?
কর্কশ স্বরে বলে উঠলো আসিফ। ফাতিহা খানিক কেঁপে উঠলো। খানিকটা সময় গাঢ় নিরবতা বিরাজ করলো পুরো ঘরজুড়ে। ফাতিহা দীর্ঘশ্বাস ফেললো আসিফের উগ্রতায়।
—কিছু কিছু জিনিস আছে, যা প্রথথবার বলার পরেও দ্বিতীয়বারও বলতেই হয়। কারণ প্রথমবার মানুষ রাগ করে বলে, দ্বিতীয়বার অনেক ভেবে বলে।
আসিফ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।
—আমাকে শিক্ষা দিচ্ছো?
—না।
—তাহলে?
—আপনাকে শুধু খেতে বলছি।
—আমার খিদে নেই।
—এখন না থাকলেও পরে লাগতে পারে।
—লাগবে না।
—তবুও…
—ফাতিহা!
আসিফের গম্ভীর কণ্ঠে থেমে গেলো মেয়েটা।
কয়েক মুহূর্ত দু’জনেই নীরব রইলো৷ তারপর ফাতিহা খুব আস্তে করে বাটিটা টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখলো।দরজার দিকে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে আবার থামলো রমণী।পেছনে না তাকিয়েই শান্ত কণ্ঠে বললো—
—রেখে গেলাম। ইচ্ছে হলে খাবেন, না হলে খাবেন না।
—কি বোঝাতে চাইছো তুমি?
—তেমন কিছুই না।
ফাতিহার হেঁয়ালিতে দাঁতে দাঁত চাপলো আসিফ। চোখজোড়া তার জ্বলজ্বল করছে তীব্র রাগে।
—বিশ্বাস করো….।
আসিফ নিজের আঙুল তুললো ফাতিহার পানে। অতঃপর হিসহিসিয়ে বলে উঠলো—–
—তোমার ছায়া পর্যন্ত আমি নিতে পারিনা। বিরক্ত লাগে আমার। দম বন্ধ হয়ে আসে।
ফাতিহা কথা বললো না। শুধু নিস্প্রভ চোখে চেয়ে শুনলো স্বামীর অভিযোগগুলো। আসিফ নিজেকে সামলে ঘুড়ে দাঁড়ালো। গমগমে আওয়াজে আওড়ালো—–
—দূর হও আমার চোখের সামনে থেকে।
তৎক্ষনাৎ কোনরূপ প্রতিক্রিয়া দেখালো না রমণী। বরং স্তব্ধ হয়ে রইলো অনেক্ক্ষণ। আসিফ নিজেও একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। খানিকবাদে টানটান নিরবতা ভেদ করে ছু*রির ফলার ন্যায় ভেসে এলো ফাতিহার গলা—
—যাচ্ছি।
থেমে ফের যোগ করলো—-
—শুধু আজকের জন্য। হয়তো কালকেও এভাবে বেড়িয়ে যাবো। অথবা তার বেশি। তবে একদিন আপনি’ই আমাকে দেখার আশায় ছটফট করবেন। গুম*ড়ে মর*বেন একপলক দেখার জন্য। চাতক পাখির ন্যায় মুখিয়ে থাকবেন, আর আমি সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম।
কথাটা বলেই ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ফাতিহা। ঘরে একা পরে রইলো আসিফ।
আবারও নেমে এলো নীরবতা। আসিফ আশ্চর্য হলো ভিষন। ফাতিহার এহেন আত্মবিশ্বাসী কথাগুলো আসিফকে অদ্ভুতভাবে নাড়া দিলো। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলো যুবক। আসিফ বিরক্ত চোখে কয়েক সেকেন্ড বাটিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। পরক্ষণেই মুখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকালো। ফাতিহার বলা প্রতিটি কথা তার কানে বাজলেও নিজের জেদের কাছে হার মানলো না পুরুষটি। বরং মনে মনে বললো—
—ভুল তুমি। আমি আসিফ মির্জা আর যাই হোক, তোমায় দেখার আশায় ছটফট করতে পারিনা। কনফিডেন্স ভালো, বাট ওভার কনফিডেন্স ভালো নয় ফাতিহা নূর।
বাটিভর্তি পায়েস যেমন ছিল, তেমনই পড়ে রইলো টেবিলের উপর। সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো।এক ঘণ্টা পর আলমারি থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে নিলো আসিফ। ফোনটা পকেটে রেখে কোনো দিকে না তাকিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে কারও সঙ্গে কথা বললো না। বাইরের গেট খুলে গাড়িতে উঠে মুহূর্তের মধ্যেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
রাত তখন সাতটার কাছাকাছি। সদ্য’ই রাতের রান্না শেষ করে ঘরে ফিরেছে ফাতিহা। আসিফ সেই যে বেরুলো এখনো ফেরেনি। ফাতিহা নিজেও ব্যাস্ত ছিলো বিধায় ঘরে আসার আর সময় পায়নি। তবে ক্লান্তমুখে যখনি ঘরে প্রবেশ করলো তখনি সবার প্রথমে তার নজর গিয়ে আটকালো টেবিলের উপর। যেখানে তখন সে পায়েস রেখে গিয়েছিলো। বাটিটা ঠিক সেখানেই আছে। একফোঁটাও কমেনি পায়েস। চামচটাও যেভাবে রেখে গিয়েছিল, সেভাবেই পড়ে আছে।
দৃশ্যটা অবলোকন করে কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইলো ফাতিহা। তারপর ধীরে এগিয়ে গিয়ে বাটিটা হাতে তুলে নিলো। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া পায়েসের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে বিষাদের ছোঁয়াই বেশি ছিল। খুব আস্তে করে নিজের মনেই বললো—
—জেদটা আপনার সত্যিই অনেক বেশি, মিস্টার মির্জা। তবে আমার ধৈর্যের থেকে বেশি নয়।
দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করলো ফাতিহা। ধীর পায়ে রান্নাঘরে ফিরে গেলো ফের।
—ভাই! এভাবে ভাবির উপর রাগ করে বাহিরে বাহিরে থাকার মানে কি? ভাবির যে কষ্ট হয় তা তুই বুঝিস না?
বন্ধু স্বাধীনের কথার পাছে তীব্র বিরক্তি নিয়ে নজর ফেরালো আসিফ। দূরের রাস্তার ল্যামপোস্টের মৃদু আলোই আলোকিত ব্রিজ’টা। তার উপরেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আসিফের গাড়ি। নিচের টলটলে জলে আলোর প্রতিচ্ছবি এঁকেছে অদ্ভুত মোহনীয় এক দৃশ্য। আসিফ সেদিকপানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আওড়ালো—-
—কষ্ট? হাহ…।
স্বাধীন কথা বললো না আসিফের এহেন তাচ্ছিল্যতায়। আসিফ ধপ করে ব্রিজের ওপর বসে পরলো। পা দোলাতে দোলাতে দোলাতে তাকালো আকাশপানে। গলিত জোসনা ছুঁয়ে যাচ্ছে টলটলে জল। তাঁরা’র বসেছে মেলা। আসিফ চাঁদের পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিষ্প্রাণ গলায় আওড়ালো—–
—আমার জন্য কারো ভাবনা নেই। কেউ কষ্ট পায়না আমার জন্য। কেউ আমাকে নিয়ে ভাবেনাও। ভাবলে কি আর জোড় করে কোন সম্পর্কে থাকতে বাধ্য করতো?
—কিন্তু আঙ্কেল তো তোর ভালোর জন্যই…..।
—শাট আপ স্বাধীন! জাস্ট শাট আপ।
আসিফের গমগমে কন্ঠস্বরের পাছে থমকে দাঁড়িয়ে রইলো স্বাধীন। আর কোন কথা বলার মতো সুযোগ পেলো না যুবকটি। আসিফ সিগারেট ধরালো। ধোঁয়া ছাড়লো আকাশপানে। বাবা-মা’র প্রতি তীব্র অভিমানে বুকটা কেমন ভাড় হয়ে উঠেছে তার। আজ হুট করেই কেনো জানি মানুষ দুটোর জন্য বুকে যন্ত্রণা হচ্ছে। মনে হচ্ছে সব শেষ। তার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে তার জন্মদাতা-জন্মদাত্রী। ভালোর নামে যে আসিফ দিনে দিনে শেষ হচ্ছে সেই ভাবনা কি আছে তাদের? নেই তো, থাকলে কি আর জোড় করতো ফাতিহার সাথে থাকতে? আসিফ মনে মনে তাচ্ছিল্য হাসে। সিগারেটের টান দিয়ে চোখবুঁজে নেই।
নিরবতার মাঝে কাটে অনেকটা সময়। আসিফ নিশ্চুপ হয়ে আকাশ দেখছে। আর স্বাধীন ভাবছে অন্য কিছু। এরমধ্যেই স্বাধীন ঘড়িতে নজর বুলিয়ে নিলো। সময় একটার কাছাকাছি। অথচ আসিফের কোন হুশ নেই তা নিয়ে। স্বাধীন দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করে হাত রাখে আসিফের কাঁধে। আসিফ কথা বলে না।
—ফিরবি না? কত বাজে হিসেব আছে?
—ইচ্ছে নেই।
—তা বললে হবে বল? ফিরতে তো হবেই।
আসিফ কথা বাড়ায় না। চুপ করে ফের চোখবুঁজে নেয়।
অন্যদিকে আসিফের ফেরার অপেক্ষায় রাতজাগা পাখির ন্যায় বসে আছে ফাতিহা। চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করছে স্বামীর। অথচ তার কোন দেখা নেই। ফোন দিলে তা রিসিভ হচ্ছে না। উপায়ন্তর না পেয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করতে পারছে না ফাতিহা। আযান মির্জা ও সায়না মির্জা রাতের খাবার-দাবার শেষে নিজ ঘরে ফিরেছেন। আযান মির্জা এখনো জানেন না ছেলে তার ফেরেনি। নইলে আজ হয়তো আবারো লংকা কান্ড বেঁধে যেতো!
ফাতিহা সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে নিলো। আসিফের ভাবনার মাঝে নিজের পরিবারের কথাও আজ বড্ড মনে পরছে। ছোট্ট বোনটাকে ভিষন মিস করছো রমণী। ফোনে কথা বললেও যেনো মন ভরছে না। ছোট্ট শরীরটা স্পর্শ করার জন্য মনটা আকুপাকু করছে কেমন!
নাবা তার চেয়ে প্রায় এগারো বছরের ছোট। বুঝ হওয়ার পর থেকেই ছোট্ট বোনটাকে নিয়েই কেটেছে তার দীর্ঘ রাত। কোলে-পিঠে করে ভিষন যত্নে মানুষ করেছে তাকে। একটা রাতও নাবা তাকে ছাড়া থাকতে পারতো না। অথচ বিয়ের পর কতগুলো রাত নাবাকে ছাড়া কেটেছে তার। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে কাটিয়েছে সেই দিনগুলোর কথা মনে করে৷
ছোট্ট পরিবার নিয়ে বেশ খুশিই ছিলো সে। এরমধ্যেই হুট করেই অনাকাঙ্ক্ষিত এক বিয়ে—অতঃপর সবকিছু এলোমেলো। বাবা তার বিশাল বড় একখানা দ্বায়িত্ব পালন করতে এবাড়ি পাঠিয়েছে, যা ফাতিহা সানন্দে গ্রহন করেছে। আর সেই দ্বায়িত্ব পালন না করা অবদি ফাতিহার শান্তির ঘুম আর হবে না।
ফাতিহা ছোট একটা শ্বাস ফেললো। চোখজোড়া পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠেছে রমণীর। নারীর জীবনটা বড্ড কঠিন। ছোট্টবেলা থেকে যেখানে মানুষ হওয়া, যেখানে তার জন্ম, বেড়ে ওঠা—ক্ষণিকের মধ্যে তা ফেলে আসতে হয় অজানাতে। নতুন করে মানিয়ে নিতে হয়, সাজিয়ে নিতে হয়। আর তা না পারলেই ভাঙ্গন ধরে।
—তোমাদের খুব মনে পরছে, আম্মাজান।
ফাতিহার ঠোঁটজোড়া কেঁপে উঠল কথাখানা বলতে গিয়ে। নরম হাতে চোখমুছে লম্বা শ্বাস ফেলে কান্নাদের গিলে নিলো। অতঃপর মাথা তুলে তাকালো ঘড়ির দিকে। ঠোঁটজোড়াতে তার খানিক তাচ্ছিল্য ফুটে উঠলো।
তাকদিরে তুমি পর্ব ১২
—এভাবে আর কতরাত নির্ঘুম থাকবেন আপনি? না আপনি শান্তি পাচ্ছেন, না আমি। তবুও আপনার জেদ কমবার নয়।
ফাতিহা চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো।
—তবে আমিও দেখি শেষ পর্যন্ত কতদূর যেতে পারেন আপনি। শেষের মাথায় কিন্তু আমি’ই থাকবো, মিস্টার মির্জা।
