Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩২

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩২

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩২
রাফিয়া জান্নাত রিফা

ড্রয়িংরুম জুড়ে নেমে এসেছে শীতল, ভারী নিরবতা। ইতির সামান্য ভুলটুকুও আলবান মেনে নিতে পারছে না তার চোখেমুখে জমে আছে বিস্ফোরণের আগের সেই দমবন্ধ করা রাগ, এক অব্যক্ত যন্ত্রণা যা তাকে ভিতর থেকে গ্রাস করছে।

ট্রি-টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কাবিননামার কাগজ সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। তালুকদার বাড়ির মানুষগুলো যেন বোবা হয়ে গেছে সবকিছুই তাদের মাথার ওপর দিয়ে ঝড়ের মতো বয়ে যাচ্ছে। ইতি আলবানকে বিয়ে করেছে এই সত্যটি তারাএখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।
নাঈম তালুকদারের মুখে তাকাতেই এক অন্ধকার ছায়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটু আগেই আলবান যে ইতিকে আরেকটি থাপ্পড় মেরেছে এ নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন নাঈম তালুকদার এবং নাজিম তালুকদার দুজনেই।
থাপ্পড়ের কারণটিও তুচ্ছ আলবানের কথা শেষ হওয়ার আগেই ইতি তাড়াহুড়ো করে প্রতিবাদ জানিয়ে ফেলেছিল। কারণ একটাই ইতি কোনোভাবেই চায় না তাদের বিয়ের কথা বাড়িতে জানাজানি হোক। সেই তর্কের মাঝেই বজ্রপাতের মতো নেমে আসে আলবানের থাপ্পড়।

আঘাতের চাপে ইতি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, আলিফা বেগম দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলেন। মেয়েটার দুই গাল এখনো জ্বলছে লালচে রঙে ফুটে উঠেছে পাঁচ আঙুলের স্পষ্ট চিহ্ন। তার নিঃশ্বাস যেন কেঁপে কেঁপে বেরোচ্ছে; ব্যথার সঙ্গে অপমানের আগুনও সেখানে মিলেমিশে আছে।
বাড়ির চারদিকে অতিথিদের ভিড়, চারপাশে গুঞ্জন-গমগম শব্দ তবু সেই কোলাহলের মাঝেও আলিফা বেগমের বুকের ভিতরটা যেন থরথর করে কেঁপে উঠছে। আলবানের সেই উগ্র, আগুনমাখা রাগ পরে কত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে তা তিনি খুব ভালোই জানেন।

কিন্তু ইতি সে তো ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার মেয়ে নয়। আলবানের কঠোর বাক্যের মাঝেই সে নিজের কথা দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করে চলেছে। তার সেই দৃঢ়তা যেন আরও প্রজ্বলিত করে তুলছে আলবানের ক্রোধকে।
আলবান যেন মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলো তবে সে পেরে ওঠেনি মুহিন, পিকি আর আর্দ্র তাকে শক্ত হাতে আটকে রেখেছে। তাদের ধরা না থাকলে পরিস্থিতি যে কতটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত, তা আন্দাজ করতে আলিফার আর বাকি নেই।
এই বিশৃঙ্খল দৃশ্য, ঘরময় অতিথিদের উপস্থিতিতে এমন আচরণ কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না নাজিম তালুকদার। তিনি রাগে গর্জে উঠলেন, তার কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই সবার কথাবার্তা স্তব্ধ করে দিলো,,

__ নিজেকে সংযত রাখো আলবান,নাহলে এর পরিনাম ভালো হবে না।
আলবান ও প্রবল রাগ নিয়ে বলে,,
__ কালনাগিনীকে আমার কথার মাঝে কথা বলতে মানা করে দিন,ওর গলা দিয়ে আর একটা আওয়াজ বেরোলে ওর গলা এখানেই চিড়ে ফেলবো?
নাঈম তালুকদার কোনো শব্দ উচ্চারণ করলেন না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দৃশ্য যেন তার অন্তরের সমস্ত পরাজয়ের প্রতিচ্ছবি। দুই মেয়েই তার ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করেছে সেই আঘাতই তাকে ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। যেন নিজের সংসারেই তিনি অচেনা এক মানুষ হয়ে পড়েছেন; এই বাস্তবতাই তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
ইতি বাবার মুখে সেই গভীর অসহায়তার রেখা দেখতে না পেরে আর স্থির থাকতে পারল না। মুহূর্তেই ছুটে গেল বাবার দিকে। তার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা স্বরে, আকুল আবেদন ভরা কণ্ঠে বলল,,

__ বাবা, ও বাবা আ আমি ওনাকে বিয়ে করিনি, জঙ্গলের লোকগুলো জোর করে বিয়ে দিছে বাবা আমি এ বিয়ে মানি না,আমি আপনার বাধ্য মেয়ে বাবা আমায় ভুল বুঝবেন না, প্লিজ।
নাঈম তালুকদারের মাথা নত ই রইল,কিছুক্ষণ ভেবে ইতি ফের বলে,,,
__ ডি ডিভোর্স পেপার রেডি করো আমি ডিভোর্স দিয়ে দিবো।
মা,আলিফা বেগমের,আর নাজিম তালুকদারের দিকেও একই কথাটি উচ্চারণ করবে ভেবে ইতি ঘুরতেই আচমকা এক শক্ত, পোক্ত হাত তার দুই গাল চেপে ধরল। ব্যথায় ইতি তীক্ষ্ণভাবে ককিয়ে উঠল চেষ্টা করল হাতটা সরাতে, মুক্ত হতে কিন্তু সেই আঘাত-সহনশীল চাপ থেকে নিজেকে আর ছাড়াতে পারল না।
মুহূর্তের মধ্যে আলবান তাকে পেছনে ঠেলে দেয়ালের গায়ে চেপে ধরল। তার চোখে জমাট ক্রোধ, শ্বাসে দমবন্ধ করা উত্তাপ। দাঁতে দাঁত চেপে, বিষণ্ন কঠোর কণ্ঠে সে বলল,,

__ডিভোর্স দিবি তুই? ডিভোর্সের মানে জানিস তুই? বিয়ের মানে জানিস কিনা এটাই নিয়ে সন্দেহ। কী জানিস তুই! জানিস তো শুধু ঝগড়া আর মানুষকে বোকা বানাতে।
আরে, ওই অপ্রত্যাশিত বিয়ে আমার থেকে তোরই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এদিকে, এই বিয়েকে নতুন একটা রূপ দেওয়ার জন্য আমি ছটফট করছি। কেন করছি? ভালোবাসি বলে! ফাকিং ইয়োর ভালোবাসা…
বিয়ের সেই প্রথম দিন থেকেই স্বপ্নে এসে জ্বালিয়ে মারছিস আমায়। একটা মেয়ে দেখলেই মনে পড়ে বিয়ে করেছি, বউ আছে আমার। আর এখন ডিভোর্স চাস? পায়ের তলে পিষে মারব ডিভোর্সের নাম মুখে আনলে!
ইতির শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আলবানের এক হাতে চেপে ধরা তার গাল, আর অন্য হাতে ইতির গলা দুই দিক থেকেই অকস্মাৎ সেই নির্মম চাপ। শ্বাসরোধের কষ্টে ইতি অনবরত কাশতে লাগল চোখ লাল হয়ে উঠল, পুরো দেহ কাঁপছে তার।
আর্দ্র, পিকি আর মুহিন মিলে আলবানকে পিছন থেকে ধরে রাখলেও তার ক্রোধে শক্ত হয়ে যাওয়া দেহটিকে একচুলও নড়াতে পারছে না তারা। যেন সে পাথরে গাঁথা কোনো বর্বর শক্তির প্রতিমা।হতাশা আর আতঙ্কে কাঁপা গলায় আর্দ্র বলল,,

__ আলবান কি করছিস টা কি,ছাড় এখন।
আলবান ইতিকে ছাড়লো না বরং এবার ইতির মা সিদ্দিকী বেগম কে গলা উঁচিয়ে বলতে লাগলো,,
__ দোষ তোমার মেজো মা তুমি একে শিখাতে পারো নি বিয়ের নামক পবিত্র বন্ধনে অর্থ। ভেবেছিলাম আর যাই করুক বিয়েটা মানবে সে,আমি কি ওরে বিয়ে করার জন্য মরে যাচ্ছিলাম,নেহাতই জঘন্য জায়গায় ফেঁসে গেছিলাম বলে।
ইতি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেই খিঁচুনি কন্ঠে বলতে লাগলো,,

__ আমি আগেও বলছি এখন ও বলছি এই বিয়ে আমি মানি এর থেকে বেশি কথা বলাতে বাধ্য করবেন না আমায়,এর ফল আপনার জন্যই ভালো হবে না।
ব্যাস আলবানের রাগ যেন মুহূর্তেই দশগুণ বেড়ে গেল। সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ক্রোধে ইতি তার কাছ থেকে ছিটকে পড়ল এক ধাক্কায়। আলবান আবার হাত তুলল আরও একটি প্রচণ্ড চড় মারবে বলে। ঠিক সেই ক্ষণেই, ঝড়ের বিপরীতে বজ্রের মতো তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এসে বিথী আলবানের হাতটি শক্ত করে ধরে ফেলল।,,
__ ইতি সরে যা।
আলবানের হাতের জোরের সাথে নিজের হাতটা পুরুষালী শক্তির সাথে পেরে উঠতেই হিমশিম খাচ্ছে বিথী,,

__ দাবানল ভাই থামো।
ইতি হেঁচকি তুলা কন্ঠে ধীরে বলে,,
__ তোরা কখন এলি।
__ এই এলাম মাএ।
বিথী অসহায় কন্ঠে আলবান কে বলে,,
__ আবার আমাকে থাপ্পর মারিয়েন না,যে রেগে আছেন।
__ ছাড় আমায়।
বিথী আলবানের হাত ছেড়ে দিয়ে ইতিকে নিজের পিছনে রেখে বলল,,
__ আমি হলে কিন্তু আরো থাপ্পড় মারতাম ?
আলবান বলে,,
__ কি?
__ না মানে ইতিকে থাপ্পড় মারতাম এই আর কি,হিহি।

বিথী হো হো হাসলো, ভাবছিলো তার হাসিতে হয়তো সবাই হাসবে কিন্তু তা আর কই হলো বরং সবাই সবাই তাকে গিলে খাওয়া চোখে দেখতে লাগলো। আলবানের রাগ এখনো কমে নি রাগ নিয়েই সবাইকে উদ্দেশ্য করে,,
__ বিয়ের ব্যবস্থা করো,কালকেই বিয়ে করবো আমি?
ইতি চোখ বড় বড় করে বিথীর পিছনে লুকিয়ে বিথী কে খুচা দিয়ে কানে কানে বলল,,
__ কাকে বিয়ে করবে, বল তো?
কথা খানা বিথীর আগে আলবানের কানে পৌঁছালো, দাঁতে দাঁত চেপে আলবান বলল,,
__ তোকেই করবো?
__ ইহহহ বয়েই গেছে আমার,বিয়ে করতাম না আপনারে।
আলবান রাগ নিয়ে তেড়ে গেল ইতি দিকে,ইতি এক দৌড়ে চলে গেলো আলিফা বেগমের নিকটে এবং বলল,,
__ তোমার ছেলেকে বিয়ে করবো না বড়মা, সেদিন ওই লালা পড়া পাগলিটার কথা বলছিলাম না,ওরে এনে বিয়ে দিয়ে দাও তোমার ছেলেকে, তাও আমি বিয়ে করবো না,এখন আমায় বাঁচাও।
বাড়ির সবাই হতবাক হয়ে আছে মুখে কারো শব্দ নেই কি বলবে তারা তাদের কথা বলার কোন সুযোগটাই দেওয়া হচ্ছে না।
আলবান আবার তেড়ে আসে ইতির কাছে থাপ্পড়ের ভয়ে ইতি দুগালে হাত দিয়ে দৌড়ে চলে যায় নাজিম তালুকদারের কাছে এবং বলে,,

__ ওনাকে বাল্যবিবাহের কেস দিয়ে জেলে ঢুকায় দিয়েছিলাম বড় বাবা,সেই রাগেই উনি আমায় বিয়ে করতে চাচ্ছে,এখন ওনার সাথে বিয়ে দিলে, নিশ্চিত বিয়ের পর আমায় খালি থাপ্পড় মারবে, তারপর আমি ও মারবো তাকে কিল, ঘুষি,চুল ও টানবো।,
তখন আপনার ছেলেকে মারার কারণে রাগ করে আমাকে আর প্রতিদিন সকালে ১০০ টাকা করে দিবেন না এটা মেনে নেওয়ার মতো না।তার থেকে এটাই ভালো ওনাকে আমি বিয়েই করবো না,দয়া এখন দাবানল ভাইয়ের হাত থেকে বাঁচান।
এই পর্যায়ে নাজিম তালুকদার ইতির এমন কথায় হেসে উঠলেন, আলবান আবার তেড়ে এসে বলতে লাগলো,,

__ তুই বিয়ে করবি না,তোর ঘাড় করবে।
ব্যাস ইতিকে ধরার জন্য নাজিম তালুকদারের চারদিকে ঘুরে ঘুরে দৌড়াতে লাগলো দুজনেই। নাজিম তালুকদার হকচকিয়ে দুজনেই থামানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু পেলো না,রাগ দেখিয়ে চিৎকার করে বললেন,,
__ আলবান থামো, দুজনেই থামো বলছি।
আলবান থেমে গেলো, নিঝুমের চোখে মুখে এক বিষন্নতা ছেঁড়ে আছে,হয়তো আলবানের জন্য, কিশোরী বয়সের প্রথম প্রেমের জোয়ার ছিলো আলবান,যদিও তা একপক্ষিক তবুও সুন্দর অনুভূতি ছিলো,সুন্দর নিঝুমের সেই ব্যথিত দৃষ্টি খুব ভালোভাবেই লক্ষ করল। নিঝুমের চোখে যেভাবে ব্যাথায় কাঁপছিল সেটা তাকে অস্বস্তি, ক্ষোভ আর আশঙ্কার মিশ্র অনুভূতিতে দগ্ধ করে তুলল। আর ঠিক তখনই, নিজের আবেগ সামলাতে না পেরে সুন্দর তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে বলল,,

__ খামসসসসসসসসসস
হিরোদের মতো করে এন্টি নিলো,তা দেখে সুন্দরের বাবা মুখ কুঁচকে বলল,,
__ তোর আবার কি হলো।
সুন্দর মাথাটা নুইয়ে লজ্জা লজ্জা ভাব করে বলতে লাগলো,,
__ ওই শীত এসেছে তো তাই আর কি?
সুন্দরের কথার মানে কেউ বুঝতে পারলো না, সাফিন তালুকদার গম্ভীর কন্ঠে আবার বলেন,,
__ মানে।
সুন্দর নিজের শার্টের কলার দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে বলে,,

__ মানে ওই আরকি,এই শীতে আমার ও যদি বিয়েটা দিতেন।
উপস্থিত থাকা আত্নীয় স্বজন সবাই হতবাক হয়ে গেল।এই নীরবতার মাঝেই সাফিন তালুকদার ধীরে ধীরে নিজের পায়ের জুতো খুলতে খুলতে কঠোর, ভারী কণ্ঠে বলল,,
__ বিয়ে করবি তাই না, ছোটাচ্ছি বিয়ে করা।
জুতো খোলা দেখে সুন্দর লুঙ্গি চিপে ধরে নিজের ঘরে ভো দৌড় মারলো। সুন্দর এমন এলোমেলো দৌড় দেখে হাসতে না চেয়ে হো হো করে হেসে উঠলো সবাই।
নাজিম তালুকদার ইতিকে বলে,,
__ আলবান কে বিয়ে করতে তোমার সমস্যা কোথায় মা।
ইতি আবাক হয়ে মাথা নিচু করে বলে,,

__ আমাকে বিয়ে করে অনেক মারবে।
__ মারবে না আম্মা জান।
কথাটা বললেন ইতির ছোট চাচ্চু নাজির তালুকদার। নাজিম তালুকদার বলে,,
__ বিয়ে করবে না কি না,এবার তোমার সিদ্ধান্ত।
ইতি ঢোঁক গিলে মাথা নিচু করে রইল ভাবতে লাগলো বিয়ে যদি সে করতেই না চায় তাহলে কেন অন্য ছেলেদের দেখলে মুখ দিয়ে বের হয়,,
__ এ্যাঁ ছ্যাঁ আমার বরের মতো সুন্দর কোন ছেলেই হয় না।
অন্য ছেলেদের কেন ইতির ভালো না,তাহলে কি ইতি ভালোবাসে আলবানকে। ভালোবাসা তো পরের কথা এখন তো ইতির ভয় হলো তাকে তো বিয়ের পর আলবান মারবে খুব।
ইতির নিরবতাই সম্মতির লক্ষণ ভেবে নিলো প্রতেকেই, নাজিম তালুকদার নাঈম তালুকদারকে বলে,,
__ কি রে, তোর এই মেয়েকেও বউমা বানালাম কিন্তু?
মাথা নিচু করেই নাঈম তালুকদার বলেন,,

__ কি করবে করো তোমরা।
বিথী এবার চরম বিভ্রান্তি ও আতঙ্কের সীমায় পৌঁছালো। সে মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে, পুরো দেহ নাড়াচাড়া করতে করতে, হাহাকার আর শূন্যচেতনার মিশ্রিত কণ্ঠে বলতে লাগল,,
__ দুজনেরই বিয়ে হলে আমি কি করবো,আমার ও বিয়ে দিয়ে দাও বাবা,বড় বাবা,আমি ও বিয়ে করবো।
বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
একটু থেকে বিথী ফের বলে,,
__ কিন্তু আমি বিয়েটা করবো কারে। আল্লাহ,এ কেমন দিন দেখাইলা আমারে।
বিথী চরম উচ্চতর লজ্জাজনক কথা বলছে তা আর বুঝতে বাকি রইল না ইতি,নিধি।ভয় লজ্জা আতংকে উঠলো মেয়ে দুটো।আর কিছু না ভেবে বিথীকে মেঝে থেকে টেনে তুলে নিজের ঘরে দৌড় লাগালো ইতি,নিধি।
সিদ্দিকী বেগম এতক্ষণ যাবৎ নিরব হয়ে দেখে গেলেন তার মেয়েদের কান্ড,আবাক হবে হাসবেন নাকি কাঁদবেন বুঝতে পারছে না ঠিকঠাক।
কিন্তু নাজিম তালুকদার ও আলিফা হেঁসে উঠলেন। নাঈম তালুকদার হতাশার নিঃশ্বাস ফেললেন।

নাঈম তালুকদারের সামনে বসা আলবানকে প্রশ্ন করেন,,
__ কি এমন পরিস্থিতি হয়েছিল যা তোমাকে ইতিকে বিয়ে করতে বাধ্য করেছে?
একটি ঘরে সবাই বসেছে ইতি ও আলবানের বিয়ের অতীত ঘটনা নিয়ে।ঘরে উদ্বৃত্ত হয়ে বসে আছে আলবানের কথা শোনার জন্য।
আলবান কোন ঘোর প্যাঁচ না রেখেই বলতে লাগলো,,

__ চার বছর আগে এসেছিলাম একটা ব্যাংক হ্যাকিং কাজে। আর্দ্রকে না বলে এসেছি আমার জানা ছিলো না যে এসব শত্রুপক্ষের একটা ফাঁদ ছিল। সেদিন শনিবার ছিল, মুখে মাস্ক পড়া অবস্থায় ক্যাডেট স্কুলের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আমার গন্তব্য ছিল তার ওপাশের জঙ্গল। ঠিক সেই রাস্তাতেই দেখা হলো ইতির সাথে।
কালনাগিনী চোখ দেখেই চিনে ফেললো আমাকে ব্যাস, বকবক করে মাথা খেতে শুরু করল। নিধি ও বিথী তখন ছিলো না। ইতির সাথে কথা বলার সময় শত্রুপক্ষ সব দেখছিল, আর ভাবছিল যে কালনাগিনীই আমার দুর্বলতা। কালনাগিনীর সঙ্গে কথা শেষ হলে আমি আমার কাজে চলে গেলাম। কে জানে, ইতি আমার পিছু নিচ্ছিল। ব্যাস, সেখান থেকে একটা মাইক্রোবাস তুলে নিল ইতিকে।

কিছুক্ষণ পর আমাকে ফোনে মুখ বাঁধা অবস্থায় ইতির ছবি পাঠালো। তাদের শর্ত ছিল, “ব্যাংকের একাউন্ট যাতে সিস করা না হয়।” ওটা একটি অবৈধ ব্যাংক ছিল, প্রচুর পরিমাণ সুদ গ্রহণ করতো তারা। যে ইতিকে তুলে নিয়েছিল, তার ফোন নাম্বার হ্যাক করে পশ্চিমের জঙ্গলে গেলাম। তাদের সব কথা মেনে নিয়ে ইতিকে ছেড়ে দিতে বললাম। কিন্তু তাদের এবার চোখ পড়লো ইতির শরীরের দিকে। যেহেতু আমি একা ছিলাম, তাই তারা সেটারই ফায়দা লুটবে।
ইতিকে দিকে নোংরা দৃষ্টি দেওয়া সহ্য হলো না আমার ইচ্ছা মতো এলোমেলো মারতে শুরু করলাম। তারা ছিল প্রায় দশজন,আমি একা, তাই প্রতিহত করা কঠিন ছিল।
হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হলো সেই বৃদ্ধ দাদু। “আজও আমার কাছে সব ধোঁয়াশা, কারণ সেদিন হঠাৎ দাদু কোথা থেকে এলো,এটা এখনো ঘুরপাক খায় আমার মাথায়।” দাদু এসে আত্নস্নিকভাবে গুন্ডাদের মারতে মারতে বলতে লাগলেন, ইতি আমার বিবাহিত বউ। আমি প্রচুর অবাক হলাম।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই দাদু আমার দিকে রেজিস্ট্রি পেপার ও পেন ছুড়ে দিয়ে বললেন,

_বিয়ে করে নাও, আলবান, সময় নষ্ট করো না।”
দেখেই গেলাম হঠাৎ দেখলাম দাদুর গলায় একজন লোক ছুরি ধরে বলছে,
_বিয়ে কর, এখনি এই মুহূর্তেই এই মেয়েটাকে।
মানে, ওই গুন্ডারাই এবার ইতিকে আমার সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগলো। দাদুর গলায় ছুরি ধরে রাখার দৃশ্য সহ্য হলো না। ইতির দাদু, তার প্রিয়জন হওয়ায়, ইতিকে চিৎকার করতে শুরু করলো।
আমি তাদের কথা কিছুতেই শুনলাম না। এক পর্যায়ে দাদুর গলার একটি অংশ কেটে রক্ত বের হতে লাগলো। দাদু তখন করুণ স্বরে বললেন,

_আলবান, বিয়ে করো। এই দাদুর অনুরোধ রাখো।
সেই মুহূর্তে আর কিছু ভাবার অবকাশ ছিল না আমার ।আমি রেজিস্ট্রার পেপারে সই করে দিলাম। ইতিও, দাদুর এমন অবস্থার দেখেশুনে, কিছু না ভেবে সই করে দিল।
এবার হলো আরেকটি টুইস্ট , পুলিশের গাড়ির আওয়াজ শুনে সবাই পালাতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর ঘটলো আরও একটি ঘটনা দাদু তিনজনকে মারছে। ছুরি দিয়ে আঘাত করেছে। হতবুদ্ধিতে একটি লোকের পেট থেকে আলগা ছুরিটা বের করি, কারণ তার বাঁচার সুযোগ ছিল। ব্যাস, লোকটির পেট থেকে ছুরি বের হওয়া দেখেই ইতির মনে হলো, আমি একজন খুনি।
মজার ব্যাপার হলো, আমার হাতে থাকা ছুরিটা নিয়ে দাদুও পালালো। পুলিশ দাদুকে ধরার চেষ্টা করলো, কিন্তু পেলো না। পুলিশের কাছে খুনি হলো দাদু,আর ইতির কাছে খুনি হলাম আমি।
ব্যাস, তখন থেকেই শুরু হলো ইতির এক আতঙ্কিত মন। ঘৃণার চোখে সে দেখতে লাগলো আমাকে। আমার কথা তার কানে গরম শিশার মতো শুনতেই চাইছিলো না। অনেক জোর জবরদস্তি করে বুঝালাম,

_যাতে আমাদের বিয়ের কথা কাউকে না বলে।
অনেক কষ্টে বুঝিয়ে, সুস্থিরভাবে, গাড়ি করে বাড়িতে পৌঁছে দিলাম। সেই দিন বাড়িতে আসা সম্ভব হত না। পরদিনই আবার ইউএসএ চলে যাই।
আলবান আলিফা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
_তোমাকে সেদিন ফোন দিয়ে ইতির খোঁজ নিয়েছিলাম, মা। মনে আছে?
আলিফা বেগম কিছুতেই মনে করতে পেলেন না। আলবান ফের বলে,,

__কোনো এক দল ইচ্ছা করেই এমন ফাঁদ পেতে আমাকে আর ইতিকে বিয়েতে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু কেন বা কোন উদ্দেশ্যে সেটাই এখনো অজানা।
ভাবো, শুধু ইচ্ছাকৃত ভুল বোঝাবুঝিতে এমন আকস্মিক বিয়ে সম্ভব? না এর পেছনে নিশ্চিতভাবে কারও পরিকল্পনা আছে।আমি ইউএসএ থেকে ফিরে সেদিন যে গুন্ডাটাকে ধরেছিলাম।তাকে এত মারধর করেছিলাম যে হাড়ভাঙা অবস্থায়ও মুখ খুলতে রাজি হয়নি। ওর চোখে আমি দেখেছি সে ভয় পাচ্ছিল মৃত্যু থেকে নয়, বরং কাউকে বিশ্বাসঘাতকতা করার ভয়ে। মানে, যাদের হয়ে সে কাজ করছিল, তারা এতটাই শক্তিশালী যে সেই গুন্ডা মারা গেলেও নাম বলতে চায়নি।
উপস্থিত থাকা আলবানের সকল পরিচিত স্বজনেরা এই কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে রইল; অনেকের চোখ যেন কোটা থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩১

সিদ্দিকী বেগমের মনে হঠাৎ সেই দিনটির ছবি ভেসে উঠল তার মেয়েকে সে তখন বিধ্বস্ত, অসহায় অবস্থায় দেখেছিল। অন্তরে অজানা আতঙ্ক ঘেঁষে উঠল; মনে হলো যেন কিছু ভয়াবহ ঘটেছে তার মেয়ের সঙ্গে। না হলে সাদা স্কুল ড্রেসের ওপর মাটির দাগ কীভাবে লেগে গেল? প্রথমে ভাবল, হয়তো পড়ে গিয়েছিল মাটিতে।
কিন্তু কাজের ব্যস্ততার চাপে, মেয়ের সঙ্গে সেই ঘটনা নিয়ে কোনো কথাই বলতে পারল না। সেই অবহেলিত ক্ষণগুলোই আজ মনে এক বিশাল চাপের মতো ফের ফিরে এলো।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৩