তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৩
জান্নাতি আক্তার জারা
ঈদের বিকালের ঝড়বৃষ্টি হয়ে পুরো বিকেলটা, মেঘের আড়ালে লুকিয়ে রইল, দূর আকাশ জুড়ে জমে থাকা কালো মেঘগুলো, বাতাসের গতিতে পুরো আকাশ খেলা করছে, ধীকে ধীকে গাছের ডাল পালা দুলে উঠছে, আকাশের বুক চিরে টুপটাপ বৃষ্টি নামছে এই জমিনে, বৃষ্টির আগে যেমন দমকা বাতাস এসে পুরো শরীর শিতল করে তুলছিলো, সেই সময় আরাত মিম রা নদীর পাড় দিয়ে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বাড়ি ফিরছিল, মাঝরাস্তায় ঝুম বৃষ্টি নেমে আসে, কখনো জোরে,কখনো বা হঠাৎ করেই থেমে গিয়ে আবার শুরু, এভাবেই এক সময় আকাশ ভেদ করে বড় বড় বৃষ্টির ফোটা এসে শুকনো শরীর ছুঁয়ে দিয়ে গেলো, ভেজে গেলো একদল অনুভূতিময় মানুষ, বৃষ্টির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলল নিজেদের, একটু আগেও পবিত্র ঈদের হাসিতে ব্যস্ত ছিল, হঠাৎ করেই মেঘভাঙা বৃষ্টির ছোঁয়ায় লুকিয়ে রাখা না বলা অনুভূতি মুক্ত করতে লাগলো, কারণ এই বৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত এক মুক্তির স্বাদ, পার্থ আহিন বৃষ্টির পানিতে দু-হাত উজাড় করে দিয়ে ছোট বাচ্চাদের মতো শরীর ভেজাতে লাগলো, এই বৃষ্টিতে ছোট বীরাত এরান মাহা নিজেদের আটকিয়ে রাখলো না, শব্দ করে হেঁসে উঠল, কাদামাখা পায়ে ছুটে বেড়াল রাস্তাজুড়ে, বাদ পরলো না আনাস আইরা মিম ও, যদিও বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো কিছুই নেই, তবুও বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে তাকবীর রাস্তার পাশে ক্ষেত থেকে কলার পাতা নিয়ে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে নিজের আর আরাতের মাথায় ধরলো, এতে আরাতের মুখটা থমথমে হয়ে উঠলো, সামনেই সবাই বৃষ্টি বিলাস করছে, এমনকি নিজদের ছেলেমেয়েও, আর সেখানে তাকবীর ছেলেমেয়ে দের বৃষ্টিতে ভিজতে দিয়ে আরাত কে সঙ্গে নিয়ে কলার পাতা মাথায় দিয়ে তাঁদের পিছুু পিছু হাঁটতে হাঁটতে সবার বৃষ্টি বিলাস দেখছে , অথচ কিছুক্ষণ আগে নদীর পানিতে শরীর আধভেজা হয়ে গিয়েছে, এখন তো বৃষ্টির পানি এসে পুরোপুরি শরীর ভেজে দিয়ে যাচ্ছে, শুধুই মাথা টা শুঁকনো,আরাত তাকবীরের অযৌক্তিক আচরণের বাহানা ধরে বলল,
___”আমিও সবার মতো আপনার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজতে চাই?
___” শরীরে জ্বর বাঁধিয়ে যাবে।
তাকবীর এর কথা শেষ হওয়ায় আগেই আরাত নিজেদের মাথার উপর থাকা কলার পাতা এক টানে কাঁদা মাটিতে ফেলে দিয়ে বলতে লাগলো,
___” আরে চলুন তো, জ্বর আসলে নাপা খাবো, তাই বলে বৃষ্টি বিলাস করবো না।
তাকবীর দ্রুত আরাতের মাথা দুহাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” হোয়াট ইজ দিস রাত?
আকাশের দিকে তাকানোর কারণে বৃষ্টির ফোঁটা তাকবীরের চোখমুখ ভেজে দিলো, বাবরি চুলগুলো ভেজে গেলো, শরীর তো আগেই ভেজে গিয়েছে, আরাত মুচকি হেঁসে তাকবীরের থেকে দূরে এসে দুহাত উজাড় করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” বৃষ্টি শুধু পানি নয়, এটা আল্লাহর রহমত, যে অন্তর শুকিয়ে গেছে, তাকেও নরম করে তোলে।
তাকবীর এক হাত মাঝায় রেখে আরেক হাতে নিজের মুখময় এবং বাবরি চুলগুলো বুলাতে বুলাতে আরাত কে দেখছে, ভেজা কাপড়, এলোমেলো চুল, ভেজা মাটির গন্ধ, বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া, চোখে-মুখে একরাশ মুগ্ধতা, মনে হলো, এই অল্প কিছু মুহূর্তেই
জীবনটা কত সুন্দর হয়ে উঠতে পারে, তাকবীর যেন নিজেও কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেল বয়স সময়ের সব হিসাব, ফাঁকা রাস্তা, মানুষ কম, শুধু বৃষ্টির শব্দ আর মেঘের গর্জন, সবকিছুর মধ্যে একদল তরুণ তরুণী এবং দম্পতি, নিজেদের উজার করে দিলো অনুভূতির জালে, মজার বিষয় হলো তাঁরা শুধু বৃষ্টি বিলাস এর ক্ষান্ত হয়নি, ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে রাস্তার পাশে আম গাছের নিচ থেকে আম কুড়িয়ে বাড়ি ফিরেছে, মিম ফ্রেশ হয়ে ভেজা চুলে বারান্দায় এসে বসে, হাতে এক কাপ চা, পরনে টপ প্লাজু তারউপর শাল জরানো বৃষ্টি থেমে গিয়ে শীতল বাতাস বইছে, মিম বিষন্ন মনে চেয়ে রইল সেই ভেজা আকাশের দিকে, আজ সেই শীতল বাতাস টাও মিমের বিষন্ন মন ভালো করতে সক্ষম হয়ে উঠলো না, জানা নেই এত কেনো মন খারাপ তাঁর, গ্রামে আসার পর থেকে রুপোলী বেগম ঠিক মতো কথা বলেনি, মায়েরা নাকি অভিমান করে না, তাহলে দুদিন পেরিয়ে গেলো তবুও রুপোলী বেগম মিম কে বুকে টেনে নিলো না কেনো, এত কিসের অভিমান, নাকি মিমের জায়গাটা অন্য কেউ পূরণ করেছে বলে, মিম ভেবে পাচ্ছে না কিভাবে ভাঙ্গাবে তাঁর মায়ের অভিমান, কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশের ফিরেছে তাঁর মধ্যে কেটে গেল পাঁচটা দিন, হাতে আছে অল্প কয়েকদিন, গনাদিন দিন এত দ্রুত কেটে যায় মিমের হিসাবের দিন না হয়লে হয়তো বুঝতেই পারতো না,
___” কিরে লেডি গুগল, একা একা বসে কী ভাবছিস?
পার্থ মিম কে উদাসীন হয়ে বসে থাকতে দেখে, মিমের মাথায় গাট্টা মেরে বিপরীত চেয়ারে বসে পরলো, বসার সঙ্গে সঙ্গে হাঁচি দিলো, ফর্সা মুখ ঠান্ডায় লাল হয়ে গেছে,মিম হটাৎ নিজের মাথায় গাট্টা খেয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে দাঁত খিঁচে বিরক্ত কন্ঠে আড়রালো,
___” ডাফার….
বিরক্ত চোখে পার্থর দিকে তাকাতেই, পার্থর চোখমুখের বেহাল অবস্থা দেখে চমকে গেলো মিম, পার্থর কপালে হাত থেকিয়ে আরেক দফা চমকে তাকালো,
___” এত জলদি জ্বর বাঁধিয়ে ফেলছিস ?
পার্থ কে ঘিরে মিমের এত অস্থিরতা দেখে পার্থ মুচকি হাসলো, পার্থ আজকে ফাস্ট টাইম বৃষ্টি বিলাস করছে, যদিও শরীর টা একটু গরম মাএ মেচমেচ করছে, বাট অলরেডি ঠান্ডা লেগে গেছে, মিম পার্থ কে হাসতে দেখে বসা থেকে উঠতে উঠতে রাগী গলায় বলল,
___” ঠান্ডা বাঁধিয়ে হাসা হচ্ছে তাই-না, এখন তোর খেয়াল কে রাখবে শুনি?
___” কেনো তুই আছিস না?
___” হুম আমার তো দায় বেজে গেছে, পারলে বাঙালি এক মেয়ে কে বিয়ে কর, বাঙালি মেয়েরা কিন্তু হাসবেন্ডের অনেক কেয়ার করে বুঝতে পারছিস?
বলতে বলতে মিম রুমে ঢুকে কিছু একটা খুজলো, পার্থর নজর মিমের দিকে, মিম কাঙ্খিত জিনিস টা খুজে না পেয়ে পার্থ কে বলল,
___” এক মিনিট, আমি আরসি।
বলেই মিম রুম থেকে বের হয়ে গেলো, পার্থ এখনো মিমের যাওয়ার পানে চেয়ে আছে, ঠোঁটের কোণে এক চিমটি হাসি, দরজা থেকে চোখ ফিরিয়ে বাহিরে বাতাসের দিকে তাকালো,কলার গাছের পাতা একটার সঙ্গে আরেকটা বারি খেয়ে যাচ্ছে বাতাসে তালে তালে, পার্থ মলিন মুখে নীরব চোখে তাকিয়ে রইল সেদিকে,
___” বাঙালী বধু।
কয়েক মিনিট যেতেই মিম হাতে করে একটা বাটি আর একটা তয়ালা নিয়ে এলো, বাটিতে ছিলো গরম পানি, টি-টেবিলের ওপর গরম পানির বাট রেগে বলল,
___” ডাফার এক কাজ কর, একটু নিচু হয়ে গরম পানির ভাব নে।
মিমের কথায় পার্থ ভ্রু কুঁচকালো,
___” হোয়াট?
___” হোয়াট ফোহাট দূরে রাখ, যাব বলছি তাই কর।
মিম কথাটা বলতে বলতে পার্থর মাথা হেঁট করে তয়েলা মাথায় রাখলো, পার্থ তখনও বুঝলো না কী হচ্ছে তাঁর সঙ্গে, কিন্তু গরম ভাব টা নাকে আসায় ভালো লাগছে বেশ, পার্থ চুপচাপ গরম ভাবের উষ্ণতা নিতে লাগলো, বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর মিম বলল,
___” কেমন লাগছে?
___” হুম বেটার।
___” এটা হচ্ছে ঘরোয়া পদ্ধতি , ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি, আমার ঠান্ডা লাগলে আম্মু এভাবেই গরম পানির উষ্ণতা দিত, পুরোপুরি ঠিক না হলেও কিছুটা বেটার লাগতো।
দুজনের মুখেই মুচকি হাসি, মিম পার্থর থেকে চোখ ফিরিয়ে বাহিরে রাখতেই যেন সবকিছু থমকে গেলো এক নিমিষেই, চোখের পাতা কাঁপতে লাগলো, পার্থ মুচকি হেঁসে বলল,
___” তাহলে তো বাঙালী নারী কেই বিয়ে করবো, ঠান্ডা বাঁধলে ডক্টর দেখাতে হবে না, ঘরের বউ তাঁর স্পেশাল ঘরোয়া ট্রিটমেন্ট দিয়ে ভালো করে তুলবে, আমার জন্য তোর মতো একটা লেডি গুগল খোঁজ, যে সবসময় বেশি বকতে থাকবে এবং সবকিছুই জানবে, উঁহু থাক তুই থাকতে অন্য মেয়ে খুঁজতে হবে না, আমি বরং তোকেই বিয়ে করে নিবো, কী আমাকে বিয়ে করবি তো?
পার্থ মিমের কেনো সাড়াশব্দ না পেয়ে মাথার উপর থেকে তয়েলা নামিয়ে মিমের দিকে তাকালো, মিমের চোখ ছলছল করছে, যে কেনো সময় চোখ গড়িয়ে গাল বেয়ে পানি পরবে, পার্থ অবাক হয়ে মিমের চোখ অনুসরণ করে উঠানে তাকালো, আরশের সঙ্গে একটা মেয়েকে দেখে অবাক হলো পার্থ নিজেও, পার্থ অবাক হয়ে মিমের ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে পুনরায় সামনে তাকালো, পার্থ একটা মেয়ে কে বাইক থেকে খুব যত্ন সহকারে নামতে হেল্প করছে, পুরো উঠান কাঁদা মাটি জন্য মেয়ে তাঁর হাত ধরে হাঁটছে, মেয়েটা কে দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটা পাঁচ-ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্ব, তাঁদের শরীর আধভেজা, হয়তো বৃষ্টির মধ্যে কোথাও আশ্রয় নিয়েছিলো, তবুও ফোঁটা ফোঁটা পানিতে শরীর আধভেজা হয়ে আছে, আরশের সেই উসখুস চুল, ফর্মাল স্টাইলে ঢিলেঢালা শার্ট প্যান্ট যেন চেহারা বিষন্নতা লেগে আছে, পার্থর পর্যবেক্ষণের মধ্যেই আরশের তীক্ষ্ণ নজর পরল মিমের বারান্দায়, পার্থর হাতে তয়েলা এবং টি-টেবিলে বাটি দিকে এক নজর তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো, তিশা আরশ কে দাঁড়াতে দেখে নিজেও মিমের বারান্দার দিকে তাকালো, মিম কে ঘিরে আনন্দ টুকু এক নিমেষেই গায়েব হয়ে গেলো মিমের পাশে অচেনা এক ছেলে কে দেখে , তিশা পুনরায় আরশের গম্ভীর মুখপানে তাকালো, আরশ কে গম্ভীর মুখে সামনে এগুতে দেখে তিশা শক্ত কন্ঠে জানতে চাইলো,
___” এতোটা ছন্নছাড়া, খামখেয়ালি, আপনার মন বলতে কিছু নেই নাকি?
নিজের থেকে বয়সের ছোট, সম্মানের দিক দিয়ে বড় ভাবির মুখে এরূপ কথা শুনে জায়গায় দাঁড়ালো, তিশার কথাটা চোখ বন্ধ করে হজম করতে চাইলো, কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই চোখে ভেসে উঠলো, গরম পানির বাটি আর পার্থর হাতে তয়েলা, সঙ্গে সঙ্গে আরশ দাঁতে দাঁত খিঁচে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো,
___” না নেই, ছিলো একসময়, যা এখন পাথর হয়ে গেছে।
আরশ বড়বড় পা ফেলে হাঁটতে লাগলো, মিম আর দাঁড়ালো না হুট করে বারান্দা থেকে রুম দিয়ে বের হয়ে গেলো, পার্থ মিমের যাওয়ার দিকে অপলক চেয়ে রইলো, মিম উঠানে এসে দেখলো, তিশা এতক্ষণে নিজেদের বাড়িতে চলে গেছে, আর আরশ মিমের ফুল বাগানের দিকে এগুচ্ছে, আরশ কে ফুল বাগানের দিকে এগুতে দেখে মিমের ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙে গেলো, রাগের মাথায় কোনো কিছু না ভেবে ভেজা উঠানে দ্রুত পা ফেলে আরশের দিকে ছুটে গেল, আরশের কাছে এসে কলার চেপে ধরে কিছু বলবে তাঁর আগেই হঠাৎ পা পিছলে গেল,মুহূর্তটা যেন ধীর হয়ে গেল, মিম পড়ে যেতে নিতেই আরশ দ্রুত মিমের কোমর চেপে ধরে এক ঝটকায় নিজের দিকে টেনে নিল, মিম এসে ধাক্কা খেল আরশের বুকের সঙ্গে, পড়ে যাওয়ার আগেই সে পুরোপুরি আরশের বাহুডরে আটকে গেল, পার্থ দূর বারান্দায় দাঁড়িয়ে মলিন মুখে দেখছে সবকিছু, কিছু সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধতা ছেড়ে গেলো, মিমের নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে, চোখ বিস্ময়ে বড় বড়, বড় বড় চোখেই খুব কাছে থেকে লক্ষ করলো আরশের গম্ভীর মুখখান, চোখে কেনো অনুভূতি নেই, বরং কঠিন এবং স্থির দৃষ্টি, মিম ঢোক গিলে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল, আরশের হাত এখনো তার কোমরে শক্ত করে ধরা, মিমের মুখপানে এক নজর তাকিয়ে মিম কে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল,
___” এটা আমার লাস্ট ওয়ার্নিং, নিজের সীমার মধ্যে থাকো।
গম্ভীর গলায় কথাগুলো বলেই আরশ মিমের কোমর থেকে হাত ছেড়ে দিল, মিম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, রাগটা কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে, শুধু বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ধুকপুক করছে, যেন সেই সাত বছর আগে ফিরে গিয়েছিল, আরশ কে বাগানের বাঁশের তৈরি গেট খুলতে দেখে মিম নিজের হুঁশে ফিরলো, পুনরায় রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো, কন্ঠে অভিযোগ মিশিয়ে বলতে লাগলো,
___” দিছেন তো আম্মুর চোখে আমাকে খারাপ বানিয়ে , কেনো আপনি নিজের দোষগুলো সবাই কে বলেন নি?
আরশের কন্ঠে ছিলো তিক্ততা, পিছু না ফিরে উওর করলো,
___” তোমার ভুলগুলো একটু দেখার চেষ্টা করো, সবসময় বিপরীত মানুষটাই ভুল হয় না।
আরশের কথাটা মিমের ভেতরে গিয়ে লাগল, নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে না পেয়ে তেতে উঠে হিসহিসিয়ে বলল,
___” আমি ভুল, আমি ভুল না, ভুল আপনি, আমার লাইফে আপনার আসা ভুল,আপনি আমার বাড়িতে কেনো এসেছেন, নিশ্চয়ই আমার আম্মু কে আমার নামে ভুলভাল বুঝাতে এসেছেন, এটা তে তো আপনি খুব স্পট, আম্মু আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা না বলার পিছনে আপনার হাত আছে তাই-না?
___” স্টুপিড।
আরশ ফুল বাগানের ভিতরে চলে গেলো, মিমের রাগ যেন আরো বেড়ে গেলো, আরশের পিছনে পিছনে ফুল বাগানের ঢুকে বলতে লাগলো,
___” স্টুপিড কাকে বললেন, আমার কথার উওর না দিয়ে কই যাচ্ছেন, আপনি আমার বাগান থেকে দূরে থাকেন বলছি, শুধু বাগান কেনো, আমার আব্বু আম্মু আমার বাড়ি ইনফ্যাট আমার লাইফ থেকেও…
মিম আরশের পিছনে হাঁটতে হাঁটতে এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামতেই, আরশ হটাৎই পিছনে ঘুরে রক্ত চক্ষু নিক্ষেপ করলো, মিম আরশের চাহনি দেখে কিছুটা হকচকিয়ে গেল, আরশ মুহূর্তেই তাঁর শক্তপোক্ত হাতে মিমের কব্জি টেনে নিজের মুখোমুখি করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
___” আমার নীরবতা কে দুর্বলতা ভাবার ভুলটা তুই করেছিস, আমি চুপ ছিলাম বলে আমাকে দুর্বল ভাবার ভুল করিস না।
___” হাতটা ছাড়ুন, ছাড়ুন বলছি, আপনি একটুও চেঞ্জ হয়নাই না, সেই আগের মতো বেপরোয়া, মনে যা আসে তাই, আপনার কী মিনিমাম টুকুও লজ্জা নেই না, যে মেয়ে কে কষ্ট দিয়েছেন, সেই মেয়ের বাড়িতেই বেহায়ার মতো চলে এসেছেন।
আরশের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলতে লাগলো,
___” শেষ হয়েছে, নাকি এখনো বাকি আছে?
মিম তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছে, আরশের ঠোঁটে হালকা বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠলো,
___” এতবছর পড়ে বাড়ির কথা মনে পড়লো, আঙ্কেল আন্টির প্রতি এত ভালোবাসা বাহ, সাত বছর আগে কই ছিলো তোর এতো ভালোবাসা, আর কী যেন বললি আমি বেহায়া, হ্যাঁ মেনে নিলাম আমি বেহায়া, আর কিছু?
আরশ কথাগুলো বলেই বড় বড় পা ফেলে মিম দের বাড়ির ভিতরে চলে গেলো, মিম কিছুক্ষণ চুপ করে আরশের যাওয়া দেখলো, রাগ আর অস্বস্তি মিশে গেছে একাকার হয়ে গেছে, মিম আরশ কে নিজেদের বাড়িতে যেতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিশা দের বাড়ির দিকে পা বাড়ালো,
___” কী বুঝলেন?
আরাতের কথায় তাকবীর কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
___” রাগ অভিমান সবকিছুর আড়ালে শুধু একটাই অনুভূতি,ভালোবাসা।
আরাত হাতে থাকা কফির কাপ টি-টেবিলে রেখে মুচকি হেঁসে বলল,
___” হুম ভালোবাসা, আমরা কী ওঁদের জন্য কিছু করতে পারি না?
আরাতের কথায় তাকবীর এর ভ্রু কুঁচকে এলো, এতক্ষণ দূর বারান্দায় বসে আরশ মিম কে লক্ষ করছিলো তাকবীর আরাত, দুজনের হাতেই কফির কাপ, ফ্রেশ হয়ে কফি হাতে দুজন বারান্দায় এসেছিল বৃষ্টি বিলাস এর শেষ মুহূর্তটা, ধীরে ধীরে আকাশের সেই গর্জন মেঘের আড়ালে হাড়িয়ে যাওয়া নীরব খেলা, কিন্তু বারান্দায় এসে দুজন বিচ্ছেদ মানবের মান-অভিমান এর সাক্ষী হয়ে গেলো, তাকবীর কফিতে পুনরায় চুমুক দিয়ে গলা ভিজিয়ে বলল,
___” অন্যের পার্সোনাল বিষয়ে ইন্টারফেয়ার করা ঠিক না, ওদের মান অভিমান, ওদের ভাঙতে দেও।
___” যদি না ভাঙ্গে?
আরাতের কথায় তাকবীর একনজর আরাত কে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে পুনরায় থমকে যাওয়া খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে কফির কাপে চুমুক বসাতে বসাতে বলল,
___” তাহলে বুঝে নিতে হবে, ভালোবাসা হেরে যাবে এক ঠুনকো ইগো নামে শব্দের কাছে।
আরাত কৌতূহল চোখে প্রশ্ন করলো,
___” তাহলে কী ওদের সম্পর্কটা খুব ঠুনকো ছিল?
___” ঠুকনো কি-না জানি না, তবে ভালোবাসার প্রতি কোনো জোর ছিলো না, আর অপেক্ষা জানে ওরা কতটা ক্লান্ত।
___” অপেক্ষা?
___” হ্যা অপেক্ষা, অপেক্ষাকৃত মানুষটার চেয়ে সুখী আর কেউ না, যেই জিনিসটা তাড়াতাড়িই মানুষ অর্জন করে সেটা আসলে ক্ষণস্থায়ী আর যেটা দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর অর্জন করে সেটাই দীর্ঘস্থায়ী।
আরাতের চোখেমুখে অবাকের রেশ,
___” একজনেন জন্য এতটা বছর অপেক্ষা করা যায় ?
তাকবীর আরাতের কথায় আকাশের দিকে চোখ রেখেই বলল,
___” একজন’ কেই জীবনের সব টা দিয়ে ভালোবাসার ব্যাপার টা সবাই কে দিয়ে হয় না ৷
আরাত বুঝলো না তাকবীরের কথায় মানে, অপেক্ষার মধ্যে একজন কে ভালোবাসার ব্যাপারটা আসলো কিভাবে, আরাত বুঝতে না পেয়ে পুনরায় তাকবীর কে প্রশ্ন করল,
___”ভালোবাসা আর অপেক্ষার মধ্যে সম্পর্ক কী?
___” ভালোবাসে বলেই অপেক্ষা করে, আর যে কেউ সারাজীবন একজন কেই ভালোবেসে অপেক্ষা করতে পারে না।
আরাত তাকবীরের মুখের দিকে অপলক চেয়ে বলল,
___” অপেক্ষার সঙ্গে আপনার এতটা গভীর বন্ধুত্ব, কখনো কারো ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন?
তাকবীরর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠলো, আকাশের থেকে চোখ ফিরিয়ে আরাত কে দেখতে লাগলো, আরাত ভ্রু নাচিয়ে পুনরায় জানতে চাইলো, তাকবীর আরাতের মুখপানে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় স্বীকারোক্তি করল,
___” হুম।
আরাতের মনে আগ্রহ জাগলো, কিছুটা মন খারাপ হয়ে এলো, তবুও মুখে হাসি রেখে জানতে চাইলো,
___” কে সে?
তাকবীর আরাতের চোখে চোখ রেখে বলল,
___” আমার অর্ধাঙ্গিনী।
আরাত যেন এতক্ষণ দম আটকে ছিলো, কয়েক সেকেন্ড যেতেই মুচকি হেঁসে লাজে রাঙা মুখ নামিয়ে নিলো, নিজের অজান্তেই বুকের ভেতর কিছুক্ষণ আগের জমে ওঠা অভিমান গুলো মুক্ত পাখির মতো উড়তে লাগলো, মনের অনুভূতিগুলো তাকবীরের আড়ালে সামলানো চেষ্টা করতে লাগলো, তাকবীর তাঁর পাগল বউয়ের অনুভূতি আগেই জানান পেয়েছে, লাজে রাঙা মুখ দেখে এক হাতে বউ কে বুকে টেনে নিলো, আরাতের কপালে চুমু রেখে দিয়ে তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
___” আমার অপেক্ষা সার্থক বউ।
আরাত চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে তাকবীরের বুকে মুখ গুঁজালো, বিয়ের এত বছর পড়েও বউয়ের লাজে রাঙা মুখের পাগলামি দেখে তাকবীর নিজেও মুচকি হাসলো, এভাবে কেটে গেলো কয়েক মুহূর্ত, নীরবতা প্রমান দিয়ে গেলো তাঁদের ভালোবাসা, আরাত তাকবীরের বুক থেকে মাথা তুলে বলে উঠলো,
___” আমার কাছে একটা আইডিয়া আছে, ওদের মান-অভিমান ভাঙানোর।
___” আবার শুরু করলে?
আরাত বিরক্ত কন্ঠে বলল,
___” উফফ আপনি বুঝবেন না, আমাকে আইরা আপুর সঙ্গে কথা বলতে হবে।
___” যা ইচ্ছা করো, কিন্তু কোনো গন্ডগোল বাঁধিয়ে দিও না।
আরাত তাকবীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” আমার উপর আপনার বিশ্বাস নেই?
___” তোমার উপর থাকলেও, তোমার ভন্ডমীর উপর নেই।
আরাত গাল ফুলিয়ে বলল,
___” আমি ভন্ড?
তাকবীর দুষ্টু হেঁসে আরাতের মাথা নিজের বুকে রেখে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
___” বউরে তুমি ভন্ডামী করতে করতে দুই বাচ্চার মা হয়ে গেলে।
সন্ধ্যারাত মিম তিশা কে নিয়ে এসেছে নিজেদের বাড়িতে, মিম এখনো জানে না তিশা আর হানিফের বিয়ে টা কিভাবে হয়েছে, শুধু এতটুকু জেনেছে, মিম যেটা সন্দেহ করেছিলো সেটা সম্পূর্ণ ভুল, তিশার হানিফের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, আর তিশা বর্তমান হানিফের বাচ্চার মা হতে যাচ্ছে, হ্যাঁ তিশা ছয়মাসের অন্তঃসত্ত্বা, কিন্তু মিম প্রথমে আরশ আর তিশা কে একসঙ্গে দেখে ভুল ভেবে নিয়েছিলো,মুলত মিমের বিকালের রাগ টা এখান থেকেই ছিলো, নিজের ভুল ধারণা যখন ভেঙে যায়, নিজের অতিরিক্ত ভাবনার জন্য একা একা লজ্জিত হয়ে গিয়েছিলো, আরশ আজ আর বাড়ি ফিরে নি, রুপোলী বেগম ফিরতে দেয়নি, আরশের প্রতি রুপোলী বেগমের অতিরিক্ত যত্ন ভালো লাগছে না, বিকাল বেলা আরশ মিম দের বাড়ির ভিতর থেকে কোদাল আর কাঁচি নিয়ে পুনরায় ফুল বাগানের ফিরে আসে, ফুল বাগানের ঝড়বৃষ্টির কারণে ডালপালা ভাঙে গিয়েছে, কাদায় ঢেকে গিয়েছে কিছু গাছ, পুরো বাগান এলোমেলো হয়ে আছে,আরশ ধীরে ধীরে কোদাল দিয়ে মাটি পরিষ্কার করতে লাগলো, আর কাঁচি দিয়ে ভেঙে যাওয়া ডালগুলো ছেঁটে ফেলতে শুরু করলো, যেগুলো বেঁচে থাকার মতো ছিল, সেগুলোকে আবার সোজা করে মাটি দিয়ে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে দিলো, কাজ করতে করতে তার হাত ময়লা হয়ে যাওয়ায় ফ্রেশ হয়েছে, আরশ কে ফ্রেশ হয়ে বাড়ি থেকে বের হতে দেখে রুপোলী বেগম পথ আটকে নিজে খাবার টেবিলে দাড়িয়ে আরশ কে খাবার খাওয়ালেন, মিম সবকিছু লক্ষ করছিলো আর আরশের উপর রাগ টা যেন আরো গারো হতে লাগলো, নিজের ভালোবাসার ভাগ আরশ কে পেতে দেখে, শুধু মিম না, তালুকদার বাড়ির সবাই আরশ আর রুপোলী বেগম কে লক্ষ করছেন, তারা আগে থেকেই জানে আরশ প্রতিদিন গ্রামে যাওয়া আসা করে, আদনান তালুকদার আদিবা তালুকদার কে অনেক আগে বলেছিনেন মিমের বাবা-মা কে তালুকদার বাড়িতে রেখে দিতে, কিন্তু রুপোলী বেগম রাজি হয়নাই, কেনোনা এতদিনে আরশ তাঁদের ছেলের মতো হয়ে গিয়েছে, রুপোলী বেগম প্রতিদিন আদিবা তালুকদার কে ফোনে আরশের ব্যাপারে বলতেন, আরশ আজকে এটা ওটা নিয়ে এসেছে, আমাদের দুজন কে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছে,
রুপোলী বেগমের মুখে আরশের নামে নিত্যদিন এটা ওটা শুনতে শুনতে আরশের প্রতি মায়া জমে গেছে, আজকে রুপোলী বেগম আর আরশ কে দেখে বুঝলেন, আরশ মিমের কমতি বুঝতে দেননি, খুব সূক্ষ্মভাবে এই বাড়িতে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে, আরশ বিকালের খাবার খেয়ে বাড়ি যেতে চাইলে রুপোলী বেগম যেতে দেননি, সন্ধারাতে বাড়ির উঠানে বসে আড্ডা দিচ্ছে, শুধু আড্ডায় না, আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার মিমের বাবা এবং আনাস মিলে লুডু খেলছে উঠানে চাটাই বিছিয়ে, আরাত মিম রা মিলে ঝড়ের ভিতরে কুড়ানো আম দিয়ে আম ভর্তা করছে, পুরো উঠান আড্ডায় জমিয়ে তুলছে ঈদের রাত, এভাবেই তাঁদের ঈদের আনন্দর শেষ অধ্যায় চলে যাচ্ছে, আম ভর্তা হতেই রাবেয়া তালুকদার মিম কে বাড়ির ভিতরে পাঠালেন পার্থ আর আহিন কে ডাকতে, পার্থ কে বিকাল থেকে মিমের চোখে পড়েনি, মিমের ধারণা পার্থ আহিনের সঙ্গে, কিন্তু আহিন কে একা একা গ্রামের মধ্যে থেকে ফিরতে দেখা গেলো,
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি ঈদ স্পেশাল ২
মিম সদর দরজার সামনে আসতেই আরশের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে যায়, আরশ মিম কে দেখেও না দেখার ভান করে পকেট থেকে ফোন বের করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো , মিম আরশের যাওয়ার পানে চেয়ে অন্ধকার মুখে পার্থর রুমের দিকে পা বাড়ালো,
