তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৯
রাফিয়া জান্নাত রিফা
ধরনীজুড়ে নেমেছে তীব্র শীতের কামড়। ভোরের আলোরাও কাঁপছে ঠান্ডার স্পর্শে। এই নির্মম শীতসকালে বউয়ের অভাবটা আজ বড়ো করে বুকে বাজছে সুন্দরের যেন তাঁর অনুপস্থিতি পুরো ভোরটাকে আরো নিষ্ঠুর, আরো নির্জন করে তুলেছে।কম্বলের উষ্ণতার খোলস ছেড়ে বাইরে আসতে মন চায় না একটুও। সূর্যি মামাও যেন রাগ করে আড়ালেই থেকে গেছে আলো আর উষ্ণতার কোনো সন্ধান নেই।বউ যদি পাশে থাকত এই শীত তো সাহস পেত না সুন্দরের কাছে আসার।
সুন্দর এখন বেশ ভয়ে আছে ,গতকাল যে গোসল করেনি! আজ করতেই হবে। কিন্তু এই বিড়ম্বনা যে এমন ঠান্ডায় গোসল করবে কী করে!গায়ে-মাথায় কম্বলটা জড়িয়ে, আধো ঘুমে ভারী, অসহায় কণ্ঠে সে যেন নিজেকেই বলে ওঠে,,
__ জীবনটা আসলেই এন্টারটিকা।
সুন্দর ভারী কন্ঠে গলা ছেড়ে গান গাইতে লাগলো,,
__ ওওও ঠান্ডা কি আর আসে একা ,
জোড়ায় থাকি কম্বল কাঁথা,
তবুও ঠান্ডা লাগে বেশি রেয়য়য়য়
ওও সূর্যি মামা,হইচে বেহায়া
থাকে শুধু লুকায়া
গোসল করতে লাগে ঠান্ডা রেয়য়
ওই শীতের জ্বালায় হইচি পাগল
আমার কি আর আছে ছাগল
জীবন যেনো এন্টারটিকারে..
জীবন রে.. ঠান্ডা রে..
ও জীবন রে,,
একা মনে প্রশ্ন শুধু জবাব খুঁজে যায়
ও শীতের দিনে মানুষ কেমনে গোসল করতে যায়।
কেউ দিবে না রে জবাব খুঁজে
সবাই মুলা খেয়ে কম্বলের নিচে
মাঝে মাঝে পাদের গন্ধ পায়..
ও মুলা রে.. ঠান্ডা রে..ও গন্ধ রে..
এত গান গেয়ে সুন্দরের এখন নিজেকে গায়ক মনে হচ্ছে। বেচারা সুন্দর বহুত কষ্টে কম্বলের নিচ থেকে নিজেকে টেনে টুনে তুললো।গা চাড়া দিয়ে কিছুক্ষণ নিঝুমের কথা ভেবে হাসলো।
ফোন হাতে নিয়েই দেখলো আজ বৃহস্পতিবার,দেখেই মুখে অন্ধকার নেমে এলো সুন্দরের।আজ তার একমাত্র বোনের গাঁয়ে হলুদ আর কাল বিয়ে।কাল চলে যাবে তার শশুর বাড়ি, সুন্দরকে একা করে,তখন সুন্দর কার সাথে ঝগড়া করবে। দুজনে চুলোচুলি করে, সুহানা রাগ করে থাকলে তখন কাকে জড়িয়ে ধরে আবার ঝালমুড়ি খাওয়াতে নিয়ে যাবে সুন্দর।বোনটা তার থেকে দুরে চলে যাবে এটা ভাবতেই সুন্দরের ভিতর ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। সত্যি বলতে সুন্দর কখনো তার বোনের বিয়ের কথা ভাবেই নি,মনে সেসব চিন্তা আসেই নি কখনো, কিন্তু করার তো কিছুই নেই আজ না হোক কাল বিয়ে তো দিতেই হবে বোনের।এক মুহূর্তে সুন্দরের ভিতরটা হাহাকারে খাঁ খাঁ করে উঠলো। অজান্তেই চোখের কর্নিশে পানি জমে উঠলো, এখন সুন্দরের ভাবনার ছেদ বিন্দু হলো সে কিভাবে তার বোনের সামনে যাবে, সুহানার সামনে গেলেই তো সুন্দর ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে খন্ড খন্ড হয়ে যাবে।
আজ বৃহস্পতিবার।
নিধি আর সুহানার গায়ে হলুদের দিন। ঘরজুড়ে হালকা হলুদের ঘ্রাণ, কাঁচা ফুলের সুবাস, আর মানুষের কোলাহল। সুহানার মা, চাচি, দাদি, মামি, মামা, খালা সবাই এসে উঠেছে বাড়িতে। বিয়েটা তেমন ধুমধামের হবে না ঠিকই, কিন্তু ঘরোয়া উষ্ণতায় ভরা, আপনজনদের হাসি-কথায় সাজানো।
নিধি আর সুহানার জন্য হলুদের সব প্রস্তুতি করে দিল ইতি, বিথী আর নিঝুম। নতুন শাড়ির রং, হলুদের দ্যুতি সব কিছুই প্রস্তুত, শুধু সুহানার মনটাই যেন কোথাও আটকে আছে।তার ভেতরটা আজ খুব অস্থির। সবকিছুই তার কাছে মনে হচ্ছে হঠাৎ হঠাৎ, একটানে বদলে যাচ্ছে জীবনের রঙ।
বাবা-মা আর ভাইকে ছেড়ে কোথায় যেন দূরে চলে যেতে হবে…নতুন মানুষ, নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ কীভাবে মানিয়ে নেবে?এইসব ভাবনাই তার বুকের ভেতর ঝড় তোলে বারবার।
এমন সময় নিঝুম সুহানাকে কাঁচা ফুলের গাঁথা মালা পরিয়ে দিচ্ছিল।মুখ তুলে সুহানাকে দেখে সে থমকে গেল।
এই উদাস, নিস্তেজ চোখগুলো তো তার পরিচিত নয়,,
__ সুহা আপু কি হয়েছে তোমার?
সুহানা টেনেটুনে হেঁসে বলে,,
__ কই কিছু না তো।
__ সবাইকে ছেঁড়ে যাবে বলে কষ্ট হচ্ছে তো।
__ ওই একটু।
সুহানাকে ইতি, বিথী, নীধি তিনজনই জড়িয়ে ধরে বলে,,
__ এত মন খারাপ করে না সোনা।
নিধি বলে,,
__ আমাদের বাড়ি থেকে অল্প একটুখানি ফারাক তোর শশুর বাড়ি,সবসময় দেখা হবে,।
সুহানা হালকা হেসে বলে,,
__ তোরই তো ভালো, এখানেই বাবার বাড়ি, আবার এখানেই শ্বশুর বাড়ি।
নিধি সুহানার গালে গাল ঘসা দিয়ে বলে,,
__ হরলিক্স ভাইয়ের সাথে রাগ করে তুই তো বাপের বাড়ি যেতে পাবি, কিন্তু আমি পাদরো ভাইয়ের সাথে রাগ করে কোথায় যাবো বল।এটা ভেবেছিস কি?
ইতি, বিথী, নিঝুম একসাথে বলে,,
__ আসলেই এটা চিন্তার বিষয়।
এই বলে চারজনই একসাথে হাসতে লাগলো।
নিধি ও সুহানাকে একই রকম করে তাজা তাজা ফুলে সজ্জিত করা হয়েছে।দুজনকেই সদ্য ফোঁটা স্নিগ্ধ শোভন লাগছে। তাদের দুজনকেই মেকআপ ও হেয়ার স্টাইল করে দিয়েছে পিকি।ফুলের মালা, কপালের টিপ, খোঁপায় গুঁজে দেওয়া কাঁচা গন্ধরাজ সব মিলিয়ে তাদের দুজনকে দেখলে মনে হয়, রূপ যেন নিজেই এসে বসেছে তাদের পাশে।
পিকি তাদের রুমে এসে বলল,,
__ সুহা তুমি কাঁদছো কেন মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে তো?
এই বলে টিস্যু পেপার দিয়ে সুহানার মুখ মুছে আবার হালকা করলে মেকআপ করে দিল।পিকি এবার নিঝুম,ইতি বিথীকে উদ্দেশ্য করে বলল,,
__ আসো তোমাদের মেকআপ করে দেই।
পিকি ধীরে ধীরে, যত্ন করে একে একে তিনজনের মুখে হালকা মেকআপের ছোঁয়া দিল। তার আঙুলের নরম স্পর্শে যেন ইতি, বিথী আর নিঝুম তিনজনই আরও প্রাণবন্ত, আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
ইতি আর বিথীর ভারী জর্জেটের উজ্জ্বল হলুদ সালোয়ার কামিজ পড়েছে। কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে আলো খেলছে।
নিঝুমও হলুদ পোশাক পরেছে তবে তারটা একেবারে আলাদা। কাপড়ের গায়ে তাঁতের সূক্ষ্ম বুনন। তিনজনকে পাশাপাশি দাঁড় করালে মনে হয়, একই রঙ হলেও প্রতিটি রঙেরই আলাদা সত্তা আছে, আলাদা সৌন্দর্য আছে।
তালুকদার বাড়ির ছাদ আজ উৎসবের রঙে রঙিন। সাজসজ্জার কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত মানুষজন; স্টেজের প্রতিটি খুঁটিনাটি তদারকিতে সদা তৎপর মোজাম্মেল চাচা। গায়ে হলুদের গন্ধমাখা উচ্ছ্বাসের পরই হবে আপন-প্রীতিতে ভরপুর মেহেদির আসর ।সেই প্রস্তুতিও চলছে সমানতালে।
এদিকে ড্রয়িং রুম যেন মহিলাদের কর্মমেলায় পরিণত হয়েছে। আয়োজনের ছোঁয়ায় তাদের কথাবার্তা, হাসির শব্দে ঘর-দেয়ালও যেন সাড়া দিচ্ছে। পুরো তালুকদার বাড়ি আজ আনন্দে উত্তুঙ্গ হইচই, ব্যস্ততা, উল্লাসে যেন প্রতিটি প্রান্ত আলোয় ভরে উঠেছে। বাচ্চাদের টুপটাপ দৌড়ঝাঁপ, চঞ্চল হাসি আর খিলখিল ধ্বনি উৎসবের আবহকে করে তুলেছে আরও জীবন্ত, আরও রঙিন।হলুদের গন্ধ ছড়িয়ে আছে চারিপাশে।
আর্দ্রের ঘরের বিছানায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসে আছে আলবান, দির্শক আর মুহিন। ভোর থেকে দৌড়ঝাঁপ করতে করতে তিনজনেরই যেন নাভিশ্বাস উঠেছে। কখন আলিফা ডাক দেন বাবা, এটি নিয়ে দে আবার একটু পরেই সিদ্দিকী বেগমের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ বাবা, টা এনে দাও ! মাঝে মাঝেই সুহানা মা-ও যোগ দেন সেই তাড়াহুড়োর তালিকায়।
এ যেন তড়িঘড়ি করা বিয়ের আয়োজনে সারা বাড়ির সমন্বয়টাই গুলিয়ে গেছে। কেউ খুঁজছে হারানো কোনো জিনিস, কেউ ছুটছে আরেকজনের ডাকে সব মিলিয়ে তালুকদার বাড়ি আজ যেন ব্যস্ততার ঘূর্ণিপাকে ঘুরছে, আর সেই ঘূর্ণিপাকের কেন্দ্রে বসে নিঃশ্বাস ফেলছে তিন সঙ্গী আলবান, দির্শক ও মুহিন।এতে চরম বিরক্তি ধরে গেছে আলবানের। আর্দ্র গায়েও হলুদ পড়ানো হবে এজন্য বেচারার মুখ শুকিয়ে খাট, কারণ আর্দ্র এমন কাঁচা হলুদের গন্ধ অসহ্য লাগে চরম বিরক্তি এতে তার। আর্দ্রকে একটু আগে তড়িঘড়ি করে মা সিদ্দিকী বেগম হুকুম করে গেলেন,,
__ এই যে লুঙ্গি, গেঞ্জি,গামছা রেখে গেলাম এসব তাড়াতাড়ি পড়ে রেডি হ।
আর্দ্রের লুঙ্গি গামছা, গেঞ্জি পড়ে নিজেকে আয়নায় দেখছে ও আলবান,দির্শক কে উদ্দেশ্য করে বলছে,,
__ মানে ভাই ,আমি বিয়ে করবো এসব রিচুয়ালের কি আছে।
আলবান ফোনে চোখ রেখেই বলে,,
__ যেয়ে দেখ তোর হবু বউ এই রিচুয়ালের খুশিতে নাচতেছে।
__ ও তো বিয়ের খুশিতে নাচতে নাচতে আমার রুমেও চলে আসে, আমার একমাত্র বউ একমাত্র বিবাহ নাচবে না তো কি করবে।
দির্শক বলে,,
__ তাহলে রিচুয়াল মানতে তোর সমস্যা কি?
__ তা তো মানতেই চাই, কিন্তু এসব হলুদ এর গন্ধে আমার বমি আসে।
আলবান ফট বলে বলে,,
__ বিয়ে না করেই প্রেগন্যান্ট?কেমনে কি?
মুহিন শব্দ করেই হেসে উঠলো সাথে দির্শক ও, আলবান লুঙ্গির গোছ ঠিক করে বলে,,
__ প্রেগন্যান্ট হবে বউ আমি না,বাই দা ওয়ে তোদের সিঙ্গের প্রো ম্যাক্স তা বুঝবে না।
দির্শক হাসতে হাসতেই বলে,,
__ ব্রো ও তো বউ থেকেও বিধবা।
আলবান বিরক্ত হয়ে বলে,,
__ ছ্যাঁ বালের বউ আমার, সারাদিন খালি ঝগড়া আর মারার ধান্দায় থাকে।
চট করে মুহিন বলে,,
__ তুমি ও তো সমান তালে ঝগড়া করো ভাইয়া?
আলবান হুঁশিয়ারি কন্ঠে বলে,,
__ খবর দার ওর সাইড নিবি না।
দির্শক বলে,,
__ আজ বোধহয় মার খেয়েছিস?
__ চুল গুলো এতো জোরে টেনেছে যে এখনো ব্যাথা আছে,বুকে কামড় দিয়েছে, নাগিনের কামড়ের ভয়ে সারা ঘর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বেড়াতে হয়েছে। আর্দ্রের কথা মতো ওকে ভালোবাসার কথা বললাম, নাগিন ভাব নিয়ে বলে”তোর ভালোবাসার গুল্লি মারি”। কত্তো বড় বেয়াদব ভাব।
আর্দ্র হাসতে হাসতে বলে,,
__ শোন ভাই ইতি গতকাল কোন কারণে খুব রেগে ছিল,তাই সব রাগ তোর উপর ঝেড়েছে।
দির্শক বলে,,
__ মন মেজাজ যেদিন ভালো থাকবে সেদিন বলিস।
__ বয়েই গেছে আমার।
আলবান কিছু একটা ভেবে বলে,,
__ বিথীকে মনে কথা তুই বলবি?
দির্শক ফেচেল হেসে বলে,,
__ আপাতত বলছি না,কখনো বলবো কিনা তাও জানি না।সেই তোরাই একসময় কেড়ে কুঁড়ে নিবি সব,দন্ডে লিপ্ত হয়ে,তখন বলবি,আমি ভুল,আমি খারাপ।যাই হোক বাদ দে,মা ডাকছে চল।
দির্শকের কথাকে আর্দ্র বেশি পাত্তা না দিলেও আলবান তা এড়োতে পারলো না,,
__ ওয়েট আ মিনিট,কি বুঝাতে চাইলি স্পষ্ট করে বল।
দির্শক হো হো করে করে হেসে বলে,,
__ আলবান ওন ফায়ার।
__ নোপ, ক্লিয়ার কর।
তখনি আলিফা বেগমের হাক আসলো,,
__ কোথায় রে ,আয় তাড়াতাড়ি।
দির্শক বলে,,
__ কিছুদিন পর এমনি সব বুঝতে পারবি?এখন চল।
তাও আলবানের মনে এক অদৃশ্য সন্দেহ কাজ করলো।
নিধি ও সুহানাকে হলুদ লাগানোর হলো,নিধি কে এখন গোসল করানো জন্য সেই তখন থেকে বলা হচ্ছে কিন্তু সে কোনভাবেই আর্দ্র ভাইয়ের হলুদ ছোঁয়া না দেখলে গোসল করবে না।সে ও আর্দ্র কে হলুদ লাগাবে,নিধির এমন জেদের কাছে তার মা ,বড় মা হার মেনে তার ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। সুহানার মন খারাপ কারণ সুন্দর তাকে হলুদ লাগাতে আসে নি সুহানা দেখেছে তার সুন্দর ভাইকে কাঁদতে,এ কারণেই সুহানাকে হু হু করে কান্না করতে ইচ্ছে করছে।
ইতি, বিথী হতাশ ভঙ্গিমায় হা হয়ে চেয়ে আছে নিধির পানে, বিথী ইতির কানে কানে বলে,,
__ এই মেয়ে বিয়ে পর যে কি করবে, আল্লাহ ভালো জানে?
ইতি বলে,,
__ কি আর করবে সারাদিন জামাই জামাই করে আর্দ্র ভাইয়ের মাথা খাবে।
দুজনেই হতাশার দীর্ঘ শ্বাস ফেলে।নিধিকে ছাদে নিয়ে যায়। ছাদের দরজার এক পাশে লুকিয়ে চুড়িয়ে দেখতে লাগলো আর্দ্রের হলুদ পড়ানো।
এদিকে আর্দ্র হো হো করে হাসছে হাসার কারণ হলো কাতুকুতি, সুহানার দাদি ও তার দাদি আছিয়া বেগম আর্দ্র এই কাতু কুকুর লাই পেয়ে আরো ইচ্ছা মতো হলুদ লাগিয়ে দিচ্ছে,সাথে গীত ও গাইছে।বেচার আর্দ্র হাসতে চাচ্ছে না কিন্তু তাও হাসতে হচ্ছে ।
তার হবু বর কে এভাবে গায়ে যেখানে সেখানে হাত দিয়ে হলুদ মাখানো টা মোটেও পছন্দ হলো না নিধির,রাগি ভাব নিয়ে বলল,,
__এই দুই বুড়ি শুরু করছেটা কি,তারা কি জানে না ওটা আমার বর,আমি ছোঁয়ার আগে তার ছুয়ে দিচ্ছে।না এটা হতে পারে না।
এই বলে দুই হাত দিয়ে শাড়ি উঁচিয়ে হনহনিয়ে আর্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল,,
__ স্টপপপপপপ।
দুই বুড়ি দাদি অর্থাৎ আছিয়া বেগম ও সাহিদা বেগম থেমে গেলেন,সাহিদা বেগম মুখ কুঁচকে বলেন,,
__ ও মলো যা,ওই মাইয়া তুই এনে কি করস।
আর্দ্র বসা উঠে দাড়ালো, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন,নিধি কোমড়ে দুহাত রেখে বলে,,
__ আমার জামাইরে হলুদ লাগালো অধিকার তোমাদের নেই,আমি হলুদ লাগাবো তাকে,আবার কাতুকুতু ও দেওয়া হচ্ছে। আমার জামাই কি সরকারি জামাই নাকি।
আছিয়া বেগম অসহায় মুখ করে আর্দ্রের দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ জান দেখ তোর হবু বউ কি বলে।
আর্দ্র কিছু না মিটিয়ে হাসতে লাগলো শুধু।এবার বেশ রাগ দেখিয়ে সাহিদা বেগম নিধিকে বলে,,,
__ তোর জামাই মানে আমগোর ও হাফ জামাই,বুঝলি?
নিধি চিৎকার করে বলে,,,
__ কিইইইইইইইইই
এমন ভাবে চিৎকার করে যে ছাদে থাকা সবাই কান চেপে ধরল,সুন্দর তখন মই বেড়ে স্টেজের উপরে ফুল লাগিয়ে দিচ্ছিলো মুহিন সেই মই ধরে ছিল,এমন চিৎকার শুনে সুন্দর মুহিনের গায়ে পড়ে মেঝেতে পড়লো,পরলো তো পরলো এমন ভাবে পড়লো যে,মুহিনের হলুদ পাঞ্জাবীর পিটের এক ভাগ ছিড়েই সুন্দর মেঝেতে পড়লো।বেচার মুহিন বুঝলো তার পাঞ্জাবির বেহাল দশা হয়েছে, পাঞ্জাবির সামন পাশ টা ঝুলঝুল করছে,মুহিন নিজের এমন বেহাল দশা দেখে রাগে দুঃখে কষ্টে সুন্দরের দিকে তাকিয়ে রইল টলমলে চোখে, সুন্দর একবার তার হাতে থাকা পাঞ্জাবির ছিড়ে অংশ কে দেখছে তো একবার মুহিনের দিকে দেখতে। সুন্দর মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ভো দৌড় দিলো নিধির দিকে।মুহিন ও চোখের পানি মুছতে মুছতে সেদিকে গেল।
এদিকে নিধি আর সুহানার দাদি সাহিদা বেগম বড়সড় ঝগড়া লেগেছে, আর্দ্র তার হাফ জামাই বলাতে নিধি প্রচুর গর্জে উঠেছে।নিধি কে আর্দ্র সহ ইতি, বিথী ও ধরে রেখেছে। ওদিকে সাহিদা বেগম কে সুন্দর আছিয়া বেগম ও মুহিন ধরে রেখেছে,পিকি হাসছে আর সব ক্যামেরা বন্দি করছে।নিধি বলে,,
__ আমার জামাইকে খালি আর একবার নিজের জামাই বলো তুমি,তারপর দেখো তোমার কি দশা করি।
সাহিদা বেগমও রেগে মেগে বলেন,
__ একশো বার কমু জামাই জামাই জামাই।
নিধি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলতে লাগে,,
__ তোরা ছাড় আমায় ইতি, বিথী আজ আমি পায়ে জুতো ছিড়বোই আমি।
বিথী বলে,,
__ ওরে নিধি থাম তুই,কি শুরু করছিস বলতো?
ইতি বলে,,
__ তোর গায়েই এতো এতো শক্তি কবে থেকে হলো নিধি?থাম নিধি থাম।
আর্দ্রের অবস্থা দেখার মতো,সে হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারছে না। অবিশ্বাস্য তার জন্য তিনটে নারীর চুলোচুলি হচ্ছে ভাবা যায়, আর্দ্র চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখতে লাগলো।
নিধি এক্সপেশনটা দেখার মতো,তাকে একবার ইতি, বিথী ছেড়ে দিলে সে এক মুহূর্তে সব লন্ডভন্ড করে দিবে ওদিকে আছিয়া বেগম ও সাহিদা বেগমের এক্সপেশন টা ও দেখার মতো। সুন্দর আছিয়া বেগম কে ধরে আছে,এই বুড়ি এতো শক্তি খাটাচ্ছে যে যেকোন সময় সুন্দর ও উড়ে যাইতে পারে, সুন্দর বিরবির করে বলে,,
__ বাবা গো এত জোর গাঁয়ে,আরে বুড়ি থাম রে থাম,আজ এগোর ভাতার নাই বইলা আমার মতো অবলা এগোরে ধইরা আছে, ছ্যাঁ লজ্জা জনক জীবন।
আছিয়া বেগম গর্জে আর্দ্রে কে বলেন,,
__ জান তুই এদিকে আয়,তুই আমাদের দলে।
সাহিদা বেগমকে ধরে আছেন মুহিন,এই মুহূর্তে সবথেকে বেশি কষ্টে আছে মুহিন, এমনিতেই তো সুন্দর তা প্রিয় পাঞ্জাবি দফারফা করে দিলো তার এই সাহিদা বেগমের শক্তির সাথে পেরে উঠছে না, এদিকে সাহিদা বেগমের মুখের চিবানো পানের টুকরো মুহিনের চোখে মুখে এসে পড়ছে,বেচার তা বারবার হাত দিয়ে মুছে ফেলছে,এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে মুহিন বলে,,
__ ওহহ দাদি আস্তে কথা কও।
সাহিদা বেগম এবার রাগ হয়ে মুহিন কে বলে,,,
__ এ চেংড়া চুপ।
এতে আরো বেশি চিবানো পানের টুকরো এসে মুখে পড়লো মুহিনের। টলমল চোখ নিয়ে আবার মুখ মুছে মনে মনে বলল,,
__ আল্লাহ কসম আর একটাও কথা বলবো না আমি।
সাহিদা বেগম নিধির দিকে তাকিয়ে আবার বলে,,
__ তোর বিয়া করা ঘুচামো আইজ, আর্দ্র আজ আমাগো দুইজনরে বিয়া করবো,দেখি তুই কি করোচ?
ব্যাস হয়ে গেলো,নিধির রাগে পা থেকে মাথা পর্যন্ত উঠে গেলো,রাগে গজগজ করে এক ঝটকায় নিজেকে ইতি, বিথীর থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সাহিদা বেগমের দিকে এগিয়ে গিয়ে,ঘটনা সামাল দিতে কিছু একটা ভেবে মুহিন নিধির সামনে এসে দাড়ালো, এবং নিধিকে বলল,,
__ নিধি আপু শাস্ত হ।
নিধি থামলো না বরং আরো গর্জে মুহিন কে বলল,,
__ সামন থেকে সর মুহিন,বুড়ি জানদের এতো বড় সাহস যে আমার একমাত্র বরের উপর নজর দে, আবার বিয়েও করতে চায়, কত্তো সাহস।
নিধির সাথে মুহিন কিছুতেই পেড়ে উঠলো না,নিধি সাহিদা বেগমের দিকে ছিঁড়ে ছুটে যাইতে চাচ্ছে। এদিকে মুহিন হলো ধস্তাধস্তির স্বীকার,নিধিকে ধরে রেখেছে ইতি বিথী।নিধির হাত অনভরত ছুড়া ছুড়ি করতে লাগলো। এবার এক পর্যায়ে রাগ দেখিয়ে মুহিনের সামনের দিকে অবশিষ্ট পাঞ্জাবির টুকরো টুকু ও ছিঁড়ে হাতে নিলো নিধি।
মুহিন গায়ে এখন সেন্ডো গেঞ্জি ও পাঞ্জাবিটার কলার ছাড়া কিছুই রইলো না। মুহিন এবার পুরো দমে স্তব্ধ হয়ে গেল।নিধি তাও থামছে না ওদিকে আছিয়া বেগম ও সাহিদা বেগমকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সুন্দর কতবার যে বেচারাকে হাত দিয়ে এক ঝটকায় ফেলে দিলো সাহিদা বেগম তার ঠিক নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাইরে তা দেখে আর্দ্র নিধি কাছে গিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,,
__ নিধি স্টপ।
এবার খপ করে আদ্রের হাত টেনে ধরে সাহিদা বেগম ও বলে,,
__ আর্দ্র তুই আমগো কাছে আয়।
অন্য হাত নিধি ধরে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে বলে,,
__ আর্দ্র আমার বর আমার কাছে আসবে।
এই বলে তাদের দুই পক্ষে টানাটানি শুরু হয় আর্দ্রকে নিয়ে, আর্দ্রের অবস্থা শোচনীয়।এমন অবস্থা দেখে ইতি, বিথী, সুন্দর মাথায় হাত দিয়ে সেখানেই বসে পড়লো। মুহিন তো ফ্যাচ ফ্যাচ করে কান্না করছে নিজের ছিড়া পাঞ্জাবির টুকরো হাতে নিয়ে।
আর্দ্র এবার বেশ রাগ হয়ে নিজেকে এক ঝটকায় সরিয়ে নিয়ে বলে,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৮
__ স্টপ, আই সেইড স্টপ।
সাহিদা বেগম ও আছিয়া বেগম থেমে গেলেন কিন্তু নিধি থামলো না। আর্দ্র এবার রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো,তাও নিজের রাগকে সংযত রেখে,নিধিকে কোলে নিয়ে চলতে লাগলো,নিধি তাও থামছেই,পা ছুড়াছুড়ি করেই যাচ্ছে। আর্দ্র সেসব কে পাত্তা না দিয়ে এগোতে লাগলো।
এদিকে মুহিনের অবস্থা দেখে ইতি বিথী,ও সুন্দর হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়াগড় খাচ্ছে।
