তোমার মুগ্ধতায় পর্ব ২৯
অহনা আক্তার
সেই দুপুরের পর থেকে ফাইজা মুসকানের ঘরে এসে তার সাথে কথায় মজে আছে । এখন প্রায় সন্ধ্যে হওয়ার কাছাকাছি। মুসকান ফাইজাকে বুঝাতে চাইছে রিশাদ কেমন ছেলে কিন্তু ফাইজা বুঝতে চাইছে না। তার মতে রিশাদ ভালো হয়ে গেছে। আর এটা নিয়েই ননদ ভাবির মধ্যে সামান্য কথা কাটাকাটি চলছে..
— না ভাবি রিশাদ সত্যিই এখন আগের মতো নেই বিশ্বাস করো!
— আমি কিভাবে বিশ্বাস করবো ফাইজা? রিশাদ ভাইয়া আমার সাথে যে আচরণ গুলো করেছে তার থেকে আমি কেন কেউই বিশ্বাস করতে পারবে না উনাকে। আর ফুপিমণির কথাতো তুমি নিজে শুনেছো। আমার জন্য রিশাদ ভাইয়া ফুপিমণির সাথে কি কি করেছে তাও শুনেছো। এরপরও তুমি রিশাদ ভাইয়াকে কি করে নিজের মন দিতে পারলে?
— তোমার ধারণা ভুল ভাবি। রিশাদ তোমার সাথে ওইরকম আচরণ করার পিছনে কারণ ছিলো। রিশাদ তোমাকে পছন্দ করতো এও সত্যিই। তোমাকে পাওয়ার জন্যই এসব করেছিল। রিশাদ ওর ফ্রেন্ডদের থেকে ইন্সপায়ার হয়ে এমনটা করেছে। রিশাদের ফ্রেন্ডরা এভাবেই মেয়েদের পটাতো তাদের সাথে ফ্লাট করতো। সে ভেবেছিল তোমার সাথে এসব করলে তোমারও ওকে ভালো লাগবে। রিশাদের ফ্রেন্ড গ্রুপটা একদম ভালো না ভাবি। খুব বা*জে। ওহ ওদের সাথে মিশেই এরকম হয়েছে। আমার কথায় রিশাদ এখন আর ওর ওইসব বন্ধুদের সাথে মিশেনা। নে*শা করাও কমিয়ে দিয়েছে। ধরতে গেলে ছেড়েই দিয়েছে। এমন টুকটাক নে*শা, আড্ডা, মা*স্তিতো বড়লোকের ছেলেরাও করে তাই না বলো?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
— এইরকম লজিক ছাড়া কথায় কোনো লাভ হবে না ফাইজা। রিশাদ ভাইয়া তোমাকে যা বুঝাচ্ছে তুমি অন্ধের মতো তাই গি’লে যাচ্ছ। আমার বারণ শুনো,, দুনিয়াতে সাবচাইতে কঠিন হচ্ছে মানুষ চেনা! রিশাদ ভাইয়ার মতো ছেলে কখনোই ভালো হতে পারে না। যেই ছেলে নিজের মায়ের সাথে এমন আচরণ করতে পারে সেই ছেলে আর যাইহোক এতো সহজে ভালো হবে না।
— ভালোবাসা সব পারে ভাবি। ভালোবাসাই পারে একজন মানুষকে পুরোপুরি বদলে দিতে। ভালোবেসে যদি একটা প্রাণীকেও বশে আনা যায় তাহলে রিশাদতো সুস্থ মস্তিষ্কের রক্তেমাংসে গড়া একজন মানুষ। সে কেন পরিবর্তন হতে পারবে না? রিশাদ তোমাকে ভুলে আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে ভাবি। আমার জন্য নিজেকে পরিবর্তন করছে। তুমি কেন বিশ্বাস করতে চাইছো না? ফুপিমণির সাথে ওই ব্যবহার গুলো করে রিশাদ এখনো অনুতপ্ত। তুমি দেখোনি সে কতবার ফুপিমণির কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছে। তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। সারারাত আমাদের বাড়ির রাস্তায় অপেক্ষা করেছে। মাকে ভালো না বাসলে সে এইরকম কেন করবে?নে*শার ঘোরে কতোকেউ ইতো কত কথা বলে। নে*শা কেটে গেলে বুঝতে পারে। রিশাদের সাথেও এইরকমই হয়েছে ভাবি। সে এখন ফুপিমণির জন্য কাঁদে। কাছের মানুষ চলে গেলেই মানুষ তার মূল্য বুঝতে পারে। ফুপিমণি চলে যাওয়ার পর রিশাদ বুঝেছে সে তার মাকে কতোটা ভালোবাসে। ওইদিন ফারিশ ভাইয়ার কথাগুলোও রিশাদকে অনেকটা নাড়িয়ে দিয়েছে। সে প্রতিনিয়ত ফুপিমণির সাথে বা*জে ব্যবহারের জন্য নিজেকে কষ্ট দিচ্ছে। বাড়িতে ঠিক মতো থাকছে না, ঘুমাচ্ছে না,খাচ্ছে না। আমি রিশাদের ভিতরটা দেখেই ওর প্রেমে পরেছি ভাবি। রিশাদ উপর দিয়ে যেমনই হোক। ওর ভিতর টা খুব নরম। ‘
মুসকান তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বলে,
— তোমার কথা গুলো শুনে আমারও খুব ইচ্ছে করছে রিশাদ ভাইয়াকে বিশ্বাস করতে। উনি সত্যিই পরিবর্তন হয়েছেন সেটা বিশ্বাস করতে। কিন্তু আমি পারছি না ফাইজা। আমার মন মানছে না । এভাবে একটা মানুষ কে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা ঠিক না। রিশাদ ভাইয়ার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করো তুমি। তোমার বাবা,মা,ভাইয়া কখনো তোমাকে রিশাদ ভাইয়ার সাথে মেনে নিবে না।
ফাইজার বুকটা কেঁপে উঠে,,,
— কেন ভাবি? এভাবে বলছো কেন? আমরা কি একজন মানুষ কে ভালো হওয়ার সুযোগ দিতে পারিনা? আর তাছাড়াও আমিতো এখনই রিশাদকে বিয়ে করতে চাচ্ছি না। আমাদের সম্পর্ক টা এভাবেই চলতে থাকুক না। রিশাদের পরিবর্তন টা আস্তে আস্তে বাবা, মা, ফারিশ ভাইয়া সকলের চোখে পরুক। যখন সকলের চোখে রিশাদ কে আসলেই অন্যরকম মনে হবে তখন নাহয় আমাদের সম্পর্কের কথা সবাই জানবে। ততোদিন পর্যন্ত রিশাদ নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করুক। আমাকে বিয়ে করার মতো পরিস্থিতি গড়ে তুলোক। আমি রিশাদকে বলেছি আমি তার জন্য অপেক্ষা করবো। তাছাড়াও ভাইয়া এতো জলদি আমার বিয়ে কখনোই দিবে না। তোমার কাছে আমার একটাই রিকুয়েষ্ট ভাবি… (আচমকা মুসকানের দু’হাত চেপে ধরে ফাইজা) প্লিজ তুমি আমার আর রিশাদের সম্পর্কের কথাটা কাউকে বলো না। প্লিজ ভাবি প্লিজ। রিশাদ যতদিন পর্যন্ত সকলের কাছে নিজেকে আদর্শবান পুরুষ হিসেবে দেখাতে না পারছে ততোদিন পর্যন্ত তুমি কাউকে কিছু বলো না। রিশাদ এখন চাকরি খোঁজছে। বিভিন্ন অফিসে চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছে। ওকে আমি ভালো হওয়ার সুযোগ দিচ্ছি। তুমি দয়াকরে আমার এই আবদার টা রাখো ভাবি। আর কখনো তোমার কাছে কিছু চাইবো না..
মুসকান খাটে বসা ছিলো। ফাইজার থেকে নিজের হাত দুটো সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হেল্পলেস স্বরে বলল,
— আমি কিভাবে এতোবড় একটা কথা সকলের কাছ থেকে লুকিয়ে যাবো ফাইজা? তোমার ভাই জানতে পারলে আমাকে আস্ত রাখবে না।
— ভাইয়া কেন জানবে ভাবি? তুমি না বললে তো জানতে পারবে না। প্লিজ তুমি ভাইয়াকে এখন কিছু বলো না। আমি সাবধান থাকবো। আমাকে এইটুকু সাহায্য করো। তুমিতো আমার ভাবি কম, বন্ধু বেশি। আমার বন্ধু হয়ে এইটুকু করো। আমি তোমার পায়ে পরছি।
ফাইজা মুসকানের পা ছুঁতে গেলে মুসকান দ্রুত তাকে বাঁধা দেয়। ঘাবড়ানো স্বরে বলে,
— ঠি..ঠিক আছে ঠিক আছে। বলবো না আমি কাউকে। পায়ে পরতে হবে না উঠো।
ফাইজার ঠোঁটে বিশ্ব জয়ের হাসি ফুটে। সে খুশিতে বাকবাকম হয়ে মুসকানকে জড়িয়ে ধরতে গেলে মুসকান বলে উঠে,
— কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।
ফাইজার খুশি খুশি মুখটা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায়,
— কি শর্ত ভাবি?
— আমি রিশাদ ভাইয়ার সাথে একবার দেখা করতে চাই। উনার সাথে কথা বলতে চাই। তোমাকে আমায় রিশাদ ভাইয়ার সাথে দেখা করার সুযোগ করে দিতে হবে। আমি উনার সাথে কথা বলেই তোমার রিকুয়েষ্ট মানব এর আগে না।
— আচ্ছা ঠিক আছে ভাবি। তুমি হচ্ছো দুনিয়ার বেস্ট, বেস্ট, বেস্ট ভাবি। (উৎফুল্ল হয়ে)
ফাইজার খুশিতে মুসকানও স্মিত হাসে। তার মাথায় দুশ্চিন্তা বাসা বেঁধেছে। রিশাদ ভাইয়া কি সত্যিই এতোটা ভালো হয়ে গেছে নাকি এইসব কিছুই তার অভিনয়।
বাবার উপর একদফা চেচামেচি করে সোফায় বসে বড় বড় নিশ্বাস ফেলছে রিশাদ। রিতাও এককোনায় গুটিয়ে বসে আছে। তার ভাই আর পাঁচ মিনিট দেরি করে আসলেই বাবা তার বিয়েটা ওই বুড়ো লোকটার সাথে দিয়ে দিতো! ভাবতেই শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে রিতার। তার বাবা এতোটা দয়াহীন কেন? সে কতো কাঁদল, মিনতি করল, পা জড়িয়ে ধরল তাও মায়া হলো না!
নিজের বাড়ির ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ছেলেকে ধমকাচ্ছে মোকলেস। এই ছেলের জন্য আজ এতোগুলো টাকা, সম্পতি সব কিছু হাত ছাড়া হয়ে গেলো। মেজাজ এখন তার আকাশ তুম্বি।
রিশাদ বাবার চেঁচামেচির পরোয়া করছে না। তার মাথায় এখনো আ*গুন জ্বলছে। সে ওই টাক মাথার ভুঁড়ি ওলা লোকটাকে আরো দু’চার ঘা দিতে পারলে শান্তি পেত। কতো বড় সাহস। দুই পা কবরে চলে গেছে এইবয়সে এসেছে তার বোনকে বিয়ে করতে। বিয়ে করার সখ সারাজীবনের জন্য গুজিয়ে দিত যদি না তার বাবা বাঁধা দিত। এবারতো শুধু মাথা ফাটিয়েছে পরের বার দেখা হলে ওই মাথাই আর রাখবে না ।
— তুই আমার কাজে বাঁধা দিয়েছিস কোন সাহসে? তোকে সবকিছু কে জানিয়েছে? চুপ করে আছিস কেন বল কে জানিয়েছে তোকে? (ক্ষিপ্ত গলায়)
— কে জানিয়েছে সেটা বড় কথা নয়। তুমি রিতার বিয়ে ওইরকম একটা লোকের সাথে কি করে ঠিক করতে পারলে? করেছো তো করেছো আবার কাউকে জানাও নি? আমাকেও না !!
— আমার মেয়ের বিয়ে আমি যার সাথে খুশি তার সাথে ঠিক করবো। তোকে বলবো কেন?
— তোমার মেয়ে বলেই তুমি তোমার জোর ওর উপর চালিয়ে দিতে পারো না। আমি রিতার ভাই আমারও অধিকার আছে জানার।
— আমাকে তোর গায়ে হাত তুলতে বাধ্য করিস না রিশাদ। তোর জন্য আমার এতোগুলো টাকা লস হয়ে গেল।
— নিজের মেয়ের থেকে তোমার কাছে টাকা বড় হলো? কেমন বাবা তুমি?
–” রিশাদ ”
ঠিক সেই মুহূর্তে শ্বশুর বাড়ির সদর দরজা দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলো জিন্নাত। মাকে দেখে রিতা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে এতোক্ষণে চাপিয়ে রাখা কান্না হাউমাউ করে মায়ের কাছে উগরে দিল রিতা। মাকে চেপে জোরে জোরে কাঁদছে সে। এতোগুলোদিন বাদে মেয়েকে দেখে জিন্নাতেরও চোখ ভরে অশ্রুর দেখা মিলল। এইসব খবর চাপা থাকে না। শ্বশুর বাড়ির এক প্রতিবেশী ভাবির ফোন পেয়ে সব জানতে পারে জিন্নাত। আর জানা মাত্রই মেজো ভাই জামিলকে নিয়ে ছুটে শ্বশুর বাড়িতে আসে। বাড়ির বাইরেও তাদের বাবা ছেলের চেঁচামেচিতে অনেক মানুষের ভিড় জমে গেছে। এতোগুলো দিন বাদে মাকে বাড়ি আসতে দেখে রিশাদের বুকে প্রশান্তির হাওয়া ভয়ে যায়। খুশিতে চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। মানছে সে বেপরোয়া চলা চলে। লোকে তাকে বা*জে বলে। তাই বলে সে টাকার বিনিময়ে নিজের বোনকে বিক্রি করে দিবে! অসম্ভব! সে যত খা’রাপই হোক না কেন মা আর বোনকে খুব ভালোবাসে। হ্যা তার বাবা তার মাকে গা’লা’গা’লি করার সময় সে প্রতিবাদ করেনি কিন্তু সেতো তখন মা’তাল ছিলো। অন্যসময়ও যখন তার বাবা তার মায়ের গায়ে হাত তুলতো তখনো অগোচরে। বাবার প্রতি অন্ধভক্ত ছিলো সে যার জন্য মায়ের কষ্টটা বুঝতে পারেনি। এখন বুঝে। এখন তার মধ্যে মনুষ্যত্ব ফিরে এসেছে। আজ সে কোনো ভাবেই তার মা কে যেতে দিবে না। দরকার পড়লে মার পায়ে পড়ে থাকবে। মাকে সবসময় রক্ষা করবে। তবু্ও মাকে চলে যেতে দিবে না।
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে, তার চোখের পানি মুছে দিয়ে, মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে মেয়েকে শান্ত করে জিন্নাত। মোকলেসের দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে,
— মানুষ নিকৃষ্ট হয় জানতাম কিন্তু কোনো বাবা নিকৃষ্ট হয় তা জানতাম না। আজ তোমাকে দেখে বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম। সব বাবা এক হয় না। কিছু কিছু বাবা টাকার লোভে মানুষ থেকে অ*মানুষও হয়। ছিঃ এতো টাকার লোভ তোমার? টাকার লোভে নিজের মেয়েকে একটা বয়স্ক লোকের সাথে বিয়ে দিতে যাচ্ছিলে। যেই লোকের কিনা তোমার মেয়ের থেকেও বয়সে বড় একটা মেয়ে আছে! লজ্জা করলো না নিজের মেয়ের সাথে এমন জ’ঘন্য একটা কাজ করতে। বাবা নামের ক*লঙ্ক তুমি….
–‘ জিন্নাত ‘ মোকলেস ক্ষেপে স্ত্রীকে ধমক দিল।
বোনকে নিজের চোখের সামনে এভাবে ধমক দিতে দেখে জামিল ক্ষেপে গেলো। সে মোকলেসের থেকেও তিনগুণ জোরে আওয়াজ নিক্ষেপ করল,
— গলা নামিয়ে। আমাদের অগোচরে আমার বোনের সাথে অনেক বা*জে ব্যবহার করেছিস আমাদের সামনে করলে জ্যা’ন্ত রাখবো না। তোর বাড়িতেই তোকে পুঁ’তে যাব।
দমে গেলো মোকলেস। কিন্তু মনে মনে রাগে ফুঁসছে। এখন কারো সাথে পারবে না এটা বুঝে গেছে। তাই নিরবেই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। ব্যবসার চিন্তায় মাথা নষ্ট তার।
— চল আমার সাথে। তোর আর এই বাড়িতে থাকতে হবে না। রিতাকে কথাটা বলে তার হাত ধরে টেনে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল জিন্নাত। যা দেখে ছুটে এসে মায়ের পথ আটকে দাঁড়াল রিশাদ।
অসহায় কণ্ঠে বলল,
— যেও না মা প্লিজ…..
জিন্নাতের মায়ের মন নাড়া দিয়ে উঠে। ইসস ছেলেটা কি অবস্থা করেছে নিজের। কতোটা শুকিয়ে গেছে। যতই হোক মা তো। সন্তানের কষ্টেতো মায়েরই পুড়ায় বেশি। রিশাদের চোখ লাল। গলার স্বর করুন,
— তোমায় ছাড়া আমরা ভালো নেই মা। বাড়িটা একদম শূন্য লাগে।
জিন্নাত ঠোঁট চেপে কান্না আটকায়। এবার রিশাদের দাদি এগিয়ে আসে জিন্নাতের কাছে,
— থাকো না বউ। পোলামাইয়া গুলার দিকে তাকানো যায় না। মা ছাড়া কি সংসারে শান্তি আছে। তুমি চইলা যাওয়ার পর থেকে বাড়িটা কেমন ম’রা ম’রা হইয়া গেছে।
জিন্নাত ভেজা গলায় বলল,
— আমি কি করে থাকবো আম্মা। আপনার নাতিতো আমায় ঘৃ*ণা করে। কথাটা বলতেই চোখ ঝরে পানি পরে জিন্নাতের।
হঠাৎ রিশাদ তার মায়ের পা জড়িয়ে বসে পরে। কান্না মিশ্রিত ভাঙা গলায় বলতে লাগে,
— ক্ষমা করে দাও মা। আর কোনোদিন তোমাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলবো না। শেষ বারের মতো ক্ষমা করে দাও। তোমায় ছাড়া ভালো নেই আমরা।
আই লাভ ইউ মা। তোমায় অসম্ভব ভালোবাসি। ওই কথাটা মন থেকে বলিনি আমি। ক্ষমা করে দাও। প্লিজ ক্ষমা করে দাও।
রিশাদের টুপটাপ চোখের পানি জিন্নাতের পায়ে পরছে। জিন্নাত আর নিজেকে কঠোর রাখতে পারলো না। ছেলের সামনে হাটু ভেঙে বসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো। মা, ছেলে দু’জনেই কাঁদছে।
বেশ অনেকক্ষণ সময় ব্যয় হওয়ার পর জামিল কথা বলল,
— বাড়ি চল জিন্নাত। রিতাকেও নিয়ে চল। ওকেও এখানে রাখা ঠিক হবে না।
মামার দিকে করুন চোখে তাকায় রিশাদ। অনুরোধের স্বরে বলে,
— মাকে নিয়ে যাবেন না মামু।
জমিলের গুরুগম্ভীর স্বর,
— আমি আমার বোনকে তোর বাবার মতো একটা প*শুর কাছে রেখে যেতে পারবো না।
— আমি থাকতে মায়ের কিছু হবে না। আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে। মা এখানে সেইফ থাকবে।
— আমি তোকে বিশ্বাস করি না। জিন্নাত আয়.. (জিন্নাতকে উদ্দেশ্য করে )
রিশাদ মায়ের হাত চেপে ধরে,
— প্লিজ মা যেওনা। আমাকে লাস্ট একটা সুযোগ দিয়ে দেখো। প্রমিজ করছি বাবাকে কখনো তোমার গায়ে হাত তুলতে দিবো না।
জিন্নাত আলতো করে নিজের হাত ছেলের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয়। জামিলের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
— আমি আমার ছেলেমেয়েদের সাথে থাকতে চাইছি ভাই। ওদের আমার প্রয়োজন। তুমি একাই ফিরে যাও।
জিন্নাতের সিদ্ধান্তে রিশাদ সহ তার পরিবারের সকলের ঠোঁটে আনন্দের হাসি ফুটে উঠে।
জামিল চিন্তিত স্বরে বলে,
— কিন্তু মোকলেস যদি তোর সাথে আবার কোনো….
ভাইকে বাকি কথাটা শেষ করতে দেয় না জিন্নাত। তার আগেই বলে উঠে,,
— আমার ছেলে আমার কিছু হতে দিবে না ভাই। কেন যেন ওর উপর বিশ্বাস রাখতে ইচ্ছে করছে।
মায়ের কথায় প্রশান্তিতে বুক ভরে উঠে রিশাদের। চোখে খুশিদের আনাগোনা।
জামিল বলল,
তোমার মুগ্ধতায় পর্ব ২৮
— ঠিক আছে। তোর সংসার তোর মর্জি। থাকতে চাইছিস থাক। কিন্তু আমিও বলে রাখছি এরপর যদি ওরা তোর গায়ে হাত তুলে বা তোর উপর কোনোরকম অমানবিক আচরণ করার চেষ্টা করে আমি কিন্তু ওদের কাউকে ছাঁড়বো না।
— এমন আর সত্যিই হবে না মামু। আমি ওয়াদা করছি আপনাকে।
ওয়াদা যখন করছিস পালন করার চেষ্টা করিস। এই শেষবার। জামিল চলে গেলো। জিন্নাত থেকে গেলো শ্বশুর বাড়ি…
