Home তাজমহল তাজমহল পর্ব ৭

তাজমহল পর্ব ৭

তাজমহল পর্ব ৭
প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী

তিনজনের ফেসিয়াল, হেয়ার স্পা করতে অনেকটা সময় কেটে গেছে। যোহরের আযান পড়েছে। তাসনুভা ঘড়িতে সময় দেখে নিল। দুইটা বাজবে আর কিছুক্ষণ পর। তৌসিফ ফোন করে বলল আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে। তারা আসছে।
তাসনুভা রাগ দেখিয়ে বলল,”আমাদের খিদে পেয়েছে। আমরা রেস্টুরেন্টে চলে যাচ্ছি। তোমাদের জন্য বসে থাকতে পারব না।”
তৌসিফ বলল,”তাহলে একা একা বাড়ি যা। আমরা আর আসব না।”
তাসনুভাকে খেপিয়ে দিয়ে সে ফোন রেখে দিল। অবশ্য তার কিছুক্ষণ পর তাজদার সিদ্দিকী হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়ে জানিয়েছে আর দশ মিনিট অপেক্ষা করতে।

কথার নড়চড় হয়নি দশ মিনিটের মাথায় হাজির হয়েছে গাড়ি। তাসনুভা আর তিতলির পেছন পেছন শাইনা এসে গাড়িতে বসলো। তৌসিফ বলল,”কারো কোনো পরিবর্তন তো দেখছিনা। চেহারা আগের মতোই আছে।”
তাসনুভা বলল,”ফেসিয়াল করালে চেহারা পাল্টায়? বোকার মতো কথা বলো। রেস্টুরেন্টে চলো। ভাত খাব।”
তিতলি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,”দম বিরিয়ানি আর কালা ভুনা।”
তৌসিফ রেস্টুরেন্টের নাম জানতে চাইল, “গ্রীন শ্যাডো নাকি লেমনগ্রাস?”
তিতলি বলার আগে তাসনুভা বলল,”গ্রীন।”
তৌসিফ মাথা হেলিয়ে বলল,”ওকে।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শাইনা চুপচাপ বসে আছে। জানালা দিয়ে বাইরে দেখছে সে। তৌসিফ বলল,”শাইনার ইচ্ছে শুনি।”
শাইনা মুখ খুলতে চাইছেনা। সে এমনকিছু মানুষের সামনে কথা বলতে চায়না যাদের সামনে তার জিভও অস্বস্তি আর একপ্রকার জড়তায় গুটিয়ে থাকে। তারপরও প্রশ্নের উত্তরে বলল,
“বাড়ি যাব। কিছু খেতে ইচ্ছে করছেনা।”
তাসনুভা বলল,”আসার সময় বলেছিলাম রেস্টুরেন্টে খাব। এখন এত বাহানা দেয়ার মানে কি?”
শাইনা চুপ করে রইলো। তাসনুভা সবসময় মেজাজ দেখিয়ে কথা বলে। যেটা শাইনার একদম পছন্দ না।
গ্রীন শ্যাডো রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামলো গাড়ি। তারা সবাই ভেতরে ঢুকে পড়লো। খাবার অর্ডার করলো তৌসিফ। হায়দ্রাবাদী চিকেন দম বিরিয়ানি, কালা ভুনা, স্পাইসি চিংড়ি ফ্রাই, ভেজিটেবল সালাদ, রায়তা, আরও কিছু ডেজার্ট।

শাইনার বিরিয়ানি আর কালা ভুনাটা ভালো লেগেছে। তাজদার সিদ্দিকী আর তৌসিফ অন্য টেবিলে বসেছিল বলে তার খেতে অসুবিধা হয়নি। নইলে অস্বস্তিতে সে খেতে পারতো না। তাজদার সিদ্দিকীর কণ্ঠস্বর কানে এলেও তার দমবন্ধ লাগছিল সেখানে সামনাসামনি বসে খাওয়া অসম্ভব ছিল একপ্রকার।
যদিও সে যেখানে বসেছে সেখান থেকে তাজদার সিদ্দিকীকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তাজদার সিদ্দিকীও তাকে দেখতে পাচ্ছিল তাই শাইনা ওড়না মুখের একপাশে একটু বেশি টেনে রেখেছিল। এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সে কখনো পড়েনি।

তৌসিফ আর তাজদার সিদ্দিকী কিছু একটা বলে বলে হেসে উঠছিল মাঝেমধ্যে। শাইনার মনে হলো তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। হয়তো ইনবক্সের মেসেজগুলো পড়েছে। আবারও হাত পা ঘামতে শুরু করলো তার।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে সবাই বেরিয়ে এল। তাসনুভা, তিতলি, তৌসিফের পাশাপাশি হাঁটছে। শাইনা তাদের সাথে তাল মিলাতে না পেরে একটু পিছিয়ে পড়েছে। হঠাৎ পেছনে ফিরে তাজদার সিদ্দিকীকে দেখামাত্রই সে লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে তৌসিফদের সামনে চলে এল। একটু দ্রুত হাঁটতে লাগলো।
তৌসিফ গাড়ির কাছাকাছি এসে সেলফি নিচ্ছে। তিতলি আর তাসনুভা নানান অঙ্গভঙ্গি করে সেলফি তুলছে। শাইনাও এমন ছবি তুলতে ওস্তাদ। কিন্তু আজ এমুহূর্তে অসম্ভব। তবুও তাকে ডেকে নিল তৌসিফ। শাইনা সবার পেছনে দাঁড়ালো।

তৌসিফ সেলফি ক্যামেরায় ক্লিক করবে ঠিক তখুনি শাইনার মনে হলো তার পেছনে আবারও কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। সে মুখের কাছটায় ওড়না ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ তুলে তাকালো তাজদার সিদ্দিকীর দিকে। সাথে সাথে তৌসিফ ক্লিক করলো। ছবিতে উঠেছে শাইনা তাজদার সিদ্দিকীর দিকে তাকিয়ে আছে। আর তাজদার সিদ্দিকী চোখদুটো তার দিকে নামিয়ে সটান দাঁড়িয়ে আছে। তৌসিফ বলল,”বেস্ট ক্যান্ডিড।”

বাড়ি ফিরে শাইনা ব্যাগ, ওড়না ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো হাত পা মেলে। উপরে ফ্যানটা ভনভন করে চলছে। অনেক্ক্ষণ বেহুঁশের মতো শুয়ে থাকলো সে। শাহিদা এসে তার নড়চড় না দেখে বলল,”আল্লাহ এই মেয়ে কেমনে প্লেনে চড়ে বিদেশ যাবে? শহর ঘুরে এসে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে।”
শাইনা মায়ের কথা চুপচাপ শুনলো। তারপর একলাফে উঠে সোজা পুকুরে চলে গেল। মাঝেমধ্যে সে পুকুরে গোসল করে। সাবানদানি আর ফেটাজাল নিয়ে সে পুকুরে চলে গেল।
ঘাটে সাবানদানি রেখে ঝাঁপ দিল পুকুরে। মাথা ডুবিয়ে রেখে পানির উপরে উঠতেই পুকুরের উত্তরে বড় ঘাটে দেখলো বড় আম্মু দাঁড়িয়ে আছে তোয়ালে হাতে নিয়ে।

ছোটবেলায় ওই ঘাটে বড় আম্মুরা গোসল করতো, কাপড়চোপড় ধুতো। তাদের তখন নলকূপ ছিল। বড়আম্মু তবুও সেখানে গোসল করতেন না। তিনি পুকুরে গোসল করতেন ঘাটে বসে বসে কাপড় ধুতেন।
আর এই ঘাটে আম্মুরা গোসল করতো, কাপড় ধুতো। সবাই কাজ করতে করতে গল্পগুজব করতো।
তাদের পুকুরে গোসল করা বন্ধ হয়েছে ডিপ বসানোর পর। তখন তাদের অপেক্ষা করতে হতো কখন ঘাট থেকে ছেলেরা সরবে আর তারা মেয়েরা গোসল করবে।
তাকে দেখে বড়আম্মু অপ্রস্তুত হাসলেন। হাতে সাবানদানি, কাঁধে তোয়ালে। চোখের ইশারায় কিছু যেন বলতে চাইলেন। সাথে সাথে পুকুর থেকে ডুব দিয়ে উঠলো তাজদার সিদ্দিকী। শাইনা চোখ বড় বড় করে তাকালো।
তাজদার সিদ্দিকী মায়ের চোখ অনুসরণ করে এদিকে তাকাবে মনে হতেই সে টুপ করে ডুব দিল। তাজদার সিদ্দিকী চোখ সরিয়ে নিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলো,”কে ওটা?”

“সানজু বোধহয়।”
শাইনা অনেকক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইলো পানির নিচে।
তাজদার সিদ্দিকী মুখ থেকে পানি সরিয়ে ঘাটে উঠে এল। ঘাট পরিষ্কার করে নিচের ঘাটে বসে উপরের ঘাটে নিজের শার্টটা বিছিয়ে সাবান ঘষতে লাগলো। সাবানটা যতক্ষণ না শেষ হবে ততক্ষণে ঘষবে সে।
শাইনা ডুব দিয়ে উঠলো। আর পারছিল না।
শুধু নাকটা পানির উপরে তুললো নিঃশ্বাস ফেলার জন্য। বড় আম্মু তাকে নাক তুলে গা ডুবিয়ে বসে থাকতে ফিক করে হেসে ফেললেন। শাইনা আবারও ডুব দিল। রাগে, ক্ষোভে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার।
রওশনআরাকে হাসতে দেখে তাজদার সিদ্দিকী কপাল কুঁচকে তাকালো। রওশনআরা বললেন,

“শার্টটা তিতলি ধুয়ে দেবে। তুমি গোসল করে উঠে যাও। হঠাৎ করে পুকুরের পানি গায়ে লাগলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
“সমস্যা নেই।”
বলেই আবারও সাবান ঘষতে লাগলো। শাইনা ফাঁকফোকর খুঁজছে পুকুর থেকে উঠে পালানোর জন্য। তখুনি শাহিদা বেগম এল।
“চুলটুল পার্লার থেকে ধুয়ে এসে পুকুরে ডুব মেরে বসে আছিস বেকুব মেয়ে? কোথায় রে তুই?”
শাইনা গেল ফেঁসে। শাহিদা বেগম তখুনি তাজদার সিদ্দিকীকে দেখলো ওই ঘাটে। সে হঠাৎ পুকুরে কেন? তিনি শুকনো ঢোক গিললেন। মেয়েটা তো এখন রেগে যাবে।

শাইনা ডুব দিয়ে উঠলো। চোখ লাল হয়ে গেছে পানিতে ডুবে থাকায়। নাকের ডগা কাঁপছে লজ্জায়, অপমানে।
তিনি ওড়নাটা ছুঁড়ে দিলেন। শাইনা গায়ে ওড়নাটা জড়িয়ে নিতে লাগলো রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে।
তাজদার সিদ্দিকীর একবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ সাবান ঘষতে লাগলো। শাহিদা বেগম বলল,”চোখ সরিয়ে নিয়েছে। উঠে যা।”

শাইনা হনহনিয়ে পুকুর থেকে উঠে গেল। অসম্ভব রকম লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়ার পর নিজের উপর রাগে দুঃখে যে কান্না আসে? শাইনা ওভারে কাঁদতে লাগলো ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে। শাহিদা বেগম সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,”তোকে দেখেনাই তো। আমি কি জানতাম নাকি ওখানে ছেলেটা থাকবে? সে তো পুকুরে গোসল করেনা।”
শাইনা তবুও থামলো না। রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলল,”তোমার জন্য বুঝে গেছে। তুমি আমাকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছ। তোমাকে কে যেতে বলেছে ওখানে?”
মা আর কোনো জবাব দিলেন না। সরে যেতেই দাদীমা এসে বললেন,

“ভাগ্যিস রায়হানের মা ছিল। নইলে..”
শাইনা দাদীমার দিকে তাকালো। বলল,”নইলে কি?”
“আর কি? ডুব দিয়ে তোর কাছে চলে আসতো। তারপর তোকে তুলে নিয়ে যেত। দোষ হতো গুইসাপের।”
শাইনা জোরে একটা চিৎকার দিল,
“বুড়িইই….

বিয়ের জমজমাট আয়োজন চলছে দুই বাড়িতেই। কথায় আছে যার বিয়ে তার হুঁশ নাই। পাড়াপড়শির ঘুম নাই।
শাইনার অবস্থা হয়েছে তেমন। ঘুমে ঘুমে দিন কাটছে তার।
শাহিদা বেগম তাকে দুধ, ডিম আর ভিটামিন জাতীয় ঔষধ খাওয়াচ্ছেন একটু স্বাস্থ্য হওয়ার জন্য। বিয়ের দিন শুকনা দেখালে মানুষ বলবে ওটা কেমন বউ। মা বাপে বোধহয় খাওয়াতে পারেনা। এখন একটু স্বাস্থ্য এসেছে। দেখতে সুন্দর লাগছে। ভিটামিন, ক্যালসিয়াম খেয়ে ঘুমের জন্য শাইনা মাথা তুলতে পারছেনা।
শপিং করার কথা ছিল পার্লারে যেদিন গিয়েছিল সেদিন রাতে। শাইনার এত জ্বর হয়েছিল সেদিন। রওশনআরা তার জ্বর দেখে পরে সিদ্ধান্ত নিলেন বিয়ের কয়েকদিন আগে শপিং হবে। এত তাড়াহুড়ার দরকার নেই। শাহিদা বেগম বলে দিয়েছিলেন শাইনা না থাকলেও সমস্যা নেই। রওশনআরা তবুও রাজী হলেন না। পরে তার কিছু অপছন্দ হলে মনোমালিন্য হতে পারে। বিয়ে নিয়ে মেয়েদের অনেক শখ থাকে।

শাইনা তার আইডি হারিয়ে অসহায়ের মতো দিন কাটাচ্ছে। শাওনকে বলতেই সে ঝাড়ি মেরে বলল, একটা আইডি গেলে দশটা খোল। তোকে কে মানা করছে?
শাইনার দুঃখ কেউ বুঝলো না। ওই বাড়ির ছেলেগুলো চিরকাল নিজেদের মর্জি অন্যদের উপর চাপিয়ে দিতে পছন্দ করে। তাজদার সিদ্দিকীর আচরণ তার কাছে স্বেচ্ছাচারিতা মনে হয়েছে। তার আইডি কন্ট্রোলে নিয়ে নিজেকে হনু মনে করছে সে। শাইনা কখনো মাফ করবেনা এসবের জন্য।
কাল শপিং করতে যাবে। রওশনআরা এসে জানিয়ে গিয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এসেছে অনেক। শাইনা সিন করেনি। ফেক আইডিতে লগইন করলো সে। নিউজফিডে তার আগের আইডির একটা পুরোনো পোস্ট ভাসছে। তখন সে সবে ফেসবুক আইডি খুলেছিল। সেই পোস্টের নিচে তিতলি একটা চোখ উল্টানো ইমুজি দিয়ে কমেন্ট করেছে।

সেই কমেন্টে হা হা রিয়েক্ট দিয়েছে তৌসিফ, তাসনুভা, তাসমীন আর তাদের অন্যান্য কাজিনরা।
শাইনার করা পোস্টটা ছিল এরকম,
“ভাবতেও লজ্জা করে একদিন আমিও বলবো ‘ছাড়ো, তরকারি পুড়ে যাচ্ছে।’
শাইনা লজ্জায়, অপমানে শক্ত হয়ে বসে রইলো।
তার এই পোস্ট নিয়ে হাসি-তামাশা করছে সবাই।
রাতে সে মেসেঞ্জারে ঢুকলো লগইন করে। সেখানে তার গালিটা সিন করেছে তাজদার সিদ্দিকী। কোনো রিপ্লাই করেনি। শাইনার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। রিপ্লাই করে গালি দিলেও এত অপমান লাগতো না।

শপিং করার জন্য রায়হানের বউ ঝিমলি, তাসনুভা, আর কনেপক্ষ থেকে শাবরিন, শাইনা গিয়েছে। ছেলেদের মধ্যে তৌসিফ ছিল। আর কনেপক্ষ থেকে শাইনার মেঝ ভাই আনিস।
শহরের নামকরা শপিংমলে এসেছে তারা। দোকানটা তাদের পরিচিত। নিজেদের মানুষ।
সব ঠিকঠাক চলছিল। সবাই মিলে বিয়ের শাড়ি, ওয়ালিমার জন্য লেহেঙ্গা, বিয়ের সেকেন্ড শাড়ি, থার্ড শাড়ি দেখছিল।
কিন্তু তাসনুভার সাথে শাবরিনের কথা কাটাকাটি লেগে গেল শাড়ি, লেহেঙ্গা চুজ করার সময়। কেউ তাদের থামাতে পারলো না।
শেষমেশ আনিস রেগে যেতেই শাবরিন তাসনুভাকে বলল,”আমি এতক্ষণ কোনো কথা বলেছি? সব তো তুমি বলছিলে। এবার আমাদের কিছু বলতে দাও। আমরা এসেছি কেন কিছু বলতে না পারলে?”
তাসনুভা বলল,”তোমাদের পছন্দ কেমন হবে জানি আমরা। আমাদের বউয়ের শাড়ি আমরাই পছন্দ করবো। তোমাদের চয়সে শাড়ি কিনবো না আমরা।”
শাবরিন অবাক হয়ে বলল,”তো আমরা এসেছি কেন? আমাদের না আনলেই পারতে। শাইনাকেও এনেছ বসিয়ে রাখার জন্য?”

তাসনুভা ঠান্ডা গলায় বলল,”না আনলে খারাপ দেখাতো তাই এনেছি।”
“তোমার কথায় চলবে ও?”
তাসনুভা ত্যাড়ার জবাব দিল,
“অফকোর্স আমার কথায় চলবে। ফাংশনে অনেক ক্লাসি লোকজন আসবে। তারা তোমাদের পছন্দ দেখলে নাক সিটকাবে।”
“আমরা আনক্লাসি বলতে চাইছো?”
“তোমাদের ক্লাস তো আমাদের জানা।”
শাবরিন ভয়ংকর রকমের রেগে গিয়ে বলল,”কি বললে? তোমার সাহস কি করে হয় এভাবে কথা বলার? এত ক্লাসি হয়ে আমাদের বাড়ির মেয়ের দিকে নজর দিলে কেন?”

তৌসিফ তাসনুভাকে ধমক দিল। টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। তাসনুভা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,”ওহ, আমাদের বাড়িতে মেয়ে বিয়ে দিয়ে নিজেদের ক্লাসি দাবি করছো? কোথাথেকে উঠে এসেছ তোমরা আমরা কি জানিনা? ভাইয়া নিজেই আমাকে পাঠিয়েছে আমার চয়েসে কেনার জন্য। আর বারণ করেছে তোমাদের চয়েসে না কিনতে। কারণ তোমাদের ভালো করে চেনে ও।”
শাবরিন শাইনার দিকে তাকিয়ে বলল,”কি রে তুই কিছু বলবিনা?”
শাইনা আপার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বলল,”কথা কি কিছু ভুল বলেছে? ওরা কেমন সেটা তুমি, আমি আর বড় আপা ছাড়া ভালো কে জানে? ওরা আমাদের কেমন চোখে দেখে তোমরা জানো না? ওরা এতগুলো আমাদের মানুষ মনে করেছে এটাই তো বেশি। ”

তাসনুভা আর তৌসিফ তার কথা শুনছে অবাক হয়ে।
শাবরিন বলল,”তুই এসেছিস কেন তাহলে? তোর কোনো পছন্দ অপছন্দ নেই?”
শাইনা এককথায় থামিয়ে দিল সবাইকে।
“নিশান পরানোর নামে আকদ পড়িয়ে দেয়ার সময় জিজ্ঞেস করেছিলে আমার পছন্দ অপছন্দের কথা? অপছন্দের মানুষকে কবুল বলেছি। অপছন্দের শাড়ি পরতে আর আপত্তি নেই।”
বলেই সে মাথায় ঘোমটা পরিয়ে রাখা শাড়িটা রেখে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখলো তাজদার সিদ্দিকী দাঁড়িয়ে আছে কাঁচের দরজার পাশে।
এই রাগী রাগী অহংকারী দাম্ভিক চেহারাটা শাইনার ভীষণ অপছন্দের। তার কত ঘৃণা লাগে সে কাউকে বলে বোঝাতে পারবে না।

হয়না এমন যে কারো চেহারা দেখলে তার করা সমস্ত অপমানের কথা মনে পড়ে তাজদার সিদ্দিকীর বেলায়ও ঠিক তেমন। শাইনার এখনো স্পষ্ট মনে আছে যে নাজিমউদ্দীন চাচা যখন সবেমাত্র আমেরিকায় গিয়ে বসবাস করা শুরু করলো তখন পুরো বাড়িতে যতগুলো ছেলেমেয়ে আছে সবার জন্য পোশাক দিয়েছিল ঈদের সময়। এই তাজদার সিদ্দিকী তার ভাইদের জন্য পাঠিয়েছিল ছেঁড়া, পুরোনো জার্সি।
তার আপাদের কোনো পোশাকই দেয়নি ফুরিয়ে গিয়েছে বলে। দাদীমা উঠোন ঝাড়ু দিতে দিতে চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছিল এই বলে যে তার ছোট ছোট নাতনিদের কেন এভাবে অবহেলা করলো? কেন কারো হাতে দুটো কাপড় উঠলো না। সবাইকে দিতে পারলে তাদের কেন নয়? মা বারণ করলেও শুনছিল না।

সেইসব শুনে বড় দাদু তার জন্য একটা ফ্রক নিয়ে এসেছিল মাগরিবের পর। ফ্রকটা তাসনুভার। তার গায়ে ছোট হয়ে গিয়েছিল বলে আর পরেনি। ওটা দিয়ে কোনোমতে সান্ত্বনা দিয়েছিল দাদীমাকে। অবশ্য ওই ফ্রকটা মা তাকে পরায়নি। পরালেও শাইনা পরতো না। ছোট থেকেই সে এমন। কেউ তার সাথে ভালো ব্যবহার করলে সে চিরকাল মনে রেখে দেবে। খারাপ ব্যবহার করলে তা মনে রেখে দেবে।
কিন্তু তার পরিবার?

তাজমহল পর্ব ৬

ওই দিনগুলোর কথা কিভাবে ভুলে গিয়েছে সবাই? আত্মীয়তা করার সুবাদে দুটো মিঠে কথা বললেই বুঝি তারা ভালো মানুষ হয়ে গেল? সে মরে যাবে। কিন্তু জীবনেও সজ্ঞানে এদের ক্ষমা করবেনা মন থেকে। তার নিজের পরিবারকেও না। তাজদার সিদ্দিকীর পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল সে। বেরিয়ে যেতে যেতে শুনলো তাজদার সিদ্দিকী কাঠকাঠ গলায় বলছে,
“অল অফ ইউ গো হোম এক্সেপ্ট শাইনা মমতাজ।”

তাজমহল পর্ব ৮