তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ১২
জান্নাতি আক্তার জারা
রশ্মি কে ছাড়া আরাতের দিনগুলো এই ভালো তো এই খারাপ। সারাদিন আরাত শুধু ছুটাছুটি করে সময় কাটাচ্ছে। কখনো রশ্মিদের বাড়িতে গিয়ে রাহিমা সুলতানা সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। তো কখনো আইরা দের বাড়িতে গিয়ে আরিশার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। আবার কখনো তালুকদার বাড়িতে। রাত হইতেই আহিন আলভী সঙ্গে গল্প করছে। রশ্মির সঙ্গে তো ফোনে কথা আছেই এভাবেই চলছে আরাতের দিনগুলো। দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরো ছয়টা দিন, আজকে আরাতের কলেজে প্রথম দিন, আরাত কলেজের জন্য এডি হয়ে নিচে নিমে এলো।
আহিন স্কুলে চলে গিয়েছে অনেক আগেই, আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার, অফিসের জন্য বের হচ্ছেন। আরাত কে কলেজ ব্যাগ নিয়ে নিচে নামতে দেখে আদনান তালুকদার। আরাত কে নিজের কাছে ডাকলেন,
“আরাত মামনী এদিকে এসো।
আরাত, আদনান তালুকদার কাছে গিয়ে দাড়ালো, আদনান তালুকদার আরাত কে বলল,,,
“কলেজে একা যাবে মামনী? চলো আমাদের সঙ্গে আমরা তোমাকে তোমার কলেজের সামনে নামিয়ে দিবো।
” আমি স্কুটি নিয়ে যাবো, বড়আব্বু।
আনাস ডাইনিং টেবিলের খাবার খেতে খেতে আরাত কে বলল,
“প্রথম দিন, একা একা যাওয়ার প্রয়োজন নেই আমি তোকে নামিয়ে দিয়ে আসবো, আর তোর কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বল……
” আমি বললাম তো, আমি স্কুটি নিয়ে যাব…..
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
আরাত বিরক্তি মুখে কথাগুলো বলতে বলতে খাবার টেবিলে দিকে তাকালো, সেদিকে তাকিয়ে মুখের কথা মুখেই রয়ে গেলো, আনাস সের পাশে চেয়ারে তাকবীর কে মাথা নিচু করে খাবার খেতে দেখে। চঞ্চল আরাত নিমেষেই শান্ত হয়ে গেলো। খাবার টেবিলে দিকে তাকিয়ে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজে নিয়ে কিছুটা আমতা আমতা করতে করতে মুখে একটু হাসি টেনে নরম সুরে পুনরায় বলল,
“না, মানে ভাইয়া, আমি স্কুটি নিয়ে যাবো।
“ওকে ওকে স্কুটি নিয়েই যাস রে বাবা, এদিকে আয়।
“ভাইয়া ওখান থেকে বলো না, আমি শুনছি তো!
” তোকে আসতে বলছি এখানে।
আনাস সের কথায় আরাত মুখ ফুলালো, আহাদ তালুকদার আনাস কে ধমক নিয়ে বললেন,
“আনাস, তুমি আমার আম্মু কে, এভাবে ধমকাচ্ছো কেনো?
” সরি বাবা, বনুর সঙ্গে আমার কথা ছিলো, বনু এদিকে শুন’না ।
আদনান তালুকদার সদর দরজায় দিকে যাইতে যাইতে বললেন,
“আহাদ অনেক লেট হয়ে গিয়েছে চলে আয়, মামনী ভাইয়া তোমাকে ডাকছে ভাইয়ার কথা শুনতে হয়, ভাইয়ার কাছে যাও।
কথাটা বলে তিনি বাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে গেলেন, আহাদ তালুকদার মেয়ের কপালে ভালোবাসার পরশ রেখে দিয়ে, তিনিও অফিসের উদ্দেশ্য রওনা দিলেন,আরাত ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়লো,আনাস আরাত কে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নরম সুরে বোনকে বলে,
“একা একা কলেজ যাচ্ছিস, আমার ভালো ঠেকছে না বনু। চল আজকে তোকে আমি নামিয়ে দিবো, আর তোর প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলে আসবো, কেউ যেনো তোকে ডিস্টার্ব করতে না পাড়ে।
আনাস সের কথায় আরাতের মুখ পুনরায় গোমড়া হয়ে গেলো, আদিবা তালুকদার এঁটোপ্লেট গুলো একসঙ্গে রাখতে রাখতে বললেন,
“আরাত একা কেনো , সন্ধ্যা তো আরাতের কলেজে ভর্তি হইছে, দুজন একসঙ্গে যাবে।
আনাস : সন্ধ্যা, মানে তাকবীর ভাইয়ার মামাতো বোনের কথা বলছো?
আদিবা তালুকদার : হ্যাঁ।
আদিবা তালুকদারের কথায় আনাস, আরাতের দিকে তাকিয়ে পুনরায় বলতে শুরু করলো,
“ওকে যা তাহলে, আর শুন সিনিয়রদের থেকে দূরে দূরে থাক’বি, তোকে নিয়ে বিশ্বাস নেই দেখা যাবে সিনিয়র দের সঙ্গে ঝগড়া লেগে প্রথম দিনেই টিসি দিয়ে তোকে বের করে দিয়েছে।
আরাত, ভাইয়ের কথায় মুখে হাসি টেনে একবার তাকবীরের দিকে তাকালো সঙ্গে সঙ্গে দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেলো, আরাত তাকবীর কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তারাহুরো করে চোখ নামিয়ে নিলো।
তাকবীর, আনাস সের কথায় আরাত কে শান্তশিস্ত ভাবে উত্তর করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে আরাত কে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো, আরাত কে চুপচাপ দাঁড়িয়ে কাচুমাচু করতে দেখে, তাকবীর নিজের চেয়ার থেকে ওঠে, খাবার টেবিলের সাইট থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে অফিসে উদ্দেশ্য বেড়িয়ে গেলো।
তাকবীর কে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাওয়া দেখে, আরাত যেন নিজের ফর্মে ফিরে এলো, চোখে মুখে চনচলতা ফুটে উঠলো নিমিষেই, আনাস সের পাশের চেয়ার টেনে বসতে বসতে আরাত আনাস সের কথায় উত্তর করলো,
” দেখো ভাইয়া, আমি বরাবরই ভদ্র এক মেয়ে, সবসময় ভদ্রভাবে চলাচল করায় আমার কাজ, যদি কলেজে কেনো সিনিয়র টিনিয়র আমাকে নিয়ে প্যারায় পড়ে, এটা ওদের প্রবলেম আমার না,ওকে।
আদিবা তালুকদার এঁটোপ্লেট গুলো নিয়ে কিচেনের দিকে যেতে যেতে আরাত কে বললেন,
“আমরা জানি রে মা, তুই আমার কতোটা ভদ্রমেয়ে, সিনিয়র সঙ্গে কোনো তর্কে জড়াইবি না বলে দিলাম।
” আজব আমি কেনো তাদের সঙ্গে ফাউল বকতে যাবো, আমার সঙ্গে ফাতরামি করলে আমি ভদ্রমেয়ের মতো তাদের কে শুধু বুঝিয়ে বললো এই যা।
“আমি এতকিছু জানি না, তোর নামে কলেজ থেকে কোনোদিন কোনো অভিযোগ আসলে সে……
” ঠিক আছে, ঠিক আছে! তোমার মেয়ে এতোটাও অভদ্র না বুঝলা! কলেজ থেকে কোনো কমপ্লেন আসবে না হুহহ।
“মা’র সঙ্গেও তোর ঝগড়া করতে হবে, আল্লাহ তোকে কি দিয়ে বানাইছে বলতো একটু ?
” এটা তো আমি জানি না, এটা জানা’র জন্য তোমাকে আল্লাহ’কে জিজ্ঞেস করতে হবে। তার জন্য তোমাকে এই দুনিয়ায় মায়া ত্যাগ করতে হবে। ইসস কতটা ভেজাল। একটা কাজ করো এদিকে আসো আমি তোমাকে উপরে পৌছানোর টিকিট কেটে দিতে’ছি।
“আরাতের অযৌতিক কথায় আনাস মুখে বিরক্তি ছেয়ে গেলো। এভাবে দু সেকেন্ড চুপচাপ বসে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাবার টেবিল থেকে উঠে ওয়লেট থেকে টাকা বের করে দুহাজার টাকা আরাত কে দিতে দিতে বলল,
“সাবধানে স্কুটি চালাবি ,কাউকে যেন দুনিয়ায় থেকে সরিয়ে ফেলিস না আবার। আমি বের হইলাম আল্লাহ হাফেজ।
” থেংকিওওও ভাইয়া, হিহিহি বাবা তো গতরাতে আমাকে হাতখরচ দিয়ে দিছে, এটা দিয়ে আমি অনলাইন থেকে শাড়ি কিনবো হাহাহাহা।
আনাস ডাইনিং থেকে দুইতিন হাত যাওয়ার পর, বোনের কথায় পিছন ফিরে তাকালো, তাকিয়েই টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে আরাত দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
” বাবা তোকে টাকা দিয়ে দিয়েছে? আগে বলিস না কেনো? আমার টাকা এখন আমাকে ফিরত দে!
” কেনো কেনো, আমি আমার টাকা তোমাকে কেনো দিবো?
“তোর টাকা মানে, দেখ বনু আমার অফিসে লেট হয়ে যাচ্ছে, আমার টাকা আমাকে ফিরত দিয়ে দে বলছি?
” এই যে মিস্টার আরিয়ান তালুকদার আনাস, এই টাকা আমার ভাই আমাকে দিয়েছে। সো এই টাকা এই মুহূর্তে থেকে এই আরিবা তালুকদার আরাতের বুঝতে পারছেন? গেট লস কিপ্টা আনাস তালুকদার। সিকোরিটি এই সিকোরি ওর সরি,সরি! নানির মেয়ে, এই নানির মেয়ে, এই কিপ্টা আনাস কে এই তালুকদার বাড়ি থেকে ঘার ধাক্কা দিয়ে বের করো ফাস্ট।
আনাস : তবে রে, দাঁড়া ওইখানে!
আরাত নিজের দিকে আনাস কে আসতে দেখে, আরাত চেয়ার থেকে ওঠে কিচেনের দিকে দৌড় দিয়ে চিল্লিয়ে উঠলো,
“নানির মেয়ে আমাকে বাঁচাওওওও
চিল্লাতে চিল্লাতে আদিবা তালুকদারের পিছনে গিয়ে দাড়ালো, মায়ের পিছনে দাড়িয়ে কিচেন থেকে ডায়িং রুমে দিকে উঁকি দিচ্ছে বারংবার,আরাত কে কিচেনে দিকে দৌড়াতে দেখে আনাস শব্দ করে হেসে সদর দরজায় দিয়ে বেরিয়ে গেলো। এদিকে আরাত কে এভাবে চিৎকার করতে দেখে, আদিবা তালুকদার রেগে গেলেন,
“সবসময় এতো ছুটাছুটি করিস কেনো, কলেজে লেট হয়ে যাচ্ছে না, ডাইনিং গিয়ে বস, আমি তোকে খাইয়ে দিচ্ছি।
আরাত আনাস কে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে দেখো, কিচেন থেকে ডায়িং রুমে এসে সোফাতে বসে সন্ধ্যা কে ফোন লাগাতে লাগাতে মায়ের উদ্দেশ্য বলে,
” মা তুমি এখানে এসে আমাকে খাইয়ে দেও, আমি সোফাতেই বসে খাবো।
“তোর এই বাজে অভ্যাস কবে যাবে বলতো, ডাইনিং টেবিলের বসে খেতে কী সমস্যা তোর?
আদিবা তালুকদার কথাগুলো বলে খাবার প্লেট নিয়ে এসে আরাত কে নিজের হাতে খাওয়াতে লাগলেন।
আরাত মায়ের কথা পাওা না দিয়ে, সন্ধ্যা সঙ্গে কথা বলতে লাগলো,
“হ্যালো সন্ধ্যা?
” হুম বল?
” কই তুই বাসা থেকে বের হইছিস?
“এই তো এডি হইতেছি।
“কতক্ষণ লাগবে, আমি কিন্তু কলেজে একা একা ডুকবো না এবং তোর জন্য বেশিক্ষণ ওয়েট করবো না,তাড়াতাড়ি আসবি বলে দিলাম।
“তুই কলেজের সামনে দুমিনিট ওয়েট করবি, আমি দশ মিনিটে আসবো।
আরাত মুখ বাকিয়ে সন্ধ্যার কথায় উত্তর করল,
” ফাতরামি করোস আমার লগে, তাড়াতাড়ি বের হ!
“আরে বোন বের হইছি তো। আম্মু আমি কলেজে গেলাম আল্লাহ হাফেজ, এই আরাত আমি বের হইছি কলেজে দেখা হবে আল্লাহ হাফেজ,আল্লাহ হাফেজ।
” হুম আল্লাহ হাফেজ।
আরাত ফোনটা কেটে দিয়ে ,অর্ধেক খাবার খাওয়ার মধ্যেই একগ্লাস পানি খেয়ে। কলেজ ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে তাড়াহুড়ো করে বের হতে হতে আদিবা তালুকদার থেকে বিদায় নিলো। আদিবা তালুকদার মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসলেন।
কলেজ গেটের সামনে,আরাত স্কুটি নিয়ে সন্ধ্যা জন্যা প্রায় দশ মিনিটে মতো অপেক্ষা করছে, সন্ধ্যা আসার কোনো নাম-ই নেই, বাধ্যতামূলক একা একা কলেজে মধ্যে প্রবেশ করে। কিছু টা ভয়, কিছুটা ভালো লাগা মিলে সংমিশ্রণ হয়ে আলেদা এক অনুভূতি কাজ করছে মনের মধ্যে। আরাত কলেজ প্রবেশ করেই মাঠের মধ্যে স্কুটি নিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো,দাড়িয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে পুরো কলেজটা দু-চোখ মেলে দেখতে লাগলো, কলেজ ভর্তি এতএত ছেলেমেয়ের মধ্যে আরাতের নিজেকে একা অসহায় মনে হতে লাগলো, হটাৎ করেই রশ্মির কথা মনে পড়ে গেলো,
“কেনো দূরে গেলি রে রশ্মি, তোর কী আমার কথা মনে পড়ে না, দেখনা এতএত মানুষের ভীড়ে তোকে খুব মিস করছি রে,তোর অভাব টা কেমন যেন কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে আমাকে।
“কী রে, এভাবে মাঠের মাঝখানে সং হয়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবছিস?
নিজের ভাবনার মধ্যেই হটাৎ কারো ধাক্কায় নিজের ভাবনা থেকে ছিটকে পড়লো আরাত, নিজের সামনে সন্ধ্যা কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, ব্যাগ থেকে পানির পট বের করে গলাটা ভিজে নিজে কিছুটা সাভাবিক হতে লাগলো, সন্ধ্যা আরাতের কোনো উওর না পেয়ে পুনরায় আরাত কে উদ্দেশ্য করে শুধালো ,
“এই আরাত, কী এতো ভাবছিস?
“কিছু না, তোর লেট হইলো কেনো?
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ১১
” লেট হবে না, তুই স্কুটি নিয়ে আরছিস আর আমি রিকশা করে তাহলে ভাব, কেনো লেট হইছে?
“হয়েছে,হয়েছে আর বাহানা দিতে হবে না, চল ক্লাসে যাওয়া যাক।
কথাটা বলেই পিছনে ফিরে সামনে দিকে স্কুটি নিয়ে হাঁটা দিতেই আবারও কারো সঙ্গে ধাক্কা লেগে গেলো, ধাক্কা খাওয়া বলতে আরাতের সঙ্গে ধাক্কা না আরাতের স্কুটির সঙ্গে আগন্তুকের ধাক্কা লেগে গেলো,
ধাক্কা লেগে তিনজনই মাঠে পড়ে গেলো, আরাত স্কুটি আর আগন্তুক, আরাত মাঠে পড়ে থাকা আবস্থাতে চেচিয়ে উঠলো,
” উফফ আজকে কী ধাক্কা ধাক্কির দিবস, যে যেভাবে পারছে শুধু ধাক্কা দিয়ে যা….আপনিনিনিনিনিহ
আগন্তুক : তুমি সেই পাগল মেয়ে টা না?
