Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ১৫

দাহশয্যা পর্ব ১৫

দাহশয্যা পর্ব ১৫
Raiha Zubair Ripti

গুলশান ২ এর ল্যাবএইড হাসপাতালের এক বিলাসবহুল কেবিনে শুয়ে আছে এজওয়ান। পেটের এক পাশ টা এখনও মারাত্মক রকমের ব্যথা। ডক্টর ব্যন্ডেজ করে দিয়েছে। পাশেই বাহাদুর দাঁড়িয়ে আছে। এজওয়ান আশেপাশ তাকিয়ে দেখতে লাগলো। সেটা দেখে বাহাদুর বলল-

-” কিছু খুঁজছিস?
এজওয়ান ব্যথা শরীর নিয়ে আধশোয়া হয়ে বলল-
-” ঐ মাইয়া কই?
বাহাদুর আশেপাশে তাকিয়ে বলল-
-” কোন মাইয়া?
-” যারে বাঁচাইতে গিয়ে আমি মরার কবলে পড়ছিলাম।
-” আমি তো হসপিটালে এসে কোনো মেয়ে কে দেখি নাই।
-” তাহলে তুই খবর পাইলি কিভাবে যে আমি হসপিটালে? ঐ মেয়েই তো ধরে নিয়ে আসলো আমায়।
-” আমাকে তো হসপিটাল থেকে ফোন করে জানানো হয়েছে তুই হসপিটালে।
-” কে ফোন করেছিলো?
-” রিসিপশন থেকে।
-” নম্বর পেলো কিভাবে তোর?
-” জানি না। বোধহয় ঐ মেয়ে তোর ফোন থেকে পেয়েছে। আমি কয়েক বার ফোন দিয়েছিলাম তোর ফোনে। রিসিভ হয় নি।
-” ওহ্। কিন্তু ঐ ম্যানারলেস মেয়েটা কি করে আমার সাথে দেখা না করেই চলে যেত পারলো? ওর জন্য আমার শরীরের র’ক্ত ঝরছে।
-” হয়তো ইমার্জেন্সি এসেছিলো সেজন্য চলে যেতে হয়েছে। আর তুই ঐ মেয়ে নিয়ে পড়লি কেনো? কি হয়েছিল যার কারনে তোর এমন অবস্থা হলো।
এজওয়ান শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই বাহাদুর বাঁধা দিয়ে বলল-

-” কি করছিস। উঠছিস কেনো? ব্যান্ডেস লাগানো হয়েছে ২ ঘন্টাও হয় নি।
-” এই বা’লের সামান্য আঘাতে আমার কিছু হবে না। তুই ভাইজান রে আবার গলগল করে খবর দিয়ে জানাস নি তো?
-” না।
-” গুড।
-” এখন তো বল কি হয়েছিল?
-” আগে বল শালা তুই কই ছিলি? গাড়ির চাবি নিয়ে ম’রতে গেছিলি?
-” আমি তো ক্লাবেই ছিলাম।
-” ক্লাবের কোন চিপায় ছিলি? তুই শালা চাবি না নিয়ে গেলে আমি তো তখনই চলে যেতাম। তাহলে তো আর এই অবস্থা হতো না।
-” এখন দোষ আমার?
-” তোর না তো কার?
-” তোকে কে বলেছিল ঝামেলায় জড়াতে?
এজওয়ান বিরক্ত হয়ে বলল-

-” আমার সামনে দিয়ে এক আগুন সুন্দরী কে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। হিংসা হচ্ছিলো সেজন্য ঝামেলায় জড়িয়েছি নিজের জীবন বাজি রেখে। আর সর সামনে থেকে। কতক্ষণ ধরে বা’লের বেডে শোয়ায় রাখছে। পিঠের মেরুদণ্ড জম ধরে গেলো মনে হয়।
এজওয়ান উঠে দাঁড়ালো। বেডের পাশ থেকে শার্ট টা তুলে নিলো। দেখলো শার্ট টা ছেড়া,রক্ত দিয়ে ভরা। এজওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলে বাহাদুর কে ডেকে বলল-
-” এ্যাই তোর শার্ট খোল।
বাহাদুর প্রথমে বুঝলো না।
-” আমি শার্ট খুলবো কেনো?
-” খুলতে বলছি খোল। আই নিড ইউর শার্ট।
বাহাদুর পড়নের শার্ট টা খুলে এজওয়ানের হাতে ধরিয়ে দিলো। এজওয়ান শার্ট টা পড়ার সময় হাত শার্টে ঢোকাতে গিয়ে ব্যথায় মৃদু আহ্ সূচক শব্দ উচ্চারণ করলো। বাহাদুর এসে সাহায্য করতে চাইলে এজওয়ান বাহাদুরের সাহায্য গ্রহন করলো না। নিজেই শার্ট টা পড়ে বলল-

-” তোকে যে একটা কাজ দিয়েছিলাম আমি।
-” কি কাজ?
-” মনে নেই?
-” না তো।
-” তোর মন কই থাকে তাহলে? তোর মন রে কিন্তু কুটি কুটি করে কেটে কু’ত্তারে খাওয়াবো বলে রাখলাম।
-” এতো চেততেছিস কেনো?
-” আমার ঐ মেয়ের ঠিকানা থেকে শুরু করে সব মানে সব ইনফরমেশন চাই। তুই এখনই খোঁজ লাগাবি। আর দিনের আলো ফোঁটার আগেই নিয়ে আসবি সব ইনফরমেশন।
বাহাদুর রাগ দেখিয়ে বলল-
-” আমারে তুমি চাকর পাইছো তাই না? বন্ধুর খোঁজ খবর ইনফরমেশন তো জীবনে কালেক্ট করলা না। কোথাকার না কোথাকার কোন মেয়ে তারজন্য এত উত্তেজনা! আমি কিভাবে জানবো তুই কোন মেয়েকে দেখছিস,কোন মেয়ে তোকে বাঁচিয়েছে।
এজওয়ান কেবিন থেকে বের হতে হতে বলল-

-” মাথার ব্রেণ কি পাছার তলে চলে গেছে নাকি? রিসিপশনে যা আর খোঁজ নে। কিছু না কিছু রেখে গেছে।
-” ঐ মাইয়ার খোঁজ এনে দেওয়ার পর কি করতে চাস ওর লগে?
-” শো-পিস বানিয়ে ঘরে সাজিয়ে রাখবো তোর কোনো সমস্যা? আমার শরীরের রক্তের বহুত মূল্য। বকবক না করে খোঁজ লাগা কে এই মেয়ে।
-” ঠিক আছে। এখন তুই কোথায় যাবি? বাসায়?
-” হুমম।
-” সোলেমান ভাই তোর এমন অবস্থা দেখলে…
-” দেখবে না। শার্ট পড়া শরীরে দেখছ না অন্ধ?
-” আমি তাহলে এখন কিভাবে বের হবো কেবিন থেকে?
-” কেনো? কোলে নিয়ে বের করার ব্যবস্থা করতে হবে?
-” আমার শার্ট তো তুই পড়ে নিলি।
-” হসপিটালের পেশেন্টের পোশাক পড়ে বের হ। টাটা আমি গেলাম।

এজওয়ান চলে গেলো। বাহাদুর আশেপাশে তাকালো। এই ছেলে এমন কেনো? শুধু নিজের টা বুঝে। নিজে তো ফিটফাট হয়ে চলে গেলো বাহাদুরের মানসম্মান সাথে নিয়ে। রেখে গেলো উদাম শরীরে সমেত বাহাদুর কে। বাহাদুর কেবিনে থাকা এক ডেস্কের উপর পেশেন্ট দের পোশাক দেখে সেটা থেকে উপরের জামা টা নিয়ে পড়ে বের হলো। প্রথমে রিসিপশনে গেলো। গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” এক্সকিউজ মি,,এজওয়ান সুলতান কে যে এডমিট করিয়েছিল তার কোনো নাম ঠিকানা দিয়ে গেছে?
-” চেক করে দেখতে হবে।
-” কাইন্ডলি দেখুন।
রিসিপশনে থাকা মেয়েটা খাতা বের করে দেখলো। হ্যাঁ নাম দিয়ে গেছে।
-” নাম দেওয়া আছে।
-” কি নাম?
-” নূর জাহান।
-” এড্রেস?
-” ধানমন্ডি ৩২।
-” আপনাদের সিসিটিভি টা চেক করা যাবে?
-” কি জন্য দরকার?
-” যেই মেয়েটা এজওয়ান সুলতান কে হসপিটালে নিয়ে এসেছিল তাকে খোঁজা জরুরী। আপনি বাদ দিন,,হসপিটালের ওনার কে?

-” মোস্তাফিজুর।
-” তার ফোন নম্বর পাবো কোথায়?
-” আমার কাছে আছে। তবে স্যারের পারমিশন নিতে হবে।
-” হুমম বলুন বাশার সুলতান চেয়েছে নম্বর।
মেয়েটা ফোন দিয়ে পারমিশন নিয়ে নম্বর টা দিলো বাহাদুর কে। বাহাদুর নম্বর টা নিয়ে মোস্তাফিজুর কে ফোন দিয়ে তার পরিচয় দিয়ে বলল সিসিটিভি টা চেক করতে চায়। পারমিশন দিলেন। বাহাদুর সিসিটিভি চেক করলো। ব্লাক জিন্স, জ্যাকেট পড়া মেয়ে নূর জাহান এজওয়ান কে নিয়ে আসছে হসপিটালে ধরে। বাহাদুর সেটার কপি নিয়ে রাখলো। মেয়েটার ফেস দরকার ছিলো। যা পাওয়া শেষ। বাহাদুর চলে গেলো হসপিটাল থেকে।
এজওয়ান বাড়িতে এসে সোজা নিজের রুমে চলে গেছে। এখন বাড়িতে এজওয়ান,সোলেমান আর ম্যেডরা। এজওয়ান ভেবেছে সোলেমান বোধহয় ঘুমিয়েছে। কিন্তু সোলেমান ঘুমায় নি। রুমের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলো। এজওয়ান কে সে দেখেছে। কিন্তু এজওয়ান সেটা দেখে নি। সোলেমানের কপালে বিরক্তির দু ভাজ পড়ে আছে। তার দলের লোকেরাই আজকাল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। সোলেমান ফোন কেটে বিছানায় আসলো।
সকালের আলো ফুটতেই বাহাদুর আসলো সুলতান নিবাসে। এজওয়ান তখন ঘুমাচ্ছিলো। বাহাদুরের ডাকে তার ঘুম ভাঙে। বিরক্ত হয়ে বলে-

-” ডাকছিস কেনো? তোর বউ মরছে?
-” মেয়েটার খোঁজ পেয়েছি।
সাথে সাথে চোখ মেলে তাকালো এজওয়ান।
-” নাম কি?
-” নূর জাহান।
-” বাড়ি?
-” ধানমন্ডি ৩২।
-” কোন বাড়ির মেয়ে?
-” তরিকুল চৌধুরীর মেয়ে।
নাম টা শুনেই কিছুটা চমকে উঠলো।
-” তরিকুলের মেয়ে!
-” হুমম।
-” ওর না এক ছেলে শুধু?
-” না দুই মেয়ে এক ছেলে।
-” দুই মেয়ে আবার কোথা থেকে টপকালো? কই আগে তো শুনি নি এমন কিছু।
-” তা বলতে পারবো না।
-” গাড়ি বের কর। তরিকুলের মাইয়ারে দেখতে যাব।
বাহাদুর গাড়ি বের করলো। এজওয়ান ফ্রেশ হয়ে জামা চেঞ্জ করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। সোলেমান ব্রেকফাস্ট করছিলো। এজওয়ান কে দেখে ডেকে বলল-

-” কোথায় যাচ্ছিস?
-” এই তো ভাইয়া একটু বাহিরে যাচ্ছি।
-” ব্রেক ফাস্ট করবি না?
-” বাহিরে করে নিব। বাবা আসবে কবে?
-” আজ।
-” ভাবি কে আনবে কবে?
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো।
-” ভাবি কে আনবো কেনো?
-” সেকি তাকে আনবে না?
-” না।
এজওয়ান আর কথা বাড়ালো না চলে গেলো। ধানমন্ডি ৩২ এ এসে কাঙ্ক্ষিত সেই বাড়িতে আসলো বাড়িটা বেশ ভালোই বড়। দোতলা বাড়ি,বাড়ির সামনে বাগান। বাড়ির ভিতরে ঢুকতে গেলে সিকিউরিটি আঁটকে দেয়। এজওয়ান পরিচয় দেয় সে তরিকুল চৌধুরীরর পরিচিত। সিকিউরিটি ঢুকতে দিলো। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলো। বাড়ির বসার ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছে এক ৫৫ বছরের পুরুষ। এজওয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে বলল-

-” হ্যালো মিস্টার তরিকুল চৌধুরী।
তরিকুল চৌধুরী মুখের সামনে থেকে খবরের কাগজ টা সরালেন। সামনে অপরিচিত দুটো মুখ দেখে অবাক হলেন।
-” কে আপনারা?
এজওয়ান সোফায় গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বলল-
-” আপনার পরিচিত কেউ। তা ভালো আছেন? আজ প্রথম সামনা-সামনি দেখলাম আপনায়। আগে যদি জানতাম আপনার একটা আগুন সুন্দরী মেয়ে আছে তাহলে ট্রাস্ট মি অনেক আগেই চলে আসতাম আপনার বাড়ি।
তরিকুল চৌধুরী কিছুই বুঝলো না এজওয়ানের কথা।
-” কিসব বলছেন এসে থেকে। কারা আপনারা?
-” আগে কফির ব্যবস্থা তো করেন। তারপর পরিচয় দিচ্ছি।
-” আপনাদের ঢুকতে দিলো কে বাসার ভিতরে?
-” আপনার সিকিউরিটি গার্ড৷ এখন বকবক না করে আপ্যায়ন করুন তো।
তরিকুল চৌধুরী বুয়া কে ডেকে কফি দিয়ে যেতে বলল। বুয়া কফি বানিয়ে আনলে এজওয়ান আয়েশ করে খেয়ে বলল-

-” আপনার মেয়ে কোথায়।
-” কোন মেয়ে? আর আপনারা পরিচয় কেনো দিচ্ছেন না?
-” বাশার সুলতান কে চিনেন?
নাম টা শুনে তরিকুল চৌধুরী কিছুটা জমে গেলো।
-” ক…কেনো বলুন তো? আপনারা কারা?
-” কি এসে থেকেই আপনারা কারা,আপনাদের পরিচয় কি এই বা’লের প্যাঁচালই বকে যাচ্ছেন কেনো। আমি বাশার সুলতানের ছেলে। এখন চিনেছেন?
তরিকুল চৌধুরীর চোখ বড়বড় হয়ে গেলো। বাশার সুলতানের ছেলে এই ছেলেটা! আর এই ছেলে দেশে আসলো কবে! আজ প্রথম দেখছে সে এজওয়ান সুলতান কে। আগে শুধু নামই শুনেছে।

-” আপনি আমার বাসায় যে।
-” আমি আপনার মেয়ের জামাই হইতে আসি নাই। ডোন্ট ওয়ারি৷ জাস্ট ডেকে দিন আপনার মেয়েকে।
-” কোন মেয়েকে?
-” নূর জাহান কোনটার নাম?
-” ছোট মেয়ের নাম।
-” তাকেই ডাকুন।
-” কিন্তু ও তো বাসায় নেই।
-” কোথায় গেছে?
-” জানি না।
-” কেমন বাবা আপনি মেয়ে কোথায় তা জানেন না।
-” আমার মেয়েকে কি দরকার?
-” আপনার মেয়ের জন্য আমার অনেক বড় একটা লস হয়েছে। এজওয়ান শার্ট টা উঁচু করে দেখিয়ে বলল-“ এই যে দেখুন কি করেছে।
তরিকুল চৌধুরী দেখলেন পেটের সাইড টা ব্যান্ডেজ করা।

-” নূরজাহান করেছে এমনটা?
-” না৷ আপনার মেয়ে কিডন্যাপ হতে যাচ্ছিলো৷ তাকে বাঁচাতে গিয়ে এই অবস্থা আমার। আপনার মেয়েকে ফোন দিয়ে বাসায় আসতে বলুন।
-” ওর ফোন নম্বর নেই আমার কাছে।
-” কিহ! মেয়ের ফোন নম্বর নেই! মশকরা করছেন! বাঁচাতে চাইছেন নাকি মেয়েকে? দেখুন নজর কিন্তু দিয়ে ফেলছি।
-” সত্যি নেই।
-” বাসায় আসবে কখন তাহলে?
-” যখন মন চায় তখন আসে।
-” নেশাটেশা করে নাকি আপনার মেয়ে?
-” না।
-” তাহলে মেয়ের খোঁজ রাখেন না কেনো?

-” এটা আমাদের পারিবারিক ব্যপার। এসব জেনে আপনার কাজ কি?
-” আপনার বড় মেয়ে কি করে?
-” ওর শ্বশুর বাড়িতে থাকে।
-” ওহ্ বিয়ে হয়ে গেছে নাকি?
-” হ্যাঁ।
-” এর স্বামী কে?
-” শাকিল।
নামটা শুনে এজওয়ান কিছু একটা ভেবে বলল-
-” এলএম কোম্পানির মালিক শাকিল সে?
-” হুমম।
-” নাইস,,সব গরু এক গোয়ালেরই দেখছি।
-” মানে?
-” নাথিং।
-” আপনার মেয়ে আসলে আমাকে ফোন দিবেন। ফোন নম্বর তো নেই তাই না? বাহাদুর কার্ড টা দে তো তাকে।
বাহাদুর এজওয়ানের কার্ড টা তরিকুল কে দিয়ে চলে আসলো। গাড়িতে উঠে বসলো। কিছুদূর এসেই একটা রেস্টুরেন্টের দেখা মিললল। ক্ষুধাও লাগছে এজওয়ানের। রেস্টুরেন্ট টা দেখে এজওয়ান বলল-

-” ঐ গাড়ি থামা।
বাহাদুর সাইডে গাড়ি থামিয়ে বলল-
-” কি হলো আবার?
-” ক্ষুধা লাগছে। চল আগে পেটরে শান্ত করার ব্যবস্থা করি।
এজওয়ান নেমে হাঁটা ধরলো। পেছন পেছন বাহাদুর ও আসলো। রেস্টুরেন্টের গেটের সামনে যেতেই এজওয়ানের পাশ কাটিয়ে একটা মেয়ে ঝড়ের বেগে পাশ কাটিয়ে একটা ছেলের পেছনে দৌড়ে গেলো। হুট করে এমন হওয়ায় মেয়েটার মুখ ঠিকঠাক দেখতে পায়নি সে। আগ বাড়িয়ে তাকিয়ে দেখে, খানিক দূরে ভীড় জমে গেছে। আর সেই ভীড়ের মাঝে ঘটছে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা,একজন মেয়ে এক ছেলেকে বেধড়ক পিটাচ্ছে। লোকজন জড়ো হলো। এজওয়ানের পাশ দিয়ে আরেক রমণী চলে গেলো। মেয়েটা সম্ভবত প্রেগন্যান্ট। পেট অনেক উঁচু। এজওয়ান এগিয়ে যেতে লাগলো। ভীড় থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করলো কী হচ্ছে আসলে। মেয়েটা যেভাবে মারছে, তাতে MMA ফাইটারও হিংসে করবে। তবে মুখটা এখনো স্পষ্ট দেখতে পায়নি। তাই আরেকটু সামনে এগোতেই, ধাক্কা খেলো একজনের সঙ্গে। মেয়েটা এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-

-” লজ্জা করে না? দেখছেন না আমি প্রেগন্যান্ট? তারপর ও গায়ে…
এজওয়ান রমণী টার দিকে তাকিয়ে সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল-
-” আমি করেছি প্রেগন্যান্ট? লজ্জা করবে কেনো আমার?
-” বেয়াদব ছেলে।
-” আপনি তো সভ্য মেয়ে,এমন পেট নিয়ে এই ভীড়ে কি করছেন? একটা গুঁতা খেলেই তো চিৎ করে পড়ে যাবেন।
-” আমার বোন মারামারি করছে আর আমি আসবো না?
এজওয়ান ভীড়ের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলো। আরেহ্ এ তো নূর জাহান। নূর জাহান মারামারি করছে! হাউ?
বাহাদুর এগিয়ে আসলো। এজওয়ান কে টেনে নিয়ে সাইডে গেলো।
এজওয়ান দূর থেকে দেখলো ছেলেটাকে নূর জাহান ভীড়ের বাহিরে টেনে এনে মারছে আর বলছে-
-” ব্লাডি রাস্কেল তুই আমার বোনের পার্স নিয়ে দৌড় দিস! একদম জানে মেরে রেখে দিব এখানে।
লোকজন ছুটিয়ে নিলো ছেলেটাকে। নূর জাহান কে বলল-

-” এখন ছেড়ে দেন আপু। নাক মুখ দিয়ে র’ক্ত বের হচ্ছে।
নূর জাহানের বোনেও বলল-
-” ছেড়ে দে,মরে যাবে তো।
নূর জাহান ছেড়ে দিলো। বোনের পার্স টা বোনের হাতে দিয়ে বলল-
-” জানে বেঁচে গেলি। ফারদার আমার নজরে তুই আসলে তোকে একদম মেরে রেখে দিব। আল্লাহ হাত পা চোখ দিছে কাজ করে খা।
নূর জাহান বোন কে নিয়ে চলে গেলো। বাহাদুর তা দেখে বলল-
-” এ তো সেই মেয়ে।
-” হুমম।
-” এ মেয়েতো গুন্ডা এজওয়ান।
-” গুন্ডা না বল গুন্ডি। এন্ড আই লাইক ইট। আর আমার একে চাই।
-” চাই মানে?
-” ওর ফোন নম্বর কালেক্ট কর।

বিকেলের দিকে সেরিন ফোন করলো আফিয়া সুলতানের ফোনে। মেহরিন তখন রুমাইসার সাথে বাগানে বসে ছিলো। রুমাইসা বই পড়ছে আর মেহরিন শুনছে। রুমাইসা হুমায়ুন আহমেদের কোথাও কেউ নেই এই বইটা পড়ছে৷ মেহরিনের ভীষণ পছন্দ বাকের ভাই কে। তার যখন ফাঁসি হয় তখন কি কান্নাটাই না করেছিল মেহরিন। একটা মানুষ যার কি না বিনাদোষে ফাঁসি হলো। মুনা কেনো ভালোবাসলো না আগে বাকের ভাই কে? মুনার প্রতি এক আকাশ সমান অভিযোগ মেহরিনের। যদিও শেষের দিকে মুনা চেষ্টা করেছিল বাকের ভাইকে বাঁচানোর জন্য৷ কিন্তু বাকের ভাই বাচলো না।
আফিয়া সুলতান এগিয়ে এসে মেহরিন কে ফোন টা দিয়ে বলল-

-” মেহরিন সেরিন ফোন করেছে।
মেহরিনের মুখে হাসি ফুটলো। ফোনটা নিয়ে বলল-
-” হ্যালো আপু। কেমন আছো?
সেরিন মুখ গুমরা করে বলল-
-” আছি ভালো। তুই কেমন আছিস?
-” আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আব্বা আম্মা কেমন আছে?
-” তোকে ছাড়া কি আর ভালো থাকে বল? আব্বা তো খাওয়াই ভুলে গেছে।
-” কাছে আছে আব্বা?
-” না, হাঁটে গেছে।
-” আম্মা?
-” কথা বল।
সেরিন মায়ের কাছে ফোন টা দিলো।
-” হ্যালো মেহরিন।
মেহরিন মায়ের গলার স্বর শুনে শান্তি পেলো।

-” কেমন আছো আম্মা?
-” ভালো আছি মা। তুই কেমন আছিস?
-” জ্বি ভালো আছি। আমি আসার পর নিজেদের যত্ন কেনো নিচ্ছ না?
-” তোর কথা ভীষণ মনে পরে রে মেহু। তোর বাপে তো ভাত হাতে নিয়ে বারবার তোর কথা জিজ্ঞেস করে।
-” আমাকে নিয়ে যাও এসে।
-” আসবি? তোর শ্বাশুড়ি আসতে দিবে?
-” জিজ্ঞেস করে দেখো।
-” আচ্ছা দে।
মেহরিন ফোন টা আফিয়া সুলতানের হাতে দিয়ে বলল-
-” আম্মা আপনার সাথে কথা বলবে।
আফিয়া সুলতান ফোন টা নিলেন। বেশ বুঝেছেন কি বলবে তার বেয়াইন। সেজন্য নিজ থেকেই বলল-

-” আপা আপনারা আসেন, মেয়ের শ্বশুর বাড়ি ঘুরে দেখে যান। আপনার মেয়ে কিভাবে আছে দেখবেন না? আপনারা কাল চলে আসেন।
-” মেহরিনের আব্বা কে পাঠিয়ে দিব নি আপা। মেয়েটাকে কয়েক দিনের জন্য পাঠিয়ে দিয়েন।
-” অনুমতি কেনো নিচ্ছেন? যখন খুশি তখন এসে আপনাদের মেয়েকে নিয়ে যাবেন।
-” আপনারাও আসুন।
-” জ্বি আসবো।
-” রাখছি তাহলে।
-” জ্বি।
আফিয়া সুলতান ফোন টা কান থেকে নামিয়ে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” মেহরিন তোমার আব্বা আসবে দু একের মধ্যে তোমাকে নিতে।
রুমাইসার মন খারাপ হয়ে গেলো। বইটা বন্ধ করে বলল-
-” মেহরিন চলে যাবে!
আফিয়া সুলতান বেশ লক্ষ করছিলেন মেয়ে তার মেহরিন কো নাম ধরে ডাকে। হোক বয়সে ছোট। সম্পর্কে তো বড়। মাথায় চাটি মেরে বলল-

-” মেহরিন কি হু? ভাবি বলে ডাক।
মেহরিন কথাটা শুনে বলল-
-” সমস্যা নেই মা। আমি তো আপুর থেকে ছোট।
-” তাতে কি? সম্পর্কে তো বড়।
-” ঠিক আছে মেহরিন কে এখন থেকে ভাবি বলবো। তা ভাবি তোমার রেজাল্ট দিবে কবে?
-” পরশু আপু।
-” প্লাস আসবে?
-” আশা তো করছি। বাকিটা আল্লাহর হাতে।
-” ইনশাআল্লাহ আসবে। কলেজেও তো ভর্তি হবে।
-” জ্বি।
-” চলো সন্ধ্যা হয়ে আসলো রুমে যাই।

রাতের দিকে মেহরিনদের ডিনার শেষে সোলেমান ফোন করলো মা’কে। এমনিতে তো নিজ থেকে জীবনে করে না ফোন। আজ নিজ থেকে করায় আফিয়া সুলতান একটু অবাকই হলো। সোলেমান কেবলই পার্টি অফিস থেকো বাড়িতে ফিরেছে। ফ্রেশ ও হয় নি। বাজে এখন সাড়ে ১০ টা। কেনো যেনো বউয়ের গলার স্বর শুনতে ইচ্ছে করলো। সেজন্য ফ্রেশ না হয়েই মা’কে ফোন করলো। আফিয়া সুলতান ফোনটা রিসিভ করতেই সোলেমান বলে-
-” আসসালামু আলাইকুম মা।
-” ওয়ালাইকুমুস সালাম। সব ঠিক ঠাক আছে?
-” জ্বি। খাইছো রাতে?
-” হুমম। তুই?
-” হয় নি খাওয়া। আচ্ছা মা।
-” হুমম।
-” মেহরিন ঘুমিয়ে গেছে?
-” বোধহয়। কথা বলবি?
-” জেগে থাকলে দাও।
আফিয়া সুলতান মেহরিনের রুমে গেলো। মেহরিন রুমের লাইট নিভিয়ে শুয়ে ছিলো। ঘুমোয় নি সে। শ্বাশুড়ির গলার আওয়াজ শুনে উঠে বসলো। আফিয়া সুলতান ফোনটা মেহরিনের হাতে দিয়ে বলল-

-” সোলেমান ফোন দিয়েছে কথা বলো।
আফিয়া সুলতান চলে গেলেন। মেহরিন সালাম দিলো। সোলেমান সালামের জবাব দিয়ে বলল-
-” কেমন আছো?
-” জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি?
-” ভালো।
লোকটা আলহামদুলিল্লাহ বলে না কেনো?
-” ভালোর আগে আলহামদুলিল্লাহ বলতে হয়। জানেন সেটা?
সোলেমানের মুখে হালকা হাসি ফুটলো।

-” জ্বি জানি।
-” যেমনই থাকুন না কেনো। সবসময় আলহামদুলিল্লাহ বলতে হয়।
-” আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। এবার হয়েছে?
-” জ্বি। আপনি দিনে কেনো ফোন দেন না?
-” কেনো আমার ফোনের অপেক্ষায় থাকো?
-” জ্বি।
-” কিন্তু কেনো?
-” সত্যি বলবো?
-” হুমম। মিথ্যা বলো নাকি?
-” কখনও মিথ্যা বলি নি আমি। আজও বলবো না। ভবিষ্যতেও বলবো না।
-” আচ্ছা বেশ তো বলো তাহলে।
-” আপনার কন্ঠস্বর টা অনেক সুন্দর।
-” তাই নাকি?
-” হুমম।
-” তোমার কন্ঠস্বর টাও মিষ্টি জানো সেটা?
-” আপনি বলার পর জানলাম। আপনি আসবেন কবে? আমি আপনাকে দেখতে চাই।
-” শুধুই দেখতে চাও?
-” হুমম। এই দেখাদেখির শহরে আপনি যে আমার অদেখাই রয়ে গেলেন৷ তৃষ্ণা যে বড্ড আপনাকে দেখার। মেটাতে আসবেন না এই তৃষ্ণা? দু চোখ ভরে আপনায় দেখার অসুখে জর্জরিত হয়ে আছি।

-” তোমার এই অসুখ সারাতে আমি আসবো মেহরিন কয়েক দিনের মাঝেই।
-” সত্যি?
-” হুমম। খেয়েছো?
-” হ্যাঁ আপনি?
-” খাওয়া হয় নি।
-” কেনো?
-” কেবল বাসায় ফিরলাম।
-” ওহ্ ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিন।
-” আচ্ছা মেয়ে শোনো।
-” হুমম বলুন।
-” আমার কাছে খুব একটা এক্সপেকটেশন রাখবে না কেমন?
-” কারন টা জানতে পারি।
-” কারন টা অজানা থাক। আস্তেধীরে বুঝে যাবে।
-” আমি একটা কথা বলতে পারি?
-” অবশ্যই।
-” আপনি আমার স্বামী। স্বামীর কাছে তার স্ত্রীর কিছুটা হলেও এক্সট্রা এক্সপেকটেশন থাকবে এটাই হয়ে থাকে স্বামী স্ত্রীর মাঝে। আর আমার এক্সপেকটেশন খুব আকাশ ছোঁয়া নয়৷ আমি সাধারণ মানুষ,আমার চাওয়া পাওয়া খুবই সামান্য।

-” যেমন?
-” আপনার ভালোবাসায় নিজেকে মুড়িয়ে রাখা।
-” ব্যাস এটুকুই?
-” জ্বি।
-” যদি এটুকুও না পাও তখন অভিযোগ রাখবে না আমার প্রতি?
-” আমি অভিযোগ করতে পারি না। অভিযোগ কাকে বলে সেটাও জানি না। আমি জানি আমার কপালে যেটা আল্লাহ লিখে রেখেছে সেটাই হবে৷ যা কপালে আছে তা অবশ্যই আমি পাবো। আর যা নেই তা কেঁদে অভিযোগ করে কখনই তা আমি আমার করতে পারবো না।
সোলেমান শুনলো কথাটা। মেয়েটা ভীষণ গুছিয়ে কথা বলতে জানে। আর এত শীতল শান্ত মেয়েটা! এদিকে সোলেমান তো মেহরিনের বিপরীত। দুই মেরুতে চলা মানুষ কি একসাথে চলতে পারবে? সোলেমান আকাশে জ্বলতে থাকা তাঁরা গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ১৪

-” স্বামী সোহাগি হও মেহরিন, দোয়া করি,তোমার স্বামী যেন তোমার এই ভালোবাসা অনুভব করে।
-” দোয়া করবেন।
কথাটা শুনে সোলেমান হেঁসে ফেললো। ফিসফিস করে বলল-
-” আমার দোয়া কখনই কবুল হয় না মেয়ে। কিন্তু বদদোয়া গুলো ভীষণ রকমের কবুল হয়৷ তোমাকে আমি বদদোয়া দিলাম মেহরিন,যেন তুমি তোমার স্বামীর ভালোবাসা পাও।
কথাটা বলেই ফের সোলেমান হেঁসে ফেললো। মেহরিন শব্দ পেলো সেই হাসির। না দেখা এই পুরুষটির হাসির শব্দও এতো সুন্দর? সামনা-সামনি না জানি তার পুরুষটি আরো কত সুন্দর! না দেখা, না জানা পুরুষটির প্রেমে শতবার সহস্রবার পড়তে রাজি মেহরিন।

দাহশয্যা পর্ব ১৬