দাহশয্যা পর্ব ৫৫
Raiha Zubair Ripti
সোলেমান পুরো রাস্তা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিবাসে ফিরে। তার ইচ্ছে করতেছে আবুল হাসান কে কে’টে টু’করো টু’করো করে ফেলতে। কতবড় সাহস সোলেমানের বউ অব্দি যাওয়ার চেষ্টা করছে! সেদিনের ঐ নিউজ দেখেই হয়তো আন্দাজ করেছিলো তারা যে সোলেমান বিয়ে করেছে। সোলেমান মোটেও তার রাজনীতির মারপ্যাঁচে মেহরিন কে আনতে চায় না। রাজনীতি মারাত্মক একটা জিনিস। মেহরিন কোনো ভাবে এসবে জড়িয়ে গেলে সোলেমান শেষ। রাজনীতির মাঠ থেকে ছিটকে পড়ে যাবে। তার দূর্বল জায়গা তার বউ। মেয়েটার কিছু হয়ে গেলে সোলেমান কে খুঁজে পাওয়া যাবে না। একবার নিজেকে সামলাতে পেরেছে,দ্বিতীয় বার পারবে না।
বাশার সুলতান সোলেমান কে এখনও রাগান্বিত দেখে ঠান্ডা জল এগিয়ে দিলো। সোলেমান খেলো না। এসির ভেতর থেকেও ঘামছে। বাশার সুলতান এসির পাওয়ার আরো বাড়িয়ে দিয়ে সোলেমান কে মাথা ঠান্ডা করতে বলে বলল-
“ মন্ত্রীর গায়ে হাত তুলে কিন্তু তুই ঠিক করিস নি
সোলেমান। অন্য ভাবেও তো বলা যেত। এখন এসব উপরমহলের কানে গেলে কি হবে ভাবতে পারছিস? নিজেদের দলের ভেতরই আমরা শত্রুতা বাড়াচ্ছি। ”
চাচার মুখে এমন কথা শুনে সোলেমান রাগে আরো ফুঁসতে শুরু করলো। তার চাচা শত্রুতা নিয়ে পড়ে আছে! সামনের গ্লাস টা ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল-
“ ঠিক ভুলের জ্ঞান একদম আমাকে দিতে আসবা না। জাহান্নামে যাক সব আই ক্যান হ্যান্ডেল ইট। কিন্তু আমার বউকে কেউ টেনে আনলে আমি কাউকে ছাড়বো না। তার জীবন টা জাহান্নাম বানিয়ে ফেলবো। কলিজা টেনে ছিঁড়ে এনে কু’ত্তাকে খাওয়াবো। হোক সে মন্ত্রী আর হোক সে এমপি। কোনো ক্ষমা নেই আমার বউয়ের ব্যপারে। তাই মন্ত্রীর হয়ে একদম চামচামি করবা না আমার সামনে। তোমার তো বউ নেই তাই তুমি এত শান্ত হয়ে আছ। বউ তো আমার তাই জ্বলছে আমার। আমার জ্বালা তুমি বিধবা বুঝবে না। তাই বকবক করো না। যাও এখান থেকে। ”
এজওয়ান সদর দরজায় পা রাখতেই সোলেমানের রাগী স্বরে বলা সব কথা কানে আসে। হাতে বাইকের চাবি তর্জনী আঙুল দিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে এগিয়ে এসে বলল-
“ কি হয়েছে ভাইজান, এত রেগে আছো কেনো? ”
সোলেমান বিরক্ত হয়ে উঠে চলে যেতে যেতে বলল-
“ এই যে এলো আরেকটা মাথা খেতে। তোর বাপকে ধরে বিয়ে দিয়ে দে। ব্যাচেলর থাকতে থাকতে তার মাথা হ্যাঙ। সেজন্য বিবাহিত দের জ্বালা বুঝতেছে না। ”
এজওয়ান বাপের পাশে বসলো।
“ এ্যই কি করছো কি তুমি ভাইজানের সাথে? তুমি তো বহুত ঝামেলার। রেগে আছে কেনো ভাইজান? ”
বাশার সুলতান সব খুলে বলল। এজওয়ান অস্থির হয়ে বলল-
“ ঠিকই তো করছে ভাইজান। আমি থাকলে তো দু চার ঘা আরো দিয়ে আসতাম। কোন সাহসে সুলতান বাড়ির বউ টেনে আনে? ”
“ তুই জানিস এর জন্য রাজনীতিতে কতটা প্রভাব পড়বে। ”
“ হে’ডার রাজনীতি তোমাগো। এই রাজনীতি না করলে কি হইবো? ভাত জুটবো না কপালে? আমি তো বলি এসব বালছালের রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাও। ব্যবসায় মনোযোগ দাও। যথেষ্ট টাকা আছে, পাওয়ার আছে। উল্টা বাহিরের দেশের লোকজন চোখ মাথা নামিয়ে কথা বলে। এদেশে থাকলে ওসব প্রধানমন্ত্রী, তথ্য মন্ত্রী দের লেজ ধরে ঝুলে থাকা লাগবে। তারা যেই আদেশ দিবে তাই মেনে চলা লাগবে। ”
বাশার সুলতান বিরক্ত হয়ে বলল-
“ তোর জ্ঞান তোর কাছে রাখ তো বাপ। জ্বালাস না। নিজের দেশ রেখে বিদেশে যাব কেনো রাজত্ব করতে? নিজের দেশে থেকে অন্য দেশ ও রাজত্ব করবো। ”
এজওয়ান বসা থেকে উঠে যেতে যেতে বলল-
“ বাংলাদেশের হেডা মার্কা রাজনীতি তে ইনফিউচার হো’গা মা’রা খাওয়ার জন্য অগ্রীম শুভেচ্ছা রইলো তোমায় পিও আব্বা। অল দ্যা বেস্ট। ”
বাশার সুলতান ছেলেকে বে’য়াদব বলে আখ্যায়িত করলেন।
এজওয়ান ঘরে এসে বউ কে পেলো না। বারান্দায় ও নেই। কই চলে যায় মাঝেমধ্যে? এক্সের সাথে দেখা করতে! আজ আসুক। ঘেটি টা ধরে শিক্ষা দিবে বেয়াদব বউ কে।
এজওয়ান ওয়াশরুমে ঢুকলো ফ্রেশ হতে।
মাহি বোনের বাসা থেকে ফিরলো সুলতান নিবাসে। বিরক্ত মুখে বাশার সুলতান কে বসে থাকতে দেখে হেঁটে রুমে চলে আসলো। রুমে ঢুকে বিছানায় বসতেই আকস্মিক ভেজা টাওয়াল মুখে এসে পড়লো। মাহি সাথে সাথে মুখের উপর থেকে টাওয়াল টা সরিয়ে এজওয়ানের দিকে রাগান্বিত হয়ে তাকিয়ে বলল-
“ কোন ধরনের কাজ এটা? ”
এজওয়ান চুল হাত দিয়ে ঝেড়ে বলল-
“ অনৈতিক। ”
“ একটু ভালো হতে পারেন না আপনি? ”
“ তুমি বানানোর চেষ্টা করেছো কখনও? ”
“ আমার ঠেকা? ”
“ তা নয়তো কার? পাশের বাড়ি কদ্দুসের বউয়ের ঠেকা? তা কোথায় গিয়েছিলে? ”
“ আপুর ওখানে। ”
“ আমার পুতের বউ ভালো আছে? ”
“ হুমম। ”
“ এক মগ কফি এনে দাও। ”
মাহি কফি আনতে চলে গেলো। এজওয়ান অবাক হলো মাহির এমন বিহেভিয়ারে। এত শান্তশিষ্ট ভদ্র বউয়ের মতন বিহেভ করছে কেনো? কোনো ঘাপলা আছে নিশ্চয়ই।
মাহি মিনিট দশেক পর কফি নিয়ে ফিরলো। এজওয়ানের হাতে ধরিয়ে দিতেই এজওয়ান কফির মগের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ বিষ টিষ মেশাও নি তো আবার? ”
” নিজে খেয়ে দেখাবো? ”
এজওয়ান বাড়িয়ে দিলো মগ। রিস্ক নেওয়ার কোনো মানেই হয় না। মাহি চুমুক দিয়ে তারপর মগ টা বাড়িয়ে দিলো। নাহ্ মাহি বেঁচে আছে কিছু হয় নি। এজওয়ান খেতে শুরু করলো।
খাওয়া শেষে এজওয়ান মাহিকে একটু রাগাতে চাইলো। ধানিলঙ্কার এমন শান্ত রূপ মোটেও
হজম হচ্ছে না এজওয়ানের। তরিকুলের বেটি আবার বিছানায় শুয়ে গুনগুন করে লা লা লা গাইছে। এত ফুর্তি জেগেছে মনে! কোন সুখে?
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল-
“ আমার ক্ষুধা লেগেছে। ”
মাহি শোয়া থেকে উঠে বলল-
“ খাবার এনে দিব?”
এজওয়ান আশ্চর্যের চরম পর্যায়ে চলে যাচ্ছে ক্রমাগত।
“ না। আমার প্রেমের ক্ষুধা লেগেছে। নিজেকে সঁপে দিয়ে ক্ষুধা মেটাও। ”
এজওয়ান ভেবেছিল এ কথা শুনলে মাহি রেগে আ’গুন হয়ে যাবে কিন্তু না। তার তরিকুল বেটি উল্টো বলল-
“ দরজা লাগিয়ে আসুন। ”
ভাবা যায়? তরিকুলের বেটি এসব বলছে! এজওয়ান তেড়ে এসে মাহিকে বিছানার সাথে চেপে ধরে বলল-
“ ভূতে ধরছে তোমায় তরিকুলের বেটি? হুজুরের কাছে নিয়ে যাব ঝাড়ুর বারি খাওয়াতে? নিজের আসল রূপে আসো। এই রূপ বড্ড বেমানান লাগে তোমার সাথে। ”
মাহি এজওয়ানের গালে তর্জনী আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে বলল-
“ ফা*ক মি এজওয়ান সুলতান। ”
শালির শরীরে জ্বর উঠছে নাকি? এজওয়ান কপাল গাল হাত দিয়ে পরখ করে দেখলো। না শরীরের টেম্পারেচার একদম স্বাভাবিক। এজওয়ান মাহি কে শোয়া থেকে উঠিয়ে ওয়াশরুমের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল-
“ শালি যা চোখ মুখে পানির ঝাপা মেরে আয়। উল্টাপাল্টা কিছু খেয়ে এসেছিস। হুঁশে নেই তুই। ”
মাহি এজওয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
“ এই ছাড়েন তো। আসেন রোমান্স করি। ”
রাগে এজওয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো।
“ শালি থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব। ”
“ ফা**”
এজওয়ান সম্পূর্ণ করতে দিলো না শব্দ টা। এই শব্দ টা একটুও তরিকুলের বেটির মুখে মানায় না। এজওয়ান মুখ চেপে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ ফা’কিং তোর ইয়োর সেল্ফের গুষ্টিরে শালি। যা এবার দূরে সর। বা’ল মি বা’ল মি শুরু করে দিছে। ”
এজওয়ান রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। এমন ছাগলামি শুরু করলো কেনো এটা? এজওয়ান চলে যেতেই মাহি আয়নার সামনে দাঁড়ালো। পৈশাচিক ভাবে হেসে হাতে থাকা কাঙ্খিত জিনসটা সযত্নে ড্রেসিং টেবিলে লুকিয়ে রাখলো।
দিনটা আজ ১৪ ই ফেব্রুয়ারী। যাকে বাংলায় বলে ভালোবাসা দিবস। ইংরেজিতে বলে ভ্যালেন্টাইন্স ডে। ১৪ই ফেব্রুয়ারী আরো একটি বিশেষ দিন। সেটা হলো আজ ঊর্মির জন্মদিন। সকাল সকাল ইমন ফোন করে বোন কে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। ইমনের মুখ থেকেই ইব্রাহিম জানতে পারলো ঊর্মির বার্থডের কথা। গতকাল রাতেও তো কথা হলো কই ঊর্মি তো তাকে বললো না আজ তার জন্মদিন। কৌশলে ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলো-
“ তোমার বোনের কত তম জন্মদিন এটা? ”
ইমন জানালো, “ উনিশ তম। ”
ইব্রাহিম স্বস্তির শ্বাস ফেললো। বিরবির করে বলল-
“ যাক বিয়ের বয়স হয়েছে তাহলে। ”
ইমন স্পষ্ট শুনতে পেলো না।
“ কিছু বললেন? ”
“ না কিছু বলি নি। তা বাড়ি গিয়ে ঘুরে আসো। ”
ইমন জবাব দিলো না। তার বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করে না এখন আর। গেলেই মেহরিনের শূন্যতা কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। ঐ গ্রামে তার মেহরিন নেই।
ইব্রাহিম নিজের ফোন থেকে ঊর্মি কে ফোন করলো। ঊর্মি ইব্রাহিমের ফোন পেয়ে রিসিভ করতেই ইব্রাহিম বলল-
“ আজ তোমার জন্মদিন আমায় বলো নি তো? ”
ঊর্মি পাল্টা প্রশ্ন করলো-
“ জানালে কি হত? ”
“ প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করা হচ্ছে? ”
“ জ্বি। জবাব দিলে তবেই জবাব দিব। ”
“ আমায় জানালে রাত ১২ টায় মহাদেবপুর এসে তোমায় উইশ করে যেতাম। ”
ঊর্মির ঠোঁটের কোনায় হাসি খেলে গেলো।
“ রাত ১২ টায়! ”
“ জ্বি ম্যাডাম। ”
“ আমি তো দেখা করতাম না আপনি আসলেও। ”
ইব্রাহিম জানতে চাইলো-
“ কেনো? ”
“ অত রাতে আমি কেনো পর পুরুষের সাথে দেখা করতে যাব? ”
“ আমি পরপুরুষ? ”
“ নিঃসন্দেহে। ”
“ ব্যক্তিগত পুরুষ হওয়ার সুযোগ দিলে পরপুরুষ থেকে সেটাও হতে পারি। ”
ঊর্মির মুখ গম্ভীর হয়ে গেলো।
“ মশকরা করছেন? ”
“ তুমি আমার বেয়াইন লাগো? ”
“ আমি যতদূর জানি আমি আপনার বেয়াইন ই লাগি। ”
“ কথা পেঁচিও না। আমি এত প্যাঁচগোছ বুঝি না। বিকেলে দেখা করতে আসতেছি। তুমি ঘোষপাড়া রোডের ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। ”
ঊর্মি ইনিয়েবিনিয়ে আমতা-আমতা করে বলল-
“ আম্মু যেতে দিবে না। ”
“ তাহলে আমি বাসায় এসে অনুমতি নিয়ে যাই তোমার আম্মুর থেকে? ”
“ এই মাথা ঠিক আছে আপনার? হামানদিস্তা দিয়ে ছেঁচবে আমায়। ”
“ তাহলে ভদ্র মেয়ের মতন চলে এসো। ঠিক ৪ টায়। ”
“ আমি আসবো না। আপনি বললেই আমায় যেতে হবে নাকি? ”
“ আমি জানি তুমি আসবে। আমি অপেক্ষা করবো গুনেগুনে ৫ মিনিট। তারপর না আসলে সোজা বাড়ি চলে আসবো। ”
ঊর্মি বাহিরে তাকিয়ে বলল-
“ আমাকে আপনি কেস খাওয়াতে চাচ্ছেন? ”
“ না আমি নিজেই খেয়ে বসে আছি সেটা। ”
“ কখন খেলেন? ”
“ প্রথমবার দেখে চোখে চোখ রেখে কখন জানি না আমি কেস খেয়েছি। ”
“ উকিল খুঁজে মুক্তি হোন এই কেস থেকে। ”
“ আপনি উকিল হয়ে মুক্তি দিলেই তো পারেন। ”
“ আমার এসব কথা শুনলে লজ্জা লাগে ভাইয়া। প্লিজ এই টোনে কথা বইলেন না। ”
ইব্রাহিমের আবেগের চূড়ায় ঊর্মি জাস্ট পানি ঢেলে দিলো। ইব্রাহিম এতে রেগে বলল-
“ ডোন্ট কল মি ভাইয়া। অনলি কল মি ছ্যাইয়া। ”
“ আপনার মাথায় সমস্যা হয়েছে। ডক্টর দেখান। ভুলভাল কথা বলছেন। রাখছি। ”
ঊর্মি ইব্রাহিমের মুখের উপর ফোন কেটে দিলো। ইব্রাহিম এই ঊর্মিকে একটু প্রেম পিরিতের কথা বললেই হেসে উড়িয়ে দিয়ে পাশ কাটে আর তা নাহলে এভাবে মুখের উপর ফোন কেটে দেয়। কতবড় সাহস এই পুচকি মেয়ের ভাবা যায়! বেয়াদব মেয়ে বড়দের মুখের উপর ফোন কেটে দেয়। আজ একটা ধমক দিবে।
ইব্রাহিম বসুন্ধরা শপিং মলে আসলো। গুনে গুনে উনিশ টা শাড়ি,উনিশ টা চকলেটের বক্স,উনিশ জোড়া চুড়ি,উনিশ জোড়া কানের দুল কিনে সুন্দর করে প্যাকিং করিয়ে বেড়িয়ে পড়লো মহাদেবপুরের দিকে।
আজকাল সোলেমান ইব্রাহিম কে বেশ ব্যস্ত দেখতে পাচ্ছে। ফোন দিলে ফোন ব্যস্ত বলে। ক্লাবে প্রয়োজন ছাড়া আসে না। খোঁজ খবর তেমন নাই বললেই চলে। এখন আবার ইয়াসিন বলছে ইব্রাহিম নাকি আজ শপিং মলে গিয়ে গাদিগাদি মেয়েদের শাড়ি চুড়ি কিনে মহাদেবপুর রওনা হয়েছে। সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
“ শাড়ি চুড়ি দিয়ে কি করবে ওয়? আজ কি কোনো বিশেষ দিন? ”
“ হ ভাই আপনে জানেন না? ”
“ না কি আজ? ”
ইয়াসিন লজ্জা পেয়ে বলল-
“ আজ তো ভ্যালেন্টাইন্স ডে ভাই। ভালোবাসা দিবস। ভাই তো মনে হয় আপনের শালির কাছে গেছে। আপনে ভাবিরে উইশ করেন নাই? ”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকে আসলো এ কথা শুনে। আজ এসব দিবস! কয় তারিখ আজ? ফোনে তারিখ দেখলো সোলেমান। আজ তো ১৪ ফেব্রুয়ারী! বউয়ের পরশু দুপুরে কথা হয়েছিল। আজ দিবে দিবে করে এখনও দেয় নি। সোলেমান ঝটপট বউয়ের ফোনে কল লাগালো।
মেহরিন জানালার সাথে থাকা টেবিল টায় বসে ডায়েরি লিখছিলো। সুলতান সাহেব আজ ফোন দেয় নি এখনও তাকে। মেহরিন ঊর্মি কে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে ফোন পাশে রেখে অপেক্ষা করছিলো উনি ফোন দিবেন। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফোন আসলো। মেহরিনের হৃদয় অস্থির হয়ে আসলো। কিন্তু তা বাহিরে প্রকাশ হতে দিলো না। খুব শান্ত থেকেই ফোনটা রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে সালাম ভেসে আসলো। মেহরিন সালামের জবাব দিলো। সোলেমান বলল-
“ বিবিজান কি করছেন? ভালো আছেন? হৃদয় শান্ত হয়েছে? ”
মেহরিন ডায়েরি টা বন্ধ করলো।
“ জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। হৃদয় শান্ত হয়েছে। আপনি কেমন আছেন? দিনকাল কেমন চলছে? ”
“ তুমি হীনা যেমন চলে তেমনই চলছে। ”
“ আমি হীনা নিশ্চয়ই ভালোই চলছে। ”
সোলেমান মৃদু হেঁসে বলল-
“ বুঝলে কি করে? ”
“ ওভাবেই। ”
“ আজ কি জানো?”
“ হুমম জানি। ”
” কি বলো। ”
“ ভালোবাসা দিবস। ”
” বুঝো? ”
” না বুঝিয়ে দিন। ”
“ বাচ্চা মেয়ে তো বুঝবা কি করে। ”
“ আপনি তো সাবালক। তো বুঝান এই নাবালক কে। ”
“ মুখে তো বোঝানো যায় না এসব। প্র্যাক্টিক্যালি বোঝাতে হয়। ”
“ আমি প্র্যাক্টিক্যালি বুঝতেও প্রস্তুত। “
“ কাছে আসলেই তো জ্ঞান হারিয়ে ফেলো। আবার বলছো প্র্যাক্টিক্যালি বুঝতে প্রস্তুত! ”
“ পুরুষ মানুষ আপনি। বউ ছাড়া থাকছেন কিভাবে? ”
“ তুমি যেভাবে থাকো সেভাবে। ”
“ ধৈর্য আছে আপনার বলতে হয়। ”
“ তোমারই তো আমি। ধৈর্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। ”
“ ভালো তো। ”
সোলেমান টেনে বলল-
” খুউউউব। ”
মেহরিন টেবিলে মাথা রাখলো। ভালোই লাগছে সময় টা।
“ ঘুমিয়ে পড়লে নাকি বউ? ”
“ না। বলুন। ”
“ তোমার পাসপোর্ট ভিসা সব হয়ে গেছে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আসবো। এসে নিয়ে যাব। ”
“ আসবেন শুনে খুশি হলাম। ”
“ সেই খুশিতে তোমার উচিত আইলাভিউ বলা। ”
“ আপনি কোনোদিন বলেছেন যে আমি বলবো? আমি আর প্রকাশই করবো না। ”
“ লুকিয়ে রাখতেও পারবে না। ”
“ পারবো। আমি সব পারি। ”
“ এই সব ব্যাপারে হেরে যাবে। ”
“ হেরে গেলে খুশি হবেন? ”
“ আমি খুশি হলে তুমি খুশি হবে? ”
মেহরিন হেঁসে বলল-
“ না হয়ে পারা যাবে? ”
“ ওয়েট ভিডিও কল দিচ্ছি। ”
সোলেমান ফোনটা কেটে ভিডিও কল দিলো। মেহরিন রিসিভ করলো। সোলেমান আবিষ্কার করলো এক শ্রেষ্ঠ স্নিগ্ধ নারী কে। পেস্ট কালারের সেলোয়ার-কামিজ পড়া। সব সময়ের মতন মাথায় ওড়না দেওয়া। সোলেমান বিরবির করে উচ্চারণ করলো— “ আমার সুলতানা। ”
পেছন থেকে ইয়াসিন বলল-
“ ভাই উইশ করেন ভাবি রে। কন হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে। এত কথা কইতাছেন। কিন্তু এটা তো কইতাছেন না। ”
সোলেমানের খেয়ালই ছিলো না এই ইয়াসিন এই রুমে আছে। হাতের ইশারায় বেরিয়ে যেতে বলল। ইয়াসিন মন খারাপ করে চলে গেলো ইমনের কাছে। আজ একটা বউ নেই বলে!
সোলেমান জানালার শিকে বা হাত ঠেকিয়ে বলল-
“ মিসেস সুলতান ইফ সামওয়ান আস্কড ইউ টু ডিফাইন লাভ, হোয়াট উড ইউ সে? ”
মেহরিন কথার বিপরীতে হাসলো। বলল-
“ মানবজীবনের সবচেয়ে পরম বিস্ময়কর অনুভূতির নাম কি জানেন? ”
“ কি?”
মেহরিন লম্বা এক শ্বাস টেনে বলল-
“ ভালোবাসা। ভালোবাসা ছাড়া বাঁচা অসম্ভব। এই ভালোবাসা কে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ডিফাইন করে থাকে । যেমন ধরুন বিজ্ঞানের ভাষায় ভালোবাসা হলো এক ধরনের হরমোনের খেলা,যা নিউরোট্রান্সমিটারের স্পন্দন। মস্তিষ্কে, ডোপামিন, অক্সিটোসিন কিংবা সেরোটোনিন নামক রাসায়নিক পদার্থের সঞ্চালন। যেটা মানুষকে আনন্দ, টান আর আবেগের অনুভূতিতে ভরিয়ে তোলে। তবে ভালোবাসার পরিধি বিজ্ঞান দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না। বিজ্ঞান যেখানে থেমে যায়, সেখানে শুরু হয় দর্শনের ব্যাখ্যা।
দর্শনের আলোকে ভালোবাসা মানে হলো এক আত্মার থেকে আরেক আত্মায় সেতুবন্ধন। তাদের ভাষায় ভালোবাসা মানুষের ভেতরের স্বার্থপরতাকে ভেঙে দিয়ে অন্যের সুখে নিজের সুখ খুঁজে নিতে শেখায়। ভালোবাসা হচ্ছে এক মহৎ আত্মসমর্পণ যেখানে আমি আর তুমি মিলে একাকার হয়ে যায় আমরা।
আর কবিদের ভাষায় ভালোবাসা হলো এক অদৃশ্য নদী, যেটা এক হৃদয় থেকে আরেক হৃদয়ে নিরন্তর বয়ে চলে। কখনো অশ্রুর জলে তার স্রোত প্রকাশ পায়, কখনো হাসির আলোয় সে ঝলমল করে ওঠে। ভালোবাসা হলো অপেক্ষার সোনালি রোদ। মানে স্মৃতির নীল আকাশ, মানে অব্যক্ত অনুভূতির গভীর সাগর।
সত্যি বলতে, ভালোবাসাকে সংজ্ঞায়িত করা প্রায় অসম্ভব। এটি হচ্ছে এক মহাজাগতিক রহস্য, যা একদিকে বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত, অন্যদিকে দর্শন দ্বারা ব্যাখ্যাত, আবার কবিদের ভাষায় কাব্যিক।
সোলেমান মনোযোগ দিয়ে শুনলো।
“ হোয়াটস ইয়োর পার্সোনাল ডেফিনিশন অফ লাভ? ”
“ মাই ডেফিনিশন? খুব সহজ। ওসব বিজ্ঞান, দর্শন কবিদের মতন প্যাঁচের বিস্তারিত নয়। খুবই ছোট সারমর্ম। আমার মতে কোনো একজনকে নিয়ে ভাবতে ভালোলাগার নাম ভালোবাসা। মনের মাঝে একজন মানুষের জন্য শূন্যতা অনুভব করার নাম ভালোবাসা। তার সাথে কথা বলতে না পেরে ছটফট করার নামই ভালোবাসা। কারো সাথে পাশাপাশি চলার তিব্র ইচ্ছার নাম ভালোবাসা। কাউকে সুখি দেখে নিজেকে সুখি ভাবার নামই ভালোবাসা। কারো চোখে দু’ফোটা জল দেখে কেঁদে ফেলার নামই ভালোবাসা। তাকে পাবে না জেনেও তাকেই ভালবাসার নামই ভালোবাসা। ”
“ বাই এনি চান্স লাস্ট সংজ্ঞা টায়ও কি আমি আছি? ”
“ আমি কি আপনাকে পাই নি বলছেন? ”
“ পেয়েছো? ”
“ শরীয়ত মোতাবেক বৈধ ভাবেই পেয়েছি জানি। ”
“ ২০২২ সালে তোমার এইচএসসি টা হয়ে গেলে আমরা বাচ্চা নিব হু? ”
মেহরিন থতমত খেয়ে গেলো এ কথা শুনে। সুলতান সাহেব কে চিনতে মাঝেমধ্যে খুব সমস্যায় পড়তে হয় মেহরিনের। হুট করে এ কথা থেকে ও কথায় লাফ দিয়ে চলে যায়। ভালোবাসার কথা তুলে লাফ দিয়ে বাচ্চার কথায় চলে গেল!
“ মাঝে মধ্যে আমার আপনাকে চিনতে অসুবিধে হয় সুলতান সাহেব। ”
সোলেমান এ কথা শুনে হাসলো। সোলেমান নিজেই নিজেকে ঠিক মতো চিনতে পারলো না। সেখানে মেহরিনের দ্বারা কিভাবে সম্ভব হবে তাকে চেনা? সোলেমান কে চেনা মানে দুঃখ কে হাসতে হাসতে বরণ করে নেওয়া। সোলেমান জানতে চাইলো-
“ মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো?
সোলেমানের এই কথা শুনে মেহরিনের বলতে ইচ্ছে করলো- “ আপনাকে চেনার চেষ্টা করতে গিয়েই তো দুঃখের সাগরে ডুবছি প্রতিনিয়ত…”
কিন্তু না,মেহরিন তা বললো না। ছোট্ট করে শুধু বলল-
“ না,চিনি না। ”
“ চেনো না! তবে চিনবে কেমন করে এই আমাকে। ? ”
“ চেনালে অবশ্যই চিনবো। ”
“ না থাক, এসব না চেনাই ভালো। চিনলে আমারই ক্ষতি বেশি। ”
মেহরিন টেবিল থেকে মাথা উঠিয়ে বলল-
“ আপনি খুব স্বার্থপর জানেন সেটা? শুধু নিজের লাভ ক্ষতি নিয়ে ভাবেন। ”
“ তোমাকে নিয়েও তো ভাবি। ”
“ সেটা সামান্য। ”
“ উঁহু অসামান্য। ”
“ তাহলে তো বুঝতাম। ”
“ বুঝে ফেললে তো সমাজ বলবে আমি বউ পাগল। ”
“ সমাজ যাকে বউ পাগল বলে। ইসলাম তাকে শ্রেষ্ঠ স্বামী বলে। বুঝেছেন? ”
“ বুঝালে বলেই বুঝলাম। ”
“ সেই খুশিতে বলুন আইলাভিউ। ”
সোলেমান হাসলো। তার কথা তাকেই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে!
“ ভালোবাসার কথা প্রকাশ করলেই মানুষ হারিয়ে যায়। আমি তোমাকে হারাতে চাই না। তোমাকে হারালে আমি নিঃস্ব হয়ে যাব। তখন পৃথিবীর সবচেয়ে ছোটলোক, গরীব, কাঙাল মানুষ টা হয়ে যাব আমি। আর আমি এসব ছোটলোকি একদম সহ্য করতে পারি না। এসব আমার সাথে যায় না। ”
“ আমি সত্যি সত্যি হারিয়ে যাওয়ার পর আবার আফসোস হবে না তো? যে কেনো প্রকাশ করলেন না এই অসুখে? ”
“ হারাতে দিবই না তোমায়। তাই আফসোসও হবে না। একদম বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখবো খুব যত্ন সহকারে। তোমার সাথে আমার এখনও সংসার করা বাকি, পৃথিবী ঘুরা বাকি,তোমাকে সাথে নিয়ে কয়েকগুটি বসন্ত পাড় করা বাকি। বয়সই বা কত তোমার বলো? সবে ১৮। ১৮ কে আমি আমার সাথে করে ৮১ অব্দি নিয়ে যেতে চাই। ”
মেহরিন নিষ্পলক চোখে দেখলো তার সুলতান সাহেব কে। তারপর ধীর গলায় বিরবির করে বলল-
“ হায়াত যে বছর সংখা মানে না সুলতান সাহেব। কারো ৮১ বছর বাঁচার ইচ্ছে টাকে ১৮ তেই সমাপ্ত করে দেওয়া হয়। জীবনের দৈর্ঘ্যটা যে সংখ্যার ওপর নয়, ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। ”
ইব্রাহিম ঘোষপাড়া রোডের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে ঊর্মির। তার বিশ্বাস ঊর্মি আসবে। মিনিট ৫ অপেক্ষা করার আগেই ঊর্মি এসে হাজির। ইব্রাহিম দূর থেকে দেখলো কালো বোরকা পরিহিত ঊর্মি আশেপাশে তাকাতে তাকাতে তার দিকে এগিয়ে আসতেছে। ইব্রাহিমের সামনে এসে ঊর্মি বিরক্ত মুখে বলল-
“ কত মিথ্যা কথা বলে আসতে হলো আমায় আপনার কোনো ধারণা আছে? আম্মু আসতেই দিচ্ছিলো না। ”
ইব্রাহিম আশেপাশে তাকালো। নাহ্ ঊর্মির নিকাবটা তোলা যাবে না। কিন্তু ইব্রাহিমের যে দেখতে ইচ্ছে করছে মেয়েটার ফেস। ইব্রাহিম জাস্ট জড়িয়ে ধরলো ঊর্মি কে। ঊর্মি বরফের মতন জমে গেলো। ছাগল ব্যাটা রাস্তা ঘাটে এসব কি করছে! লোকজন চিনে ফেললে খবর আছে। ঊর্মি ভয়ার্ত গলায় বলল-
“ আরে কি করতেছেন কি? ছাড়ুন। কি হলো কি ছাড়ুন না। আমি কিন্তু কেঁদে দিব ভাই। ”
ইব্রাহিম ফের ভাই ডাক শুনে ঊর্মির মাথায় চাপড় মারলো।
“ এই মেয়ে আমি তোমার কোন জন্মের ভাই? একদম ভাই ডাকবে না। ”
ঊর্মি উল্টো ঘরে যেতে যেতে বলল-
“ দেখা শেষ এখন চলে গেলাম। ”
ইব্রাহিম হাত টেনে ধরলো। সামনে দাঁড় করিয়ে গাড়ির ভেতর থেকে সেই ১৯ টা শাড়ি চুড়ি চকলেট বের করে ঊর্মির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল-
“ জন্ম দিনের শুভেচ্ছা আর ভাল…”
সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে পারলো না ইব্রাহিম। পেকেটে থাকা ফোন টা বেজে উঠে। ইয়াসিন ফোন করেছে। ইব্রাহিম রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইয়াসিন বলে-
“ ভাই তাড়াতাড়ি আহেন। বাশার স্যারের অবস্থা খারাপ। হাসপাতালে ভর্তি করা হইছে। হার্ট অ্যাটাক উঠছে। ”
ইব্রাহিম তাড়াতাড়ি করে গাড়িতে উঠতে গিয়েও থেমে গিয়ে পেছন ফিরে বলল –
“ সাবধানে বাসায় যাবে। আমি ফোন দিব পরে। ”
দাহশয্যা পর্ব ৫৪
ইব্রাহিম চলে গেলো। ঊর্মি হাতে থাকা প্যাকেট গুলোর দিকে তাকালো। এত প্যাকেট! এসব নিয়ে সে বাসায় যাবে কি করে? তার মা দেখলে তো প্রশ্ন করবে। তখন ঊর্মি কি বলবে জবাবে? মা তাকে আজ মা’রতে মা’রতে পিঠের চামড়া উঠিয়ে ফেলবে। ঊর্মির এখন রাস্তায় হাত পা ছুঁড়ে বসে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। এই লোক তাকে ডুবিয়ে ছাড়বে। বজ্জাত লোক।
