তাজমহল দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ১৮
প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
“আপনি নামবেন না তাই তো? সরি বলুন নয়তো তাড়াতাড়ি নামুন। কোনোটাই না করলে আমিই উপরে উঠে যাব।”
শাহিদা বেগম আনিসকে বললেন,”কি বলতে বলছে বলে দে নারে আনিস। জুমাবারে তোর এসব করতে ভালো লাগছে?”
তাসনুভা রাগে লাল হয়ে উঠেছে। আনিস বলল,”ওটা কি যেমন তেমন কথা আম্মা? দোষ করিনি সরি বলবো কেন? এক্সিডেন্টলি এরকম অনেক ব্যাপার স্যাপার ঘটে। সরি বলতাম। যদি সিনক্রিয়েট না করতো। ও যা করেছে তাতে সরি বলা জায়গাটুকু রাখেনি।”
তাসনুভা একদৃষ্টিতে তার দিকে ক্ষোভসমেত চেয়ে রয়েছে। শাহিদা বেগম তাসনুভার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,”আচ্ছা মা। আর রাগ করো না। ও দেখেনি।”
তাসনুভা বলল,”একশোবার দেখেছে। উনি ইচ্ছে করেই আমাকে ভিজিয়ে দিয়েছেন। আমাকে সরি না বললে এখান থেকে একপাও নড়বো না আমি। আপনি নামবেন নাকি আমি উপরে যাব আনিস ভাই?”
আনিস হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,”আচ্ছা তুমি উপরে আসো। আম্মা তুমিও চলে আসো।”
বলেই সে ভেতরে চলে গেল। তাসনুভা বলল,”আচ্ছা বেশ। আপনি ঘর থেকে বের হইয়েন। আপনাকে দেখে নেব আমি। কতক্ষণ ঘরের মধ্যে বসে থাকবেন। দেখে নেব।”
বলেই হনহনিয়ে সে তাদের বাড়ির দিকে চলে যেতে লাগলো। তৌসিফ পথ আটকে তার সামনে মাইক্রোফোন ধরার ভঙ্গি করে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ম্যাডাম আপনি এভাবে হার মেনে নিয়েছেন? খেলা তো জমে উঠেছিল। আরেকটু খেলতে পারতেন। আনিস ভাইকে না নামানো অব্দি আপনি আন্দোলন করতে পারতেন। সিদ্দিক বাড়ির রাস্তা অবরোধ করতে পারতেন। এভাবে হাল ছেড়ে দিলেন?”
তৌসিফ প্রশ্ন করছে আর তিতলি তা ভিডিও করছে। আশেপাশের সবাই তাদের দুষ্টুমিতে হাসছে। তাসনুভা আবারও শাইনাদের বাড়ির দোতলার বারান্দায় তাকাতেই দেখলো আনিস এসে দাঁড়িয়েছে আবারও। তৌসিফের কথা শুনে কেমন করে যেন হাসছেও যা সহজেই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু তাসনুভা স্পষ্ট বুঝতে পারছে উনি হাসছেন। তাসনুভা রাগে লাল হয়ে এবার বিকট শব্দে গর্জে উঠলো,
“ভাইয়া! তিতলি!”
তিতলিকে বগলদাবা করে তৌসিফ ছুটলো এমনকি আশেপাশের পাড়াপড়শিরাও। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বললেন,”এত মাথা গরম করলে চলে না মা। ও তো বলছে দেখেনি।”
তাসনুভা বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগলো। রওশনআরা বলল,”একটাকে কোনোমতে লন্ডনে পাঠিয়েছি। আরেকটা আছে বাড়ি মাথায় তোলার জন্য। নাকের ডগায় রাগ নিয়ে ঘুরতে হবে সারাক্ষণ।”
তাসনুভা ঘরে চলে যেতে যেতে জোহরা বেগমকে বলল,”ভাইয়ে কোথায়? আমি ওকে আর তিতলিকে কিছুতেই ছাড়ব না।”
জোহরা বেগম অবাক কণ্ঠে বললেন,”ও আবার কি করেছে?”
তাসনুভা থামলো। জোহরা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,”ভিডিও করছিল আমাকে। আমি হাতের কাছে পেলে মেরেই ফেলবো।”
“কেমন অলক্ষুণে কথা নুভা!”
“একশোবার বলবো। তিতলি? কোথায় তুমি? বেরিয়ে আসো। তোমাকে একটা চড় মারবো।”
ঝিমলি হাসতে হাসতে বলল,”আনিস ভাই কাজটা ঠিক করেনি আমার ননদিনীকে রাগিয়ে দিয়ে। এর মাশুল দিতেই হবে।”
তাসনুভা ঘরের দরজা বন্ধ করলো শব্দ করে। বলল,”উনাকে আমি ঠান্ডা পানিতে চুবিয়ে না মারলে আমার নাম তাসনুভা সিদ্দিকী নয়।”
ঝিমলি হাসছে। জোহরা বেগম তৌসিফকে ডাকতে লাগলেন।
“তৌসিফ? নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে। কোথায় তুই?”
তিনি তৌসিফকে ডাকতে ডাকতে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
আনিস নামাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে নিল। শাইনা তার ঘরে এসে ফিরনির বাটিটা টেবিলের উপর রাখলো। জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় বাড়ির ছেলেরা মিষ্টি জাতীয় কিছু মুখে দেয়। আনিস গায়ে খুশবু মেখে শাইনার দিকে তাকালো।
“কিছু বলবি?”
“আম্মা ফিরনির বাটিটা নর্মালে রেখেছে। ঠান্ডা হয়ে আছে। এখান থেকে শুধু দু-চামচ খেতে বলেছে। তোমার গলা ব্যাথা বাড়বে।”
ফিরনির বাটিটা হাতে তুলে নিয়ে আনিস গুণে গুণে শুধু দুচামচ খেল। তারপর শাইনার দিকে চেয়ে বলল,”আর দু-চামচ খাচ্ছি।”
শাইনা হেসে ফেললো।
“শুধু দু-চামচ। আম্মা আমাকে বকবে।”
আনিস আর দু-‘চামচ খেল। ফিরনিটা ঠান্ডা হওয়ায় বেশি মজা লাগছে। তারপর বাটিটা শাইনার হাতে দিয়ে কলার ঠিক করতে করতে বলল,
“উঠোনে তোর ননদ আছে কিনা দেখতো।”
শাইনা তার কথা শুনে হেসে ফেললো।
“কিছু করবে না।”
“পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। পাঞ্জাবি ভিজে গেলে নামাজে যেতে পারব না। দেখ একটু।”
শাইনা বারান্দায় গেল। তাসনুভা ড্রেস পাল্টে আবারও রোদে এসে দাঁড়িয়েছে বুকে হাত ভাঁজ করে। মাথায় কাপড় তোলা। এলাকার সব মসজিদগুলোতে খুতবা পাঠ হচ্ছে।
শাইনা আবারও ঘরে এল। আনিসকে বলল,
“ভাইয়া এমনি রোদে দাঁড়িয়েছে। কিছু করবে না। তুমি দুলাভাইয়ের সাথে যাও। নামাজে যাচ্ছ ওটা জানে। পানি ছুঁড়বে না।”
আনিস পকেটে পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে বের হলো। বলল,”মেয়েটার মাথা খারাপ। বিশ্বাস নেই। জামিল ভাই?”
শাইনার দুলাভাই সাড়া দিল।
“হ্যাঁ, যাচ্ছি। আপনি নামেন। আপনাকে দরকার।”
বলতে বলতে তারা শব্দ করে হেসে উঠলো একসাথে। আশরাফ আর আফসার সাহেবও তাদের সাথে ছিল। আনিস তাই তাদের পেছনে যেতে যেতে আর কিছু বললো না। তাসনুভা সরে দাঁড়িয়েছে ওই বাড়ি থেকে সবাইকে বের হতে দেখে।
আনিস সবার পেছন পেছন চলে গেল। তাসনুভা সেদিকে ফিরেও তাকালো না। তৌসিফ তাদের পেছন পেছন বের হলো রায়হান, তাজউদ্দীন আর তৈয়বউদ্দীন সিদ্দিকীর সাথে। তাসনুভাকে দেখামাত্রই তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বলল,
“এত রোদের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকলে মাথা ঘোরাবে আম্মু।”
“আমার মাথা এত সহজে ঘোরায় না।”
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী হেসে ফেললেন।
“এখনো দেখছি রেগে আছে মেয়েটা।”
তাসনুভা তৌসিফকে বলল,”তোমার বিচার পরে হবে।”
তৌসিফ হেসে ফেলে বলল,”আমার সাথে ঝগড়া করতে এলে আমি ভিডিওটা মেঝ ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দেব।”
তাসনুভা ঝাঁজালো কণ্ঠে বলল,”আমি তোমাকে..
তৌসিফ তাকে পুরোটা বলতে না দিয়ে বলল,”মসজিদ থেকে তওবা করে ফিরি। তারপর মারিস।”
তাসনুভার রাগ কমেনি। প্রতিশোধ সে নেবেই। কিন্তু এমনভাবে নেবে যাতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে। তার গায়ে গরম পানি ছোঁড়ার স্পর্ধা উনি দেখায় কি করে? আনিস মসজিদ থেকে আসার সময়ও উঠোনে পা রেখেছিল আতঙ্কের সাথে। মেয়েটা কোন সময় পানি নিয়ে অ্যাটাক করে বসে কে জানে। এইরকম মেয়ে সে জীবনে দেখেনি। গোটা বাড়ির মানুষ একজায়গায় করে ফেলেছে চেঁচামেচি করে।
তৌসিফ তাসনুভার চেঁচামেচির ভিডিওটা তাজদারকে দিয়েছে। তাজদার রিপ্লাই করেছে,”কেস তো সিরিয়াস।”
তৌসিফ বলল,”আনিস ভাইকে পুরা বেইজ্জতি করে ছেড়েছে। তোমাকে বলছি এই মেয়েকে বিয়ের ভয় দেখাও। ওর এখন শ্বশুরবাড়ি গিয়ে বরের সাথে ঝগড়া করার বয়স। করছে পাশের বাসার চাচাতো ভাইয়ের সাথে। এগুলো মানা যায় না।”
তাজদার মেসেজ সিন করলো। কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই করলো,”ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে। যাইহোক তিতলি আর শাইনার ইনকোর্স পরীক্ষা কাল। দুজনকেই গাড়িতে করে নিয়ে যাবি। তুইও যাবি নয়তো শাওনকে যেতে বলবি। একা পাঠাবি না। আর খাবার কিনে নিবি যাওয়ার পথে।
“ওকে।”
পরদিন শাইনার ইনকোর্স পরীক্ষা ছিল। তিতলির সাবজেক্ট একাউন্টিং, শাইনার ম্যানেজমেন্ট। শাইনার প্রস্তুতি যতটা খারাপ। তিতলির প্রস্তুতি তারচেয়েও বেশি। তবুও পরীক্ষা দিতে যেতে হবে। প্রস্তুতি ছাড়া পরীক্ষা দিতে যায় নির্লজ্জরা। তিতলিও নির্লজ্জ।
শাইনার উপর দিয়ে রীতিমতো ঝড় গেল। সে মনে মনে সেইসব মেয়েদের প্রশংসা করছিল পরীক্ষার হলে বসে বসে যাদের সংসারের সমস্ত কাজ করে, তারপর পরীক্ষা দিতে আসতে হয়। পরীক্ষার পর তার শরীর এতটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল সে আশেপাশের কিছু খেয়ালও করেনি। গাড়িতে এসে প্রায় অজ্ঞানের মতো মাথা এলিয়ে দিয়ে বসেছিল। তিতলি জোর করলো কিছু খেতে কিন্তু সে খেল না। বাড়ি এসে গোসল করে সোজা বিছানায়। আর কোনোদিকে তাকানোর জোঁ নেই। তার দুই বোন তাকে দেখতে এসেছিল।
সবার সাথে তাদের আলাপ জমে উঠেছিল তখনো শাইনা ঘুমিয়ে। কেউ তাকে ডাকেনি। যখন ঘুম ভাঙলো তখন এতটা ক্লান্ত লাগছিল যে তার ইচ্ছে করছিল বসে বসে কাঁদতে। চোখে জল চলে এসেছিল। কিন্তু কেউ দেখার আগেই মুছে নিয়েছিল। মনে মনে পণ করলো সে আর জীবনেও বাচ্চা নেবে না। জীবনেও না।
সাড়ে সাতটা নাগাদ তাজদার ফোন করেছে। বাড়ির সবার সাথে কথা বলে যখন ফোনটা শাইনার কাছে গেল তখন সে কথা বলতে চাইছে না। তিতলিকে বলল,”রাতে বলবো। এখন না। বলো দশটার দিকে আমি ফোন দেব।”
তিতলি বলল,”ভাইয়া বলছে কথা বলতে হবে না। নাও। বেশি খারাপ লাগছে তোমার?”
“না, না। আমি পরে কথা বলবো। ফোন রেখে দাও।”
তিতলি ফোন রেখে দিল। শাইনা হালকা নাশতা খেয়ে আরেকটু ঘুমিয়ে নিল। আড্ডায় বসলো না। যখন ঘুম ভাঙলো তখন রাত দশটা। রওশনআরা এসে বললেন,”ভাত খাবে না?”
শাইনা দুপাশে মাথা নাড়লো।
“দুটো করে খাও। একেবারে না খেলে কিভাবে হবে?”
তিনি জোরাজোরি করলেন। শাইনার লজ্জা লাগছে। কিন্তু তবুও সে মানা করে দিল। তিতলি বাসন নিয়ে তার ঘরে চলে এল তন্মধ্যে। হাসিমুখে বলল,”শাইনা শাইনা আমি ফিশ ফ্রাই করেছি। তেলাপিয়া মাছের। দেখো দেখো কত্তবড়। ভাত খেতে হবে না বস। এই মাছটা খাও। খুব মজা হয়েছে। ভাইয়ে চেটেপুটে খেয়ে আবার আমারটাতে ভাগ বসিয়ে দিয়েছে। ওর দুটো মাইর বাকি আছে। নাও।”
রওশনআরা বলল,”এসবে পেট ভরে? আজব!”
তিনি বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন। তিতলি প্লেটটা শাইনার সামনে ধরলো। সালাদ আর মাছটা প্লেট ভর্তি করে ফেলেছে। পাশে তিন রকমের সসও আছে। শাইনা কাটা চামচ দিয়ে মাছ তুলে নিয়ে মুখে পুরলো। ঝাল ঝাল ফিশফ্রাই। জিভে লাগছে বেশ। শাইনা খুব তৃপ্তি নিয়ে খেতে খেতে তিতলির দিকে তাকালো। তিতলি হাসলো।
“মজা?”
“খুব। কিভাবে করেছ।”
“হি হি ভাইয়ার বুদ্ধি।”
শাইনা অবাক হয়ে বলল,”কিভাবে?”
তিতলি সবটা খুলে বললো।
“ভাইয়া বলেছে তোমার মুড ভালো হয় পছন্দের কিছু খাবার-দাবার খেলে। তারপর বলল ফ্রিজে মাছ থাকলে ঝাল ঝাল করে ফ্রাই করে দাও। কাল ভাইয়ে বাজার থেকে টাটকা মাছ এনেছিল। ব্যস!”
“থ্যাংকস তোমাকে দেব নাকি তোমার ভাইয়াকে?”
“তোমার বাচ্চার বাপকে। আমি যাই। ভাইয়েকে দুটো গদাম গদাম মেরে আসি। রাক্ষসটা আমার মাছের একটা পিঠ সাবাড় করে দিয়েছে। ভাইয়ে বের হও। পঞ্চাশ টাকা ছাড়ো। নইলে তোমার বিয়ে হবে না গাধা।”
চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে গেল তিতলি।
খাওয়াদাওয়ার পর শাইনার মনমেজাজ সত্যি সত্যি ভালো হয়ে গিয়েছে। তাজদার সিদ্দিকীকে ফোন করতে গিয়ে তার ভয়ও হলো। আবার রেগে বোম হয়ে আছে নাকি?
সে ফোন দেওয়ামাত্রই তাজদার সিদ্দিকী রিসিভ করলো। শাইনা স্ট্যান্ডে ফোনটা রেখে পিঠের নিচে বালিশ দিয়ে শুয়ে পড়লো। তাজদার সিদ্দিকী তাকালো ক্যামেরার দিকে ভালো করে। শাইনাও চেয়ে আছে। কোনো কথা বললো না সে তাজদার সিদ্দিকীর মেজাজ বোঝার জন্য।
তাজদার তার সাড়াশব্দ না পেয়ে কিছুক্ষণ পর বলল,”হাই!”
শাইনা বিড়বিড়িয়ে বলল মেজাজ তো দেখছি ফুরফুরে। তাকে বিড়বিড় করতে দেখে তাজদার আরও ভালো করে ক্যামেরার দিকে চেয়ে বলল,
“গালি দিচ্ছ?”
শাইনা হালকা হাসলো।
“আপনি আমার মুখে কখনো গালি শুনেছেন?”
“শুনিনি। তবে মেসেজে দিয়েছিলে বিয়ের শুরুতে।”
এই এক কথা বলে তাকে হাজারবার লজ্জা দিয়েছে তাজদার সিদ্দিকী। তবুও একই কথা বলে যায়। শাইনা এবার চুপ করে রইলো। কিছুক্ষণ পর বলল,”থ্যাংকস!”
তাজদারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“কেন?”
সে আইরন টেবিলে কাপড়চোপড় আইরন করাচ্ছে। তারমধ্যেই কথাবার্তা বলছে। শাইনা বলল,”তিতলির কাছ থেকে জেনে নেবেন।”
তাজদার গম্ভীরমুখে বলল,”বুঝেছি। কিন্তু তোমার একটা স্বভাব ভীষণ খারাপ। তোমার টেস্ট চেঞ্জ হয়েছে। তোমার উচিত কোনটা খেতে ইচ্ছে করছে সেটা নিজে বানিয়ে খাওয়া নয়তো অন্য কাউকে বলা। একেবারে না খেয়ে থাকাটা কেমন?”
“কাউকে কাজ করতে বলতে লজ্জা লাগে আমার। আমি নিজের কাজ নিজেই করতে পারছি না এখন। আপনি থাকলে অবশ্য আপনাকে বলতাম।”
কথাটা বলেই সে হালকা হাসলো।
“তুমি মেয়ে ভালো নও।”
শাইনা অকপটে বলল,
“সেজন্যই আপনাকে বিয়ে করেছি।”
তাজদার সিদ্দিকী গোমড়ামুখে বলল,”মানে?”
“কিছু না।”
তাজদার সিদ্দিকী আঙুল তুললো,
“এই মেয়ে তুমি কিছু একটা বলতে চেয়েছ।”
শাইনা বলল,”মানে ভালো হলে আপনাকে বিয়ে করতাম না এটাই।”
তাজদার সিদ্দিকী ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,”ভালো বলেছ। তাজদার সিদ্দিকী তার মতোই কাউকে ডিজার্ভ করতো। পেয়েছেও।”
শাইনা জিভ দেখিয়ে বলল,”ভ্যাঁ ভ্যাঁ।”
তাজদার সশব্দে হেসে ফেললো। বলল,
“তোমার খুশি হওয়ার কথা আমার মতো বর পেয়ে। তোমার মা বাবা টাকলা, ভুঁড়িওয়ালা চাচাদের ধরিয়ে দিত। তুমিও নাচতে নাচতে বিয়ে করে নিতে।”
শাইনা বলল,”মোটেও না।”
“কথায় পারছো না। বিয়ের আজ কত মাস হয়ে গেল। তোমার এখনো মনে হচ্ছে না আমাকে পেয়ে তুমি ধন্য। ভীষণ ভালো।”
“আমি ধন্য সেটা আমার চেহারায় বোঝা যাচ্ছে। আপনারা চেহারা দেখে মনে হচ্ছে বউ বাচ্চা হারিয়ে পথে বসেছেন। শরীর খারাপ নাকি?”
তাজদার সিদ্দিকী এবার ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়ালো। অবাককণ্ঠে বলল,”এতদিন ধন্য হইনি। আজ ধন্য হলাম। তুমি আমার চেহারা দেখে অন্তত বুঝেছ আমি সিক।”
শাইনা কপাল কুঁচকে বলল,”মেডিসিন নেননি?”
“নিয়েছি। কিন্তু বউয়ের সেবাশুশ্রূষা না পেয়েই এই রোগ হয়েছে। শত মেডিসিন নিলেও কাজ হবে না।”
শাইনা অতকিছু না ভেবেই বলল,”মেডিসিন নিন। তারপরও না কমলে দেশে চলে আসেন।”
তাজদার সিদ্দিকীর চোয়াল ঝুলে পড়ার মতো অবস্থা। শাইনা মমতাজ বলছে এই কথা?
সে বলল,”বিয়ের এই এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কথাগুলো তুমি আজ বলেছ। দারুণ উন্নতি হয়েছে। সাবাশ সাবাশ।’
শাইনা খোঁচা মেরে বলল,”বিয়ের এক বছরের মধ্যেই বাচ্চার বাবা হয়ে যাচ্ছেন। সাবাশ সাবাশ ঠু।”
তাজদার মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,”তোমার গর্ব করা উচিত আমাকে নিয়ে।”
শাইনা তাকে ব্যঙ্গ করে বলল,”গর্ব করতে গিয়েই তো আমি আজ গর্ভবতী।”
তাজদার সিদ্দিকী হো হো করে হাসলো। বলল,
“লোকজন শুনলে বলবে আমাকে ভূতে ধরেছে।”
“ধরেছেই তো।”
“অবশ্যই ধরেছে। ভূতের নাম শাইনা মমতাজ।”
প্রায় দুই সপ্তাহ কেটেছে শাইনার এই অসুস্থতা দিয়ে। তারপর এক বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ তার লেবার পেইন উঠলো। যখন সে অপেক্ষায় ছিল তাজদার সিদ্দিকীর ফোনের।
তাজদার যখন ফোন করলো তখন তার ফোনটা ঘরের এককোণায় বাজছে। শাইনার দিকে সবার মনোযোগ এমনভাবে চলে গিয়েছিল যে ফোনের দিকে তাকালো না কেউ। এমনকি শাইনারও সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। দুপুরেও মেসেজে সে তাজদারের সাথে ঠাট্টা-তামাশা করছিল যা সে আগে কখনো করেনি।
তাজমহল দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ১৭
আনিস অফিস থেকে এসে আরাম করছিল নিজের ঘরে। তন্মধ্যেই তাসনুভার চেঁচামেচি কানে এল,”আনিস ভাই দ্রুত আসেন। ভাইয়ারা কেউ বাড়ি নেই। শাইনার শরীর খারাপ লাগছে। ভেজার জন্যও প্রস্তুতি নিয়ে আসেন। সুখবর শোনার পর আপনার মাথায় এক বালতি ঠান্ডা পানি ঢালবো আমি।”
আনিস তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে এল।
