Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪২

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪২

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪২
জান্নাতি আক্তার জারা

সকালের সবাই মিলে একসঙ্গে নাস্তা খেয়ে মিমের বাবা বাড়ির ভিতর থেকে মাছ ধরার জাল বের করে আনলেন, নতুন মেয়ে জামাইয়ের জন্য পুকুর থেকে মাছ তুলবেন,রুপোলী বেগম হাতে করে রাতের কিছু এঁটো খাবার নিয়ে এসে পুকুরের মাছদের খেতে দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে একঝাঁক মাছ এসে ঝাঁক বেঁধে গেলো। মিমের হাতে একটা বালতি, মিমের পাশে আরাত তিশা দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখছে, মিমের বাবা এই শীতে লঙ্গি বেঁধে পুকুরের নামলেন,পুকুরের ধাড়ে দাঁড়িয়ে জাল দিয়ে মাছ মারতে লাগলেন, প্রথম বারে জালে ধরা দিলো বেশ বড়বড় নানাজাতের মাছ, মিম দ্রুত বালতি নিয়ে বাবার কাছে গেলো,মাছ গুলো বালতি তে তুলতে। আরাত মিমদের কাছে এসে জালের মধ্যে থেকে একটা চিংড়ি মাছ তুলে নিলো,

___” মামা, আপনি বড়মাছ ছেড়ে দিয়ে চিংড়ি মাছ উঠান,বীর ভাইয়ার চিংড়ি মাছ ফেভারিট!
ভদ্রলোক ভাগিনীর দিকে অবাক হয়ে তাকালেন,
___” বীর ভাইয়া কেডা মা?
মামার কথায় আরাত একটু কাচুমাচু করে উঠলো, মিম আরাত কে দেখে মুচকি হেঁসে বাবা কে বলল,
___” আরাত আপু তাকবীর ভাইয়ার কথা বলছে আব্বু, এই মাছগুলো ছেড়ে দিতে হবে না, আব্বু তুমি বরং চিংড়ি মাছ উঠাও তাহলে হবে।
মিমের বাবা পুনরায় জাল পুকুরে নামালেন,আরাত মিম পুকুরের উপরে দাঁড়িয়ে দেখছিলো। হটাৎই পাশের বাড়ির এক বয়স্ক মহিলা বের হয়ে এলেন, রুপোলী বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন তিনি,
___” কে বাড়ে বউ, মোর সতিন কোনে?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রুপোলী বেগম হেঁসে আরাত কে দেখিয়ে দিলো, আরাত মহিলা কে চেনে, তাঁর নানুমনীর জা হয়, আরাত যখন ছোট ছিল এই মহিলা আরাতের সঙ্গে মজা করতো, এখন বেশ বয়স্ক হয়ে গেছে,শরীরের চামড়া গুলো ধিলা হয়ে গেছে, আগের মতো এত গলার জোর দেখা যাচ্ছে না, কী আজব দুনিয়ায় তাইনা, ছোট-রা বড় হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বড়রাও কেমন বুড়ো হয়ে যায় ৷এমন অনেকেই আছে এ গ্রামে, আরাতের সঙ্গে ছোটবেলায় মজা করতো, তাঁদের মধ্যে এই মহিলাও একজন, আরাত হাসি মুখে বয়স্ক মহিলার কাছে এসে দাঁড়ালো,

___” নানুমনী কেমন আছো?
মহিলা আরাতের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বললেন,
___” ভালো আছি, তুই কেবা আছোস রে, মেলা বড় হয়ে গেছোস, মোর সমী কোনে ?
মহিলার কথায় তিশা চেতে উঠে বলে উঠলো,
___” বুড়ী বয়সে ভীমরতি ধরছে, আরাত আপু এই বুড়ীর থেইকা ভাইয়া রে দূরে রাখবা,বুড়ীর নজর ভালা না।
___” ওই ছেমড়ি তোর গায়ে জ্বালা লাগে কে, তোরে কইছি তুই মধ্যে থেকে ফুলুন দিয়া উঠতি ক্যা?
___” মোড়ে কিছু কয়া লাগতো না তেমারে বুড়ী, তুমি তোমার নজর সামলাও,মোর সমিক তো মাইরা লইছো, এখন আইছো শহরের ভাইয়ার দিকে নজর দিতে ন?
আরাত দুজনের ঝগড়া দেখে হাসতে হাসতে বলল,

___” হয়েছে হয়েছে আর ঝগড়া না, তিশা তুই নানুমনীর সঙ্গে ঝগড়া করছিস কেনো?
___” আরে আপু আর বলো না, বুড়ী আমাকে আর মিম কে জ্বালিয়ে মারে,এই বুড়ী কবে যে মরবো, আর মোর সমী মোর কবে যে হবো কে জানে!
তিশার কথায় আরাত রাগী চোখে তাকালো তিশার দিকে, কিন্তু বয়ষ্ক মহিলা তিশার কথায় রাগ করলেন না, তিশা মিম দের সঙ্গে সবসময় এমন ঝগড়া করে থাকে,নাতনীদের জ্বালিয়ে যেন বয়স্ক বয়সে এসে সময় কাটানোর একটু সুখ খুঁজে পান, মিম তিশার দেখা পাইলেই মজা করে এমন ঝগড়া করে থাকে, বয়ষ্ক মহিলা পুনরায় বলে উঠলো,
___” তোর সমি রে না দেখেই মরমু না ছেমরি।
তিশা বয়স্ক মহিলার কথায় মুখ বাকালো, বয়স্ক মহিলা পুনরায় আরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” কোণে মোর সমী কোণে, তুই মোর সমী রে কোণে লুকে রাখছোস?
আরাত হাসি মুখে আশেপাশে তাকালো, তাঁদের থেকে কিছু দূরে উঠানের মধ্যে, তাকবীর পকেটে এক হাত গুঁজে আরেক হাতে কফিতে চুমুক বসাচ্ছে, চোখ স্থির আরাতের উপর, আরাত বুড়ী কে তাকবীরের দিকে আঙ্গুল ত্যাক করে দেখিয়ে দিলো,

___” ওটাই তোমার বর?
তাকবীরের কপাল কুঁচকে এলো, বুঝলো না আরাত কেনো তার দিকে দেখিয়ে দিচ্ছে, বয়স্ক মহিলা আরাতের হাত টেনে তাকবীরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বললেন,
___” বাহ বা, মোর সমী তো মাআশাল্লাহ, এক বারে টিভির হিরো দের মতো?
আরাত মুচকি হাসলো, তাকবীর বুঝতে পারলো তাকে নিয়ে কথা হচ্ছে, পরমুহুর্তে সমী নামটা শুনতে পেয়ে কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকে গেলো, আরাত আর বয়স্ক মহিলা কে নিজের কাছে এসে দাঁড়াতে দেখে তাকবীর সালাম দিলো বয়স্ক মহিলা কে,তিনি হাসি মুখে সালামের উত্তর করে পুনরায় বলে উঠলেন,
___” মোর মতো সুন্দরী থাকতে তুমি মোর সতিন রেই বিয়ে করে নিলে নাতজামাই, মোর সমীর কী হবো এখন?
তাকবীর বয়স্ক মহিলার কথায় মানে বুঝলো না, আরাতের দিকে তাকাতেই দেখলো আরাত মুখ টিপে হাসছে, তাকবীর কে তাকাতে দেখে আরাত মাথা নিচু করে বলল,

___” এটা আমার নানুমনী ।
___” মোর সমী রে কয়া দিয়া লাগতো না, মোর সমী চিনে মোরে, কী সমী চিনো না মোরে?
তাকবীর পড়ে গেলো ঝামেলায়, একে তো কথা বুঝতে পারছে না, তারউপর আরাতের মিটিমিটি হাসি, তাকবীর আরাতের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে জানতে চাইলো,
___”হোয়াট ইস হি সায়িং?
আরাতের হাসি বন্ধ হয়ে গেলো, সে কি করে বলবে, আপনাকে নানুমনী সমী মানে হাসবেন্ড বলছে, এতক্ষণ তো তাকবীর কে বিভ্রান্ত অবস্থায় দেখে খুব মজা নিচ্ছিল, কিন্তু তাকবীর তো কথায় মানেই বুঝতে পারিনি বিভ্রান্ততে পড়বে কীভাবে, এবার আরাত ঝামেলায় ফেঁসে গেলো,কাচুমাচু করে তাকবীরের কথায় উওর করলো,
___” নানুমনী আপনার সঙ্গে মজা করছে।
___ “ওকে বাট, হোয়াট সমী ?

আরাত এদিক ওদিক তাকিয়ে কাচুমাচু করতে করতে মনে মনে বলল,সমী চিনছে না যদি বলতো ভাতার তাহলে খুব সহজে বুঝে যেত,আসলেই কী বুঝতো, একবার কী বাজিয়ে দেখবো, না বাবা দরকার নেই যদি জেনে থাকে, তাহলে লজ্জায় পড়ে যাবো দরকার নেই, পুনরায় তাকবীরে দিকে তাকিয়ে বুঝানোর ন্যায় বলল,
___” সমী মানে স্বামীর কথা বলছে নানুমনী!
তাকবীর এতক্ষণে বুঝতে পারলো, বয়স্ক মহিলার কথার মানে, নানুমনী আর কথা বাড়ালেন না নিজের বাড়ির দিকে যেতে যেতে বলে উঠলো,

___” পড়ে আসে গল্প করমু নাতজামাই, মোর সমী ভাত খাচ্ছে বাড়িতে যাইগা।
বয়স্ক মহিলা চলে গেলো, এতক্ষণে মিম তিশা মাছের বালতি নিয়ে উঠানে চলে এলো, রুপোলী বেগম বাড়ির মধ্যে থেকে পাতিল নিয়ে এসে উঠানে মাছ কাটতে লাগলো। তাকবীর বাড়ির ভিতরে চলে গেলো, আরাত মামীর কাছে বসে মাছ কাঁটা দেখতে লাগলো, রুপালী বেগম মাছ কাঁটার ফাঁকে আরাত কে বললেন, চিংড়ি মাছের কী রান্না করবো, আরাত কিছুক্ষণ ভেবে রুপোলী বেগম কে বলল,
___” মামী আমি রান্না বসাবো আজকে?
রুপালী বেগম অবাক হয়ে আরাতের দিকে তাকালেন
___” তুমি রান্না করবে,তুমি পাও রান্না করতে?
___” মামী না করবেন না, আমি ইউটিউব দেখে রান্না করবো সমস্যা হবে না।

রুপোলী বেগম আরাতের কথায় না করতে পারলো না, দ্রুত চিংড়ি মাছ গুলো কেটে পরিস্কার করে দিলেন , আর রান্না করতে প্রয়োজনীয় সবকিছু হাতের কাছে রেডি করে দিলেন, আরাত ওড়না ভালোভাবে মাথায় দিয়ে কিচেন রুমে টুলে বসে প্রথমে ফোনে ইউটিউবে চিংড়ি মাছের ভুনা কিভাবে রান্না করে সার্চ দিয়ে দেখতে লাগলো। ফোন সামনে রেখে ইউটিউব চালু করে প্রথমে পাতিলের মধ্যে তেল দিয়ে দিলো, বিপত্তি বাজলো,তেলের মধ্যেই পিয়াজ বাটা দিতে গিয়ে। মিম আরাতের পাশে বসে দেখছিলো। দুজনের রান্না ঘরে যাওয়া আসা থাকলেও কোনোদিন কিভাবে রান্না করে রান্না সম্পর্কে জানা নেই। আজকেই আরাত প্রথমবার রান্না করছে তাও আবার তাকবীরের ফেবারিট ডিশ, যদিও মাঝেমধ্যে চা কফি বা নুডুলস বানাইছে, জাস্ট এতটুকুর মধ্যে তাঁদের রান্নার হাত। আরাত গরম তেলের মধ্যে পিয়াজ বাটা দিতেই গরম তেল ছিটকাতে শুরু করে, তেল ছিটকাতে দেখে আরাত মিম দু’জনেই একে-অপরকে জরিয়ে ধরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো। দুজনের চিৎকারের রুপোলী বেগম মিমের বাবা, কিচেন রুমে এসে দাঁড়ালেন। দুই সেকেন্ড পর তাকবীর কে রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে আসতে দেখা গেলো। রুপোলী বেগম এতক্ষণে গ্যাস বন্ধ করে দিয়েছেন। আরাত মিম এখনও একে-অপরকে জরিয়ে ধরে আছে। তাকবীর কিচেন রুমের সামনে এসে আরাত কে ঠিকঠাক অবস্থায় দেখতে পেয়ে চোখ বন্ধ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আরাতের দিকে তাকালো। মিমের বাবা রুপোলী বেগমের উপর রেগে গেছেন। আরাত আর মিম কে রান্না করতে দেওয়ার জন্য, রুপালী বেগম আরাত কে বললো,

___” ঘরে যাও, আর রান্না করতে হবো না যাও।
আরাত মিম কে ছেড়ে দিয়ে সোজা হতে হতে তাকবীরের দিকে তাকালো। তাকবীরের নজর তাঁর উপর, আরাত নিজের পাকনামিতে লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে কিচেন রুম থেকে বের হয়ে তাকবীরের সামনে দিয়ে যেতে নিলে তাকবীর আরাতের হাত ধরে আটকে দেয়। পুনরায় রুপোলী বেগমের দিকে তাকিয়ে রুপোলী বেগমের উদ্দেশ্য বলে উঠে,
___” আন্টি, আমি আর রাত রান্নাটা শেষ করতে চাই?
রুপোলী বেগম প্রথমে না করতে চেয়েও করতে পারলেন না, হাসি মুখে মিম কে নিয়ে জায়গা ত্যাগ করলেন, সঙ্গে মিমের বাবা চলে গেলেন, আরাত তাকবীর কে বলে উঠলো,
___” আপনি রান্না করতে পারেন?
তাকবীর কথা বললো না, কিচেন রুমে ঢুকে, ছিটকানো তেল গুলো পরিস্কার করতে করতে এদিক ওদিক তাকিয়ে গম্ভীর গলায় আরাত কে বলল,

___”পানি কই, পানি নিয়ে আসো?
আরাত দ্রুত পানি নিয়ে এলো, তাকবীর গ্যাস চালু দিয়ে একটার পর একটা মসলা দিতে লাগলো, আরাত অবাক হয়ে শুধু দেখে যাচ্ছে, তাকবীর পুনরায় হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
___” হলুদ দেও?
আরাত দ্রুত হলুদ খুজে তাকবীর কে দিলো,
___” এই তো হলুদ!
তাকবীর একনজর আরাত কে দেখে নিয়ে, হলুদ তরকারির মধ্যে দিতে দিতে পুনরায় আরাতের কাছে লবণ চাইলো, আরাত পুনরায় একিভাবে লবণ খুঁজে তাকবীর কে দিয়ে দিলো, তাকবীর রান্না করছে আর আরাত অবাকের পর অবাক হয়ে দেখছে, তাকবীর কিছু চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুঁজে দিচ্ছে, এভাবেই প্রায় ২৫ মিনিট সময় নিয়ে রান্না শেষ করলো বীর রাত, বীর রান্না শেষ করে ছোট একটা চামু যে তরকারি তুলে আরাতের সামনে ধরলো, আরাত আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে মুখে পুড়ে নিলো, না খারাপ না, মজা হয়েছে, তাকবীর আরাতের মুখের রিঅ্যাকশন দেখে গম্ভীর কন্ঠে জানতে চাইলো,

___” কেমন ?
আরাত তাকবীরের মুখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” উঁহু মজা হয়েছে কিন্তু এতটাও না।
তাকবীর আরাতের দুষ্টু হাঁসির দিকে তাকিয়ে বলল,
___” পুরোটাই মজা হতো, তুমি হেল্প করেছো এজন্য আধা আধা মজা হয়েছে।
তাকবীরের কথায় আরাতের মুখের হাসি বন্ধ হয়ে গেলো, মুখ অন্ধকার করে ভার কন্ঠে বলে উঠলো,
___” আমি মিথ্যা বলছি পুরোটাই মজা হয়নাই।
তাকবীর কিচেন থেকে বের হতে হতে বলল,
___” বললাম তো তুমি রান্নায় হেল্প করেছো এজন্য মজা হয়নাই,
আরাত তাকবীরের পিছনে যেতে যেতে ,
___”আপনি আমার সঙ্গে ঝগড়া করছেন?
তাকবীর থেমে গেল, হটাৎই পিছন ঘুরে আরাত কে নিজের সঙ্গে জরিয়ে নিয়ে বাঁকা হেঁসে বলল,
___” আসো ঝগড়া করি জিতলে তুমি আমার, হারলে আমি তোমার?
___” আপনি বদলে যাচ্ছেন ?
তাকবীর আরাত কে একিভাবে ধরে রেখে,আরাতের চোখে চোখ রেখে বলল,
___” এটাও তোমার জন্য।

রশ্মি কলেজে ঢুকে মাঠের মধ্যে এদিক ওদিক তাকিয়ে সন্ধ্যা কে খুঁজতে লাগলো, ফোন বের করে সন্ধ্যা কে ফোন লাগাতে যাবে হটাৎই কোথাও থেকে মাহির সামনে এসে দাঁড়ালো, রশ্মি নিজের সামনে মাহির কে দেখে পাশ কেটে ক্লাসে যেতে নেয়, মাহির পুনরায় রশ্মির সামনে এসে হাসি মুখে বলে উঠলো,
___” গুড মর্নিং রশ্মিরানী?
রশ্মি রাগের মাথায় মাহিরের সামনে আঙ্গুল ত্যাক করে আশেপাশে তাকালো,অনেকের নজর তাঁদের উপর, রশ্মি পুনরায় আঙ্গুল নিচে নেমে নিতে নিতে নিচু স্বরে তিরতির মেজাজে বলল,

___” মাইন্ড ইট, নেক্সট টাইম আপনার মুখে যেন রশ্মিরানী ডাক না শুনতে পাই, নয়তো…
___” নয়তো কী রশ্মিরানী, বলেন না?
মাহির রশ্মির আরো কাছাকাছি এসে বলল কথাটা, রশ্মি মাহির কে নিজের খুব কাছে দেখতে পেয়ে আশেপাশে তাকাতে তাকাতে পিছু সরে দাঁড়িয়ে রাগী গলায় বলল,
___” দুদিন আগে বড়বড় কথা বললেন, আপনাকে আর ডিস্টার্ব করবো না, আপনার সামনের আর পড়বো না, আপনার থেকে দূরে থাকবো,তাহলে আবার কেনো পিছু নিচ্ছেন, আসলে আপনার প্রবলেমটা কী ?

___” আপনি!
রশ্মির ভ্রু কুঁচকে এলো,
___” আমি আপনার প্রবলেম?
মাহির মাথা নাড়িয়ে ছোট করে বলল,
___” হ্যাঁ।
রশ্মি মাহির কে পুনরায় পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলল,
___” তাহলে এই প্রবলেম থেকে দূরেই থাকবেন।
মাহির রশ্মির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বলে উঠলো,
___” আরে এটাই তো প্রবলেম, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না, আমি কী করছি, শুধু আপনার আশেপাশে থাকতে মন চায়।
রশ্মি দাঁড়িয়ে গেল, বিরক্ত মুখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,

___” হিরোগিরি দেখাচ্ছেন,আপনি হিরো ?
মাহির রশ্মির কথায় রশ্মির দিকে তাকালো, নিঃশব্দে কয়েক পলক রশ্মি কে দেখে নিয়ে শরীরের লেদার ঠিক করতে করতে অ্যাটিটিউড এর সঙ্গে বলে উঠলো,
___” অফকোর্স রশ্মিরানী!
রশ্মি মাহিরের অ্যাটিটিউড দেখে, হাতে হাত ভাজ করে দাঁড়ালো,মাহিরের পা থেকে মাথা অবধি পরক করে ঠোঁট উল্টে ব্যঙ্গ করে বলল,
___” রিয়েলি?
মাহির রশ্মির দিকে ঝুকে এক চোখ টিপে মুখে বাঁকা হাসি এনে অ্যাটিটিউড এর সঙ্গে বলল,

___” ইয়া জাস্ট আপনার হিরো।
রশ্মি উঁচু জুতা দিয়ে মাহিরের পায়ের উপর গুঁতা মারলো,সঙ্গে সঙ্গে মাহির ব্যথায় চোখমুখ বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, রশ্মি মুখে সয়তানি হাসি এনে বলে উঠলো,
___” আমার সঙ্গে লাগতে আসবেন না, ভুলে যাবেন না আমি আরাতের ফ্রেন্ড, আরাত আপনাকে লাইক করতো বিধায় আপনি এখনো আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, ইনফ্যাক্ট এখনো ছহিভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, আচ্ছা সবকিছু বাদ দিলাম আপনার কী মিনিমাম লজ্জা টুকুও নেই, মানে যে মেয়েকে ঠকালেন তাঁর ফ্রেন্ড কে বলছেন ভালোবাসি, লাইক সিরিয়াসলি আপনার মতো নির্লজ্জ ছেলে আমি আমার লাইফে দ্বিতীয় আর দেখি নি, সত্যি বলছি আই জাস্ট হেইট ইউ।

___” বাট আই লাভ ইউ!
রশ্মি একপ্রকার ঘেন্নার চোখে তাকিয়ে কথাগুলো বলে ক্লাসে যেতে নিলো, পুনরায় মাহিরের কথা শুনে থাই দাঁড়িয়ে গেলো,আশেপাশে অনেকের চোখ তাঁদের উপর, রশ্মির কথা গুলো মাহিরের ইগোতে লেগে গেলো, যেখানে পুরো ভার্সিটির ছেলে মেয়ে মাহির কে মাথায় তুলে রাখে, মাহির বলতে পাগল, সেখানে এতএত ছেলেমেয়ের সামনে মাহির কে রশ্মি নির্লজ্জ বলে অপমান করলো,মাঠের মধ্যে এক সঙ্গে ছেলেমেয়েদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাফি আর আরশ এগে এলো, মাহির আর রশ্মি কে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুঝতে পারলো, এখানে কিছু একটা হয়েছে, মাহির রশ্মির চোখের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,

___” হ্যাঁ আমি নির্লজ্জ, বাট কার জন্য জানতে চান, আপনার জন্য, আপনাকে আমি ভালোবাসি বলেই আজকে আপনি আমাকে ভরা ক্যাম্পাসে ইন্সাল্ট করার চান্স পেয়েছেন, হ্যাঁ আমি অপরাধ করেছি তাঁর পানিশমেন্ট হিসাবে আমি আপনার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নির্লজ্জ হয়ে বারবার আপনার পিছনে ঘুরছি, অন্ধকার রাতে আপনাকে নিয়ে ভাবছি, কী করলে আপনি আমাকে ভালোবাসবেন, যখনই ভাবনায় আসে আমি যেমন আপনার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত ছটফট করছি, এভাবে আপনার ফ্রেন্ড কষ্ট পেয়েছে আমার ভুলের কারণে, তখন মনে হয় হ্যাঁ আমি এটারই যোগ্য, আচ্ছা আমাকে বলবেন প্লিজ, আমার ভুলটা কোথায় আপনাকে ভালোবাসা কী আমার ভুল, কই আপনার ফ্রেন্ড তো এত সহজে আমাকে ভুলে বিয়ে করে নিলো, সে কী সত্যিই আমাকে ভালোবেসে ছিলো বলতে পারবেন, আপনার ফ্রেন্ড আমাকে ভুলে দিব্যি সংসার করছে, আর আমি আমার ভুলের জন্য অবগত ছটফট করছি।
রশ্মি এতক্ষণ মাহিরের কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনল, আরশ কে মাহিরের পাশে দাঁড়াতে দেখে রশ্মি আরশ কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

___” কাইন্ডলি আপনার ফ্রেন্ড কে পাবনা পাগলা গারদে ভর্তি করে দিয়ে আসবেন, অ্যাকচুয়ালি আমার মনে হয় আপনার ফেন্ড মানসিক সিক।
রশ্মি কথাটা বলে যেতে নিলেই মাহির গম্ভীর গলায় বলল,
___” ডোন্ট ওরি আপনার আশেপাশে আমাকে আর দেখতে পারবেন না, আপনাকে ভালোবাসি বলে এই না আমার আত্মসম্মান নেই, সরি ফর অল থিস।
মাহির কোনো দিকে না তাকিয়ে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে গেলো, আস্তে আস্তে জায়গা ফাঁকা হতে লাগলো, রশ্মির চোখ এখনো মাহিরের যাওয়ার রাস্তায়, আরশ রশ্মি কে একনজর দেখে জায়গা ত্যাগ করলো, রাফি রশ্মির সামনে এসে দাঁড়ালো, রশ্মি রাফির দিকে তাকাতেই রাফি মুচকি হেঁসে বলল,

___” বলবো না মাহির কে মেনে নেও, শুধু বলবো একবার ভেবে দেখতে পারো, যে ছেলে তোমার জন্য একজন কে ছেড়ে দিতে পারে, তুমি যদি বেঁধে রাখতে যানো, তাহলে সে তোমার জন্য পরিবর্তন হতে পারবেন, মাহির খারাপ না শুধু শেষের পরিনীতি না বুঝে আবেগের টানে ভুল করে ফেলছে।
রাফি চলে গেলো, রশ্মি কিছুক্ষণ জায়গায় থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো,মাথার সবকিছু এলোমেলো লাগছে, সবকিছু দোটানা হয়ে আছে, আজকে আর ক্লাস করা হলো না, পুনরায় মাঠ থেকে বের হয়ে রিকশা ডেকে বাড়ির পথে ফিরলো,

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে লাগলো, মায়া নিজের রুমে সোফায় বসে আশিকের সঙ্গে কথা বলছে, যদিও গতকাল আইরার দেওয়া প্লান আশিকের সঙ্গে শেয়ার করেছে,আশিক আজকে জানাতে চেয়েছি, তাইতো মায়া দুরুদুরু বুকে আশিকের সঙ্গে কথা বলছে, যানা নেই আশিক জবাবে কী বলবে, টুকিটাকি কথা বলার মধ্যেই মায়া নিজে থেকে জানতে চাইলো, আশিকের পরিবার কে জানাছে,আশিক মায়ার কথায় কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে বলল, পরিবার কে জানানোর পর তাঁর বাবা-মা প্রথমে একটু নাকচ করলেও একমাত্র ছেলের অবেদন ফেলতে পারেনি, তারা আগে মায়া কে দেখতে যাবে তাঁরপর তাদের ডিসিশন জানাবে বলে দিছেন, আশিক অসহায় ফেস করে মায়া কে বলল,

___” আমাকে ভুলে যাও, বাবা-মা যেতে রাজি না, বাবা-মার একমাত্র ছেলে আমি,তাঁদের কষ্ট দিতে চাইনা,বাবা-মা যা বলবে আমি তাই শুনবো সরি!
মায়া আশিকের কথায় প্রথমে রেগে গেলেও পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে বলে উঠলো,
___”তোর কী মনে হয় আমি তোকে ছেড়ে দিবো হাট, তুই তোর পরিবার কে কিভাবে ম্যানেজ করবি তোর প্রবলেম আমার না ওকে?
আশিক মায়ার রিঅ্যাকশন দেখে ফোনের ওপাশ থেকে মায়া কে শান্ত করতে বলে উঠলো,
___” ওকে ওকে কূল ডাউন, আই এম কিটিং বাবা, আগামীকাল বাবা-মা যাবে রেডি থেকো।
মায়া কিছুটা শান্ত হয়ে গেলো,
___” এইতো এবার লাইনে এসেছিস, খাটাশ একটা!
___” মায়া তুমি একটু তোমার ব্যবহারটা ঠিক করবে প্লিজ, অন্তত বাবা-মার সামনে তুই বলবে না প্লিজ?
আশিকের কথায় মায়া হেঁসে উঠলো, মায়ার হাসিতে ওপাশে আশিকও হেঁসে উঠলো, মায়ার বাবা মেয়ের রুমের সামনে দিয়ে বাহিরে যাওয়ার উদ্দেশ্য বের হতেই হাসির শব্দে মায়ার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে পরলো,মায়া নিজের বাবার উপরিস্থিত বুঝতে পেয়ে তাড়াহুড়ো করে আশিকের ফোন কেটে দিলো, খালেক চেয়ারম্যান রাগী মুখে মায়ার রুমে ঢুকে মায়া কে কিছু বলতে না দিয়ে নিজে বলে উঠলেন,

___” আগামীকাল তোমার এঙ্গেজমেন্ট, কোনোপ্রকার বাহানা করবে না, আজকে থেকে, ওই ছেলের সঙ্গে তোমার কোনো প্রকার সম্পর্ক বা যোগাযোগ থাকা চলবে না ।
মায়ার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরলো, বসা থেকে উঠে বাবাার সামনে মাথা নিচু করে বলে উঠলো,
___” সরি আব্বু,আমি আপনার পছন্দের ছেলের সঙ্গে না, আমি আশিক কে ভালোবাসি আর বিয়ে করলে আমি ওকেই বিয়ে করবো।

খালেক চেয়ারম্যান মেয়ে কে মুখের উপর কথা বলতে দেখে আরো রেগে গেলেন,রাগের মাথায় মায়া কে থাপ্পড় বসালেন, মায়া গালে হাত দিয়ে ছলছল নয়নে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে, খালেক চেয়ারম্যান এতদিনের প্লান মেয়ের জন্য ভাঙতে দিবেন না তিনি, মেয়র হয়ে নিজে থেকে তাঁর ছেলের জন্য মায়ার হাত চেয়েছেন, মেয়রের ছেলের সঙ্গে মায়ার বিয়ে দিতে পারলে খালেক চেয়ারম্যানের দল ভারী হবে, সামনে নির্বাচন নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে গেলে মেয়র সাহেব কে দরকার, তাইতো মেয়র সাহেব যখন বলছে, তাঁর ছেলের সঙ্গে মায়ার বিয়ে দিতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে খালেক চেয়ারম্যান কোনোদিকে না ভেবে রাজি হয়ে যায়, মায়া আর আশিকের রিলেশনশিপ জানতে পেয়ে তিনি মেয়র সাহেব কে বলেন নির্বাচনের আগেই মেয়ে কে তাঁদের হাতে তুলে দিবেন, এবং দুদিন আগে আশিকের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হলে তিনি, মায়া কে না জানিয়ে মায়ার এনগেজমেন্ট এর তারিখ ফেলান, আগামীকাল মায়ার এনগেজমেন্ট, এখন মায়া কে আশিকের সঙ্গে কথা বলতে দেখে ভদ্রলোকের রাগ উঠে গেলেন, রাগের মাথায় আদরের মেয়ে কে থাপ্পড় দিয়ে বসলেন,বাবা মেয়ের চিৎকারে ফারজানা বেগম মায়ার রুমে এসে দাঁড়ালেন, ফারজানা বেগম কে দেখে খালেক চেয়ারম্যান আরো রেগে গেলেন,

___” যা হয়ে গেছে এবং যা করেছো মাথা থেকে সব ঝেড়ে ফেলাও, তুমি আমার মেয়ে, তুমি কোথায় ভালো থাকবে, কার হাতে তুলে দিতে হবে তোমার থেকে নিশ্চয় আমি ভালো জানবো?
মায়া এবার বাবার কথায় ফুপাতে ফোপাতে বলে উঠলো,
___” আপনার জানা মানেই তো সবকিছু রাজনীতি, রাজনীতির বাহিরে আর কিছু জানেন আপনি, কখনো নিজের মেয়ে কী চায় জানতে চেয়েছেন, না চাননি, এখন নিচ্চয় আমাকেও রাজনীতির কোনো গুটি হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছেন?
মায়া নিজের কথা শেষ করার আগেই ফারজানা বেগমের হাতে আরেকটা থাপ্পড় পরলো মায়ার গালে, মায়া পুনরায় গালে হাত দিয়ে মায়ের দিকে তাকালো, ফারজানা বেগম কান্না করতে করতে রাগী গলায় বললেন,
___” লজ্জা করে না বাহিরের ছেলের জন্য বাবার মুখের উপর কথা বলছো,তোমাকে আমি এই শিক্ষা দিয়েছি, আজকের দিনের জন্য তোমাকে বড় করেছি, বলো তোমার কোন চাওয়াটা আমরা পূরণ করে নাই, রাজনীতির কথা বলছো তুমি, এসব কার জন্য, এই এত বড় বাড়ি গাড়ি এসব কার জন্য বলো, আর তুমি দুদিনের ভালোবাসার জন্য আমাদের উপর কথা বলো,

___” হ্যাঁ আম্মু ও আমার দুদিনের ভালোবাসা, আমি দু’দিনের ভালোবাসা চাইনা, আমি ওকেই চাই সারাজীবনের জন্য, তোমরা আমার সব ইচ্ছায় পূরণ করছো, আমিই তো তোমাদের সব, তাহলে কেনো আমার ভালোবাসার মধ্যে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছো, তোমাদের উচিত হাসতে হাসতে মেয়ের সুখের জন্য সবকিছু মেয়ে নেওয়া?..
খালেক চেয়ারম্যান মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে আছে, মেয়ের কথাটা বুকে এসে লেগেছে হয়তো, ফারজানা বেগম পুনরায় মায়ার দুহাত ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন,
___” তোমার সুখে আমরা বাঁধা সৃষ্টি করছি, তোমার সুখের জন্য কী করি নাই বলো, আর তুমি বলছো তোমার সুখে আমরা বাঁধা সৃষ্টি করছি, তুমি জানতে না ছেলেটা বেকার?
___” হ্যাঁ জানতাম, কিন্তু ও জব করবে আম্মু, ও বেকার থাকবে না?
মায়ার কথায় ফারজানা বেগম পুনরায় বলে উঠলেন,

___” মায়া তুমি বুঝতে পারছো না, তোমার আব্বু মেয়র সাহেব কে কথা দিয়ে রেখেছে, তোমার আব্বুর মানসম্মানের কথা একবারো ভাববে না, তোমার জন্য তোমার আব্বু মানুষের কাছে ছোট হতে হবে, তুমি চাইছো তোমার আব্বু তোমার জন্য ছোট হয়ে যাক?
মায়া মায়ের কথায় তাচ্ছিল্য হেঁসে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
___” এসে গেলো তো তোমাদের আসল রুপ, বলেছিলাম না তোমাদের মেয়ের সুখের চেয়ে রাজনীতি সন্মান আগে?
___” মায়া…
ফারজানা বেগম পুনরায় মায়ার গায়ে হাত তুলতে গেলেন, খালেক চেয়ারম্যান ফারজানা বেগম কে আটকে রাগী গলায় এতক্ষণ বলে উঠলেন,

___” তুমি ওই ছেলে কে বিয়ে করবে তাইনা, যাও যাও বিয়ে করো ওই ছেলে কে!
মায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠলো, হাসি মুখে বাবার সামনে এসে মুখে উৎফুল্লতা নিয়ে বলল,
___” সত্যি আব্বু, আপনি সত্যি বলছেন, এক মিনিট আমি এক্ষুনি আশিকের কাছে ফোন করে বলে দেই, আঙ্কেল আন্টি কে আগামীকাল আসতে।
মায়া আশিকের কথাগুলো বলতে বলতে আশিকের কাছে ফোন লাগাছে,
___” ফোন না তুমি একন্নি এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবে, আজ থেকে এই বাড়ির কেউ না তুমি!
আশিক ফোন রিসিভ করতেই কথাটা শুনতে পেলো,
খালেক চেয়ারম্যানের কথায় মায়ার হাসি মুখ মলিন হয়ে উঠলো, কান থেকে ফোন নামিয়ে বাবার দিকে অবাক চোখে চেয়ে রইলো, ফারজানা বেগম অবাক হয়ে স্বামী কে দেখছেন, মায়া কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে বলে উঠলো,

___” আমি,আমি এমন না আব্বু!
____” খবরদার, আমাকে আব্বু বলে ডাকবে না, তোমার আব্বু তোমার জন্য মৃত!
খালেক চেয়ারম্যানের কথায় মায়া চমকে মেঝেতে বসে পরলো, খালেক চেয়ারম্যান কথাটা বলে রুম থেকে তিনি বের হয়ে গেলেন, ফারজানা বেগম মেয়ের কাছে এসে বলল,
___” আমি তোমার আব্বু কে বুঝাচ্ছি, কষ্ট পাও না তোমার আব্বুর মুখের উপর কথা বলাতে রেখে গেছে, তাই এ-সব বলছে, তুমি শান্ত হও।

ফারজানা বেগম রুম থেকে বের হয়ে গেলেন, মায়া এবার মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে কান্নার ভেঙ্গে পড়লো, এক নিমেষেই কোথায় কী হয়ে গেলো, মায়া প্রথম থেকেই খালেক চেয়ারম্যান কে ভয় পায়, ভদ্রলোক কে রাজনীতির জন্য বাড়িতে খুব কম দেখা যায়, মায়া যতটুকু আবদার সবকিছু মায়ের কাছেই বলে, বাবার সঙ্গে ঠিকমতো কথা না হওয়ায় বাবা-মেয়ের মধ্যে দূরত্ব আগে থেকেই ছিলো। মায়া খালেক চেয়ারম্যানের সঙ্গে কখনো উঁচু গলায় কথা পর্যন্ত বলেনি, সেই মায়া আজকে বাবার মুখের উপর কথা বললো, মায়ার কান্নার আওয়াজ আশিকের কানে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশিক ফোনের উপার থেকে বলে উঠলো,

___” ডোন্ট ক্রাই মায়া, জাস্ট কয়েক মিনিট ওয়েট করো আমি এসেগেছি।
মায়া কান্নার মধ্যে আশিকের কন্ঠ শুনতে পেয়ে ঘাবড়ে গেলো, ফোন হাতে কানে তুলে নিয়ে, কান্নাভেজা কন্ঠে হ্যালো হ্যালো, করে উঠলো, কিন্তু বিপরীত পাশে থেকে আর কোনো শব্দ এলো না, মায়া পুনরায় আশিক কে বারবার ফোন লাগতে গেলো কিন্তু না আশিকের ফোন আর রিসিভ হলো না, মায়া ভয়েতে নিজের রুমে এমাথা থেকে ওমাথা পায়চারি করতে লাগলো, এভাবেই কেটে গেলো প্রায় আঠারো মিনিটের মতো, হটাৎই আশিকের কন্ঠ শুনে মায়া রুম থেকে দৌড়ে নিচে নামতে লাগলো,

___” মায়া, মায়া, দেখো আমি এসেছি?
খালেক চেয়ারম্যান আর ফারজানা বেগম নিজেদের রুমে ছিলো, আশিকের কথায় আরো রেগে গেলেন তিনি, মেয়ের উপর তীব্র অভিমান জমে গেলো, উনার ধারণা মায়া আশিক কে ফোন করে আসতে বলছে, তিনি তো রেখে বলছিলো কথাগুলো, রাগ ঠান্ডা হয়ে এলে পুনরায় মেয়েকে বুকে টেনে নিতেন, কিন্তু তাঁর আগেই আশিক কে ডেকে নিয়ে এলো মায়া, উনার ভুল ধারণা নিয়ে ভদ্রলোক রুম থেকে বের হলেন না, না হতে দিলেন ফারজানা বেগম কে, মায়া দৌড়ে এসে আশিক কে জরে ধরে কান্না করতে লাগলো, আশিক মায়া কে সামলে নিয়ে দুহাত দিয়ে মায়ার মুখ ধরে শান্ত করতে বলে উঠলো,

___”কান্না করো না মায়া, আমি তো এসেগেছি তাইনা, চলো তুমি আমার সঙ্গে এখানে আর থাকতে হবে না!
আশিকের কথায় খালেক চেয়ারম্যানের বুকটা মুচড়ে উঠলো, তবুও রুম থেকে বের হলেন না রুমের ভিতর থেকে মেয়ের উত্তরের আশায় থাকলেন, ফারজানা বেগম রুম থেকে বের হতে নিলে হাত ধরে আটকে দিলেন ভদ্রলোক, মায়া চোখ ভরা পানি নিয়ে আশিকের দিকে চেয়ে রইলো,এর আগে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে নি সে, কী করবে কী করলে সব আগের মতো হয়ে যাবে কিছুই মাথায় এলো না, মায়া কে চুপচাপ কান্না করতে দেখে আশিক নরম কন্ঠে পুনরায় বলল,
___” আমার সঙ্গে যাবে, না-কি এখানেই থাকবে?
মায়া পুনরায় কিছুক্ষণ হেঁচকি তুলতে তুলতে চুপ থাকলো, থেকে গেলো আগামীকাল অন্য ছেলের সঙ্গে এনগেজমেন্ট করতে হবে, তখন সারাজীবনে জন্য আশিক কে হারাতে হবে, মায়া কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,

___”তুমি যেখানে যাবে তোমার সঙ্গে যাবো!
আশিকের মুখে হাসি ফুটে উঠলো, খালেক চেয়ারম্যান ফারজানা বেগমের হাত ছেড়ে দিয়ে বিছানায় বসে পরলেন, ফারজানা বেগম আর মেয়ের কাছে এলেন না, স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে স্বামীর হাত আগলিয়ে ধরলেন, আশিক পুনরায় মায়া কে বলল,
___” আঙ্কেল আন্টি কে ছেড়ে থাকতে পারবে আমার সঙ্গে?
মায়া একবার বাবা-মার রুমের দরজার দিকে তাকালো, দুজনেই চুপচাপ বিছানায় মাথা নিচু করে বসে আছে, মায়া সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে পুনরায় বলে উঠলো,

___”এই সামাজ এই শহর, যে যাই ভাবুক বলুক আমি তোমার সঙ্গে থাকবো,আর তুমি বেকার হও বা সাকসেস হও, তুমি যেমনি হও, তুমি শুধু আমার, তোমাকে কোনো কিছুর বিনিময়ে ছাড়তে পারবো না।
মায়ার কথায় খালেক চেয়ারম্যান বিছানা থেকে উঠে রুমের দরজার সামনে দাঁড়ালো, মায়া আশিক কে ছেড়ে দিয়ে বাবার কাছে যেতে নিলে, খালেক চেয়ারম্যান মায়ার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো, মায়া দরজার সামনে এসে কান্নারত কন্ঠে ডাকতে লাগলো,
___” আম্মু, আব্বু, একবার দরজাটা খুলে দেও, আম্মু…
পুনরায় দরজায় নক করতে করতে, বলে উঠলো,

___” আব্বু, আব্বু..
আশিক মায়ার কাছে এসে মায়া কে দু-হাতে আগলিয়ে নিয়ে বলল,
___” চলো মায়া!
মায়া আশিকের দিকে তাকিয়ে কান্না করতে করতে ছোট করে বলল,
___” কিন্তু..
আশিক মায়ার চোখের পানি মুছে দিতে বলল,
___” কোনো কিন্তু না, চলো অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে,
আঙ্কেল ভাববেন না আমি বেকার বলে আপনার মেয়ে কে না খেয়ে রাখবো, মেনে না নিলেন শুধু মন থেকে আমাদের জন্য দোয়া করবেন, আমরা যেন নতুন জীবনে সুখী হতে পারি, আল্লাহ হাফেজ ভালো থাকবে।
আশিকের কথায় রুমের ভিতরে থেকে কোনো সাড়া শব্দ এলো না, আশিক কথাটা বলে মায়ার হাত ধরে বাড়ির বাহিরে বের হয়ে যেতে যেতে, আনাস কে ফোন লাগলো,

মাগরিবের আজান পরার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের মানুষরা নিজেদের ঘরে ঘরে উঠে যায়, কিন্তু আরাত রা আসাতে মিমদের বাড়ির আশেপাশের অনেকেই মিমদের উঠানে ভীড় জমাছে,তাকবীর মিমের বাবার সঙ্গে মসজিদে নামাজ আদায় করে এলো, উঠাতে সন্ধ্যার পর এত মানুষজন দেখতে পেয়ে কিছুটা কপাল কুঁচকে এলো, মিম তিশা আর কিছু ছোট ছোট বাচ্চারা উঠানের মধ্যে ব্যাডমিন্টন খেলছে, রুপালী বেগম নামাজ আদায় করে উঠানে বসে আদা রসুন কেটে নিচ্ছে,তাকবীর আশেপাশে আরাত কে দেখতে না বাড়ির ভিতরে এলো, রুমে ঢুকতেই দেখতে পেলো আরাত মেঝেতে বসে বিছানায় সঙ্গে মাথা এলিয়ে দিয়ে কাকে যেন বারংবার ফোন করে যাচ্ছে, তাকবীর ধীরপায়ে আরাতের সামনে এসে দাঁড়ালো, আরাত তাকবীর কে দেখেও না দেখার ভান ধরে রশ্মি কে ফোন করে যাচ্ছে, তাকবীর মেঝেতে আরাতের পাশে বসে, আরাতের দিকে তাকিয়ে নীরবতা ভেঙ্গে কথা বলে উঠলো,

___” নামাজ পড়েছো?
আরাত ভার কন্ঠে উওর করলো,
___” হুম।
আরাত কে মলিন মুখে উত্তর করতে দেখে তাকবীর পুনরায় বলে উঠলো,
___” মন খারাপ?
___” একটু।
___” রিজন ?
আরাত তাকবীরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে ফোন দেখিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
___” রশ্মি ফোন উঠাচ্ছে না!
আরাতের মুখের এক্সপ্রেশন দেখে তাকবীর মুচকি হেঁসে উঠলো, আরাতের মুখ ঠান্ডা হাতে ছুয়ে দিতেই আরাত মুখ সরিয়ে নিতে নিতে বলল,
___” উমম ঠান্ডা।
তাকবীর পুনরায় হেঁসে উঠলো, হেঁসে হুট করে আরাতের কাঁপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে আরাতের কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে নিলো, আরাত কিছুই বুঝলো না শুধু চোখ বড়বড় করে তাকবীরের মুখের দিকে চেয়ে রইলো, তাকবীর চোখ বন্ধ রেখেই আরাতের হাত নিজের বাবরি চুলগুলোই মধ্যে গুঁজে দিতে দিতে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,

___” তোমার নরম নরম হাতে চুলগুলো টেনে দেও তো বউ!
___” বিছানায় শুয়ে পরেন, মেঝে থেকে ঠান্ডা উঠছে,
আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে?
তাকবীর আরাতের কোলে মাথা রেখেই মুচকি হেঁসে বলে উঠলো,
___” আমার জন্য এতটা চিন্তা, গুড তোমার উন্নতি হয়ে যাচ্ছে?
আরাত আমতা আমতা করে বলল,
___” মোটেও না, আপনার ঠান্ডা লাগবে আমার কী, আমি তো নিজের জন্য বলছিলাম।
তাকবীর চোখ মেলে তাকালো, কপাল কুঁচকে আরাতের দিকে চেয়ে রইলো, আরাত তাকবীরের তাকানেই বুঝতে পারলো, তাকবীর জানতে চাচ্ছে, আরাত অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,

___” না আপনার সঙ্গে তো আমিও মেঝেতে, আমার ঠান্ডা লাগছে এজন্য বললাম।
___” একটু শীত সহ্য করে নেও, রাতে শোধ করে দিবো।
___” মানে?
আরাতের চিৎকার দিয়ে কথা বলায়, তাকবীর আরাতের চোখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেঁসে বলে,
___” চলো বিছানায়, বুঝিয়ে দি…
___” চুপপপপ..
আরাত চোখ খিঁচে বন্ধ করে তাকবীরের মুখ চেপে ধরলো, তাকবীর আরাতের হাতে অবনত ঠোঁট ছুঁয়ে দিচ্ছে, আরাত চোখ মেলে তাকবীরের মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিলো, তাকবীরের মুখে দুষ্টু হাসি, আরাত এদিক ওদিক তাকাচ্ছে বারবার, তাকবীর আরাত কে লজ্জায় ফেলতে পুনরায় বলে উঠলো,
___” প্রবলেম নেই রাত, ঘুমানোর আগে আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেও, তাহলে হিসাব বরাবর হবে।
আরাত অবুঝের মতো পুনরায় জানতে চাইলো,

___” কীসের হিসাব বরাবর হবে?
___” এইতো আমি তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে, রাতে তুমি আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যাবে, স্বামী স্ত্রী সবকিছু শেয়ার করলে বরকত আসবে।
আরাত অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, মুখে তাঁর লজ্জা মিশানো হাসি, তাকবীর আরাতের মুখের দিকে নেশাতূর চোখে চেয়ে আছে, এভাবেই কেটে গেলো বেশ কিছুক্ষণ, তাকবীর আরাতের কোলে মাথা রেখেই এক হাত আরাতের মুখে রাখলো, আরাত তাকবীরের নেশা লাগানো চোখে চোখ রাখতে পারছে না কেমন যেন নেশা নেশা লাগছে সবকিছু, তাকবীরের মুড নষ্ট করতে শব্দ করে ফোনটা বেজে উঠলো, সঙ্গে সঙ্গে মুখে একরাশ বিরক্ত ফুটে উঠলো, তাকবীর চট করে আরাতের কোল থেকে দাঁড়িযে গেলো, আরচোখে আরাতের দিকে তাকাতেই দেখলো, আরাতের মুখে এখনো একরাশ লজ্জারা খেলা করছে, আরাত নিচু হয়ে নিজের হাতের নক গুলোতে চোখ নিবদ্ধ করছে, তাকবীর পকেট থেকে ফোন বের করে জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো, আনাস কে অসময়ে ফোন করতে দেখে বিরক্ত মুখে ফোন রিসিভ করলো, ওপাশে আনাস তাকবীর সালাম দিলো, তাকবীর বিরক্ত মুখে সালামের উত্তর করলো,আরাত এবার চোখ তুলে তাকবীর কে দেখতে লাগলো, তাকবীর চুপচাপ ওপাশের কথাগুলো শুনতে শুনতে আরাতের দিকে চোখ রাখলো, তাকবীর কে তাকাতে দেখে আরাত সঙ্গে সঙ্গে চোখ অন্য দিকে ফিরিয়ে দিলো, তাকবীর আরাতের দিকে তাকিয়েই গম্ভীর গলায় বলল,

___” বিয়ে দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দে।
ফোনের ওপাশ থেকে আনাস বলে উঠলো,
___” আঙ্কেল আন্টি রেগে আছে, এভাবে বিয়ে দিয়ে দিলে যদি আঙ্কেল প্রবলেমে পড়ে?
___” পড়ে দেখা যাবে, তুই ওঁদের বিয়ে দিয়ে হালাল ভাবে বাড়িতে পৌঁছে দে।
তাকবীর কথাটা বলেই আনাস কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিলো, আরাত বুঝলো না কার বিয়ের কথা বলছে, তাকবীর আরাতের সামনে এসে এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
___” ঠান্ডা লেগে যাবে উঠে পড়ো।
আরাত তাকবীরের হাতে হাত রাখলো উঠে দাঁড়াতে, তাকবীর একটানে আরাত কে নিজের বুকে সঙ্গে মিশে নিলো, তাকবীর আরাত কে বুকের মধ্যে আটকে নিয়ে বলে উঠলো,
___” এভাবে থাকবে, আমার প্রবলেম নেই, থাকতেই পারো।
আরাত দ্রুত সরে যেতে নিলে তাকবীরের হাতের বাঁধন থেক সরতে পারেনা, নিচু স্বরে বলল,

___” ছাড়ুন আমি বাহিরে যাবো।
___” বাহিরে কী করবে, তুমি বরং রুমে বরের আদর নেও।
আরাত মুখ ভার করে বলল,
___” বীর ভাইয়া আপনি খুব নির্লজ্জ!
তাকবীর আরাতের কথায় ভ্রু কুঁচকালো , গম্ভীর গলায় আরাত কে বলে উঠলো,
___” কিছু না করেই নির্লজ্জ হয়ে গেলাম, তাহলে তো কিছু করতেই হবে?
তাকবীরের কথা আরাত অন্য প্রসঙ্গ তুললো,
___” ফোনে কার বিয়ের কথা বললেন, বীর ভাইয়া?
তাকবীর স্বাভাবিক ভাবেই আরাত কে ছেড়ে দিলো, দুষ্টু হাসি থেকে গম্ভীর হয়ে উঠলো, রুম থেকে বের হতে হতে গম্ভীর গলায় বলল,

___” আশিক,আর আইরার ফ্রেন্ড।
আরাত তাকবীরের পাশে হাঁটতে হাঁটতে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” মায়া আপু আর আশিক ভাইয়ার?
___” হ্যাঁ।
তাকবীরের নজর সামনে, আরাত তাকবীর কে সামনে তাকাতে দেখে কথা বলে শান্তি পেলো না, দৌড়ে তাকবীরের সামনে দাঁড়িয়ে পিছু পা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
___” কিন্তু আমরা তো এখানে, তাহলে আজকেই বিয়ে কেনো দিতে বললেন?
তাকবীর আরাত কে উল্টোদিকে হাঁটতে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো, গম্ভীর গলায় আরাতের কথায় জানতে চেয়ে বলল,

___” বিয়ে আটকে আমাদের কাজ কী ?
আরাত তাকবীরের মতো কপাল কুঁচকে কোমরে হাত রেখে বলল,
___” কেনো বিয়ে খাবো না আমরা?
আরাতের কথায় তাকবীরের কুঁচকানো ভ্রু সোজা হয়ে এলো, কিছুপলক আরাতের দিকে নিঃশব্দে চেয়ে রইলো, তাকবীর কে নিজের দিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকতে দেখে, আরাত কোমর থেকে হাত নামালো,আমতা আমতা করে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” আমি কী কিছু ভুল বলেছি?
আরাতের কথায় তাকবীর নিঃশ্বাস ফেলে আরাত কে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলল,

___” ইম্পসিবল তুমি।
আরাত তাকবীর কে যেতে দেখে ঠোঁট উল্টে পিছু পিছু বাহিরে উঠানে এলো, মিমের বাবা ছোট ছোট কাঠখড়ি একখানে জ্বালিয়ে আগুন জ্বালিয়েছে, তাঁর পাশে রুপালী বেগম বসে থেকে আদা রসুন কেটে নিচ্ছে, আরাত মিম তিশাদের কাছে এগুলো, চারদিকে অন্ধকার, বড়বড় লাইট জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলছে তিশা মিম, আর আশেপাশের ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটা পিচ্চি, আরাত সেদিকে গিয়ে দাঁড়ালো, তাকবীর মিমের বাবার পাশে এসে দাঁড়ালো, মিমের বাবা তাকবীর কে নিজের পাশে দেখে হাসি মুখে দ্রুত বাড়ির ভিতরে চলে গেলো, রুপোলী বেগম তাকবীর কে দেখে হাসি মুখে বলে উঠলো,

___” তুমি উঠানে কেন, কুয়াশা পরছে অসুখ হবো তো, পড়ে আফা ( আদিবা তালুকদার ) আমারে বলবো নতুন জামাইয়ের যত্ন নিতে পারেনি?
রুপালী বেগমের কথার মধ্যে মিমের বাবা বাড়ির ভিতর থেকে চেয়ার নিয়ে এলো, তাকবীর কে চেয়ার দিতে দিতে বলল,
___” চেয়ারে বসো তুমি।
কথাটা বলে তিনি বিছানো খেরের উপর বসে পরলো, তাকবীর মিমের বাবার পাশে বসতে বসতে বলল,
___” চেয়ার লাগবে না আঙ্কেল।
কথাটা বলে তাকবীর আশেপাশে দেখতে লাগলো, সারাজীবন পরিস্কার শহরে উঠবস করে এখন গ্রামে এসে পরিবেশ টা ভিন্ন লাগছে, সবকিছুর মধ্যে এক ধরনের সুখ লেগে আছে, যা শহরের মাটিতে নেই, চারপাশের মানুষের জায়গা সবকিছু নিজস্ব নিজস্ব অনুভব হয়, তাকবীর হাত বাড়িয়ে আগুনের গরম ভাব অনুভব করতে করতে ফোন বের করে আনাস কে মেসেজ করতে লাগলো, আরাত মিমের সঙ্গে কিছুক্ষণ ব্যাডমিন্টন খেললো, খেলার পর তাকবীর কে মামার পাশে মাটিতে বসে ফোনে টাইপিং করতে দেখে বেশ অবাক হলো,পুনরায় মিম আর তিশা কে এক নজর দেখে নিয়ে আরাত মুচকি এক পা দুপা করে তাকবীরের কাছে এসে দাঁড়ালো, তাকবীর ফোনে চোখ রেখেই আরাত কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

___” কী চাই?
আরাত এতক্ষণ কাচুমাচু করছিলো, তাকবীরের কথায় মুখে নিয়ে সাহস করে বলে উঠলো,
___” ব্যাডমিন্টন খেলবো!
তাকবীর ফোনে চোখ রেখেই ছোট করে বলল,
___” ওকে যাও।
আরাত তাকবীরের দিকে তাকিয়ে একটু সময় নিয়ে বলল,
___” আপনার সঙ্গে খেলবো!
তাকবীর স্বভাবিক ভাবে ফোন থেকে চোখ উঠিয়ে আরাতের উপর রাখলো,আরাত তাকবীর কে স্বাভাবিক মুখে তাকাতে দেখে ঢোক গিলে মুখটা ইনোসেন্ট করে বাহানা ধরে বলে উঠলো,
___” প্লিজ চলুন না বীর ভাইয়া ব্যাডমিন্টন খেলবো?

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪১ (২)

তাকবীর আরাতের ইনোসেন্ট মার্কা ফেস দেখে বসা থেকে উঠে আরাত কে কিছু না বলে মিমদের দিকে যেতে লাগলো, তাকবীর কে যেতে দেখে আরাত তাকবীরের পিছনে যেতে যেতে খুশিতে হাত পা ছড়াছড়ি করতে করতে নাচানাচি করলো, তাকবীর যেতে যেতে লাইটের আলোতে নিজেদের শরীরের ছায়া তে দেখতে পেলো আরাতের উৎফুল্লতা, আরাতের পাগলামিতে তাকবীরের মুখে মুচকি হাসি সামনে হাঁটতে লাগলো, তাকবীর কে আসতে দেখে মিম আর তিশা আরাতের হাতে ব্যাট দিয়ে সাইটে দাঁড়ালো, আরাত একটা ব্যাট তাকবীর কে দিয়ে আরেকটা নিজে নিয়ে বিপরীত পাশে দাঁড়ালো, তাকবীর আরাতের দিকে তাকিয়ে আছে, আরাতের মুখে তৃপ্তির হাসি, মনে হচ্ছে তাকবীর কে নিজের সঙ্গে খেলাতে সামিল করতে পেয়ে বিশ্ব জয় করে ফেলছে, দুজন খেলার মধ্যে মিম দৌড়ে বাড়ির ভিতরে এসে নিজের ফোনটা নিয়ে পুনরায় উঠানে এসে তাকবীর আর আরাতের ভিডিও করতে লাগলো,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৩