তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৬
রাফিয়া জান্নাত রিফা
মুহিন আর পিকি দু’জনেই বেশ উৎফুল্ল মনে নির্জন রাস্তা ধরে হাঁটছিল। হঠাৎ করেই কোথা থেকে একটি গাড়ি এসে তাদের সামনে থামল। মুহূর্তের মধ্যেই দু’জন লোক পিকির হাত শক্ত করে চেপে ধরে, মুখ বন্ধ করে তাকে গাড়িতে তুলে নিল। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে মুহিন বুঝে ওঠার আগেই গাড়িটি ঝড়ের গতিতে সেখান থেকে চলে গেল।
মুহিন কিছুক্ষণ হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যখন তার হুঁশ ফিরল এবং বুঝতে পারল পিকি আর তার পাশে নেই, তখন ভয়ে তার শরীর কেঁপে উঠল। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে একটি শব্দও বের হলো না। চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা কোথাও কোনো মানুষ বা প্রাণীর চিহ্ন নেই, যে তার ডাক শুনে এগিয়ে আসবে। অবশেষে আর কিছু না ভেবে সে সরাসরি তালুকদার বাড়ির দিকে দৌড়ে গেল।
অন্যদিকে, বড় একটি টয়োটা গাড়ি এসে থামল গভীর, নির্জন এক জঙ্গলের মধ্যে। গাড়িতে থাকা তিনজন পুরুষ বেশ উৎফুল্ল তারা পিকিকে মেয়ে ভেবেই তুলে এনেছে, এবং এখনো সেটাই বিশ্বাস করছে। গাড়ি থামিয়ে তারা নেমে মদ্যপানে মেতে উঠল।
পিকি তখনও গাড়ির ভেতরে, মুখে শক্ত করে টেপ লাগানো, হাত দু’টি পিছনে বাঁধা। সে নিরন্তর ছটফট করছে, অস্পষ্ট শব্দে কিছু বলতে চেষ্টা করছে। বাইরে মদ্যপ অবস্থায় এক ব্যক্তি হাসতে হাসতে বলল, “আজ তো জমে যাবে! মেয়েটাকে গাড়ি থেকে নামা রেয়য়য়।”
তার কথামতো বাকি দু’জন পিকিকে নামাল। একজন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“এই মেয়েটা এত ভারী কেন রে! কী খায় এত?”
মাটিতে পড়তেই পিকি আরও জোরে ছটফট করতে লাগল। আর তিনজনই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হঠাৎ একজন পিকির দিকে ভালো করে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এ আবার কেমন মেয়ে?”
অন্য দু’জন অবাক হয়ে একসাথে বলল,
“কী বলছিস এসব?”
প্রথমজন সন্দেহের সুরে বলল,
“মেয়েদের শরীরের গঠন কি এমন হয়?”
অন্যজন প্রতিবাদ করে বলল,
“আরে চুপ! দেখছিস না জিন্স, টি-শার্ট, ঠোঁটে লিপস্টিক! অবশ্যই মেয়ে।”
কিন্তু প্রথমজন আবার বলল,
“না, ভালো করে দেখ।”
এবার বাকি দু’জনের মনেও সন্দেহ জাগল এ কি সত্যিই মেয়ে, নাকি অন্য কিছু?
এর মধ্যে একজন এগিয়ে এসে পিকির মুখের টেপ খুলে দিল। টেপ খুলতেই পিকি জোরে চিৎকার করে উঠল,
“আমাকে ছেড়ে দাও! আমাকে বাতাও!”
পিকির ভারী কণ্ঠস্বর শুনে তিনজন পুরুষের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল পিকি তৃতীয় লিঙ্গের। মুহূর্তেই তাদের মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল।একজন হতভম্ব হয়ে বলল,
“ভাইরে ভাই! এ কী কাজ করলাম! শেষমেশ কিনা একজন হিজরাকে তুলে আনলাম! ছিঃ, ছিঃ!”
অন্যজন বিরক্তির সুরে বলল,
“পেট্রোলের এই দামে এত খরচ করে এভাবে এই শাউয়ারে তুলে আনলাম!”
তৃতীয়জন রেগে গিয়ে বলল,
“সব তোর জন্যই হয়েছে! পেছন দেখে এমন মুগ্ধ হয়ে গেলে যে তুলে আনতেই হবে! এখন বল, কী করবি?”
প্রথমজন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে জবাব দিল,
“পেছন দেখে তো একদম সুন্দরীই মনে হলো! কে জানত এমন হবে? তবে ভাই, মানতেই হবে হিজরাও এত সুন্দর হয়! কী অবস্থা!”
অন্যজন তাড়াহুড়ো করে বলল,
“চল, এটাকে এখানেই রেখে পালাই! এ যেভাবে চিৎকার করছে, লোকজন জড়ো হলে বিপদে পড়ব।”
এই বলে তারা পিকিকে জঙ্গলে ফেলে রেখে দ্রুত গাড়ি নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। তাদের চলে যেতে দেখে পিকি অবাক হয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আরে! হাতের দড়িটা তো খুলে দিয়ে যাও!”
কিন্তু তার কথা শোনার মতো কেউ আর সেখানে ছিল না। গাড়িটি ইতিমধ্যেই দূরে মিলিয়ে গেছে। অনেক কষ্টে পিকি নিজের হাতের বাঁধন আলগা করে অবশেষে দড়ি খুলতে সক্ষম হলো।
পিকি এই সব ঘটে যাওয়া ঘটনা ইতি, বিথী, নিধি ও মুহিনকে ভোঁতা মুখে বর্ণনা করল। তার কথা শুনে তারা প্রথমে হেসে উঠল এতটাই যে একে অপরের গায়ে হেলে পড়তে লাগল। হাসির তোড়ে কারো মুখ দিয়ে ঠিকমতো শব্দই বের হচ্ছিল না।
হঠাৎ করেই পিকির আচরণ বদলে গেল। সে বিথীকে জড়িয়ে ধরে ছোট শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করল। পিকির কান্নার শব্দে সবার হাসি থেমে গেল। তারা হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
বিথী বিস্মিত হয়ে এক হাত দিয়ে পিকির পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলল,
“এই, কাঁদছ কেন? আমরা তো মজা করে হাসছিলাম। আর হাসব না, সরি। প্লিজ, কান্না থামাও।”
ইতি ও নিধিও কাছে এসে কান ধরে নরম স্বরে বলল,
“এই দেখো, আমরা কান ধরছি আর হাসব না। এবার চুপ করো, কান্না থামাও।”
পিকি শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলল। তার সেই কান্না দেখে ইতি, বিথী আর নিধির মন অদ্ভুত এক কষ্টে ভরে উঠল যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কাঁদতে কাঁদতেই পিকি ভাঙা গলায় বলল,
“তখন আমি নিজের জন্য না… অন্য কিছুর জন্য ভয় পাচ্ছিলাম, বিথী।”
বিথী কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কিসের ভয়?”
পিকি চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“আমি আর মুহিন যখন বের হচ্ছিলাম, তুমি তো আমাদের সাথে যেতে চাইছিলে তখন দির্শকের ফোন এসেছিল বলে থেকে গেলে… যদি যেতে, তাহলে ওরা আমার বদলে তোমাকেই তুলে নিয়ে যেত,তখন কি হতো,আমি দির্শককে কি বলতাম,ওকে যে আমি কথা দিয়েছি ওর অবর্তমানে তোমাকে দেখে রাখবো আমি।”
কথাটা শুনে সবার কাছেই বিষয়টি এবার পরিষ্কার হয়ে গেল। ইতি আর নিধি পুরো ঘটনাটা জানত না, তাই তারা নীরব রইল। কিন্তু পিকির সরল কথায় বিথীর মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে মজা করে বলল,
“আমি গেলে তো ভালোই হতো, পিকি! ওদের এমন শিক্ষা দিতাম যে হাড়গোড় ভেঙে যেত!”
পিকি সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে বলল,
“ওরা আমার হাত-পা, মুখ সব বেঁধে দিয়েছিল, বিথী তাহলে তোমার কি করতো ভাবো।”
বিথী দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিকিকে নিজের থেকে আলতো করে সরিয়ে দিল। তারপর তার চোখের পানি মুছে দিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বলল,
“এবার একদম চুপ। দেখো, আমি একদম ঠিক আছি তোমার সামনেই তো দাঁড়িয়ে আছি। এখন চলো, কিছু খেয়ে নিই।”
দুপুর গড়িয়ে যেতে না যেতেই আরেকটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। হঠাৎ করেই নিধির মাথা ঘুরে গেল, সে ড্রয়িংরুমে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। সবাই ভয় পেয়ে গেল। দ্রুত তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেওয়া হলো বিছানায়। সাথে সাথে ডাক্তারকে ফোন করে ডাকা হলো।
ডাক্তার এসে নিধিকে পরীক্ষা করে চলে গেলে বিথী ফোন করে আর্দ্রকে নিধির অসুস্থতার কথা জানাল। কথার ফাঁকে সে এটাও বলল,
“ফেরার পথে মিষ্টি নিয়ে আসবে।”
কিন্তু নিধির অসুস্থতার খবর শুনেই আর্দ্র এতটাই বিচলিত হয়ে পড়েছিল যে, মিষ্টির কথা তার কানে পৌঁছালই না। সে অফিসের সব কাজ ফেলে তড়িঘড়ি বাইক নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
বাড়িতে পৌঁছে সে আর কোথাও না তাকিয়ে সোজা নিজের ঘরের দিকে দৌড় দিল। ঘরে ঢুকেই থমকে গেল বিছানায় শুয়ে থাকা নিধির ফ্যাকাশে মুখ দেখে তার বুক ধকধক করে উঠল। সারাদিন যার হাসি আর কথায় ঘর ভরে থাকে, সেই নিধিকে এভাবে নিশ্চুপ শুয়ে থাকতে দেখে তার চোখে জল এসে গেল।
চুপচাপ নিধির পাশে বসে আর্দ্র তার কপালে আলতো করে চুমু খেল। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা পানি নিধির চোখে পড়তেই নিধি একটু নড়েচড়ে উঠল। সে প্রিয় মানুষের স্পর্শ অনুভব করল,বুঝতে পারল, তার আর্দ্র ছুটে এসেছে।
কিন্তু আর্দ্র কাঁদছে এই অনুভূতি হঠাৎই নিধির মনে দোলা দিল। সঙ্গে সঙ্গে সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। আর্দ্র তখন তার দুই চোখে আলতো চুমু এঁকে দিল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“ তোমার অসুস্থতা শুনে আমি তো নিজেই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি, নিধি… কী হয়েছে তোমার? সকালে তো কিছুই বলোনি আমায়!”
নিধি দু’গালে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসতে চাইলে আর্দ্র তাড়াতাড়ি তার বাহু ধরে তাকে সহায়তা করল। উঠে বসেই নিধি অভ্যাসমতো আর্দ্রের পুরো মুখে একের পর এক চুমু এঁকে দিল। আর্দ্র অফিস থেকে ফিরলেই এটাই তার স্বাভাবিক অভ্যর্থনা আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
তারপর নিধি দু’হাতে আর্দ্রের মুখটা আলতো করে ধরে হাসিমুখে বলল,
“আমি একদম সুস্থ।”
আর্দ্র কোনো কথা না বলে ঝট করে নিধিকে বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ,
“তোমার কিছু হলে আমি বাঁচব না, নিধি… নিজের এত অবহেলা করছ কেন?”
নিধি হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“কোথায় অবহেলা করছি! আচ্ছা, আগে বলুন মিষ্টি এনেছেন?”
আর্দ্র নিধির চুলগুলো একত্র করে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ওসব মিষ্টি দশবছর থেকেই ঘৃণা করি আমি। ছোটবেলায় এই মিষ্টি খেয়েই তুমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলে। তাই বলছি আই হেইট মিষ্টি! তুমি কিন্তু একদম খাবে না।”
নিধি বিস্মিত চোখে আর্দ্রের দিকে তাকিয়ে রইল,
“এ আবার কেমন কথা! আচ্ছা, সেসব থাক এখন কিন্তু সুসংবাদ শোনার জন্য মিষ্টি লাগবেই। তাড়াতাড়ি নিয়ে আসুন।”
আর্দ্র হেসে নিধির গালে চুমু দিয়ে বলল,
“আমার ছোট্ট চড়ুই, আমার লাভলি গার্ল তুমি সুস্থ আছো, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় সুখবর।”
নিধি একটু রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসল,
“এর থেকেও বড় সুখবর আছে… খুব, খুব খুশির খবর!”
আর্দ্র ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল,
“কী সেই খুশির খবর?”
নিধি লজ্জায় চোখ নামিয়ে মৃদু হাসল।আর্দ্র মুচকি হেসে বলল,
“এভাবে লজ্জা পাচ্ছো কেন, নিধি?”
নিধি মৃদু হেসে আর্দ্রের একটি হাত নিজের জামার ভেতর দিয়ে আলতো করে উন্মুক্ত পেটে রেখে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আমাদের অস্তিত্ব… একটা ছোট প্রাণ আসছে। আমাদের ছোট্ট সোনা আসছে পৃথিবীতে।”
নিধির এমন কথায় আর্দ্রের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এই সংবাদে তার খুশিতে ভরে ওঠার কথা কিন্তু নিধি স্পষ্টই দেখল, সেই আনন্দের ছাপ তার চোখে নেই। বরং এক অদ্ভুত অস্থিরতা।ধীরে ধীরে আর্দ্র তার হাতটা নিধির পেট থেকে সরিয়ে নিল। নিধি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুই বুঝতে পারছে না। এমন সুখবর শুনে তো তার উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠার কথা!
আর্দ্র হঠাৎই চোখ-মুখ হাত দিয়ে মুছে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করতে লাগল, মাঝে মাঝে নিজের চুল মুঠো করে টানতে লাগল। তারপর হঠাৎ করে এসে নিধির দুই হাত শক্ত করে ধরে শান্ত অথচ চাপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কয়দিন হয়েছে?”
নিধি মলিন মুখে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“এক সপ্তাহ…”
এরপরই আর্দ্র হঠাৎ করে তার হাত টেনে বলল,
“চলো।”
নিধি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কোথায়?”
আর্দ্র ঠান্ডা গলায় বলল,
“অ্যাবরশন করাতে।”
নিধি যেন বিশ্বাসই করতে পারল না। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল,
“কি! আপনি পাগল হয়ে গেছেন? ছাড়ুন আমাকে!”
আর্দ্র কঠোর স্বরে বলল,
“যা ভাবছ ভাবো তার আগে এটা করতেই হবে। এখন করলে কষ্ট কম হবে। চলো, সময় নষ্ট কোরো না।”
নিধি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,
“আমি কোথাও যাব না! আমাকে ছাড়ুন!”
কিন্তু আর্দ্র তার কথা না শুনে তাকে টানতে লাগল। নিধি কান্নায় ভেঙে পড়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। তার কান্না আর অসহায় চিৎকারে পরিস্থিতি আরও ভারী হয়ে উঠল।
নিধির এই প্রতিরোধ আর কান্না আর্দ্রের ভেতরের রাগকে উসকে দিল। তার চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। হঠাৎ করেই সে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলল,
“এই! আমার কথা শুন আমি যা বলছি, তাই হবে। চল!”
আর্দ্রের সেই ভয়ঙ্কর কণ্ঠস্বর আর রাগান্বিত চেহারা দেখে নিধি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ল। ভয়ে তার শরীর কাঁপছে, আড়চোখে আর্দ্রের দিকে তাকাচ্ছে এই মানুষটাকে সে যেন আজ চিনতেই পারছে না। এ কি সেই তার চেনা, প্রিয় আর্দ্র?
রাগের তীব্রতায় আর্দ্রের কপালের রগ ফুলে উঠেছে, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই যখন সে লক্ষ্য করল নিধি ভয়ে অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে, তখন তার রাগ ধীরে ধীরে গলে গেল। অস্থির হয়ে সে নিধির কাছে এগিয়ে এল।
নিধি তাকে কাছে আসতে দেখে আরও ভয়ে কেঁপে উঠে নিজেকে আরও গুটিয়ে নিল। আর্দ্র দুই হাতের মাঝে নিধির মুখ তুলে ধরে নরম কণ্ঠে বলল,
“আমাদের সন্তান লাগবে না, নিধি… আমরা দু’জনেই তো সুন্দরভাবে জীবন কাটিয়ে দিতে পারি। চলো, অ্যাবরশন করে ফেলি। আমি তোমাকে হারাতে পারব না।”
নিধি কাঁপা হাতে তার মুখ থেকে আর্দ্রের হাত সরাতে চেষ্টা করল,
“ছাড়ুন… আমার খুব ভয় করছে।”
আর্দ্র সঙ্গে সঙ্গে তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলল,
“সরি, পাখি… আর এমন হবে না। আমি বুঝিনি তুমি এত ভয় পাবে। সরি… চলো এখন।”
কিন্তু নিধি এবার রাগ আর কষ্টে ভেঙে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে আর্দ্রের বুকে কয়েকবার ঘুসি মেরে বলল,
“আমি অ্যাবরশন করব না! এটা আমার বাচ্চা… করব না, শুনেছেন?”
আর্দ্র কঠিন স্বরে বলল,
“জেদ করো না, নিধি।”
নিধি চোখ ভেজা রেখেই বলল,
“যা মনে হয় করুন।”
আর্দ্র শুকনো ঢোক গিলে হঠাৎ পাগলের মতো নিধির মুখে বারবার চুমু এঁকে দিয়ে ভাঙা কণ্ঠে বলল,
“আমার মা… আমাকে জন্ম দিতে গিয়েই মারা গিয়েছিল। তাতে হয়তো বাবার কিছু যায় আসেনি… কিন্তু তোমার কিছু হলে আমি কীভাবে বাঁচব? আমার খুব ভয় করছে, নিধি… দেখো না, আমার বুকটা কেমন কাঁপছে…আমার শরীর টাও কাঁপছে,আমি তোমাকে হারাতে পারব না, চড়ুই। চলো, আমরা বাচ্চা ছাড়াই একটা জীবন কাটিয়ে দিই। আলবান আর দির্শকের বাচ্চা তো হবেই তাদের সন্তানদের তুমি মন ভরে আদর করবে… কিন্তু আমি এই ঝুঁকি নিতে পারব না… পারব না…”
এবার নিধি বুঝতে পারল আর্দ্রের ভয়ের গভীরতা কোথায়। নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরস্বরে বলল,
“এটা আপনার ভুল ধারণা… সবাই সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায় না, আল্লাহ নিয়ে নেয় তাদের। আমার কিছু হবে না দেখবেন, আমি আর আমাদের সন্তান দু’জনেই সুস্থভাবে আপনার কাছেই ফিরে আসব।”
আর্দ্র আবার তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমার এসব বিশ্বাস হয় না, নিধি… আমি এত বড় ঝুঁকি নিতে পারব না। আর তোমার শারীরিক অবস্থাও এখন তেমন ভালো না… এই বয়সেও না…”
নিধি এবার একটু রাগ দেখিয়ে বলল,
“আমার কিন্তু রাগ হচ্ছে এবার।”
আর্দ্র নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“যাই হোক এই ঝুঁকি আমি নেব না।”
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৫
নিধি নিজের কাঁপুনি সামলে নিয়ে এগিয়ে এসে আর্দ্রের ঠোঁটে আলতো করে চুমু দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি ,আপনার স্ত্রী, আপনার অনাগত সন্তানের মা আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি এবং আমাদের সন্তান দু’জনেই সুস্থভাবে আপনার কোলে, আপনার ঘরে ফিরে আসব।”
তবুও আর্দ্রের ভয় কাটল না। একের পর এক ঢোক গিলতে লাগল সে। অজানা এক আতঙ্ক যেন তাকে গ্রাস করে রেখেছে ঠিকমতো নিঃশ্বাসও নিতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে, নিধিকে কোথাও লুকিয়ে রাখে… যেন কোনোভাবেই তার কিছু না হয়।
