তুমি আছো মনের গহীনে পর্ব ১১

1169

গল্পের পরের পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে পরতে চাইলে notification অন করে রাখুন ok বাটনে ক্লিক করে

তুমি আছো মনের গহীনে পর্ব ১১
Jannatul ferdosi rimi

মেহেভীন ঘুমের ঘোরে আরহামের শার্ট আকড়ে ধরে।
আরহাম তা বুঝতে পেরে,মেহেভীনের দিকে তাকায়। মেয়েটা কেমন যেন আষ্টেপৃষ্টে তার শার্টটা আকড়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। আরহাম একবার ভাবছে সে কি মেহেভীনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলবে? এমনভাবে শার্টটা চেপে ধরে আছে, মনে হচ্ছে এখুনি ছিড়ে যাবে। স্টুপিড মেয়েটা এখন জেগে থাকলে আরহাম তাকে আচ্ছা বকুনি দিতো। আরহাম একবার ভাবলো মেহেভীনকে জাগাবে, কিন্তু না সে তা করেনা। বরং মেয়েটার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন। মেয়েটাকে দেখেই মনে হয় কতরাত সে ঘুমাই নি।মেয়েটার চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে। হয়তো অতিরিক্ত কান্না এবং না ঘুমানোর জন্যে। আজ যদি আরহামের সংস্পর্শে এসে,একটু শান্তির ঘুম দিতে পারে মন্দ হবে না ব্যাপারটা। আরহাম আনমনে ভাবলো, ‘আচ্ছা ভালোবাসায় এতো বেদনা থাকে কেন? বর্তমানে কিছু মানুষ ভালোবাসায় এখন সুখ খুজতে গিয়ে, অসুখী হয়ে উঠে। মেহেভীনও তার মধ্যে একজন। ভালোবাসায় সুখ ধরা দেয় তখনি, যখন সঠিক মানুষটাকে ভালোবাসা যায়। মেহেভীন মেয়েটা বড্ড সরল। তাই তার ভালোবাসাকে নিয়ে খেলা করা হয়েছে।’

আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জ্যাম পড়েছে। জ্যামে বসে আছে তো আছেই নড়ার নাম নেই। ঢাকা-শহর বলে কথা। জ্যাম তো সামান্য ব্যাপার। আরহামের রাগে মাথা বিগড়ে যাচ্ছে। আজ সারাদিন অফিস শেষে, অফিসের বাইরে এসে গাড়ি স্টার্ট দিতে গিয়ে দেখে গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই আরহাম ঠিক করেছিলো বাসে করে বাসায় যাবে। বাসের ভিতরে এসেই, মেহেভীনের সাথে দেখা হয়। বলতে গেলে আজ সঠিক সময়তেই আরহাম এসেছে। আজ বোধহয় আরহামের ভাগ্যটাই খারাপ। আজকেই গাড়িটা নষ্ট হলো, তার মধ্যে জ্যামটাও ছুটছে না।
এতোক্ষন বাসে বসে থাকতে থাকতে আরহামের একপ্রকার দমবন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু মেহেভীন নামক রমনী দিব্যি এই দমবন্ধ করা পরিবেশে ঘুমিয়ে যাচ্ছে। যাকে বলে একেবারে নিশ্চিন্তের ঘুম। আরহাম বিরক্তির শব্দ মুখ থেকে বের করে বলে,
‘এতো গরমে কীভাবে ঘুমাচ্ছে? স্টুপিড মেয়েটা তরতর করে ঘামছেও। তবুও ঘুম ভাঙ্গছে না এর। স্ট্রেঞ্জ! ‘

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

মেহেভীন একটি সবুজ রংয়ের বোরখা পড়ে আছে । মাথায় হিজাব দিয়ে রেখেছে। মেহেভীনের ঘামার্ত মুখশ্রীটা শুধু দেখা যাচ্ছে। আরহাম তার পকেট থেকে টিস্যু বের করে মেহেভীনের কপালের ঘামটুকু মুছিয়ে দেয়। পাশের সিটেই বসে ছিলো সদ্য বিবাহিত পুরুষ ও নারী। তাদের দেখেই বুঝা যাচ্ছে তারা সমবয়সী।
তাদের বয়স বলতে ২৪-২৫ হবে। যুবতীটি তার স্বামীকে খুঁচিয়ে, আরহামকে দেখিয়ে বলতে লাগলো,
‘দেখেছো কি কেয়ারিং হাজবেন্ড। কেমন করে নিজের বউটাকে আগলে রাখছে। বাবাহ দেখেই মনে হচ্ছে বেশ রোমান্টিক। আর তুমি? হুহ খবিশ লোক একটা৷ ‘
যুবকটি তার স্ত্রীর কথা শুনে মুখ ঘুড়িয়ে ফেলে। স্ত্রী তাকে প্রায়ই এইসব কথা শুনায়। এইসব কথা শুনতে শুনতে সে অভ্যস্ত। এখন তার কিছু যায় আসে না।
আরহামের কানে ও আসে কথা গুলো। বাড়িতে তো এই মেহেভীন নামক রমনীর স্বামীর পরিচয়ে থাকতে হচ্ছে, এখন বাইরেও তা হচ্ছে। আরহামের এখন বড্ড চিন্তা হচ্ছে তার জীবন নিয়ে। সারাজীবন অবিবাহিত হওয়ার পন করে এখন বিবাহিত হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে হচ্ছে। তাও আবার মিথ্যে বিয়ের। কিরকম ভবিষ্যৎ হবে এই মিথ্যে বিয়ের। দীর্ঘ জ্যামের সপাপ্তি ঘটিয়ে, বাস আবারোও তার আপনমনে চলতে শুরু করলো।

অভ্র অফিসের কাজগুলো শেষ করে, অফিসের সাথে এটাচ করা তার রেস্ট রুমে গিয়ে, বেডে শুয়ে পড়ে। আজ-কাল বাড়িতে যেতে তার ইচ্ছাও করে না। কারণটা একটু একটু হলেও অভ্র বুঝতে পারে। বাড়িটার প্রতিটা কোনায় মেহেভীনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। মেয়েটা এই বিরাট ঢাকা শহরে একা একা কোথাও গেছে তা অভ্র জানে না। এই এগারো মাস মেহেভীনের সাথে ভালোবাসার মিথ্যে অভিনয়ের পরে, অভ্র এইটুকু জানে তার একটি মায়া পড়ে গেছে মেহু নামক সরল-সোজা রমনীট জন্যে। অভ্র উত্তেজিত গলায় বললো,
”একবার শুধু দেখা দে মেহু। আমি সব বলতে চাই তোকে। বিশ্বাস কর আমি নিজেও কখনো বুঝতে পারেনি। এই এগারো টা মাস ভালোবাসার মিথ্যে অভিনয়ের পর তোর মায়ায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলবো। এই মায়া কে আমি কি নাম দিবো বল? শুধু এইটুকু বলতে চাই আমার যদি সাধ্যি থাকতো, তাহলে করতাম না মিথ্যে অভিনয়ের ভালোবাসা।’

অভ্র বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। তার ফোনটা বেজে উঠে। অভ্র জানে মায়রা তাকে ফোন করছে,কিন্তু আপাতত অভ্রের মায়রার সাথে কোনপ্রকার কথা বলার ইচ্ছে নেই। তাই অভ্র ফোনটা কেটে দেয়। মায়রা পুনরায় ফোন করে। অভ্র বিরক্তি হয়েই ফোনটা ফোন দেয়। আজ সে বাড়িতেও যাবে না। অফিসেই কাটিয়ে দিবে রাতটা।
অভ্র এইভাবে ফোন কেটে দেওয়ায়, মায়রা নামক রমনীর অভিমান হয় প্রচন্ড। যাকে বেশ ভালো রকমের অভিমান। আচ্ছা তার স্বামীটা কি বুঝে না?
মায়রার চিন্তা হয় তার স্বামীটার জন্যে। মায়রা অভিমানী হয়ে নিজের ঘরে গিয়ে, শুয়ে পড়ে। আজকে আসুক অভ্র। কথা বলবে না সে তার সাথে।

‘এইযে স্টুপিড মেয়ে একটা!কত ঘুমাবে তুমি? বাস স্ট্যান্ড এ চলে এলাম আমরা। এখনো ঘুম শেষ হয়না। ঘুম থেকে উঠো ফাস্ট। ‘
কারো কর্কষ কন্ঠ শুনে মেহেভীন ধড়ফড় করে উঠে মেহেভীন। নিজের মাথা আরহামের কাঁধে দেখে,তৎক্ষনাক সরিয়ে ফেলে রমনী। সারা রাস্তায় আরহামের কাঁধে ঘুমিয়েছে সে। ভাবতেই লজ্জায় মুখখানি ছেঁয়ে যায় রমনীর। সে তাড়াতাড়ি বাস ছেড়ে নেমে যায়। আরহামের সাথে তর্কে সে জড়াতে চাইছে না আপাতত। আরহাম ও বাসে ভাড়া মিটিয়ে নেমে যায়। বাকি রাস্তাটুকু তারা কোনপ্রকার কথা না বলেই হাটতে হাটতে বাড়িতে চলে আসে।
বাড়িতে আসতেই, আরহামের মা হাজারটা প্রশ্ন খুলে বসেন । এতো দেরী কেন হলো। আরহাম কিছু একটা বুঝিয়ে দিয়েছেন।
আরিয়ান সিটি বাজাতে বাজাতে নিজের ঘরে হাতের ঘড়িটা খুলছিলো। তখনি মেহেভীন একপ্রকার রাগ দেখিয়, আরহামের ঘরে এসে তার কাঁধের ব্যাগটা ফেলে দেয়। তারপর বিছানায় রাগে ফুশতে থাকে।
আরিয়ান মেহেভীনের পাশে বসে বললো,

‘তা আমার লিটেল সিস এতো রেগে আছিস কেন? আজকের দিনটা কেমন কাটলো তোর হাব্বি থুরি নকল হাব্বির সাথে। ‘
মেহেভীন আরিয়ান গলা চেপে বলে,
”আরেকটা কথা মুখ থেকে বের করেছিস তো। একেবারে খুন করে ফেলবো তোকে। হাব্বির না বেটা একটা আস্ত খবিশ। জানিস সারাদিন শুধু ‘স্টুপিড ‘ বলতে থাকে। এই লোকটার সাথে থাকা যায় নাকি?
আমি একদম কনফার্ম করে বলতে পারি। এই লোকটার বউ যে হবে,তার জীবন একদম ত্যানা ত্যানা হয়ে যাবে। কে জানে? কে সেই অভাগী।’
আরিয়ান মেহেভীনের কথায় মুচকি হেসে বলে,
‘হয়তো তুই-ই সেই অভাগী। ‘
আরিয়ানের কথাতে মেহেভীন তার দিকে চোখ গরম করে তাকালে, আরিয়ান আমতা আমতা করে বলে,
”মানে আমি বলতে চাইছি যে। ভাগ্যের খেলা কে বলতে পারে বল? ভাইয়াকে না করলি,কিন্ত তুই কি ভবিষ্যৎ এ অন্য কাউকে বিয়ে করবি না?&
‘মানুষ ভূল একবারই করে। কাউকে গভীরভাবে নিজের অন্তর দিয়ে ভালোবাসাও আরেকটি ভূল।
আমি এই ভূল বার বার করতে চাই না।’

মেহেভীন কথাটিই বলে, জানালা ঘেষে দাঁড়ায়। আর কাউকে ভালোবাসার সাধ্যি তার নেই। একবার তার সন্তানটা পৃথিবীতে চলে এলেই, মেহেভীন ও অভ্রের ডিভোর্স পুরোপুরি হয়ে যাবে। একেবারের জন্যে অভ্রের থেকে সে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অভ্রের কোন ছায়া সে তার এবং তার সন্তানের জীবনে পড়তে দিবে না। সকালের কথা মনে পড়তেই মেহেভীনের চোখ দুটো ভরে আসে। সে যতই চাক শক্ত হতে, অভ্র সামনে এলে, সে ঠিকই ভেঙ্গে পড়ে। মায়রার সাথে আজ অভ্র যা যা করছে। তা তো একদিন অভ্রও করতো মেহেভীনের সাথে। সবকিছুই অভিনয়। কাঁধে কারো স্পর্শ পেতেই, মেহেভীন নিজের জলটুকু মুছে দেখে আরিয়ান। আরিয়ান বললো,
”আর যাই করিস মেহু৷ আমার থেকে নিজের কষ্ট লুকানোর চেস্টা করিস না৷ আর কি বললি?ভালোবাসা ভূল?ভালোবাসার মতো সুন্দর অনুভুতি হয়তো আর কিছু নেই।
ভূল মানুষকে ভালোবাসা ভূল। দেখবি যখন তোর লাইফে তোর প্রিন্স চারমিন আসবে মানে তোর সঠিক মানুষটা আসবে,তখন বুঝবি ভালোবাসা টা ঠিক কতটা সুন্দর৷ ‘
মেহেভীন আরিয়ানের কথার বিপরীতে, কিছু বলবে তখনি তার কানে আসে কারো গলায় মধুর সুর । হ্যা আরহাম তার গিটার টা নিয়ে, বাগানে বসে গাইছে,

যখন সন্ধ্যা নেমে জোনাকিরা আসে
আর ফুলগুলো সুবাস ছড়ায় রাতে
তোমার ঘরের পুতুলগুলো তখন
চুপ-অভিমানে ঘরে ফিরে যায় ভাঙ্গা মনে
তাইতো রাত আমায় বলে
তুমি ভেঙ্গে পড়োনা এইভাবে
কেউ থাকে না চিরদিন সাথে
যদি কাঁদো এভাবে, তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে
ভেঙ্গে পড়োনা এই রাতে
মেহেভীন গানটা গভীরভাবে অনুভব করছে। গানটার প্রতিটা লাইন যেন তারই জন্যে গাওয়া । আরহাম খুবই নিখুঁত ভাবে প্রতিটা গানের লাইন গাইছে। মেহেভীনের চোখ থেকে টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়ে। গান গাইতে গাইতে আরহামের চোখ যায় মেহেভীনের দিকে। মেয়েটার মায়াভরা মুখশ্রীতে এক রাশ কান্না এসে ভীর করেছে। আচ্ছা মেয়েটা এতো ছিচকাদুনে কেন? একটু হাঁসতে পারেনা? আপনমনে নিজেকে প্রশ্ন করে বসে আরহাম। তারপর নিজেই নিজেকে বলে, ‘আস্ত একটা স্টুপিড় মেয়ে। স্টুপিড মেয়েরা শুধু কাঁদতেই জানে। ‘

আরহাম মেহেভীনের দিকে তাঁকিয়ে পুনরায় গাইতে লাগলো,
ও চাঁদ, বলো না সে লুকিয়ে আছে কোথায়?
সে কি খুব কাছের তারাটা তোমার?
সে কি করেছে অভিমান আবার?
হঠাৎ সে চলে গেছে, শূন্যতা যেন এ ঘরে
তাইতো রাত আমায় বলে
তুমি ভেঙ্গে পড়োনা এইভাবে
কেউ থাকে না চিরদিন সাথে
যদি কাঁদো এভাবে, তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে
ভেঙ্গে পড়োনা রাতে
তুমি ভেঙ্গে পড়োনা এইভাবে
কেউ থাকে না চিরদিন সাথে
যদি কাঁদো এভাবে, তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে
ভেঙ্গে পড়োনা এই রাতে

তুমি আছো মনের গহীনে পর্ব ১০

মেহেভীন গানটি শুনে যেন এক অদ্ভুদ মনোবল কাজ করলো। তার কান্না নিজে নিজেই থেমে গেলো। মনে হচ্ছে আরহামের পাওয়া প্রতিটি সুর, প্রতিটি লাইন শুধু মেহেভীনের জন্যে ছিলো।

তুমি আছো মনের গহীনে পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here