তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৪
রাফিয়া জান্নাত রিফা
আজ ২৭ মার্চ। আজ রাতেই দির্শকের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। পুরো কারাগার যেন সেই খবরকে ঘিরে এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনায় আবদ্ধ ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে গেল ফাঁসির রায় স্থগিত করা হয়েছে।
খবরটি মুহূর্তেই জেলখানার প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ল। বন্দীদের মধ্যে শুরু হলো নানা গুঞ্জন, সন্দেহ আর জল্পনা। কেউ বলল, “হঠাৎ করে ফাঁসি বন্ধ হলো কেন?” আবার কারও মনে প্রশ্ন জাগল, “তবে কি ম্যাজিস্ট্রেট মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়েছে?” পুরো পরিবেশটাই যেন এক অজানা রহস্যে ঘেরা হয়ে উঠল।
জেলখানায় একটি বড় প্রজেক্টর রয়েছে, যেখানে বন্দীদের মামলার অগ্রগতি ও জামিনের তারিখ প্রদর্শন করা হয়। সেখানেই দির্শক দেখল তার ফাঁসি আর হচ্ছে না, পরিবর্তে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এই সংবাদে খুশি হওয়ার কথা থাকলেও, দির্শকের মনে আনন্দের চেয়ে বিস্ময়ই বেশি কাজ করল। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না এত বড় একটি রায় এভাবে হঠাৎ করে কীভাবে বদলে যেতে পারে!
মনের ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। হতভম্ব দির্শক দ্রুত পা বাড়াল নাজিম তালুকদারের দিকে। তখন তিনি যোহরের নামাজ আদায় করছিলেন। নামাজ শেষ করে দির্শককে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি মৃদু হেসে বললেন,,
“হঠাৎ আমার কাছে এলে যে?”
দির্শক কিছুটা অস্থির কণ্ঠে বলল,
“আজ আমার ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন শুনছি, সেটা আর হচ্ছে না। এটা কীভাবে সম্ভব?”
নাজিম তালুকদার হালকা হাসলেন।
“ভাবতে পারো, সবার মোনাজাতে তোমার জন্য কান্না করে মঙ্গল কামনা করার ফল এটা।”
দির্শক মাথা নাড়ল।
“আমি সেটা বলছি না… আমি জানতে চাই, একটা রায় এভাবে হঠাৎ করে বদলে যায় কীভাবে?”
তার কণ্ঠে তখন স্পষ্টই ধরা পড়ছিল বিস্ময়, সংশয় আর এক অদৃশ্য ভয়ের মিশ্রণ।
“তুমি নির্দোষ। তুমি যাদের হত্যা করেছ, তারা এই দেশ ও সমাজের জন্য অভিশাপ ছিল পুলিশ যাদের খুঁজে বেড়াত, যারা ছিল ধর্ষক, মাদক ব্যবসায়ী, গুন্ডা, খুনি। তুমি তাদেরই শেষ করেছ। তোমার সেই সৎ কাজগুলোই আজ তোমাকে রক্ষা করেছে, দির্শক।
তোমার কি মনে নেই, তুমি কত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছ? ক্ষুধার্তদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছ, অসহায়দের জন্য তিনবেলা আহারের ব্যবস্থা করেছ। শিশুদের পড়াশোনা, পোশাক সবকিছুর দায়িত্ব নিয়েছ তুমি। তোমার কাছে তাদের অগাধ ঋণ।
বলতো, তারা কীভাবে তোমার ফাঁসি হতে দিত?
তোমার জন্যই তারা গত সাত দিন ধরে আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান নিয়েছিল। তোমার ফাঁসি বাতিলের দাবিতে তারা একত্রিত হয়েছিল। পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে, তবুও তারা পিছু হটেনি। নিজেদের দাবিতে অটল থেকেছে।
তবে এসবের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা যার… সে হলো বিথী। সবকিছু মূলত ও-ই সামলেছে।”
এতক্ষণ নাজিম তালুকদারের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল দির্শক। কিন্তু ‘বিথী’র নাম উচ্চারিত হতেই সে যেন চমকে উঠল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,,
“ওর কিছু হয়নি তো?”
নাজিম তালুকদার হালকা হেসে বললেন,
“আমার জানা মতে, না। তোমার ভালো কাজই আজ তোমাকে বাঁচিয়েছে, দির্শক। আল্লাহ তোমার সঙ্গে আছেন। তুমি কোনো অন্যায় করোনি। বিথী শুধু বুদ্ধি খাটিয়ে সবকিছু সংগঠিত করেছে, এই যা।”
দির্শক কিছুই বলতে পারল না। কী অনুভব করবে, তাও যেন বুঝে উঠতে পারছিল না। একবার নাজিম তালুকদারের দিকে তাকাল, তারপর নীরবে মাথা নিচু করে সেখান থেকে চলে গেল।
আদালত প্রাঙ্গণে তখন উৎসবের মতো হইচই। জড়ো হওয়া মানুষের চোখে জল, কিন্তু সেই জলের ভেতরেই লুকিয়ে আছে স্বস্তির হাসি। কিছুক্ষণ আগেই ঘোষণা করা হয়েছে দির্শকের ফাঁসি আর কার্যকর হবে না।
সাত দিনের অবিরাম সংগ্রামের ফল আজ তারা হাতে পেল।
এই সাত দিন তারা কী যে কষ্ট করেছে! কনকনে ঠান্ডায় রাত কাটিয়েছে খোলা আকাশের নিচে। পুলিশের লাঠিচার্জও সহ্য করেছে, তবুও একচুল নড়েনি। নিজেদের দাবিতে অটল থেকেছে শেষ পর্যন্ত।
ভিড়ের মধ্যে ছিল ইতি, বিথী, নিধি আরও অনেকে। তবে সবার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছে বিথী। পুরো আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সে-ই।
অন্যদিকে, আলবান ও আর্দ্র এসব বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানত না। আজই তারা পুরো ঘটনাটা জানতে পারল আর বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
তালুকদার বাড়ির সবাই নাঈম তালুকদার, নাফিস তালুকদার, সিদ্দিকী বেগম, আলিফা বেগম, মিলি বেগম, মুহিন, মিশকাত, নিঝুম, সুন্দর, সুহানা, হরলিক্স, পিকি, আলবান, আর্দ্র এক এক করে আদালত প্রাঙ্গণে এসে জড়ো হলো।
ইতি, বিথী আর নিধি তো আগের দিন থেকেই সেখানে অবস্থান করছিল।
দির্শকের ফাঁসি ঠেকানোর প্রথম এই ভাবনাটা এসেছিল বিথীর মাথায়। সে দির্শকের স্থায়ী বসবাসের এলাকায় গিয়ে মানুষের কাছে সব খুলে বলে। দির্শকের ফাঁসির খবর শুনে সেখানকার মানুষজন যেন ভেঙে পড়েছিল অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। কারণ, দির্শকই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা তাদের খাবার, পোশাক কোনো কিছুরই অভাব সে হতে দেয়নি।
তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল দির্শক খুন করতে পারে না। আর যদি করেও থাকে, তবে তারা নিশ্চয়ই দেশ ও সমাজের শত্রুই ছিল।
এই বিশ্বাস থেকেই সবাই একত্রিত হয়ে আন্দোলনে নামে। ইতি, বিথী আর নিধির নেতৃত্বে শুরু হয় মিছিল। রাত জেগে তারা বড় বড় অক্ষরে প্ল্যাকার্ড লিখেছিল,,
“দির্শক প্রধানের ফাঁসি চাই না।”
টানা সাত দিনের সেই কঠিন সংগ্রামের অবসান হলো আজ।যখন বিথীর কানে পৌঁছালো,,
“দির্শক প্রধানের ফাঁসি কার্যকর হবে না, কর্তৃপক্ষ আপনাদের দাবি মেনে নিয়েছে”
তখন সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হাসতে হাসতে, কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার সেই কান্না ছিল নিখাদ আনন্দের কান্না।
শুধু বিথী নয় ইতি, নিধি, সিদ্দিকী বেগম, আলিফা বেগম, মুহিন, পিকি সবার চোখেই পানি। কেউ উচ্চস্বরে, কেউ নীরবে কিন্তু সবাই আনন্দে কাঁদছিল।
ইতি আর নিধি বিথীকে ধরে রেখেছিল, কিন্তু তার কান্না কিছুতেই থামছিল না। এই সাত দিন সে বুকভরা দুশ্চিন্তা আর অজানা ভয়ের মধ্যে কাটিয়েছে যদি ম্যাজিস্ট্রেট তাদের দাবি না মানেন! সেই আতঙ্ক এক মুহূর্তের জন্যও তাকে ছেড়ে যায়নি।
আজ যখন ম্যাজিস্ট্রেট মাইকে রায় ঘোষণা করতে এলেন, তখনই তার বুকের ব্যথা বেড়ে গিয়েছিল। নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়। দির্শক জেলে যাওয়ার পর থেকেই তার প্রায়ই নাক দিয়ে রক্ত পড়ত,অসংখ্যবার প্যানিক অ্যাটাকও হয়েছে তার। তবুও সে থামেনি, দমে যায়নি দির্শকের ফাঁসি রদ করতেই সে ছিল অটল।
এখনও তার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে।নিধির চোখে সেটা পড়তেই সে তাড়াতাড়ি বলল,,
“বিথী, পানি নে… তোর আবার নোজ ব্লিডিং হচ্ছে!”
বিথী হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে রক্ত মুছে নিল। ইতি আর নিধি তাকে ধরে দাঁড় করাল। তার শরীর কাঁপছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে, চোখ-মুখ ফ্যাকাশে।
হাঁসফাঁস করতে করতে সে কষ্টে বলল,
“ইতি… নিধি… আমি… আমি হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাব…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই বিথীর শরীর ঢলে পড়ল ইতির ওপর।মুহূর্তেই চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। উপস্থিত সবাই বিচলিত হয়ে উঠল।
আদালতের পাশের একটি হাসপাতালে বিথীকে ভর্তি করা হয়েছে। তার শরীরে স্যালাইন চলছে। চোখ দুটো বন্ধ কিন্তু সেই বন্ধ চোখের আড়ালেও যেন এক দৃশ্য বারবার ভেসে উঠছে।
দির্শক…
সে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে, অন্ধকারের ভেতরে মিলিয়ে যাচ্ছে…
বিথী যেন তাকে থামাতে চাইছে, কিন্তু পারছে না।
হঠাৎই সে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। শরীর কেঁপে উঠল, চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে আবার তড়িঘড়ি খুলে ফেলল।
চোখ খুলতেই নিজেকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতে দেখল। চারপাশে তার চেনা মানুষদের উদ্বিগ্ন মুখ ইতি, নিধি, সিদ্দিকী বেগম, আলিফা বেগম… সবাই যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে।
ইতি এগিয়ে এসে নরম গলায় বলল,,
“এখন কেমন লাগছে তোর?”
বিথী ধীরে, ভাঙা গলায় বলল,,
“হ্যাঁ… আমি ঠিক আছি…”
কিন্তু কথাটা বলেই সে উঠে বসে পড়ল। হাতের ক্যানুলাটা খুলতে শুরু করল। সেটা দেখে সিদ্দিকী বেগম হালকা রাগ নিয়ে বললেন,,
“এটা খুলছিস কেন?”
বিথী নির্বিকারভাবে ক্যানুলা খুলতে খুলতেই বলল,,
“আমি ভালো আছি। এটা আর লাগবে না… দির্শক স্যারের কাছে যেতে হবে।”
ক্যানুলা খুলে সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। তারপর ইতি আর নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,,
“চল।”
আলিফা বেগম চোখ ভেজা কণ্ঠে বললেন,,
“আমিও যাবো… আমাকেও নিয়ে চল।”
বিথী মাথা নাড়ল,,
“আচ্ছা, চলো।”
তবে নিয়ম অনুযায়ী জেলখানায় চারজনের বেশি ঢোকার অনুমতি নেই। তাই চাইলেও মুহিন আর পিকিকে সঙ্গে নেওয়া গেল না।
জেলখানার ভেতরের একপাশে একটি বড় বারান্দা। চারপাশে মোটা লোহার গ্রিল চেকের মতো ঘেরা। গ্রিলের ওপারেই বন্দীদের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা।
আলিফা বেগম প্রথমে নাজিম তালুকদারের সঙ্গে দেখা করতে চাইছিলেন না। কিন্তু ইতি, বিথী আর নিধির জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত তার জন্যও টোকেন নেওয়া হলো।কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর, অবশেষে দির্শক আর নাজিম তালুকদারকে নিয়ে আসা হলো।
সেই মুহূর্তে,,
বিথীর চোখে পড়ল দির্শককে।মুহূর্তেই তার শরীরটা যেন হালকা হয়ে এল, আবার ভারীও হয়ে উঠল একসাথে। চোখে পানি জমে উঠল। তার হাত কাঁপছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যাচ্ছে। নিধি শক্ত করে তাকে ধরে রেখেছে।
অন্যদিকে, দির্শকের চোখও থেমে গেল বিথীর ভেজা চোখে।কতদিন পর সে বিথীকে দেখছে…
কিন্তু এই কেমন অবস্থা?চোখের নিচে কালি, শুকনো ঠোঁট, ফ্যাকাশে মুখ,দির্শকের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।“বিথী নিজের কী অবস্থা করে ফেলেছে…”
এই ভাবনায় গলা শুকিয়ে গেল তার। একরাশ কষ্ট নিয়ে একটা ঢোঁক গিলল।
সে বিথীর দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু সেই হাসি টানটান, ভাঙা একদমই স্বাভাবিক নয়।
বিথী সেই হাসি দেখেই ভেঙে পড়ল আরও বেশি। চোখের পানি যেন থামতেই চাইছে না।
দির্শক ধীরে ধীরে তার হাত দুটো এগিয়ে এনে গ্রিলের ওপর রাখল।
বিথী চোখে চোখ রেখে, কাঁপা কণ্ঠে বলল,,
“জানি… তুমি ভালো নেই…”
বিথী চোখের পানি মুছে নিয়ে ধীরে বলল,,
“এখন ভালো…”
তারপর জোর করে একটা হাসি ফুটানোর চেষ্টা করল ঠোঁটে।দির্শক তাকিয়ে রইল, তারপর নরম গলায় বলল,,,
“আরও পাঁচ বছর কিন্তু…”
কথাটা শেষ হতেই বিথীর চোখ আবার ভিজে উঠল। গলা কেঁপে উঠল,,
“অপেক্ষা করব আমি…”
এই কথায় দির্শকের নিজের চোখও ভিজে এলো। কিছুটা হালকা করার জন্য বলল,,
“চিঠি লেখা শিখেছ দেখছি।”
বিথী মৃদু হেসে বলল,,
“ঘৃণার কাজগুলোও তো আপনিই শিখিয়েছেন আমায়।”
দির্শক ফিচেল হেসে বলল,,
“আমি তো নিজেও ঘৃণার ছিলাম তোমার।”
বিথী শান্ত গলায় জবাব দিল,,
“ঘৃণাকেও তো ভালোবাসতে শিখিয়েছেন যে।”
দির্শক এবার চওড়া করে হাসল। সেই হাসিতে এক ধরনের তৃপ্তি, এক ধরনের বিস্ময়। বিথীও হাসল তার সাথে,,
“বড় হয়ে গেছ,” দির্শক বলল।
“তাও তো আপনার কাছেই শেখা,” বিথীর উত্তর।
দির্শক হালকা হেসে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর জিজ্ঞেস করল,,
“খেয়েছেন?”
“হ্যাঁ।”
আবার কিছুক্ষণ চুপ থেকে দির্শক বলল,,
“আমার জন্য এত কিছু কেন করলে?”
বিথী এবার সোজা চোখে তাকিয়ে বলল,,
“কে বলেছে আপনার জন্য করেছি? আমি তো নিজের জন্যই করেছি। আপনাকে ছাড়া আমি বাঁচছিলাম না… তাই নিজেকে বাঁচানোর জন্যই করেছি এসব।
আপনার মাঝেই তো আমার বেঁচে থাকা, মরে যাওয়া, হাসি, সুখ সবকিছু। আপনি না থাকলে আমিও শেষ… তাই।”
কথাগুলো শুনে দির্শক যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ তাকে এতটা ভালোবাসতে পারে এটা বিশ্বাস করাই তার জন্য কঠিন হয়ে উঠল। গলায় যেন কিছু আটকে গেল।ধীরে বলল,
“কবে এত ভালোবাসলে আমাকে?”
বিথী এবার একটু অভিমানী ভঙ্গিতে বলল,,
“বেইমানদের কে ভালোবাসে? আমি তো আপনাকে ভালোবাসিই না। আপনি খারাপ মানুষ… আফসোস, আপনাকে ঘৃণাও করতে পারিনি।”
দির্শক হেসে উঠল একটা পূর্ণতার হাসি।
“এই বেইমানকেই কিন্তু বিয়ে করতে হবে, বুঝেছ?”
বিথীও হেসে বলল,,
“হ্যাঁ, বুঝেছি। আর উপায়ও নেই। নিজেকে এমনিতেই শেষ করে ফেলেছি সৌন্দর্য নষ্ট, চুল পড়ে গেছে, শরীর শুকিয়ে অর্ধেক… এখন এই অবস্থায় আমাকে আর কে বিয়ে করবে? তাই আপনার ঘাড়েই চাপবো সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে, বুঝলেন?”
দির্শক মাথা নেড়ে হেসে বলল,,
“আজ্ঞে হ্যাঁ, রাজি আছি।”
অনেকদিন পর বিথীর এমন প্রাণখোলা হাসি শুনল ইতি আর নিধি। দু’জনের চোখেই পানি এসে গেল। এই কয়েকদিনে তাদের বোনের ওপর দিয়ে কী ভয়াবহ ঝড় বয়ে গেছে তা তারা খুব কাছ থেকে দেখেছে। এখন তাদের একটাই চাওয়া বিথী যেন আবার আগের মতো হয়ে ওঠে, আবার তারা তিন বোন আগের মতো হাসে, নাচে, বাঁচে।
দির্শক এরপর ইতি আর নিধির সঙ্গেও কিছু কথা বলল।
অন্যদিকে, আলিফা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন নাজিম তালুকদারের সামনে। কিন্তু কথা বলতে পারছেন না শুধু শিশুর মতো কাঁদছেন।
স্বামী যাই অপরাধ করে থাকুক, ভালোবাসায় তিনি কোনোদিন কমতি রাখেননি। সবসময় খেয়াল রেখেছেন তাকে। সেই মানুষটাকে আজ এই অবস্থায় দেখে তার বুক ফেটে যাচ্ছে।
নাজিম তালুকদার অনেকক্ষণ ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন,,
“কেঁদো না আলিফা… আমি আর দির্শক এখানে ভালোই আছি, কোনো সমস্যা নেই।”
কিন্তু এই সান্ত্বনা যে কতটা মিথ্যা তা আলিফা বেগম খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন।হঠাৎ তিনি দির্শকের দিকে তাকালেন।দির্শকও তাকিয়ে ছিল তার দিকেই।
ছেলের শুকনো, ক্লান্ত মুখটা দেখেই আলিফা বেগম আবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
দির্শক নরম গলায় ডাকল,,
“মা…”
এই এক শব্দেই যেন তার বুক ভেঙে টুকরো হয়ে গেল। ইচ্ছে করছিল লোহার এই শিকল ভেঙে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিতে। কিন্তু সে তো সম্ভব নয়…কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠে কিছু বলতে গিয়ে তিনি শুধু বলতে পারলেন,,
“বা…বা…”
দির্শক তাড়াতাড়ি বলল,,
“মা, আমি ভালো আছি… একদম ভালো আছি। তুমি কেঁদো না। তোমার কান্না দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়। প্লিজ মা, কেঁদো না…”
অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে আলিফা বেগম বললেন,,
“মিথ্যা বলবে না। আমি দেখছি তুমি কত ভালো আছো এখানে…”
দির্শক হালকা হেসে বলল,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৩
“সত্যিই ভালো আছি। বাবা আমাকে প্রতিদিন ঘুম পাড়িয়ে দেয়, খাইয়েও দেয়।”
দ্বিতীয়বার ‘বাবা’ ডাকটা শুনে নাজিম তালুকদার অসহায় চোখে তাকালেন দির্শকের দিকে,ওনার বুক বয়ে শান্তি বয়ে গেল এই এক শব্দই। দির্শক তার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে দিল।
আলিফা বেগম কান্না একটু থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,,
“এখানে কি ভালো খেতে দেয় তোমাদের?”
দির্শক মাথা নেড়ে বলল,,
“হ্যাঁ মা, দেয়। বাগান পরিষ্কারের কাজ করলে ভালো ভালো খাবারও দেয়।তুমি চিন্তা করো না আমাদের জন্য।”
