Home তিমিরে ফোঁটা গোলাপ তিমিরে ফোটা গোলাপ গল্পের লিংক || Taniya Sheikh

তিমিরে ফোটা গোলাপ গল্পের লিংক || Taniya Sheikh

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ১+২
Taniya Sheikh

দু’দিন বাদেই বিয়ে। অতিথিদের অনেকে এসে পৌঁছেছে, বাকিরাও আসবে আজ কালের মধ্যে। তাদের জন্য অতিথিশালা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। পুরো বাড়ি সরগরম বিয়ের আমেজে। বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে অতিথি আপ্যায়নের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। ভৃত্যরা এক এক করে চেয়ার টেবিল রাখছে ওখানটাতে। ব্যাকইয়ার্ডের আশপাশের আগাছাগুলো দু’একদিন পর পরই ছেঁটে ফেলছে মালি। নতুন কিছু জিরেনিয়াম ফুল গাছ আর বাহারি গাছের টব এনে বসিয়েছে দেয়াল ঘেঁষে। কিচেনে পুরোদমে রান্না চলছে। সোল্যাঙ্ক, বীফ স্ট্রগানফ আর পিরোজকির সুগন্ধ দোতলার ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে পেল ইসাবেলা। রাশান এই খাবারগুলোর প্রতি বরাবরই ওর দূর্বলতা আছে। মা আর দিদিমার হাতে তৈরি বীফ স্ট্রগানফ আর সোল্যাঙ্কা ওর খুব পছন্দের।

বাড়ির পাশের রাস্তাটাতে চোখ পড়তে পিটারকে দেখতে পেল। আপনমনেই লাজে লাল হলো সে। এ মহল্লায় ওর রূপের প্রশংসা খুব। বেশ লম্বা চওড়া আর সুদর্শন পিটার মিখায়লোভ। সমবয়সী যুবকদের মতো বার, নারী এসবে মেতে থাকে না। শান্ত, মার্জিত স্বভাব। তাইতো ওকে নিয়ে এ মহল্লার মেয়েগুলোর মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা। যুবতী মেয়েগুলো এক রাত কাটাবে বলে, অধিকারকার বলে দেখলে গা ঘেঁষতে শুরু করে। ওদের ঐ নির্লজ্জতা দেখলে রাগে মুখ চোখ লাল হয়ে ওঠে ইসাবেলার। পিটার তার একার। এ কথা এখন আর কারো অজানা নয়। দম্ভ হয় মনে মনে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

পিটারের মাথার কটা কোঁকড়া চুলগুলো অবিন্যস্ত। চোয়ালে খোঁচা দাড়ি। চোখে সেই গোল ফ্রেমের চশমা। ওর সমস্ত মুখে ভাবুকতার ছাপ। একদৃষ্টে সামনে চেয়ে হাঁটছে। দেখলে অনুমেয় গভীর ভাবনায় বুঁদ সে। সর্বক্ষণ কী এত ভাবে বুঝে উঠতে পারে না ইসাবেলা। বয়স কত হবে? ইসাবেলার চেয়ে বছর চারেক বড়ো। এইটুকু বয়সে এত কীসের ভাবনা? মা- বাবাকে পরশু রাতে পিটারকে নিয়ে ফিসিরফিসির করতে শুনেছে। তারপর বাড়ির মুরুব্বিরা গোপনে ওকে ডেকে নিয়ে কী সব আলোচনা করল। মা’কে জিজ্ঞেস করে জবাব পায়নি। তবে তাঁকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। পিটার বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতে ইসাবেলা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কেন যে এই দীর্ঘশ্বাস নিজেও ঠিক বুঝতে পেল না। হঠাৎ দৃষ্টি স্থির হলো বা’হাতের অনামিকায়।

জ্বলজ্বলে হীরের আংটিটির দিকে অনিমেষ চেয়ে আছে ইসাবেলা। ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি। মাস দুই আগে পারিবারিক ভাবে পিটার মিখায়লোভের সাথে আংটি বদল হয়েছে। যে মানুষটাকে ও আশৈশব ভালোবেসে এসেছে তারই নামের আংটি অনামিকাতে। ভাবতে অভ্যন্তরে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়।
ডান হাতের আঙুলে নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখতে লাগল জিনিসটা। এ কেবল একটা জিনিস নয়, এরচেয়ে বেশি ইসাবেলার কাছে। যদিও গতানুগতিকভাবে পিটার তাকে প্রপোজ করেনি কিংবা বলেনি,”উইল ইউ ম্যারি মি ইসাবেলা অ্যালেক্সিভা?” তাতে কী? পিটার মুখে প্রকাশ না করলেও ইসাবেলা জানে, সে তাকে কত ভালোবাসে। কথাটা ভাবতে কেমন উদাস হলো। এই বিশ্বাসই তার সব। এই বিশ্বাস ভাঙার কথা সে স্বপ্নেও ভাবে না, ভাবতে চায় না। পিটারকে ছোটোবেলা থেকে পছন্দ করে। বন্ধুত্বের সম্পর্ক সেই শৈশব থেকেই। বাল্যকালে পিটারের মায়ের মৃত্যু, বাবার গৃহত্যাগ ছেলেটাকে কেমন হঠাৎ বদলে দিলো। একদম চুপচাপ হয়ে যেতে লাগল হাসি-খুশি পিটার।

ইসাবেলাদের বাড়িতেই ছিল মাস দুই। তারপর ওর নানি এসে মস্কোতে নিয়ে যায়। বয়স যখন ষোলো তখন ফিরে এলেন গৃহত্যাগী বাবা দানিল মিখায়লোভ। একা নয়, সঙ্গে নিয়ে এলেন বান্ধবীকে। মস্কো থেকে ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। পত্নী বিয়োগ আমূল পাল্টে দিয়েছিল দানিল মিখায়লোভকে। বেপরোয়া জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। মদ, উচ্ছৃঙ্খল জীবনাচারে নিত্য অশান্তি শুরু হলো পিটারদের বাড়িতে। এরমধ্যেই কাটল আরো চার বছর। ইসাবেলার সাথে প্রায় দেখা করতে আসত এ বাড়ি পিটার। ইসাবেলা বুঝত পিটার আর আগের মতো নেই। কেমন উদাস আর ভাবুক হয়ে থাকে সর্বক্ষণ। পাশাপাশি বসে কিন্তু দু’একটি প্রয়োজনীয় কথার জবাব দিয়ে চুপ হয়ে যায়। ইসাবেলা মাঝেমধ্যে ওকে দেখতে যেত ও বাড়িতে। ওর বাবার বান্ধবীটি কেন যেন ইসাবেলাকে দেখলে মুখ কালো করে ফেলত। ইনিয়ে বিনিয়ে কটাক্ষ করত প্রায়ই। এ নিয়ে পিটারের সাথে খুব একচোট ঝগড়াও হয়েছিল একবার। ইসাবেলাকে কেউ মন্দ কথা বললে, আঘাত করলে একদম সহ্য করতে পারে না ও। মহিলা এ নিয়ে বিশ্রী একটা কাণ্ড ঘটালেন। চেঁচিয়ে মহল্লা এক করে লোক জানালেন পিটার তার গায়ে তুলতে চেয়েছে।

পিটার ইসাবেলাকে জড়িয়ে কী সব নোংরা কথা যে বলেছিল, ভাবলে এখনো লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করে ইসাবেলার। দানিল বান্ধবীর নাকে কান্না শুনে পিটারকে মেরেছিল। চোখের সামনে প্রিয় মানুষটিকে মার খেতে দেখে খুব কাঁদা কেঁদেছিল সেদিন ইসাবেলা। এরপর ও বাড়িতে যাওয়া তেমন হয় না। পিটারও নিষেধ করেছে। বলেছে প্রয়োজন হলে কাওকে দিয়ে খবর পাঠাতে। সে নিজে এসে দেখা করে যাবে। প্রয়োজন! শব্দটা বিড়বিড় করে উচ্চারণ করেছিল কয়েকবার। প্রয়োজনের অধিক পিটার তার কাছে। তাকে প্রতিদিন দেখতে না পেলে ভালো লাগে না। কিন্তু পিটার যেন কোনোদিন ওর মন বুঝল না। আস্তে আস্তে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ হলো। সপ্তাহে, মাসে দু তিনদিন দেখা হতো ওদের। দুজনের মাঝের সহজ সম্পর্কে একটু একটু করে জড়তার দেয়াল তৈরি হতে লাগল। পিটারকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করে জবাব পেত না ইসাবেলা। সারাক্ষণ কী যেন ভাবনায় ডুবে থাকে। তবুও এইটুকু বিশ্বাস ছিল, ওর প্রতি পিটারের ভালোবাসার কমতি নেই। ওর ডাক সে কখনো উপেক্ষা করেনি। ইসালেবার সামান্য জ্বর হয়েছে শুনলেও ছুটে এসেছে। কপালে চুমো খেয়েছে, দীর্ঘক্ষণ হাত ধরে বসে থেকেছে ওর শিওরে। এসব তাকে আশ্বস্ত করে তার প্রতি পিটারের ভালোবাসা। এই বিশ্বাসের জোরে সে সব দ্বিধাবোধ ভুলেছে। একমনে ভালোবেসেছে, ভালোবাসছে।

রুমের দরজা খুট করে খুলতে ভেতরে ঢুকল ইসাবেলার সহোদরা তাতিয়ানা, সঙ্গে দাসি। ইসাবেলা জানালার কাছ ছেড়ে ঘরের ভেতর এলো। তাতিয়ানার কোলে মাস দুইয়ের মেয়ে শিশুটি। ওর নাম তাশা। ভীষণ মিষ্টি আর আদুরে মেয়েটি। এই মুহূর্তে কাঁদছে সে। খিদে পেয়েছে বোধহয়। দাসিকে ইশারায় হাতের জিনিস সামনের বিছানার উপর রাখতে বলল তাতিয়ানা। দাসি হাতের কাপড়ে ঢাকা বস্তুটি রেখে বিদায় নিলো। তাতিয়ানা বেশ আরাম করে বসল ইসাবেলার প্রিয় চেয়ারটাতে। ওক কাঠে বেশ কারুকাজ করে তৈরি ওটা। ইসাবেলার পনেরোতম জন্মদিনে দিদিমা ওকে উপহার দিয়েছিলেন। চেয়ারটাকে ও যত আগলে যত্নে একান্ত নিজের করে রাখতে চায়, ততই সকলে ওটার উপর আসন জমাতে উদগ্রীব। বোনের দিকে রুষ্ট মুখে চেয়ে রইল। তাতিয়ানা বুঝে ঠোঁট টিপে হাসল কিন্তু একেবারে অগ্রাহ্য করল ওর ওই দৃষ্টি। মেক্সির বুকের তিনটে বোতাম খুলতে খুলতে ছোটো বোনকে বলল,
“মা বলল গাউনটা একবার পরে দেখতে। কোথাও কোনো সমস্যা হলে আবার দর্জিবাড়ি পাঠাবে।”
বিছানার উপর জিনিসটাকে দেখছে। ওটা বিয়ের গাউন! ইসাবেলার ঠোঁটে ফের হাসি দেখা গেল। একটা পাতলা সাদা সিল্ক কাপড়ে ঢেকে রাখা সাদা গাউনটি। কাছে গিয়ে হাতে নিয়ে মুগ্ধতার সাথে দেখতে লাগল। দারুন এক অনুভূতিতে সমস্ত শরীর শিহরিত হলো। এই গাউনটি ওর স্বপ্ন পূরণের দর্পণ। তাতিয়ানা হালকা কাশতে তন্ময়তা ভাঙল। সলজ্জে মুখ ঘুরিয়ে বলল,

“পরে পরব।”
“না, মা বলেছে এখনই পরতে। জলদি কর।”
তাতিয়ানার মেয়েটি এখন আর কাঁদছে না। মায়ের দুগ্ধ পান করছে। হাত-পা নাড়ছে থেকে থেকে। ইসাবেলা বোনের দিকে তাকাতে চোখটা ঠিক গেল তাতিয়ানার একপাশের উন্মুক্ত বুকের উপর।
“ইশ! কী বেহায়া তুমি। দেখছ আমি উপস্থিত তবুও এভাবে আছো।”
“বেহায়া!” ভ্রু কুঁচকে ফেলল তাতিয়ানা। ইসাবেলা চোখের কোণে বোনের কঠিন দৃষ্টি দেখে ঢোক গিলল। কিন্তু মুখ ফসকে বলে ফেলল,

“নয়ত কী?”
“আর তুই কী? সতীসাধ্বী যুবতী? মা তোকে যা শেখায় কলের পুতুলের মতো তাই শিখিস। নিজস্ব বলে কিছু কি আছে তোর মধ্যে? নিজেকে দেখ আর সম বয়সীদের দেখ। আধুনিক যুগে থেকেও তোর রুচি, আচার-আচরণ মান্ধাতার আমলের। তুই আমাকে বল তো, পিটার ছাড়া কোনো পুরুষ তোকে ফিরে দেখেছে কখনো?’
দাঁতে দাঁত পিষে বলল তাতিয়ানা। মায়ের অনুরূপ কাওকে দেখলে মেজাজ খিঁচড়ে যায়। বোনটা হয়েছে ঠিক মায়ের প্রতিচ্ছবি। কতভাবে চেষ্টা করেছে রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ভেদ করে শহরের আধুনিকা মেয়েদের মতো করতে, পারেনি।
বোনের কাঁটা কাঁটা কথাতে রাগে, অপমানে গা জ্বলতে লাগল ইসাবেলার।
“পিটার দেখলেই যথেষ্ট। অন্য কোনো পুরুষের দেখার প্রয়োজন নেই।”
তাতিয়ানা তাচ্ছিল্য ভরে হাসল। ইসাবেলা গাউন শক্ত করে ধরে লম্বা শ্বাস টানে। গলা ধরে এলো। নিজেকে শান্ত করে বলল,
“তুমি আমাকে কেন এত ঘৃণা করো?”

“আমি তোকে ঘৃণা করি না। তুই আমার বোন, ইসাবেল। তোকে মায়ের সেকেলে আমল থেকে বের করে আনতে চেয়েছি সব সময়। কিন্তু আমাকে, আমার কথাকে তুই নেগেটিভলিই নিয়েছিস। দুঃখটা এখানে। মা’ই তোর কাছে সব। তার কথা ঈশ্বরের বাণীর মতো তোর কাছে। চোখ মেলে দেখ চারপাশ। বেরিয়ে আয় আলোতে।”
“তোমরা যেটাকে আলো বলো তা আমার কাছে অন্ধকারের সামিল। উচ্ছৃঙ্খলতাকে আধুনিকতা বলে না। নিত্যদিন মদ, পুরুষ এটা কখনো আলো হতে পারে না। আমি একটা সুন্দর সংসারের কামনা করি। যেখানে থাকবে পবিত্রতা, ঈশ্বরের আশীর্বাদ।”
তাতিয়ানা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে,
“তুই বলতে চাস আমরা অপবিত্র, উচ্ছৃঙ্খল!”
ইসাবেলা জবাব দিলো না। হাতের গাউনের দিকে ছলছল চোখে চেয়ে রইল।
তাতিয়ানা কোলের মেয়েটাকে একহাতে বুকে জড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। শিশুটি ঘুমের ঘোরে চুক চুক মায়ের স্তন টানছে। তাতিয়ানা বোনের গালে হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“বড্ড নিষ্পাপ তুই ইসাবেল। পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতা থেকে মা তোকে আড়াল করে রেখেছে। একটা ঘোরের মধ্যে বাস করছিস তুই। আমি এখন মনেপ্রাণে চাই ঘোরটা তোর না কাটুক। কারণ, তোর মতো সকলে নিষ্পাপ না রে। ভয়টা এখানেই আমার।”

সহোদরার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল ইসাবেল। মাঝেমাঝে একদমই কঠিন বলে মনে হয় বোনের কথা। এই মনে হয় সে ইসাবেলাকে অপছন্দ করে। আবার পরক্ষণেই কত মায়া দেখতে পায় ও চোখে। খুব বেশি বিভ্রান্তবোধ করে। কিন্তু মা’কে নিয়ে, মায়ের শিক্ষা নিয়ে তাতিয়ানার কটুক্তি একদমই পছন্দ নয় ইসাবেলার। মায়ের রক্ষণশীল মনোভাব, অনুশাসন কোনোকালে তাতিয়ানা মানেনি। এই নিয়ে মা মেয়েতে বনিবনা হয় না এখনো। মা উত্তরে বললে তাতিয়ানা গেছে দক্ষিণে। ওর লাগাম মা আন্না মেরিও কখনো টানতে পারেননি। এক্ষেত্রে তাতিয়ানাকে আস্কারা অবশ্য ওর দাদা-দিদিমা আর বাবাই দিয়েছে। তাতিয়ানা খুব স্বাধীনচেতা। তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে মায়ের রক্ষণশীল মনোভাবকে মোটেও সহ্য করেনি। বোনের এই অতিরিক্ত লাজুকতা, ধার্মিকতাকে ওর ভালো লাগে না। ইসাবেলা লাজুক, সরলা। ওর বয়সী মেয়েরা যখন ভার্জিনিটি খুইয়ে দু’তিনটে বয়ফ্রেন্ড বদলে ফেলেছে, ও তখন এ ব্যাপারে বড্ড সংযমি, অনেকটা অজ্ঞও বলা যায়। এজন্য অবশ্য ওদের মায়ের বিরাট ভূমিকা।

ভদ্রমহিলা বেশ ধার্মিক, খুব বেশি রক্ষণশীলা মনোভাবাপন্ন৷ অন্যান্য সন্তানদের থেকে ইসাবেলার জীবনের উপর তার আধিপত্য একটু যেন বেশি। নিজের মনের মতো করে এই মেয়েকে গড়েছেন তিনি। বিয়েটাও দিচ্ছেন পছন্দের পাত্রের সাথে। পিটারের মা ভানিয়া ছিলেন ইসাবেলার মায়ের বান্ধবী। খুব বেশি দূরে নয় দুই বাড়ির দূরত্ব। প্রায় প্রতিদিনই আসা যাওয়া ছিল দুই পরিবারের এ বাড়ি ও বাড়ি। ক্রমশ দুই পরিবারের মধ্যে একটা হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠে। এই সম্পর্ককে পাকাপোক্ত করতে ভানিয়া মিখায়লোভই প্রস্তাবটা প্রথমে দিয়েছিলেন। অত ছোটো বয়সে এহেন কথাবার্তা পছন্দ করেছিলেন না ইসাবেলার বাবা ওলেগ অ্যালেক্সিভ। কিন্তু ভানিয়ার হঠাৎ রোগাক্রান্ত তারপর শয্যাশায়ী অবস্থা সকলকে নাড়িয়ে দেয় সেই সময়। মৃত্যু শয্যায় কাতর ভানিয়া মিখায়লোভের কথা ফেলতে পারেননি ওলেগ। কথা দিয়েছিলেন ইসাবেলা আর পিটার প্রাপ্তবয়স্ক হলে ওদের বিয়ে দেবেন। সেই কথামতোই বাগদান এবং দু’দিনবাদে বিয়ের দিন তারিখ স্থির হয়েছে। দানিলেরও তাতে অসম্মতি নেই।

তাতিয়ানা তাড়া দিতে গাউনটা পরে নিলো ইসাবেলা। আয়নার সামনে দাঁড়াতে সে যেন সব ভুলে গেল। বিয়ের গাউন প্রতিটি মেয়ের কাছে বিশেষ। এর সৌন্দর্য মেয়েদের সৌন্দর্যকে আরো অনেকখানি বাড়িয়ে তোলে যেন। দু’হাতে ছুঁয়ে দেখতে লাগল গলার কাজ, বুকের উপরের জরিদার লেসের কাজ আর কোমরের কুঁচির অংশটা।
“ওহ ঈশ্বর! অপূর্ব দেখাচ্ছে তোকে ইসাবেল।”

পেছনে দাঁড়িয়ে আয়নায় বোনের দিকে তাকিয়ে অভিভূত স্বরে বলল তাতিয়ানা। কোলের মেয়েটিকে আগেই ইসাবেলার বিছানায় শুয়ে দিয়েছে। বোনকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে প্রশংসার পর প্রশংসা করতে লাগল। ভারী লজ্জা হচ্ছে এবার ইসাবেলার। তাতিয়ানা বুঝতে পেরে শব্দ করে হাসল৷ দু’বোনে আরো কিছুক্ষণ খোশগল্প করার পর ইসাবেলা গাউন খুলে রাখল। তাতিয়ানা গাউন ভাঁজ করে আগের মতো সিল্ক কাপড়ে ঢেকে রাখে।
পশ্চিম আকাশে গোধূলির লালিমা ভেসে উঠেছে। চারপাশটা আস্তে আস্তে ধোঁয়াটে হতে লাগল। বাইরে হ্যাজাকের আলো জ্বলে ওঠে। ইসাবেলা ঘরে আলো জ্বালিয়ে বসল বিছানায়। তাশার ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে মুচকি হাসছে। আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে শিশুটির তুলতুলে গাল, নাক।
হঠাৎ কী মনে করে হাসিটুকু ম্লান হয়ে যায়। তাতিয়ানা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। ইসাবেলা সেদিকে চেয়ে বলল,

“ভ্যালেরিয়া কী আসবে না?”
তাতিয়ানা দৃষ্টি বাইরে রেখে বলে,
“আসবে তো।” তারপর ঘুরে বোনের মলিন মুখখানা লক্ষ্য করে অপরাধী সুরে বলল,
“ওহ! সত্যি ভুলো মন আমার। দুঃখিত বোন আমার, আমি তোকে বলতেই ভুলে গেছি ভ্যালেরিয়ার চিঠি এসে পৌঁছেছে দুপুরে।”
“চিঠি! সে নয়?” ক্ষোভ ঝরে ইসাবেলার কণ্ঠে। তাতিয়ানা মাথা নাড়ায় দু’দিকে।
“কী একটা বিশেষ কাজে আঁটকে পড়েছে বেচারি। লিখেছে যেভাবেই হোক বিয়ের আগে এসে হাজির হবে। তোকে চিন্তা করতে নিষেধ করেছে। আরো বলেছে রাগ করলে মুখে ব্রণ উঠতে পারে। ব্রাইডের মুখে ব্রণ দেখলে ভারী বেজার হবে পিটার মিখায়লোভ।” বলে মুচকি হাসল তাতিয়ানা।
ইসাবেলার চেহারা এখন দেখার মতো। গাল দুটো ফুলিয়ে ফেলেছে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে। তারপর বিড়বিড় করে বলল,

“তোমার সাথে কথাই বলব না আমি ভ্যালেরি। একদমই বলব না।”
তাতিয়ানা কিছু বলতেই যাচ্ছিল ওমনি নিচে সোরগোল শোনা গেল। বিয়ে বাড়ির সাধারণ সোরগোল নয়। ওরা স্পষ্ট শুনতে পেল দানিল উচ্চৈঃস্বরে কারো সাথে তর্ক করছে। অপরিচিত গম্ভীর গলার আওয়াজে কেউ একজন একটা নাম বার বার নিচ্ছে ” পিটার”। ওদের বাবা ওলেগ আর ভাই ভ্লাদিমির গলাও শুনতে পেল। পরস্পরের দিকে কৌতূহলে তাকায় ইসাবেলা ও তাতিয়ানা। দুজনে দরজার দিকে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গেল। করিডোর ধরে সিঁড়ি দিকে এগোতে সিঁড়িতে কারো ভারী পায়ের শব্দ শুনতে পায়। ভ্লাদিমি উঠে এসেছে। ওর মুখটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। তাতিয়ানা দৌড়ে গেল ভাইয়ের কাছে। ভ্লাদিমির দৃষ্টি ইসাবেলার দিকে স্থির। আর্ত, করুণ। ইসাবেলার পা থেমে গেল। কী এক অজানা আশঙ্কায় বুক কাঁপতে লাগল এবার।

“নিচে শোরগোল কীসের? কী হয়েছে, ভ্লাদিমি?” তাতিয়ানা প্রশ্ন করল।
ভ্লাদিমির দৃষ্টি তখনো ছোটো বোনটির দিকে স্থির। কীভাবে, কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারছে না। তাতিয়ানা খেয়াল করে ওর অস্থিরতা। ভাইয়ের বাহুতে হাত রাখল এবার সে। চিন্তা হচ্ছে ওর।
“ভ্লাদিমি?”
ভ্লাদিমি দৃষ্টি সরিয়ে বড়ো বোনের দিকে তাকায়। গলাটা শুকিয়ে এসেছে ওর। ঢোক গিলে আড় চোখে ইসাবেলার চিন্তিত মুখখানা দেখে বলল,
“নিচে পুলিশ এসেছে।”
তারপরেই বলল,
“পিটার ফেরারি, ইসাবেল।”

প্রত্যাখ্যান আর মিথ্যার কণ্টকাঘাতের ব্যথা সর্বাঙ্গে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। মনটা ভেঙে দিয়েছে পিটার ওর। এই বাড়ির মুরুব্বিরাও ইসাবেলাকে কিছু বলেনি। তাঁরা সকলে ঘটনার আগে জেনেছে পিটারের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কথা৷ কেন আড়ালে রেখেছে ওঁরা? কেন পিটার বলল না তাকে? ওর ওই নীরব পলায়ন ইসাবেলাকে যে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। ভেবেছিল দু’ একদিন গেলে হয়ত পিটার ফিরবে কিংবা ওর কোনো পত্র আসবে। কিন্তু সে আশাহত হয়েছে এবারও। বাইরের জগতের প্যাঁচ বোঝে না ইসাবেলা। মানুষের জীবনের ক্ষুদ্র বৃহৎ জটিলতা সম্পর্কে একেবারেই জ্ঞান নেই। মা ওকে যা দেখিয়েছেন তাই দেখেছে। মা দেখিয়েছেন এই ঘর, এই ঘরের হেঁশেলে সীমাবদ্ধ থাকাতেই নারী জীবনের সার্থকতা। বিপ্লব কী? বিপ্লবী কেন হয় মানুষ? এসব ওর জানা নেই। জানা নেই বলেই ভেবে নিয়েছে পিটারের বিপ্লবী হওয়ার কথাটা নিছক সান্ত্বনার বাণী।

আদপে সে ইসাবেলাকে চায় না বলেই এভাবে চলে যেতে পেরেছে। আজ দুদিন হতে চলল পিটার ফেরারি। মহল্লায় এ নিয়ে কথা চালাচালি হচ্ছে। সকলে বলছে পিটার আর ফিরবে না। দানিল ছেলের উপর ক্ষুব্ধ। পুলিশ তাকে জেরায় জেরায় নাজেহাল করেছে। ছেলের কোনোরকম খোঁজ-খবর নিতে সে নারাজ। ওলেগ গম্ভীর হয়ে আছেন। একটা থমথমে ভাব পুরো বাড়িময়। বিয়ে উপলক্ষ্যে আগত অতিথিরা সান্ত্বনার বাণী আওড়ে ফিরে গেছে গতকালই। ভ্লাদিমির সেই কথা শুনে ইসাবেল সেদিন মূর্ছা যায়। তাকে ধরে বিছানায় শুয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজ দু’দিন হয় বিছানা ছেড়ে নামছে না। জানালায় বসে পথ চেয়ে থাকে, এই বুঝি ও পথে পিটার হেঁটে এলো। কিন্তু না, সে আর আসে না। পিটারকে অধিকার করবে বলে মুখিয়ে থাকা যুবতীদেরদল সকৌতুকে রাস্তা দাঁড়িয়ে গলা তুলে বলছে,

“পালিয়েছে তোমার রাজপুত্তুর। আহা! এবার বুঝলে তো কেউ তোমার মতো সতীসাধ্বীকে চায় না। অমন দাদি-নানি সেজে থাকলে কপালে আর প্রেমিক জুটবে না, স্বামী তো দূর কী বাত।”
তাতিয়ানার ধমকে মেয়েগুলো মুখ ভেংচে চলে যায়। কিন্তু ওদের ওই কথা, ও তো ইসাবেলার হৃদয় বিদীর্ণ করে দিলো। লজ্জায়, অপমানে মাটির সাথে মিশে যাওয়ার সাধ জাগে। তাতিয়ানা, ভ্লাদিমি ছুটে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরল। কারো সাথে কোনো কথায় সে বলছে না। আর না শুনতে ইচ্ছুক কারো কথা। মা আন্না মেরিও মেয়ের এই দুরাবস্থা চোখে দেখতে পারছেন না। তার নিষ্কলুষ মেয়েটি বিনাদোষে শাস্তি পাচ্ছে। গত দু’দিন হয় সে পানি ছাড়া কিছুই মুখে তোলেনি। সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে কাঁদছে। এমনকি ওর প্রিয় আন্টি ভ্যালেরিয়ার সাথেও তেমন কথা বলেনি। ভ্যালেরিয়া ওর মায়ের সৎ বোন। সৎ হলেও দু’বোনের সম্পর্ক খুব ভালো। আন্না মেরিওর অর্ধেক বয়স ভ্যালেরিয়ার। বলা যায় তাতিয়ানার বয়সী। মায়ের অকাল মৃত্যুর পর এ বাড়িতে বছর দশেক ছিল সে। ইসাবেলার সাথে গড়ে ওঠে অসম বন্ধুত্ব। নিজের মনের কথা অকপটে যদি কাওকে ইসাবেলা বলেছে তবে সে ভ্যালেরিয়া। সেই ভ্যালেরিয়া আসার পর থেকে ইসাবেলাকে বুকে আগলে বসে আছে। ওর বুকে মাথা রেখে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছে ইসাবেলা।

“তোমাকে একটা কথা বলব ভ্যালেরি?”
ঘুমন্ত ইসাবেলার মুখের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বোনের দিকে তাকায়,
“হুম”
“এবার সাথে করে বেলাকে নিয়ে যাও তুমি। কিছুদিন তোমার সাথে চার্চের মতো পবিত্র স্থানে থাকলে ওর মনটা শান্ত হবে। ঈশ্বরের সান্নিধ্যে মা আমার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।”
ভ্যালেরিয়া ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে ওকথা শুনে। শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“এ অসম্ভব আপা, আপনি জানেন, বিভিন্ন দায়িত্বপালনে চার্চের বাইরে থাকতে হয় আমাকে বেশিরভাগ সময়। তাছাড়া চার্চে ওকে রাখা যাবে না। আচ্ছা, আপনি কী ওকে সিস্টার বানাতে চাইছেন?” শেষটায় কপাল কুঁচকে যায় ভ্যালেরিয়ার। আন্না মেরিও আর্ত কণ্ঠে বলেন,

“না না, আমি শুধু চাইছি এই বাড়ির বাইরে গিয়ে কিছুদিন ঘুরে আসুক বেলা। সেটা তোমার সাথে হলে আমি নিশ্চিন্ত হই।”
ভ্যালেরিয়া বোনকে মনের কথা কী করে বোঝাবে? কী করে বোঝাবে তাঁরা সকলে যা ভাবে সে তা নয়। সে নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করেছে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য, ঈশ্বরের সৃষ্টি এই মানুষদের কল্যাণের নিমিত্তে। কিন্তু সকলের ভাবনার মতো ওত সহজ নয় তাঁর এই ‘সিস্টার’ জীবন। আর দশটা সাধারণ সিস্টারের মতোও নয় তার কাজ। বছর তিনেক হলো সে সিস্টারের শপথ নিয়েছে। তারপর থেকে বাড়িতে আসা হয়নি তেমন। ইসাবেলার অনুরোধ রক্ষার্থে তিন বছরে এই প্রথম এলো। ফাদার জালোনভের কাছ থেকে যখন তখন চিঠি এসে পৌঁছাবে দুয়ারে। চিঠি এলে তাঁকে ফিরতে হবে আবার। আর কোনোদিন এখানে ফেরা হবে কি না জানে না সে। তাকে আনমনা হতে দেখে আন্না মেরিও ফের শুধান,

“নেবে বেলাকে, ভ্যালেরি?”
“আপনি বুঝতে পারছেন না আপা। বেলা এখানেই ভালো থাকবে। রোজ সাথে করে শনি, রবিবারে চার্চে নিয়ে যাবেন। এখানকার চার্চের সিস্টারদের সাথে কথা বলব আমি। অনুরোধ করব ওকে একটু সময় দেওয়ার।”
আন্না মেরিওর মুখ কালো হয়ে যায়। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন,
“তোমাকে ছাড়া আর কারো সান্নিধ্যে ওকে দিয়ে ভরসা পাইনা আমি। একটু ভেবে দেখো আমার কথাটা।”
এখানের ভাবার কিছু নেই। ভ্যালেরিয়া পারবেই না ওই বিপদসংকুল জীবনে ইসাবেলাকে জড়াতে। ইসাবেলাকে সে বড্ড ভালোবাসে। মেয়েটার খারাপ কিছু হোক কিছুতেই চায় না। এই বাড়ির বাইরে প্রতি পদে পদে বিপদ ভ্যালেরিয়ার। তাইতো সে পিছুটান ভুলে থাকে। নিজের দুর্বলতাগুলো কাওকে দেখাতে চায় না।

“ভ্যালেরি!”
ইসাবেলার ডাকে সংবিৎ ফেরে। মুচকি হেসে বলে,
“ক্রাসিভায়া( বিউটিফুল) ঘুম ভেঙেছে তোমার? কিছু খাইয়ে দিই?”
“না, খিদে নেই। তুমি আরো কাছে সরে এসো। তোমাকে জড়িয়ে ধরি।”
ভ্যালেরিয়া ওকে জড়িয়ে ধরে। ইসাবেলা আদুরে বেড়ালের মতো ওর বুকে মাথা রেখে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলে না। ভ্যালেরিয়া ওর হালকা বাদামি চুলে বিলি কেটে বলে,
“ক্রাসিভায়া, এমন করে তো জীবন চলে না। তোমাকে ধৈর্য শক্তি বাড়াতে হবে। শক্ত হতে হবে।”
“ওরা সকলে আমায় মিথ্যার মধ্যে রেখেছিল ভ্যালেরি। আমি কী করে শক্ত হব? তুমি আমাকে বলছ ভেঙে পড়তে না, ও ভ্যালেরি, আমি যে ইতোমধ্যে ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেছি। পিটার আমার মনটাকে এভাবে কেন ভাঙল?”
ভ্যালেরিয়া নিরুত্তর। ইসাবেলা ফুঁপিয়ে ওঠে।
“আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে হয় না ভ্যালেরি। এখানে দমবন্ধ হয়ে আসছে আমার। আর কিছুদিন থাকলে মরেই যাব বুঝি। তোমার সাথে করে নিয়ে যাও না আমায়, নেবে তো?”

“ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। ও কথা বলো না আর। নিজেকে এভাবে দুর্বল করে তুলো না ইসাবেল। এখানে থেকেই তোমাকে বাঁচতে শিখতে হবে। যিশুর জীবনী পড়েছ না? তিনি কত দুঃখ ভুগেছেন। শূলে বিদ্ধ হয়েছেন তবুও আশাহত হননি। কাওকে দোষারোপ করেননি। ভালোবাসেন তিনি আমাদের। ঈশ্বর তোমায় ভালোবাসে। এই দুর্যোগের কাল থেকে বেরিয়ে ঈশ্বরের দেখানো পথে চলতে হবে তোমায়। জীবন থেকে বিশ্বাস হারিয়ো না। ঈশ্বর তোমায় ধৈর্যশীল করুন। মঙ্গল হোক তোমার।”
ইসাবেল ওর গলা জড়িয়ে ধরে,

“আমি কিছু শুনতে চাই না। আমায় তুমি এবার সাথে করে না নিলে মরা মুখ দেখবে। আমি সত্যি মরে যাব ভ্যালেরি। পিটারের স্মৃতি আমায় মেরে ফেলবে। তোমার সাথে না রাখ, কিন্তু এই রিগা শহর থেকে আমায় নিয়ে চলো।”
ভ্যালেরিয়া চিন্তায় পড়ে। ইসাবেলা কাঁদতে কাঁদতে ওর বুকের উপর ঘুমিয়ে যায়। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতের ঘন কালোয় চারপাশ ঢেকে গেছে। ভ্যালেরিয়া ঘণ্টাখানেকের জন্য পার্শ্ববর্তী চার্চে গিয়েছিল। বাড়িতে ঢোকার মুখে উত্তর দিকের রাস্তা থেকে ভেসে এলো ঘোড়ার খুঁড়ের আওয়াজ। থেমে দাঁড়ায় সে। মেরুন রঙের ফিটন এসে থামল ওর সামনে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন চল্লিশোর্ধ্ব এক লোক। পরনে তাঁর কালো আলখেল্লা। মাথায় কালো পাগরি। মুখভর্তি দাড়িগোঁফ। গলায় ঝুলছে ক্রুশ। অভ্যর্থনা জানায় ভ্যালেরিয়া। লোকটাকে কয়েকবার দেখেছে ফাদার জালোনভের সাথে। চিনতে কষ্ট হলো না তাই। তবে নামটা ঠিক মনে করতে পারল না। লোকটা মাথা মৃদু নুয়ে প্রত্যুত্তর করে পকেট থেকে একটা খাম বের করলেন। শুকনো গোলাপের ছবির স্ট্যাম্পসম্বলিত খামটা দেখে গলা শুকিয়ে এলো ভ্যালেরিয়ার। হাত বাড়িয়ে খামটা নিলো। খামটা হাতে দিয়েই ফিটনে উঠে পড়ল লোকটা। উঠার আগে আরেকবার আশপাশটা সতর্কে দেখে নিলো। কোথাও কেউ নেই। লোকটাকে নিয়ে উত্তর দিকের রাস্তায় ফের হারিয়ে গেল ফিটনটি। ভ্যালেরিয়া গলার ক্রুশটা শক্ত মুঠে ধরে আস্তে আস্তে উঠে এলো দোতলায় ইসাবেলার কক্ষে। ইসাবেলা ঘুমিয়ে আছে। আজ অনেক বলে কয়েক চামচ স্যুপ খাওয়াতে সক্ষম হয়েছে। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ইসাবেলার তখনকার কথা। নতুন ভাবনা যোগ হলো আগত চিঠির ভেতরের অদেখা নির্দেশ। চিঠিটা অসতর্কে সামনের ছোট্ট টেবিলে রেখে ওয়াশরুমে ঢুকল।

হঠাৎ দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙে ইসাবেলার। পাশে ভ্যালেরিয়া নেই। বোধহয় পাশের ঘরে নৈশ প্রার্থনায় মগ্ন। ভ্যালেরিয়ার এই পরিবর্তন ভীষণ ভালো লাগে ইসাবেলার। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হয় সেও সিস্টার হবে। না, সিস্টার নয়, সে হবে নান। কিন্তু মা রাজি হবেন না। বয়সও তো কম। সবে সতেরো পড়ল। নান হওয়ার ইচ্ছেটা এই ক্ষণে প্রবল হলো। এই মোহ, মায়া ত্যাগ করতে পারলেই বুঝি কষ্ট লাঘব হবে। আচ্ছা, মনুষ্য জীবনে এত কষ্ট কেন? গলাটা শুকিয়ে এসেছে। শিওরের পাশে পানির জগটা পেল না। ওই তো ছোট্ট টেবিলের উপর ওটা। অনাহারে দূর্বল শরীরটাকে ঠেলে তুলে দাঁড় করিয়ে চলল সেদিকে।

পানি পান করে গ্লাসটা রাখতে যাবে তখনই চোখ পড়ে টেবিলে পড়ে থাকা চিঠির খামটার দিকে। হাতে তুলে নিলো। ভাবলো চিঠিটা পিটারের নয়ত? আনন্দটুকু তার নিমেষে মুছে গেল লেখাগুলো দেখে। পিটারের নয়। প্রেরকের নাম ধাম পড়তে পারল না। বড়ো অদ্ভুত লেখা। কোন দেশের ভাষা কে জানে? কিন্তু চিঠিটা কার? ভ্যালেরিয়ার! হঠাৎ চোখ পড়ল স্ট্যাম্পের শুকনো গোলাপের ছবিটার উপর। সাধারণ শুকনো গোলাপের মতো নয় ওটি। বেশ অন্যরকম। যেন শুকিয়েও জীবন্ত। আচমকা মনে হলো এই রকম একটা চিত্র ও আগেও কোথাও দেখেছিল! কিন্তু কোথায়?

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৩+৪