তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৭৯+৮০
Taniya Sheikh
ভীষণ ব্যথাভরা একটা মেয়েলি গোঙানির আওয়াজ আবছা অন্ধকার ঘরের চার দেওয়ালে দাপাদাপি করে থেমে গেল। এখন কেবল হিংস্র চাপা গর্জন শোনা যাচ্ছে। শিকার ধরার পর হায়েনার গলা দিয়ে যে পৈশাচিক শব্দ বের হয় এ তেমনই।
আপাদমস্তক কালো আলখেল্লা পরিহিত একজন লোক বন্ধ দরজার কাছে এসে সেই শব্দ শুনে থমকে গেলেন। তাঁর ভয় থাকার কথা নয়। ভয় মানুষের থাকে। তিনি মানুষ নন। তবুও দুজনকে তাঁর ভীষণ ভয়। একজন এই বন্ধ দরজার অপরপ্রান্তে। হিংস্র জানোয়ারের ন্যায় গজরাচ্ছে। একসময় লোকে তাঁকে বলত বিকারগস্ত, নিষ্ঠুর। ওরা একে দেখলে কী বলবে? মনে মনে হাসলেন। তাঁর মতো বিকারগস্ত লোক যাকে ভয় পায় তার বর্ণনা মুখে বলে কী শেষ হবে? দরজায় টোকা দিতে গিয়ে হাতটা জমে যায় পাথরের মতো। ভেতরের গর্জন ক্রমশ হিংস্র হচ্ছে। এসময় যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু দেখা করা খুব জরুরি। সেখানে দাঁড়িয়ে দোনোমোনো করতে লাগলেন।
“তুমি এখানে কী করছো?” চমকে তাকালেন পেছনে। সামনে দাঁড়ানো লোকটার মুখ কড়িডোরের আঁধারে জড়িয়ে আছে। কিন্তু গলাটা চেনা। এগিয়ে গেলেন লোকটার দিকে। মুখ তুললেন। স্বার্থোদ্বারের প্রয়োজনে মাথা নিচু করতে হয়। অপছন্দের জনদের সাথে মিষ্টি করে বলতে হয় কথা। এসবে তিনি পূর্ব অভিজ্ঞ। অপ্রস্তুত হেসে বললেন,
“ড্যামিয়ানের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। জরুরি কথা ছিল।”
“এখন দেখা হবে না। এই সময় ও কারো সঙ্গে দেখা করে না।” নিরস গলায় জবাব দিয়েই ঘুরে দাঁড়ায়,
“ভালো চাও তো চলে যাও, রিচার্ড।”
“কথাগুলো জরুরি।” পেছন পেছন এলেন তিনি। লোকটা বলল,
“আমাকে বলতে পারো।”
“তোমাকে?”
“হ্যাঁ, আমাকে।”
“থাক। আমি বরং পরেই আসব।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দাঁড়িয়ে গেলেন। এদের একটাকেও বিশ্বাস করেন না। তবুও জোর করে বিশ্বাসটাকে স্থির রাখতে হচ্ছে। সবই একমাত্র ওই সিংহাসনের জন্য। ড্যামিয়ান ওঁকে কথা দিয়েছে নিকোলাসের সিংহাসন দখল করতে সাহায্য করবে। কথার বরখেলাপ হলে সহজে ছেড়ে দেবেন না তিনি। আর ধোঁকা দেওয়ার সাহস করলে দেখে নেবেন। বোকা ভেবেছে!
“হুঁ!”
ক্ষুব্ধ মনে পাশের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন রিচার্ড।
ভেতরে দাঁড়ানো লোকটার চোয়াল শক্ত হলো। কিন্তু ফিরল না। হনহন করে হেঁটে যেতে লাগল। ওকে হেয় করার উচিত শাস্তি একদিন এই পিশাচটাকে ও দেবে। লোভ, ক্ষমতা মানুষকে অন্ধই করে না, বোকাও বানিয়ে ছাড়ে। লোকে বলে শত্রুর শত্রুকে বন্ধু বানাও। এই পিশাচ তাই করেছে। জানে না, লোকের সব কথা শুনতে নেই। বিদ্রুপের হাসি খেলে গেল ওর ঠোঁটের কোণে।
“রজার!”
ভেতরে পরিচিত গলায় একজন ডেকে উঠল। পাশের জানালা খুলতে কক্ষের হ্যাজাকের আলো ওর মুখের ওপর পড়ে। অশুভ প্রেতমূর্তির মুখের মতো দেখাচ্ছে রজারের মুখ।
আজ রাতে বিয়ে। ইসাবেলার মনের ভেতর বেশ অস্থিরতা কাজ করছে। নিকোলাসের স্ত্রী হবে। প্রেমিকা হওয়া আর স্ত্রী হওয়াতে পার্থক্য আছে। ইসাবেলা এবার একই সাথে ওর প্রেমিকা ও সহধর্মিণী। সহধর্মিণী! কেমন যেন সুখ সুখ অনুভব করে। বুকের ভেতরে প্রসন্ন এক ঢেউ খেলে যায়। ওদের বিয়েটা হয়তো পুরোপুরি সামাজিকতা ও ধর্মীয় নিয়ম মানবে না তবুও তো তা বিয়েই।
এই সময় আপনজনেরা পাশে থাকে। কত কী বলে -বুঝিয়ে নববধূর অস্থিতিশীল মন ভুলায়। ইসাবেলার দুর্ভাগ্য ওর পাশে আপনজন থাকলেও মন ভুলানোর জন্য কেউ নেই। কীভাবে থাকবে? ওদের তো ধারণাই নেই আজ ইসাবেলার বিয়ে। দিনভর ইসাবেলা একা একা থাকার চেষ্টা করেছে। বাবা-মা, ভাইবোনের সান্নিধ্যে এলে কান্না পায় ওর। অপরাধবোধ তীব্র হয়। সত্য সূর্যের ন্যায়। একদিন ভাস্বর ঠিক হবে। সেদিন ওদের মুখোমুখি হবে কীভাবে ইসাবেলা? সারাটাদিন চোখের জল আড়াল করে কেটেছে ওর। অথচ, আজ ওর বড়ো আনন্দের দিন। কিন্তু এই আনন্দে এত বিষাদ কেন?
ওর মন খারাপ যে কেউ খেয়াল করেনি তা নয়। আন্না মেরিও, ওলেগ, তাতিয়ানা ও মাতভেই ঠিকই দেখেছে তাদের প্রিয় বেলার বিষণ্ণ মুখ। কথা বলতে চেয়েছে ওরা। ইসাবেলা বরাবরের মতোই এড়িয়ে গেছে। অপ্রয়োজনীয় হাসি হেসে সকলের চোখে ধুলো দিয়েছে। কিন্তু মা’কে পুরোপুরি ধোঁকা দিতে সফল হয়নি। আন্না মেরিও গত কয়েকদিন ধরে খেয়াল করছেন ও যেন একটু বেশিই চুপচাপ হয়ে আছে। আজ কাছে ডেকে কথা বলতে চাইলে আসছি বলে সেই যে রুমে গেল আর এলো না। তিনি ভাবলেন মনটা বুঝি আজ ওর কোনো কারণে খুব খারাপ। একা থাক কিছুক্ষণ। পরে গিয়ে কথা বলবেন। তাছাড়া তিনি ইদানীং অন্য একটা ব্যাপার নিয়ে খুব ভাবছেন। রেইনি মেয়েটা তাশার বেবিসিটার হওয়ার পর থেকে তাশার রোগটা ভালো হয়ে গেছে। আগের মতো সুস্থ দেখাচ্ছে ওকে। বাড়ির সবাই খুশি। কিন্তু আন্না মেরিওর চোখে ধরা পড়েছে রেইনির পরিবর্তন। মেয়েটাকে তিনি পছন্দ করেন এমন নয়। এই অপছন্দের কারণ ওর দাদি। বাবার বিশ্বস্ত, ঘনিষ্ঠ ভৃত্যাটিকে তিনি আগাগোড়াই বক্র চোখে দেখেছেন। তার আপনজনদের বেলাতেও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে না। কিন্তু রেইনিকে অপছন্দ করার দাবিটা কেন যেন শক্ত নয়। মেয়েটার মুখখানি মায়াভরা। ওই মুখে তাকালে মায়া করতে ইচ্ছে হয়। তিনি অবশ্য সে ইচ্ছেটাকে প্রশ্রয় দেন না। তবুও মেয়েটার শূন্য দৃষ্টি তাঁকে আজকাল ভাবায়। তাশা যত সুস্থ হচ্ছে রেইনিকে ততই যেন রোগা দেখাচ্ছে। চোখদুটো আগের মতো জীবন্ত নয়। নির্জীব হচ্ছে দিনকে দিন। তাশার সাথে হাসলেও ওর হাসি প্রানবন্ত নয়। রেইনির এই পরিবর্তন একা তিনি নন মাতভেইও লক্ষ্য করেছে। বেশ চিন্তিত ও। আন্না মেরিও অবশ্য ওকে অভয় দিয়েছেন। বলেছেন, এই বয়সে একটু আকটু ওমন অসুখ হয়। ওষুধ খেলে সেরে যাবে। মাতভেই যে তাঁর কথাতে নিশ্চিন্ত হয়নি সেটা ওর মুখ দেখেই বুঝেছেন। আন্না মেরিও ভাবছেন রেইনির ব্যাপারটা নিয়ে বাবার সাথে কথা বলবেন। তাছাড়া মাতভেই আর তাতিয়ানার বিয়ের দিন-তারিখও তো ঠিক করা দরকার। ইসাবেলার জন্য পাত্র দেখা নিয়েও আলাপ করবেন। কত দায়িত্ব তাঁর! এত কিছুর মাঝে মেয়ের মন খারাপের কারণ জানার কথাটা বেমালুম ভুলে গেলেন আন্না মেরিও।
মধ্য রাত। অদূরে কোথাও গির্জার ঘণ্টা বেজে উঠল। মৃদু কাঁপিয়ে দিলো ইসাবেলাকে। এতক্ষণ আয়নার সামনে তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হুঁশ ফিরতে ফের চোখ পড়ে নিজের বধূবেশের দিকে। সাদা গাউন, মাথায় হিরের সাদা লাল মিশেলের পাথরের টাইরা, কানে ও গলায় একই রঙের কানের দুল এবং হার। বিয়ের সাজে প্রতিটি মেয়েই বুঝি অনিন্দ্যসুন্দরী। নিজেকে এত সুন্দর আগে লাগেনি ওর। নিকোলাসকে পাওয়ার আনন্দ কী এমন করে রঙে, রূপে প্রকাশিত হচ্ছে? আচ্ছা আজ ইসাবেলাকে দেখে মুগ্ধ হবে তো নিকোলাস? ইসাবেলা খুব চায় ও মুগ্ধ হোক। ওর জন্যই তো এত সাজসজ্জা। আজকাল ওর চোখেই নিজেকে দেখে। হীনম্মণ্যতাগুলোকে ভুলে যায়। ও সুন্দর। নিকোলাসের জন্য সুন্দর। লোকে শুনলে বলবে, কী আদিখ্যেতা! প্রেমে বুঝি কেউ আর পড়েনি, প্রেমিকা বুঝি কেউ আর হয়নি। কিন্তু ওরা তো আর ইসাবেলা নয়। ইসাবেলা যেমন করে নিকোলাসকে ভালোবেসেছে আর কে আছে এমন ভালোবাসবে? কেউ না, কেউ না।
মাথায় পর্দা টেনে নেয়। মুখের ওপর ফেলেনি এখনও। আরেকটু দেখবে নিজেকে। আজ নিজেকে দেখতে ওর বেশ লাগছে। কিন্তু বুক ঢিপঢিপানির যন্ত্রণায় এই বেশ লাগাটা ঠিক বেশ হচ্ছে না। কিছু সময় পরেই ও আর নিকোলাস বৈবাহিক সম্পর্কে বাঁধা পড়বে। অবশেষে এক হবে ওরা। জীবনটা যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। যেমন দেখেছিল তেমনই তো হচ্ছে। কী প্রশান্তি!
মনের শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। মনে পড়ে রক্তসম্পর্কের আত্মীয়দের কথা। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সকলে। ওরা জানেও না ওদের অজান্তে কত বড়ো সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও। স্বার্থপরের মতো নিজেকে সুখী করতে সকলকে উপেক্ষা করছে, ধোঁকা দিচ্ছে। এই স্বার্থপরতার জন্য কী বিধাতা কঠিন শাস্তি দেবেন? তাঁকেও তো ইসাবেলা অসম্মান করেছে। যে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেনি ও কি না তাকেই সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসল! ভয়ের ডঙ্কা বাজে বুকের ভেতর। কিন্তু সেই ভয় নিকোলাসকে পাওয়ার আনন্দের চেয়ে বেশি নয়। ক্ষণিক জাগা ভয়টাকে আজকের এই সুখের সমুদ্রের অতলে ছুঁড়ে ফেলে। সামনে যত সংকটই আসুক না কেন সাহসের সাথে মোকাবিলা করবে। ভয় কীসের নিকোলাস পাশে আছে না?
দরজায় টোকা পড়ে। পুরুষালি গলায় একজন বলে উঠল,
“ভেতরে আসতে পারি? কাউন্ট আপনাকে নিতে পাঠিয়েছেন।”
ইসাবেলা শেষবার আয়নায় নিজেকে দেখে ফের লম্বা শ্বাস ছাড়ে। বুকের ভেতর যেন আষাঢ়ে মেঘ ডাকছে। চিত্ত বড়ো চঞ্চল। মুখের ওপর পর্দা ফেলে দরজার ওপাশে থাকা ব্যক্তিটিকে প্রবেশের অনুমতি দিলো। পিয়তর গুসেভ এসেছেন। ইনাকে সেদিন ওই মেয়ের উদর ছেদনের সময় দেখেছিল ইসাবেলা। ওদের বাড়ির পাশের সেই কবরস্থানের কবরটিও তো পিয়েতরেরই। এছাড়াও বোধহয় দেখা হয়েছিল। কিন্তু সামনা-সামনি সাক্ষাৎ হয়নি। পিয়েতর কাছে এসে ওর হাতটা ধরলেন। করপুটে চুমো খেয়ে আন্তরিক গলায় বললেন,
“পিয়েতর গুসেভ। আগে দেখা হলেও ঠিকভাবে সাক্ষাৎ হয়নি। চমৎকার লাগছে আপনাকে। কাউন্ট নির্ঘাত বাকরুদ্ধ হবেন।”
ইসাবেলা লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। কথা বলল না। কী বলবে ঠিক খুঁজে পায় না। পিয়েতর মুচকি হাসলেন।
“আমি আপনাকে এখান থেকে বিয়ের আসর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য পেতে পারি, হবু কাউন্টেস?”
মস্তিষ্কে সূক্ষ্ণ ব্যথা ঝিলিক দিয়ে ওঠে। বাবার অনুপস্থিতি খুব টের পেল। কান্না গিলে ফের মাথা নাড়ায়। পিয়েতর বাহু কোণ করে বললেন,
“কাউন্ট অধীর হয়ে আছে। আর দেরি হলে বেচারার ওপর টর্চার করা হবে। চলুন।”
মজা করে হাসলেন। পিয়েতর বয়স্ক তবে গম্ভীর নন। ইসাবেলার তাই মনে হলো। ইসাবেলা সংকোচের সাথে তাঁর বাহুর ফাঁকে হাত রাখল। অন্য হাতে একগুচ্ছ শুভ্র ফুল। পিয়েতর সারল্য মাখা হাসি উপহার দিয়ে বেরিয়ে এলেন কক্ষের বাইরে।
“নার্ভাস?”
“হুঁ?” পিয়েতরের প্রশ্নে চমকে তাকালো ও। পিয়েতর অন্য হাতটা ইসাবেলার হাতের ওপর রেখে মৃদু চাপ দিয়ে বললেন,
“কাউন্টের সাথে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলো মনে করুন। দেখবেন নার্ভাসনেস আর থাকবে না।”
ইসাবেলা তাই করল। ফলও পেল। নিকোলাসের সাথে কাটানো মুহূর্ত ওর স্নায়ু শান্ত করে।
“আই উইশ আমি আপনাকে বিয়ে সম্পর্কে ভালো ভালো নসিয়ত দিতে পারতাম। কিন্তু আফসোস এ ব্যাপারে পূর্ব অভিজ্ঞতা একেবারেই নেই।” বললেন পিয়েতর। ইসাবেলা বিস্মিত হয়ে বলল,
“আপনি কখনো বিয়ে করেননি?”
“দুর্ভাগ্যবশত একবারো না। তবে কাউন্টকে বশ করার কৌশল শেখাতে পারব। যদিও আমার মনে হয় সেটার আর প্রয়োজন হবে না। অ্যাংরি ইয়াং ম্যান আপনার প্রেমে ইতোমধ্যে সফট প্রেমিক পুরুষে পরিণত হয়েছে।”
ইসাবেলা লজ্জায় অধোবদন হয়ে মুচকি হাসল। পিয়েতরও হাসেন। দুজনে দুর্গের ব্যাকইয়ার্ডের নেমে এলো।
রাতটা উজ্জ্বল। চাঁদের আলোয় বিধৌত সমস্ত ব্যাকইয়ার্ড। আকাশে রুপোলী তারার সামিয়ানা। শীতল হাওয়া বইছে। শীতে কাঁপুনি দিয়ে ওঠে ইসাবেলার শরীর। কিন্তু তা সাময়িক। বিয়ের ভেন্যু হ্যাজাকের আলো, কাঠের আগুনে উষ্ণ। ব্যাকইয়ার্ডের একপাশে সুন্দর করে সাদা এবং লাল ফুলে সাজানো হয়েছে। সামনে তাকাতে নিকোলাসকে দেখতে পেল। কালো টুক্সিডো স্যুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। ওর কালো সিল্কি চুলগুলো পরিপাটি করে একপাশে সাইড করে আঁচড়ানো। ঠিক আর পাঁচটা বরের মতো সাজলেও ওকে সাধারণ লাগছে না। প্রতিটি মেয়ের স্বপ্নের ক্যানভাসে যে সুদর্শন রাজপুত্রের ছবি আঁকা হয় নিকোলাস যেন তাই। হৃদয় হরণকারী এই সুদর্শন পুরুষটি ওর হবে। একান্ত ওর। আনন্দে চোখে জল টলমল করে।
নিকোলাস একদৃষ্টে চেয়ে আছে ওর দিকে আগত ইসাবেলার দিকে। নীল চোখে ঘোর লেগেছে। হাতটা বুকের বা’পাশে। খুব জোরে শব্দ হচ্ছে সেখানে। শব্দ! না না, এ যে মিলন বেলায় বেজে ওঠা মৃদঙ্গ ধ্বনি। ঠোঁটের কোণের প্রসস্থতা ক্রমশ দীর্ঘ হয়।
পিয়েতর ইসাবেলাকে নিয়ে ওর সামনে এসে থামলেন। নিকোলাস হাত বাড়িয়ে ইসাবেলার হাতটা নিলো।
“ধন্যবাদ, পিয়েতর।” বলল নিকোলাস।
ইসাবেলার মনের অবস্থার কথা স্মরণ করে পিয়েতরকে পাঠিয়েছে নিকোলাস। বিয়েতে হাতেগোনা কয়েকজন উপস্থিত। সকলেই নিকোলাসের শুভাকাঙ্ক্ষী। ও জানে এখানে একমাত্র পিয়েতরই আছেন যিনি ইসাবেলার মন ভালো করতে সক্ষম। বাকিরা ঠিক আগের নিকোলাসের মতো বর্বর। পিয়েতর মুচকি হেসে সামনের অতিথি আসনে গিয়ে বসলেন। নিকোলাস আবার তাকালো হবু স্ত্রীর দিকে। পূর্ণিমা চাঁদের ন্যায় সুন্দর যেন ও। এই পূর্ণিমার চাঁদটা ওর আকাশের। হাতের মধ্যে থাকা ওর কোমল হাতদুটোকে মৃদু চাপ দিয়ে বলল,
“ইউ লুক ব্রেথটেকিংলি বিউটিফুল, মাই লাভ।”
পদ্মের মতো কোমল হাতটার ওপর চুম্বন করল। আজ মনে হচ্ছে নিকোলাসের দেহে প্রাণ এসেছে। জীবন্তের মতো আনন্দ, অনুভূতি টের পাচ্ছে। শ্বাসরুদ্ধ করেছে ইসাবেলার বধূবেশ।
ওদের দুজনের মাঝে দাঁড়ানো পলকে ওরা যেন ভুলেই গেছে। হালকা কেশে উঠল পল। ইসাবেলা সলজ্জে কাতর হয়। নিকোলাস হয় বিরক্ত। মনিব এবং ইসাবেলার ভালোবাসা পলকে পুলকিত করে। এই যে নিকোলাস বিরক্ত হয়ে তাকালো তাতে বেশ মজাই পেল ও। কিন্তু প্রকাশ করবে এমন সাহস নেই। নিকোলাসের অনুমতি নিয়ে বিয়ের কার্যক্রম শুরু করল পল। উপস্থিত সকলকে ভুলে বর কনে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল। সময় এলো শপথ পাঠের। দুজনের কেউ ই শপথ বাক্য লিখে রাখেনি। আজ মনে যা আসবে তাই শপথ করবে। নিকোলাস শুরু করে,
“যেদিন প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম আমার নিস্পন্দ হৃদয় বহুবছর পর স্পন্দিত হয়। আজও একইভাবে স্পন্দিত হচ্ছে, যতদিন এ হৃদয় আছে এমনই হবে। একমাত্র তোমার জন্য। তোমাকে আমি ভালোবাসি বেলা। এই কথাটা দিন রাতে অসংখ্যবার বলব। ওয়াদা করছি, আমি নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুহূর্ত পর্যন্তও কথাটি আমার ঠোঁটে থাকবে। আমার আঁধার জীবনে আলো তুমি। আজ আমার যা পরিবর্তন কেবলমাত্র তোমার কারণে। ওয়াদা করছি, একজন ভালো পুরুষ ও উত্তম স্বামী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলব শুধু তোমার জন্য। তুমি আমার সঙ্গী, অর্ধাঙ্গিনী। এই জীবন্মৃত দেহের ভেতরের হৃদয়টার অধিকারস্বত্ব তোমাকে দিলাম। চিরতরের জন্য।এই আংটি হাতে নিয়ে আমি ওয়াদা করছি, তোমার বাকি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হব আমি। ওয়াদা করছি, তোমাকে একা ছাড়ব না, তোমাকে আগলে রাখব, ভালোবাসব, তোমার সকল স্বপ্ন পূরণ করব। তোমার কষ্টের কারণ হব না, ঠোঁটে হাসি এনে দেবো, লজ্জায় লাল হবে তোমার সুশ্রী গাল সেই কারণ হব। যতদিন অস্তিত্ব থাকবে এই হাত ছাড়ব না। তোমার ছায়া হব রোদে, বৃষ্টিতে ছাউনি। তোমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে স্মরণীয় করব। ওয়াদা করছি, প্রতিদিন তোমার প্রেমে পড়ব, নতুনভাবে, আগের চেয়ে বেশি করে।”
থামল নিকোলাস। সমস্ত হৃদয় উল্লাসিত। হাতের ছোট্ট হিরের আংটিটি ইসাবেলার অনামিকায় পরিয়ে দিলো। ইসাবেলা চোখ মুছলো। ঠোঁটে হাসি লেগেই আছে। প্রাণভরে শ্বাস নিয়ে বলতে লাগল,
“প্রথম তোমাকে দেখে আমি নির্বাক তাকিয়ে ছিলাম। কেন যেন বহুদিন পর যন্ত্রণাকাতর মন তোমাকে দেখে শান্তি পায়। বড়ো বিরক্ত হলাম আমি। সূর্য যেমন রাত থেকে দূরে পালিয়ে বেড়ায় আমিও তোমাকে দেখে তাই করেছি। কিন্তু গন্তব্য শেষ তোমার কাছেই হয়েছে। তোমাকে অপছন্দ করতে চাইলাম। যখন তোমার সত্য জানলাম, ঘৃণা করতে চেয়েছি, প্রতিশোধ নিতে চেয়েছি। কিন্তু শেষমেশ ভালোবাসিয়ে ছাড়লে। যত তোমার কাছে গেলাম এক নতুন তোমাকে দেখলাম। যাকে ভালোবাসতে চাইল মন। কিছুতেই বারণ শুনলো না। পূর্বে আমি যা ভালোবাসা ভেবেছি তোমাকে দেখে জানলাম সব ভুল। এই নির্বোধ মেয়েটাকে তুমি ভালোবাসতে শিখেয়েছো নিকোলাস। ওয়াদা করছি, আজীবন এই শিক্ষা আমি ভুলব না। তোমাকে আমি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এমনই করে ভালোবাসব। প্রতি মুহূর্ত অনুভব করবে আমার ভালোবাসা। তোমাকে প্রেমিক এখন স্বামী হিসেবে পেয়ে নিজেকে পৃথিবীর সেরা ভাগ্যবতী মনে করছি। ওয়াদা করছি, বাকি জীবন তাই মনে করব। পৃথিবীসুদ্ধ লোক তোমার বিপক্ষে গেলেও আমি তোমার পাশে থাকব, তোমাকে ভালোবাসব, বিশ্বস্ত হব। ওয়াদা করছি, আমি এবং আমার হৃদয় একমাত্র তোমার। ওয়াদা করছি, তোমার মৃতসঞ্জীবনী হব৷ তোমার হাসির কারণ, সুখের কারণ হয়ে রবো। ওয়াদা করছি, আমার আজকের ভালোবাসাকে ছাড়িয়ে যাবে কালকের ভালোবাসা। দিনে দিনে ছাড়িয়েই যাবে।”
দম ফেললো ইসাবেলা। হাতে রাখা আংটিটি নিকোলাসের অনামিকায় পরিয়ে দিলো। নিকোলাস ওর সজল চোখের দিকে তাকালো। দুজনের চোখে-মুখে আজ প্রাপ্তির উচ্ছ্বাস। চারপাশ এখন লুপ্ত শুধু পরস্পরকে অনুভব করছে ওরা।
“আমি নিকোলাস উইলিয়াম, গ্রহন করছি ইসাবেলা অ্যালেক্সিভকে আইনত আমার স্ত্রীরূপে। সে আছে এবং থাকবে সকল পরিস্থিতিতে।” এক নাগাড়ে বলল নিকোলাস। ইসাবেলা আবেগে জড়িয়ে আসা গলায় বলে,
“আমি ইসাবেলা অ্যালেক্সিভ, গ্রহন করছি নিকোলাস উইলিয়ামকে আইনত আমার স্বামীরূপে। সে আছে এবং থাকবে সকল পরিস্থিতিতে।”
একে অপরের হাতটা ওরা শক্ত করে ধরে আছে। পল মুচকি হেসে ওদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা দিতে সামনের অতিথিরা হাতে তালি দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়। পল নিকোলাসকে বলল,
“আপনি এখন বধূকে চুম্বন দিতে পারে__” পলের কথা শেষ হওয়ার আগেই ইসাবেলাকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে মুখের ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে দীর্ঘ গাঢ় চুম্বন দিলো ঠোঁটে। ইসাবেলার টলমল চোখ উপচে জল পড়ল। আনন্দের আতিশয্যে আরও কাছে টেনে নিলো নিকোলাসকে। কলতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বিয়ের আসর। পল বিড়বিড় করে বলল,
“আমাকে শেষই করতে দিলো না। নো প্রবলেম। বি হ্যাপি। আমার আশীর্বাদ রইল তোমাদের ওপর। মাই গড! একদম আসল ফাদারের মতো বিহেভ করছি দেখি। ফাদার! হেল নো!”
কেক কাটা থেকে শুরু করে বিয়ের বাকি নিয়ম-কানুন ভালোভাবেই শেষ হয়। অতিথিরা নব দম্পতিকে আশীর্বাদ জানিয়ে চলে গেল। পল গেল দুর্গের ওপরে। নোভাকে আজ খুব বেশি মনে পড়ছে। এবার জার্মানি গিয়ে যেভাবেই হোক মনের কথা বলবে। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় নিয়ে নির্জন রাতে দূর আকাশে চেয়ে রইল।
রাত তখন প্রায় শেষ। ইসাবেলাকে বাড়ি ফিরতে হবে। নিকোলাস ইসাবেলাকে কোলে করে ফিরে এলো। প্রবেশ করল ওর রুমটিতে। দু’হাতে ওর গলা জড়িয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজে আছে ইসাবেলা।
“ক্লান্ত?” চাপা গলায় বলল নিকোলাস। ইসাবেলা ঘাড়ের ওপরই মাথা দুদিকে নাড়ালো। হাসল নিকোলাস। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পাশে বসল। ক্লান্তি জড়ানো চোখে তাকালো ওর দিকে ইসাবেলা। জীবনে এত নার্ভাস কখনো হয়নি নিকোলাস। কত মেয়ের সান্নিধ্যে গেছে। নারী মহলে নির্লজ্জ, বর্বর বলেই পরিচিত। কিন্তু, আজ ইসাবেলাকে স্পর্শ করতে এত জড়তা! অথচ, ওকে ও চায়। ভীষণভাবে। নির্লজ্জ, বর্বর নিকোলাস আজ স্বামী হয়েছে। তখন আর এখনে অনেক ফারাক। এখন ওর সামনে যে সে মেয়ে নয় বরং ওর প্রিয়তমা স্ত্রী। যাকে ও ভালোবাসে।
“কী হয়েছে?” উঠে বসল ইসাবেলা। নিকোলাস গলা ঝেড়ে বলল,
“কই? কিছু না তো।”
ইসাবেলা লক্ষ্য করল নিকোলাস সরাসরি ওর দিকে তাকাচ্ছে না৷ লজ্জা পাচ্ছে?
“তুমি লজ্জা পাচ্ছো!”
“হু-য়াট? লজ্জা! নো ওয়ে।”
“অবশ্যই। দেখো তোমার কান লাল হয়ে উঠেছে। মাই, মাই। রিয়েলি নিকোলাস?” ফিক করে হেসে ওঠে ইসাবেলা। নিকোলাস কান পরীক্ষা করল। সত্যি কী ওর কান লাল হয়েছে! সেটা কী করে সম্ভব!
“বেলা, স্টপ।” ইসাবেলা গুরুত্বই দিলো না। নিকোলাসকে এমন বিব্রত হতে দেখে হেসে খুন ও। স্বামীকে একটু জ্বালাতে কোন স্ত্রীর না আনন্দ হয়? নিকোলাস ওকে বিছানার ওপর ফেলে দুহাত মাথার দুদিকে চেপে ধরে।
“আমাকে লাজুক বলা বন্ধ করো।”
তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৭৭+৭৮
“করব না। কী করবে, হু? দ্য নিকোলাস উইলিয়ামস বিয়ের রাতে বউয়ের চোখে তাকাতে লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। হি-হি-হি।” হাসতে লাগল ইসাবেলা। নিকোলাসের মুখটা ধীরে ধীরে ওর দিকে নেমে আসতে শিহরণে জমে গেল। প্যারালাইজড হয়ে রইল ওর নিচে। নিকোলাস মুচকি হাসল। ওকে লাজুক বলা! নির্বোধ বেলা। কার ইগোতে খোঁচা দিয়েছে ধারণা নেই ওর।ইসাবেলার গলায়, ঘাড়ে, কানে চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“থামলে কেন? হাসো?”
“নি-কোলাস!”
“হুম? আমাকে লাজুক বলা তাইনা? চলো তোমাকে দেখাই কতটা নির্লজ্জ আর অসভ্য আমি।”
