তাজমহল দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ৩২
প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী এলেন। স্ত্রীকে যেহেতু রাজি করাতে পারলেন না সেহেতু শেষ চেষ্টা হিসেবে তাজদারকে বললেন, যেন সে বাড়ি ছেড়ে এভাবে না যায়। কিন্তু সে তাজদার সিদ্দিকী! পাঁচ বছর বয়সেই একদিন এমন হয়েছিল যে খেলার সময় নিজের মামার ছেলেকে মারামারি করায় রওশনআরা তাকে বাইরে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন পুরো বাড়ির সবাই এমনকি তার মামা মামি পর্যন্ত তাকে আনতে গিয়েছিল। কিন্তু মা তাকে না নিয়ে পর্যন্ত বাড়ির ভেতর যাবে না। মামা জোর করে কোলে তুলে ভেতরে নিয়ে গেলেও সে আবারও বাইরে চলে গিয়েছিল।
শেষমেশ রওশনআরাকে হার মানতে হয়েছিল যদিও সেটা অনেকটা সময় পর। মায়েদের ছ্যাঁচড়া হতে হয় সন্তানদের কাছে। কিন্তু রওশনআরা সেই মায়েদের কাতারে পড়তেন না। তিনি পাঁচ বছরের বাচ্চা ছেলের কাছে কখনো দমে যেতেন না। কঠোর শাসনে বড়ো ছেলেটাকে মানুষ করেছেন। সে এখনো পর্যন্ত মায়ের উপরে কথা বলে না। কিন্তু ছোটোটা তেমন হয়নি।
শত চেষ্টার পরও সে মায়ের মনের মতো হয়নি। এ নিয়ে রওশনআরার আক্ষেপের শেষ নেই। তিনি ভেবেছিলেন একটা ভালো পরিবার থেকে ছেলের যোগ্য মতো মেয়েকে বউ করে আনবেন কিন্তু সেটা হয়নি। এইবার মেয়ের ব্যাপারে একই রকম ভাবনা ছিল তার।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কারণ গত পাঁচ বছরে তার জন্য যতগুলো সম্বন্ধ এসেছে, তার মধ্যে একটার আশেপাশেও পাশের বাড়ির ছেলে আনিস দাঁড়াতে পারবে না। ছেলেটা খারাপ না। ছোট থেকেই চোখের সামনে বেড়ে ওঠা, নম্র-ভদ্র স্বভাবের। কিন্তু এই পরিবারের আভিজাত্য আর বর্তমান অবস্থানের সাথে তাদের কোনো দিক দিয়ে যায়?
আনিস মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েনে অভ্যস্ত একটা সাধারণ ছেলে। তার স্বপ্নগুলো সীমাবদ্ধ। কিন্তু নুভার জন্য আসা প্রস্তাবগুলো সব আকাশচুম্বী ছিল। বিদেশে সেটেলড ফ্যামিলি, নামের পাশে বড় বড় ডিগ্রি আর বংশীয়।
তারা আনিসকে কখনো প্রতিযোগী হিসেবে তো দূরে থাক সাধারণ কোনো আলোচনার খোরাক হিসেবেও গণ্য করেননি। আনিস পাশের বাড়ির ছেলে অব্দি সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু নুভার জীবনের সঙ্গী হওয়ার যোগ্যতা তার সামাজিক মানদণ্ডে একেবারেই অসম্ভব।
গতবার যে সম্বন্ধটা নুভা ফিরিয়ে দিয়েছে তারা স্বপরিবারে আমেরিকা স্যাটেল। বংশগৌরব আছে। খান পরিবার। কত ভালো একটা ছেলে। কক্সবাজারের ঘটনাটির পরও তারা চেয়েছে কথা আগাতে। কিন্তু নুভা সোজা মানা করে দিল। মেয়ের মনে কি তখন থেকেই এইসব গোঁজামিল চলছিল?
রওশনআরা পারছেন না সব ছেড়েছুড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে। ছেলেমেয়েদের এইসব অবাধ্যতা তিনি আর নিতে পারছেন না। বারবার মানুষের কাছে তাকে ছোট হতে হচ্ছে। যে আভিজাত্যের অহংকার তিনি সারাজীবন আগলে রেখেছেন, আজ নিজের সন্তানদের কারণেই তাতে ফাটল ধরছে।
তিনি বিছানায় শুয়ে রইলেন। তৌসিফ নিয়ে এসেছিল বাবুনিকে।
“বড়োআম্মু নাতনি তোমাকে টা টা দিতে এসেছে। চলে যাচ্ছে।”
রওশনআরা তার দিকে তাকালেন না। তার মা বাবার উপর ক্ষোভ। এই ক্ষোভে তিনি এমুহূর্তে অন্ধ। তাঁর এখন নাতি নাতনিও ভালো লাগছে না।
বড়োআম্মুর সাড়াশব্দ না পেয়ে বাবুকে নিয়ে চলে গিয়েছিল তৌসিফ।
পাড়াপড়শিরা বাঁকা চোখে সবটা দেখছিল তাই আফসার সাহেব তাজদারকে নিয়ে বাড়িতে চলে গেলেন। শাইনাকেও শাহিদা বেগম ভেতরে নিয়ে গেছে। তাসনুভা ঝিমলির পাশে উঠোনের এককোণায় দাঁড়িয়ে আছে। রায়হান আশরাফের সাথে কথা বলছে। আনিস ভেতরে চলে গেছে তাজদারকে নিয়ে। রায়হান আর তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বলছে একটু বোঝাতে। এই ছেলে সবসময় একরোখা সিদ্ধান্ত নেয়। সবসময় তার সিদ্ধান্ত সঠিক হবে এমন কোনো কথা নেই।
তাজদার সোফায় বসে রইলো। আফসার সাহেব পিঠে হাত রেখে বোঝাচ্ছেন, মায়ের কথায় বউ নিয়ে বেরিয়ে যেতে নেই। সবকিছুর একটা সমাধান আছে। এখন এই সময় যাবে কোথায় বাচ্চার মা নিয়ে।
তাজদার তবুও দমলো না। সে বলল, আমি ওই বাড়ি থেকে যখন একবার বেরিয়ে এসেছি তখন আর যাব না। গেলে আপনাদের মেয়েই বেশি অপমানিত হবে। অবশ্য এইসব অপমানে ওর কি যায় আসে?
শাহিদা বেগম বললেন,”ঝামেলা কি নিয়ে হয়েছে?”
শাইনা আর তাজদার কেউ কিছু বললো না। সবাই মোটামুটি বুঝতে পারলো কারণটা। কিন্তু এটা বুঝতে পারলো না এখানে তাদের টানার কি দরকার। অবশ্য দাদিমা পরে বুঝিয়ে বললেন রওশনআরা কেন এত ক্ষেপেছেন। শাহিদা বেগম বললেন, “তার মেয়ে আনার জন্য কি আমরা পাগল হয়ে যাচ্ছি? এত নাটক দেখানোর কি আছে বুঝিনা। ছেলের চাপে পড়ে শানুকে বউ করে নিয়ে গিয়েছিল। এখন মুখোশ খুলছে।”
তাজদার শাইনা সকাল থেকে তাদের রুমে থাকা বিস্কিট খেয়েছিল। আর কিচ্ছু না। শাইনা তাই রান্নাঘরে চলে গেল। সাবরিনাও হাতেনাতে কিছু নাশতা বানিয়ে নিচ্ছে। কোথাও যেতে হলেও কিছু অন্তত মুখে দিতে হবে।
শাহিদা বেগম এসে বললেন,”রাতে ওখানে এত ঝামেলা হচ্ছে তুই এখানে চলে আসবি না?”
“ওর আব্বুকে ফেলে কিভাবে আসবো? কথা একটা বললেই হলো আম্মা? আমি চলে এলে আরও বেশি চিল্লাপাল্লা করার সুযোগ পেত।”
শাইনা কিছুক্ষণ পর নাশতা নিয়ে যেতেই তাজদার দাঁড়িয়ে পড়লো।
“তুমি এখানে এসে নাশতা বানানো শুরু করে দিয়েছ? আমি তোমাকে এজন্য এখানে নিয়ে এসেছি? চলো। বাবু কোথায়? ওকে নাও। ঢাকায় চলে যাব।”
আফসার সাহেব তাদের একটু একা ছাড়লেন।
শাইনা বলল,”আগে খাওয়াদাওয়া করুন। মাথা ঠান্ডা হোক। তারপর কথা বলি? নিন খান। খেয়েদেয়ে চিল্লাবেন। পেটকে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই।”
“আমার খিদে নেই।”
“আছে। এই যে আমাকে খাবেন খাবেন করছেন।”
তাজদার মুখ ফিরিয়ে বসে রইলো মুখ শক্ত করে। শাইনা হতাশ হলো। বলল,”রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন।”
“তোমার নাটকীয় কথাবার্তা বন্ধ করো।”
“করবো না। বোনের বিয়ে দিতে চেয়েছেন না? তাহলে বিয়ে না দিয়ে কেটে পড়ছেন কেন? বড়োআম্মু এখন যেকোনো একটা ছেলে ধরে আপুর বিয়ে দেবে। তখন?”
“তার মেয়ে। যা ইচ্ছে করুক আমার কি?”
“কি স্বার্থপরের মতো কথা। অথচ উনি কাঁদছেন আপনি চলে যাচ্ছেন দেখে। আপনি চাইলে এখন ঘটনা ঘুরে যেতে পারে। ইউ আর ভেরি পাওয়ারফুল। বি স্ট্রং ম্যান!”
“আবারও রসিকতা!”
“মোটেই না।”
“এখন আমি কি করবো?”
“আম্মা আব্বা দেখলাম রাজি আছে। তাই
বোনের বিয়ে দেবেন। আর আপনিও আরেকটা বিয়ে করবেন।”
তাজদার চমকে গেল!
শাইনা বলল,”সবাই তো তাই বলছে। কাল আপনার ফুপু, খালা সবাই ফোন করে আপনাকে এই কথাটা বলেছে।”
তাজদার আশ্চর্য হলো।
“তুমি কি করে জানলে?”
“আমাকে কি বোকা হয়ে মনে হয় আপনার? আমি আপনাকে বলছি বিয়ে আরেকটা করুন। উনি আপনার মায়ের সাথে থাকবে। উঠতে বললে উঠবে, বসতে বললে বসবে। আমি সেটা পারিনি তাই আমি ভালো বউ না। অবশ্য বড়ো ভাবি এমনটা না করেও মন জয় করেছে। কোটিপতির মেয়ে বলে কথা!”
তাজদার বলল,”সবকিছুর একটা লিমিট আছে।”
“অফকোর্স আছে। নাশতা খেয়ে নিন আগে।”
“তুমি আমাকে আর প্যারা দিওনা।”
“ওকে দেব না। এখন যেটা বলছি সেটা মনোযোগ দিয়ে শুনুন।”
“কী?”
“ওদের বিয়েটা দিন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তারপর লন্ডনে ব্যাক করুন। আমি পটিয়ায় কোনো একটা ভাড়া বাসা নিয়ে থাকবো। আট হাজার টাকা দিলে চমৎকার বাসা পাওয়া যায়। ঢাকায় যেহেতু একা থাকতে পারবো না। সেহেতু এখানে বাসায় থাকবো। ওই বাড়ি আমি আর যাচ্ছি না।”
“এখন বাসায় চলো। আমি আমার এক বন্ধুকে বলেছি।”
“হুট করে বাসায় ওঠা যাবে নাকি? ফার্নিচার নিয়ে যেতে হবে। অনেক কাজবাজ আছে।”
“ওটা রেডি বাসা।”
“বাসায় যাওয়ার অনেক ঝামেলার । আমি কিছুদিন এখানে থাকি। আপনি তো এখানে থাকবেন না। সেহেতু বাড়ি যান। এখানে অবশ্য আজ রাতটা থাকা যায়। গোপন মিটিং করার আছে।”
বলেই শাইনা একটা হাসি দিল। তাজদার রেগে যাচ্ছে। আর নিজেকে সামলাচ্ছে। তামাশা করছে তার সাথে। হাতি গর্তে পড়লে পিপড়া লাথি মারে। কথাটা মিথ্যে নয়। সকাল থেকে তাকে খোঁচাচ্ছে।
সে বলল,
“তুমি আমার সাথে মশকরা করবে না খবরদার।”
“মশকরা করবো কেন? আমি একটা কথা বুঝে গিয়েছি জানেন এই দুনিয়াটা শক্তের ভক্ত নরমের যম। বড়োআম্মু আজকে আমার সালামটা পর্যন্ত নিল না। আমার মেয়ের মুখটা পর্যন্ত দেখলো না। আমি ওখানে চোখের পানি ফেলে এসেছি। আর ফেলবো না। দায়মুক্ত হয়েছি। আর আমার কোনো দায় নেই।”
তাজদারের এখন এইসব শুনতে ভালো লাগছে না। সে মায়ের ছেলে। মা সম্পর্কে স্ত্রীর মুখে এইসব শুনতেও তার খুব একটা ভালো লাগছে এমন নয়। কিন্তু কিছু করার নেই। তার মাও এই মেয়েটি সম্পর্কে যা তা বলেছে। অন্য মেয়ে হলে হয়তো দোষারোপ করতো এই বলে, মায়ের অমতে কেন বিয়ে করেছেন? হয়তো আম্মু তার আড়ালে আরও এমন অনেক কথা বলেছে। আনিস এসে নাশতার প্লেট হাতে তুলে দিল।
“আগে খাওয়া শেষ কর।”
তাজদার ধীরেধীরে খাওয়া শুরু করলো। কিন্তু তার সাথে কোনো কথা বললো না। তাজদার রাগী, অভিমানী। আনিস সেটা জানে। তার সময় চাওয়াতে তাজদার রেগে গিয়েছিল। মনে মনে খুব দুঃখ পেয়েছিল। এমনকি তাদের এই বন্ধুত্বের উপর একটা অভিমানও জন্মেছিল।
কিন্তু এই সময়টুকু নেওয়া জরুরি ছিল। বিশেষ করে পরিস্থিতি তখন আগুন ছিল। তাই সবাইকে কথা বলার সুযোগ দেওয়াটা দরকার ছিল। মানুষের ক্ষোভ রাগগুলো তখন বেড়ে যায় যখন তাদের কথা শোনার মানুষ থাকে না। কিংবা তারা মনের কথা বলতে পারেনা।
তাই সে তার মা, বোনদের সমস্ত অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। তার মা আর বোনেরা সংসারী। সংসার করে যাচ্ছে। তারা জানে কোন মেয়ে সংসারে ভালো হবে, কোন মেয়ে ভালো হবে না।
তাদের কথা ফেলে দেয়া যায় না। সে যদি সবার কথা মনোযোগ দিয়ে না শুনতো তাহলে তাদের মনের ভেতর একটা ক্ষোভ থেকে যেত। কিন্তু তারা নিজেদের ক্ষোভ আর অভিযোগ উগরে দিয়েছে।
এমনকি তাকে নিশ্চুপ দেখে ওই মেয়ে তার পছন্দ হলে, বাড়িতে বউ করে নিয়ে আসার দরকার পড়লে সে কি কি করলে, তারা কি কি করলে ভালো হবে সেই পরামর্শও দিয়েছে। সে বিশ্বাস করে, পৃথিবীতে অর্ধেক সমস্যার সৃষ্টি হয় একে অপরের কথা না শোনা থেকে। একে অপরকে বুঝতে চেষ্টা না করা থেকে।
শাহিদা বেগম এসে এটা ওটা তুলে তুলে দিলেন।
তাজদার চুপচাপ খাচ্ছে। রাগ হোক, ক্ষোভ হোক, অভিমান হোক সব ধীরেধীরে মলিন হচ্ছে। কিন্তু সে নিজের বিয়ের সময় যেটা করেছে সেটা এখন করতে পারবে না। এই একটা ভুল সিদ্ধান্ত তাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। তার উচিত ছিল রওশনআরা আর মমতাজ দুজনকেই সময় দিয়ে বিয়েটা করা। সেটা না করায় আজকের এই পরিস্থিতি। তাই আবারও জেদ দেখিয়ে একটা ভুলের সাথে সে নুভা আর আনিসকে জড়িয়ে দিতে পারবে না। রওশনআরা তার মা। রওশনআরা এমুহূর্তে তাকে ছেলে হিসেবে অস্বীকার করলেও তিনি মা মা’ই। তাই মায়ের মনে আঘাত দিয়ে সে বোনকে নতুন সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিতে পারবে না। তার নিজের জীবন নিয়ে কখনো বিস্তর ভাবনা তার ছিল না। ভবিষ্যত সে ভাবেনি। কিন্তু বোনের বেলায় তাকে ভাবতে হবে। বন্ধুর জন্য হলেও একটা দায়বদ্ধতা থেকে তাকে ভাবতে হবে।
আফসার সাহেব নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন,”কিছুক্ষণ তুমি ঘুমাও বাবা। চোখের নিচে কালি পড়েছে। রাতে ঘুমাওনি বুঝতে পেরেছি।”
তাজদার চুপচাপ শুনেছে। শরীর ক্লান্ত। সত্যিই সারারাত ঘুমায়নি। দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি সকালে কি করবে তা ভেবে। হুট করে মেয়ে আর তার মাকে নিয়ে কোথায় উঠবে তা ভেবে। শোয়ামাত্রই সে ঘুমিয়ে পড়লো। শাইনাও বিরক্ত করলো না। ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ করে দিল। ভাগ্নে ভাগ্নীদের ওই ঘরের আশেপাশেও যেতে দিল না চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যাবে বলে।
বিকেলে তাজদারের মামারা এসেছে। এই মা ছেলের মান অভিমান আর কত? এত কিছু হয়ে গেল একবার ফোন করলেই তো হতো। ছেলে কেন বউ নিয়ে বেরিয়ে যাবে? তাঁরা নিজেদের বোনকেই বেশি দোষ দিলেন। রওশনআরা পুরোটা সময় চুপ থাকলো।
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বললেন,”নুভা ওই বাড়ির ছেলেকেই বিয়ে করবে জানার পর থেকে ওর মায়ের মাথা নষ্ট। এখন ছেলেমেয়েরা পছন্দ করলে আমাদের কি করার আছে?”
আনোয়ারা বেগম বললেন,”ছেলে যদি যেমন তেমন হতো আমিও না বলতাম। কিন্তু ছেলে তো যথেষ্ট ভালো। সারা গ্রামে খোঁজ নিয়ে দেখো সবাই। তার শত্রুও বদনাম করবে না। ছোটো থেকে অভাব অনটনে বড়ো হয়েছে ওরা। কিন্তু মানুষ হয়েছে। এখন তোমাদের বোনকে এটা কে বোঝাবে বাবা? উড়নচণ্ডী মেয়েটা বিয়ে করবে বলছে এটাই তো বেশি।”
“তাজ এখন কোথায়?”
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বললেন,
“শ্বশুরবাড়িতে ছিল। কিছুক্ষণ আগে আনিসের সাথে বেরোতে দেখলাম। বাসায় উঠবে কালকের মধ্যে। এত করে বললাম কিন্তু বাড়ি ফিরবে না।”
আনোয়ারা বেগম বললেন,”ওকে জোর করে লাভ নেই। ওর মা ওকে দুইদিন ধরে কথা শুনিয়েছে। এত ধৈর্য দেখিয়েছে এটাই বেশি। এখন বউ বাচ্চার মুখ পর্যন্ত দেখেনি। ওকে এখন কিছু বলে লাভ নেই। তোমরা এসেছ। এখন ওই বাড়িতে গিয়ে পারলে কথাবার্তা বলো। বিয়েটা হলে রাগ একটু কমতে পারে।”
সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো মুরব্বিরা বসে কথাবার্তা বলবে। তারপর যা সিদ্ধান্ত হয়। সেই ফাঁকে তাজকে রাজি করানো যাবে বাড়ি ফিরতে। ঘরের ছেলে ঘরে না ফিরলে কেমন দেখায়?
মাগরিবের আজানের পর দুই বাড়ির মধ্যে বৈঠক হলো। শাইনাদের বাড়িতেই গিয়েছেন সবাই। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী যাননি। তিনি সম্বন্ধিদের উপর সব ছেড়ে দিয়েছেন। রওশনআরাকে কোনো বাড়তি কথা বলতে বারণ করে নিজের কাজে চলে গিয়েছেন। তৌসিফের বাবা তৈয়বউদ্দীন সিদ্দিকী ছিল। রায়হান ছিল। তাজদার আর আনিস ফিরলো এশার আজানের একটু আগে। তখন বড়োরা সবাই মিলে কিছু একটা বলতে বলতে হাসাহাসি করছিল। তাজদার মামাদের দেখে থমকে গেল।
“মামা!”
“জি মামারা এসেছে। সব ছেড়েছুড়ে চলে এসেছি। এত রাগ করলে হয় সাহেব? মেয়ের বাবা হয়েছেন।”
বলতে বলতে ভাগ্নেকে বুকে জড়িয়ে নিলেন বড়ো মামা। তাজদার ছোটোবেলা থেকেই মামার বাড়িতেই বেশি যাতায়াত করতো। গ্রামে ফিরলেই শাঁ করে মামার বাড়ি ছুটে যেত। সেখানেই বেশি থাকতো। তাই মামাদের সাথে তার বন্ধন খুব গাঢ়। তিনি পিঠ চাপড়ে দিলেন। বললেন,
“বসো চা খাও। তোমার শ্বশুর শ্বাশুড়ি পর্যন্ত তোমাকে নিয়ে টেনশন করছে।”
তৈয়বউদ্দীন সিদ্দিকী আনিসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বড়ো মামা বললেন,”নতুন করে চেনার দরকার নেই। তাজের বিয়ের সময় আমরা একই টেবিলে বসে ভাত খেয়েছিলাম। নুভামণির চয়েস ভালো। আমার ভাগ্নীকে গতবারই বলেছিলাম আমি বেঁচে থাকতে বিয়েটা করেন। সে কথা রেখেছে।”
সবাই একটু হেসে উঠলো তখন।
“বসেন আনিস সাহেব। বলেন কি খবর!”
আনিস সোফায় বসতে বসতে মুখ খুলতে যাবে তখুনি তাজদার ধমকে উঠলো,
“তুই চুপ কর! তোর মুখে কীসের খবর? মামা খবরের সব হেডলাইন ওর মুখস্থ। জিগ্যেস করবে না। বলা শুরু করলে ফজরের আজান দেবে।”
আনিস হাঁ করে তার দিকে চেয়ে রইলো। সবাই সশব্দে হেসে উঠলেন। বড়োমামা বললেন,
“এমন জামাই’ইতো দরকার।”
তিতলি চলে এসেছিল শাইনার কাছে। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে তারা সব কথা শুনছে। তাজদারের কথা শোনার পর পর্দার ওপাশের সবার হাসির শব্দ শোনা গেল। তিতলি ছটফটিয়ে উঠে বলল,
“যাই আপুকে বলে আসি।”
শাইনা বলল,”কিছু বলতে হবে না।”
তিতলি বলল,”আপু বলেছে এখানে কি কথা হচ্ছে সেইসব গিয়ে ওকে বলতে। তোমার সাথে কথা বলতে বলতে সব ভুলে যাচ্ছি। যাই বলে আসি। প্রথমত মামা আনিস ভাইয়ের হ্যান্ডশ্যাক করেছে, তারপর জড়িয়ে ধরেছে, তারপর বলেছে আনিস সাহেব বসেন, কি খবর বলেন, তারপর তিতলিনী ভুলে যাস না গাধার বাচ্চা…
“ননদিনীর চোখের পানির কিন্তু পাওয়ার আছে।”
ঝিমলির কথা শুনতে শুনতে তাসনুভা পায়চারি করতে লাগলো।
“থ্যাংক য়ূ!”
“চিন্তা হচ্ছে?”
“না।”
“হচ্ছে। আমি বললাম তো বিয়ে ফাইনাল। তাজ সাহেব যা রাগা রেগেছেন। তাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার জন্য হলেও বিয়েটা হতে হবে।”
“কিন্তু বিয়ে একটা সিরিয়াস ইস্যু। কোনো কারণের জন্য বিয়ে হোক সেটা আমি চাইনা।”
“তাও ঠিক। কিন্তু আমার মনে হয় না তাজ সাহেব বউ নিয়ে আর এই বাড়িতে উঠবেন।”
“ভাইয়া না থাকলে.. নো নো ভাইয়া ছাড়া কোনোকিছু হবে সেটা আমি ভাবতেই পারিনা।”
ঝিমলি বলল,”আচ্ছা চিন্তা বাদ দিন।”
তখুনি তিতলি নেচে-কুঁদে এল। বলল,
“একটি সুসংবাদ। জিন্নাতআরা সিদ্দিকী আপনাকে অতি আনন্দের সাথে জানাচ্ছে আগামী শুক্রবার আপনার বিবাহ কার্য সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।”
“শাটআপ তিতলি! সোজা কথা বলো।”
“বলবো না। তোমার কোনোদিনও বিয়ে হবে না। মামারা সবাই আনিস ভাইকে পছন্দ করেছেন ভাগ্নী জামাই হিসেবে। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আনিস ভাইকে দুলাভাই ডাকতে যাচ্ছি। কিন্তু এটা মনে রাখো জুনুনআরা সিদ্দিকী। তোমার বিয়ে হচ্ছে না।”
“উফ বেশি কথা বলো তিতলি। এনিওয়ে থ্যাংক য়ূ!”
তিতলি যেভাবে এল সেভাবে চলে গেল। তৌসিফকে গিয়ে বলল,
“ভাইয়েরেহহ আমার কি খুশি লাগছে। এরপর আমার সিরিয়াল। এলো এলো একি গোধূলি জীবনে। ডানা মেলে একশোটা প্রজাপতি মনে।”
তৌসিফ শাওনের সাথে কথা বলছিল। সে কোমরে হাত চেপে চেয়ে রইলো তার যাওয়ার পথে।
এশার নামাজের জন্য সবাই বেরোচ্ছিল ঠিক তখুনি আনিসকে একলা পেল তিতলি। যদিও পেছনে রায়হান দাঁড়ানো।
“আনিস ভাই!”
আনিস ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো।
“আপনাকে আমি এখন থেকে দুলাভাই ডাকবো।”
রায়হান তাকাতেই তিতলি দৌড়ে চলে গেল লজ্জা পেয়ে।
“একটা মিষ্টিও নেই ফ্রিজে? ছিঃ!”
তৌসিফ বলল,”তুই মিষ্টি দিয়ে কি করবি?”
তাসনুভা বলল,”খুশির খবর শুনলে মিষ্টি খেতে হয়। তোমার আর তিতলির জন্য মিষ্টি থাকেনা ফ্রিজে। ”
“বিয়ে তোর। তুই কেন মিষ্টি খাবি? ও আল্লাহ আনিস ভাইয়ের মতো ভালো মানুষের কপালে তুমি এটা কাকে লিখে দিয়েছ?”
তাসনুভা তার ঘরের দিকে চলে গেল। ঝিমলিকেও বললো একথা। তাই ঝিমলি রায়হানকে ফোন করে বলেছে আসার সময় যাতে মিষ্টি নিয়ে আসে। বধূর মুখ পানসা হয়ে আছে। মিষ্টিমুখ করতে হবে।
রায়হান সত্যি সত্যি মিষ্টি এনেছে। তবে দুই বাড়ির জন্য। মিষ্টি পাওয়ার পর শাইনা প্রথম মিষ্টিটা তাজদারের মুখে পুরে দিল। তাজদার তখন জরুরি ফোনকলে। সে অবাক হয়ে শাইনার দিকে চেয়ে রইলো।
শাইনাও অপ্রস্তুত!
“আল্লাহ খেয়াল করিনি।”
সে যত দ্রুত সম্ভব চলে যাচ্ছিল। তাজদার তার দুই বাহু চেপে মুখটা তার সামনে নিয়ে গিয়ে ইশারা করলো মুখ থেকে মিষ্টির ভাগটুকু নিতে। শাইনা বলল,
“রোমান্স তো মাথায় উঠে গেছে!”
তাজদার বিরক্ত হলো। শাইনা বাইরে বেরিয়ে থাকা মিষ্টির অংশটুকু কামড়ে নিয়ে চলে গেল খেতে খেতে। যদি পেট খারাপ হয় তাজদার সিদ্দিকীর খবর আছে।
যৌতুক প্রসঙ্গ আসতেই আনিস সরাসরি বলে দিয়েছে সে একটা জিনিসও নেবে না। দরকার পড়লে দামী ফার্নিচার কিনে ঘর সাজাতে তার পাঁচ বছর লাগুক। রায়হান বলল, “আব্বু এভাবে রাজি হবে না। কিছু তো নিতে হবে।”
আনিস আর কোনো জবাব দেয়নি। সে এককথায় বলে দিয়েছে। এমনকি এটাও বলে দিয়েছে অন্যান্য পাত্রীদের বেলায় যত মোহরানা দিবে বলেছিল বলেছে ততটুকুই দিবে।
আশরাফ বলল, “এইসব বললে বড়োআম্মু বড়োআব্বু একেবারে বেঁকে আসবে। তুই কি মেয়েটাকে দিয়ে ফেলবি নাকি বিয়ের পর?”
“আশ্চর্য এটা কি ধরনের কথা?”
“তাহলে কাবিনের টাকা বিশ লাখ হোক তোর সমস্যা কি?”
“আমি এতকিছু জানিনা। মোহরানা আমি পাঁচ লাখ দেব। যেটা দিয়ে দিতে হয়। লোকদেখানোর জন্য কাগজে সংখ্যা লিখতে ইচ্ছে করলে লিখুক।”
আশরাফ বলল,”কোনো মেয়ের বাবাই মেয়েকে কম কাবিনে মেয়ে দিতে চায় না। তুইও দিবিনা মেয়ের বাবা হলে। কারণ দুনিয়াটাই এমন। যাতে কথায় কথায় যাতে তালাকের কথা উঠতে না পারে।”
আনিস আর কিছু বললো না। শাহিদা বেগম বললেন,”ওর কথা শুনিস না তো। তোরা যেটা ভালো মনে হয় কর। ওর বউকে মোহরানা দিতে ইচ্ছে করলে ও দেবে।”
“ইচ্ছে করলে কি আম্মা? এটা তো বাধ্যতামূলক।”
কতটুকু গয়না দেবে এটা নিয়েও কথা হলো। যেহেতু সে কোনোপ্রকার পণ নিচ্ছে না সেহেতু কতটুকু গয়না দিতে হবে এই দাবিও কনেপক্ষের কেউ করতে পারবে না।
তবে শাহিদা বেগম বলেছেন, তিনি তিন ভরি গয়না দেবেন। তবে আপাতত দুই ভরি দিচ্ছেন। বড়ো বউকে যা যা দিয়েছেন সব তিনি মেজোটাকেও দিবেন।
আর রইলো বৈরাতী। শাইনার বিয়ের সময় মেহেদী অনুষ্ঠান একসাথে হয়েছিল। দুই বাড়ি একসাথে খরচ করেছে। বৈরাতী কনে পক্ষের লোকজন খাইয়েছিল। এবারও তাই হবে।
যেহেতু অন্যান্য খরচ হচ্ছে না সেহেতু তাজদার দুই হাজার বরপক্ষ খাওয়াবে কথা দিল। শাহিদা বেগম এতে খুশি হয়ে গেছেন। সবাইকে দাওয়াত দিতে পারবেন মন ভরে। যদিও এই দু’হাজার আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যাবে। বিয়ের দিন তারিখও ঠিকঠাক করে দিয়ে গেছে তাসনুভার মামারা।
আগামী বৃহস্পতিবার গায়ে হলুদ। শুক্রবার শুভ বিবাহ। আর কোনো বাড়তি আয়োজন দরকার নেই। কেনাকাটার জন্য তাজানাহা শপিংমল তো আছেই। তবে তাসনুভা বলে দিয়েছে এবার কোনো ডিসকাউন্ট নেই। একদাম।
রওশনআরা কোনো কথাই বলছেন না এই বিষয়ে। চুপচাপ সব দেখছেন। তাজদার নিজের ঘরে এসেছে। শ্বশুরবাড়িতে একরাতের বেশি থাকা অসম্ভব। তবে মায়ের মুখোমুখি হয়নি। কথাবার্তাও বলেনি। তবে সে বিয়েটা নিয়ে উত্তেজিত। তার বিয়ের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। বিয়ের শপিং হবে, সোমবারে। মঙ্গলবারে তাসনুভা ফেসিয়াল নেবে। রোদে বেরোতে পারবে না আর। সবাইকে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে।
তিতলি শাওনকে আগে থেকেই বলে রেখেছে।
তাজমহল দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ৩১
“শাওন ভাই বিয়েতে চল না সুজন, আর কোনো এক নীলচে পরীর গানটা বাজাবেন।”
শাওন বলল, “না আমি বাজাবো কেমন আছেন বেয়াইন সাব। বুকে বড়ো জ্বালা।”
তিতলি বলল,”আমার মনে কোনো জ্বালা নেই শাওন ভাই। আমার মন খুব ভালা।”
